বুধবার

সুবিমল বসাকের কবিতা : তন্ময় ভট্টাচার্য

সুবিমল বসাকের কবিতা – হলদেটে পাতার আড়ালে : তন্ময় ভট্টাচার্য

(১)
প্রতি রাত্র
আমার লগে বেইমানি করে ম্যায়ামানুষের লেহান
                          নিখুঁত
ম্যায়ামানুষের লগে
অহন আর কোনো সম্পক্ক নাই আমার
                     তবভি
পুরানা স্মৃতি
আমারে বারবার ছোবল মারতে থাকে
আমি তাগো ভালাবাসি
ভালবাসার গাঢ়ভাব না দেইহা।
                     (হাবিজাবি – ২১)
স্বীকারোক্তির বিভিন্ন ধরণ থাকে। বেশিরভাগই প্রচ্ছন্ন। আমাদের পাঠকমন তাতে হাবুডুবু খায়, ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’ গোছের একটা ডিসশানে এসে সুখটান মারে সিগারেটে। এমন অভ্যাসে “আমি তাগো ভালাবাসি/ভালবাসার গাঢ়ভাব না দেইহা” – এসব কথা মুখোশ টেনে ধরে, চচ্চড় করে আঠা, আঁকড়ে রাখতে চাই, ছাল উঠে যায়। স্পষ্ট কথায় কষ্ট আছে তো বটেই! আমরা বাপ-মায়ের আহ্লাইদ্যা পুলা, কবিতা বলতে বুঝি পান্তাভাতের সঙ্গে পেঁয়াজ কামড়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর; সেখানে অনভ্যস্ত পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট আর গ্লিসারিনের বিক্রিয়া আগুন তো জ্বালাবেই! বালিশ তোশক কম্বল চাদর হাতের কাছে যা কিছু পাই তা দিয়ে চেপে ধরি, ছড়িয়ে যায় আরো। জল ঢালি। পোড়া গন্ধ। নাক কুঁচকাই। হো হো করে হেসে ওঠেন সুবিমল বসাক।
এখানেই চুপ করা যেত। কিন্তু ফাঁক গলে ঢুকে পড়ছে সিনিয়ার কণ্ঠস্বর। ঢাকাইয়া ভাষায় হাবিজাবি কিছু লিখলেই সেটা কবিতা হয়ে যাবে? মামদোবাজি নাকি? আমরা এতদিন ধরে ঘষে ঘষে পাছার আদ্ধেক মাংস ক্ষইয়ে মৌরসিপাট্টা দখল করলাম, আর কোথাকার কোন পাটনার ছেলে এসব স্টান্ট দেখিয়ে হাততালি নেবে? শাশ্বত বোঝে? অমরত্ব জানে? আনন্দ ওর বই ছাপিয়েছে? অমুক স্মৃতি পুরষ্কার পেয়েছে? তমুকের বৌয়ের সঙ্গে পার্টিতে ছবি তুলেছে? তাহলে কীসের কবি হে! চেষ্টা করুক, ওরও হবে। হতেই হবে। আমরা আছি না…

(২)
আরশির ওই পাড়ে ফুটছে শয়তানের চ্যারা
ফিরা ফিরা প্রতিশোধ লইতে তেইড়্যা আহে
আমার উল্টাহানই আমি নিত্য দেহি আরশিতে।
                             (হাবিজাবি – ১২)
মেলা বিপদে ফেললেন মশাই! চেপেচুপেই রেখেছিলাম এতদিন! ‘কেটেছে একেলা বিরহের বেলা/আকাশকুসুম চয়নে’ গাইতে গাইতে দিব্যি তো ফুলটুশকুমার আছি; ছিপে যদি মাছ না ওঠে, চালাও পানসি বেলঘরিয়া! ওইসব আয়না-টায়নায় দাঁড়াতে গেলে, বিবেকের গুঁতোয় মাথা মুড়িয়ে সন্নেসী হয়ে যাব যে! হ্যাঁ, আমি জানি আমি শয়তান, মাল্টিপল ডেফিনেশনের সবকটাই অ্যাপ্লাই করা চলে আমার ওপর। তা বলে সুন্দর করে রঙ মেরে রেখেছি যে পরিচয়ে, খুঁড়ে বের করতে যাব কোন দুঃখে? একটা প্রেস্টিজ আছে না? ওসব পাপবোধ-টোধ প্রথমদিকে অনেক হত, এই বুঝি কেউ এসে ছিঁড়ে দেবে সাধুপুরুষামি; ঘুম হত না অনেকদিন। নিজের মুখ নিজেকেই দেখানো যায় না, আয়নায় দাঁড়াবো কীভাবে? আড়চোখে দেখলেও একটা ছোটোলোক কোত্থেকে এসে ভ্যাঙাতে থাকে। চাবকাতে থাকে সারা শরীরে। তবে ভুলেও থাকা যায়। ফুর্তিসে বাঁচো, গুলি মারো ওসব হিস্ট্রিতে। আস্তে আস্তে সব ফিকে হয়ে যাবে।
বাই দ্য ওয়ে, আপনি জানলেন কীভাবে? কবি না গুপ্তচর মশাই?

(৩)
তোমার ওই ব্যবহার-তরিবতে
আলগা-পীরিত ছাপাইয়া ওঠে
     দেহন-মন্তরে সীনার ভীৎরে যন্তন্না টাটায়
আমি আওগাইয়া যাই তোমার লাগ্‌
পুরানা ঘটনা রক্তে অহন বিষের লেহান্‌
সময়েতে ছোবল মারে নীল নীল
তোমার লগে মেল বয়না এতটুক্‌
তবভি আওগাইয়া যাই তোমার লাগ
       ধোন্ধের লেহান কেবল ঘুইর‍্যা মরি।
                             (হাবিজাবি – ১৯)
স্বীকার করুন বা নাই করুন, ল্যাং খাওয়া মানুষ আর ঠ্যাং খোওয়া মুরগির মধ্যে প্রধান পার্থক্য হল ইচ্ছের। মানুষটি অন্ধকার ঘরে হলেও আশায়-আশায় বসে থাকে, কোনোদিন যদি ফিরে আসে! আর মুরগি দুঃখে হতাশায় নিজেকেই তুলে দেয় হত্যাকারীর হাতে। ঝুলে থাকতে কারোরই বিশেষ আপত্তি নেই – একজন আধমরা, অন্যজন পুরোটাই। কিন্তু যেখানে-সেখানে পালক ছড়িয়ে নিজেকে ঘিনঘিনে করে তুলতে পারে না বলেই মানুষ কোনোদিন মুরগি হতে পারবে না। প্রেমিকই থেকে যাবে।
এই যে ‘আলগা-পীরিত’টির কথা সুবিমল বসাক লিখেছেন, লেখেননি নেলপালিশরঙা আঙুলের কথা। দুটো মিলে যে আঁচড়, তাতেই জ্বলে ওঠে পুরুষের যাবতীয় লাগাম-প্রবণতা। বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হয়, ‘হ্যাঁ, আমিও ভালোবাসা পাওয়ার যোগ্য’। এবং, সত্যি বলতে, ফুল ফল গাছ পাখি চাঁদ তারা নদী ইত্যাদি সবকিছু এই আটফুট-বাই-ছয়ফুট ঘরের মধ্যে উপচে পড়ে। সাঁতার না জেনেও সাঁতরাতে ইচ্ছে করে, চুমু খেতে না জেনেও মনে হয় ইমরান হাসমি তো বাচ্চা ছেলে! আকাশে ঝিলিক মারতে থাকে অসময়ে চোখের বিদ্যুৎ।
এরপর বাজ-পোড়া গাছ। কখন যে ঝলসে গেছেন, বুঝতেই পারবেন না। হাত বাড়াচ্ছেন, ধরার বদলে ঢেলে দিচ্ছে যন্ত্রণার অ্যাসিড। সাধে কি মলয় রায়চৌধুরী বলেছেন – “আজ মনে হয় নারী ও শিল্পের মতো বিশ্বাসঘাতিনী কিছু নেই”! আপনার মনে ফিরে-ফিরে আসবে ফেলে আসা দিনের স্মৃতি, যাকে এত ঘনিষ্ঠ চিনতেন, আপনার উপস্থিতি তার কাছে হয়ে উঠবে বিষময়। তবু আপনাকে যেতেই হবে। বিজ্ঞানের যুগেও এ এক অদ্ভুত নিশিডাক। যাবেন, অপমানিত হবেন, ফিরে আসবেন, আবার যাবেন। সাইক্লিক প্রসেস। ফাইনালি, একদিন মুরগির মতো ঠ্যাং তুলে মরে যাবেন।
এটুকু সান্ত্বনা যেন সেদিনও থাকে যে, আপনি আসলে প্রেমিকই ছিলেন, মুরগি না…

(৪)
সারারাত্র বাত্তি আঙাইয়া আমি আর উই শুইয়া কাটাই
নীল হেজহানে লাগালাগি চাম ছেঁওয়াইয়াও কতো আল্‌গা আছি
অর চ্যারায় কুনো পীরিতের চিন্‌হী নাই
আমার চ্যারায়ও কুনো পীরিতের চিন্‌হী নাই
ভয়ান্নক রূপ দেহনের ডরে আমরা দুইজনে চোক্ষু জুইব্বা আছি
তবও নিষ্ঠুরের লেহান আওগাইয়া
            কয় দণ্ড মুহূর্ত
            কিছুটা সময়-ওক্তো
আমরা ‘পীরিতের খেলা-পীরিতের খেলা’ খেলি।
                               (হাবিজাবি – ৪)

তারপর, পাশ ফিরে ঘুমিয়ে পড়ি। ভালোবাসা যখন বাধ্যতায় পরিণত হয়, তার থেকে কষ্টকর আর কিছুই নেই। ছেড়ে আসার পথ বন্ধ, কারণ আপনি দায়িত্ব নিয়েছেন; ভুলে যাওয়ার ক্ষেত্রেও আঙুল তোলে শিষ্টাচার। প্রতিবাদ তখনই সফল হয়, যখন পিছুটান ফেলে আসা যায়। আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে পড়েও ঘেন্না নিয়ে বেঁচে থাকি বলেই আমরা সংসারী। আমরা অসহায়। পূর্বনির্দেশিত বেশ কিছু নিয়মের মধ্যে একটা হল অপরকে তৃপ্ত করা। মনের খবর ক’জনই বা রাখে! শরীরে শরীর লেগে আগুন জ্বলে ওঠাই যেন সাম্যবাদের শ্রেষ্ঠ সাফল্য। বিশ্বাস করুন, আমি-আপনি তখন একটা যন্ত্র ছাড়া আর কিছুই নই। ওয়েল্ডিং মেশিনের সঙ্গে আমাদের কোনো পার্থক্যই নেই।
ভালোবাসাহীন এই মিলনে মরে যেতে যেতে আর কতদিন সামাজিকতার পরীক্ষা দিতে হবে, বলতে পারেন?

(৫)
২৬নং রাস্তার চৌমাথায় আইয়া দেহি
             ম্যায়ামানুষ খাড়াইয়া আছে সটান
শরীল লইয়া আওগাইয়া আহে, পুরুষের হুম্‌কে
আমি আঙুলের ইশারা করতেই খোলস্‌ ছিড়্যা বাইরইয়া পড়ে লাল ফুল
সোন্দর পাপড়ি ছিড়্যা দাঁতে চাবাইয়া দেহি,
               অহন আর কুনো সোয়াদ পাই না
গাড়ীর লামাৎ কেউ চাপা পড়লেও অস্‌থির হই না
এই শহরের নিশ্বাসে আমার কইল্‌জা পুইড়্যা গেছে
আন্ধারে কেবল বিড়ালের লাল চক্ষু জ্বল জ্বল করে
                                   (হাবিজাবি – ২৩)

টইটম্বুর হয়ে আছেন। একটা টোকা মারলেই ফুটপাথ ভেসে যাবে বিরক্তিতে। সিগারেট খেয়ে খেয়ে মুখের ভেতরটা পানসে। চুমু খেতে চাইছেন কি? সাবধান! বিষ যখন অমৃতের বেশে ধরা দেয়, তার থেকে বিপজ্জনক আর কিছুই হতে পারে না। হাতছানি। শক্ত হচ্ছেন। কাছে এগিয়ে এল। শক্ত। আহ্বান। ঝাঁপালেন। আবার বিরক্তির শুরু…
কোথায় যাওয়া যায় বলুন দিকি? মর্গের দেয়াল ছেয়ে গেছে সিনেমার পোস্টারে। থানার বাইরে পাবলিক টয়লেট। মন্দিরের চাতালে জুয়ার আড্ডা। ন্যাংটো ছেলে পুরুষ হতে চাইছে। ফুটপাথে ঘন্টা থাকে না। সাইরেন। কোথায় পালাবেন? মৃত্যু এখন জলভাত। খালাসিটোলা? বড্ডো ভিড়। একা হতে চাই। আপনিও কি? চলে আসুন তাহলে আমাদের একমেবাদ্বিতীয়ম কুঠুরিতে। যেখানে জয়েন্ট মানে শুধুই পরীক্ষা নয়। চোখ লাল হলে অন্ধকারের ভয় দেখাবে না কেউ। নরম গদির পাশে একট পিকদানি ও একটা তবলচি পেলে আপনিই আজ রাতের নবাব।
মুজরোর চিন্তা নেই। তিলোত্তমা ঘাঘরা ওড়াতে পারে ভালো…


কাব্যগ্রন্থ – হাবিজাবি
কবি – সুবিমল বসাক
প্রথম প্রকাশ – ১৯৭০
রচনাকাল – ১৯৬৩-৬৮

                                                                  





 

 
   





কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন