মঙ্গলবার

ফালগুনী রায়, আমার ছোট ভাই -- সুবো আচার্য

ফালগুনী থাকতো বরানগরের দিকে, সেই রাস্তাটা ছিল ওরই সম্মানিত পূর্বপুরুষ ‘রতনবাবু’র নামেই। ঐ নাম গঙ্গার ধার ঘাটছিল একটা, ছিল শ্মশান- রাস্তার শুরুতে প্রসূতিসদন এবং অন্যদিকে মহাশ্মশান- বরানগর জায়গাটা আমায় খুব টানতো- ভয়ংকরভাবে, অত্যন্ত ব্যাপকভাবেও, তথাকথিত রাজনীতি বরানগরকে বদলাতে পারেনি। ফালগুনীর পূর্বপুরুষ রতনবাবু- যাঁর নামে রাস্তা, তিনি ছিলেন যশোরের নড়াইল রাজ এষ্টেটের স্মরণীয় মানুষ। তো ফালগুনী ছিলো নড়াইল-এর রাজবাড়ির বংশধর। ওর অতিসম্মানিত পূর্বপুরুষেরা ছিলেন বিদ্বান, গুনী মানুষ, আর তাঁরা ছিলেন শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকুলচন্দ্রের আশ্রিত, দেওঘরের সৎসঙ্গ আশ্রমে ওদের নামে একটা বাড়িও ছিল- ‘নড়াইল হাউজ’- এখনও আছে। যদিও আমার সেটা খুব ভালোভাবে দেখা হয়নি। খুব ভালোভাবে আলাপ হওয়ার অনেক পরে ফালগুনীর পূর্ব পুরুষের কথা ওর কাছ থেকে জানতে পেরেছি।

ফালগুনীর সঙ্গে আমার আলাপ হয় কলেজষ্ট্রীটের কফিহাউসে- আধময়লা ধুতিফুল শার্ট পরা, পায়ে অতি সাধারণ চটি- সর্বাঙ্গে দারিদ্রের ছাপ- দারিদ্র্যের না অন্যমনষ্কতার কে জানে? কিন্তু সমস্ত অন্যমনষ্কতা, দারিদ্র্য বা জীবনের ধুলিধূসরতা ভেদ করে এক অত্যন্ত প্রতিভাবান যুবকের দীপ্ত অবয়ব মুখশ্রী গ্রীক যুবাদের মতো একটু ঔদাসীন্য ছিলো ওর চোখে আর ছিল এক অদ্ভুদ নির্লিপ্ত ভাব- যেন এই জগতের মধ্যে বাস করেও ও এই জগতের কেউ নয়। যেন অল্পদিনের জন্য এখানে এসেছে দেখতে, কোনও কাজে নয়, আবার ফিরে যাবে যেখান থেকে এসেছিলেন।

চেহারায় লাবণ্য ছিল ক্ষীয়মান, শুনতো বেশি আর চাঞ্চল্য ছিল না তেমন। আমাদের চেয়ে বয়সে অনেক কম- বরং ওর দাদা তুষার রায়, পরবর্তীকালের খ্যাতিমান কবি তুষার রায় ছিলেন আমাদের সমসাময়িক। কিন্তু তুষারের চেয়ে ফালগুনীকেই আমার বেশি ভালো লাগতো- তার একটা বড় কারণ হয়তো এই যে, ফালগুনীর মধ্যে কোনও উচ্চাকাঙ্খা ছিলো না, কোনও মতলব ছিলো না-ও যখন সুনীলদার সঙ্গে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে কথা বলছে- ওর ভঙ্গিতে কোনও অতিরিক্ত আগ্রহ বা আতিশয্য ধরা পড়তো না- হয়তো সেরকম ভাব ওর মধ্যে ছিলও না- বরং ভাবটা অনেকটা এরকম ছিল যে ’আমি ফালগুনী রায় কথা বলছি- আপনার পরবর্তীকালের কবি’- এটা ওর অহংকার ছিল না- কিন্তু কোথাও একটা উদাসীনতা ছিল। শুনেছি ওর পিঠোপিঠি এক ভাই যিনি পাটনার কোনও এক বিখ্যাত হোটেলের ম্যানেজার ছিলেন, ওর আরও অনেকরকম বংশগত কৌলিন্য ছিল যেগুলো ও কখনও বলতো না- সেসব খবর পেয়েছি ওর পাড়ার ছেলেদের কাছ থেকে।

আমার চেয়ে বয়েসে ও অনেক ছোট ছিল- কিন্তু কখনও ও হাংরি জেনারেশনের কাউকেই দাদা বলেনি- না শৈলেশ্বর বা সুভাষকে- না বাসুদেব বা প্রদীপকে- কিন্তু আমাদের সাহিত্য সংক্রান্ত আলোচনা গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনতো।

অতি আশ্চর্যভাবে হাংরি জেনারেশনের লেখালেখির মূল স্পিরিট এবং ধারণাগুলি আয়ত্ত করেছিল, ওর লেখার শুরুও হয়েছিল সেভাবেই- ভাষা, ভাব, শব্দনির্বাচন, বিষয়, উপমা, চিত্রকল্প, প্রতীক- সবই হাংরি জেনারেশনের মনে করবেন যে কেউ- যেন সাবলীলভাবে ও স্বত:স্ফূর্তভাবেই ও ছিল জন্ম-হাংরি। ফালগুনী ছিল আমার কাছে, শেষ হাংরি কবি ও গদ্যকার। জীবনকে দেখার একটা নির্লিপ্ত কিন্তু স্বচ্ছ স্পষ্ট ভঙ্গী ছিল ওর। আর ছিল এক আশ্চর্য নিষ্ঠুরতা- যেটা ও সবচেয়ে বেশি প্রয়োগ করেছে নিজের ওপর।

মাত্রাতিরিক্ত মাদকসেবন ও উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপনের কারণে মাত্র ৩৬ বছর বয়সে মারা গিয়েছিলেন ফালগুনী রায়( ৭ই জুন ১৯৪৫-৩১শে মে ১৯৮১) । যিনি লিখেছিলেন,
"আমি রবীন্দ্রনাথ হতে চাই না – হতে চাই না রঘু ডাকাত
আমি ফালগুনী রায় হতে চাই – শুধুই ফালগুনী রায়"
তিনি হয়েছিলেন। হয়ে আছেন।
ভিন্নচোখ প্রকাশনী প্রকাশ করেছে ফালগুনী রায় সমগ্র।
চট্টগ্রামে পাাওয়া যাবে- বাতিঘরে,
যশোরে- বই হাট,
বরিশালে- বুকভিলা,
বগুড়ায়- পড়ুয়া,
সিলেটে- বইপত্র,
কোলকাতায়- অভিযান পাবলিশার্স এবং ধ্যানবিন্দু,
ঢাকায়- পাঠক সমাবেশ, শাহাবাগ এবং গদ্যপদ্য- কনকর্ড, কাটাবনে।
rokomari.com থেকে অর্ডার করলে বাংলাদেশেরে যেকোনো জায়াগায় পাওয়া যাবে ।
হট লাইন: 01758461368
ফালগুনী রায় সমগ্রতে আছে তার সাক্ষাৎকার। তার পরিবার পরিচিতি। কবিতা আছে সবগুলোই। আছে তার একমাত্র গল্প ‘কাঠের ফুল’। প্রবন্ধ ‘একজন অশিক্ষিত ও তিনজন হাংরি গদ্যকার’। আছে মঞ্চ নাটক ‘কলো খ্রীষ্ট’। চিত্রনাট্য আছে তিনটি। জরায়ু, মানুষ-মানুষী, অন্তিম জরায়ু। বন্ধু মলয় রায় চৌধুরীর লেখা স্মৃতিকাব্য যখন ফালগুনী রায়ের সঙ্গে আকাশে উড়তুম।
ফালগুনী রায়ের একনিষ্ঠ পাঠিকা ।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন