বৃহস্পতিবার

সোনালী মিত্র নিয়েছেন মলয় রায়চৌধুরীর সাক্ষাৎকার

মায়াজম :  '' প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার '' এর পরে মলয় রায়চৌধুরীর সেই কবিতা আর এলো কই যে আগামী প্রজন্ম মনে রাখবে ? নাকি বিতর্ক হয়েছিল বলে কবিতাটা বিখ্যাত হয়েছিল ? নাকি মলয় রায়চৌধুরীর সব প্রতিভা ঢাকা পড়ে গেলো ''প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার '' এর সৌজন্যে ?

মলয় :  ওটা ছিল মূলত দ্রুতির কবিতা ; আক্ষেপানুরাগের কবিতা । ওই কবিতার দরুন পঁয়ত্রিশ মাস ধরে আদালত-উকিল-চাকুরি থেকে সাসপেনশানের কারণে অর্থাভাব ইত্যাদির ফলে দ্রুতির রেশ আক্রান্ত হয়েছিল । কলকাতায় তো আমার মাথাগোঁজার ঠাঁই ছিল না, কেননা আমরা তখন পাটনায় থাকতুম । সুবিমল বসাক ছাড়া অন্যান্য বন্ধুরাও কলকাতায় তাদের আস্তানায় রাতে থাকতে দিত না । উত্তরপাড়ার আদিবাড়ির খণ্ডহরে রাতে থাকলে সকালে কলকাতা আদালতে যাবার জন্যে প্যাসেঞ্জার ট্রেন, যার সময়ের ঠিক ছিল না । ইলেকট্রিক ট্রেন তখন সেরকমভাবে আরম্ভ হয়নি । সে কি দুরবস্হা । টয়লেট করতে যেতুম শেয়ালদায় দাঁড়িয়ে থাকা দূরপাল্লার ট্রেনে ; রাত কাটাতুম সুবিমলের জ্যাঠার স্যাকরার এক-ঘরের দোকানে, বৈঠকখানা পাড়ায় । একই শার্ট-প্যাণ্ট পরে দিনের পর দিন কাটাতে হতো ; স্নান রাস্তার কলে, সেগুলোও আবার এতো নিচু যে হামাগুড়ি দিয়ে বসতে হতো । কবিতা লেখার মতো মানসিক একাকীত্বের সময় পেতুম না মাসের পর মাস । 

‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতাটা তখন বিখ্যাত হয়নি ; হয়েছে এই বছর পনেরো-কুড়ি হল । তখন তো ভয়ে লোকে হাংরি শব্দটাই ব্যবহার করত না, কবিতাটা নিয়ে আলোচনা তো দূরের কথা । আমার মনে হয় বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর ওদেশে কবিতাটা প্রকাশের ব্যাপারে বা হাংরি আন্দোলন নিয়ে আলোচনার ব্যাপারে ভীতি ছিল না । ঢাকায় মীজানুর রহমান ওনার পত্রিকায় ধারাবাহিক আমার ‘হাংরি কিংবদন্তি’ প্রকাশ করেছিলেন । আশির দশকে আমার বেশির ভাগ লেখা প্রকাশিত হয়েছে ঢাকার পত্র-পত্রিকায় । বাংলাদেশের কবিদের দেখাদেখি পশ্চিমবঙ্গে বছর দশেক পরে কবিতাটা প্রকাশের সাহস যোগাতে সক্ষম হন লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদকেরা । এখন তো কলকাতার সংবাদপত্রের পুস্তিকাতাও প্রকাশিত হতে দেখি । ‘ক্ষুধার্ত’, ‘ক্ষুধার্ত খবর’ ইত্যাদি যে পত্রিকাগুলো সুভাষ ঘোষ আর বাসুদেব দাশগুপ্ত প্রকাশ করত, তাতেও ওরা আমার কবিতা প্রকাশ করতে বা আমার নামোল্লেখ করতে ভয় পেতো ; এমনকি হাংরি শব্দটা এড়াবার জন্য ক্ষুধার্ত শব্দটা প্রয়োগ করা আরম্ভ করেছিল । আসলে শৈলেশ্বর ঘোষ, সুভাষ ঘোষ আদালতে আমার বিরুদ্ধে রাজসাক্ষী হয়ে গিয়ে আত্মঅবমাননার গাড্ডায় পড়েছিল ।

আমার মনে হয় তোদের নাগালে আমার বইপত্র পৌঁছোয় না বলে কেবল ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ দ্বারা প্রভাবিত রয়েছিস । আমার উপন্যাস ‘ডুবজলে যেটুকু প্রশ্বাস’ আর ‘অরূপ তোমার এঁটোকাঁটা’ তো বেশ বৌদ্ধিক রেসপন্স পেয়েছে, বিশেষ করে কম বয়সী অ্যাকাডেমিশিয়ানদের থেকে । নয়তো কেনই বা বিষ্ণুচন্দ্র দে আমার কবিতা নিয়ে পিএচডি করবেন, উনি ওনার গবেষণাপত্র গ্রন্হাকারে প্রকাশ করেছেন । স্বাতী বন্দ্যোপাধ্যায় এম ফিল করবেন ? মারিনা রেজা ওয়েসলিয়ান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে হাংরি আন্দোলন নিয়ে গবেষণার জন্য আসবেন ? আরও কয়েকজন তরুণ-তরুণী গবেষণা করছেন । অধ্যাপক দেবপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায় সম্প্রতি ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতাটা বিনির্মাণ করে অ্যাকাডেমিশিয়ানদের সাইটে আপলোড করেছেন । পড়ে দেখতে পারিস । তুই দিল্লিতে থাকিস বলে আমার বইপত্র পাস না। এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে ইটালি থেকে গবেষণার জন্য আসছেন ড্যানিয়েলা লিমোনেলা ।

মায়াজম :  হাংরি আন্দোলন নতুনধারার কবিতার জগতে বিপ্লব এনেছিল । কিছুদিন ফুল ফুটবার পরেই রোদের তাপে মিইয়ে গেলো ! মতপার্থক্য জনিত কারণেই কি আন্দোলন শেষ হয়ে গেলো ? পৃথিবীতে সমস্ত আন্দোলনই প্রথমে আগুন লাগিয়ে দেয় মানুষের বুকে , আবার আগুন নিভিয়েও দেয় আন্দোলনের হোতারা , হাংরি ও এর ব্যতিক্রম হোল না কেন?

মলয়: হ্যাঁ, পৃথিবীর সব আন্দোলনই একটা নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে গড়ে ওঠে ; তার কাজ হয়ে গেলে মিলিয়ে যায় ; আন্দোলন মাত্রেই সমুদ্রের আপওয়েইলিং । হাংরি আন্দোলনের অনুপ্রেরণায় একের পর এক কতোগুলো আন্দোলন হয়ে গেছে বাংলা সাহিত্যে । তারা মিডিয়া প্রচার পায়নি বলে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারেনি । আমরা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মিডিয়ার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পেরেছিলুম, যে কারণে এই মাস তিনেক আগেও বিবিসির প্রতিনিধি এসে একটা প্রোগ্রাম তৈরি করে নিয়ে গেলেন আর প্রসারণ করলেন । গত বছর আমেরিকা থেকে অনামিকা বন্দ্যোপাধ্যায় এসে একটা ফিল্ম তৈরি করে নিয়ে গেলেন ; হাংরি আন্দোলন নিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বক্তৃতা দেবার সময়ে ওনার কাজে লাগে ফিল্মটা। হাংরির পর তো কবিতার আর গদ্যের ক্রিয়েটিভ ধারাই পালটে গেছে ।

মায়াজম :  আপনারা কবিতা আন্দোলন করে কি করতে চেয়েছিলেন ? এতদিন পরে পেছনের দিকে তাকালে কি মনে হয় অল্পবয়সে হুজুকে চেপেছিল আপনাদের সাহিত্য সাধনা ? আপনারা যা চেয়েছিলেন তার কতখানি সফলতা অর্জন করেছিলেন ? যদি সফলতা অর্জন করে থাকেন তাহলে ধরে রাখতেই বা পারলেন না কেন ?

মলয় : না, আমাদের আন্দোলন কেবল কবিতার আন্দোলন ছিল না । গদ্য-নির্মাণ আর ছবি-আঁকারও আন্দোলন ছিল । ছবি আঁকায় ১৯৭২ সালে অনিল করঞ্জাই ললিত কলা অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড পেয়েছিলেন । বাসুদেব দাশগুপ্তের ‘রন্ধনশালা’ গল্পের বইটা সেই ষাটের দশকেই প্রশংসিত হয়েছিল ; এখন তো ওর রচনাসমগ্র প্রকাশিত হয়েছে, আর পাঠকদের দ্বারা সমাদৃত হচ্ছে । হাংরি আন্দোলনের কারণে পাঠবস্তু মুক্ত হয়ে গেছে যুক্তির কেন্দ্রিকতা থেকে; কবিতা আর গল্প লেখা হচ্ছে মুক্ত-সূচনা, মুক্ত-সমাপ্তি এবং মুক্ত আঙ্গিক নিয়ে ; মানের নিশ্চয়তা এড়াতে পারছে ; অফুরন্ত মানে গড়তে পারছে; সংকরায়ণ ঘটাতে পারছে; ‘আমি’কে বহুমাত্রিক আর বহুস্বরিক করে তুলতে পারছে ; শিরোনামের পরিবর্তে রুবরিক প্রয়োগ করতে পারছে ; ভঙ্গুরতা আনতে পারছে ; মাইক্রোন্যারেটিভকে গুরুত্ব দিতে পারছে; ফ্লাক্স তৈরি করতে পারছে । এ থেকেই তো বোঝা যায় যে পরের পর প্রজন্মে সফলতা ক্রমশ চারিয়ে যেতে পেরেছে ।

মায়াজম : হাংরি ভূত কি গায়ে চেপে বসে আছে এখনও আপনার পরিচয়ের সঙ্গে ? এখন ও যা লেখেন মানুষ তুলনা টানে হাংরি কবিতার সঙ্গে , এটাকে উপভোগ করেন না খারাপ লাগে ? জীবনের এইপ্রান্তে এসে কি মনে হয় হাংরি আন্দোলন অন্যকোন ভাবে পরিচালনা করা যেত যাতে এই সময়েও সমান প্রাসঙ্গিকতা থাকত ?

মলয়: হাংরি আন্দোলনের তো কেউ পরিচালক ছিলেন না । আমাদের আন্দোলনের কোনো সম্পাদকীয় দপতর, হেড কোয়ার্টার, হাই কমাণ্ড, পলিট ব্যুরো জাতীয় ব্যাপার ছিল না । যাঁর যেখান থেকে ইচ্ছে বুলেটিন বা পুস্তিকা প্রকাশ করার স্বাধীনতা ছিল । বাঙালির সাহিত্য চেতনায় এই ব্যাপারটা ছিল অভাবনীয় । প্রথম দিকে হ্যাণ্ডবিলের আকারে বেরোতো আর ফ্রি বিলি করা হতো ; যিনি বের করতেন তিনিই বিলি করতেন । কবিতার পোস্টারের প্রচলনও আমরাই সর্বপ্রথম করি, তখনকার দিনে উর্দু লিথোপ্রেসে অনিল করঞ্জাইয়ের আঁকা পোস্টার ছাপিয়ে । দেয়ালে সাঁটার কাজটা করতেন ত্রিদিব মিত্র আর ওনার প্রেমিকা আলো মিত্র । এখন যেটা হয়েছে তা হাংরি নাম ঘাড়ে চেপে যাওয়ার নয় । যা মাঝে-মাঝে নজরে পড়ে তা হল, মলয় রায়চৌধুরী নামটা আমার লেখার আগেই পাঠকের কাছে পৌঁছে একটা ইমেজ গড়ে ফেলার । এর জন্য আমার কিছু করার নেই । জনৈকা পাঠিকা লিখে জানিয়েছিলেন যে আমার কবিতাগুলোকে তিনি প্রিডেটর মনে করেন, এবং আমাকে নয়, আমার কবিতার সঙ্গে তাঁর সুপ্ত যৌনসম্পর্ক গড়ে ওঠে তা তিনি টের পান । অর্থাৎ এ-ক্ষেত্রে আমার নামকে অতিক্রম করে তিনি আমার কবিতার সঙ্গে সম্পর্ক পাতিয়ে নিয়েছেন । এই তরুণীর চরিত্রটিকে আমি ‘ভালোবাসার উৎসব’ কাব্যনাট্যে ব্যবহার করেছি । হাংরির ভুতপ্রেত আমার চেয়ে পাঠক-পাঠিকার ওপর চেপে বসেছে বেশি করে । আর হাংরি আন্দোলনের প্রাসঙ্গিকতা না থাকলে তুই পাঁচ দশক পর বিষয়টা নিয়ে উৎসাহী কেন ?

মায়াজম : স্পষ্টত তখন হাংরি আন্দোলন নিয়ে বাংলার কবিদল দু'ভাগে বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল , যারা সঙ্গে থাকব বলেও পরে সরে গিয়েছিলেন , যারা কিছুদিন থাকবার পরে সরে গিয়েছিলেন , যারা প্রথম থেকেই বিরুদ্ধে ছিলেন , তাদের প্রতি আপনার কখনও কি মনে হয়েছে যে শিল্প-সাধনার স্বাধীনতার পরিপন্থী ছিলেন তারা ? কিংবা তাদের সেই সাহস ছিল না ?

মলয় : দু’ভাগ নয়, অনেক ভাগ । লেখালেখির জগতে এই ধরণের ঘটনা আকছার ঘটে । এটা ব্যক্তিচরিত্রের ব্যাপার, শিল্প-সাধনার নয় । সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় আমেরিকা থেকে সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, উৎপলকুমার বসু, শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে চিঠি লিখে ওসকাচ্ছিলেন হাংরি আন্দোলন ছেড়ে বেরিয়া যাবার জন্য । তাঁরা বেরিয়ে গিয়ে আমার বিরুদ্ধে পুলিশের সাক্ষী হয়ে যেতেই উনি ফিরে এসে আমার পক্ষের সাক্ষী হয়ে গেলেন আর নিজের বন্ধুদের ছবিটা বাঙালির ইতিহাসে নোংরা করে দিলেন । মীজানুর রহমান ‘হাংরি কিংবদন্তি’ ধারাবাহিক প্রকাশ করার পর গ্রন্হাকারে বের করতে চাইছিলেন, কিন্তু সেখানেও শামসুর রাহমানের মাধ্যমে তাঁকে বিরত করা হয় ; করেছিলেন ‘কৃত্তিবাস’ গোষ্ঠীর কবিরা । স্ট্যালিন যখন পরাবাস্তববাদীদের জেলে পুরছিলেন তখন কয়েকজন কমিউনিস্ট হয়ে-যাওয়া পরাবাস্তববাদী স্ট্যালিনকে সমর্থন করেন । হুমায়ুন আজাদ আর অভিজিৎ রায় হত্যা নিয়ে আল মাহমুদ আর নির্মলেন্দু গুণ মুখে লিউকোপ্লাস্ট লাগিয়ে বসে রইলেন । আল মাহমুদ একজন মৌলবাদী, তাঁর আচরণ বোঝা যায় । নির্মলেন্দু গুণ মুখ খুললেন না ভয়ে, এসট্যাবলিশমেন্ট তাঁকে সাহিত্যের ইতিহাস থেকেই লোপাট করে দিতে পারে এই আশঙ্কায় । পশ্চিমবঙ্গেও গণধর্ষণের ঘটনা ঘটে, কিন্তু ‘পরিবর্তনওয়ালা’ কবি-সাহিত্যিকরা মুখে লিউকোপ্লাস্ট চিপকে লুকিয়ে পড়েন । শিল্প-সাধনার স্বাধীনতা তখন কোথায় যায় ?

মায়াজম :  মলয় রায়চৌধুরী একটা ব্র্যান্ড । মলয় রায়চৌধুরী তকমা ছেপে গেলে অনেক কিছু করে ফেলা যায় যা একটা সাধারণ শিল্পীর দ্বারা সম্ভব নয় ! আপনার কি মনে হয়নি এতদিন যা লিখেছেন , যা লিখছেন এসব যেন কিছুই নয় , চরম কিছু বাকি রয়ে গেলো যা এখনও লেখা হোল না ! শেষ সময়ে এসে কি পেছনে তাকিয়ে হাঁটেন না সামনের পথ তৈরি করার খেলাতে মেতে আছেন ?

মলয় : হ্যাঁ, আসল লেখা এখনও লেখা হয়ে ওঠেনি ; মগজের মধ্যে ঘটে চলে অনেকরকমের ভাবনাচিন্তা। ব্র্যাণ্ড কিনা তা জানি না । আমার কতো প্রবন্ধ, কবিতা, উপন্যাস, কাব্যনাট্য গ্রন্হাকারে প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে । ব্র্যাণ্ড হলে তো কোনো না কোনো প্রকাশক রাজি হতেন প্রকাশ করতে । কেউই রাজি হন না । অনেকে ছাপার জন্য টাকা চেয়ে বসেন । টাকাই যদি দিতে হয় তো নিজেই ছাপিয়ে ফ্রি বিলি করা ভালো, যেমন রবীন্দ্রনাথ করতেন । কেননা প্রকাশকরা টাকা নিয়ে নাকি যথেষ্ট কপি ছাপেন না, শুনেছি কয়েকজন তরুণ কবি-সাহিত্যিকের কাছে । পেছনে ফিরে তাকাই না । আমি বইপত্র সংগ্রহ করি না, নিজের বইও আমার কাছে নেই, তাই আগের লেখাগুলোর সঙ্গে সম্পর্কটা অবিরাম ছিন্ন হয়ে চলেছে । আমার বইয়ের কোনো লাইব্রেরি নেই । বই-পত্রিকা পড়ি, আগ্রহী পাঠকদের বিলিয়ে দিই ।

মায়াজম : যৌবনে শুভা শেষ জীবনে অবন্তিকা'র মধ্যে দিয়ে প্রেমের ভিন্নতা খুঁজতে চাওয়া কি কোন ভুল সংশোধন ? নারীকে যখন ভোগ্য , পুরুষকে ও যখন ভোগ্য ভেবে সমস্ত নৈরাশ্যকে প্রশ্রয় দেওয়া হয় , তখন কি মনে হয়নি শ্মশানের পাশেই হাসনুহানা গাছে কত ফুল ফুটে আছে , সেই ফুলের শোভা ও নৈরাশ্যর মতই ভীষণ সত্য , ফুলকে উপেক্ষিত করা যায় ?

মলয় : শুভা যৌবনের নয় ; বয়ঃসন্ধিকালের । আমার “রাহুকেতু” উপন্যাস পড়লে তুই আমার জীবনের কয়েকজন নারীর সঙ্গে পরিচিত হতে পারবি । “ভালোবাসার উৎসব” কাব্যনাট্যেও আছেন তাঁরা । আমার ‘অলৌকিক প্রেম ও নৃশংস হত্যার রহস্যোপন্যাস’ বইতে একটি নারী চরিত্র আছে যে একজন আধচেনা পুরুষের হাত ধরে বলে ওঠে, ‘চলুন পালাই’ । এটা আমার জীবনে একজন নারীর প্রবেশের প্রয়াস ছিল । অবন্তিকা একটি নির্মিত প্রতিস্ব । এর আগে রামী, বনলতা সেন, নীরা, নয়ন, সুপর্ণা ইত্যাদি ছিল কবিদের নিজস্ব নারী । অবন্তিকা সেরকম নারী নয়, সে স্বাধীন, পাঠকের কাছে, আলোচকের কাছে, নির্দ্বিধায় যায় । অবন্তিকা আমার স্লেভগার্ল নয় ।

মায়াজম : এই সময়ের কবিতার ভবিষ্যৎ কি ? এই সময়ের কবিতা কোনপথে এগিয়ে গেলে হাংরি যেখানে শেষ করেছিল সেখান থেকে শুরু করা যাবে ? নাকি এখনকার কবিরা গোলকধাঁধায় পড়েছে , কি করবে না করবে কিছুই যেন লক্ষ্য নেই তাদের সামনে ? নাকি এখনকার কবিতা সমাজ রাষ্ট্র সময় থেকে সরে যাওয়া কোন জাফর শা ? কোন উত্তাপ লেগে নেই তাদের হৃদয়ে ?

মলয় : এখন তো অনেকের কবিতা পড়ে আমার হিংসে হয়; অসাধারণ কবিতা লিখছেন এখনকার কবিরা । মনে হয় শব্দ বাক্য ছন্দ সবই তো রয়েছে, আমি কেন এদের মতন লিখতে পারছি না । যেমন রাকা দাশগুপ্ত, সাঁঝবাতি, মুজিবর আনসারী, বিভাস রায়চৌধুরী, অনুপম মুখোপাধ্যায়, বিদিশা সরকার, বহতা অংশুমালী, মিচি উল্কা প্রমুখ । সব নাম এক্ষুনি মনে আসছে না ।

মায়াজম : কবির চেতনায় কোন না কোন পূর্বজ কবির একটি আদর্শগত ধারাপাত থেকে যায়, এটা প্রাচীন কাল থেকেই লক্ষণীয় ,কবি অগ্রজ কোন কবির দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন ? আসলেই কে কাউকে সামনে রেখে এগিয়ে যাওয়া যায় সাধনায় ? যদি যায় কতদূর গিয়েই বা ফিরে আসা উচিত নিজের চেতনায় ?

মলয় : শৈশবে আমাদের পরিবারে শিউনন্দন কাহার আর বাবার ফোটোগ্রাফি দোকানে রামখেলাওয়ন সিং ডাবর, দুজন কাজের লোক ছিল । শিউনন্দন নিরক্ষর হলেও পুরো রামচরিতমানস মুখস্হ ছিল । রামখেলাওয়ন রহিম, দাদু আর কবির থেকে উদ্ধৃতি দিতে পারত । তারা কাজের লোক ছিল বলে সরাসরি বকুনি দিতে পারত না, কিন্তু রামচরিতমানস বা রহিম-কবির-দাদু থেকে কোট করে জানিয়ে দিত আমরা কী ভুল করছি । আমার বাল্যস্মৃতি “ছোটোলোকের ছোটোবেলা”র ‘এই অধম ওই অধম’ অংশে আমি তাঁদের উদ্ধৃতি দিয়ে নিষেধ করার কিছু উদাহরণ দিয়েছি । অগ্রজ কবিদের বদলে এই দুই জনের প্রভাব আমার ওপর গভীরভাবে পড়েছিল । তাছাড়া, আমাদের বাড়িতে প্রথম স্কুলে পড়তে ঢুকেছিলেন আমার দাদা সমীর রায়চৌধুরী । আমাদের পরিবার সেই অর্থে শিক্ষিত-সংস্কৃতিমান পরিবার ছিল না । বাবা-মা আর জেঠা-কাকারা কেউই স্কুলে পড়েননি । বাবা-জেঠারা সুযোগ পাননি কেননা ঠাকুর্দা ছিলেন ভ্রাম্যমান ফোটোগ্রাফার-আর্টিস্ট, বেশির ভাগ সময় কাটাতেন প্রিন্সলি স্টেটের সদস্যদের পেইনটিং আঁকায় ; উনি সপরিবারে মুভ করতেন এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় । আমার বাবা তো জন্মেছিলেন লাহোরে । গোঁড়া বামুন পরিবার ছিল বলে ঠাকুমা আর বড়োজেঠা রবীন্দ্রসঙ্গীতকে মনে করতেন বেমমো ; বহুকাল রবীন্দ্রসঙ্গীত নিষিদ্ধ ছিল আমাদের বাড়িতে ।

মায়াজম : প্রতিটি সফল পুরুষের পিছনে নাকি একজন নারী শক্তি বিরাজ করেন ।আপনার কলমের প্রাণোচ্ছল পরিনতির জন্য কোন নারীশক্তিকে কি আধার মানতে চান ?কবি কলম দূর্ধষ রোম্যান্টিক, এই রোম্যান্টিসিজম এখনো কি প্রেমে পড়তে বাধ্য করে ?আপনার কলমে যে নারীদের পাই তারা কি শুধুই কল্পনারী নাকি বাস্তবেও তাদের ছোঁয়া আছে ?

মলয় : না, আমার পেছনে কোনো নারী নেই, মানে প্রেমিকা-নারী নেই । তবে সাপোর্ট সিস্টেম হিসাবে মা ছিলেন । যে নারীদের আমার লেখায় পাস, তারা কল্পনারী নয়, বাস্তবের নারী, একমাত্র অবন্তিকা হল বিভিন্ন নারীর উপাদান নিয়ে নির্মিত একটি প্রতিস্ব । ‘চলুন পালাই’ পর্ব থেকে আমি আর প্রেমে পড়তে চাই না । রোম্যান্টিক হওয়াটাই আমাকে বিপদে ফেলেছে বারবার । বড্ড ডিসট্র্যাকশান হয় প্রেমে । বুড়ো হয়ে গেছি বলে বলছি না, অভিজ্ঞতা থেকে বলছি ।

মায়াজম : একদম সর্বশেষ প্রশ্নটা করেই ফেলি , আগামীদিনে আপনার পরিকল্পনা কি ? নতুন কি কোন পরিকল্পনা আছে লেখালেখি নিয়ে ? পাঠকরা কি নতুন স্বাদের কিছু পেতে চলেছে আপনার কলম থেকে ? 

মলয় : তোরা তো আমার লেখাপত্র যোগাড় করে পড়িস না । কমার্শিয়াল পত্রিকায় আমার লেখা বেরোয় না যে হাতে পাবি। ‘রাহুকেতু’ উপন্যাসে লেভেল-জামপিং আর ফ্রো-টু আঙ্গিক দেবার কাজ করেছি । ‘ঔরস’ উপন্যাসে ফর্ম ভেঙে মানুষের পাশাপাশি মাছিদেরও টিভি সাংবাদিকের চরিত্র দিয়েছি । ‘গল্পসংগ্রহ’তে বিভিন্ন জীবজন্তু পাখিপাখালিকে রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক মানুষের ভূমিকা দিয়েছি । চটকল আর পাটচাষের দুর্দশা নিয়ে ‘নখদন্ত’ উপন্যাসটায় ডায়েরি, নোটস, সত্য ঘটনা আর কাহিনির মিশেল দিয়েছি । ‘জঙ্গলরোমিও’ নামে একটা উপন্যাস পুজোর সময় প্রকাশিত হবার কথা, যার গল্প একদল ক্রিমিনালদের নিয়ে, সেখানে কারোর নাম উল্লেখ করা হয়নি, তাদের সংলাপের ঢঙই তাদের পরিচয়। এলেকট্রা কমপ্লেক্স নিয়ে একটা নভেলাও প্রকাশিত হবে পুজোর সময় বা পরে, তাতেও ফর্মের নিরীক্ষা করেছি ।



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন