বুধবার

হাংরি আন্দোলন ও একটি সিনেমা প্রসঙ্গ

মাঝেমাঝে কিছু আলোচনা খুব মন দিয়ে লক্ষ্য করি। আলোচকদের কবিতাবোধ ও কবিত্বশক্তির ওপর আমার শ্রদ্ধা অটুট। এটাও মানি যে, প্রত্যেকেই নিজস্ব চিন্তার দ্বারা চালিত হন। তবু অবাক লাগে যখন দেখি, তাঁরা হাংরি সাহিত্য সম্পর্কে স্বচ্ছন্দ নন আজও। কোথাও একটা ঘৃণা কাজ করে। আঙ্গিক পত্রিকায় প্রকাশিত একটি সাক্ষাৎকারে সুবিমল বসাক বলেছিলেন – “লোকের মনে একটা কনসেপ্ট তৈরি হয়ে গেছে যে, হাংরিদের লেখা মানেই কয়েকটা গালাগাল, কয়েকটা অশ্লীল শব্দ থাকবেই। ফলে পরিস্থিতিও এরকম দাঁড়িয়েছে।” হ্যাঁ, অনেকের মধ্যে আমিও এই ধারণার প্রতিফলন দেখেছি। কিন্তু কেন হবে তা? আমি, তরুণ এক পাঠক, বঙ্কিমচন্দ্র থেকে বিবেক ভট্টাচার্য পর্যন্ত সাবলীলভাবে বিচরণ করতে পারছি যখন, চণ্ডীদাস থেকে সায়ন্তন সাহা, মধ্যিখানের হাংরি সাহিত্য কেন অস্বস্তিকর হবে? আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, হাংরি আন্দোলন না হলে বাংলা সাহিত্যের সাবালকত্ব পেতে আরও বহুদিন লেগে যেত। 

কয়েকটি অশ্লীল শব্দ বা আপত্তিকর দৃশ্যলিখন কখনও ওই সমালোচকদের অস্বস্তির কারণ হতে পারে না। কারণ তাঁরা যথেষ্ট পরিণত এবং প্রগতিশীল মননসম্পন্ন, এই বিশ্বাস আমার আছে। তাহলে, সৃষ্টিটি সাহিত্য হয়ে উঠতে পারেনি তাঁদের মতে। এই কথাটি ব্যক্তি আমি-কে সংশয়ে ফেলে। তাহলে আমারই পাঠে খামতি থেকে গেছে কোথাও? চমকে ভুলেছি? তা তো নয়! নিরপেক্ষ হয়ে খানিকক্ষণ চোখ বুজে ভাবলে, দেখতে পাই আমার কথা, আমার প্রাত্যহিক যাপন চিন্তার কথা, যা ধরা পড়েছে হাংরি আন্দোলনকারীদের কলমে। আমি যা প্রত্যেক মুহূর্তে ভাবছি, করছি কিংবা করতে চাইছি, তারই আংশিক ঘটনাবলির সততা উচ্চারিত হয়েছে সেখানে। আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগেই। আর আমি, তরুণ এক পাঠক, ২০১৬তে বসে পড়তে পড়তে বিন্দুমাত্র সঙ্কুচিত হচ্ছি না, শালীনতাবোধ একটুও আহত হচ্ছে না আমার। বরং অবচেতনে থেকে যাওয়া কথাগুলো ফুটে উঠতে দেখে ঋদ্ধ হচ্ছি, নিজেকে চিনছি নতুন করে।

এত কথা বলার কারণ, এটা স্বাভাবিক যে, স্থিতিশীল সমাজে যা এখনও মোড়কে রাখতে হয়, তার হঠাৎ-উন্মোচন একটা তোলপাড় তুলে দেয়। অনেক আক্রমণ ধেয়ে আসে। নিন্দা। কটূক্তি। শিল্পবোধের থেকে বড় হয়ে দাঁড়ায় তখন ব্যক্তি-অহং। ছায়াচ্ছন্ন একটি শালীনতাবোধ, যা প্রত্যেক মানুষের ক্ষেত্রে পৃথক।

সহজিয়া সাধক-রা বলেন, ঈশ্বরের নাগাল পেতে হয় নিজের মধ্যে দিয়েই। মিলনের তুরীয় অবস্থায় যে আনন্দ, রসের স্খলনসংযমে যে দৃঢ়তা, তা পরমের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। ‘যৌনতা’ শব্দটি তার আপাত অর্থ ছাড়িয়ে অনেক বিস্তৃত হয়ে যায় তখন। সৃষ্টি ও স্রষ্টা বিলীন হন পরস্পরে। সাধারণের জন্য কঠিন এক মার্গ অনুশীলনের দ্বারা সফলতা প্রাপ্ত হয় যেন।

অঙ্ক একটি জটিল বিষয়। কিন্তু পারদর্শীদের মতে, এর পরতে পরতে যে সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে, তার স্বাদ একবার পেলে আর সব তুচ্ছ হয়ে যায়। একেকজনের কাছে অঙ্ক একেক রূপে ধরা দেয়। কারোর কাছে ভয়, কারোর কাছে আবার মুগ্ধতা। সবটাই নির্ভর করে অনুশীলনকারীর ওপর।

প্রসঙ্গে আসি ‘Mathrisk 37.7%’-নামক শর্টফিল্মটির। যেখানে দুটি পুতুল আসলে একটি মানুষ। একটি পুতুল অবসাদগ্রস্ত হয়ে বারবার আত্মহত্যার প্রয়াস করে এবং তা ব্যর্থ হওয়ার পর বিষণ্ণ যে বসে থাকা, অপর পুতুলটির আগমনমুহূর্ত ঘনিয়ে ওঠে সেখানেই। ‘I am straight’ – প্রথম পুতুলটির এই স্বীকারোক্তি(যে কিনা সুপারম্যান – এখানে বিষয়টি কাব্যিক হয়ে ওঠে আরও) ও সারল্য যেন অঙ্ক না-পারার উপমায় আসলে সমাজে তার অস্তিত্বসংকট-কেই বোঝাচ্ছে। যে একাকীত্বে সঙ্গী হয়ে ধরা দেয় দ্বিতীয় পুতুলটি(পরিচয়ে স্পাইডারম্যান, যেন জালের আদরে বলতে চাইছে – ‘আছি’)। অঙ্ক বোঝানোর প্রয়োজনে তার সংসর্গ ও সান্নিধ্য পরিণতি পায় মিলনে। পরস্পরের শরীরে যে জ্যামিতি, তা যেন অঙ্কেরই সৌন্দর্য। দৃশ্যত সমকাম হলেও, প্রেক্ষিত সঙ্কীর্ণতার অনেক ওপরে। যা সুন্দর, তার পরিচয় দিতে কোনও নামের প্রয়োজন নেই। হ্যাঁ, প্রথম পুতুলটি কাটিয়ে ওঠে অবসাদ।

চমক শেষ দৃশ্যে। পুতুলদুটি আসলে একটি শিশুর খেলার উপকরণ। এমন এক শিশু, যে জাগতিক ও সামাজিক গণ্ডির চক্রান্তে পা দেয়ার অবকাশ পায়নি। সে নিষ্পাপ। দেখতে দেখতে আমার মনে ভেসে উঠেছিল একটি মধুর কল্পনা। হয়তো শিশুটির বাড়িতে অন্য কেউ জ্যামিতিচর্চা করে(কেননা শিশুটির যা বয়স, তাতে জ্যামিতির পাঠপ্রসঙ্গ আসা অসম্ভব), হয়তো শিশুটি সেই জ্যামিতির ছবিগুলি দেখে-দেখে নিজের সরল মনেই খেলা জুড়েছে তার নিজস্ব দুটি পুতুলের সঙ্গে, যে পুতুলদুটি জ্যামিতিছবির অনুকরণে নিজেরাই হয়ে উঠেছে সৃষ্টি। শিশুটি কিছুই জানে না তার। সে ঈশ্বর। আপনভোলা। শ্যামল মিত্রের গানটা হঠাৎ মনে পড়েছিল আমার – “এ যে বাজিকরের খেলা রে মন, যার খেলা হয় সে জানে।” কিংবা ‘আনন্দ’ সিনেমায় রাজেশ খান্নার সেই কথাটি – “বাবুমশাই, হম্‌ সব রঙ্গমঞ্চ্‌ কি কাঠপুতলিয়া হ্যয়…’। ঈশ্বরের হাতের টানেই যেন লেখা হয়ে চলেছে মর্ত্যের একের পর এক মহাকাব্য। আবেগীরা একে ‘লীলা’ বলেন। আমি বলি কবিতা। যে কবিতা একটি নিষ্পাপের দৌলতে দুটি নিষ্পাপে বিলীন হয়ে যায়।
শর্টফিল্ম? কে জানে! আমি তো একে ‘কবিতা’ ধরে নিয়েছি!

পুনশ্চ – এখন একটিবার প্রথম প্যারাগ্রাফটির বক্তব্যের সারমর্ম চিন্তা করুন। দর্শক কীভাবে নেবেন এই আপাত সমকাম? শৈল্পিক বোধটুকু কি ধরা দেবে, দৃশ্য ছাড়িয়ে? কবিতার রসগ্রাহী এমনিতেই কম; হাংরি কবিতা হলে তো কথাই নেই…



 


 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন