বৃহস্পতিবার

যখন বাসুদেব দাশগুপ্তের সঙ্গে হাঙরের ঢেউয়ে সাঁতার কাটতুম




যখন বাসুদেব দাশগুপ্তের সঙ্গে হাঙরের ঢেউয়ে সাঁতার কাটতুম

malay

যখন বাসুদেব দাশগুপ্তের সঙ্গে হাঙরের ঢেউয়ে সাঁতার কাটতুম                                               ম ল  য় রা য়  চৌ ধু রী

হাংরি আন্দোলনের দ্বিতীয় বছরে, ১৯৬২ সালের প্রথম দিকে, পরিচয় হয়েছিল বাসুদেব দাশগুপ্তের সঙ্গে, আর তখন থেকেই আমাদের হাঙরের ঢেউয়ে সাঁতার কাটা ।
বাসুদেব দাশগুপ্ত তখন ‘রন্ধনশালা নামের ফিকশনটা লিখছে ।
ওহ সে কতো সমুদ্র, কতো নদ-নদী, কতো ঝিলপুকুর ।
কতো হাঙর চলে গেছে আমাদের পাশ দিয়ে, দেঁতো হাসি হেসে, কিংবা ল্যাজের আছাড় মেরে জলকে ঘোলাটে ফেনায় ফাঁপিয়ে, হাঁ-মুখ খুলে গোঁতা মেরেছে কুচো মাছের ঝাঁকে ।
ক্রান্তীয় নাতিশীতোষ্ণ উষ্ণ পত্রিকায় আর খোলা সাগরের সেই স্পিনার হাঙরেরা, গায়ে চাককাটা বুশশার্ট, ছুঁচোলো মুখ, কালচে নিউজপ্রিন্ট নাড়িয়ে ভাসতে ভাসতে গেছে আড়চোখে ।
ক্যারিবীয় প্রবাল হাঙর, আঙুলে গোমেদ আর প্রবালের আঙটি কিন্তু মার্কসবাদী, রঙবদলু অক্টোপাস খেতে ভালোবাসে, অতলান্তিকে সাঁতরেছে আমাদের পাশ কাটিয়ে, শিকারি চোখের পিটপিটে চাউনি মেলে ।
কাঁধে ঝোলা পিগমি হাঙর, বড়ো হাঙরদের চেলা, দেখেই ফিসফিসিয়ে পালিয়েছে  কফিহাউসের ভিন্ন ভিড়েল টেবিলে । তিমি হাঙর, বেঘো হাঙর, লিটল সিল মাছ দেখলেই, পেংগুইন দেখলেই ছুটেছে পেছনে, তুলে আছাড় মারার ধান্ধায়, তারপর আমাদের দেখে কেটে পড়েছে অন্য ঢেউফেনায় ।
কতো যে দাঁত বদলাতে দেখেছি সেসব হাঙরদের, সারা জীবনে তিরিশ হাজার দাঁত ওঠে আর পড়ে যায় ওনাদের, মানে জীবনভর ওনারা একবার শিশু ,  আর একবার বুড়ো , এই ভাবেই চালিয়ে দেন ওনাদের দেঁতো বিদ্যায়তনিক আর সাংবাদিক অভিজ্ঞতার ওঠানামা ।
আমরা তবুও সাঁতরেছি নীল জলে; কাউকে ভয় দেখাইনি, তবুও হাঙরেরা আমাদের ভয় পেয়েছে । সেপাই বরকন্দাজ খোচর লেলিয়েছে । টেকো খোচর, পিঠে কুঁজ খোচর ।
কতো দিন পেছন ফিরে দেখেছি, ফলো করছে । ভেবেছি, আমাদের ফলো করার কি দরকার ! কোনো তরুণী ফলো করলে না হয় কথা ছিল । কিন্তু টেকো কুঁজো কিংবা রোগা কেলো ভেড়া ! তারা যে পুলিশের ইনফরমার, জেনেছি, কয়েক বছর পর ।
কখনও পাশ দিয়ে কিলবিলিয়ে গেছে কালচে-পেছল অ্যানাকোণ্ডা ।
আর রুপোলি আঁশের মাছেরা ? বোয়াল, চিতল, মাগুরেরা ? তারা তিড়িক নাচন নেচেছে । তারপর প্রতিষ্ঠানের বঁড়শিতে গেঁথা কেঁচো কামড়ে ধরতে গিয়ে এইপাশ ওইপাশ । পড়েছে গিয়ে মেছো বাজারের দরাদরিতে । গলা কাটা, রক্ত বেরোচ্ছে, পটকা ফেটে বেরিয়ে গেছে বক্তিমেবায়ুর তেলপোঁটা ।
ঠোঁটে লিপ্সটিক মাখা পারশে, তোপসে, বাটা ।
আর বিদ্যায়তনিক শুঁটকি । রোদে থুথ্থুরে লাঠি হাতে গলির ভেতর  দিয়ে যেতে দেখেছি শুঁটকি মাছবুড়োদের।
ব্ল্যাক সি, ইয়েলো সি, হোয়াইট সি, রেড সি ।
কালো প্রেস, হলুদ প্রেস, শাদা প্রেস, লাল প্রেস — হাঙরের ঢেউয়ে ঢেউয়ে ।


শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কোচিং ক্লাসের টিচার বাসুদেব দাশগুপ্ত, শক্তিদার চেলা, কোচিং ক্লাসে সব বিষয়ই পড়ায় ।
উনি বললেন, একে নিয়ে নাও, পাণ্ডুলিপি দেখিয়েছে, গদ্যের হাত খুব ভালো । ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়ের ‘কঙ্কাবতী’ পড়েছো তো ? ও এর আগে যে লেখাটা লিখেছে, ‘চোরাবালি’ নামের গদ্য, সেটা অবশ্য এক্সপেরিমেন্টাল নয় ।
‘রন্ধনশালা’ নামে একটা গল্প লিখছি । একটা উপন্যাসও প্রায় শেষ করে এনেছি, নাম দিয়েছি, ‘উৎপাত’ । শক্তিদাকে বলল বাসুদেব । আচরণে যৎসামান্য বিব্রতভাব ।
কঙ্কাবতী আমার স্নাতকস্তরের বাংলা কোর্সে ছিল ; তাছাড়া ত্রৈলোক্যনাথ আমার ঠাকুমার জাঠতুতো ভাই, ওনার সুপারিশে বড়োজ্যাঠা পাটনা মিউজিয়ামে কিপার অফ পেইনটিংস অ্যাণ্ড স্কাল্পচার হয়েছিলেন । পরে, বাসুদেবের ‘রন্ধনশালা’ সিরিজের ফিকশান পড়ে বুঝেছি যে ত্রৈলোক্যনাথের সঙ্গে বাসুদেবের বেশ পার্থক্য আছে । ত্রৈলোক্যনাথ ইরর‌্যাশানাল হলেও ধাপেধাপে যুক্তিগেঁথে ফিকশানকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন । বাসুদেব এগিয়েছে ন্যারেটিভের সময়ের অনুক্রম ভেঙে-ভেঙে, এক ঘটনা থেকে হঠাৎ আরেক ঘটনায় লাফিয়েছে । বাসুদেবের ন্যারেটিভ স্ট্রেটেজির সঙ্গে ত্রৈলোক্যনাথের ন্যারেটিভ স্ট্র্যাটেজির মিল নেই ।
বাসুদেব, তুমি হারাধন ধাড়াকে গদ্যটা দিয়ে দিও, উনিই কলকাতায় ছাপাবার ব্যবস্হা করেন । বললুম আমি, যুবকটিকে ।
নববর্ষের অনাবিল আনন্দ
মিস ক্যালকাটার উপস্হিতিতে ২০ জন শ্রেষ্ঠ শিল্পীর নৃত্য, অর্কেষ্ট্রা, বাংলা ও হিন্দী চিত্রের গান, গজল ও
ফিরপোর পুরো ক্যাবারে ।
আরও একটা ব্যাপার, বললেন মিসেস কফ । এখেনে নিউ ইয়র্কের মতো বিজ্ঞাপনের যন্ত্রণা সহ্য করতে হয় না।
ওখানে জানালা খুললে বিজ্ঞাপনের আলো, টেলিভিশানে বিজ্ঞাপনের ছবি, রেডিওয় বিজ্ঞাপনের চিৎকার, কোথায়
যাই বুঝতে পারি না । এখানে বিজ্ঞাপন এখনও তেড়ে এসে মাথায় উঠে বসেনি । ইচ্ছে করলে নিরিবিলি শান্তিতে
গার্হস্হ জীবন যাপন করতে পারে একজন বিজ্ঞাপনের দৌরাত্ম্যের বাইরে ।
শাড়ি পরা মিসেস কফের কোলে দৌড়ে এসে বসল তার ফুটফুটে ছেলে আর মিসেস কফের ছোট্ট চিৎকার, এই
যাঃ ।
কী হল ?
শাড়ি খুলে গেল !
ঘুটঘুটে অন্ধকার । আমরা কোথায় চলেছি ?
স্টিকস নদী পার হওয়ার সময় নিশ্চিন্ত করে কেউ বলতে পারে না কোথায় যাচ্ছি….
— ঐ যে ডেসমণ্ড । ওই তোমার শত্রু ।
–কোথায় ?
— এটা ছেড়ে দাও । শান্ত হও ডেসমণ্ড । পৃথিবীতে তোমার কে শত্রু আছে ?
— আমি জানি না স্যার । কিন্তু তলোয়ারটা ছোঁবার সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে অজেয় মনে হল, আর সবাইকে শত্রু বলে
মনে হতে লাগল ।
–এটা অশুভ….। এখান থেকে পালাতে হবে ।

দিয়ে দেব । তুমিই ছাপাবার খরচ দাও ? চাকরি করো ? আমার এখনও চাকরি জুটল না । টিউশানি করে চালাচ্ছি ।
আমার মুখ থেকে আর্কটিক সাগরের গন্ধ বেরোচ্ছিল বোধহয় ।
বললুম, ওয়েলকাম টু দি হাংরিয়ালিস্ট প্যানথেয়ন ।
আমার দিকে ইশারা করে শক্তিদা বললেন, আরে ও তো কোটিকোটি টাকার নোট পোড়াবার চাকরি করে ।
নোট পোড়াবার চাকরি ? অবাক বাসুদেব । অমন চাকরি হয় নাকি ?
হ্যাঁ, বস্তা-বস্তা রিজার্ভ ব্যাঙ্কের পচা গলা তেলচিটে নোংরা নোট, যেগুলো আর চলবেনা, সেগুলো জ্বালানো হয়, ইনসিনেটারে । নাকে রুমাল বেঁধে, কেননা তা থেকে মড়াপোড়ার গন্ধ বেরোয় ।
বাসুদেব মোটা কাচের চশমার ফাঁক দিয়ে চোখ কুঁচকে জানতে চাইল, তোমার ইয়ার অফ বার্থ কতো ?
ব্যাঙ্কনোট পোড়ানোর সঙ্গে জন্মসালের কি করার আছে বুঝতে পারলুম না. বললুম, ১৯৩৯ সাল ।
হেঃ হেঃ, বলল বাসুদেব, আমি তোমার চেয়ে বয়সে বড়ো, আমি জন্মেছি ১৯৩৮ সালে । তা তুমি হারাধন ধাড়া লোকটাকে পেলে কোথায় ? দেখতে কেমন ভদ্রলোককে ?
বললুম, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের দৌরাত্ম্যে এতদিন তো ব্রাহ্মণ, কায়স্হ, বদ্যিরাই সাহিত্যে রাজত্ব করল, ইউরোপ থেকে আনা মানদণ্ডে লেখালিখি করে । তাই ধাড়া পদবি দেখে একটা লিটল ম্যাগাজিনের সম্পাদকের বাড়িতে মিট করতে বলে ওনাকে পেয়েছি । তবে উনি পদবি পালটে ফেলার কথা ভাবছেন ; ওনার মতে, অমন পদবী দেখে কেউই লেখা ছাপতে চায় না ।
সেকথা ঠিক । তা কোথায় থাকেন উনি ?
হাওড়ার একটা বস্তিতে ।
আচ্ছা, আন্দোলনের অফিস তাহলে বস্তিতে ?
অফিস-টফিস বলে কিছু নেই । কলকাতায় একজন কাউকে তো দরকার যে কোঅর্ডিনেট করবে । আমাদের আন্দোলন কারোর বাপের সম্পত্তি নয়, কোনো হেডকোয়ার্টার, হাইকমাণ্ড, পলিট ব্যুরো, সম্পাদকের দপতার জাতীয় ব্যাপার নেই  ; তুমিও নিজের লেখা নিজেই ছাপাতে পারো, হাংরি জেনারেশনের ডাক তুলে ।
ছাপাবার পয়সা কোথায় ! বাংলায় বিএ স্নাতক হয়ে চাকরিই জুটলো না এখনও ।
বাংলা পড়ে চাকরি জোটা কঠিন । গ্র্যাজুয়েশানের পর পোস্টগ্র্যাজুয়েশান করছ না ?
খরচ দেবে কে ? স্নাতক হয়েছি এই তো যথেষ্ট । স্কুলটিচারি যদি পাই তাহলে বি এডটা দেবো ।
শক্তিদা আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, তুমি তো আমার চেয়ে বেশি ডুবজলে চলে গেছো দেখছি ; সকালবেলাতেই টেনে এসেছ ?
পিসেমশায়ের বাড়ি উঠেছি ; সেন্টুদাকে তো জানেনই, বললে, চল, রাধাবল্লভী, আলুর দম আর তাড়ি দিয়ে ব্রেকফাস্ট করা যাক । বিহারিদের ঠেক আছে সোনাগাছির লাগোয়া, সকালবেলায় তাড়ি বিক্রি করে ।
সোনাগাছিও যাও নাকি ? জানতে চাইল বাসুদেব ।
এখনও যাইনি ।
যদি যাও তাহলে জানিও । নোট পোড়াবার চাকরি করছ, কিছু নোট না হয় ওই পাড়ায় পোড়ালে।
ঠিক আছে ; সেন্টুদাকে সঙ্গে নিতে হবে, নয়তো উল্টোপাল্টা বাড়িতে গিয়ে পৌঁছোব আর টাকা খসিয়ে নেবে ।
মলয়, ওকে এত তাড়াতাড়ি তোমাদের খোট্টা লাইনে নিয়ে যেও না, আগে লেখালিখিটা পাকুক , শক্তিদার উপদেশ ।
জিগ্যেস করি বাসুদেবকে, ওর মুখে অসহায়তার পাতলা প্রলেপ দেখে, তুমি কি প্রেম করে ব্যর্থ হয়েছ ?
বাসুদেব, কোনো উত্তর না দিয়ে কেবল, হেঃ হেঃ ।
এরপর লক্ষ করেছি, প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যেতে হলে বাসুদেবের মুখ থেকে কেবল হেঃ হেঃ ।
সেন্টুদাকে চেনেন শক্তিদা, সমুদ্র দুজনেই এক চুমুকে ফুরিয়ে ফেলতে পারেন । পিসেমশায়ের বড়ো ছেলে । সেন্টুদা আর পিসেমশায় দুজনেই বাংলা সমুদ্র ভালোবাসেন, বিদেশি সমুদ্রে আগ্রহ নেই । ওঁদের দুজনেরই দাঁত কালো হয়ে এসেছে । সন্ধ্যাবেলায় একই সময়ে দুজনকে দেখা যায় খালাসিটোলায় ।
শক্তিদার সঙ্গে সাঁতার কাটা মানে পুরো পুকুর উনি শুষে নেবেন, নদী হলে নদী, সাগর হলে পুরো সাগরই চোঁ-চোঁ করে । ওনাকে সাগরে ভাসাতে হলে বেস্ট ছিল ওনার উল্টোডাঙার বস্তির ঘরে এক বোতল সমুদ্র নিয়ে পৌঁছোনো, নীল সমুদ্র নয়, আবসাঁথ তো আর আমাদের পুকুরে-নদীতে-সাগরে মেলে না । জলের রঙের সমুদ্র কিংবা চায়ের লিকারের রঙের । ওনার কোনো বাছবিচার নেই ।
চাইবাসায় দেখেছি ওনার কাজকম্মো । প্রেমিকাকে ফেলে পালিয়ে এসেছিলেন কেন, তা তখন, ১৯৬১-৬২ সালে জানতুম না, পরে জানলুম, ব্যর্থ প্রেমের বদলাটা আমার ওপর নিয়েছিলেন, আমার বিরুদ্ধে সাক্ষী হয়ে ।
বাসুদেবের মোটা কাচের চশমা, বাদামি ফ্রেম, ফিকে নীল জলকাচা বুশশার্ট, ধূসর রঙের প্যাণ্ট, চটি । হেঃ হেঃ হাসি । করমর্দন করে বুঝলুম হাত ঘামে, নরম । হেঃ হেঃ হাসির আড়ালে কেমন যেন যন্ত্রণার রেশ ।
বললে, তুমি তো পাটনায় থাকো, কলকাতায় হ্যাঙ্গাম বাধিয়েছ কী করে ?
বললুম, হারাধন ধাড়া আছেন কলকাতায় । কফিহাউসে, প্রেসিডেন্সিতে, সংবাদপত্র অফিসে প্রথম তিনটে বুলেটিন বিলি করেছে, ফলে হইচই ।
বললে, হারাধন ধাড়া, ওই যিনি হাওড়ায় থাকেন ? পরিচয় হয়নি এখনও ।
শক্তিদা বললেন, আমি পরিচয় করিয়ে দেব’খন । আজকেই সন্ধ্যাবেলা  কফি হাউসে লেখা কালেক্ট করতে আসবে অরূপরতন বসুর থেকে । সন্দীপন হারাধনের বাড়ি গিয়ে লেখা দিয়ে এসেছে ।
পাটনার ঠিকানা দিয়ে বললুম, তোমার কয়েকটা ফোটো পাঠিয়ে দিও, সকলের ফোটো কালেক্ট করছি, কোলাঝ বানাবো, পোস্টার হবে আর সেটা ছোটো করে বুলেটিনেও যাবে ।
বাসুদেব দাশগুপ্ত আর সুভাষ ঘোষের ফোটো দিয়ে দুটো পৃথক কোলাঝ করেছিলুম । সকলের ফোটো মিলিয়ে একটা কোলাঝ করেছিলুম, যেটা নিরানব্বুই নম্বর বুলেটিনে প্রকাশিত হয়েছিল । তা অবশ্য বেশ পরে । সুভাষ ঘোষ আর শৈলেশ্বর ঘোষ আন্দোলনে যোগ দিয়েছিল ১৯৬৩ সালের শেষ দিকে, ‘এষণা’ পত্রিকায় প্রকাশিত শৈলেশ্বর ঘোষের  ‘তিন বিধবা’ কবিতাটি ইংরেজিতে অনুবাদ করে আমি ১৯৬৩-এর ডিসেম্বরে পাটনায় একটি প্রেসে বুলেটিনে ছাপাই ; তাছাড়া ওর আর মাত্র একটি কবিতা  প্রকাশিত হয়েছিল হাংরি বুলেটিনে  । সুভাষেরও একটামাত্র লেখাই বুলেটিনে বেরিয়েছিল, সেই যে সংখ্যাটা নিয়ে মোকদ্দমা হয়েছিল । বাসুদেবের লেখা ১৯৬২ থেকে বুলেটিনে ছাপা আরম্ভ হয়ে গিয়েছিল ।
বাসুদেবকে বললুম, ঠিকানা তো দেয়াই রইল, পাটনায় চলে এসো, হিপিরা কাঠমাণ্ডু যাবার পথে আমাদের বাড়িটাকে হলটিং স্টেশান করে, একদিন থেকে, পরের দিন পাড়ি মারে । ফেরার সময়ে একদিন থেকে, বেনারস পাড়ি মারে। বেনারসে অনিল করঞ্জাই আর করুণানিধান মুখোপাধ্যায় আছে ।
বাসুদেব আসেনি কখনও ; দাদাও বলেছিল, চাইবাসায় যেতে, যায়নি ।
পরে, দাদা বাঁশদ্রোণীতে পাকাপাকি থাকা আরম্ভ করলে বাসুদেব প্রায়ই দুপুরবেলায় বেহেড মাতাল হয়ে দাদার বাড়িতে এসে চিৎপটাঙ হয়ে খাটে শুয়ে পড়ত । একা । নেশা কেটে গেলে চলে যেত ।
শেষদিকে কি বন্ধুহীন হয়ে গিয়েছিল ? অবনী ধরের মতে হ্যাঁ, একা থাকতে ভালো লাগত এদান্তি ।

পথে বেরিয়ে বাসুদেব বলল, ওরা রিফিউজি ফ্যামিলি, ছয় ভাই এক বোন, তারপর চুপ করে গেল ।
ছয় ভাই, এক বোন, আজকালকার দিনে, শুনে, পরিবারটাকে স্ট্রেঞ্জ মনে হয়েছিল । বৈভবশালী ছিল তাহলে, জমিজমা, প্রতিপত্তি ওপার বাংলায় ।
আমি আবার জানতে চাইলুম, প্রেম করে লাৎ খেয়েছ নাকি ?
আরেকদিন বলব, অত্যন্ত জটিল সম্পর্কে ফেঁসে গেছি । হঠাৎ মুখ নিচু করে বলল, শালা আত্মহত্যা করতে ইচ্ছে করে ।
আত্মহত্যা ? আর ইউ ম্যাড ? আমিও তো প্রথম প্রেমে প্রেমিকার লাৎ খেয়েছি, কিন্তু কখনও হেরে গেছি বলে ভাবিনি, হেরে যাবার বোধ আমার মধ্যে নেই ।
তুমি তো বিহারি খোট্টা, শক্তিদার কাছে তোমার আর তোমার দাদা সমীর রায়চৌধুরীর অনেক গল্প শুনেছি, চাইবাসার, পাটনার, মহুয়া, হাড়িয়া, সোমরস, ঠররা, তাড়ি, গাঁজা, চরস, ভাঙ, আরও কতো কি ! যাকগে পরে শুনবো একদিন । এখন বড্ডো খিদে পেয়েছে । চলো না, কোনো পাইস হোটেলে, ভাত খেয়ে নেয়া যাক । খরচটা তুমিই দেবে ।
এখনকার, মানে ২০০০ সাল পরবর্তী সময়ের ছেলে-মেয়েরা, গাঁজা, চরস, ভাঙ বলতে লজ্জা পায় । গাঁজাকে বলে পাতা বা মারিহুয়ানা । চরসকে বলে হ্যাশ । অথচ ফোঁকেনি এমন ছাত্র-ছাত্রী মিলবে না । তখনকার দিনে এগুলো সরকারি দোকানে বিক্রি হতো, পুরিয়ায় সত্যমেব সিংহের ছাপ মারা ।
শ্যামবাজারের মোড়ের পাইস হোটেলে, যেখানে দাদা কলেজে পড়ার সময়ে খেতুম, মুড়ি ঘন্ট, ডাল, ভাত আর লেবু । আমি বেশি খেতে পারলুম না, তাড়ি আর রাধাবল্লভী তখনও হজম হয়নি ।
কফি হাউসে যাবে নাকি ?
বললুম, নাঃ, পিসেমশায়ের বাড়িতেই যাই, ভাত আর তাড়ির মিশেলে ঘুম পেয়ে যাচ্ছে । তুমি কোথায় যাবে ?
দাদার বাড়ি । বালিগঞ্জে ।
পরের বার কলকাতায় এসে বাসুদেবের মুখেই শুনেছিলুম, ওর দাদার বাড়িতে থাকার সময়েই এক নিকটাত্মীয়ার প্রেমে পড়েছিল বাসুদেব । সেই প্রেমিকা ওর মাসির মেয়ে নয়, যেমনটা বিভিন্ন পত্রিকার গালগল্পে লেখা হয়ে থাকে। সেই মেয়েটি ছিল বাসুদেব দাশগুপ্তের Neice. আমি Niece লিখছি, পরিচয় গোপন রাখার জন্য ।
চুমু পর্যন্ত খায়নি তখনও পর্যন্ত । সব সময় ধরা পড়ে যাবার ভয় । দুজনে একসঙ্গে ইডেন গার্ডেনস, গঙ্গার পাড়, চিড়িয়াখানা ইত্যাদি জায়গায় ঘুরে বেড়ানোর গল্পও সম্পাদকদের বানানো, সম্ভবত বাসুদেবের গেলানো গুলগল্প । আমি ওর প্রেমের ঘটনাটা জানি, কেননা আমার সামনে কেঁদেছিল বাসুদেব । ওর প্রায় প্রতিটি কাহিনীতে দেখা যায় ওর প্রেমিকাকে, একটি  বয়ঃসন্ধিকালীন মেয়ে, ‘রতনপুর’ কাহিনির চুমকি আর রুমকি, ‘বমনরহস্য’-এর হৈমন্তী উল্লেখ্য ।
পরিকল্পনা করেছিল ছাতা আড়াল করে দুজনে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালে গিয়ে একদিন ঘনিষ্ঠ হবে । প্রেমিকার ভীতির জন্য তা সম্ভব হয়নি ।
শেয়ালদার কাছে একটা হোটেলঘর ভাড়া নিয়েছিল একদিনের জন্য । কিন্তু প্রস্তাবেই কাঁপুনি ধরে গিয়েছিল ওর প্রেমিকার, তেড়ে জ্বর এসে গিয়েছিল । তাই ফাঁকা হোটেলঘর ফাঁকাই থেকে গিয়েছিল অন্ধকারে।
ব্যর্থ প্রেমিক বাসুদেব আমার চেয়েও বেশি মদ খাওয়া আরম্ভ করে দিয়েছিল । আমি কলকাতায় গেলে প্রতি সন্ধ্যার ঠেক হয়ে গেল খালাসিটোলা । নয়তো সুভাষ ঘোষের সঙ্গে ; তখনও পর্যন্ত সুভাষের সঙ্গে সাহিত্যিক রেশারেশি আরম্ভ হয়নি ওর । আরম্ভ হল সুভাষের ‘আমার চাবি’ গদ্যটা বেরোবার পর ; যদিও তার কোনো কারণ ছিল না, কেননা দুজনের গদ্যের জনার ছিল সম্পূর্ণ আলাদা ।
মদের প্রভাব বাসুদেবের গালে আর দেহে পড়া আরম্ভ হয়ে গিয়েছিল । ছিপছিপে ভাবটা হারিয়ে ফেলছিল।
সুভাষের চরিত্রে  সমবয়সী গদ্যলেখকদের হিংসে করার গোপন একটা দিক ছিল ।
আমার ‘ডুবজলে যেটুইকু প্রশ্বাস’ পড়ে সৈয়দ মুজতফা সিরাজ একটা চিঠি দিলে, দাদা সেটা ‘হাওয়া৪৯’ পত্রিকায় ছাপিয়েছিল ।
সুভাষের চন্দননগরের বাড়িতে ১৯৯৬ নাগাদ দেখা করতে গেলে, প্রথমেই আক্রমণ করে বসল সিরাজকে । ‘ডুবজলে যেটুকু প্রশ্বাস’ উপন্যাসকে টিটকিরি মারা আরম্ভ করলে টের পেলুম কেন সিরাজ সম্পর্কে অকথা-কুকথা বলছে ।
বাসুদেব আর সুভাষের তাত্বিক ঝগড়াটা ওদের কাহিনি-বিশ্লেষণে নিয়ে যায়নি ওরা, বা পশ্চিমবঙ্গের সমাজব্যবস্হার ক্রম-অবনমন নিয়ে এগোয়নি তর্কটা, যেমনটা আমরা দেখি ওক্তাভিও পাজ আর কার্লোস ফুয়েন্তেসের পারস্পরিক বিতর্কে ; চার্লস ডিকেন্স আর হ্যান্স ক্রিশ্চিয়ান অ্যানডারসনের পারস্পরিক সমালোচনায়, গোর ভিডাল আর নরম্যান মেইলারের, সলমান রুশডি আর জন আপডাইকের, হেনরি জেমস আর এইচ জি ওয়েলসের, জোসেফ কনরাড আর ডি এইচ লরেন্সের, রবের্তো বোলানো আর গ্যাব্রিয়েল মার্কেজের মাঝে । কিংবা পিকাসোর আঁকার স্টাইল নিয়ে মাতিসের ।
বামপন্থার দুটি ভিন্ন পাটাতনে দাঁড়িয়ে দুজনের কাছে কাঙ্খিত ছিল যে বাসুদেব দাশগুপ্তের ‘খেলাধূলা’ উপন্যাস নিয়ে সুভাষ ঘোষ তার বক্তব্য রাখবে আর সুভাষ ঘোষের ‘সাবিত্রীবালা’ কিংবা ‘যুদ্ধে আমার তৃতীয় ফ্রন্ট’ নিয়ে রাখবে বাসুদেব দাশগুপ্ত— পরস্পরের রাজনৈতিক চিন্তার বৈভিন্ন্যের প্রেক্ষিতে ।
আজিজুল হক সম্পর্কে যখন বক্তব্য রাখতে পারে বাসুদেব তখন হাংরি আন্দোলনের দুই গল্প-উপন্যাস লেখক সুভাষ ঘোষ আর সুবিমল বসাক সম্পর্কে লেখা প্রয়োজন মনে করল না কেন ? এমনকি যখন ‘ক্ষুধার্ত’ সম্পাদনা করল, তখনও সুবিমল বসাককে বাদ দিল । আমি এই ব্যাপারটাকে হালকা করে দেখতে চাই না, এই বাদ দেবার প্রক্রিয়াটি ইউরোপ থেকে আমদানি করা আধুনিকতাবাদী বিদ্বেষমূলক চারিত্র্য । এটা তিরিশের দশকের লেখক-কবিরা আরম্ভ করেছিলেন ।
আমার তো মনে হয় বাসুদেবের চরিত্রে গোপন ঈর্ষা কাজ করত, দরবারি প্রতিষ্ঠানের নেকনজর পাওয়া সত্ত্বেও, যা সিপিএম কার্ড হোল্ডার সুভাষ ঘোষ পায়নি, আর প্রতিটি রাজনৈতিকপন্হার সমালোচক সুবিমল বসাক একেবারেই পায়নি । সুবিমল বসাককে শেষে আলোচনার কেন্দ্রে আনার প্রয়াস করলেন নিম্নবর্গ ও দলিত বাঙালি লেখকগোষ্ঠী-সংস্হা ।
বাঙালি লেখকরা এই ব্যাপারটা সম্পূর্ণ এড়িয়ে গিয়ে একটা ভাই-ভাই ক্লাবের মতন সাহিত্যের আলোচনা করেন । শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় ঈশ্বরে বিশ্বাস করেন, মনে করেন মানুষেরা এসেছে ভিন্ন গ্রহ থেকে, অনুকূল ঠাকুরের শিষ্য, অথচ সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কখনও শীর্ষেন্দুর সাহিত্যে এইগুলির প্রভাব নিয়ে ওনার সাহিত্য আলোচনার সময়ে লেখেননি, যখন কিনা সুনীল ছিলেন সম্পূর্ণ আলাদা ভাবনাচিন্তার মানুষ । একই বক্তব্য খাটে শীর্ষেন্দুর ক্ষেত্রেও । এইটেই প্রাতিষ্ঠানিকতার বিষ ।
বাসুদেবের গোরু আর শুয়োরের মাংস খাবার সঙ্কোচ ছিল না । সুভাষ কখনও গোরুর আর শুয়োরের মাংস খেতে চাইত না, বলত আমার ধার্মিক ইনহিবিশান কাজ করে, বমি করে ফেলব । সিপিএম-এর কার্ডহোল্ডারের এই ধার্মিক ইনহিবিশান বেশ কনট্রাডিকটরি মনে হয়েছিল । ব্যক্তি-এককের কনট্রাডিকশান অবশ্য থাকবেই ।

অশোকনগরে উদ্বাস্তুদের জন্য নির্দিষ্ট ফ্ল্যাট পেয়ে প্রেমিকার শহর থেকে দূরে থাকার সুযোগ তৈরি হল বাসুদেবের, এবং মেয়েটিকে ক্রমশ ভুলে যাবার । আমি কেবল দুবার গেছি বাসুদেবের অশোকনগরের বাড়িতে। দ্বিতীয়বার আমায় দেখে বিব্রত বোধ করেছিল বাসুদেব, কেননা তখন হাংরি আন্দোলন মোকদ্দমা পুরোদমে চলছে আমার বিরুদ্ধে । পুলিশের কাছে জমা দেয়া মুচলেকাগুলো হাতে পেয়ে গেছি ।
অশোকনগরের মার্কসবাদে ওই এলাকার জীবন যাপনের প্রভাব ছিল, আর বাসুদেব তাকে আত্তীকরণ করে নিয়েছিল । বস্তুত প্রমোদ দাশগুপ্তের পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রতিটি শহর ও গ্রামকে পার্টি নেটওয়র্কের অন্তর্গত করার প্রয়াস হয়েছিল ; ছোটো শহরগুলোর যুবকদের পক্ষে ওই ফাঁদের বাইরে স্বাধীন চিন্তা প্রকাশ করা তখনকার দিনে অত্যন্ত কঠিন ছিল । মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্বাচনে জেতার প্রধান কারণ ছিল প্রমোদ দাশগুপ্তের দমবন্ধকরা নেটওয়ার্কিঙের প্রভাব, যে নেটওয়র্কিঙের কারণে মুসলমানরা নিজেদের অবহেলিত মনে করেছিল ।
বর্তমানে তৃণমূল দলটি ওই নেটওয়র্কটিকেই রেডিমেড পেয়ে গেছে এবং তা আমরা ছোটো শহরগুলোয় চাক্ষুষ করছি । বাসুদেবের পক্ষে অশোকনগরের জাল আর সুভাষের পক্ষে চন্দননগরের জাল এড়ানো কঠিন ছিল । যে কবি-লেখকরা কলকাতায় থাকেন তাঁরা এই জালটিকে এড়িয়ে নিজস্ব ভাবনাচিন্তা আর রাজনৈতিক লেখালিখি ও সমাজ-বিশ্লেষণ করতে পারেন । মফসসলে ব্যাপারটা তখন বিপজ্জনক ছিল; এখন হয়তো আরও বিপজ্জনক । জানতে ইচ্ছে করে সুভাষ যদি অশোকনগরে থাকত আর বাসুদেব যদি চন্দননগরে, তাহলে ওদের মননজগতটা কেমনধারা হতো ।
সুভাষের চন্দননগরের মার্কসবাদ ছিল পার্টি প্রভাবান্বিত, প্রাতিষ্ঠানিক দরবারি রাজনীতির বামপন্হা ।
পরে বামপন্হী সরকার তখতে বসলে দুজনের মধ্যে বিদেশী তাত্ত্বিকদের মার্কসবাদের ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ নিয়ে তুমূল মনোমালিন্য শুরু হয়েছিল । বাসুদেব একদল শিষ্য যোগাড় করে ফেলেছিল আর সুভাষ ঘোষ আরেকদল । অথচ তা বাসুদেব সম্পাদিত বা সুভাষ ঘোষ সম্পাদিত ‘ক্ষুধার্ত’ পত্রিকায় প্রতিফলিত হয়নি, কখনও হয়নি ।
কমিউনিস্ট পার্টি দুভাগ হয়ে গেলে সুভাষ ঘোষ সিপিএম-এর কার্ড হোল্ডার হয়ে গেল । জ্যোতি বসু মুখ্যমন্ত্রী হলে, সুভাষ ঘোষ নিজের বাড়িতে জ্যোতিবাবুর ফোটো টাঙিয়ে রাখত, সিপিএম-এর ঝাণ্ডা উড়তো দোরগোড়ায় । সিপিএমের মিছিলে যোগ দিয়ে স্লোগান দিত ।
বাসুদেব আকর্ষিত হল উগ্র বামপন্হার দিকে, অ্যাকটিভিস্ট হিসাবে নয়, ভাবুক হিসাবে । ওর অশোকনগরের বাড়িতে জ্যোতি বসুর ফোটো ঝুলতে দেখিনি । বালক-বালিকাদের মাঝে ইনটারন্যাশানাল গাইত । সুভাষ ঘোষ গান গাইতে বিব্রত বোধ করত ।
হাংরি আন্দোলনে করুণানিধান মুখোপাধ্যায়, যে আমাদের পোস্টার ড্রইং ইত্যাদি এঁকে দিত, সে বেশ গলা ছেড়ে গান গাইত, বিশেষ করে হিন্দি । করুণানিধান মুখোপাধ্যায় একবার ফালগুনী রায়ের পোরট্রেট এঁকে খালাসিটোলায় পেছনের দিকে টাঙিয়েছিল, যেখানে তখনকার দিনে শ্রমিক আন্দোলনের পোস্টার মারা হতো । পেইনটিঙটা দুতিন দিন পরেই হাপিশ হয়ে গিয়েছিল ।
বাসুদেব হিন্দি ফিল্ম দেখতে ভালোবাসত আর হিন্দি সিনেমার গানও গাইত গলা ছেড়ে । নায়িকাদের স্তন দেহ ইত্যাদি নিয়ে খোশমেজাজ আলোচনা করত, বিশেষত নার্গিস আর মধুবালার । প্রদীপ চৌধুরী, সুবিমল বসাক, ত্রিদিব মিত্র এদের কখনও গান গাইতে শুনিনি । অনুকূল ঠাকুরের শিষ্য হবার পর সুবো আচার্য হয়তো আশ্রমিকদের নির্দিষ্ট গান গায় ; আমি অবশ্য শুনিনি কখনও ।
আমার মনে হয়, বাসুদেব আর সুভাষের মার্কসবাদ নিয়ে কচকচিটা ছিল আড়াল । ওই আড়ালের পেছনে দুজনে দুজনের গদ্য নিয়ে ঈর্ষার লড়াই লড়ত । নয়তো, মাও জে ডং, চীন, সাংস্কৃতিক বিপ্লব নিয়ে ১৯৭৮ সালের ‘দন্দশূক’ পত্রিকায় বিতর্কের আর তো কোনো কারণ দেখি না ; সে সময়ের পশ্চিম বাংলার সামাজিক-অর্থনৈতিক দুর্দশার প্রেক্ষিতে ওই সমস্ত তত্ব ছিল জ্ঞান ফলাবার অহেতুক বালখিল্য । পশ্চিমবাংলা ক্রমশ যে গাড্ডায় গিয়ে পড়ল,  তার আভাস নেই ওদের তর্কবিতর্কে ।
তখন পশ্চিমবাংলা থেকে কল-কারাখানা পালাতে আরম্ভ করেছে অন্যান্য রাজ্যে, অথচ তার কারণ বিশ্লেষিত হল না বা প্রতিফলিত হল না ওদের লেখায় । তারপর যখন স্কুলে মিডডে মিল খাওয়াবার ব্যবস্হা হল, তখন আড়ালে যে উঁচু জাত-নিচু জাতের বিভাজন দিব্বি বজায় রয়েছে, তাও নজরে পড়ল না ওদের !
একদিকে দুজনে মানবতাবাদী তক্কাতক্কি চালাচ্ছে, আরেক দিকে ‘ক্ষুধার্ত খবর’ আর ‘ক্ষুধার্ত’ পত্রিকা থেকে বাদ দিয়ে দিচ্ছে ত্রিদিব মিত্র, দেবী রায়, করুণানিধান মুখোপাধ্যায়, অনিল করঞ্জাই আর সুবিমল বসাককে । চরিত্রের দৈন্য ছাড়া কী বলব একে ?
আমাকে বাদ দেবার ব্যাপারটা ব্যাখ্যাযোগ্য, কেননা আমার জন্যই বাকি দশ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বেরোয় ; ওদের নতুন চাকরি নিয়ে টানাটানির ভয় ছিল । অবিরাম বাদ দিতে থাকার দরুন ত্রিদিব মিত্রও লেখালিখি ছেড়ে দিয়েছিল । ত্রিদিব ‘উন্মার্গ’ নামে একটা পত্রিকা প্রকাশ করত ; তাতে লেখা দিতে অস্বীকার করল বাসুদেব, সুভাষ, শৈলেশ্বর । বেশ আহত আর অপমানিত বোধ করেছিল ত্রিদিব । পত্রিকাটা তুলে দিতে বাধ্য হয়েছিল ওদের অসহযোগীতায় । বাসুদেবকে আমি যতটা বুঝেছিলুম, মানে সেই সময়, এই রকম আচরণ কাঙ্খিত ছিল না। পরে তো ওরা দেজ থেকে প্রকাশিত সংকলনে শঙ্খ ঘোষকেও হাংরি বলে চালিয়ে দিলে !
সারা ভারত সম্পর্কে ধারণা না থাকার ফলে কুয়োর ব্যাঙ হয়ে কেবল পশ্চিম বাংলার একটি বিশেষ শহরের, চন্দননগর আর অশোকনগর, ভাবনাচিন্তা-নির্ভর বিতর্ক, যাতে পরস্পরের গদ্য বিশ্লেষণ হচ্ছে না, সময়-কাগজ-টাকা নষ্ট ছাড়া আর কিই বা বলা যায় তাকে ।
১৯৭০ সালে বাসুদেবের বিয়ের সময় সুভাষ ঘোষ আর ফালগুনী রায় বিয়ের মণ্ডপে এতো বেশি মাতলামি করছিল যে বাসুদেব ওদের দুজনকে তাড়িয়ে দিতে বাধ্য হয়েছিল । কোনো কথা শুনছিল না সুভাষ । ফালগুনীও সুভাষের পাল্লায় পড়ে অপমানিত হয়েছিল । এই তথ্য অবনী ধরের কাছে পাওয়া ।
ফালগুনীকে অপদস্হ করে অনুতপ্ত বাসুদেব ফালগুনীর কবিতাগুলো নিয়ে ১৯৭৩ সালে প্রকাশ করেছিল এক ফর্মার ‘নষ্ট আত্মার টেলিভিসন’ ।
অবনী ধরের কাছে শুনেছিলুম, শৈলেশ্বর ঘোষের স্ত্রীর পরিবারের  যুবতী  ইন্দিরা কুণ্ডুকে বিয়ে করেছিল বাসুদেব দাশগুপ্ত । ইন্দিরা কুণ্ডুর সঙ্গে বাসুদেবের বন্ধুত্ব শৈলেশ্বর ঘোষের সূত্রেই হয়েছিল ।
সুভাষ ঘোষ আর ফালগুনী রায় গোলমাল করতে পারে অনুমান করে ওদের সম্ভবত নিমন্ত্রণ করা হয়নি ; তাই ওরা বিয়ের মণ্ডপে উদয় হয়ে মাতলামির মাধ্যমে প্রতিবাদ করেছিল ।
আমি, দাদা, সুবিমল বসাক, দেবী রায়, করুণানিধান মুখোপাধ্যায়, অনিল করঞ্জাই,  আর ত্রিদিব মিত্রও বাসুদেব দাশগুপ্তের বিয়ের নিমন্ত্রণ পাইনি । প্রদীপ চৌধুরী আর সুবো আচার্য নিমন্ত্রণ পেয়েছিল কিনা জানি না । অবশ্য সুভাষ ঘোষ আর শৈলেশ্বর ঘোষও ওদের বিয়েতে জানায়নি ; শৈলেশ্বর বিয়ের পর দাদাকে চিঠি লিখে জানিয়েছিল ।
বাসুদেবের প্রথম প্রেমের জটিলতা সম্পর্কে জানতুম বলে, আর মোকদ্দমার দরুন সম্পর্ক বিগড়ে গিয়েছিল বলে  হয়তো বলেনি আমাকে ।

বাসুদেবের প্রথম প্রেমোত্তর বিষণ্ণতা কেটেছিল ডেভিড গারসিয়া নামে একজন বিদেশির হোটেলঘরের স্নানঘরে উলঙ্গ হুল্লোড়ের পর ।  ডেভিড এসেছিল গ্রিস থেকে । আগেই ও আমাকে লিখে জানিয়েছিল যে কলকাতায় আসছে আর কোন হোটেলে উঠবে ।
আমি সবাইকে জানিয়ে দিলুম । তারপর একদিন সবাই মিলে ডেভিডের হোটেলঘরে পৌঁছে চরস ফোঁকার পর যৌথ স্নানের ইচ্ছে হল । ঝটপট পোশাক খুলে ফেলল বাসুদেব, সুবিমল, সুভাষ, শৈলেশ্বর । আমিও।  স্নানঘরটা বেশ বড়ো ছিল ।
পরস্পরকে হোটেলের দামি সাবান মাখিয়ে স্নানের হুল্লোড়ের মাঝে বাসুদেব বলেছিল, যাক, আমার লিঙ্গ সুভাষের চেয়ে ছোটো নয় ।
সুভাষের দেয়া উত্তরটা মনে আছে, ‘আমি এখনও ভার্জিন, বুঝলে, এখনও ফুল খোলেনি ; একবার খুলে যাক, তারপর সবাইকে দেখাবো’ ।
ডেভিড বললে, ও একজন বাঙালি মেয়ের সঙ্গে প্রেম করতে চায় । অথচ কেবল এক সপ্তাহ থাকবে, তারপর যাবে দাদা সমীর রায়চৌধুরীর বাড়ি দুমকায় ।
এতো তাড়াতাড়ি তো আর প্রেমিকা পাওয়া যাবে না । আমরা প্রস্তাব দিলুম, সোনাগাছি যাওয়া যাক ।
অবিনাশ কবিরাজ লেনে পৌঁছোতেই, সন্ধ্যা তখন সবে নামছে, পিম্পরা পেছনে লেগে গেল । একজন সাহেবের সঙ্গে এতোগুলো ভারতীয় দেখে পিম্পগুলোও মন্তব্য আরম্ভ করল আমাদের উদ্দেশ্য করে, সায়েবকে ফতুর করার জন্য আমরা ওকে এপাড়ায় ধরে এনেছি ।
পিপ্মগুলোর টিটকিরি এড়াতে সামনে বাঁদিকে যে তিনতলা বাড়িটা ছিল, তার সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে গেলুম আমরা।  দোতলায় উঠে দশ স্কোয়ার ফুট মতো বারান্দার তিন দিকে একাধিক  দরোজায় দাঁড়িয়ে নানা বয়সের সুন্দরীরা।
মাসি সামনে পানের ডাবর রেখে সুপুরি কাটছিল, পান সাজছিল ।
মাসিকে  বলা হল যে ইনি বিদেশ থেকে এসেছেন, বাঙালি মেয়ের সঙ্গে প্রেম করতে, কম বয়সী হলে ভালো হয়, যাকে প্রেমিকা-প্রেমিকা মনে হবে  । মাসি একটা দরোজার দিকে আঙুল তুলে দেখাতে বছর কুড়ির এক তন্বীকে দেখে পছন্দ হল ডেভিডের । গোলাপি অরগ্যাণ্ডির শাড়ি, কেবল বডিস পরে, খাঁজ দেখা যাচ্ছে, যদিও মেয়েটির খাঁজ তখনও ভালো করে গড়ে ওঠেনি । কম বয়সের বলে অন্যান্য যৌনকর্মীদের মতন কুৎসিত ভাবে সাজতে হয়নি মেয়েটিকে ।
মেয়েটি আমাদের এতজনকে দেখে বলল, সবাইই নাকি, একসঙ্গে একের পর এক পারব না ; পনেরো মিনিট করে হাঁপ ছাড়ার সময় দিতে হবে ।
সুভাষ বোঝালো যে, সবাই নয়, কেবল এই সায়েব, কোনো সায়েবের সঙ্গে ইয়ে করেছ কখনও ?
ডেভিডের দাড়িতে হাত বুলিয়ে মেয়েটি বললে, না গো করিনি, তবে সায়েব বলে দাম কম হবে না, বলে দিচ্ছি ।
বাসুদেব বলল, শুধু সায়েব হলেও আমাদের একটু নষ্টামি করতে দিতে হবে ।
ফষ্টিনষ্টির নামে সবাই যদি এখানে সেখানে হাত দাও আর চুমু খাও, তাহলে দাম ডবল পড়বে কিন্তু ।
আমি বললুম, ঠিক আছে, চলবে ।
মাসিকে ডেকে মেয়েটি জানিয়ে দিল যে সবাই প্রথমে একটু ফস্টিনষ্টি করবে, তারপর সায়েবের সঙ্গে কাজ হবে । মাসি বললে ঠিক আছে, ডবল খরচ লাগবে, সায়েবরা তো বিদেশি টাকাও দেয় ।
আমি বললুম, চলবে । জানি বাদবাকি সকলেই  মহাকিপটে কিংবা চাকরি নেই ।
সেইদিনের জন্য মেয়েটির নাম রাখা হয়েছিল বেবি । ওদের নাম প্রতিদিন বদলায় । মনে আছে । বেবি বলল, মদ আনাও, খেয়ে নিই আগে, মেজাজকে বাগে আনি ।
‘আমিও খেয়ে নিই’ বলে বাসুদেব বেবিকে জড়িয়ে ওর ঠোঁটে চকাচক-চকাচক কয়েকটা চুমু খেল । বাসুদেবের মুখের দিকে তাকিয়ে মনে হল যে নিকটাত্মীয়ের সঙ্গে প্রেমে পড়ার গ্লানি আর কুন্ঠাকে কাটিয়ে বেরিয়ে যেতে পেরেছে ।
বাংলা মদ এলে, সকলে তাতেই ব্যস্ত হয়ে পড়ল ; বেবিকে জড়িয়ে ধরার চেষ্টা করল কেউ-কেউ । ডেভিড বলল, বাংলা মদ অনেকটা ক্যারিবিয়ান হোমমেড রাম-এর মতন স্বাদ ।
ডেভিডকে ঘরে রেখে আমরা বাইরে বারান্দায় এসে দাঁড়ালুম আর এঘর-সেঘর থেকে ডাক শুনতে লাগলুম । চারিদিকে তাকিয়ে বিভিন্ন বাড়ির নারীদের দেখা গেল কে কেমন বিদকুটে সেজে আছে ।
ডেভিড প্রায় আধঘণ্টা পরে বাটারফ্লাই স্ট্রোক সাঁতার কেটে বেরিয়ে এলো । বলল, সাচ এ স্মল কান্ট, অ্যাণ্ড দ্য বুবস আর সো স্মল ইউ ক্যাননট হোল্ড ইন ইওর পাম ; আই লাভড হার, টকড টু হার ইন ইংলিশ অ্যান্ড শি ওয়াজ ভেরি মাচ অ্যাটেনটিভ ।
বুকে আঁচল চাপা দিয়ে বেবি দরোজায় এসে বললে, আরেকজন এসো, ডবল দাম দেবে যখন । দুই ঘোষভাইয়ের মধ্যে একজন ঢুকে গেল তড়িঘড়ি । দশ মিনিটেই বেরিয়ে এলো, হয়তো ব্রেস্টস্ট্রোক সাঁতার দিতে গিয়ে ডুবে যাবার আশঙ্কায় ।
অবিনাশ কবিরাজ লেন থেকে বেরিয়ে আমরা সাঁতার দিলুম হিন্দি ‘জ্ঞানোদয়’ পত্রিকার সম্পাদক-লেখক শরদ দেওড়ার আড্ডায় । কাছাকাছি স্টুডিওয় গিয়ে আমাদের সবায়ের একটা গ্রুপ ফোটো তোলানো হল শরদের ইচ্ছায় ।
ডেভিডকে নিয়ে আমি রওনা দিলুম দুমকা, দাদার আস্তানায়, মহুয়া, হাড়িয়ার জগতে ।

শক্তিদা ১৯৬৪ সালের প্রথম দিকে দলবল নিয়ে সুবিমল বসাককে মারধর করার জন্য কফি হাউসের সামনে ঘিরে ধরেছিলেন । সুবিমলের সঙ্গে হাংরি আন্দোলনের যারা ছিল পালালো সবাই । বাসুদেব দাশগুপ্তও পালালো। সুবিমলের খোট্টা চিৎকারে শক্তিদার দলবলও ছত্রভঙ্গ ।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় আমেরিকা থেকে ফিরেছিলেন । আমেরিকা থেকে শক্তি, সন্দীপন, উৎপল প্রমুখকে হুমকি দিয়ে চিঠি লিখেছিলেন হাংরি আন্দোলন ছেড়ে দেবার । তার প্রতিক্রিয়া আরম্ভ হয়ে গিয়েছিল তাঁর ইয়ারদোস্তদের মাঝে । ওনার চিঠি প্রকাশিত হওয়া আরম্ভ হয়েছে, তা থেকে জানা গেছে যে উনি আশঙ্কা করেছিলেন ‘কৃত্তিবাস’ গোষ্ঠীকে ভেঙে দেবার জন্যই হাংরি আন্দোলন আরম্ভ করা হয়েছে ।
একদিন সন্ধ্যায়, আমিই খরচ করব জানিয়ে,  বাসুদেব দাশগুপ্তকে ওর মুখের কোলাঝটা দেখাবার জন্য নিয়ে গিয়েছিলুম খালাসিটোলায় ।
ওর দুটো মুখের ওপর বসানো জাপানে আণবিক বোমার দরুণ জন্মানো এক বিকৃত শিশুর দেহ, যার মুখ বলতে প্রায় কিছুই নেই ।
কোলাঝের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে হঠাৎ কাঁদতে আরম্ভ করে দিল বাসুদেব ।
বলল, তুমি আমার অবস্হার যথার্থ ব্যাখ্যা করেছ । এই যে আমার কপালের ওপর এক বিকৃত শিশুর লিঙ্গ এসে পড়েছে, এটাই আমার বর্তমান অস্তিত্ব, হয়তো এটাই আমার বেঁচে থাকার ব্যাখ্যা ।
কি বলব বুঝতে পারলুম না । কেন কান্না, তাও জিগ্যেস করতে পারলুম না । ভাঙা প্রেম হয়তো খোঁচা হয়ে লুকিয়ে আছে । ভাবলুম, কাঁদছে, কেঁদে নিক, জমে থাকা কান্না বেরিয়ে যাক । সে সময়ে খালাসিটোলায় অনেককেই কাঁদতে দেখা যেত, তাই ওই পরিবেশে বাসুদেবের আচরণে কোনো ব্যাখ্যাহীনতা ছিল না ।
বাসুদেবের সঙ্গে যেটুকু মিশেছি, ওকে মনে হয়েছে ভিতু প্রকৃতির । একাধিক বন্ধুবান্ধব সঙ্গে থাকলে ওকে সাহসী মনে হতো । একা থাকলে ভালনারেবল ফিল করতো ।
হাংরি আন্দোলনের মুখোশ পাঠানোর ব্যাপারটা ওর পছন্দ হয়নি । সব সময় বলত, কিছু যদি হয়, যদি সরকার স্টেপ নেয়, ইত্যাদি । সুবিমল বসাকের আঁকা ড্রইংগুলো সম্পর্কেও বাসুদেবের ইনহিবিশান ছিল, বলত ওগুলো নোংরা হয়ে যাচ্ছে না কি । বিভিন্ন ট্যাবলয়েডের সংবাদে বা আমাদের কার্টুন কোনো কাগজে বেরোলে বলত, কাজগুলো বোধহয় উচিত হচ্ছে না । আসলে বাসুদেবের ভীতির কারণ যে পবিত্র বল্লভ নামে এক লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদক, যে পুলিশের কফিহাউস-ইনফমফার ছিল, তা আমরা তখন জানতে পারিনি ।
সুভাষকে নিয়ে করা কোলাঝটা সুভাষের পছন্দ হল না । আমরা দুজনে অলিমপিয়ায় । সুভাষ বলল, বাসুদেবের প্রতি তোমার পারশিয়ালিটি রয়েছে, ওই কোলাঝটা আমার হবার কথা, আমি কপালে বিকৃত শিশুর লিঙ্গ নিয়ে জন্মেছি ।
সুভাষের সমস্যা ছিল যে বাসুদেবের ১৯৬২ সালে ‘রন্ধনশালা’, ১৯৬৪ সালে ‘রতনপুর’ প্রকাশিত হয়ে গেছে আর কফিহাউসে আলোচ্য হয়ে উঠেছে ; তখনও পর্যন্ত সুভাষের ‘আমার চাবি’ গদ্যটা বেরোয়নি ।
সুভাষের আরেকটা অভিযোগ ছিল । যখন প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার কার্যক্রম চালাচ্ছে হাংরি আন্দোলনকারীরা তখন বাসুদেব দাশগুপ্ত চুপচাপ নিজের একটি কাহিনি ‘দেশ’ পত্রিকায় জমা দিয়ে এসেছিল । পরবর্তীকালে যখন সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের ‘এখন আমার কোনো অসুখ নেই’ উপন্যাস ওই একই বিগহাউস পত্রিকায় প্রকাশিত হল, তখন প্রথম অভিযোগের আঙুল তুলেছিল বাসুদেব দাশগুপ্ত ।

১৯৬৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসের ২ তারিখে আমাদের এগারোজনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বেরোল, সমীর রায়চৌধুরী, উৎপলকুমার বসু, সুবো আচার্য, প্রদীপ চৌধুরী, রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়, দেবী রায়, সুবিমল বসাক, সুভাষ ঘোষ, শৈলেশ্বর ঘোষ, বাসুদেব দাশগুপ্ত আর আমি, ১২০ ( বি ) আর ২৯২ ধারায়, দাদার জন্য একটা আলাদা ধারা, ২৯৪ যোগ হয়েছিল । কিন্তু সবাইকে গ্রেপ্তার করা হল না ।
আমি, দাদা, দেবী রায়, শৈলেশ্বর ঘোষ আর সুভাষ ঘোষ গ্রেপ্তার হয়েছি শুনে, অনেকেই কলকাতা ছেড়ে যে যার গ্রামে চলে গিয়েছিল । রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় তো ভয়ে সাহিত্যই ছেড়ে দিলে । সুবো আচার্য প্রদীপ চৌধুরী সঙ্গে চলে গিয়েছিল ত্রিপুরায় ।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন