বৃহস্পতিবার

যখন দেবী রায়ের সঙ্গে পথে-পথে হ্যাণ্ডবিল বিলি করতুম : মলয় রায়চৌধুরী

প্রথমেই বলে নিই যে হারাধন ধাড়া অর্থাৎ দেবী রায়ের কবিতা ও জীবন সম্পর্কে এম ফিল করছেন দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজিভাষার একটি ছাত্র। সম্প্রতি  তিনি দেবী রায়ের বাড়িতে গিয়েছিলেন এবং সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন, যেটি একটি আন্তর্জাতিক ওয়েব ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়েছে। দেবী রায়ের কবিতাতেই, বাংলা ভাষায় প্রথম যুক্তিভাঙন দেখা দিয়েছিল, লেভেল জাম্পিং দেখা দিয়েছিল, চিত্রকল্পের ভঙ্গুরতা দেখা গিয়েছিল, ইমেজের ফ্লাক্স দেখা গিয়েছিল, এবং জীবনানন্দের পর তার কবিতায় মুক্ত সমাপ্তি ও মুক্ত সূচনার প্রাধান্য, কবিতার শিরোনাম দিয়ে কবিতা-বিশেষের বিষয়কেন্দ্র চিহ্নিত করেন না তিনি। প্যারিস রিভিউ, পোয়েট্রি, লন্ডন ম্যাগাজিন, লিটহাব ইত্যাদি পত্রিকায় প্রকাশিত ইউরোপীয় কবিতাগুলো পড়লে আমার বক্তব্য স্পষ্ট হবে। সাবজেকটিভিটি-নির্ভর আমাদের বৈদ্যায়তনিক ও সাংবাদিক আলোচকরা এই ব্যাপারগুলো সম্ভবত বুঝতে পারেন না, কেননা বেশিরভাগ আলোচকই পড়ে আছেন মান্ধাতার “ভালো লাগা” দিনকালের ব্যক্তি-প্রাতিস্বিক দুনিয়ায়। সেই কারণেই দেবী রায় সম্পর্কে আগ্রহী হয়েছেন ইংরেজি বিভাগের ছাত্র, বাংলা বিভাগের নয়।

দেশ-ভাগের আগে উচ্চবর্ণের বাঙালি কমিউনিস্ট নেতারা পাকিস্তান সৃষ্টি সমর্থন করেছিলেন।


আরেকটা কথা এখানে শুরুতেই বলে নিই; শৈলেশ্বর ঘোষ আর সুভাষ ঘোষ হাংরি আন্দোলনের বিরুদ্ধে মুচলেকা দিলেও দেবী রায় দেন নি, তিনি দুই ঘোষভাইয়ের মতন হাংরি আন্দোলনের সঙ্গে তার সম্পর্ক অস্বীকার করেন নি। রাজসাক্ষী এবং পুলিশের পক্ষের সাক্ষীদের মতন তিনি আমার বিরুদ্ধে আদালতে সাক্ষ্য দেন নি। আমার পক্ষে তরুণ সান্যাল, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, জ্যোতির্ময় দত্ত ও সত্রাজিৎ দত্তের সাক্ষ্য সত্ত্বেও আমার এক মাসের কারাদণ্ডাদেশ হয়েছিল রাজসাক্ষী ও পুলিশের সাক্ষীদের সাক্ষ্যের কারণে। জজসাহেব আমার পক্ষের সাক্ষীদের পাত্তা দেন নি।
বছরখানেক হলো দেবী রায়ের স্ত্রী মারা গেছেন, এবং সে-কারণে তিনি নিঃসঙ্গ বোধ করেন, ও একা সময় কাটাতে ভালোবাসেন। আমার সঙ্গে তার যোগাযোগ নেই; তিনি আমার সঙ্গে যোগাযোগ রাখা পছন্দ করেন না, যদিও গবেষকরা আমার সঙ্গে যোগাযোগ করলে আমি তাদের পাঠাই দেবী রায়ের বাড়িতে।
হারাধন ধাড়া নামে সমবয়সী এক যুবককে খুঁজে পেয়ে, ১৯৬১ সালে, কী আনন্দ যে হয়েছিল কী বলব; সেসময়ে লক্ষ করেছিলুম যে কবিতা, কৃত্তিবাস, শতভিষা, পরিচয়, উত্তরসূরী, ধ্রুপদি ইত্যাদি পত্রিকায় কোনো নিম্নবর্গের কবির লেখা প্রকাশিত হয় না। আঁচ করেছিলুম যে তারাও কবিতা পাঠান নিশ্চয়ই, কিন্তু সম্পাদক মশায়রা পদবী দেখেই বাদ দিয়ে দেন। তার আগে, ১৯৫৯-৬০ থেকে আমি আর দাদা একটা সাহিত্য-সংস্কৃতির আন্দোলনের কথা ভাবছিলুম; হারাধন ধাড়া নামটা পেয়ে আর যুবকটির সঙ্গে পরিচয় করে আন্দোলনটা ফাইনাল করতে দেরি হলো না। হারাধন ধাড়া বলেছিলেন যে সংসার চালাবার জন্য উনি চায়ের দোকানে হেল্পারের কাজও করেছেন, কাপডিশ ধুয়েছেন, খদ্দেরদের বকুনি সহ্য করেছেন। জীবনের সঙ্গে লড়াই করে তিনি ১৯৫৮ সালে স্কুল ফাইনাল পাশ করেন এবং ১৯৬০ সালে ইন্টারমিডিয়েট অফ আর্টস পাশ করেন। তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ কলকাতা ও আমি প্রকাশিত হয় ১৯৬৫ সালে, হাংরি আন্দোলনের সময়ে।
দেশ-ভাগের আগে উচ্চবর্ণের বাঙালি কমিউনিস্ট নেতারা পাকিস্তান সৃষ্টি সমর্থন করেছিলেন, কিন্তু যেই দেশ-ভাগের তোড়জোড় শুরু হলো, তারাই সবচেয়ে আগে পশ্চিমবাংলায় পালিয়ে এলেন, নিম্নবর্গের বাঙালিদের দিশেহারা করে দিয়ে। যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল, যিনি নিম্নবর্গের ছিলেন, তিনি তক্ষনি পশ্চিমবঙ্গে চলে আসেন নি, কেননা জিন্নাহ তাকে মন্ত্রীত্ব দিয়ে পূর্ব বাংলার নিম্নবর্গের বাঙালিদের নিজের সঙ্গে রাখার প্রয়াস করেছিলেন, ১৯৪৭ থেকে ১৯৫০ পর্যন্ত তিনি করাচিতে ছিলেন। পাকিস্তানে হিন্দুদের প্রতি অবিচার আর অত্যাচার প্রত্যক্ষ করতে হচ্ছিল তাকে এবং শেষ পর্যন্ত ১৯৫০ সালে লিয়াকত আলি খানের হাতে পদত্যাগপত্র ধরিয়ে চিরকালের জন্য ভারতে চলে আসেন। এই উত্তরঔপনিবেশিক পটভূমিতে হাংরি আন্দোলনের সামনের সারিতে একজন নিম্নবর্গের প্রতিনিধি জরুরি ছিল।Debi
যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলের কারণে, উচ্চবর্ণের বাঙালিদের মতন, নিম্নবর্গের বাঙালিরা নতুন পূর্ব পাকিস্তানে থেকে গিয়েছিলেন, যা, আমার মনে হয়, এক বিরাট ব্লান্ডার ছিল। এখন ভারতে জাঠ, মারাঠি, গুজ্জরদের মতো ধনীরাও চাকরি ও শিক্ষায় কোটা চাইছেন। অথচ বহু বাঙালি, নিম্নবর্গের হওয়া সত্ত্বেও তা দাবি করতে পারছেন না, কেননা প্রথমত তাদের সংবিধানের নির্দিষ্ট তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয় নি, দ্বিতীয়ত মণ্ডল কমিশনও তাদের পিছড়াবর্গের অন্তর্ভুক্ত করেন নি। বাংলাদেশ রাষ্ট্র হবার পর সেখানে নিম্নবর্গের হিন্দুরা যেকোনো ছুতোয় আক্রান্ত হন, তাদের মন্দির ভেঙে ফেলা হয়, তাদের প্রতিমা নষ্ট করে দেওয়া হয়।
হারাধন ধাড়াকে চিঠিতে লিখেছিলুম আমার স্কুলের সহপাঠী সুবর্ণ উপাধ্যায়ের পাইকপাড়ার আস্তানায় এসে দেখা করতে; সুবর্ণ তখন মনীন্দ্র কলেজে সবে পড়াতে ঢুকেছে, আর কলকাতায় গিয়ে উত্তরপাড়ার বসতবাড়ির বদলে ওর আস্তানাতেই উঠতুম। পরিচয় হবার পর হারাধন ধাড়াকে নিয়ে গেলুম পাটনায়। সেখানে দাদা আর শক্তি চট্টোপাধ্যায় আগে থেকে মৌতাত জমিয়ে ফেলেছিলেন। তার পরের গল্প সকলেই জানেন যে, হাংরি জেনারেশন নামে আন্দোলন শুরু করার তোড়জোড় আরম্ভ হলো। ১৯৬১ সালের পয়লা নভেম্বর আমি ইংরেজিতে লেখা একটা বুলেটিন পাটনায় ছাপিয়ে নিয়ে গেলুম হারাধন ধাড়ার বাড়ি, রইলুম দিনকতক উনার একঘরের বস্তিবাড়ির বাসায় আর আরম্ভ হলো হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের বুলেটিন বিলি। এখন লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদকদেরও পত্রিকা বিলি করেন, বিলি না করলে বোধহয় তাকে লিটল ম্যাগাজিন বলা যায় না। বুলেটিনে প্রকাশকের ঠিকানা দেওয়া ছিল হারাধন ধাড়ার হাওড়ার বস্তিবাড়ির।
কলকাতায় হারাধন ধাড়া নামের জন্য, যাতে হাংরি আন্দোলনের বিরোধিতাটা অমন একটা স্তর থেকে শুরু করা যায়, কফি হাউসে অনেকেই ওর নামটিকেই আক্রমণ করা আরম্ভ করলেন। হারাধন ধাড়া আমায় জানালেন যে উনি নামটা পালটে ফেলতে বাধ্য হচ্ছেন, আগেই ওই নামের জন্য তার লেখা সম্পাদকরা নিতেন না আর এখন তো হাংরি আন্দোলনকে আক্রমণ করার ওছিলায় তার নামকেই আক্রমণ করা হচ্ছে। হারাধন বাধ্য হয়ে এফিডেভিট করে নিজের নাম দেবী রায় করে নিলেন।
দেবী রায় নাম নেওয়ার দরুন হাংরি মামলার সময়ে আরেকটা সমস্যা দেখা দিয়েছিল। সেই সময়ের ডিটেক্টিভ ডিপার্টমেন্টের ডেপুটি কমিশনার, যিনি আমাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ও অনুসন্ধানের তদারকি করছিলেন, তার নাম ছিল দেবী রায়। তাকে বোঝানো হয়েছিল যে হারাধন ধাড়া ইচ্ছে করে তাকে হাস্যকর প্রমাণ করার জন্য নিজের নাম পাল্টে দেবী রায় করে নিয়েছেন। অথচ আমরা কেউ জানতুমই না যে ডিটেক্টিভ ডিপার্টমেন্টের ডেপুটি কমিশনারের নাম দেবী রায়, যিনি আবার ছিলেন কৃত্তিবাসের কবি তারাপদ রায়ের নিজের মেসোমশায়। তারাপদবাবুও তাকে উল্টোপাল্টা বুঝিয়েছিলেন। তারাপদবাবু যে হাংরি আন্দোলনের বিরুদ্ধে উল্টোপাল্টা কথা বলার দায়িত্ব নিজের আয়ত্তে নিয়েছেন তা ডেবোরা বেকারের দেওয়া সাক্ষাৎকার থেকে জানা যায়। ডেবোরা বেকার, যিনি ইংরেজি ভাষার ভারতীয় ঔপন্যাসিক অমিতাভ ঘোষের স্ত্রী, অ্যালেন গিন্সবার্গের ভারতবাস নিয়ে দ্য ব্লু হ্যান্ড নামে একটি বই লিখেছেন এবং তাতে হাংরি আন্দোলন নিয়ে উল্টোপাল্টা কথা বলেছেন। তিনি কোনো হাংরি আন্দোলনকারীর সঙ্গে দেখা করেন নি, লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরিতে গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করেন নি, তারাপদবাবুর দেওয়া তথ্যের ওপর নির্ভর করে হাংরি আন্দোলন সম্পর্কে উল্টোপাল্টা কথা বলেছেন।

দেবী রায়ের সাহচর্য ছাড়া হাংরি আন্দোলন আরম্ভ করা সম্ভব হতো না।


হারাধন ধাড়া নিম্নবর্গের হবার কারণে তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলুম, এই কথাটা লেখার জন্য দেবী রায় কয়েকটি পত্রিকায় আমার সম্পর্কে উনার রোষ প্রকাশ করেছেন; তাছাড়া ২রা সেপ্টেম্বর ১৯৬৪ থেকে মে ১৯৬৫ পর্যন্ত গ্রেপ্তার হয়ে জামিনে থাকার কারণে সরকারি চাকরি থেকে সাসপেন্ড ছিলেন বলেও তিনি আমার উপর রুষ্ট, বলেছিলেন যে চাকরি চলে গেলে আত্মহত্যা করতে হবে। তবে উনার রোষ প্রকাশ শৈলেশ্বর ঘোষের পর্যায়ের নয়, যিনি সুযোগ পেয়েই আমার চোদ্দপুরুষ উদ্ধার করেছেন, যে কাজটা, শৈলেশ্বর ঘোষের মৃত্যুর পর তার তৈরি করে বাজারে ছেড়ে-যাওয়া চেলারা এখন করে। গ্রেপ্তার হবার পর কলকাতায় উনি জামিনদারও পাচ্ছিলেন না। শেষে তখনকার ‘মহেঞ্জোদারো’ পত্রিকার সম্পাদক সমীর রায় তাকে জামিনে ছাড়ান।
আমি একথা স্বীকার করি যে দেবী রায়ের সাহচর্য ছাড়া হাংরি আন্দোলন আরম্ভ করা সম্ভব হতো না দেবী রায়ের হাওড়ার বস্তিবাড়িতে সেসময়ে সকলেই লেখা জমা দিতে যেতেন, আর বস্তির রূপ দেখে ভিরমি খেতেন। আমার শৈশব কেটেছে পাটনার ইমলিতলা পাড়ায়, তাই বস্তিজীবনের সঙ্গে আমার ভালোই পরিচয় ছিল, কেননা ইমলিতলা ছিল বিহারি অন্ত্যজ আর অত্যন্ত গরিব মুসলমানদের পাড়া। দুর্ভাগ্যবশত, পরে যারা যোগ দিল, তারা দেবী রায়কেই হেনস্থা করা আরম্ভ করল, হাংরি জেনারেশন সংকলনগুলো থেকে দেবী রায়কেই বাদ দিয়ে দিল আর তার বদলে তাতে এমন সকলকে ঢুকিয়ে দিল যে পুরো ইতিহাসটাকেই ঝাপসা করে দেবার ব্যবস্থা করে ফেলা হলো।
দেবী রায়ের যে কতটা গুরুত্ব ছিল তা সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের এই চিঠিটি থেকেই স্পষ্ট হবে, তখনও সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় জানেন না যে হারাধন ধাড়া এফিডেভিট করে দেবী রায় নামে পরিচিত হতে চাইছেন :
মির্জাপুর, ৫ অক্টোবর ১৯৬৩
প্রিয় হারাধনবাবু
হাংরি জেনারেশনের জন্য লেখা পাঠালাম। প্লট, কনটেন্ট, ক্র্যাফ্ট—এসব বিষয়ে ডেফিনিশন চেয়েছেন, আপাতত অন্য কতকগুলো ডেফিনিশন পাঠালাম, ওগুলো পরে লিখব। প্রকাশযোগ্য কিনা দেখুন।
ছাপালে সবকটি একসঙ্গে ছাপাতে হবে—নইলে খাপছাড়া লাগবে। ছাপার ভুল যেন বেশি না থাকে, দরকার পড়লে অনুগ্রহপূর্বক একটা ফ্রেশ কপি করে প্রেসে দেবেন।
‘অমৃত’তে আমার বইয়ের যে বিজ্ঞাপনটা বেরিয়েছিল, দেখেছেন? নইলে পাবলিশারের কাছে গিয়ে তার একটা কাটিং পাঠাবার ব্যবস্থা করেন তো খুশি হই। ওই বিজ্ঞাপনটাই দেশে বেরোবার কথা আছে—যদি বেরোয় তার প্রুফটা কাইন্ডলি দেখে দেবেন। আনন্দবাজারে লেখকদের কোনো বিবৃতি বেরিয়েছিল নাকি? তাহলে তারও একটা কাটিং পাঠাবেন ।
সামনের মাসে বাড়ি পাল্টাব। আরো একমাস থাকব বা ততোধিক। সহজে যাব না। শরীর ভালো। ছোটগল্পে আবার লেখা দিতে পারলাম না, সম্ভব হলে ক্ষমা করবেন।
আগামী সপ্তাহে নতুন ঠিকানা পাঠাব। তার আগে চিঠি দিলে, কুমুদ বাঙলো, রুম নং ৫, টিকোর, চুনার, মির্জাপুর,—এই ঠিকানায় দেবেন। ‘আক্রমন’ বানান কী? ‘ন’ না ‘ণ’?
লেখাটা প্রকাশ হবার আগে আপনি ছাড়া কেউ যেন না দেখে। অনেক বাদ দিয়ে, খুব নরম করে, সবদিক বাঁচিয়ে লিখেছি, ভয় নেই।
হাংরি জেনারেশনের একটা সিম্বল করতে বলেছিলুম, তার কী হলো? ৫ নয়া পয়সা দাম করতে পারেন। কমাগুলো ভেবেচিন্তে দিয়েছি, ওইগুলোই আসল জিনিস যেন থাকে।
শেষের তারিখটা যেখানে আছে, ওখানে প্রকাশের তারিখ দেবেন।
‘অভিযান’ পূরবীতে হয়েছিল তো?
সুনীলবাবুকে (হাজরা) প্রীতি জানাচ্ছি।
ইতি
সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়
দেবী রায় (১৯৬৩)
দেবী রায় (১৯৬৩)
এই চিঠিটিতে হারাধন ধাড়াকে সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় দেবী রায় নামে সম্বোধন করছেন। চিঠিটি বেশ মজার এবং দেবী রায়ের সঙ্গে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে একত্রে সম্বোধন করা হয়েছিল বলে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বেশ ক্রুদ্ধ হয়েছিলেন, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কাছে দেবী রায় তখনও হারাধন ধাড়া। দেবী রায় চিঠিটি হাংরি বুলেটিনে ছাপার বদলে সুবিমল বসাককে দিয়েছিলেন, কেননা সুবিমল বসাক তখন ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ নামে হাংরি আন্দোলনের একটা পত্রিকা প্রেসে দিয়েছিলেন। বস্তুত এটি কেবল চিঠি নয়, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের অসাধারণ সেন্স অফ হিউমারের প্রকাশ। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রকাশিত হতেই, যাদের নাম এতে উল্লেখ করা হয়েছে তারা ধুয়ো তোলেন যে ব্যক্তিগত ছিঠি ছাপিয়ে সাহিত্যিকদের অপমান করা হচ্ছে। অথচ সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় এই লেখাটি একটি নিরীক্ষামূলক রচনা হিশাবে দিয়েছিলেন হাংরি বুলেটিনে প্রকাশ করার জন্য।
প্রিয় দেবী,
পরপর দুসপ্তাহ এলেন না, কোনো চিঠিপত্রও নেই। দোষ একটিমাত্র করেছি। এতদিনের বন্ধুত্বে একটি, আপনাকে লেখা দিই নি। এজন্যে যদি কিছু মনে করে থাকেন, আমার কিছু করার নেই। উৎপল আপনার ওখানে গিয়েছিল? প্রিয় উৎপল অনেকদিন দেখা হয় নি। রয়েড স্ট্রিটে উঠে গেছেন? আমি সুনীলের একটা চিঠি পেয়েছি। আমি খুব ভালো নেই। একদিন যদি চলে আসেন, ভালো হয়—আপনি তো শক্তির মতো ধান্দায় ঘোরেন না। আপনি চলে এলেই পারেন। বিটদের একটা পত্রিকা NOW ডাকে পেয়েছি। প্রেরক C. Phymell একজন কবি। 1537 N, To Peka, Wichita, Kansas, USA. একটা উত্তর দিন। ভাই শক্তি, দেশে কলাম ছাপানো ব্যাপারে তৈরি প্ল্যান কি successful হলো, অন্যান্য planগুলো, শংকর, বরেন, সুভাষ মুখো থেকে শুরু করে নরেশ গুহ স্টিল সুনীল, বুদ্ধদেব, নীরেনবাবু ইত্যাদি মিলিয়ে ও বিধু, রবীন দত্ত, শামসের সমেত ও অধুনা শংকর কী যেন (ছাড়পত্র সম্পাদক) প্লাস শরৎ, ভাস্কর, প্রনব প্রভৃতি নিয়ে যে বিরাট জাল ফেলেছিস, সেটা এবার তোল। আমরা আর কত সময় দাঁড়িয়ে থাকব? তারপরেও অপেক্ষা করতে হবে। আমেরিকাগামী প্লেনে দমদমে সি অফ করতে পারলে তবে আমাদের ছুটি। প্রিয় সুনীল, আপনার চিঠি পেয়েছি। আমার bedroom-এ উঁকি মারছেন কেন? আমার সমূহ বিপদ—এই প্রথম আমার মনে হচ্ছে, আমার দ্বারা বুঝে ওঠা সম্ভব হবে না এখন আমার কী করা উচিত, এখন এই প্রথম আমাকে অপরের উপদেশমত চলতে হবে। প্রিয় দীপেন, তোমার কী হলো? কোথায় থাক? তুমি জেনো আমার সব অপরাধের শাস্তি আমি ভোগ করছি। প্রিয় উৎপল, আপনি ছাড়া কারো সম্পর্কে এখন বন্ধুত্বের বোধ নেই। সুনীলের জন্য আছে, কিন্তু তা বোধহয় সে আমেরিকায় আছে বলে। শ্যামবাজার থেকে টুবি ধরেছি, দোতলা, মাঝেমাঝে বাসস্টপগুলির সুযোগ নিয়ে লিখছি। একদিন আসুন।
—আপনাদের সন্দীপন

শৈলেশ্বর ঘোষ আর সুভাষ ঘোষ মুচলেকা দিয়ে আমার বিরুদ্ধে রাজসাক্ষী হয়েছিল।


প্রতিদ্বন্দ্বীতে এই রচনাটি প্রকাশিত হবার পর কলকাতার আঁতেলরা বেশ খাপ্পা হয়েছিলেন। সেন্স অফ হিউমারের অভাবে, যাদের উল্লেখ চিঠিটিতে করা হয়েছে, তারা মাঝখান থেকে খাপ্পা হয়ে উঠলেন আমার ওপর, কেননা হাংরি বুলেটিন ছাপাবার খরচ আমি বা দাদা দিতুম। প্রতিদ্বন্দ্বী যদিও সুবিমল নিজের মাইনের টাকায় ছাপিয়েছিল। আবু সয়ীদ আইয়ুব তো অ্যালেন গিন্সবার্গকে নালিশ ঠুকে বসলেন, “দ্য হ্যাভ প্রিন্টেড লেটার্স অ্যাবিউজিং ডিস্টিংগুইশড রাইটার্স ইন ফিলদি অ্যান্ড অবসিন ল্যাংগুয়েজ।” লেখাটা প্রকাশিত হবার পর সন্দীপনকে সবাই ঘিরে ধরলে উনি পুরো দোষটা আমার আর দেবী রায়ের ওপর চাপিয়ে দিলেন। কফি হাউসে টেবিলের তলা থেকে তাসের কার্ড বিলির মতন টেবিলের তলা দিয়ে নিয়ে নিজের বিয়ের কার্ড বিলি করলেন, দেবী রায়ও কার্ড পেল, আমাকে দিলেন না তিনি, এতই খাপ্পা হয়ে গিয়েছিলেন আমার ওপর। পরে জেনেছি যে তাকে লালবাজারে ডেকে হাংরি আন্দোলন সম্পর্কে জেরা করা হবেছিল বলে তিনি ঘাবড়িয়ে গিয়েছিলেন আর আমার বিরুদ্ধে স্টেটমেন্ট লিখে দিয়ে এসেছিলেন। হাংরি আন্দোলন মামলায় তিনি আমার বিরুদ্ধে পুলিশের পক্ষে সাক্ষী হয়েছিলেন। শৈলেশ্বর ঘোষ আর সুভাষ ঘোষ মুচলেকা দিয়ে আমার বিরুদ্ধে রাজসাক্ষী হয়েছিল। আমার যে একমাসের কারাদণ্ডের সাজা হয়েছিল তা আমার বিরুদ্ধে যারা সাক্ষ্য দিয়েছিল তাদের কারণে। জজ সাহেব আমার পক্ষের কোনো সাক্ষীর বক্তব্যকে গুরুত্ব দেন নি।
সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় তার চিঠিসাহিত্যটি বিভিন্নজনকে পাঠিয়েছিলেন বিভিন্ন রঙের কালিতে লিখে, প্রত্যেকের জন্য আলাদা কালি। চিঠিটি দেবী রায়কে সম্বোধন করা, কিন্তু আমেরিকা থেকে ১৫ জুন ১৯৬৪ সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়কে লেখা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের প্রতিক্রিয়া থেকে তার ব্রাহ্মণ্যবাদী মানসিকতার ঝলক দেখা যায়, কিয়দংশ তুলে দিচ্ছি এখানে :
“এবার নতুন কী ঘটল বুঝতে পারলুম না। যে ছাপা জিনিসটার কথা লিখেছেন সেটা দেখলে হয়তো বুঝতে পারতুম। এবং এটা খুবই গোলমেলে—যে চিঠি আপনি চারজন বন্ধুকে একসঙ্গে লিখেছেন, যেটা চারজনকে একসঙ্গে পাঠানো যায় না, সেটা হারাধন ধাড়াকে পাঠালেন কী জন্য, বুঝতে পারলুম না। কিংবা আমার বোঝারই বা কী দরকার? আচ্ছা মুশকিল তো, আমাকে ওসব বোঝার জন্য কে মাথার দিব্বি দিয়েছে এই আষাঢ় মাসের সন্ধ্যাবেলা? আমি কলকাতায় ফিরে শান্তভাবে ঘুমাব, আলতো পায়ে ঘুরব—আমার কোনো সাহিত্য আন্দোলনের দরকার নেই।”
ইতোমধ্যে কলকাতায় আমাদের বিরুদ্ধে লালবাজারে অভিযোগ জমা হওয়া আরম্ভ হয়ে গিয়েছিল। কফিহাউসে গুজব ছড়ানো আরম্ভ হয়ে গিয়েছিল। পুলিশের দুজন খোচর, পবিত্র বল্লভ আর সমীর বসু আমাদের যাবতীয় লেখাপত্র, বুলেটিন, পত্রিকা নিয়ে গিয়ে জমা দিচ্ছিল লালবাজারের প্রেস সেকশানে। সে-সময়ের কফি হাউসের আবহাওয়া নিয়ে দেবী রায়ের এই চিঠি :
হাওড়া, সকালে, বাড়িতে
২২ জুন, ১৯৬৪
মলয়,
তুমি-আমি নাকি কলকাতায় অ্যারেস্ট হয়ে গেছি। চতুর্দিকে গুজব। কয়েকজন চেনা-হাফচেনার সঙ্গে দেখা হলে অবাক চোখে তাকাচ্ছে; ভাবখানা এই, ‘কখন ছাড়া পেলে।’ আমার তো এখন একতারা নিয়ে বাউল হয়ে বেরিয়ে পড়তে ইচ্ছে করছে কলকাতায়। সবাই তালে আছে, ‘বাঘে ছুঁইয়ে দেবার’, পর্নোগ্রাফি প্রমাণ করার। সুবিমলকে মেসে কে একজন বলেছে, ‘দেখব কী করে হাংরি বুলেটিন বের হয়।’ সমীর রায়কে টেলিফোন করে ‘আমাদের দাদারা’ বাণী দেওয়ার তালে ছিল, কিন্তু বুঝে গেছে সমীর খচ্চর ছেলে, শালাদের কোঁচা খুলে নেবে। সমীরদার কী খবর? এদিকে পারিজা (পাতিরাম) খচে লাল। আমরা কেন ‘গনদা পরতিকা’ দিয়েছি ইত্যাদি।
শৈলেশ্বর বালুরঘাট থেকে ফিরেছে, দেখা করে নি, চিঠিও দেয় নি—ডাকে পাঠিয়েছি ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’। শৈলেশ্বররা লেখে এক, করে এক, বলে এক, ভাবে আরেক, ছোঃ। ‘এষণা’র ব্যাপারটা জেনে নিও।
চিঠি লিখো। লালমোহন বলছিল, ‘ছোটগল্প’ বেরোবে।
দেবী রায়
হাংরি আন্দোলনে যারা যোগ দিয়েছিলেন, তিরিশজনের বেশি, তাদের অধিকাংশকে, দেবী রায়ই ডেকে এনেছিলেন, এবং কলকাতায় অ্যারেস্ট হবার সম্ভাবনার কথা ছড়িয়ে পড়তেই বেশিরভাগই কেটে পড়েন। ১৯৬৩-এর প্রথম দিকে প্রকাশিত ইংরেজি ম্যানিফেস্টোতে তাদের নাম পাওয়া যাবে। সুভাষ ঘোষ, বাসুদেব দাশগুপ্ত, শৈলেশ্বর ঘোষ এনারা সকলেই দেবী রায়ের সঙ্গে দুর্ব্যবহার আরম্ভ করেন, এবং কেমন করে তাকে হাংরি আন্দোলন থেকে বের করে দেওয়া যায় তার ছক কষতে থাকেন, অথচ দেবী রায়ের আহ্বানেই তারা হাংরি আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। ২রা সেপ্টেম্বর ১৯৬৪ দেওয়া নিজেদের মুচলেকায় তা স্বীকারও করেছিলেন শৈলেশ্বর ঘোষ ও সুভাষ ঘোষ :
শৈলেশ্বর ঘোষের মুচলেকার অংশ:
১৯৬৩ সনে সেপ্টেম্বর মাসের শেষ দিকে একদিন কলেজ স্ট্রিট কফি হাউসে দেবী রায় ওরফে হারাধন ধাড়া নামে একজন তার হাংরি জেনারেশন ম্যাগাজিনের জন্য আমাকে লিখতে বলেন। তারপরেই আমি হাংরি আন্দোলনের লেখকদের সঙ্গে পরিচিত হই।
সুভাষ গোষ :
আমার সঙ্গে একদিন হাংরি আন্দোলনের উদ্ভাবক মলয় রায়চৌধুরীর পরিচয় হয়। সে আমার কাছ থেকে একটা লেখা চায়। হাংরি জেনারেশন বুলেটিনের খবর আমি জানি বটে কিন্তু হাংরি জেনারেশনের যে কী উদ্দেশ্য তা আমি জানি না। আমি তাকে আমার একটা লেখা দিই যা দেবী রায় সম্পাদিত হাংরি জেনারেশন পত্রিকায়প্রকাশিত হয়।
শেষ পর্যন্ত তারা ক্ষুধার্ত, ক্ষুধার্ত খবর ইত্যাদি পত্রিকা থেকে দেবী রায়কে ছাঁটাই করে দিয়েছিলেন। দেবী রায় সেই জন্য নিজে ‘চিহ্ন’ নামে একটা পত্রিকা প্রকাশ করেন। দেবী রায়কে যে কোণঠাসা করার চেষ্টা হচ্ছিল তা তার এই চিঠিদুটো থেকে স্পষ্ট হবে।
হাওড়া, ১০ মে, ১৯৬৬
শোনো মলয়,
কে আমার সঙ্গে কিরকম ব্যবহার করেছিল, ভুলি নি। লালবাজারে টেবিল ঠুকে অনিল ব্যানার্জি বলেছে ‘হেড কোয়ার্টার কোথায়?’ হোঃ হোঃ, শৈলেশ্বর বলেছিল, ‘আজ্ঞে পাটনায়’। তোমার খবর কী? আমার ওল্ড ফুল নামটা ব্যবহার করেছ—যা অতীতের তা যেতে দাও। খালাসিটোলায় সুভাষের কলার চেপে ধরতে বলে ওঠে, ‘প্রণবদা, দেখুন না, এরা কী করছেন আমাকে, একটা পান খাওয়ান না।’ হাঃ হাঃ, আরে সবই জানি। নিজের কবিতার স্বপক্ষে একটা কবিতা লিখছি।
দেবী রায়
বর্ধমান, ১০ জুলাই, ১৯৬৮
প্রিয় মলয়,
কিছুদিন আগে, সুবো আমাকে বলেছিল, আমার কবিতায় ‘সংহতির অভাব সম্ভবত’—পরিষ্কার লিখেছি, ‘প্লাস্টিক জীবন, সবুজ সূর্য’ কবিতার মধ্যে আমার কবিতাও পারম্পর্যহীন, এলোমেলো—অপ্রকৃতিস্থ। তোমার ‘কামড়’ এ-যাবৎ যত কবিতা আমি পড়েছি, তোমারই লেখা—ব্যক্তিগতভাবে আমার মনে হয় সবচেয়ে ম্যাচিওর।
ফুলস্কেপের প্রায় আরো দিনকয় আগে আমি কৃষ্ণগোপালবাবুকে পোস্ট করলাম। ওতে লিখেছি আমাকে কী ঘোড়েল এবং বাবু বলে মনে হয়, এবং আরো যত খবরাখবর, যথা ত্রিদিব মদ্যপান করতে অস্বীকার করলে সুভাষ-শৈলেশ্বর ওরা ওর হাংরিত্ব নিয়ে হাসাহাসি করে—এটা আমিও লক্ষ করেছি। ত্রিদিবের তো জবাব দেওয়ার একটা কারেজ থাকা দরকার। ঐ মুহূর্তে গালগলা ফুলিয়ে বসে থাকলে কি হবে? কী জানি, আমি ওর অমঙ্গল কামনা করি না, বিশ্বাস করো। আগেকার চেয়ে আজ আমি অনেক বেশি জটিলতামুক্ত—complex বিহীন, কিন্তু ওকে লিখে প্রমাণ করতে বলো যে সে বেঁচে আছে, এ যাবৎ তার কোনো লেখা—তার দৃঢ় চরিত্রের ছাপ বহন করেছে কি? যে লিখতে পারবে তার পলিটিক্স না করলেও চলবে—আর এটাও খুবই সত্যি যে তুমি নিজেও কিছু-কিছু ভুল ও বোকামো করেছ। যার ফল তোমাকেই ভোগ করতে হবে, এবং এটাই তোমার নিয়তি, সিরিয়াসলি লিখে যাও, try to forget the past, যার যার দল তৈরি করার—তারা তা করার চেষ্টায় সময় খরচ করুক। আমি কারোর সম্পর্কেই আর মোহগ্রস্ত নই। যদি কেউ সিরিয়াসলি লেখে, হাজার শত্রু হলেও, আমি তার কথা পরবর্তী প্রবন্ধে লিখে যাব, এবং তার ব্যক্তিচরিত্রের কিছু খবরাখবর—এরা লেখে এরকম—এদের জীবনযাত্রা পদ্ধতি এরকম—এরা কথাবার্তা বলে আরেকরকম। শৈলেরশ্বর ৩২ পৃষ্ঠায় লিখেছে, ‘নিজের ভাইকে পর্যন্ত ভাই বলে স্বীকার করি না’, ২৬/২৭ পৃষ্ঠায় দেখো, ‘আমার ভাই খুব অসুস্থ; তোমার শুশ্রূষার জন্য আমি তোমাকে বুকের কাছে টেনে নিয়ে ১০ পয়সার চা…’ কোনটা ট্রুথ? জোর করে কোনো কিছু বানিয়ে তুললে—ফাঁপিয়ে তুললে, তা টেকে না কোনোদিনই।

বন্ধুদের (?) ব্যবহারে আমি এতদূর মর্মাহত ছিলাম যে বিয়ে করার একটা প্রয়োজন অনুভব করেছিলাম।


নিশ্চয়ই কোনো-কোনো লাইন শৈলেশ্বর মারাত্মক লিখেছে, যার যতটুকু প্রাপ্য সেটুকু সে পাবেই। আমিও দেবো। ১নং ফৌজ ম্যানেজার শক্তির পতন, ২নং মলয়, পতনের জবাবও আমি দেবো। এসব খেয়োখেয়ির মূল কারণ কি আনন্দবাজারের চাকরি আর পজিশন? আমি কোনো কিছুই ভুলি নি। ভুলে যাওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। কে আমার সঙ্গে কিরকম ব্যবহার করেছিল, করে যাচ্ছে, কী নিদারুণ mental depression-এর মধ্যে দিয়ে আমার দিন কেটেছে, আমি জানি, মাত্র দশ পয়সা নিয়ে কলেজ স্ট্রিট যাওয়া, খালি পেটে কফির পেয়ালার দিকে তাকিয়ে থাকা, দুনিয়ার লোকের কাছে টাকা ধার করা, বন্ধুদের খাওয়ার সময়ে হুট করে হাজির হওয়া—এসব আমি ভুলি নি। চাকরি চলে গেলে হয়তো আমায় সুইসাইড করতে হবে। বন্ধুদের (?) ব্যবহারে আমি এতদূর মর্মাহত ছিলাম যে বিয়ে করার একটা প্রয়োজন অনুভব করেছিলাম। সমস্ত ব্যাপারটাই ভুলে যেতে চেয়েছিলাম কিন্তু ভুলে যেতে পারি নি। আরো সহজ করে নেওয়ার জন্য আমাকে পার্টটাইম চাকরি করতে হয় এখনও। লেখাটাই আমার কাছে মূল পয়েন্ট।
আমি ঈশ্বর বা ট্রুথে যেমন বিশ্বাস করি, ঐ একই কারণে, সাহিত্যেও আমার বিশ্বাস—বিবাহেও অবিশ্বাস করি না।
সুভাষ-শৈলেশ্বর গরুর মাংস খায় না, অথচ ত্রিদিব মদ খেতে অস্বীকার করলে ওরা ওর হাংরিত্ব নিয়ে চ্যালেঞ্জ করে—যদিই সুবো শ্রীশ্রীঅনুকুলচন্দ্র চক্রবর্তীর কাছে দীক্ষা নেয় এবং ধ্যানের মারফত তার জীবনের গণ্ডগোল সারিয়ে তুলতে চায় বা ভুলে যেতে, কারোরই কোনো অধিকার নেই এসব নিয়ে ইনসাল্ট করার।
এ-সব নিয়ে আরো বিস্তারিত ২নং কিস্তিতে লিখছি। তোমার কিছু খবরাখবর পাঠাতে পারো, এবং আমার সম্পর্কিত চিঠিগুলো—কলকাতার।
একজন আধুনিক আমাদেরই বয়সী যে কী করে লেখে ‘তোমার সতীচ্ছদের জন্য আক্ষেপ নেই আমার’, আমি ভাবতেও পারি না। ২৬/২৮ বছর বয়সী কোনো যুবকের লেখা এ-কথা ভাবতেই আমার কুৎসিত লাগে।
—দেবী রায়
খালসিটোলায় কমলকুমার মজুমদার একবার দেবী রায়কে বলেছিলেন, ‘বাছা, ডিপ্লোম্যাট হও’। দেবী রায় কমলবাবুর উপদেশ মনে রেখে এই কবিতাটা লিখেছিলেন :
আগুনের কবিতা
ভিতরের আগুন আমাকে শান্ত হতে দেয় না
বাহিরের সব ওলোটপালোট ঘেয়ো অশান্তি
আগুনকে আরও উসকে দেয়!
—কেই বা পছন্দ করে উলঙ্গ জীবন?
…………”বাছা, ডিপ্লোম্যাট হও”

মলয় রায়চৌধুরী

জন্ম ২৯ অক্টোবর, ১৯৩৯। বিশিষ্ট বাঙালি কবি, ঔপন্যাসিক, গল্পকার, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক, সাংবাদিক।

মলয় রায়চৌধুরীর ১০টি কাব্যগ্রন্থ, ৪টি উপন্যাস, ১০টি সমালোচনা গ্রন্থ এবং কয়েকটি অনুবাদ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। উল্লেখযোগ্য রচনার মধ্যে ‘শয়তানের মুখ’, ‘জখম’, ‘ডুব জলে যেটুকু প্রশ্বাস’, ‘নামগন্ধ চিৎকার সমগ্র’, ‘কৌণপের লুচিমাংস’, ‘অ্যালেন গিন্সবার্গের ক্যাডিশ ও হাউল গ্রন্থের অনুবাদ’ প্রভৃতি অন্যতম।

শিক্ষা : পাটনার সেইন্ট জোসেফ কনভেন্টে প্রাথমিক এবং রামমোহন রায় সেমিনারিতে ম্যাট্রিকুলেশানের পর অর্থনীতিতে সাম্মানিক স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন।

মলয় রায়চৌধুরী ২০০৩ সালে অনুবাদ সাহিত্যে, সাহিত্য অাকাদেমি পুরস্কার এবং পরবর্তীকালে বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিন পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেন।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন