সোমবার

মলয় রায়চৌধুরীর 'নখদন্ত' : শর্মিষ্ঠা ঘোষ

 

মলয় রায়চৌধুরীর ‘নখদন্ত’ – ডকুমেন্ট অব এ ট্র্যাজেডি টু বি কন্টিনিউড : শর্মিষ্ঠা ঘোষ

31317761_108679213330944_3726457460169375744_n

টাইপ এ : লেখক কাহিনী বুনবেন মনগড়া কিংবা তাও ঠিক নয় , কতগুলো জেনারেল হ্যাপেনিংস বা প্রোবাবিলিটির ওপর । চারপাশের বস্তু ও প্রাণীজগৎ কে ঘিরে ।

 টাইপ বি : লেখক ডিটো ভাষ্য দেবেন সাংবাদিকের নির্লিপ্ততায় যা ঘটেছে ও ঘটছে চেনাজানা চৌহদ্দিতে ।

 টাইপ সি : লেখক সত্যতথ্য ভিত্তিক ও গবেষণালব্ধ ফ্যাক্ট ফাইন্ডিংসকে বীভৎস বা করুণ রসে জারিত করে নাটকীয় ভাবে পরিবেশন করবেন ।

 টাইপ ডি : এইসব উপরিউক্ত বৈশিষ্ট্যের সম্মেলনে লেখক কথাকারের ভণিতা সহ পেশ করবেন । কতগুলি তথ্যের আগে পিছের কার্যকারণ তুলে ধরবেন । সামাজিক অর্থনৈতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং নিজস্ব ধ্যান ধারণা বিশ্বাস পছন্দ অপছন্দের আলোতে বিশ্লেষিত একটি বিশ্বাসযোগ্য উপস্হাপনা সেটি ।

 মলয় রায়চৌধুরীর সম্পর্কে কিছুই না জেনে পড়তে বসেও মামুলি পাঠক চতুর্থ শ্রেণীভুক্ত করবেন তাঁকে ।

“নখদন্ত” শুরু ও শেষ হয় ডায়েরির মেজাজে , তার সাথে জুড়ে যায় কথকের নিজস্ব লেখন জগৎ , পর্যালোচনা , কাহিনী প্রসঙ্গে উঠে আসে রাজ্য রাজনীতি , অর্থনীতি , সমস্যা , অন্যায় , বঞ্চনা , শ্রমিক শ্রেণী বিশেষত পাট শিল্পের সমস্যা জনিত ঘটনাবলী । সত্য ঘটনা নির্ভর এক নিটোল গল্প যা একইসাথে একজন গবেষকের কাছেও যথেষ্ট আদরণীয় হতে পারে দ্বিবিধ কারণে । প্রতিষ্ঠান বিরোধীতার সাবটেক্সট , পোস্টমডার্নিজম ইত্যাদি নিয়ে আগ্রহীরা আবার পাশাপাশি একটি উচ্চমানের গবেষণালব্ধ তথ্যাবলী সমৃদ্ধ লেখা হিসেবে ।

 সাধারণ ফিকশান ক্যাটেগরিতে ফেলতে গিয়ে এ লেখা এ কারণেই বাঁধে । আবার পাঠক ‘মামুলি’ এই কথা পলিটিক্যালি কারেক্টনেসের উর্দ্ধে উঠে বলা , কারণ জ্ঞানত এক শ্রেণীর পাঠক বিদ্যমান যারা বিস্তর তত্ত্বকথা ঠোঁটস্হ করে একটি টেক্সটের কলকব্জা ঢিলে করে অমুকবাদ তমুকবাদ কপচান । লেখক যখন ছকভাঙা কিছু দিয়ে জোর ধাক্কা মারতে চাইছেন তিনি এমন জ্ঞানপাপী পাঠককেই অধিক সমাদর করে থাকেন , তাতে মামুলি পাঠকের পাঠ প্রতিক্রিয়ার বিস্ময়বোধে বা ইস্থেটিক প্লেজারে কোন ঘাটতি পড়ে না । আর্টস ফর আর্টস সেক কথাটি তারা সিংহাসনে বসান বেশ নমো করেই । নৈকট্য না থাকুক , স্বীকৃতির অভাব তাদের শত্তুরেও খুঁজে পাবে না ।

 তো , আমি এহেন গোলা পাঠক মলয় রায়চৌধুরী পাঠ করেছি আমার মত করেই , ডিকনস্ট্রাকশন করেছি আমার সাধ্য অনুযায়ী , ইউনিটি অব টাইম প্লেস অ্যাকশান মান্য করল কি করল না ভাবা বাদ দিয়ে বা ফার্স্ট পার্সন ন্যারেটিভের একটি বিপজ্জনক প্রবণতা , নিজ মতবাদের প্রতিফলন কাহিনী থ্রেডকে প্রভাবিত করতে পারে এই আশঙ্কা সাময়িক ভাবে সরিয়ে রেখে । রোমান এ ক্লেফ না বিলডানসরোমান তর্কাতর্কির পরেও যে সংবেদনশীলতা ভিখারি পাসওয়ান কেসের আগে পরে একটি তৃতীয় নয়নের উপস্হিতি মহাকালের দৃষ্টি না এড়ানো নেমেসিস হয়ে আসে তা অস্বীকার করা যায় না ।

 পাট শিল্পাঞ্চলের এ টু জেড গুলে খেয়ে কঠোর পরিশ্রমের তথ্যকে শিল্পসম্মত উপস্হাপনের তোয়াক্কা না করেই জিরো নম্বর হয়ে যাওয়া মানুষগুলোর জন্য নরম একটা দুঃখবোধ মধ্যবিত্ত বাবুপাঠকের গালে বেশ ঠাস ঠাস করেই লাগে । জ্ঞানচক্ষু উন্মীলনের পাশাপাশি সুখি সুখি খাঁচার তোতার জীবন থেকে একেবারে আছড়ে পড়ে শব্দবানে । কোন রেয়াত নেই বিদগ্ধ জননেতাদের । কোন ছাড় নেই ডান বাম মধ্যবর্তী মতবাদের ধ্বজাধারীদের । কারণ পাটশিল্পের অবনমনের জন্য পাটকল ও উৎপাদক অঞ্চলের অবস্হানগত বিপ্রতীপ যতখানি দায়ী কোন অংশে কম দায়ী নয় রাষ্ট্রযন্ত্রের ক্যালাসনেস ও তাদের ডানহাত বাঁহাত মুষ্টিমেয় চালিকাশক্তি বনিক সম্প্রদায় । ক্রমাগত হাতবদল হওয়া মালিকানা , লিজ , পি এফ , গ্রাচুইটি মেরে পালিয়ে যাওয়া মালিক , কাঁচামালের নয়ছয় , কমিশন লোভী মধ্যস্বত্বভোগী , পচাগলা ট্রেড ইউনিয়ন লিডারশিপ , ঘুষের চক্করে ইমান বেচার দল , শুধু পাট কেন চোখ বুলালে চা শিল্পেও একইপ্রকারে বর্তমান ।

 দু একটি ফেনোমেনা বাদ দলে উত্তরবঙ্গের বাসিন্দাদের কাছে এ ছবি চেনাই লাগবে । সময়টা আগে পিছে যেদিকেই গড়াক , শাসনে নীল লাল যে অবতারই থাকুক না কেন , বনাঞ্চলের অধিকার নিয়ে লড়াই করা লীলা গুরুং , ন্যায্য মজুরীর দাবীতে উত্তরকন্যা অভিযানে যাওয়া চা শ্রমিক , রেশন , পি এফ , গ্রাচুইটি হজম করে ফেলা বাবুলোগ , শাসকের ভয়ে টেবিলের নীচে লুকোন পুলিশ কোন জাপানী তেলে শ্রমিকদের শান্তিপুর্ণ আন্দোলনে ক্ষ্যাপা কুত্তা হয়ে ওঠে আজ ভৌগোলিক প্রেক্ষাপটের পরিবর্তনে বা সময়ের ব্যবধানে মলয় রায়চৌধুরী এবং একটি গোলা পাবলিকের অনুভবকে একই বিন্দুতে দাঁড় করায় ।

 কিন্তু দিন শেষে তিনি মলয় রায়চৌধুরী । তাঁর প্রকাশ, তাঁর চলন, তাঁর ধার-ভার-নীরীক্ষা আলোচনাযোগ্য হয়ে ওঠে যথাযোগ্য কারণেই । ঘটনাচক্রে কাহিনীর সময় থেকে আজ পর্যন্ত অনেক জল গড়িয়ে গেছে , পাঠক দেখে ফেলেছে একের পর এক লোকোমোটিভ কারখানা , কার ফ্যাক্টরিস, ছোট বড় কাপড়ের কল , কাগজ কল , ইস্পাতের যন্ত্রাংশ , রং , নানাবিধ ফুড প্রোডাক্ট তৈরীর কারখানা লালবাতি জ্বেলেছে , গনেশ উল্টেছে এবং লক্ষ লক্ষ শ্রমিক ক্ষেত মজুর , জনমুনিষ , কুলি , ভিখিরি , চোর , ডাকাত , দেহোপজীবী , ফেরিওয়ালায় পরিণত হয়েছে , নিজ রাজ্য ছেড়ে পাড়ি জমিয়েছে দিল্লি , মুম্বাই , কেরল , অন্ধ্রপ্রদেশ এমনকি একটি দীর্ঘকালীন রাজত্ব করার কারণে ঘুণ ধরে যাওয়া শাসনব্যবস্হার শেষে নব্যজমানা শুরু হয়ে প্রায় এক দশক হতে চলেছে তখনও বিহার থেকে আগত , ঝাড়খন্ড থেকে আগত একসময়ের কাজহারানো পাটকল শ্রমিকদের কিস্যা অনেকটাই গা সওয়া লাগে । থার্ড ফোর্থ ফিফত ডিগ্রী পুলিশি টর্চারের সামনে আজ যখন আন্দোলনরত শিক্ষিত বেকারও অহরহ পড়ে সেই বিস্ময় সেই নৃশংসতা জনিত শিহরণ অনেকটাই প্রশমিত হয়ে যায় ।

 তবু টাইম ডকুমেন্টেড এ লেখা তার নিজস্ব গুরুত্ব বজায় রাখবে ঐতিহাসিক কারণেও বটে । “ইতি শ্রী শ্রী পশ্চিমবঙ্গের সাতকাহন শেষ হইল ” , না , আসলে শেষ হয় নি , কারণ একটা পিরিয়ড মাত্র শেষ হল , তাও আংশিক কারণ গোটাটাই অন্ধকারের চলাফেরা হতাশা আর ক্রোধজনিত মনোলগ , যা হারানো ডায়েরির পাতায় ফিরে আসে । শেষ হয় না , কারণ লেখক বর্তমান , শেষ হয় নি তাঁর দেখা শোনা । শেষ হয় নি পশ্চিমবঙ্গীয় কিস্যা ।

 পালা বদল হয়েছে মাত্র , বদলায় নি কিছুই । যে ভাষ্যের কোন চরিত্র বলে , ” খ্যাংরা কাঠির ওপর আলুর দম মার্কা এক নেতার জন্যেই পশ্চিমবঙ্গে তিরিশ বছর কম্পিউটার ঢুকতে পারেনি । তাই আজ মাথায় করে টাইপরাইটার বয়ে পরীক্ষাকেন্দ্রে যেতে হচ্ছে , ” সে আসলে থেমে গেছে সেই নেতার জমানা শেষ হবার বহু আগেই । নোট আছে ডায়েরির পাতায় পাতায় যেমন থাকে । যেন মুখবন্ধ । কী কেন তার কৈফিয়ত । ” 1.ইনভেন্ট আইডিওলজি টু সাপোর্ট অ্যাকশান । 2. ব্লেমিং আদার্স অর ইভেন্টস নট রিলেটেড টু ইউ ফর ইয়োর মিজারি ইজ এ ফয়েল অব ইয়োর উইথড্রল ফ্রম দি ওয়ার্লড । … 4. কালচার ডাজ নট সিম্পলি রেসপন্ড টু পাওয়ার , ইট শেপস দি মরাল ওয়ার্লড ইন হুইচ পাওয়ার ইজ এক্সারসাইজড অ্যান্ড এনকাইনটার্ড । 5. সিডাকটিভ ডিগ্রেডেশান অব নলেজ । রিভাইভ ইয়োর প্রিডিলেকশানস । 6. অল পলিট্কাল অ্যাকশান গেটস সেল্ফ কনট্যামিনেটেড ।” যেন কোন বর্ণনার প্রেক্ষিত ও বর্ণনাকারীর নিউট্রালিটিটা ঘোষণা করা বেশ জরুরী । ”

 1দি পাস্ট শুড বি অলটার্ড বাই দি প্রেজেন্ট অ্যাজ মাচ অ্যাজ দি প্রেজেন্ট ইজ ডায়রেক্টেড বাই দি পাস্ট । 2. মেমরি অবস্কিয়র্স ট্রুথ ।” যেখানে তিনি লিখছেন দেয়াল লিখনের কথা , ভুল হাতে পড়ে একটা স্বপ্নের অপমৃত্যুর পর নির্মম রসিকতা ,” কমরেড তুমি আর গাঁড় মারবে না ? এখনও অনেক …ইয়ে …রয়েছে বাকি ।” হয়তো তখন ভাবা যায় নি দুহাজার আঠেরোর পশ্চিমবঙ্গে আরো অনেক নতুন নতুন শিল্পে লালবাতি জ্বলবে , কম্পিউটার আর ই জমানার মানুষও সমানভাবে খিস্তি করবে নতুন কোন লিডারকে , সমান প্রযোজ্য হবে , “

 মিলের শপফ্লোরে জঙ্গল , দেয়ালে দেয়ালে কত সে অশথ গাছ । রাত্তিরে তোলাবাজ আর মস্তানদের অঙ্গনওয়াড়ি । আলোর বালাই নেই । লাখ লাখ ট্যাকার বিদ্যুৎ বিল বাকি । লাইন কাইট্টা দিসে । বাইরে দেয়ালে আর স্লোগান নাই । ঘুঁটের পর ঘুঁটের পর ঘুঁটে , তারপর ঘুঁটে , আবার ঘুঁটে । আমাগো ন্যাতা সাইনবোর্ড লয়্যা অননো মিলে গ্যাসেন গিয়া … কবে যে মিলের জমিডা বিক্রয় হইব ।” কোথাও কি বদলেছে বিরোধী বা প্রতিবাদীদের ওপর শাসকদলের উস্কানিতে পুলিশি নির্যাতনের ইতিবৃত্ত ? এখনো কি হরহামেশা এসবের পর কর্তাদের নেতাদের বলতে শোনেন না ” ওই ঘটনার কতা আমার জানা নেই । তবে খোঁজ নিচ্ছি ” ? নির্বাচন চলাকালীন পোলিং অফিসার কে তুলে নিয়ে গিয়ে খুন করে রেল লাইনে ফেলে দিয়ে আত্মহত্যা বলে চালাতে দেখেন নি সম্প্রতি ? সেন্ট পলস এর ফেস্টে হাজার হাজার টাকা তোলা তুলছে না ইউনিয়ন ? অধ্যাপক , শিক্ষকদের গান পয়েন্টে হেনস্হা ঘটছে না প্রায় রোজ ? ঘটছে । কারণ রাজ্যটার নাম যাই হোক না কেন , কোন জায়গাতেই ফর দ্য পিপল , অব দ্য পিপল , বাই দ্য পিপল কোন ব্যাপার নেই , সংবিধানে সে যাই দাবী করা হোক না কেন ।

 তাই মলয় রায়চৌধুরীর রাগ ক্ষোভ ব্যঙ্গ যতই পার্টিকুলার আইডিয়ালস বা লাইন অব পলিটিক্সকে আক্রমণ করুক না কেন , কোন আইডিয়াল রিপাবলিক বা ইউটোপিয়া খুব রিজনেবল চাওয়াও নয় । তাই পিরিয়ড পিস হিসেবেই বা শুধু বলি কেন এই টেক্সটকে , মাৎস্যন্যায়ের সর্বলক্ষণ বুকে করে চলা এক মায়া সভ্যতা সে নিজেকে টেনে নিয়েই চলে , ক্ষইতে ক্ষইতে , না ফুরোতে ফুরোতে , কাংগাল চামার বা সত্য আচার্যরা আজও নাম বদলে ধাম বদলে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে চলেছেন । আঠেরোটা ইউনিয়ান সেদিন যে সর্বনাশ করেছে আজ একটিমাত্রই কাফি । চাকরির পরীক্ষা দিতে জড়ো হওয়া টাইপরাইটার মাথার বেকারদের মহামিছিল শুধু বদলে গেছে কম্পিউটার জানা বেকারদের আত্মহত্যায় , ঘুষ দিতে না পারার আর লিডার ধরতে না পারার ব্যর্থতায় । হাসপাতালের ঘোষণা করা মরা বাচ্চা আজও দাফন করতে গেলে নড়ে ওঠে , মানুষের হাসপাতালে কুত্তার ডায়ালিসিস হয় , কোটি কোটি টাকার ওষুধ নয়ছয় হয় , পোড়াতে হাসপাতালের পর হাসপাতালে আগুন ধরানো হয়,  আজও জঙ্গমহল হাসছে বিজ্ঞাপনের পেছনে, না খেতে পেয়ে শবররা মরে যায় , নতুন নতুন কলকারখানা বন্ধ হয় রোজ আর সেসব সারানোর গুণিনরা বিষধর । ” তারা যত বিষ ঝাড়েন তত বিষ বাড়ে । কত – কত বক্তৃতা আর ভাষণ ঝাড়েন সেসব গুণিনরা , গম্ভীর মুখে , নাক ফুলিয়ে , যন্তরের মতন বকরের পর বকরের পর বকর ।”

 কই কিছুই তো একচুল বদলায় নি , সাদা ধুতি গিয়ে সাদা শাড়ি এসেছে , সর্বহারার নেতার বদলে হাওয়াই চটির নেত্রী এসেছে , পশ্চিমবঙ্গের ‘বাংলা’ নাম না রেখে “রসাতল” রাখার দাবীটি মোটেও বদলায়নি । সব ‘নখদন্ত’ নিয়ে বিদ্যমান । মলয় রায়চৌধুরী যদি প্রতিষ্ঠান বিরোধীতার ঐতিহ্য এখনো বর্তমান রেখে থাকেন আমরা নিশ্চয়ই এর একটি সিকুয়েল আশা করতে পারি !


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন