" প্রতিষ্ঠান বিরোধিতায় তোমার ভূমিকা কী ? তুমি কি গাছেরও খাও, তলারও ?
শোষণ ও জোযা়ল সম্পর্কে তোমার ধারণা কেমন ? তোমার ইগো ক'হাত লম্বা - কেবল
আমাকে দ্যাখো - ব্যাপারটা কেমন বোঝো তুমি ? তোমার ও তোমার বাবার বিছানার
মধ্যে কতটা ফারাক ? বাবার সঙ্গে any joint account ? কীরকম এটি, তোমার বয়স
বাডা়র সঙ্গে, বড় বাজার - তুমি কি লেখার ভেতর লেখক খোঁজো ? পাঠক লেখা
নিচ্ছে না - তাহলে কি লেখা ভাঙব ? ভাষা ভাঙব, ছাঁচ ভাঙব, নিজেকে ভাঙব,
না পাঠকের হোল চুলকোবো ? কেমন ওই বৌদির বাপের বাড়ি ? " - সুভাষ ঘোষ
"আমাদের কেউ কখনও ভদ্রলোক বলেনি, আমরাও জানি আমরা ভদ্রলোকের কেউ না... যে
নোংরা জীবনের ভেতর, অশ্লীল জীবনের ভেতর ভদ্রলোকের জাত মানুষকে ঠেলে ফেলে
দিযে়ছে , সেই মানুষের ভাষা, কথা কী করে শুদ্ধ শুচিময় হবে ? ... আসলে আমরা
তাদেরই নোংরামি, অশ্লীলতা তাদেরকেই ফিরিযে় দিযে়ছি-- তাদের সামনে মেলে
ধরেছি তাদের ভন্ড ডিহিম্যানাইজড জীবনপ্রণালী -- তাদের কোড ল্যাঙ্গুযে়জ ধরে
ফেলি আমরা, তাই অপরাধ -- অপরাধ আমাদের তাই -- তাই আমরা নোংরা, কুৎসিত,
অসভ্য, মেযে়সংক্রান্ত, যৌনসংক্রান্ত, নৈরাজ্যসংক্রান্ত. অপাঠ্য, অবোধ্য
আমরা --" -সুভাষ ঘোষ "এই সভ্যতার কাছে কবিই সবচেযে় বড় অপরাধী। কারণ সভ্যতার বেঁধে দেওযা়
গন্ডীর সীমা কবিই প্রথম লঙ্ঘন করে। কবি শব্দই আমাদের কাছে বিদ্রোহবাচক।
কবি, প্রচারিত মহত্বের আডালে কামার্ত মুখগুলি চিনে ফ্যালে - কবির চোখ সমস্ত
গোপন হত্যাকাণ্ড দেখে ফ্যালে। যারা শ্রেষ্ঠ তাদের ধ্বংস করেই এই সভ্যতা
আনন্দ পায়। কবি যথার্থ সর্বহারা সে সক্রিয় এবং আক্রমণকারী, তার হারাবার
কিছুই নাই । সর্বহারা বলেই সে প্রতিটি শব্দের প্রকৃত ইতিহাস আবিষ্কার করতে
পারে । আইনসম্মত বেশ্যাবৃত্তিই এই সভ্যতার চমকপ্রদ ইতিহাস।
কবির সৃষ্টিকে ভয়ংকর ব'লে মনে করে । তার কণ্ঠস্বরকে স্তব্ধ করার ঘৃণ্য
ষড়যন্ত্র শুরু হয়। স্বপ্নহীন পৃথিবীতে কবিই কেবল স্বপ্ন দেখে । স্বপ্নহীন
মানুষ কবির সৃষ্টিকে অশ্লীল মনে করে । বিদ্রোহকে বিকার মনে করে।
ভালোবাসাকে অপরাধ বলে ঘোষণা করে। 'সাফল্য'ই কবির কাছে সবচেযে় অশ্লীল
শব্দ। মেলাবে মিলিযে় দেবে সে কবি নয়, সে এক ঘুষখোর যে সস্তায় বাজিমাত
করতে চায়।" --শৈলেশ্বর ঘোষ
সর্বহারা শৈলেশ্বর ঘোষের বাংলো বাড়ি কবি শৈলেশ্বর ঘোষ।হাংরি আন্দোলনের অন্যতম কবি।
হ্যাঁ,ঘনিষ্ঠতা গড়ে উঠেছিল তাঁরও সঙ্গে।প্রায় দেড়দশক জুড়ে।অনেক স্মৃতি,
ঋণও অনেক।তবু ভেঙে গেল, মুগ্ধতা কেটে গেল!দূরত্বও তৈরি হলো অনেকটা।দূরত্ব
বাড়াতে হাজির হয়ে গেলেন তাঁর অনুগত চাকরবাকরেরা! যেমনটি হয়, যেমনটি হয়ে
এসেছে এযাবৎ! তবু অনেক ঋণ তাঁর কাছে।হাংরি এবং হাংরি ঘিরে ষড়যন্ত্র এবং পরিকল্পনাগুলির অনেক গল্প তাঁরই কাছে শোনা যে! ভালবাসতেন গাঁজা।ভালবাসতেন হেনরী মিলার,আঁতোয়া আর্তো,নিজের প্রশংসা এবং স্তুতি। সাক্ষাৎকার দেবার আগে, শর্ত রাখলেন,মলয় রায়চৌধুরী এবং 'প্রচন্ড বৈদ্যুতিক
ছুতার' নিয়ে কোনো প্রশ্ন করা যাবেনা।মেনে নিলাম।বিরক্ত হলাম প্রথমবার। প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার কথা বলেছেন বরাবর।একইভাবে গভীর রাতে টেলিফোনে যোগাযোগ রেখে গ্যাছেন কবি শঙ্খ ঘোষের সঙ্গে।অন্যদিকে 'শৈলেশ্বর ঘোষ সংখ্যা'-য় লিখতে অস্বীকার করেছেন 'মহামান্য' অভিভাবক-কবি শঙ্খ ঘোষ! হ্যাঁ, মৃত্যুর আগে সরকার পরিচালিত লিটলম্যাগাজিন মেলার উদ্বোধন করার সুযোগও পেলেন তিনি।মন্ত্রী পার্থ চ্যাটার্জির সঙ্গে ছবিও উঠলো তাঁর! কবির মৃত্যুর পর এসব কথা বলা যায়? যায়! যায়তো! --কৃশানু বসু
হাংরি-র
পুরনো বা নতুন সব কবি বা লেখকই কিন্তু অনায়াসে ব্যবহার করেছেন অবদমিতের
ভাষা। এঁদের লেখায় অনায়াসেই চলে আসে প্রকৃত শ্রমিক-কৃষকের দৈনন্দিন ব্যবহৃত
শব্দাবলি। ভালবাসা-ঘৃণা বা ক্রোধ বা ইতরামি প্রকাশে হাংরিদের কোনও ভণ্ডামি
নেই, রূপক বা প্রতীক নয়, এঁদের লেখায় যৌনতা বা ইতরামির প্রকাশে থাকে
অভিজ্ঞতার প্রত্যক্ষ বিবরণ— একেবারে জনজীবনের তথাকথিত শিল্পহীন কথা। সংকলনে
আরও আছে অরুণেশ ঘোষ, শৈলেশ্বর ঘোষ ও বাসুদেব দাশগুপ্তের তিনটি সাক্ষাৎকার।
এতে, বিশেষত বাসুদেব দাশগুপ্ত ও শৈলেশ্বর ঘোষের ক্ষেত্রে যিনি সাক্ষাৎকার
নিচ্ছেন ও যিনি দিচ্ছেন দুজনেরই প্রধান আগ্রহ যেন ছিল মলয় রায়চৌধুরীর
নিজেকে হাংরি জেনারেশনের সৃষ্টিকর্তা বলে দাবির বিরুদ্ধে যুক্তি খাড়া করা।
তা করতে গিয়ে শৈলেশ্বরের মতো মানুষও নিজের এক সময়কার সঙ্গী মলয়
রায়চৌধুরীকে অপ্রত্যাশিত ভাবে ‘বিহারী-বাঙালিবাবুটি’ বলে ফেলেছেন, যা অত্যন্ত নিন্দনীয়।
অনেকেই প্রায় সমসময়ের নকশাল আন্দোলনের সঙ্গে হাংরি আন্দোলনকে তুলনা করে
এদের অরাজনৈতিক তকমা দেন, কিন্তু ক্ষমতার সঙ্গে ভাষার সম্পর্ক নিয়ে হাংরি
জেনারেশন যে প্রশ্ন তুলেছিল তা ছিল নকশালদের তোলা প্রশ্নের চেয়েও অনেক বেশি
মৌলিক। এমনকী তুমুল প্রচার পাওয়া এবং নিজস্ব অস্তিত্ব তৈরি করা সত্ত্বেও
দলিত সাহিত্য আন্দোলনকে শেষ পর্যন্ত হাংরি আন্দোলনের থেকে পিছিয়েই রাখতে
হয়। দাবি-দাওয়া, জমায়েত বা প্রথাগত রাজনৈতিক প্রতিবাদ আন্দোলনকে প্রথম
থেকেই সাহিত্য আন্দোলনে জড়িয়ে রাখায় এই আন্দোলন দ্রুতই বুর্জোয়া
কুঅভ্যাসগুলিতে আক্রান্ত হয়।
হাংরি আন্দোলন শুরুর প্রায় পঞ্চাশ বছর পর সেই সময় ও পরবর্তী কালে এই
আন্দোলনে যোগ দেওয়া কবি ও গদ্যলেখকদের রচনাসংগ্রহ সম্পাদনায় উদ্যোগী হয়ে
সব্যসাচী সেন খুবই প্রয়োজনীয় কাজ করেছেন। তবে উৎপলকুমার বসুর ‘পোপের সমাধি’
কবিতাটি বর্তমান সংগ্রহে না থাকাটা রীতিমতো বিস্ময়কর। আর হাংরি আন্দোলন
নিয়ে ‘সম্প্রতি’ পত্রিকায় প্রকাশিত শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের পুরো প্রবন্ধটিও
থাকা উচিত ছিল। সর্বোপরি সমীর রায়চৌধুরী ও মলয় রায়চৌধুরী প্রসঙ্গ।
সম্পাদকীয়ের শুরুতেই আমরা সম্পাদকের এক ‘বন্ধু’র বয়ানে জেনে যাই, ‘এই
(হাংরি কিংবদন্তি) গ্রন্থে মলয় রায়চৌধুরী অতীব যত্ন সহকারে নিজেকে হাংরি
আন্দোলনের স্রষ্টা বলে প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করেছেন যা সর্বৈব মিথ্যা।
হাংরি সাহিত্যের স্রষ্টা হলেন শক্তি চট্টোপাধ্যায়।’ সে ক্ষেত্রে যতই শক্তি
চট্টোপাধ্যায় শৈলেশ্বর ঘোষের ‘তিন বিধবা’ কবিতা প্রকাশের পর আন্দোলন থেকে
বিদায় নিন, অন্তত ঐতিহাসিক কারণে তাঁর ‘সীমান্ত প্রস্তাব ১/ মুখ্যমন্ত্রীর
প্রতি নিবেদন’ কবিতাটি এখানে অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিত ছিল। আর, শক্তি
চট্টোপাধ্যায়কে এই আন্দোলনের সৃষ্টিকর্তা ধরে নিলে তিনিই যখন আদালতে
দাঁড়িয়ে ‘এটা ঘটনা যে, এই সাহিত্য আন্দোলন (হাংরি জেনারেশন) আমি কয়েক জন
বন্ধুকে নিয়ে শুরু করেছিলাম’ বলে সাক্ষ্য দেন আর কয়েক জন বন্ধুর মধ্যে মলয়
রায়চৌধুরী থাকেন তখন মলয় সৃষ্টিকর্তা হোন বা না হোন তাঁর অন্তত একটি লেখা
এই সংকলনে ঠাঁই পাওয়ার অধিকার পেয়ে যায়। বিশেষ করে তাঁর যে লেখার জন্য এত
কোর্ট কাছারি এত সাক্ষ্যদান সেই ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক কুঠার’ থাকবে না?শক্তি
বা আরও অনেক কবিই এই লেখাটিকে বাজে লেখা বলেছিলেন, কিন্তু ইতিহাসের
দাবিতেই এই লেখা বা সমীর রায়চৌধুরীর লেখা এই সঙ্কলনভুক্ত হওয়া উচিত ছিল।
সম্পাদকীয়তে বলা আছে, ‘সুভাষ ঘোষের একটি বক্তব্যে জানা যাচ্ছে—‘‘তখন হাংরি
জেনারেশনের প্রথম পর্ব শেষ... শেষ পর্বে ঝাঁকের কই মিশে গ্যাছে ঝাঁকে—
আমাদের নিয়ে ’৬৩-’৬৪তে আরম্ভ দ্বিতীয় পর্বের’’—। এই সংগ্রহকে ‘হাংরি
জেনারেশন (দ্বিতীয় পর্ব)’ বললে মলয়, সমীর, শক্তি বা উৎপলকুমার বসুর লেখা
বাদ দেওয়ার যুক্তি বোঝা যেত।অন্য দিকে যতই মলয় রায়চৌধুরী উদ্বাস্তুদের
বিরুদ্ধে বিদ্বেষ করে থাকুন বা নিজের বুর্জোয়া অতীত নিয়ে গর্ব প্রকাশ করুন
বা ১৯৬৪ সালে হাংরি জেনারেশনের মৃত্যু ঘোষণা করুন, তাতে তিনি যে ১৯৬৫-র আগে
পর্যন্ত অর্থাৎ হাংরি জেনারেশনের প্রথম পর্বের এক জন ছিলেন এটা তো অপ্রমাণ
হয় না। অর্থাৎ কোথাও যেন একটু উদারতার অভাব থেকে গেল।
( উল্লেখ্য যে শৈলেশ্বর ঘোষ ও সুভাষ ঘোষ ছিলেন মলয় রায়চৌধুরীর বিরুদ্ধে রাজসাক্ষী এবং সেই কারণেই মলয় রায়চৌধুরীর একমাসের কারাদণ্ডের আদেশ হয়েছিল ।
একটি কবিতার জন্য ১৯৬৪ সালে মলয় রায়চৌধুরীর বিরুদ্ধে মকদ্দমা করেছিল তৎকালীন
পশ্চিমবঙ্গ সরকার। মলয়ের হাতে হাতকড়া পরিয়ে ও কোমরে দড়িবেঁধে প্রথমে থানায়
এবং থানা থেকে ছয়-সাতজন অপরাধীর সঙ্গে রাস্তা দিয়ে হাঁটিয়ে কোর্টে নিয়ে
যাওয়া হয়েছিল। মলয়ের বিরুদ্ধে ৩৫ মাস মামলাটি চলে প্রথমে নিম্ন আদালতে,
যেখানে মলয়ের একমাস জেলের সাজা ঘোষিত হয় ও তারপর কলকাতা উচ্চ আদালতে,
যেখানে তিনি বেকসুর ছাড়া পান। মলয়ের পক্ষে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন তরুণ সান্যাল,
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, জ্যোতির্ময় দত্ত, সত্রাজিৎ দত্ত ও অজয় হালদার।
পাঠকের হয়ত আশ্চর্য লাগবে, মলয়ের বিরুদ্ধে পুলিসের পক্ষের সাক্ষী ছিলেন
শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় ও উৎপলকুমার বসু। দুজন পুলিস
ইনফর্মার, পবিত্র বল্লভ ও সমীর বসু, ছিলেন পুলিসের ভুয়ো সাক্ষী, যাঁরা
মলয়ের পরিচিত না হওয়া সত্ত্বেও কোর্টে জানান যে মলয়ের সঙ্গে তাঁদের বহুবার
কফিহাউসে দেখা হয়েছে। সবচেয়ে লজ্জার যে দুজন হাংরি আন্দোলনকারী রাজসাক্ষী ,
অর্থাৎ অ্যাপ্রুভার, হয়ে মলয়ের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেন; তাঁরা দুজন হলেন শৈলেশ্বর ঘোষ ও সুভাষ ঘোষ।এঁদের সাক্ষ্যের কারণেই নিম্ন আদালত মলয়কে সাজা দিয়েছিল ।
শৈলেশ্বর ঘোষ ও সুভাষ ঘোষ-এর মুচলেকা : হাংরি আন্দোলন
শৈলেশ্বর ঘোষের মুচলেকা
আমার নাম শৈলেশ্বর ঘোষ। আমার জন্ম বগুড়ায় আর বড় হয়েছি বালুরঘাটে। আমি
১৯৫৩ সনে বালুরঘাত হাই ইংলিশ স্কুল থেকে স্কুল ফাইনাল পাশ করেছি, ১৯৫৫ সনে
বালুরঘাট কলেজ থেকে আই এস সি, ১৯৫৮ সনে বালুরঘাট কলেজ থেকে বি এ, আর ১৯৬২
সনে কলকাতার সিটি কলেজ থেকে বাংলায় স্পেশাল অনার্স। ১৯৬৩ সনে সেপ্টেম্বর
মাসের শেষ দিকে একদিন কলেজ স্ট্রিট কফি হাউসে দেবী রায় ওরফে হারাধন থাড়া
নামে একজন তাঁর হাংরি জেনারেশন ম্যাগাজিনের জন্য আমাকে লিখতে বলেন। তারপরেই
আমি হাংরি আন্দোলনের লেখকদের সঙ্গে পরিচিত হই। আমি ব্যক্তিগতভাবে
খ্যাতিমান লেখক সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়, সুনীল
গঙ্গোপাধ্যায়, রবীন্দ্র দত্ত, বাসুদেব দাশগুপ্ত, প্রদীপ চৌধুরী এবং
উৎপলকুমার বসুকে চিনি। গত এপ্রিল মাসে একদিন কলেজ স্ট্রিট কফিহাউসে মলয়
রায়চৌধুরীর সঙ্গে আমার দেখা হয়, এবং তিনি আমার কাছে কয়েকটা কবিতা চান। তাঁর
কাছ থেকে একটা পার্সেল পেয়েছি। আমি মলয় রায়চৌধুরীকে চিনি। তিনি হাংরি
আন্দোলনের স্রষ্টা। হাংরি জেনারেশন ম্যাগাজিনে আমি মোট দুবার কবিতা লিখেছি।
মলয় আমাকে কিছু লিফলেট আর দুতিনটি পত্রিকা পাঠিয়েছিলেন কিন্তু সেগুলি
সম্পর্কে কোন নির্দেশ তিনি আমাকে দেননি। সাধারণত এইসব কাগজপত্র আমার ঘরেই
থাকত। এটুকু ছাড়া হাংরি আন্দোলন সম্পর্কে আমি আর কিছু জানি না। অশ্লীল
ভাষায় লেখা আমার আদর্শ নয়। ১৯৬২ থেকে আমি হুগলি জেলার ভদ্রকালীতে ভূপেন্দ্র
স্মৃতি বিদ্যালয়ে স্কুল টিচার। মাইনে পাই দু’শ দশ টাকা। বর্তমান সংখ্যা
হাংরি বুলেটিনের প্রকাশনার পর, যা কিনা আমার অজান্তে ও বিনা অনুমতিতে ছাপা
হয়, আমি এই সংস্হার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছি। ভবিষ্যতে আমি হাংরি আন্দোলনের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক রাখব না এবং হাংরি পত্রিকায় লিখব না। বর্তমান বুলেটিনটি ছাপিয়েছেন প্রদীপ চৌধুরী। ( ২ সেপ্টেম্বর ১৯৬৪, স্বাক্ষর শৈলেশ্বর ঘোষ )
সুভাষ ঘোষের মুচলেকা
আমার নাম সুভাষচন্দ্র ঘোষ। গত এক বৎসর যাবত আমি কলেজ স্ট্রিট কফি হাউস
যাতায়াত করছি। সেখানে আমার সঙ্গে একদিন হাংরি আন্দোলনের উদ্ভাবক মলয়
রায়চৌধুরীর পরিচয় হয়। সে আমার কাছ থেকে একটা লেখা চায়। হাংরি জেনারেশন
বুলেটিনের খবর আমি জানি বটে কিন্তু হাংরি যা ঠিক কী উদ্দেশ্য তা আমি জানি
না। আমি তাকে আমার একটা লেখা দিই যা দেবী রায় সম্পাদিত হাংরি জেনারেশন
পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। আমি তা আমার রুমমেট শৈলেশ্বর ঘোষের কাছ থেকে পাই। সে
হাংরি বুলেটিনের একটা প্যাকেট পেয়েছিল। আমি এই ধরণের আন্দোলনের সঙ্গে কখনও
নিজেকে জড়াতে চাইনি, যা আমার মতে খারাপ। আমি ভাবতে পারি না যে এরকম একটা
পত্রিকায় আমার আর্টিকেল ‘হাঁসেদের প্রতি’ প্রকাশিত হবে। আমি হাংরি আন্দোলনের আদর্শে বিশ্বাস করি না, আর এই লেখাটা প্রকাশ হবার পর আমি ওদের সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন করেছি। ( ২ সেপ্টেম্বর ১৯৬৪ স্বাক্ষর সুভাষ ঘোষ )
[ হাংরি আন্দোলন মামলায় আদালতে এনারা দুজন মলয় রায়চৌধুরীর বিরুদ্ধে
পুলিশের পক্ষে সাক্ষী ছিলেন , অর্থাৎ রাজসাক্ষী ছিলেন। সে-সময়ে এই মুচলেকা
দিয়ে তাঁরা হাংরি আন্দোলনের সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন করেন। পরে হাংরি
আন্দোলনের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়লে তাঁরা সুযোগ বুঝে নিজেদের আবার হাংরি ঘোষণা
করেন। ‘হাংরি জেনারেশন রচনা সংকলন’ নামে সমীর চৌধুরী
সম্পাদিত যে বইটি বাজারে পাওয়া যায় তা একটি চারশো বিশ সংকলন; ওই সংকলনে
প্রধান হাংরি আন্দোলনকারীরা কেউ নেই; পরিবর্তে আছেন এমন লেখক-কবিরা যাঁরা
হাংরি আন্দোলনে
মলয়,
তুমি কলকাতায় কি সব কাণ্ডের বড়াই করে চিঠি লিখেছ জানি না । কী
কাণ্ড করছ ? আমার বন্ধু-বান্ধবদের কেউ-কেউ ভাসা-ভাসা লিখেছে বটে কফিহাউসে
কী সব গণ্ডোগোলের কথা ।
কিছু লেখার বদলে আন্দোলন ও হাঙ্গামা করার দিকেই তোমার লক্ষ্য
বেশি । রাত্রে তোমার ঘুম হয় তো ? এসব কিছু না --- আমার ওতে কোনো মাথাব্যথা
নেই । যত খুশি আন্দোলন করে যেতে পারো --- বাংলা কবিতার ওতে কিছু আসে যায় না
। মনে হয় খুব একটা শর্টকাট খ্যাতি পাবার লোভ তোমার । পেতেও পারো, বলা যায়
না । আমি এসব আন্দোলন কখনো করিনি ; নিজের হৃৎস্পন্দন নিয়ে আমি এতই ব্যস্ত ।
তবে একথা ঠিক, কলকাতা শহরটা আমার । ফিরে গিয়ে আমি ওখানে
রাজত্ব করব । তোমরা তার এক 'চুলও' বদলাতে পারবে না । আমার বন্ধুবান্ধবরা
আনেকেই সম্রাট । তোমাকে ভয় করতুম, যদি তোমার মধ্যে এখন পর্যন্ত একটুও
জেল্লা দেখতে পেতুম । আমার চেয়ে কম বয়সিদের মধ্যে একমাত্র তন্ময় দত্ত
এসেছিল বাংলা কবিতায় তলোয়ার হাতে, আমার চেয়ে অন্তত ছ'বছরের ছোটো---- কিন্তু
জীবনানন্দের পর অত শক্তিশালী কবি এদেশে আর কেউ আসেনি । প্রচণ্ড অভিমান করে
ও চলে গেছে । সেজন্যে এখনও আমি অপরের হয়ে অনুতাপ করি । আমি নিজে তো এখনও
কিছুই লিখিনি , লেখার তোড়জোড় করছি মাত্র ; কিন্তু তোমার মতো কবিতাকে
'কমার্শিয়াল' করার কথা আমার কখনো মাথায় আসেনি । বালজাকের মতো আমি আমার
ভোকাবুলারি আলাদা করে নিয়েছি কবিতা ও গদ্যে । তোমার প্রতি যতই আমার স্নেহ
থাক মলয়, কিন্তু তোমার কবিতা সম্বন্ধে এখনো কোনোরকম উৎসাহ আমার মনে জাগেনি ।
প্রতীক্ষা করে আছি অবশ্য ।
অনেকের ধারণা যে পরবর্তী তরুণ জেনারেশানের কবিদের হাতে না
রাখলে সাহিত্যে খ্যাতি টেকে না । সে জন্যে আমার বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে
কেউ-কেউ একসময় তোমাদের মুরুব্বি হয়েছিল । আমি ওসব গ্রাহ্য করি না । নিজের
পায়ে আমার যথেষ্ট জোর আছে, এমনকী একা দাঁড়াবার । আমার কথা হল : যে-যে বন্ধু
আছ কাছে এসো, যে ভালো কবিতা লেখো কাছে এসো --- যে-যে বন্ধু নও , বাজে
কবিতা লেখো, দূর হয়ে যাও কাছ থেকে । বয়সের ব্যবধান তোলা আমার কাছে অত্যন্ত
ভালগার লাগে ।
চালিয়ে যাও ওসব আন্দোলন কিংবা জেনারেশানের ভণ্ডামি । আমার ওসব
পড়তে কিংবা দেখতে মজাই লাগে । দূর থেকে । সাহিত্যের ওপর মৌরসি পাট্টা
বসাতে এক-এক দলের অত লোভ কী করে আসে , কী জানি । তবে একটা কথা জানিয়ে রাখা
ভালো । আমাকে দেখেছ নিশ্চয় শান্তশিষ্ট, ভালো মানুষ । আমি তাই-ই, যদিও গায়ে
পদ্মাপাড়ের রক্ত আছে । সুতরাং, তোমাদের উচিত আমাকে দূরে-দূরে রাখা , বেশি
খোঁচাখুঁচি না করা । নইলে হঠাৎ উত্তেজিত হলে কী করব বলা যায় না । জীবনে
ওরকম উত্তেজিত হয়েছি পৌনে এক বার । গত বছর । দুএকজন বন্ধুবান্ধব ও-দলে আছে
বলে নিতান্ত স্নেহবশতই তোমাদের হাংরি জেনারেশান গোড়ার দিকে ভেঙে দিইনি ।
এখনও সে ক্ষমতা রাখি , জেনে রেখো । তবে এখনও ইচ্ছে নেই ও-খেলাঘর ভাঙার ।
আমার এক বন্ধু জানিয়েছে যে তোমরা নাকি আমার কোনো কোনো চিঠির
অংশ-বিশেষ ছাপিয়েছ । পত্রসাহিত্য-ফাহিত্য করার জন্য আমি চিঠি লিখি না ।
আমার চিঠি নেহাত কেজো কথা । অবশ্য লুকোবারও কিছু নেই । কিন্তু আগে-পরের
কথা বাদ দিয়ে, ডটডট মেরে, চালাকির জন্য আমার কোনো চিঠি যদি কেউ ছাপিয়ে থাকে
--- তবে আড়াই মাস পরে ফিরে তার কান ধরে দুই থাপ্পড় লাগাব বলে দিও ।
আশা করি শারীরিক ভালো আছ । আমার ভালোবাসা নিও ।
সুনীলদা
( The facsimile of the letter was first published in 1987 in the book
HUNGRY, SHRUTI and SHASTROBIRODHI ANDOLON by Dr Uttam Das. Publisher :
Mahadiganto Prokashani, Padmapukur Mor, Kolkata 700 144. The letter has
been reprinted thereafter in various books and periodicals and used by
researchers doing M Phil and PhD )
সমীর রায়চৌধুরী ও হাংরি আন্দোলন সম্পর্কে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ( কৃত্তিবাস পত্রিকার সম্পাদক )
একটি চিঠিপত্রের সংকলন প্রকাশিত হচ্ছে, আমাকে লেখা বিভিন্ন সময়ে
অনেকের লেখা চিঠি । তাতে ছাপা হচ্ছে সমীর রায়চৌধুরীর কয়েকটি চিঠি । আমার
স্মৃতিশক্তি ইদানিং দুর্বল হয়ে যাচ্ছে, ওই চিঠিগুলোর বিষয়বস্তু আমার মনে
ছিল না । সেই সব চিঠিতে বিধৃত হয়েছে হাংরি জেনারেশন গড়ার ইতিহাস আর
কৃত্তিবাসের সঙ্গে সমীর রায়চৌধুরীর সম্পর্ক । আমার মনে পড়ে গেল, একসময় আমি
কৃত্তিবাস নিয়ে বেশ সংকটে পড়েছিলাম । তখন আমার পাশে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়েছিল
সমীর । সে আমাকে বুঝিয়েছিল যে কিছুতেই কৃত্তিবাস বন্ধ করা যাবে না । সে সব
রকম সাহায্য করতেই প্রস্তুত, এমনকী টাকা পয়সা দিয়েও ।
সমীর অন্য অনেক সময়েও আমাকে অনেক সাহায্য করেছে । একই কলেজে পড়ার সুবাদে
বন্ধুত্ব, যদিও আমাদের বিষয় ছিল আলাদা । সমীরের জীববিজ্ঞান আর আমার
অর্থনীতি । কলেজে তো অনেকের সঙ্গেই পরিচয় হয়, কিন্তু কারুর কারুর সঙ্গে
সে-বন্ধুত্ব খুব গাঢ় হয়ে ওঠে । গ্র্যাজুয়েশানের পর সমীর বেশ তাড়াতাড়ি চাকরি
পেয়েছিল । আমি বেশ কয়েক বছর বেকার অবস্হায় টিউশানি-মিউশানি করে কাটিয়েছি ।
সেই সময় সমীর কৃত্তিবাসের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে । হাংরি জেনারেশনের সঙ্গে
কৃত্তিবাসের খানিকটা টানাপোড়েন তো ছিলই, সমীর সেটা মেলাবার অনেক চেষ্টা
করেছে । ওর ছোটোভাই মলয় রায়চৌধুরীকে পুলিশ গ্রেফতার করে মামলা দায়ের করে,
তাতে, হাংরি জেনারেশনের সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক না থাকলেও মলয়ের পক্ষে
প্রথম সাক্ষী দিয়েছিলুম আমি ।
বিহারে চাকরিরত হলেও সমীর কলকাতা থেকে একটি প্রকাশনা সংস্হা চালু করতে
চেয়েছিল । তার প্রথম বই আমার ‘একা এবং কয়েকজন’। তখন আমাকে কবি হিসাবে ক’জনই
বা চেনে । তবু আমার কবিতার বই প্রকাশ করায় সমীরের অনেকখানি ঔদার্য প্রকাশ
পেয়েছিল । সমীরের কাব্যগ্রন্হ বেরুল, ‘ঝর্ণার পাশে শুয়ে আছি’ । নামটা বোধহয়
আমারই দেওয়া । প্রেসেও ছোটাছুটি করেছি আমি । সে সময়ে সমীর চমৎকার
রোমান্টিক কবিতা লিখত । পরে তার কবিতা একটা অন্যদিকে বাঁক নেয় । ওই সংস্হা
থেকে সমীরের আরেকটি বই বেরিয়েছিল, ‘আমার ভিয়েৎনাম’ । পরে সেই প্রকাশনা বন্ধ
হয়ে যায় । লেখালিখি ছাড়াও সমীরের সঙ্গে আমার একটা গভীর নৈকট্যের সম্পর্ক
তৈরি হয়ে যায়, যে সম্পর্কের মধ্যে কখনো ভুল বোঝাবুঝির প্রশ্ন থাকে না । আমি
জানতাম এই দীর্ঘকায়, সুঠাম চেহারার বন্ধুটির ওপর সব সময় নির্ভর করা যায় ।
আমার দিক থেকে ওকে ককন কী সাহায্য করেছি, তা বলতে পারি না । চাকরিসূত্রে
সমীর যখন যেখানে বদলি হয়েছে, আমি সেখানে গিয়ে উপস্হিত হয়েছি । যেমন
ডালটনগঞ্জ, ভাগলপুর, দুমকা, মুজফফরপুর, চাইবাসা, দ্বারভাঙ্গা এবং ওদের
নিজস্ব বাড়ি পাটনায় । সেই সময়কার আড্ডার উজ্জ্বল মধুর স্মৃতি কখনো ভোলার নয়
। বিয়ের সময়, সমীর বেশ একটা কৌতুক করেছিল। আমরা জানতুম, চাইবাসার বেলার
সঙ্গেই ওর ভালোবাসার সম্পর্ক ।কিন্তু সমীর রটিয়ে দিল, ও অন্য একটি মেয়েকে
বিয়ে করছে । খুবই উদ্বিগ্ন অবস্হায় আমরা কয়েকজন বিবাহবাসরে যোগ দিতে গেলাম
চাইবাসায় । সমীরকে কিছু জিগ্যেস করলে সে মুচকি হাসে । অনুষ্ঠান শুরুর আগে
নববধুর মুখ দেখে আমার বুক থেকে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস বেরিয়ে এল ।
লাবণ্যময়ী বেলা পরে সমীরের সব বন্ধুকেই আপন করে নিয়েছিল । স্বাতীর সঙ্গে
আমার বিয়ে উপলক্ষ্যেও সমীর আর বেলা দুজনে এসে উপস্হিত হয়েছিল আমাদের দমদমের
বাড়িতে । বউভাতের রাতে নববধূকে কিছু একটা উপহার দিতে হয়, তা আমার জানা ছিল
না । জানব কী করে, আমি যে কাঠ বাঙাল । সমীরই প্রায় শেষ মুহূর্তে সেই কথাটা
মনে করিয়ে দেওয়ায় দুজনে বেরিয়ে কিনে আনলাম একটা লেডিজ ঘড়ি, খুব সম্ভবত
সমীরই সেটার দাম দিয়েছিল । তারপর এই দুই পরিবারের একটা ঘনিষ্ঠতা হয়ে যায় ।
সমীরের সঙ্গে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের পরিচয় প্রথমে আমিই করিয়ে দিই । তারপর
শক্তি-সমীরের চাইবাসা পর্ব নিয়ে বাংলা সাহিত্যে অনেক কিছু লেখা হয়েছে ।
বিহারে থাকলেও সমীর মাঝে মাঝেই কলকাতা এসে অন্য সব লেখকদের সঙ্গে পরিচিত
হয়ে ওঠে ।
হাংরি জেনারেশন আন্দোলন শুরু হবার পর ওদের সঙ্গে আমার খানিকটা দূরত্ব
তৈরি হয় । আমার ‘আনন্দবাজারে’ যোগ দেওয়া ও কবিতা ছাড়াও প্রচুর গদ্য
লেখালিখি ওরা অনেকেই পচন্দ করেনি, শুনেছি । সেটা তো এসটাবলিশমেন্টের খপ্পরে
পড়া, এবং কথাটা ঠিকই । কয়েক বছর পর শক্তিও অবশ্য ‘আনন্দবাজার’ সংস্হায় যোগ
দিয়েছিল ।
রাজনীতির মতন সাহিত্য জগতেও নীতিগত আপত্তি ও দূরত্ব থাকতেই পারে ।
কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনে সেই দূরত্ব সৃষ্টি করার পক্ষপাতী আমি কোনোদিনই নই ।
হাংরি জেনারেশন পর্ব চুকে গেলে শক্তির সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতায় সামান্য
সাময়িক ফাটল খুব সহজেই জোড়া লেগে যায় । যেমন সন্দীপনেরও । কিন্তু কেউ কেউ
দূরত্বটাই পছন্দ করে । সমীরের সঙ্গে বিচ্ছেদটাই আমার বেশি মনে লাগে ।
সমীরের লেখা, সাহিত্য সম্পর্কে ওর নানারকম পরিকল্পনা আমার বরাবরই পছন্দ
ছিল। সবচেয়ে বেশি আপন মনে করতাম মানুষ সমীরকে ।
জীবন কত নিষ্ঠুর । জীবনের গতি কোন সময় কোন বাঁক নেবে, তা আগে থেকে কিছুই
বলা যায় না । এক সময়কার সেই প্রগাঢ় বন্ধুত্ব, আড্ডা, পানাহার, পরস্পরের
স্বপ্ন বিনিময়, এসবই কখন যেন ধূসর হয়ে যায় । বিহার ছেড়ে সমীর এখন কলকাতারই
উপকন্ঠে বাড়ি করে সপরিবারে চলে এসেছে । অথচ ওর সঙ্গে আমার আর প্রায় দেখাই
হয় না । কেন কে জানে ! হয়তো আমার দিক থেকেই অনেক ত্রুটি আছে ।
একটা সাম্প্রতিক ঘটনা বলি । চোখের চিকিৎসার ব্যাপারে স্বাতী আর আমি গেছি
একটা চিকিৎসালয়ে । বেশ ভিড় । তারই মধ্যে স্বাতী আঙুল দেখিয়ে বলল, ওইখানে
সমীর বসে আছে না ? কাছে গিয়ে দেখি, সত্যিই সমীর আর বেলা । কুশল বিনিময় হল ।
ছেলেমেয়েদের কথা হল । এক সময় আমি সমীরকে বললাম, কানাইলাল জানার বাড়িতে যে
একটা উৎসব হল কদন আগে, শুনেছিলাম, তোরও সেখানে যাবার কথা ছিল । তুই গেলি না
কেন ? তোর বাড়ির তো কাছেই ।
সমীর আমার চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে ঠাণ্ডা গলায় বলল, আমি যাইনি, যদি তুই আমাকে সেখানে চিনতে না পারিস?
আমার বুকে যেন একটা বুলেট বিদ্ধ হল । এরকম নিষ্ঠুর কথা আমি বহুদিন
শুনিনি । যে বন্ধুর সঙ্গে আমার তুই-তুই সম্পর্ক, যার সঙ্গে আমার কখনো
ঝগড়াঝাঁটি হয়নি, কোনোদিন তিক্ততার সৃষ্টি হয়নি, তার সঙ্গে দেখা হলে আমি
চিনতে পারব না ? এমন অভিযোগ শোনার জন্য কী দোষ বা অন্যায় করেছি আমি, তা
জানি না । এরপর কয়েকদিন বেশ বিমর্ষ হয়েছিলাম । মনে হল, জীবনের কাছ থেকে
এরকম আকস্মিক আঘাত আরও কত পেতে হবে কে জানে !
হয়তো সমীরও কোনো গভীর অভিমানবোধ থেকে এই কথা বলেছিল । আমি নিজেই নিশ্চয়ই
সেরকম কোনো কারণ ঘটিয়েছি, কিন্তু তার বিন্দুবিসর্গও আমার জানা নেই ।
( ২০১২ ) [ নব্বুই দশকে কলকাতার বাঁশদ্রোণীতে এসে সমীর রায়চৌধুরী “হাওয়া
৪৯” নামে একটি পত্রিকা সম্পাদনা ও প্রকাশ আরম্ভ করেন । তিনি সুনীল,
সন্দীপন, শক্তি, উৎপল, শরৎ প্রমুখ সবায়ের সঙ্গে দেখা করে লেখা দেবার আহ্বান
জানান । একমাত্র উৎপল ছাড়া আর কেউ সাড়া দেননি । সমীর অত্যন্ত দুঃখিত হন
তাঁর নিকটবন্ধু সুনীলের ব্যবহারে । প্রায় দুই বছর সমীর রায়চৌধুরী কৃত্তিবাস
পত্রিকাকে আর্থিক সাহায্য দিয়ে দাঁড় করিয়ে রেখেছিলেন, কিন্তু যখন সমীর এবং
অন্যান্য হাংরি আন্দোলনকারীরা গ্রেফতার হন ও তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের
হয় তখন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কৃত্তিবাস পত্রিকায় হাংরি আন্দোলনের বিরুদ্ধে
একটি ঘৃণ্য সম্পাদকীয় লিখেছিলেন । সমীর আই আচরণে অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হন ।
ভূমেন্দ্র গুহের মাধ্যমে সমীরকে সংবাদ পাঠিয়েছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় যে
সবাই যখন অকাদেমি পুরস্কারের জন্য তাঁকে খোশামোদ করছে তখন সমীর রায়চৌধুরী
তাঁর বাড়িতে একবারের জন্যও কেন যান না । হাংরি আন্দোলন মামলায় কলকাতায়
সমীরের যখন মাথা গোঁজার ঠাঁই ছিল না তখন সুনীল একবারের জন্যও বলেননি তাঁর
বাড়িতে আতিথ্য নিতে । সমীরের গল্পগ্রন্হ “খুল যা সিমসিম” নিয়ে যখন কলকাতার
তরুণ লেখকমহলে আলোচনা আরম্ভ হয়েছিল গল্পের একটি নবদিগন্ত খুলে দেবার জন্য,
তখন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বইটি সম্পর্কে কোথাও এক লাইনও লেখেননি । তিনি
চাইলেই আনন্দবাজার ও দেশ পত্রিকায় বইটির আলোচনা করতে পারতেন । বিদেশে গিয়েও
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর বার্ধক্যেও হাংরি আন্দোলনের বিরুদ্ধে প্রচার
করেছেন, অ্যালেন গিন্সবার্গকে বুঝিয়েছেন যাতে আন্দোলনকে কোনো গুরুত্ব দেয়া
না হয়, সমীর তা জানতে পেরেছেন বিভিন্ন বিদেশী গবেষকদের কাছ থেকে । অমিতাভ
ঘোষের বিদেশিনী স্ত্রী যখন “এ ব্লু হ্যাণ্ড” নামে একটি বই গিন্সবার্গকে
নিয়ে লিখছিলেন তখন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তাঁকে বিপথগামী করেন, যে কারণে
বইটিতে সত্য তথ্য নেই বললেই চলে । শেষ বয়সে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কাঁদুনি
গেয়ে আত্মরক্ষা করতে চাইছেন ইতিহাসের পাতায় । শক্তি চট্টোপাধ্যায় সমীর
রায়চৌধুরীর সঙ্গে তাঁর সম্পর্কে প্রকাশ করতে দ্বিধা করেননি তাঁর ‘কিন্নর
কিন্নরী’ উপন্যাসে । অথচ সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর ‘অরণ্যের দিনরাত্রী’
উপন্যাসে সমীর রায়চৌধুরীকে গুরুত্ব দেননি, যখন কিনা ঘটনাবলী চাইবাসায়
ঘটেছিল । ]
[ বাংলা সাহিত্যে একটি বিতর্কিত
নাম সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়। বাংলা সাহিত্যে এক স্বতন্ত্র পাঠক গোষ্ঠী তৈরি
করেছিলেন সন্দীপন। লিখন শৈলীতে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ভিন্ন মেরুতে অবস্থান
সত্ত্বেও আজও সমান আলোচিত তিনি। সন্দীপনকে নিয়ে লিটল ম্যগাজিন ছাড়া অন্যত্র
সেভাবে আলোচনা হয়নি বললেই চলে। নব্বইয়ের দশকে সন্দীপন ভাবনায় আলোড়িত হন
তাঁর এক নিবিড় পাঠক প্রবীর চক্রবর্তী। সন্দীপন সান্নিধ্যে তাঁর সঙ্গে আলাপ
হয় সদ্য প্রয়াত ও তৎকালীন তরুণ প্রাবন্ধিক অদ্রীশ বিশ্বাসের। উভয়ের যৌথ
উদ্যোগে প্রকাশিত হয় একটি অনন্য গ্রন্থ – ‘ সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় সম্পর্কে
দুটো একটা কথা যা আমরা জানি।’ ১৯৯৬ সালের জুলাই মাসে এই বইটি প্রকাশিত
হয়েছিল ‘ভূমিকা’ প্রকাশন থেকে। এই বইটির জন্য দীর্ঘ আলাপচারিতায় বসেছিলেন
প্রবীর চক্রবর্তী, অদ্রীশ বিশ্বাস এবং সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়। সাক্ষাৎকারটি
অনুলিখনের দায়িত্ব পড়েছিল তৎকালীন সাংবাদিক,লেখক এবং বর্তমানে গল্পের সময়
পরিবারের অন্যতম সদস্য দেবাশিস মজুমদারের উপর।‘সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়
সম্পর্কে দুটো একটা কথা যা আমরা জানি’ বইটি এখন বইবাজারে দুর্লভ। প্রকাশের
বছর কুড়ি পর সেই জুলাই মাসেই ‘গল্পের সময়’এর পাঠকদের জন্য সেই
সাক্ষাৎকারটির সামান্য বাছাই করা অংশ তুলে আনলেন দেবাশিস মজুমদার। ] ‘সূর্যমুখী ফুল আর বিকালের আলো’। ওই গল্পটা পড়েই তো ফণীভূষণ আচার্য, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়রা আপনার সঙ্গে আলাপ করেছিলেন।
ওটা ফণীভূষণ লিখেছে বটে, তবে প্রথম আলাপ ওটা পড়ে হয়নি। তবে পরবর্তীকালে
শুনেছি সুনীল ঐ গল্পটা পড়ে মন্তব্য করেছিল, ‘লোকটা বোধহয় জেলে’। কফি হাউসে
কোনো এক বন্ধুর মুখে শুনেছিলাম। তখনও সুনীলের সঙ্গে আলাপ হয়নি। আমরা কফি
হাউসে আলাদা টেবিলে বসতাম। সুনীলরা আলাদা টেবিলে বসতো। ‘কৃত্তিবাসে’র গোড়ার
দিক তখন।
তখন কারা কারা আপনাদের টেবিলে বসতেন?
মিহির সেন, মিহির আচার্য, বীরেন্দ্র নিয়োগী, পূর্ণেন্দু পত্রী, একটু পরে অসীম সোমও আসে।
‘কৃত্তিবাসে’র সঙ্গে আলাপটা কীভাবে ঘটেছে?
আমি তখন ধুতি-শার্ট পরতাম। একথা আগেও অনেক জায়গায় বলেছি – আমি তখন বাড়ি
থেকে পালিয়ে ২৪ বি নূর মহম্মদ লেনে আলাদা থাকতাম। আমার সঙ্গে থাকতো
প্রণবকুমার মুখোপাধ্যায়।ওখানে বসেই আমি ‘ক্রীতদাস ক্রীতদাসী’ গল্পটা লিখতে
শুরু করি।ওখানেই একটা কবিতাও লিখি, যার প্রথম লাইনটা মধুসূদন থেকে ধার করতে
হয়েছিল – ‘দাঁড়াও পথিকবর’। ‘এপিটাফ’ নাম।সেটা আমি কোনো ক্রমে লিখি। সেটা
পড়ে প্রণব বলল, ‘আরে এতো খাঁটি পয়ার ! চলুন আপনার সঙ্গে সুনীলের সঙ্গে আলাপ
করিয়ে দি’ – বলে দেশবন্ধু পার্কে নিয়ে গেল। ওখানেই সুনীলের সঙ্গে প্রথম
আলাপ। তারপর টেবিল বদল হল। পুরনো বন্ধুত্ব কিছু রইলো। ওখানে খুব ইমপর্টেন্ট
ছিল যুগান্তর চক্রবর্তী। আমরা দুজনেই ইংরাজি পড়তাম। আমি একবছর পরীক্ষা
দিতে পারিনি বলে সে সিনিয়র হয়ে যায়।
হঠাৎ ইংরেজি?
দেবীপদ ভট্টাচার্য বললেন, ‘তুমি তো দেখছি বরাবর বাংলায় কম ইংরেজিতে বেশি
নম্বর পাও’। ইংরেজিতেই অ্যাপ্লাই করলাম। এবং চান্সও পেয়ে গেলাম। যাইহোক,
যা বলছিলাম। দেশবন্ধু পার্কে ঢুকে দেখলাম ওরা সবে কবিতা লিখছে। মাঝে-মধ্যে
মদ-টদ খেতে যায়। শক্তির সঙ্গে খুব তাড়াতাড়ি বন্ধুত্ব হয়ে গেল। তারপর ওরই
সঙ্গে প্রথম দিকে ওইসব মদ বিক্রির ঠেকগুলোতে যাতায়াত শুরু করলাম। ওদের
মধ্যে আমিই সেই ভাগ্যবান যে প্রথমেই একটা চাকরি পেয়ে গিয়েছিল।আর চাকরি
পাওয়ার প্রথম দিকে, মানে, মাইনে পাওয়ার প্রথম কয়েকদিন ওদের সঙ্গে থাকতাম।
সবাই মিলে খুব পানাদি হত। তারপর চারআনা-আটআনা ওদের কাছ থেকে ধার নিয়ে
চালাতাম। আমরা কিন্তু সোনাগাছিতে যেতাম। এই কথাগুলো কিন্তু আমি বলছি না।
কারণ, এই যে আমি খরচ করে ফেলতাম, বা ধার নিয়ে কাজ চালাতাম, এগুলো তো আমি
কখনও ভাবিনি, লক্ষ্যও করিনি। পরে বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে পুরনো দিনের কথা
নিয়ে আড্ডা দেওয়ার সময় বিভিন্ন লোক রেফার করেছে।
‘ক্রীতদাসক্রীতদাসী’ পর্যায়েরপ্রথমযেগল্পটালিখেছিলেনতা কি ‘বিজনেররক্তমাংস’ নয়?
না,
‘ক্রীতদাস ক্রীতদাসী’ আমি আগে থেকেই লিখেছিলাম।এসম্পর্কে সুনীলের কথা বলতে
হয়।গল্পটা তখন অনেকটা লেখা হয়ে গিয়েছিল। সুনীল কিছুটা পড়েও ছিল। তা, সুনীল
নাকি সমীর রায়চৌধুরীকে একটা চিঠি লিখেছিল চাইবাসায়, ‘ সন্দীপন একটা
অসাধারণ গল্প লিখছে। শেষ হলে একটা যুগান্তকারী ঘটনা ঘটবে। তো যাই হোক, এ
বিষয়টা আমার কাছে একেবারে আশ্চর্যের নয়। কারণ, ও তো ভীষণ বন্ধু-বৎসল। অবশ্য
শুধু ও নয়, সে সময় আমাদের বন্ধুদের মধ্যে সম্পর্কটা খুবই ঘনিষ্ট ছিল। যে
কারণে সকলেই প্রায় প্রেম করতো লুকিয়ে। জানাজানি হলে মারধোর খাওয়ার একটা ভয়
ছিল। বন্ধুত্বের বাইরে আর কিছুর যেন কোনো ভূমিকাই থাকতে পারে না আমাদের
জীবনে – এরকম একটা ধারণা ছিল। আমাদের তাই এই নিয়মে লুকিয়ে প্রেম করতে হতো।
খালি শক্তির ব্যাপারটা একটু আলাদা। ও তো প্রায় বুড়ো বয়সে প্রেম করেছে
(চাইবাসায়)। আর তার আগে শক্তি তো কোনোদিনই ও সবের ধার ধারেনি। যে কটা প্রেম
করতে গেছে সব কটাই গোলমেলে। এবং অনেকটাই এক তরফা। শক্তি অপর পক্ষের
সম্মতির অপেক্ষাই করেনি। ও একটা আলাদা ঘরানার মানুষ। ওর মধ্যে যেটা ছিল
সেটা ওবিসি স্তরের ব্যাপার। এ জিনিস এসিটিস্ট বা ভদ্দর লোকেরা বুঝতে পারবে
না।
আপনার প্রথম পর্বের গল্পগুলোতে যে ব্যক্তির হতাশা ও সংকট
চিহ্নিত হয়েছে, তা ওই বামপন্থী বন্ধুবান্ধবরা এবং পত্রপত্রিকাগুলো সমালোচনা
করেনি?
হ্যাঁ, ‘বিজনের রক্তমাংস’ তো ‘পরিচয়’ পত্রিকা ফেরত পাঠিয়েছিল। এগুলোই
আমায় পার্টি থেকে সরিয়ে দিয়েছে। আসলে তখন আমি ভেবে দেখলাম – এভাবে হবে না।
কারণ, এর আগে আমি যত কমিটেড লেখা লিখেছি সেগুলো কিন্তু যথারীতি গুরুত্ব
দিয়েই ছাপা হয়েছিল। দীপেন নিজের হাতে ‘বিজনের রক্তমাংস’ ফেরত দিয়ে যায়।
যদিও পরে এ ঘটনাটা নিয়ে দেবেশ রায় আমাকে বলেছিল, ‘তুমি কি করে ভাবলে দীপেন
ওই লেখা ফেরত দিল?’ পরে আমি ভেবে দেখেছি, দেবেশই ঠিক বলেছিল। কারণ তখন তো
সম্পাদক ছিলেন সত্য গুপ্ত, যিনি পরবর্তীকালে এমএল পার্টিতে যোগ দেন। দীপেন
সত্যবাবুর বাতিল করে দেওয়া লেখাটা কেবলমাত্র আমার হাতে তুলে দিতে এসেছিল।
পরবর্তীকালে ‘বিজনের রক্তমাংস’ যখন ছাপা হয় তখন দীপেন ভূয়সী প্রশংসা
করেছিল। ওই সময়েই তো ‘অশ্বমেধের ঘোড়া’ ছাপা হল। আউট-স্ট্যান্ডিং স্টোরি!
ওইরকম গল্প হয়তো আর লেখা হবে না। হয়ওনি।
‘কৃত্তিবাস’-এর সূত্রেই শক্তির সঙ্গে আলাপ এবং শক্তির সূত্র
ধরেই ‘হাংরি জেনারেশনে’র সঙ্গে যোগাযোগ। হাংরির প্রতি এই আকর্ষণের কারণটা
কী ছিল?
প্রথম কথা, আমি হাংরি জেনারেশনের লেখক নই। যদিও বুলেটিনে হয়তো একবার ২/৪
লাইন লিখেছি কিনা মনে নেই। তাতে হাংরি বলে কিছু ছিল না। যেমন, হাংরি
জেনারেশন বলে যদি কোনো আন্দোলন হয়ে থাকে তাতে যোগদান করার কোনো ব্যাপার ছিল
না। তবে মলয়রা যাদের ‘হাংরি’ লেখক বলে মনে করেছিল তাদের মধ্যে অবশ্যই আমি
একজন। জীবনানন্দ দাশও একজন। সমীর আর শক্তির প্রতি আমার বন্ধুত্ব ছিল। সেই
সূত্রেই যেটুকু। কিন্তু সব খবর রাখতামও না। একবার একটা আড্ডায় আমি প্রস্তাব
দিয়েছিলাম, তাহলে কিছু মুখোশ কিনে বিভিন্ন লোককে পাঠানো যাক। ওপর থেকে
নিচে সমস্ত স্তরের লোককেই। সে সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়ই হোক আর সাগরময় ঘোষই
হোক। ঠিক হল মুখোশে লেখা থাকবে – ‘মুখোশ খুলে ফেলুন।‘ দ্যাট ওয়াজ মাই
আইডিয়া। আর আমার আইডিয়া বলে সমীর রায়চৌধুরীর সঙ্গে গিয়ে মুখোশগুলো কিনতে
হল। এই রকম সব ঘটনা আর কি। তারপর ওরা যখন অ্যারেস্ট হল তখন আমি বিয়ে করেছি,
৬৪ সালের কথা। সত্যিকথা বলতে কি রীণারা খুবই অভিজাত পরিবারের মেয়ে। এই
যেমন ধরো ওর দাদা পাঁচটা আংটি পরে। যারা উত্তর কলকাতায় থাকে। চামড়া রক্তাভ।
তা যাইহোক, বিয়ে করে দমদমে ছোট্ট একটা ফ্ল্যাটে উঠেছি, এমন সময় একদিন
লালবাজার থেকে ডেকে পাঠালেন। আমার কিন্তু সাহস বলতে যা বোঝায়, তা হল ভীরুর
সাহস। আমাদের দলে সাহসী বললে বলতে হয় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কথা। এবং বারবার
যে ওর দিকে আকর্ষিত হই তা ওই সাহসের কাছে। আর বাকি সব ভীতুর দল। তখন তো
সুনীল এখানে নেই – আইওয়াতে। এদিকে এখানে এরা সব আন্দোলন করেই খালাস। লিখতে
যে হবে সে ধান্দা তো নেই। লেখক বলতে যা তা ওই আমি, শক্তি আর উৎপল। আর
একজনের কথা বলতে হয়, তাকে হাংরি জেনারেশনই বল আর যাই বল, সে হচ্ছে বাসুদেব
দাশগুপ্ত।
সত্যিই, আজও ‘রন্ধনশালা’র গল্পগুলো পড়লে অভিভূত হই।
ওই রকম বই ওই সময় ওই একটাই। তা, বাসুদেব তো লিখলো না। আসলে লেখাটাই
হচ্ছে প্রকৃত বিপ্লব করা আর সেটাই করে যেতে হয়। যাই হোক, হাংরি জেনারেশনের
একটা সংখ্যা বেরিয়ে গেল পাটনা থেকে যাতে খুবই অশ্লীল লেখাটেখা ছিল। সেই
পত্রিকার প্রিন্টার অ্যাণ্ড পাবলিশার হিসাবে ছিল আমার নাম।
আপনি জানতেন না?
উইদাউট মাই নলেজ – টোটালি। সেইজন্য লালবাজারে গিয়ে আমি বলেছিলাম যে, এই
সংখ্যাটা আমি ছাপিনি বা প্রকাশ করিনি। কিন্তু সাক্ষী দেওয়ার সময় মলয়কে
সম্পূর্ণভাবে ডিফেণ্ড করি। বলি, সাহিত্যের ক্ষেত্রে এইরকম এক্সপেরিমেন্ট
হয়েই থাকে। আজ যা অশ্লীল, পরে তাই শ্রেষ্ঠ সাহিত্য হয়ে দাঁড়ায়। পরে কোনো
একটা লেখায় বোধ হয় এই বিষয়টা স্বীকার করেছে সমীর রায়চৌধুরী। তবে সমীর
শক্তির বিষয়ে যেটা বলেছে সে ব্যাপারে আমি কিছু বলব না। যদি সত্যি সত্যি
ঘটনাটা ঘটে থাকে তবে তা দুঃখজনক। শক্তি যদি বলে থাকে বিষয়টা সত্যিই অশ্লীল
তা হলে যা দাঁড়াচ্ছে সেটা খুব খারাপ।
গিনসবার্গ প্রসংগে জানতে চাই।
হ্যাঁ, গিনসবার্গ। গিনসবার্গের সঙ্গে আমার খুবই ঘনিষ্টতা ছিল। বরেনরা
টাটাতে গিনসবার্গকে যখন নিয়ে গেল, সুনীল থেকে শুরু করে প্রত্যেককে আমার বেশ
পরিস্কার মনে আছে – হাওড়া স্টেশনে প্রত্যেককে আমায় বিদায় দিতে এল। একা আমি
স্টেশনে দাঁড়িয়ে রইলাম। এরকম ঘটনা জীবনে বহুবার হয়েছে। যখন আনন্দবাজারে
ঢুকে গেল শক্তি আর সুনীল, আমি একা ফুটপাতে দাঁড়িয়ে রইলাম। টাটার ঘটনায় আমি
খুব দুঃখ পেয়েছিলাম। তবুও গিনসবার্গের সঙ্গে আমার বিশেষ ঘনিষ্ঠতা হয়
বেনারসে। যেখানে আমি, গিনসবার্গ আর পিটার অরলভস্কি ছিলাম। আর কেউ ছিল না।
ওরা ওই সময় এক মাসের জন্য বেনারস, এলাহাবাদ এলাকায় ছিল। তখন রোজ দেখা হত।
মণিকর্নিকার ঘটে যেতাম। একদিনের কথা তো খুব মনে আছে। জানো তো, ওরা একটু ইয়ে
ছিল – মানে, হোমো সেক্সুয়াল ছিল আর কী। গিনসবার্গ তো পিটারের পরিচয়ই দিত
মাই ওয়াইফ বলে। একদিন আমি গিয়ে পড়ি। তখন বোধহয় ওরা ব্যস্ত ছিল। তা
গিনসবার্গ বেরিয়ে এসে সেই দরাজ অসাধারণ হাসি হেসে বলেছিল – তুমি আর আসবার
সময় পেলে না। তবে ওদের সঙ্গে খুব ভাল একটা ডিনার খেয়েছিলাম মনে পড়ে। ওরা তো
সেই সময় খুব গরিবের মতন দশাশ্বমেধ বোর্ডিং-এ মাত্র ত্রিশ টাকা ভাড়ায় থাকত।
এটা ৬২ সালের ঘটনা। পিটার একটা বাঁধাকপি কিনে আনলো। এককেজি কড়াই শুঁটি,
যার দাম ছিল তখন চারআনা। সবাই মিলে তাড়াতাড়ি ছাড়িয়ে ফেলা হল। এর সঙ্গে
অবশ্যই টমাটো আর আলুও ছিল। মাখন দিয়ে একটা ডেকচিতে বসিয়ে দিল অ্যালেন। জল
বোধহয় দেওয়াই হয় নি বা, নামমাত্র। গিনসবার্গ বলেছিল ওর থেকে যে জল বেরবে
তাতেই হবে। তবে মাখন বেশ অনেকটাই দেওয়া হয়েছিল। লেবু আর নুন। আহা, অপূর্ব
খেতে হয়েছিল। সঙ্গে ছিল দিশি মদ। বড় অদ্ভূত ভাবে সে সব সময় কেটেছে। আসলে
আমি তো বেনারসে গিয়েছিলাম মায়ের সঙ্গে, তো গিনসবার্গকে নিয়ে গেলাম আমাদের
ওখানে। মা অনেক কিছু খাওয়ালেন। গিনসবার্গ আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তুমি
এইরকম ঠাকুমার মতন মা পেলে কোত্থেকে?’ সকলেই জানেন গিনসবার্গের মা নাওমি
তুলনায় যথেষ্ট ইয়াং ছিলেন। তাঁর পিরিয়ডের উল্লেখ গিনসবার্গের কবিতায় আছে।
তুলনায় মা’র শেষ তিরিশের সন্তান আমি। এইরকম অনেক টুকরো স্মৃতি ধরা আছে।
যেমন, একবার মণিকর্ণিকার ঘাট থেকে গাঁজা খেয়ে ফিরছি হঠাৎ গিনসবার্গ ফুটপাতে
বসে থাকা একটা লোককে দেখিয়ে বলে উঠল, ‘ওই লোকটা নিশ্চই মরে গেছে। ওর
হাঁটুটা কিরকম খোলা রয়েছে দেখো। তুমি একটু হাঁটুটা ছুঁইয়ে এসো তো’। আমি
সত্যি সত্যি ছুঁলাম। ঐটুকু ছোঁয়াতেই কাঁথা কম্বল সুদ্ধ লোকটা হুড়মুড় করে
পড়ে গেল। খুবই অবাক হয়েছিলাম গিনসবার্গের সেই আশ্চর্য ক্ষমতা দেখে। যাইহোক
এরপর তো হিন্দু ইউনির্ভাসিটিতে ওর ওই লেখা পড়বার সময় আবার গোলমাল শুরু হল।
অধ্যাপকরা ওর মায়ের পিরিয়ডের জায়গায় আপত্তি করলেন, গিনসবার্গ হঠাৎ বলে উঠল
‘দেন ফাক ইওরসেলফ’। এতে তার ওপরে সব রেগে আগুন। গিনসবার্গের কলার ধরে ঘা
কতক দেয় আর কি। কিন্তু সাহেব-মারার দিন বোধহয় অনেক আগেই শেষ হয়ে গিয়েছিল।
অনেকের মধ্যস্থতায় ব্যাপারটা মিটমাট হয়। কোনমতে আমরা সে জায়গা ছেড়ে বেরিয়ে
আসি।
মিনিবুকের প্ল্যানের পেছনে কারণ কী ছিল?
হ্যাঁ, পুরোটাই আমার একেবারে নিজস্ব ভাবনা বলতে পারো। ডবল ক্রাউন ওয়ান-সিক্সটিন সাইজে ভাঁজ করে মুড়লে যা হয় সেভাবে ছাপা। আমি
ভাবলাম এর মধ্যে একটা গল্প যদি বের করা যায়। তবে এরজন্য আমাকে একটা প্রেস
খুঁজতে হয়েছিল, যে প্রেসে এই ১৬টা পাতা একসঙ্গে ‘বর্জাইস’ টাইপে ছাপা যাবে।
কারণ, একসঙ্গে না ছাপলে পড়তায় আসে না।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মিনি কবিতার বই ‘লাল রজনীগন্ধা’ নকশালরা পুড়িয়েছিল কেন?
কেন পুড়িয়েছিল তা আমি জানি না। তবে ওখানে সমস্ত কবিতাই হচ্ছে লাল কবিতা।
তখন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের যা আনন্দবাজারি ইমেজ তাতে ‘লাল কবিতা’ কেউ
বিশ্বাস করবে না, সেইজন্যই ‘লাল রজনীগন্ধা’ নাম দিয়েছিলাম। ওদের হয়তো সেটা
পছন্দ হয়নি।
এটা কি খুব যোগাযোগের মধ্যে থেকেই ঘটেছিল?
না না, ওদের কি কখনও চেনা যায়? কারা করেছিল জানি না। তবে কলেজ স্ট্রিটেই পাতিরামের স্টল থেকে কিছু কপি নিয়ে পুড়িয়েছিল।
কত ছাপা হয়েছিল ‘লাল রজনীগন্ধা’?
৫০০০। পরে ভেবে দেখলাম এভাবে তো ছবিও ছাপা যায়। তখন প্রকাশ কর্মকারের
ছবি সহ শক্তির কবিতা ছেপেছিলাম। সেটা বোধহয় এগারো হাজার ছাপা হয়েছিল।
বইমেলাতে প্রথম বেরয় পদ্ম ঘোষের কবিতার মিনিবুক। শ্যামবাজারের বিশ্বনাথ
বস্ত্রালয়েরর শাড়ির প্যাকেটে চারমিনার আর ওই মিনিবুকগুলো সাজিয়ে, গলায় চুল
বাঁধার ফিতে দিয়ে ঝুলিয়ে বিক্রি করা হয়েছিল। লেখা শ্লোগানঃ চার্মিনার অথবা
মিনিবুক। দাম ৩০ পয়সা তখন দুটোরই। এতে নিত্যপ্রিয় ঘোষ খুব আপত্তি করেছিনেল।
তখনকার নিত্যপ্রিয় ঘোষ আর কি।
আপত্তিটা কী?
‘দাদার বই এভাবে আপনারা বিক্রি করছেন’। তবে আমার নিজের ধারণা শঙ্খ ঘোষের
এ পর্যন্ত যত বই বেরিয়েছে তার মধ্যে সব থেকে দ্রুত বিক্রি হয়েছে মিনিবুক।
দ্বিতীয় সংস্করণ বইমেলার মধ্যে বেরয় এবং তাও শেষ হয়ে যায়। কোনও স্টলে দিতে
হয়নি।
শঙ্খবাবুর কোনো আপত্তি ছিল কি এই মিনিবুক ছাপার ব্যাপারে?
না, না। শঙ্খদা কোনো আপত্তি করেন নি। শঙ্খদার আপত্তি ছিল অন্য জায়গায়। সেটা হচ্ছে শঙ্খদার সেই টাই-পরা ছবি আমি প্রথম ছাপি প্রচ্ছদে।
সত্যি, এই ব্যাপারটা খুবই মজার। ছবিটা পেলেন কোথায়?
উনি তখন আইওয়া থেকে ঘুরে এসেছেন। ওখানেই বোধহয় টাই-পরা কোনো ছবি তুলেছিলেন। আর সেটাই আমি পেয়ে গিয়েছিলাম।
হাংরি আন্দোলনের তৃতীয় বছরে, ১৯৬৩ সালে সুভাষ ঘোষের সঙ্গে আমার পরিচয়
হয়েছিল কলকাতার কলেজ স্ট্রিট কফিহাউসে, পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন দেবী রায়,
“ইনি আমাদের আন্দোলনে যোগ দিতে চাইছেন, লেখা এনেছেন সঙ্গে, নিয়ে নেওয়া যাক”
। সুভাষ ঘোষের ছোট্টো গদ্যটা নিয়ে নিলুম, সেটাই হাংরি বুলেটিনে প্রকাশিত
সুভাষের একমাত্র লেখা ।
আমি তখন অফিসের কাজে তিন মাসের জন্যে কলকাতায়, থাকি ডালহাউসি স্কোয়ারে
অফিসের গেস্ট হাউসে, খাওয়া-থাকা অফিসেরই, ট্র্যাভেলিং অ্যালাউন্স যা পাই তা
দিয়ে হাংরি বুলেটিন বের করার কোনো অসুবিধা নেই । শক্তি চট্টোপাধ্যায়, যাঁর
নাম ১৯৬১-১৯৬২ সালে ‘লিডার’ হিসাবে বুলেটিনে ছাপা হয়েছে, তিনি থাকেন
উল্টোডাঙার বস্তিতে, চান না যে ওনার বাসায় কেউ যাক ।
তখন থেকেই আমাদের মরুভূমি পর্যটন আর সুভাষের উটের দুধ খাবার অভিজ্ঞতা ।
ওহ সে কতো মরুভূমি ঘুরেছি আমরা দুজনে, গেঁজিয়েছি উটের পচে যাওয়া দুধের গ্যাঁজলার মতন ।
সাহারা মরুভূমিতে, আলজেরিয়া চাদ, মিশর এরিট্রিয়া, মালি, মরিট্যানিয়া,
মরোক্কো, নিজের, সুদান, টিউনিশিয়া । হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত হয়ে গেছে সুভাষ,
বলেছে, “আমি বাড়ি যাবো।”
কতো বেবুন হুপহুপিয়ে চলে গেছে পাশ কাটিয়ে, শুঁড় উঁচিয়ে হাতির সাঙ্গো-পাঙ্গো । চশমাচোখে জংলি কালোগাধা ।
তারপর আরব মরুভূমিতে, ইরাক, জর্ডান, কুয়েত, ওমান, কাতার, সউদি আরব । হাঁটতে-হাঁটতে ক্লান্ত হয়ে গেছে সুভাষ, বলেছে, “আমি বাড়ি যাবো।”
কতো নীলগুবরে, আরমাডিলো, কালোপা বেড়াল, বোয়া সাপ, লুকিয়ে পড়েছে, সুযোগ পেলে বেরোবার ইচ্ছায় ।
তারপর গোবি মরুভূমিতে, চিন আর মোঙ্গোলিয়ায় । হাঁটতে-হাঁটতে ক্লান্ত সুভাষ বলেছে, “আমি বাড়ি যাবো।”
কতো বাদামি ঘোঁতঘোতে ভাল্লুক বুদ্ধিজীবি, বাস্টার্ড পাখি, কারাকাল বেড়াল থপথপিয়ে চলে গেছে কলেজস্ট্রিট দিয়ে ।
তারপর, কালাহারি মরুভূমিতে অ্যাঙ্গোলা, বোৎসওয়ানা, নামিবিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা । হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত সুভাষ বলেছে, “আমি বাড়ি যাবো।”
কতো তেঁতুলে বিছে, দৌড়বীর চিতা, কৌগার সিংহ, নাল ফেলতে-ফেলতে আড়চোখে দেখে এগিয়েছে।
তারপর পাতাগোনিয়া মরুভূমিতে, আরজেনটিনা আর চিলে । হাঁটতে-হাঁটতে ক্লান্ত সুভাষ বলেছে, “আমি বাড়ি যাবো।”
কতো সজারু কাঁটা উঁচিয়ে পালিয়েছে সেন্ট্রাল অ্যাভেনিউ কফিহাউসে ।
তারপর ভিক্টোরিয়া মরুভূমিতে অস্ট্রেলিয়ায় । হাঁটতে-হাঁটতে ক্লান্ত সুভাষ বলেছে, “আমি বাড়ি যাবো।”
কতো কালচে কাঙ্গারু পেটে ছুটকো কবি লুকিয়ে দু’পায়ে লাফিয়ে উধাও হয়ে গেছে ।
তারপর সিরিয়া মরুভূমিতে ইরাক জর্ডন সিরিয়ায় । হাঁটতে-হাঁটতে ক্লান্ত সুভাষ বলেছে, “আমি বাড়ি যাবো।”
কতো বাজপাখি, শেয়াল, হায়না আমাদের দেখেই ঝোপঝাড়ের আড়াল নিয়েছে ।
তারপর গ্রেট বেসিন মরুভূমিতে আমেরিকায় । হাঁটতে-হাঁটতে ক্লান্ত সুভাষ বলেছে, আমি বাড়ি যাবো।”
কতো র্যাটল সাপে ঝুমঝুমি বাজিয়ে খেলতে ডেকেছে ।
তারপর চিহুয়াহুয়া মরুভূমিতে, মেক্সিকোয় । হাঁটতে-হাঁটতে ক্লান্ত সুভাষ বলেছে, “আমি বাড়ি যাবো ।”
কতো র্যাকুন, কচ্ছপ, শকুন পোঁ-পাঁ পালিয়েছে কাঁধে ঝোলা ঝুলিয়ে ।
তারপর কারাকুম মরুভূমিতে, তুর্কমেনিস্তানে । হাঁটতে-হাঁটতে ক্লান্ত সুভাষ বলেছে, “আমি বাড়ি যাবো।”
তারপর থার মরুভূমিতে, ভারত আর পাকিস্তানে । হাঁটতে-হাঁটতে ক্লান্ত সুভাষ বলেছে, “আমি বাড়ি যাবো।”
কতো উট আর হাতি আর দিশি গাধা সেলাম ঠুকেছে ।
বললুম, এটা তো রাজস্হান, এখানের উটের দুধ বেশ মিষ্টি । শুনে সুভাষ থনে
মুখ দিয়ে চুষে-চুষে দুধ খেয়ে চাঙ্গা হল, তারপর বলল, “আমি বাড়ি যাবো।”
গণ্ডারেরা ফলো করেছে আর সুভাষের ভয় করেছে । আমি বলেছি, ভয়ের কি আছে, ও
তো বাসুদেব দাশগুপ্তের বন্ধু, “উপদ্রুত” পত্রিকার সম্পাদক, ও কি আর পুলিশের
খোচর হতে পারে ।
সুভাষ ঘোষ বলেছে, “আমি বাড়ি যাবো।”
কোথায় বাড়ি ? জানতে চাইলে, সুভাষ বলল “ভাড়া করা বাসা, টালায় ।” দুই
গেলুম টালা ব্রিজের তলায় পাশের রাস্তায় সুভাষের ভাড়া-করা বাসায়, বলল,
আরেকজনের সঙ্গে থাকে, তার নাম শৈলেশ্বর ঘোষ, সে উটের দুধ খায়নি কখনও,
দুজনেই উত্তরবঙ্গ থেকে কলকাতায় এসেছে, পড়াশুনা আর চাকরি-বাকরির ধান্দায় ।
“এষণা” নামে একটা চটি পত্রিকা দিল সুভাষ, সম্পাদক সতীন্দ্র ভৌমিক, তাতে
শৈলেশ্বের ঘোষের “তিন বিধবা গর্ভ করে শুয়ে আছি পূণ্য বিছানায়” পড়ে বললুম,
এটা ইংরেজিতে অনুবাদ করব ।
সুভাষ বলল, কালকে ও কফিহাউসে আসবে তোমায় লেখা দিতে, তখন পরিচয় হবে ।
পরের দিন শৈলেশ্বর ঘোষের কাছ থেকে লেখা নিলুম । আমার অনুবাদ করা কবিতা
আর যে কবিতা শৈলেশ্বর দিল, এই দুটিই কেবল হাংরি বুলেটিনে প্রকাশিত হয়েছিল ।
তাছাড়া আমাকে গালমন্দ করে যে চিঠি শৈলেশ্বর লিখেছিল, মুচলেকা জানাজানি
হবার পর, তা ছাপিয়ে দিয়েছিলুম নিরানব্বুই নম্বর হাংরি বুলেটিনে।
দুজনেই বলল, ওই হারাধন ধাড়াকে আন্দোলন থেকে বের করে দাও।
বললুম, ওনার নাম দেবী রায় ।
দুজনেই বলল, ও আবার লিখতে জানে নাকি, যতো সব অশিক্ষিতদের যোগাড় করেছ ।
বললুম এটা তো ইউরোপের মতন আন্দোলন নয়, কারোর বাপের সম্পত্তি নয়, যেমনটা
আঁদ্রে ব্রেতঁ পরাবাস্তববাদের ক্ষেত্রে করেছিলেন, ত্রিস্তঁ জারাকে কুচোনো
কাগজের কবিতা লেখার জন্য বের করে দিয়েছিলেন, প্রদর্শনীর আগের দিন ব্রায়ন
জিসিনের ছবি দেয়াল থেকে নামিয়ে দিয়েছিলেন । আমি অমন দাদাগিরির পক্ষে নই,
হাংরি আন্দোলনকে কৃত্তিবাসের মতন করে তোলা উচিত হবে না, যে সম্পাদক বাড়ি
বদলালে পত্রিকার সদর দপতর চলে যায় সেই বাড়িতে ।
বললুম, হাংরি আন্দোলনের কোনো হেড কোয়ার্টার, হাইকমাণ্ড, পলিট ব্যুরো নেই।
ওদের পছন্দ হল না । সুভাষ বলল, এ আবার কিরকম আন্দোলন ?
শৈলেশ্বর বলল, ওকে কেন সম্পাদক করা হয়েছে, ওর বাড়ির ঠিকানা দেয়া হয়েছে, শুনেছি ওটা একটা বস্তিবাড়ি, ওর কবিতা সম্পূর্ণ ব্যানাল ।
বুঝলুম, আগেই খবর নেয়া হয়ে গেছে দেবী রায় সম্পর্কে ।
নিজেকে নিঃশব্দে বলতে শুনলুম, এরা কেমনতর স্বার্থপর যুবক, দেবী রায় এদের
ডেকে এনেছে আন্দোলনে, আর তাকেই বের করে দিতে চাইছে, আমার সঙ্গে প্রথম
পরিচয়ের দিনেই ! দেবী রায়ের সাহায্যেই তো কলকাতায় ছড়িয়ে দিতে পেরেছি
আন্দোলনকে ।
এটা ঠিক যে আমার কিছু কাজকে শক্তি চট্টোপাধ্যায় আর দেবী রায় অনুমোদন
করেননি, যেমন মন্ত্রি-আমলা-সাংবাদিকদের “মুখোশ খুলে ফেলুন” ছাপানো
দানব-জানোয়ার-জোকারের মুখোশ পাঠানো, জুতোর বাক্স রিভিউ করতে দেয়া, শাদা
ফুলস্কেপ কাগজকে ছোটোগল্প হিসেবে জমা দেয়া, বিয়ের কার্ডে “ফাক দি
বাস্টার্ডস অফ গাঙশালিক স্কুল অফ পোয়েট্রি” ছাপিয়ে বুদ্ধিজীবিদের ডাকে
পাঠানো । বাসুদেব দাশগুপ্তকে পুলিশের খোচর পবিত্র বল্লভ এই ব্যাপারে
হুশিয়ারি দিয়ে দিয়ে দিয়েছিল বলে বাসুদেব দাশগুপ্ত প্রায় খুঁতখুঁত করতো ।
বললুম, এই আন্দোলনে যে কেউ যে-ঠিকানা থেকে ইচ্ছে নিজের লেখা প্রকাশ করতে
পারে, হাংরি জেনারেশনের বুলেটিনগুলো কোনো পত্রিকা নয়, বিক্রি করা হবে না,
স্রেফ বিলি করা হবে ।
কথা বলে বুঝলুম, দুজনেরই টাকাকড়ির টানাটানি, নিজের টাকায় বুলেটিন ছাপাতে
পারবে না । রিফিউজি ফ্যামিলি, এখনও পশ্চিমবাংলায় রিরুটিং হয়নি । মনে হল
সাহিত্য ওদের কাছে পশ্চিমবাংলায় রিরুটিঙের প্রধান উর্বর জমি ।
আন্দোলন ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বুঝলুম, ইংরেজি কবিতার সঙ্গে অ-বিদ্যায়তনিক
পরিচয় নেই, জিওফ্রে চসার পড়েনি । বিদ্যায়তনিক গ্রন্হের বাইরে তেমন পড়াশুনা
করেনা । ফিলজফি অব হিসট্রির কথা শোনেনি, অসওয়াল্ড স্পেংলারের ‘ডিক্লাইন অব
দি ওয়েস্ট’ পড়েনি । ওরা চা-বিস্কুট আনালো, মাটিতে মাদুরে বসা ছাড়া অন্য
উপায় নেই, কেননা কোনো আসবাবপত্র নেই ।
আমি বোঝাবার চেষ্টা করলুম যে ‘হাংরি’ শব্দটা আমি পেয়েছি জিওফ্রে চসারের
বাক্য ‘ইন দি সাওয়ার হাংরি টাইম’ থেকে, স্নাতক কোর্সে চসার ছিল । আর
অসওয়াল্ড স্পেংলার বলেছেন যে একটি সংস্কৃতির ইতিহাস কেবল একটি সরলরেখা
বরাবর যায় না, তা একযোগে বিভিন্ন দিকে প্রসারিত হয়, তা হল জৈবপ্রক্রিয়া, আর
তাই, ওই সমাজের নানা অংশের কার কোনদিকে বদল ঘটবে তা আগাম বলা যায় না । যখন
কেবল নিজের সৃজনক্ষমতার ওপর নির্ভর করে, তখন সংস্কৃতটি নিজেকে বিকশিত ও
সমৃদ্ধ করতে থাকে, তার নিত্যনতুন স্ফূরণ আর প্রসারণ ঘটতে থাকে । কিন্তু ওই
সংস্কৃতির অবসান সেই সময়ে আরম্ভ হয়, যখন তার নিজের সৃজনক্ষমতা ফুরিয়ে গিয়ে
তা বাইরে থেকে যা পায় তাই আত্মসাৎ করতে থাকে, খেতে থাকে, তার ক্ষুধা
তৃপ্তিহীন। দেশভাগের পর আর ফলে, পশ্চিমবাংলা এই ভয়ংকর অবসানের মুখে পড়েছে,
এবং উনিশ শতকের পর্যায়ের বাঙালির আবির্ভাব আর সম্ভব নয় । স্বদেশী আন্দোলনের
সময়ে জাতীয়তাবাদী নেতারা যে সুখী, সমৃদ্ধ, উদার, কুসংস্কারমুক্ত, উন্নত
ভারতবর্ষের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন তা টকে পচতে শুরু করেছে আমাদের
উত্তরঔপনিবেশিক কালখণ্ডে ।
আমি বোঝাবার চেষ্টা করলুম যে ইউরোপীয় সাহিত্য আন্দোলনের ‘সময়তাড়িত
চিন্তাতন্ত্র’ থেকে সম্পূর্ণ পৃথক হাংরি আন্দোলনের ‘পরিসরলব্ধ
চিন্তাতন্ত্র’ । অনেকে মিলে আন্দোলন করার উদ্দেশ্য হল সৃজনশীলতার ক্ষেত্রে
ব্যক্তিমালিকানার আধিপত্যকে গুরুত্ব না দিয়ে কৌমপরিসরকে গুরুত্ব দেয়া ।
ইউরোপীয় সাহিত্য আন্দোলনগুলো খতিয়ে যাচাই করলে দেখা যায় যে ব্যক্তিক
তত্ত্বসৌধ নির্মাণের প্রয়াস করা হয়েছে, সেখানে ব্যক্তিপ্রজ্ঞার দামামায়
সমাজের যেন কোনও গুরুত্ব নেই, তার কারণ ইউরোপ মনে করেছে সময় ব্যাপারটা
একরৈখিক । হাংরি আন্দোলনে লেখাকে আলোকিত করা হবে, লেখককে নয় ।
ওদের মুখ দেখে মনে হয়েছিল, পশ্চিমবাংলায় যে রাজনৈতিক গণ্ডোগোল চলছিল
সেসময়ে, সোভিয়েত রাষ্ট্রের কাঠামোটাই রিফিউজি যুবকদের কাছে আদর্শ ছিল, যদিও
যে হিন্দু বাঙালি কমিউনিস্ট নেতারা পূর্ববঙ্গে থাকতেন তাঁরা দেশভাগ হবার
আগেই পশ্চিমবঙ্গে পালিয়ে এসেছিলেন, আন্দামান দীপপূঞ্জকে বঙ্গভূখণ্ড হতে
দেননি ।
তারপর ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি ভেঙে গেল, নকশাল আন্দোলন হল, নকশালরাও
নানা টুকরোয় ভেঙে গেল, সব শেষে সোভিয়েট ব্যবস্হাও ভেঙে পড়ল, পূর্ব ইউরোপে
প্রাক্তন কমিউনিস্ট দেশগুলোয় ধর্মের আর জাতীয়তার লড়াইতে অজস্র মানুষ মারা
গেল, কিন্তু সুভাষের চিন্তায় ও লেখায় তার কোনো ছাপ পড়ল না, যেমন পড়েছিল
বাসুদেব দাশগুপ্ত আর সুবিমল বসাকের ফিকশানে । তিন
শক্তি চট্টোপাধ্যায় হাংরি আন্দোলন ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন, মূলত সুনীল
গঙ্গোপাধ্যায়ের চাপে এবং সংবাদপত্রের চাকরির শর্ত পূরণ করার জন্য ।
শৈলেশ্বর ঘোষ যে চারিদিকে লিখে বেড়িয়েছেন যে তাঁর ‘তিন বিধবা’ কবিতার জন্য
শক্তি হাংরি আন্দোলন ত্যাগ করেছিলেন, তা ডাহা মিথ্যা । শৈলেশ্বরের ‘তিন
বিধবা’ “এষণা” পত্রিকায় বহু আগে বেরিয়েছিল, ১৯৬৩ এপ্রিলে শৈলেশ্বর হাংরি
আন্দোলনে যোগ দেবার আগে ।
মুখোশ, কার্ড, শাদা-কাগজ, জুতোর বাক্স ইত্যাদি কাজগুলোয় আমার সঙ্গে
সুবিমল বসাকও থাকত । আমাকে কফিহাউসে না পেয়ে শক্তি চট্টোপাধ্যায় দলবল নিয়ে
কফিহাউসের সামনে সুবিমল বসাককে মারধর করার জন্য ঘিরে ধরেছিলেন, পেটানোর
জন্যে কফিহাউসের সিঁড়ির তলায় পান-সিগারেটের দোকানে লোহার রড লুকিয়ে
রেখেছিলেন । সুবিমল বসাকের চেহারা তখন ছিল কুস্তিগিরের, তার হিন্দি-বাংলা
মেশানো গালমন্দের হুংকারে শক্তি চট্টোপাধ্যায় দলবল নিয়ে পালান । আর সমর্থন
করার বদলে পালায় বাসুদেব দাশগুপ্ত, সুভাষ ঘোষ, শৈলেশ্বর ঘোষ ও সুবো আচার্য ।
সুভাষের সঙ্গে আমার ভালোই বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল, কিংবা হয়তো
আমার কাছে যে বিদেশী বইপত্র আসতো বা আমি কিনতুম, সেগুলো পড়ার জন্য
দেখনবন্ধুত্ব বজায় রেখেছিল । যদি উত্তরপাড়ার খণ্ডহরে থাকতুম, তাহলে সুভাষ
ওর অফিস থেকে চলে আসতো দক্ষিণেশ্বরে, আমরা রেস্তরাঁয় চা-টা খেয়ে বিদেশের
নতুন লেখালিখি নিয়ে গ্যাঁজাতুম, তখনও সুভাষ ঘোষ চন্দননগরে গিয়ে সিপিএমের
রক্তচন্দনের তেলক কপালে পরেনি।
হাংরি আন্দোলন মামলায় আমাকে চার্জশিট দেবার পর বন্ধুত্বে চিড় ধরা আরম্ভ
হল, কেননা চার্জশিটের সঙ্গে পুলিশ আমার বিরুদ্ধে কাঠগড়ায় যে সাক্ষীদের
তুলবে তাতে দেখলুম রাজসাক্ষী হিসেবে সুভাষ ঘোষ আর শৈলেশ্বর ঘোষের নাম ।
ওদের দেয়া মুচলেকার কপিও পুলিশ দিল সেদিন, মামলা থেকে ওদের রেহাই দিয়ে ।
আশ্চর্য যে যেদিন ওরা গ্রেপ্তার হয়েছিল, মানে ২রা সেপ্টেম্বর ১৯৬৪,
সেইদিনই হাংরি আন্দোলনের সঙ্গে সংস্রব অস্বীকার করে মুচলেকা দিয়েছিল, অথচ
তা বলেনি আমাকে, চেপে রেখেছিল, আমাকে ৩রা মে ১৯৬৫ চার্জশিট দেবার দিন
পর্যন্ত ।
সুভাষ ঘোষের মুচলেকা:-
“আমার নাম সুভাষচন্দ্র ঘোষ। গত এক বৎসর যাবত আমি কলেজ স্ট্রিট কফিহাউসে
যাতায়াত করছি। সেখানে আমার সঙ্গে একদিন হাংরি আন্দোলনের উদ্ভাবক মলয়
রায়চৌধুরীর পরিচয় হয় । সে আমার কাছ থেকে একটা লেখা চায় । হাংরি জেনারেশন
বুলেটিনের খবর আমি জানি বটে কিন্তু হাংরি আন্দোলনের যে ঠিক কী উদ্দেশ্য তা
আমি জানি না । আমি তাকে আমার একটা লেখা দিই যা দেবী রায় সম্পাদিত হাংরি
জেনারেশন পত্রিকায় প্রকাশিত হয় । আমি তা আমার রুমমেট শৈলেশ্বর ঘোষের কাছ
থেকে পাই । সে হাংরি বুলেটিনের একটা প্যাকেট পেয়েছিল। আমি এই ধরণের
আন্দোলনের সঙ্গে কখনো নিজেকে জড়াতে চাইনি, যা আমার মতে খারাপ । আমি ভাবতে
পারি না যে এরকম একটা পত্রিকায়, আমার আর্টিকেল ‘হাঁসেদের প্রতি’ প্রকাশিত
হবে । আমি হাংরি আন্দোলনের আদর্শে বিশ্বাস করি না, এর এই লেখাটা প্রকাশিত
হবার পর আমি ওদের সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন করেছি ।”
শৈলেশ্বর সেদিন থেকে সেই যে উধাও হল, কফিহাউসে আসাও বন্ধ করে দিলো, দেখা
হয়েছিল যেদিন রাজসাক্ষী হিসেবে আমার বিরুদ্ধে কাঠগড়ায় উঠলো, তারপর থেকে
শৈলেশ্বর আর ওর শিষ্যরা অবিরাম আমাকে আক্রমণ করে মিথ্যা প্রচার করে গেছে,
রাজসাক্ষী হয়েছে বলে শত্রুতাকে হাতিয়ার করে তুলেছে । প্রদীপ চৌধুরী আর সুবো
আচার্যও ওদের রাজসাক্ষী হওয়া নিয়ে কখনও মুখ খোলেনি, সুবো আচার্য বরং
গডম্যানসুলভ অভিনয় করে আমার আর আমার লেখা সম্পর্কে কটূ মন্তব্য করে গেছে ।
বাসুদেব দাশগুপ্ত ১৯৭৫ সালের পর আর লিখতে পারছিল না, কিন্তু শিবনারায়ণ
রায়ের ‘জিজ্ঞাসা’ পত্রিকায় ১৯৮৫ সালে হাংরি আন্দোলন নিয়ে আমার প্রবন্ধ
প্রকাশিত হতেই ওর কলম আমার বিরুদ্ধে সচল হয়ে উঠল, বাসুদেবের লেখালিখিও
আরেকবার আরম্ভ হল, আত্মখননের ফিকশান লেখা শুরু করল, যা সুভাষ ঘোষ করেনি
কখনও, সম্ভবত সিপিএমের চোখ রাঙানির ভয়ে, আর যা সুবিমল বসাক, পিছড়াবর্গের
হবার কারণে প্রথম থেকেই করে গেছে।
ওরা দুজন, সুভাষ আর শৈলেশ্বর, ছিল রাজসাক্ষী । আমাকে আশ্চর্য করে
তালিকায় দেখলুম পুলিশের পক্ষে সাক্ষ্য দিচ্ছেন সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, শক্তি
চট্টোপাধ্যায়, উৎপলকুমার বসু, আর বাসুদেব দাশগুপ্তর বন্ধু ‘উপদ্রুত’
পত্রিকার সম্পাদক পবিত্র বল্লভ । ‘নতুন কৃত্তিবাস’ পত্রিকার প্রথম সংখ্যায়
শরৎকুমার মুখোপাধ্যায় লিখেছেন যে সন্দীপন, শক্তি এবং উৎপলকেও মুচলেকা দিতে
হয়েছিল, কিন্তু ওনাদের মুচলেকার কপি পুলিশ আমাকে দেয়নি । ‘বাইশে শ্রাবণ’
ফিল্মে সৃজিৎ মুখোপাধ্যায় এই পবিত্র বল্লভকেই খোচর হিসেবে দেখিয়েছেন, যে
কিনা লিটল ম্যাগাজিনের সম্পাদক ।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তখনই আইওয়া পোয়েট্রি ওয়র্কশপ থেকে ফিরেছিলেন । উনি
একটি চিঠিতে অ্যালেন গিন্সবার্গকে লিখেছিলেন সবসুদ্ধ ছাব্বিশজনকে পুলিশ
জেরা করেছে । আমরা ছাড়া বাকি ছাব্বিশজনের মধ্যে কারা ছিলেন তা আর জানা গেল
না । চার সুভাষ বুঝতে পেরেছিল যে আমাদের সম্পর্কে
ভাঙন ধরেছে, স্বীকার না করলেও আমাকে সঙ্গ দিতে চাইত,
বাসুদেব-প্রদীপ-সুবো-শৈলেশ্বরের মতন পাশ থেকে বেমালুম গায়েব হয়ে যায়নি ।
মামলায় কয়েকজন গ্রেপতার হতেই প্রদীপ চৌধুরী চলে গিয়েছিল ত্রিপুরায় সুবো
আচার্যকে সঙ্গে নিয়ে । ত্রিপুরায় প্রদীপকে কলকাতা পুলিশ গ্রেপ্তার করতে
গেলে সুবো আরও ইনটিরিয়রে এক কবির বাড়িতে গিয়ে লুকোয় । ফিরে এসে ও অনুকুল
ঠাকুরের শিষ্য হয়ে যায় ।
খালাসিটোলার পাশেই গাঁজা-চরসের সরকারি দোকান ছিল, সেখান থেকে পুরিয়া
কিনে ফুঁকতে-ফুঁকতে সুভাষ আর আমি, আমরা দুজনে, চলে যেতুম কফিহাউস, আশির
দশকে আমেরিকার চাপে মাদক বেআইনি হবার ফলে দোকানটা বন্ধ হয়ে গেছে, অথচ এখন
আমেরিকায় বিভিন্ন রাজ্যে মারিহুয়ানার দোকান খোলা আরম্ভ হয়েছে ।
কফিহাউস থেকে খালাসিটোলা । অনেক সময়ে অলিমপিয়া, যা এখন অলিপাব । সুভাষের
পছব্দ ছিল সেন্ট্রাল অ্যাভেনিউতে ‘অ্যাম্বার’ নামে একটা নিরিবিলি বার ।
গ্যাঁজাবার পর সুভাষ চলে যেতো ওর আস্তানায়, আমি হয় সুবিমল বসাকের জ্যাঠার
স্যাকরার দোকানে, নয়তো পিসেমশায়ের বাড়ি আহিরিটোলায়, নয়তো হিন্দি জ্ঞানোদয়
পত্রিকার সম্পাদক শরদ দেওড়ার ব্যাবসার গদিতে, যেখানে বাইরের ব্যাবসাদাররাও
রাতে শুতে আসত । সুভাষকে আমি কখনও প্যান্ট-শার্ট পরতে দেখিনি, সব সময় শাদা
পাঞ্জাবি আর শার্ট, গেরুয়া পাঞ্জাবিও নয়, যা তখন আঁতেলরা পরে কফিহাউসে আসতো
।
আমি বাসুদেব দাশগুপ্ত আর সুভাষ ঘোষ দুজনেরই ফোটো নিয়ে কোলাঝ তৈরি
করেছিলুম । সুভাষ বলেছিল, “তুমি পারশিয়ালিটি করছ, বাসুদেবের কোলাঝটা আমার
হবার কথা ছিল, আমি কপালে বিকৃত শিশুর লিঙ্গ নিয়ে জন্মেছি।” বাসুদেবের
কোলাঝটা বাসুদেব যত্ন করে রেখেছিল, সুভাষ ওর কোলাঝটা কি করল জানি না । দুটো
কোলাঝের ব্লক পাটনাতেই করিয়েছিলুম ; কলকাতা পুলিশ যখন পাটনায় আমাকে
গ্রেপ্তার করতে গিয়েছিল তখন ব্লকের দপতরে ঢুঁ মেরেছিল । ‘আর্তনাদ’ নামে যে
পত্রিকা সুভাষরা প্রকাশ করেছিল তার ব্লকও আমার তৈরি করা ।
মামলার সময় কলকাতায় যেখানেই রাতে থাকতুম, সব জায়গাতেই আমার সমস্যা ছিল
সকালে হাগবার আর স্নান করার । সুবিমলের জ্যাঠার স্যাকরার দোকানে রাতে শুলে
চলে যেতুম শেয়ালদায় টয়লেটে কিংবা দাঁড়িয়ে-থাকা দূরপাল্লার ট্রেনে, স্নান
করা ব্যাপারটা পনেরো দিনে একদিনে ঠেকেছিল, কলগুলো এতো নিচু যে তার তলায়
হামাগুড়ি দিয়ে স্নান করতে হতো । সুভাষ কখনও বলেনি যে ওর আস্তানায় গিয়ে রাত
কাটাই । সুবিমল ওর বেলঘরিয়ার বাড়ি তৈরি করেছে তার চল্লিশ বছর পর ।
সুভাষ ঘোষ ‘ক্ষুধার্ত প্রতিরোধ’ নামে একটা পত্রিকা প্রকাশের তোড়জোড়
আরম্ভ করলে, আমার লেখা চায়নি, আর সেই সঙ্গে অন্য সবাইকে বাদ দেবারও কারবার
আরম্ভ করে দিয়েছিল । ব্যাপারটা অদ্ভুত, কেননা একদিকে মানবতার জয়গানের ঢাক
পেটাচ্ছে, আরেকদিকে বাদ দিয়ে দিচ্ছে বন্ধুদের । নিম্নবর্গের লেখকদের
আধুনিকতাবাদীরা বাদ দেবার রেওয়াজ আরম্ভ করেছিলেন বলেই আমি খুঁজেপেতে হারাধন
ধাড়াকে আন্দোলনে এনেছিলুম, নয়তো আমি আর দাদা যে পরিকল্পনা করেছিলুম, ১৯৬০
সালেই আন্দোলন আরম্ভ করে দিতুম । হাংরি আন্দোলনের সবাইকে যাতে একসঙ্গে একটা
পত্রিকায় আনা যায়, তাই আমি ‘জেব্রা’ নামে একটা পত্রিকা প্রকাশ করার তোড়জোড়
করছিলুম, কিন্তু পারস্পরিক অবনিবনার দরুণ দুটো সংখ্যা বের করে বন্ধ করে
দিতে হয়।
সুভাষ ২২ মে ১৯৬৫ চিঠিতে দেবী রায় সম্পর্কে লিখেছে :
“হ্যাঁ, যা বলছিলাম —ক্ষু.প্র.তে হারাধনের বইয়ের বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছে বলে ওর লেখা জেব্রাতেও
ছাপা হবে — এরকম কথা আছে নাকি ? কই তোমার সঙ্গে দেখা হল যখন এরকম বললে না তো—
এই তোমার দোষ — আমি তখন হারাধনের লেখা গুণগত যোগ্যতা না থাকায় ছাপতে বারণ
করেছিলাম তোমাকে — গুণও বড়ো কথা নয় — আসল কথা দেবী রায়ের ক্লিক + এক্সপ্লয়টেশন +
নোংরামি ।
আসলে ওর লেখা ক্ষু প্র-তে ছাপা হচ্ছে না যখন জানল তখন মরিয়া আর কি— আর তো…হেঁ হেঁ।
তুমি তখন জিগ্যেস করলেও আমি পরিষ্কার করতাম সব — ফলে তুমি জেব্রা থেকে ওর লেখা
withdraw করে নাও । ওর নাকি সব বিদেশি নাঙরা ১০০০-১০০০ পৃষ্ঠার প্রশংসা পাঠিয়েছে —
ওই নিয়ে থাকুক ও — OK. ভালোবাসা নিও । সুভাষ ।
দেবী রায়ের ওপর সুভাষ-শৈলেশ্বরের ক্রোধের কারণ হল, ওদের দুজনের জেরার
সময়ে লালবাজারে দেবী রায় উপস্হিত ছিল । আমাকে যখন চার্জশিট দেওয়া হল, তখন
দেবী রায়ও ছাড়া পেয়ে গিয়েছিল, সকলেই জেনে গিয়েছিল যে দেবী রায় মুচলেকা
দেয়নি, অথচ ওকে পুলিশ ইচ্ছে করলেই রাজসাক্ষী হবার জন্যে চাপ দিতে পারতো ।
দেবীর ১৭ মে’র এই চিঠিটা থেকে স্পষ্ট যে লালবাজারে কী ঘটেছিল :
শোনো মলয়, কে আমার সঙ্গে কীরকম ব্যবহার করেছিল, আমি ভুলিনি । লালবাজারে টেবিল ঠুকে
অনিল ব্যানার্জি বলেছে হেড কোয়ার্টার কোথায় — হোঃ হোঃ, শৈলেশ্বর বলেছিল, “আজ্ঞে পাটনায়” ।
তোমার খবর কী ? আমার ওলড ফুল নামটা ব্যবহার করেছ — যা অতীতের তা যেতে দাও ।
খালসিটোলায় সুভাষের কলার চেপে ধরতে বলে ওঠে, “প্রণবদা, দেখুন না, এঁরা কী করছেন আমাকে,
একটা পান খাওয়ান না । হাঃ হাঃ, আরে সবই জানি । নিজেদের কবিতার স্বপক্ষে একটা প্রবন্ধ লিখেছি।
দেবী রায় ।
ত্রিদিব মিত্র আর ওর বন্ধুনি আলো মিত্রকেও বাদ দেবার ষড়যন্ত্র চলছিল,
শেষ পর্যন্ত ওদের দুজনকে তো বটেই, সুবিমল বসাক, শম্ভু রক্ষিত, তপন দাশ,
অজিতকুমার ভৌমিক, করুণানিধান মুখোপাধ্যায়, রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় আর অনিল
করঞ্জাইকেও আমার সঙ্গে বাদ দিয়ে দেয়া হয়েছিল । বাদ দেবার ষড়যন্ত্রের কারণে
দেবী আর সুবিমল ছাড়া সকলেই লেখালিখি ছেড়ে দিলে, ত্রিদিব আর আলো ‘উন্মার্গ’
আর The Waste Paper সম্পাদনা করতো, তাও বন্ধ হয়ে গেল, শম্ভু রক্ষিত ‘ব্লুজ’
পত্রিকা বন্ধ করে দিলো । ত্রিদিবের ১৭ জুলাইয়ের চিঠি থেকে আঁচ পাওয়া যাবে ;
সুবো আচার্য বিষ্ণুপুর থেকে কলকাতায় এসে থাকতো ত্রিদিবের বাড়ি, কিন্তু আজ
পর্যন্ত কৃতজ্ঞতা স্বীকার করেনি :
ডিয়ার মলয়, পোস্টকার্ড পেয়েছ সম্ভবত । শুক্রবার পাঞ্জাব মেলে চাপছি । সুবিমলের সঙ্গে গতকাল
হাওড়া স্টেশানে দেখা, সন্ধ্যাবেলা । ট্রেন ধরতে না পারায় সোমবার রাত্তিরে সিদ্ধি চলেছিল ।
সুভাষ ইদানিং নতুন সাকরেদ যোগাড় করেছে, কফিহাউস থেকে বা কফিহাউসে এনে । গদ্য ও কবিতার
উপর, হাংরিদের, অমিতাভ দাশগুপ্ত ও মোহিত চট্টোপাধ্যায়ের দুটো প্রবন্ধ ক্ষু.প্র.তে থাকছে। সে ব্যাপারে
উভয় ঘোষবাবু ও দাশগুপ্তবাবু, দাশগুপ্ত ও চাটুজ্জেবাবুর বাড়িতে ঘনঘন যাতায়াত, পাঞ্চিং, লিঞ্চিং
ইত্যাদি ব্যাপারে বড়োই ব্যস্ত । সুভাষ প্রচার করত, ১৯৬০ সালে তুমি নাকি সুবোকে তুলে এনেছো !
AVANT GARDE আদ্যন্ত পড়েও খুঁজে পেলাম না । তাছাড়া এইচ জি প্রথম বেরোয় ১৯৬১-এর শেষে
আর সুবোর লেখা গোলমাল HG-তে ১৯৬৩ সালে, তখন আমার বাসায় থাকত ।
সুভাষ ক্ষু.প্র.র জন্য এক পৃষ্ঠার লেখা চেয়েছিল । এবং আমিও ‘উন্মার্গের জন্য সুভাষের । কিন্তু
সুভাষবাবু এত ব্যস্ত কিংবা……ত্রিদিব
হাংরি আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের মুচলেকা দেয়া নিয়ে ‘জিজ্ঞাসা’ পত্রিকার
কার্তিক-পৌষ ১৩৯১ সংখ্যায় তাঁর সম্পাদকীয়তে শিবনারায়ণ রায়, যিনি
সন্তোষকুমার ঘোষ এবং আবু সয়ীদ আইয়ুব-এর ভূমিকার কথা জানতেন না, লিখেছিলেন :
“যেটি আমার কাছে সবচাইতে গ্লানিকর মনে হয়েছে সেটি পুলিশের মূঢ়, অতিনৈতিক জুলুমবাজি নয়,
সেটি হল প্রথম ধাক্কাতেই বিদ্রোহী লেখকদের হার মানা । মকদ্দমা শেষ পর্যন্ত হয়েছিল মলয়ের
বিরুদ্ধে ; তাঁর বেশির ভাগ সাহিত্যিক সহকর্মীই হাংরি আন্দোলনের সঙ্গে নিজেদের সম্পর্ক পুলিশের
কাছে অস্বীকার করেন । শহিদ হওয়া শিল্পীদের দায়িত্ব নয় ; কিন্তু আত্মমর্যাদাবোধ এবং বিপন্ন বন্ধুর
প্রতি আনুগত্য না-থাকলে কোনও আন্দোলনই শক্তি অর্জন করতে পারে না । শিল্পকৃতির জন্য
আন্দোলন জরুরি নয় ; শিল্পী ও ভাবুকদের মধ্যে অনেকেই নির্জনে বসে সাধনা করবার পক্ষপাতী ।
কিন্তু কোনও আন্দোলন — শিল্পসাহিত্যের ক্ষেত্রে হোক, আর জীবনের অন্য বিন্যাসেই হোক —
প্রভাব ফেলতে পারে না, যদি না সেই আন্দোলনে যাঁরা অ২শভাক তাঁরা সৎ, নীতিনিষ্ঠ, এবং পরস্পরের
কাছে নির্ভরযোগ্য প্রমাণিত হন । যেমন উৎসবে ব্যাসনে তেমনি দুর্ভিক্ষে, রাষ্ট্রবিপ্লবে, রাজদ্বারে এবং
শ্মশানে যে পাশে থাকে সেই তো বন্ধু “। পাঁচ
সুভাষ ঘোষের সঙ্গে আমার সম্পর্ক ব্যাংকশাল কোর্টে সাজা ঘোষণার পরও আমি
বজায় রাখার চেষ্টা করে গেছি, বহু বই পড়িয়েছি, যেমন লেনি ব্রুসের ‘হাউ টু টক
ডার্টি অ্যাণ্ড ইনফ্লুয়েন্স পিপল’, উলিয়াম বারোজের ‘নেকেড লাঞ্চ’, অ্যালেন
গিন্সবার্গের ‘হাউল’ আর ‘ক্যাডিশ’, ‘আঁতোয়াঁ আর্তো অ্যানথোলজি’, মাকি দি
সাদের ‘ফিলোজফি ইন দি বেডরুম’, ফ্রাঁসোয়া র্যাবেলের ‘গার্গাতুয়াঁ অ্যান্ড
পাঁতাগ্রুয়েল’, জঁ জেনের ‘আওয়ার লেডি অফ দি ফ্লাওয়ার্স’, অঁরি শারিয়েরের
‘পাপিলঁ’, মিগেল সেরভানতেসের ‘ডন কিয়োতে’, আর অগুনতি পত্রপত্রিকা যেগুলো
ইউরোপ-আমেরিকা থেকে পেতুম । বাসুদেব দাশগুপ্তকেও পড়িয়েছি বইগুলো । ২৮
ডিসেম্বর ১৯৬৫ ব্যাংকশাল কোর্টে আমার এক মাসের জেল অনাদায়ে দুশো টাকা
জরিমানার সাজা হয়েছিল । সম্পর্ক যে ভালো রাখার চেষ্টা করেছিলুম, ‘জেব্রা’
প্রকাশ করার চেষ্টা করছিলুম, তা সুভাষ ঘোষের ২২ নভেম্বর ১৯৬৬ এই চিঠি থেকে
স্পষ্ট :
প্রিয় মলয়
প্লিজ তুমি আমার ওই লেখাটা প্রেসে দিও না, তাহলে মারা পড়ে যাব মাইরি । আমি দেড় ফরমার লেখা
পরশু নাগাদ পাঠিয়ে দিচ্ছি — ‘যুদ্ধে আমার তৃতীয় ফ্রন্ট’ — এটা যদি না ছাপো, একদম বসে যাব শালা,
তুমি তো বলেছিলে ডিসেম্বরে প্রেসে দেবে — দরকার হলে তোমার সম্পাদকের জমিতেও জায়গা দিও
ভাই।
আমার দুটো ফোটো পাঠাব, ছাপিয়ে দিও প্লিজ । বড়ো ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছি । শালা তোমার রেজিমেন্ট দুর্বল
হলে দরকার মতো রাইফেল ধরবে কে — এলে তোমায় পেট ভরে ভদকা খাওয়াব মাইরি — আমি
কিছু দিন অসুস্হ — ডাক্তার বলেছে মদ্যপানজনিত পেটখারাপ অথবা গ্যাসট্রাইটিস । চিঠি পেয়ে সঙ্গে
সঙ্গে লিখো প্লিজ ।
সুভাষ
তাহলে কী এমন হল যে সুভাষ ঘোষও ক্রমশ এড়িয়ে যেতে লাগল ? বাসুদেব
দাশগুপ্ত সংখ্যা ‘বাঘের বাচ্চা’ ( জানুয়ারি ২০১৬ ) পত্রিকায় সুভাষের স্ত্রী
কণক ঘোষের দেয়া সাক্ষাৎকারে এর হদিশ মেলে । কণক ঘোষ বলেছেন, “পাঁচজন
উদ্বাস্তু যুবক দ্বিতীয় পর্যায়ের হাংরি জেনারেশন সাহিত্য আন্দোলন শুরু
করেছিল।” এনারা সেই পাঁচজন উদ্বাস্তু যুবক : সুভাষ ঘোষ, শৈলেশ্বর ঘোষ,
বাসুদেব দাশগুপ্ত, প্রদীপ চৌধুরী এবং সুবো আচার্য । অর্থাৎ অন্যন্যদের বাদ
দেবার জন্য যে মানদণ্ডে সুভাষ নিজেকে সোপর্দ করে ফেলল, তাহল “উদ্বাস্তু
হওয়া ভালো, গরিব হওয়া ভালো, সর্বহারা হওয়া ভালো, ইংরেজি না শেখা ভালো,
কমপিউটার না শেখা ভালো ইত্যাদি ইত্যাদি।” এই মানদণ্ডে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত
হয়েছে সুভাষ ঘোষ ।
সেই সময় থেকে সিপিএমের লুমপেনরা পশ্চিমবঙ্গকে ক্রমশ টেনে নামিয়ে
অরাজকতার প্রসার ঘটিয়ে যাচ্ছিল, মার্কসবাদের প্রয়োগের জায়গায় দেখা দিয়েছেল
মারোয়াড়ি দোহন-পোষণ, সুভাষ কেন তখন আত্মসমীক্ষা আর আত্মখনন করল না ?
বাসুদেব দাশগুপ্ত নিজের লেখা বন্ধ করে সেসময়ে অবজার্ভ করে চলেছে
পশ্চিমবঙ্গের সমাজকে আর মার্কসবাদের প্রায়োগিক দৌরাত্ম্যকে, যা পরে ফুটে
উঠবে বাসুদেবের অসাধারণ লেখাগুলোয়। ‘দন্দশূক’ পত্রিকায় বাসুদেব দাশগুপ্তের
সঙ্গে মার্কসবাদ নিয়ে তর্কাতর্কি করার সময়েও সুভাষের মগজের চোখ বন্ধ ছিল ।
লেখকের যে একাকীত্ব প্রয়োজন, তার জন্য সময় কি সুভাষের থাকতো ? কলকাতায়
গিয়ে চাটুকারদের সঙ্গে আড্ডা, খালাসিটোলায় মদ খাওয়া, চন্দননগরে ফিরে
পার্টিবাজি । কখন থাকতো সময়, একলা বসে ভাবার?
সুভাষের চরিত্রে আর আচরণে মধ্যবিত্ত মূল্যবোধকে বজায় রাখার স্পেস ছিল,
সেটা দেখেছি সোনাগাছিতে । ডেভিড গারসিয়া নামে একজন হিপি বাঙালি মেয়ের সঙ্গে
প্রেম করতে চাইছিল বলে ওকে নিয়ে আমি, সুভাষ, বাসুদেব, সুবিমল, শৈলেশ্বর
গিয়েছিলুম সোনাগাছিতে বেবি নামে এক যুবতীর ঘরে । সকলে বেবিকে টেপাটিপি
করলেও, বাসুদেব চুমু খেলেও, সুভাষ মেয়েটির গায়ে হাত দেয়নি । পরে একদিন
দুপুরে আরেকজন পৃথুলা-ফর্সা যুবতীর কাছে গেলে সে সকলের সঙ্গে এক-এক করে
সেক্স করতে রাজি হয়ে যায় । সুভাষ ঘরে ঢুকেই বেরিয়ে এসে বলেছিল, “শালা
দাঁড়ালোই না।” আমার মনে হয় সুভাষ সম্ভবত সেক্স করতে চায়নি, মধ্যবিত্ত
মূল্যবোধ ওকে বাধা দিয়েছিল ।
‘আমার চাবি’ লেখার পর সুভাষ শুধু অন্যের গোলমেলে ব্যাপারের খেয়াল রাখল,
নিজের নয় । হয়তো এর জন্যে সুভাষকে ঘিরে থাকা তরুণ লেখক-চাটুকারদের অবদান
আছে, যখন কিনা বাসুদেব দাশগুপ্ত চাটুকারদের অ্যাভয়েড করে বরং সোনাগাছিতে
বেবি-দীপ্তি-মীরার সঙ্গে সময় কাটানোকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছে। বাসুদেবের
ফিকশান নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, অথচ সুভাষের লেখা নিয়ে কেন হচ্ছে না, তাও ভেবে
দেখা দরকার মনে করেনি সুভাষ । এখানে তিন অংশে লেখা সুভাষের একটা লেখা তুলে
দিচ্ছি, পড়লেই বোঝা যায় যে এটা বাসুদেব দাশগুপ্ত বা সুবিমল বসাকের মতন
আত্মসমীক্ষা-আত্মখনন নয়, বরং ‘অন্যেরা কী করছে’ তা নিয়ে লেখকের হিংসুটে
উদ্গার । আমার মনে হয় এই রচনা বাসুদেব দাশগুপ্ত বা সুবিমল বসাক লিখলে
নিজেকেই জলাতঙ্ক আক্রান্ত মনে করতো : ১)একভীতুরগল্প
অনেকেই আমাকে ভীতু বলে—
আমি কখনও মেনেও নিই—
কামরোগ আমার ভয়
নামরোগ আমার ভয়
‘আমি’ রোগ ভয় আমার — ক্ষমতা রোগ
কামে অবশ রোগী এড়িয়ে যাই —
নামে অবশ রোগী এড়িয়ে যাই—
আমিতে বশীভূত রোগী এড়িয়ে যাই–
বোসে বোসে রোগসুখ
উপভোগ করবো — সে উপায় নাই —
আমার ফ্রেঞ্চ লিভ নাই–
ক্যাজুয়াল লিভ নাই ২) সিনথেটিকবীরেরগল্প
অনেকেই আমাকে ভীতু বলে—
আমি কখনো মেনেও নিই—
বীর আর মহাবীর সেই কবে ঢুকে গ্যাছে বীরগাথায়—
নায়ক/মহানায়ক সেই কবে ঢুকে গেছে মহাকাব্যে —
মাঘ নিশীথে এই
বীর আর মহাবীর বীরগাথায়
ঘুম যায় — নাক ডাকে
মাঘ নিশীথে
নায়ক মহানায়ক মহাকাব্যে
নাক ডাকে — ঘুম যায়
আজ বীরের আদলে
যে চোস্ত বীর — সিনথেটিক বীর আমাকে
ভীতু বলে — আমি বলি তাকে
পেন্নাম জনাব !
আদপ জনাব !!
নায়কের আদলে যেসব
সিনথেটিক চোস্ত নায়ক আমাকে
ভীতু বলে — আমি বলি তাকে
আদপ জনাব !
পেন্নাম জনাব !!
সিনথেটিক বীরগণ
ক্যাকটাস শুঁকতে-শুঁকতে — শুঁকতে শুঁকতে
কিচেনগার্ডেনে ঢুকে যায়
আমি গ্যাঁটের পয়সা গুণতে-গুণতে — গুণতে গুণতে
মাতালের টোলায় — খালাসিটোলায়
ঢুকে যাই ৩ ) জলাতঙ্ক
কতকত রকমের আতঙ্ক
প্লেগ আতঙ্ক—
দাঁতাল আতঙ্ক—
স্টোনম্যান আতঙ্ক—
জলাতঙ্ক—
জলাতঙ্ক হলে কুকুরের লালা ঝরে — জিব থেকে, জলাতঙ্ক রোগে আক্রান্ত কুকুরের জিব থেকে ঝরে লালা—
অবিরল লালা ঝরে —
লালা ঝরে — লালা ঝরে —
ঝরে লালা—
লালা ঝরা একটা উপসর্গ — সিমটম — উপসর্গ ওই দেখা দিলে বুঝতে হয় ওই
কুকুরের জলাতঙ্ক হয়েছে — জলাতঙ্কে কুকুর পাগল ক্ষ্যাপা ঘেয়ো হয় — ঘেয়ো
কুকুর ওই অন্য কুকুরকে কামড়ে দিলেও সে-ও হয় পাগল ঘেয়ো ক্ষ্যাপা — জলাতঙ্ক
রোগে আক্রান্ত সে — তার জিব থেকে তখন লালা ঝরে —
লালা ঝরে — লালা ঝরে — লালা ঝরে —
লালা ঝরা একটা সিমটম—
জলাতঙ্কের
কোনোকোনো মানুষের জিব থেকেও ঝরে লালা — অবিরল/অনর্গল জিব থেকে ঝরে — ওই
ঝরিত লালা ফলো করে কোনো লোক বলতেই পারে মানুষটার জলাতঙ্ক হয়েছে — যদি
জলাতঙ্ক না হয় তাহলে বলে লোক — ওই জিব থেকে লালা ঝরা উপসর্গ ধরে মানুষটার
অন্য রোগের কথা—
বলে
মানুষটার কামরোগ হয়েছে—
নামরোগ হয়েছে—
আমি রোগ হয়েছে—
নামরোগ — কামরোগ — আমি রোগ মানুষের
কুকুরের নয়
কুকুরের শুধু ঝরা লালা থেকে চিহ্ণিত জলাতঙ্ক রোগ —
মানুষের নামরোগ কামরোগ জলাতঙ্ক রোগ —
মজা এই জলাতঙ্ক কুকুর থেকে অন্য কুকুর নিজেকে আলাদা
করতে পারে না — মানুষ পারে —
জলাতঙ্ক রোগী থেকে মানুষ নিজেকে আলাদা করতে পারে — চাইলে
ঘেয়ো রোগী কামরোগী নামরোগী আমি রোগী থেকে মানুষ নিজেকে আলাদা করতে পারে অথবা পারে না–
কলকাতায় আসার পর ১৯৯৬ সালে আমি সুভাষের চন্দননগরের বাড়িতে গিয়েছিলুম ।
দেখলুম মিছিলে সিপিএমের স্লোগান দিয়ে ভিড়ের সঙ্গে হাঁটছে, দোরে সিপিএমের
ঝাণ্ডা উড়ছে, বারান্দায় গোছা-গোছা সিপিএমের ঝাণ্ডা আর গণশক্তি । যাতে লোকে
সদর দিয়ে ঢুকেই দেখতে পায় তাই দেয়ালে জ্যোতি বসুর ফোটো ঝোলানো ।
প্রতিষ্ঠানবিরোধীর অভাবনীয় ভোলবদল, সরকারের বিরুদ্ধে ছাড়া তাহলে আর কার
বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলছে সুভাষ !
আমার “ডুবজলে যেটুকু প্রশ্বাস” উপন্যাস যোগাড় করে পড়ে থাকবে, তার সূত্র
ধরে সৈয়দ মুস্তফা সিরাজকে আক্রমণ করে বসল, কেননা সিরাজ একটা চিঠিতে আমাকে
লিখেছিলেন যে উপন্যাসটা পোস্টমডার্ন ; চিঠিটা “হাওয়া৪৯” পত্রিকায় প্রকাশ
করা হয়েছিল ।
সুবিমল বসাকের ফিকশান “ছাতামাথা” যখন প্রকাশিত হয়েছিল, তখনও তার
বিরুদ্ধেও নানা কথা বলা আরম্ভ করেছিল সুভাষ, অথচ কলেজ স্ট্রিটের মেস ছাড়ার
পর সুবিমলের আস্তানায় ছিল অতিথি হয়ে । বাসুদেবের গদ্যের হরাইজন্টাল
সপ্লিটিং আর সুবিমল বসাকের ভার্টিকাল সপ্লিটিং ধরতে পারেনি সুভাষ, ওকে এতো
বইপত্র পড়ানো সত্বেও । আমি ওর চন্দননগরের বাড়িতে গেলেও সুভাষ কিন্তু আমার
সঙ্গে যোগাযোগ করতে চায়নি, ফোন করেনি বা আমার নাকতলার ফ্ল্যাটে আসেনি ।
চন্দননগরে যাবার পর সুভাষকে সিপিএমের স্হানীয় কর্তাদের সঙ্গে সময় কাটাতে
হতো বলে মনে করি, হয়তো মোহোল্লা কমিটির সদস্যও ছিল । পার্টি অফিসে গিয়ে
সময় নষ্ট করতে হতো, যাদের সদস্যরা প্রায় সকলেই যে সাহিত্য-জ্ঞানহীন তা
প্রকট হয়ে পড়ছিল দলটার কাজকারবারে ।
তৃণমূল আসার পর চন্দননগরের লুমপেনরা নিশ্চয়ই নতুন দলে চলে গেছে । ভয়াবহ
পরিবেশে সুভাষ কী করত জানি না । হয়তো যে একাকীত্বের একান্তই প্রয়োজন ছিল তা
সুভাষ পেতো।
উটের গ্রীবার মতো কোনো এক নিস্তব্ধতা এসে গ্রাস করে ফেলেছিল সুভাষ ঘোষকে ।
( সুবো আচার্য ছিলেন হাংরি আন্দোলনকারী । তাঁর বিরুদ্ধেও গ্রেপতারি পরোয়ানা ছিল । কিন্তু তিনি সেসময়ে ত্রিপুরার একটি গ্রামে গিয়ে গা ঢাকা দেন। পরে পুলিশ কেবল মলয় রায়চৌধুরীর বিরুদ্ধে মামলা করেছে শুনে সুবো আচার্য ত্রিপুরা থেকে ফেরেন, এবং দেওঘরে গিয়ে অনুকূল ঠাকুরের শিষ্যত্ব নিয়ে সাহিত্যজগত থেকে উধাও হয়ে যান । স্টেট ব্যাংকের চিফ ম্যানেজার হিসাবে অবসর নেবার পর কলকাতায় ফিরলে 'চন্দ্রগ্রহণ' পত্রিকার সম্পাদক প্রণবকুমার চট্টোপাধ্যায় তাঁকে খুঁজে বের করে এই সাক্ষাৎকারটি নেন । আগ্রহীরা পড়ে সুবো আচার্যের পলায়ন ও পুনরাবির্ভাব ও নির্বাণের গল্প পাবেন সাক্ষাৎকারটিতে । 'চন্দ্রগ্রহণ' পত্রিকা, বসন্ত সংখ্যা, ২০১৪, ৭ বরদাকান্ত রোড, দমদম, কলকাতা ৭০০ ০৩০, মুঠোফোন : ৯৮৩১৬৭৯৩৭৭ ) প্রশ্ন : আপনার সম্পর্কে আমরা কিছুই জানি না । হাংরি আন্দোলন মামলায় যাঁরা রাজসাক্ষী হয়েছিলেন, তাঁদের মুচলেকা থেকে তাঁদের পারিবারিক তথ্য পাওয়া যায় । আপনি যদি আপনার জন্ম, বাবা-মা, পরিবার, বাল্যকাল নিয়ে কিছু বলেন তাহলে ভালো হয় । উত্তর: আর দশটা বাঙালি মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেরা যেভাবে মানুষ হয়, আমিও সেভাবেই মানুষ হয়েছি -- খুব অল্প বয়সেই, দেশভাগের সামান্য আগে আমরা বাঁকুড়ায় চলে আসি --- সেখানেই আমার বড়ো হওয়া --- স্কুল-কলেজের পরে কলকাতায় এসে পড়াশুনো -- প্রথমে প্রেসিডেন্সি কলেজের মাধ্যমে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ( ড. হরপ্রসাদ মিত্রের সৌজন্যে ) কিন্তু অল্প কিছুদিন পরেই যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে তুলনামূলক সাহিত্যের পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ক্লাসে ভর্তি হই -- পরে এমন সব ঘটনা ঘটতে থাকে, যে একসময় আমি বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে চলে আসি আমার তখনকার বন্ধু প্রদীপ চৌধুরীর সঙ্গে -- মূল কারণ ছিল কবিতা লেখা ও জীবনকে দেখা -- এছাড়া আর কিছু নয় --- তখনও হাংরি জেনারেশানের কারুর সঙ্গে আলাপও হয়নি --- আমার এ সিদ্ধান্ধ একজনই মাত্র সমর্থন করেছিলেন -- তিনি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় -- আয়ওয়া থেকে একটি চিঠিতে লিখেছিলেন --"যেভাবে জীবন কাটাতে চাইছ সেটা দিব্য"-- তারও প্রায় বছরখানেক বাদে যোগাযোগ হয় শৈলেশ্বর, সুভাষ, বাসুদেব, দেবী রায় আর ফালগুনী রায়ের সঙ্গে --- বন্ধুত্ব হয়, ভাববিনিময় হয়, একসঙ্গে উন্মত্ত জীবনযাপন শুরু হয় -- কলকাতার নাড়িনক্ষত্র, অন্ধিসন্ধি, গলিঘুঁজি দেখতে দেখতে চোখের ওপর থেকে যেন একটা পর্দা সরে যায় -- মলয়ের সঙ্গে জীবনে দুবারই দেখা হয়েছে --- একবার দুমকায় সমীরদার কোয়ার্টারে তাঁর আম্ন্ত্রণে গিয়ে -- দ্বিতীয়বার মলয় যখন সাহিত্যসংক্রান্ত মামলা মিটে যাওয়ার পর সুবিমল আর ত্রিদিবকে নিয়ে আমার তখনকার চাকরি স্হলে এসেছিলেন -- তখন সদ্য পিতৃহীন হয়েছি -- বিধবা মা আর এক দাদার সঙ্গে থাকতাম--- সঙ্গী ছিল গ্রন্হ, গ্রন্হ, গ্রন্হ --- লেখা আর লেখা আর লেখা আর বিরতিহীন, একাকী মদ্যপান আর মৃত্যুচিন্তা-- মৃত্যুর চিন্তা আমার সর্বক্ষণের সঙ্গী ছিল -- জীবনের এক বিচিত্র উদঘাটন হতে থাকে আমার কাছে --বাড়ির কাছেই ছিল একটা শ্মশান -- মধ্যরাতে ছাদে দাঁড়িয়ে মদ্যপ এক মৃত্যুচিন্তাকাতর যুবা, যে কয়েকবছর আগেও ধর্মতলা এলাকায় সন্ধ্যেয় ট্র্যাফিক অগ্রাহ্য করে উচ্চস্বরে কবিতা আবৃত্তি করতে করতে রাস্তা পেরোতো--- কলকাতা কিন্তু কবিকে অসন্মান করেনি -- নয়তো কবেই মরে যেতুম -- দেঘরে 'সৎসঙ্গ আশ্রমে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের সমীপে পৌঁছোই মৃত্যুরহস্য জানার জন্য -- তাঁরই নির্দেশে আমার দীক্ষা -- তাঁর দুটি মাত্র ছোট বাক্য বুঝতে আমার বছর আষ্টেক সময় লেগেছিল -- জীবনের দিগন্ত খুলে যেতে থাকে -- তাঁরই অনুপ্রেরণায় আমি যাবতীয় ধর্মগ্রন্হ থেকে হাহরণ করতে থাকি সারকথাগুলি--- জীবনের রাস্তাটাই সম্পূর্ণ বদলে যায় -- কথা যদি আমি বলি যে, তিনি সর্বক্ষণ আমার সঙ্গে থাকেন-- তাহলে লোকে পাগল বলবে আমায় । এই যে আপনার প্রশ্নগুলির উত্তর লিখছি এখনও তিনি আমার সঙ্গে আছেন --- ফলে সত্য থেকে বিচ্যুত হওয়া বা অহং নিয়ে মত্ত হহোয়ার কোনো উপায়ই নেই । তাঁর অনন্ত করুণা ও দয়ায় আমি গোটা জীবনটাকে দেখতে পাই -- শুধু দেখি না, মৃত্যুর ওপরে বসে প্রার্থনা করি, "অন্ধজনে দেহ আলো, মৃত্যুজনে দেহ প্রাণ--" প্রশ্ন : হাংরি আন্দোলনে আপনি কার মাধ্যমে যোগ দিলেন ? কবে নাগাদ আপনার মনে হল যে এই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে আপনি আত্মপ্রকাশ করতে পারবেন ? যে কাজকর্মের জন্য ষাটের অন্যান্য গোষ্ঠীর তুলনায় হাংরিদের খ্যাতি, তাতে কি অংশ নিতেন ? খালাসিটোলা যাওয়া, গাঁজা-হ্যাশিশ টানা, দলবেঁধে যত্রতত্র যাওয়া, ইত্যাদিতে অংশ নিয়েছেন কি ? হাংরি আন্দোলন মকদ্দমায় আপনার বিরুদ্ধেও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ছিল । পুলিশ কি আপনার খোঁজে গিয়েছিল ? গ্রেপ্তার হলে মুচলেকা দিতেন ? মকদ্দমার সময়ে বন্ধুদের সমর্থনে নিম্ন/উচ্চ আদালতে যেতেন ? মকদ্দমার সময়ে আপনি কোথায় থাকতেন ? উত্তর : আমি, যতদূর মনে পড়ে, শৈলেশ্বর, সুভাষ, বাসুদেব এবং প্রদীপের সঙ্গেই মেলামেশা করতাম -- মলয়ের সঙ্গে যোগাযোগ হয় বহু পরে -- কারুর বেঁধে দেয়া ম্যানিফেস্টো বা নিয়মে লেখার কথা ভাবিনি কখনও, ফলে আমার ব্যাপারটা ছিল আমার মতন । লেখার ব্যাপারে আমার সেরকম কোনও বাসনা ছিল না -- শেক্সপিয়ার এর ঐ লাইনটা আমি খুব সমর্থন করি --"অ্যাম্বিশান ইজ এ থিং হুইচ মেকস অ্যান এনজেল এ সিনার" । প্রতিষ্ঠা বা নানারকম বিশেষণে ভূষিত হওয়া নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই । মলয়ের মামলা চলার সময়ে আমি ত্রিপুরায় থাকতাম -- তেলিয়ামুড়া নামে একটা জায়গায় স্কুলশিক্ষক ছিলাম -- কলকাতার সঙ্গে কোনো যোগাযোগ ছিল না -- ফলে এদিকের কিছুই জানতাম না । ওখানে ছমাসের বেশি থাকার পর আমি কলকাতায় ফিরে আসি । না, পুলিশ আমার সম্পর্কে কি কি করেছিল জানি না -- তবে, ওরা একটা ক্ষতি করেছিল -- ওদেই অ্যাডভার্স রিপোর্টের জন্য মিনিস্ট্রি অফ এক্সটারনাল অ্যাফেয়ার্স এ আমার প্রায় হওয়া একটা চাকরি শেষ অব্দি হয়নি -- মনে পড়ে, খুব ব্যথা পেয়েছিলাম -- বাস্তব ক্ষতি হয়েছিল দুটো -- আমার পিতৃদেব খুব হতাশ অবস্হায় চলে গিয়েছিলেন -- এবং যে মেয়েটি আমার জন্য বহু বছর অপেক্ষা করেছিল, সে শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যা করে । কিন্তু এতে ওদের আর কি যায় আসে । আজ আমারও কিছু এসে যায় না । ইট ইজ এ পার্ট অফ দি গেম । ধ্বংস ও সৃষ্টির লীলা ছাড়া একে আর কি বলা যায় ! প্রশ্ন : আপনি কি নিজেকে প্রতিষ্ঠানবিরোধী মনে করেন ? অনেকে অভিযোগ করেন যে হাংরিরা প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার কথা বলে অথচ গোষ্ঠীপতি দাদা ও বইবাজারের বাণিজ্যিক কর্তাদের ধরে সংকলন প্রকাশ করতে এবং তার জন্য টাকা নিতে, তাদের বাধে না । এ বিষয়ে আপনার অবস্হান যদি স্পষ্ট করেন । উত্তর : এই চিন্তা থেকে আমি লক্ষ মাইল দূরে । তাছাড়া আমি বোধহয়, সেরকম গুরুত্বপূর্ণ কিছু ছিলাম না । শক্তি বা সন্দীপন সম্পর্কে কিছু বলতে পারবো না । তবে এদেশে প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার কথা বলে প্রাতিষ্ঠানিকতার প্রতি লোভ অনেকেরই আছে । সকলেই তো আর সতীনাথ ভাদুড়ি বা শঙ্খ ঘোষ নন । তাছাড়া লেখাটাই তো কথা, মূল ব্যাপার । প্রশ্ন : 'কথা ও কাহিনি' প্রকাশিত সংকলনটি সম্পাদনা করেছিলেন সমীর চৌধুরী । সম্পাদকীয় পড়ে আমাদের মনে হয়েছে যে হাংরি আন্দোলন সম্পর্কে সমীর চৌধুরীর কোনো ধারণা ছিল না । তিনি কয়েকজনের রচনা নিয়ে দপ্তরির কাজ করেছেন । আপনি কী বলেন ? উত্তর : আপনার কথাই তো ঠিক । প্রশ্ন : দে'জ থেকে প্রকাশিত হাংরি সংকলনটিকে অনেকে বলেন 'দারা-পুত্র-পরিবার' সংকলন । যে চারজন হাংরি আন্দোলনের সূত্রপাত করেছিলেন, তাঁদের রচনা এই সংকলনে নেই । যাঁদের কার্যকলাপের জন্য হাংরি আন্দোলনের খ্যাতি, তাঁদের রচনা নেই । যাঁদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বেরিয়েছিল, তাঁদের অধিকাংশের রচনা নেই । তার পরিবর্তে আছে অমুকের স্ত্রী, তমুকের শ্যালক, তমুকের আত্মীয়, পাঁচের দশকের কবি, ইত্যাদি । আপনি সৎপথের ধার্মিক মানুষ হয়ে কোন তর্কে এই সংকলনে নিজেকে অন্তর্ভুক্ত করলেন ? উত্তর : ঐ সংকলনের কথা আমি জেনেছি 'দেশ' পত্রিকার বিজ্ঞাপন থেকে -- প্রদীপ চৌধুরীর টেলিফোন পেয়ে । আমি করলে অবশ্যই অন্যরকম হতো । মলয়কে বাদ দেয়া মানে তো শিরচ্ছেদ করা । প্রশ্ন : আপনি অনুকূল ঠাকুরের শরণাপন্ন কেন হলেন ? আপনি কি হাংরি আন্দোলনের জীবনে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন বা অধঃপতনের পথে চলে যাচ্ছিলেন ? আপনার কি মনে হয়েছিল যে হাংরিদের জীবন প্রকৃতপক্ষে একটি ইঁদুরকল, এবং তা থেকে মুক্তি প্রয়োজন ? হাংরি আন্দোলনের সঙ্গে কি অনুকূল ঠাকুরের মতবিরোধ আছে ? অনেকে তেমনটাই মনে করেন । আপনি কি বলবেন ? উত্তর : প্রশ্নের প্রথম অংশ সম্পর্কে কিছুই বলবো না । শুধু দেবীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথা সম্পর্কে বলি -- বই পড়ে কখনও ভগবানের অনুভূতি হয় না -- ঈশ্বরের জ্ঞান পেতে হলে কি করতে হয় ? ভগবান শ্রীরামকৃষ্ণদেব বলেছেন, "ঈশ্বর শুদ্ধ মনের গোচর" -- আগে জলে নামতে হবে তবে তো সাঁতার -- ডাঙায় সাঁতার দিলে বুকের ছাল-চামড়া ছিঁড়ে যাবে । কবি সমর সেনের 'বাবু বৃত্তান্ত' পড়লে এমন একটা দৃষ্টান্ত পাবেন যা অফুরন্ত হাসির খোরাক হয়ে আছে । হাংরিরা অসম্পূর্ণ -- ঠাকুর সম্পূর্ণ -- তিনি দ্বন্দ্বাতীতং গান সদৃশং । প্রশ্ন : আপনি কোনো কাব্যগ্রন্হ প্রকাশ করেননি কেন ? অথচ আপনি আপনার কবিতা 'কথা ও কাহিনি' এবং 'দে'জ' প্রকাশিত সংকলনে অন্তর্ভুক্তির জন্য দিয়েছেন ? আপনি তো স্টেট ব্যাঙ্কের উঁচু পদে ছিলেন, মাইনেও ভালো পেতেন, তবু কাব্যগপ্রন্হ প্রকাশ করলেন না কেন ? আমরা, সাধারণ পাঠকরা, আপনার একটি কাব্যগপ্রন্হ খুঁজে বেড়াই । উত্তর : ভীষণ টাকার অভাব -- নয়তো, প্রকাশক পেলে হয়তো একটি বই বার করা যেতো । প্রশ্ন : আপনি কি মেডিটেশন করেন ? মেডিটেশনের সময়ে আপনার মনে কি কোনো কবিতার উন্মেষ ঘটার সম্ভাবনা দেখা দেয় ? এখনকার তরুণ কবিদের মেডিটেশান সম্পর্কে কোনো পথনির্দেশ দিতে পারেন কি ? উত্তর : পরামর্শ দিলে কেউ কি শুনবেন ? স্বামী বিবেকানন্দের 'ইন সার্চ অফ গড অ্যাণ্ড আদার পোয়েমস' পড়েছেন ? সন্ত কবীরের দোহা পড়লে বিস্ময়ে মূক হয়ে যেতে হয় -- এগুলো সবই মেডিটেশনের পথে পাওয়া -- কবীর পড়তে পড়তে আমি বার বার দেখি রবীন্দ্রনাথের অনেক আগেই তিনি অনেক কথা বলেছেন যা রবীন্দ্রনাথে ঘুরে ফিরে এসেছে । তবে ব্যক্তিটি তো রবীন্দ্রনাথ -- অসম্ভব এবং প্রবল পরিপাক শক্তি ছিল তাঁর । কবীরের ব্যবহৃত শব্দগুচ্ছ রবীন্দ্রনাথ বাংলায় এনেছেন ঈষৎ পরিবর্তিত করে । এবং মনে হবে এসবই রবীন্দ্রনাথের । প্রশ্ন : সুভাষ ঘোষ ও বাসুদেব দাশগুপ্ত সিপিএম-এ যোগ দিয়ে ছিলেন, অথচ হাংরি পত্রিকাও প্রকাশ করতেন । সুভাষ ঘোষের বাড়িতে জ্যোতি বসুর ফোটো ঝোলানো থাকত, লাল ঝাণ্ডার ভাঁড়ার ছিল । তাঁরা দুজনেই সিপিএম-এর মিছিলে অংশ নিতেন । তাঁদের এই রাজনৈতিক কার্যকলাপ কি প্রতিষ্ঠানের আশ্রয়ে তাঁদের সুবিধাভোগী প্রমাণ করে না ? আপনার কি মনে হয় ? উত্তর : কি জানি, ওদের রাজনৈতিক মতামত নিয়ে কখনও আমার সঙ্গে কথা হয়নি । বাসুদেবের শেষ দিকের রাজনৈতিক উপন্যাস আমার একেবারেই ভালো লাগেনি । প্রশ্ন : 'চন্দ্রগ্রহণ' পত্রিকার হাংরি আন্দোলন সংখ্যা ( সেপ্টেম্বর-অক্টোবর ২০১৩ ) পড়ে আপনার কি মনে হয়েছে যে 'কথা ও কাহিনি' এবং 'দেজ' থেকে প্রকাশিত সংকলনগুলির তুলনায় এটি একটি সামগ্রিক কাজ, এবং সেকারণে প্রশংসনীয় ? উত্তর : কিছুই হয় না --- যতক্ষণ না দেখছি ততক্ষণ কোনও মন্তব্য করা ঠিক হবে না । প্রশ্ন : আপনি কি জানেন যে হাংরি আন্দোলন নিয়ে পিএইচ ডি এবং এম ফিল হয়েছে ? ওয়েসলিয়ান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মারিনা ডি হেলার হাংরি আন্দোলন নিয়ে গবেষণা করেছেন ? ইউটা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনামিকা বন্দ্যোপাধ্যায় ফিল্ম তুলে নিয়ে গেছেন ? ইউ টিউবে হাংরি কবিতা পাঠ করে রেকর্ড করেছেন বাংলাদেশ, আমেরিকা, কানাডা ইত্যাদি দেশের কবিরা ? ফালগুনী রায়ের কবিতা নিয়ে ফিল্ম করেছেন শর্মী পাণ্ডে ? মলয় রায়চৌধুরীর 'প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার' কবিতাটি নিয়ে ফিল্ম করেছেন মৃগাঙ্কশেখর গঙ্গোপাধ্যায় ? এই সংবাদগুলো শুনে আপনার কেমন প্রতিক্রিয়া হয় ? 'বাইশে শ্রাবণ' নামে একটি ফিল্মে প্রখ্যাত পরিচালক গৌতম ঘোষ জনৈক হাংরি কবির ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন, জানেন ? ফিল্মটি আপনি দেখে থাকলে আপনার প্রতিক্রিয়া জানতে চাইব । উত্তর : সিনেমাটা আমার সেভাবে দেখা হয়নি । তবে গৌতম ঘোষ একজন ব্রিলিয়ান্ট অভিনেতা -- সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেনের পরে দুজন আমার খুব প্রিয় পরিচালক -- একজন আমার একদাকালের বন্ধু বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত -- অন্যজন অবশ্যই দি ম্যাসকুলাইন বয় অফ মাই টাইম, গৌতম ঘোষ । তৃতীয়জন সৃজিৎ মুখোপাধ্যায় । তবে যা বর্ণনা শুনেছি, আমরা একটু অন্যরকম ছিলাম । দৃশ্যত আমাদের অবয়বেই খানিকটা পাগলামির ভাব ছিল। কিন্তু আমরা আত্মহত্যা করিনি -- একটা অনুসন্ধান ছিল আমাদের -- সেটা অবিশ্যি এক একজনের এক একরকম । অ্যালেন গিন্সবার্গের তো শেষ পর্যন্ত বৌদ্ধদর্শনে খুব বিশ্বাস হয়েছিল । যদিও ওঁর ঈশ্বরানুভূতির ব্যাপারটা সেভাবে আমাদের প্রভাবিত করেনি -- যা ওঁদের প্রবল ক্ষতি করেছে তা হল নানা রকমের নেশা । বাহিরের চেষ্টায় কিছু হবে না ভাই -- এটা সম্পূর্ণ অন্তর্গত ব্যাপার । প্রণব, শ্মশানে গেলেই কি সব হয় ? ঈশ্বরলাভের জন্য বহু জন্মজন্মান্তের সুকৃতি লাগে । আর লাগে সংকল্প, লাগে "মুখ্য হরিকথা -নিরূপণ" করে যাওয়া । মানুষের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার ঈশ্বরকে বা মূল উৎসকে খুঁজে পাওয়া -- সেটা হলেই সমস্ত অসম্পূর্ণতা তুচ্ছ হয়ে যায় । কবিতা মানে তো আমার কাছে আজ 'দি জার্নি টোয়ার্ডস দি ইটারনাল ট্রুথ -- আমি কি চাই ? এ টাচ অফ দি ইনফিনিট -- এ টাচ- এ রিয়াল টাচ । কোনো অজ্ঞাত কারণে আমার বেঁচে থাকা নয় । শংকরাচার্য বলতেন --ব্রহ্ম সত্য, জগত মিথ্যা-- বুদ্ধও তাই বলতেন -- সূক্ষ্ম ভাবনা থেকে সূক্ষমতর ভাবনায় যেতে হবে -- বাসনার দাস হলে নির্বাণের পথ বন্ধ হয়ে যায় । সেইজন্যেই সহস্রমুখ চেতনার অধিকারী হতে হয় ।
সমীর অন্য অনেক সময়েও আমাকে অনেক সাহায্য করেছে । একই কলেজে পড়ার সুবাদে বন্ধুত্ব, যদিও আমাদের বিষয় ছিল আলাদা । সমীরের জীববিজ্ঞান আর আমার অর্থনীতি । কলেজে তো অনেকের সঙ্গেই পরিচয় হয়, কিন্তু কারুর কারুর সঙ্গে সে-বন্ধুত্ব খুব গাঢ় হয়ে ওঠে । গ্র্যাজুয়েশানের পর সমীর বেশ তাড়াতাড়ি চাকরি পেয়েছিল । আমি বেশ কয়েক বছর বেকার অবস্হায় টিউশানি-মিউশানি করে কাটিয়েছি । সেই সময় সমীর কৃত্তিবাসের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে । হাংরি জেনারেশনের সঙ্গে কৃত্তিবাসের খানিকটা টানাপোড়েন তো ছিলই, সমীর সেটা মেলাবার অনেক চেষ্টা করেছে । ওর ছোটোভাই মলয় রায়চৌধুরীকে পুলিশ গ্রেফতার করে মামলা দায়ের করে, তাতে, হাংরি জেনারেশনের সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক না থাকলেও মলয়ের পক্ষে প্রথম সাক্ষী দিয়েছিলুম আমি ।
বিহারে চাকরিরত হলেও সমীর কলকাতা থেকে একটি প্রকাশনা সংস্হা চালু করতে চেয়েছিল । তার প্রথম বই আমার ‘একা এবং কয়েকজন’। তখন আমাকে কবি হিসাবে ক’জনই বা চেনে । তবু আমার কবিতার বই প্রকাশ করায় সমীরের অনেকখানি ঔদার্য প্রকাশ পেয়েছিল । সমীরের কাব্যগ্রন্হ বেরুল, ‘ঝর্ণার পাশে শুয়ে আছি’ । নামটা বোধহয় আমারই দেওয়া । প্রেসেও ছোটাছুটি করেছি আমি । সে সময়ে সমীর চমৎকার রোমান্টিক কবিতা লিখত । পরে তার কবিতা একটা অন্যদিকে বাঁক নেয় । ওই সংস্হা থেকে সমীরের আরেকটি বই বেরিয়েছিল, ‘আমার ভিয়েৎনাম’ । পরে সেই প্রকাশনা বন্ধ হয়ে যায় । লেখালিখি ছাড়াও সমীরের সঙ্গে আমার একটা গভীর নৈকট্যের সম্পর্ক তৈরি হয়ে যায়, যে সম্পর্কের মধ্যে কখনো ভুল বোঝাবুঝির প্রশ্ন থাকে না । আমি জানতাম এই দীর্ঘকায়, সুঠাম চেহারার বন্ধুটির ওপর সব সময় নির্ভর করা যায় । আমার দিক থেকে ওকে ককন কী সাহায্য করেছি, তা বলতে পারি না । চাকরিসূত্রে সমীর যখন যেখানে বদলি হয়েছে, আমি সেখানে গিয়ে উপস্হিত হয়েছি । যেমন ডালটনগঞ্জ, ভাগলপুর, দুমকা, মুজফফরপুর, চাইবাসা, দ্বারভাঙ্গা এবং ওদের নিজস্ব বাড়ি পাটনায় । সেই সময়কার আড্ডার উজ্জ্বল মধুর স্মৃতি কখনো ভোলার নয় । বিয়ের সময়, সমীর বেশ একটা কৌতুক করেছিল। আমরা জানতুম, চাইবাসার বেলার সঙ্গেই ওর ভালোবাসার সম্পর্ক ।কিন্তু সমীর রটিয়ে দিল, ও অন্য একটি মেয়েকে বিয়ে করছে । খুবই উদ্বিগ্ন অবস্হায় আমরা কয়েকজন বিবাহবাসরে যোগ দিতে গেলাম চাইবাসায় । সমীরকে কিছু জিগ্যেস করলে সে মুচকি হাসে । অনুষ্ঠান শুরুর আগে নববধুর মুখ দেখে আমার বুক থেকে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস বেরিয়ে এল । লাবণ্যময়ী বেলা পরে সমীরের সব বন্ধুকেই আপন করে নিয়েছিল । স্বাতীর সঙ্গে আমার বিয়ে উপলক্ষ্যেও সমীর আর বেলা দুজনে এসে উপস্হিত হয়েছিল আমাদের দমদমের বাড়িতে । বউভাতের রাতে নববধূকে কিছু একটা উপহার দিতে হয়, তা আমার জানা ছিল না । জানব কী করে, আমি যে কাঠ বাঙাল । সমীরই প্রায় শেষ মুহূর্তে সেই কথাটা মনে করিয়ে দেওয়ায় দুজনে বেরিয়ে কিনে আনলাম একটা লেডিজ ঘড়ি, খুব সম্ভবত সমীরই সেটার দাম দিয়েছিল । তারপর এই দুই পরিবারের একটা ঘনিষ্ঠতা হয়ে যায় ।
সমীরের সঙ্গে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের পরিচয় প্রথমে আমিই করিয়ে দিই । তারপর শক্তি-সমীরের চাইবাসা পর্ব নিয়ে বাংলা সাহিত্যে অনেক কিছু লেখা হয়েছে । বিহারে থাকলেও সমীর মাঝে মাঝেই কলকাতা এসে অন্য সব লেখকদের সঙ্গে পরিচিত হয়ে ওঠে ।
হাংরি জেনারেশন আন্দোলন শুরু হবার পর ওদের সঙ্গে আমার খানিকটা দূরত্ব তৈরি হয় । আমার ‘আনন্দবাজারে’ যোগ দেওয়া ও কবিতা ছাড়াও প্রচুর গদ্য লেখালিখি ওরা অনেকেই পচন্দ করেনি, শুনেছি । সেটা তো এসটাবলিশমেন্টের খপ্পরে পড়া, এবং কথাটা ঠিকই । কয়েক বছর পর শক্তিও অবশ্য ‘আনন্দবাজার’ সংস্হায় যোগ দিয়েছিল ।
রাজনীতির মতন সাহিত্য জগতেও নীতিগত আপত্তি ও দূরত্ব থাকতেই পারে । কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনে সেই দূরত্ব সৃষ্টি করার পক্ষপাতী আমি কোনোদিনই নই । হাংরি জেনারেশন পর্ব চুকে গেলে শক্তির সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতায় সামান্য সাময়িক ফাটল খুব সহজেই জোড়া লেগে যায় । যেমন সন্দীপনেরও । কিন্তু কেউ কেউ দূরত্বটাই পছন্দ করে । সমীরের সঙ্গে বিচ্ছেদটাই আমার বেশি মনে লাগে । সমীরের লেখা, সাহিত্য সম্পর্কে ওর নানারকম পরিকল্পনা আমার বরাবরই পছন্দ ছিল। সবচেয়ে বেশি আপন মনে করতাম মানুষ সমীরকে ।
জীবন কত নিষ্ঠুর । জীবনের গতি কোন সময় কোন বাঁক নেবে, তা আগে থেকে কিছুই বলা যায় না । এক সময়কার সেই প্রগাঢ় বন্ধুত্ব, আড্ডা, পানাহার, পরস্পরের স্বপ্ন বিনিময়, এসবই কখন যেন ধূসর হয়ে যায় । বিহার ছেড়ে সমীর এখন কলকাতারই উপকন্ঠে বাড়ি করে সপরিবারে চলে এসেছে । অথচ ওর সঙ্গে আমার আর প্রায় দেখাই হয় না । কেন কে জানে ! হয়তো আমার দিক থেকেই অনেক ত্রুটি আছে ।
একটা সাম্প্রতিক ঘটনা বলি । চোখের চিকিৎসার ব্যাপারে স্বাতী আর আমি গেছি একটা চিকিৎসালয়ে । বেশ ভিড় । তারই মধ্যে স্বাতী আঙুল দেখিয়ে বলল, ওইখানে সমীর বসে আছে না ? কাছে গিয়ে দেখি, সত্যিই সমীর আর বেলা । কুশল বিনিময় হল । ছেলেমেয়েদের কথা হল । এক সময় আমি সমীরকে বললাম, কানাইলাল জানার বাড়িতে যে একটা উৎসব হল কদন আগে, শুনেছিলাম, তোরও সেখানে যাবার কথা ছিল । তুই গেলি না কেন ? তোর বাড়ির তো কাছেই ।
সমীর আমার চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে ঠাণ্ডা গলায় বলল, আমি যাইনি, যদি তুই আমাকে সেখানে চিনতে না পারিস?
আমার বুকে যেন একটা বুলেট বিদ্ধ হল । এরকম নিষ্ঠুর কথা আমি বহুদিন শুনিনি । যে বন্ধুর সঙ্গে আমার তুই-তুই সম্পর্ক, যার সঙ্গে আমার কখনো ঝগড়াঝাঁটি হয়নি, কোনোদিন তিক্ততার সৃষ্টি হয়নি, তার সঙ্গে দেখা হলে আমি চিনতে পারব না ? এমন অভিযোগ শোনার জন্য কী দোষ বা অন্যায় করেছি আমি, তা জানি না । এরপর কয়েকদিন বেশ বিমর্ষ হয়েছিলাম । মনে হল, জীবনের কাছ থেকে এরকম আকস্মিক আঘাত আরও কত পেতে হবে কে জানে !
হয়তো সমীরও কোনো গভীর অভিমানবোধ থেকে এই কথা বলেছিল । আমি নিজেই নিশ্চয়ই সেরকম কোনো কারণ ঘটিয়েছি, কিন্তু তার বিন্দুবিসর্গও আমার জানা নেই ।
( ২০১২ )
[ নব্বুই দশকে কলকাতার বাঁশদ্রোণীতে এসে সমীর রায়চৌধুরী “হাওয়া ৪৯” নামে একটি পত্রিকা সম্পাদনা ও প্রকাশ আরম্ভ করেন । তিনি সুনীল, সন্দীপন, শক্তি, উৎপল, শরৎ প্রমুখ সবায়ের সঙ্গে দেখা করে লেখা দেবার আহ্বান জানান । একমাত্র উৎপল ছাড়া আর কেউ সাড়া দেননি । সমীর অত্যন্ত দুঃখিত হন তাঁর নিকটবন্ধু সুনীলের ব্যবহারে । প্রায় দুই বছর সমীর রায়চৌধুরী কৃত্তিবাস পত্রিকাকে আর্থিক সাহায্য দিয়ে দাঁড় করিয়ে রেখেছিলেন, কিন্তু যখন সমীর এবং অন্যান্য হাংরি আন্দোলনকারীরা গ্রেফতার হন ও তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হয় তখন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কৃত্তিবাস পত্রিকায় হাংরি আন্দোলনের বিরুদ্ধে একটি ঘৃণ্য সম্পাদকীয় লিখেছিলেন । সমীর আই আচরণে অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হন । ভূমেন্দ্র গুহের মাধ্যমে সমীরকে সংবাদ পাঠিয়েছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় যে সবাই যখন অকাদেমি পুরস্কারের জন্য তাঁকে খোশামোদ করছে তখন সমীর রায়চৌধুরী তাঁর বাড়িতে একবারের জন্যও কেন যান না । হাংরি আন্দোলন মামলায় কলকাতায় সমীরের যখন মাথা গোঁজার ঠাঁই ছিল না তখন সুনীল একবারের জন্যও বলেননি তাঁর বাড়িতে আতিথ্য নিতে । সমীরের গল্পগ্রন্হ “খুল যা সিমসিম” নিয়ে যখন কলকাতার তরুণ লেখকমহলে আলোচনা আরম্ভ হয়েছিল গল্পের একটি নবদিগন্ত খুলে দেবার জন্য, তখন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বইটি সম্পর্কে কোথাও এক লাইনও লেখেননি । তিনি চাইলেই আনন্দবাজার ও দেশ পত্রিকায় বইটির আলোচনা করতে পারতেন । বিদেশে গিয়েও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর বার্ধক্যেও হাংরি আন্দোলনের বিরুদ্ধে প্রচার করেছেন, অ্যালেন গিন্সবার্গকে বুঝিয়েছেন যাতে আন্দোলনকে কোনো গুরুত্ব দেয়া না হয়, সমীর তা জানতে পেরেছেন বিভিন্ন বিদেশী গবেষকদের কাছ থেকে । অমিতাভ ঘোষের বিদেশিনী স্ত্রী যখন “এ ব্লু হ্যাণ্ড” নামে একটি বই গিন্সবার্গকে নিয়ে লিখছিলেন তখন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তাঁকে বিপথগামী করেন, যে কারণে বইটিতে সত্য তথ্য নেই বললেই চলে । শেষ বয়সে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কাঁদুনি গেয়ে আত্মরক্ষা করতে চাইছেন ইতিহাসের পাতায় । শক্তি চট্টোপাধ্যায় সমীর রায়চৌধুরীর সঙ্গে তাঁর সম্পর্কে প্রকাশ করতে দ্বিধা করেননি তাঁর ‘কিন্নর কিন্নরী’ উপন্যাসে । অথচ সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর ‘অরণ্যের দিনরাত্রী’ উপন্যাসে সমীর রায়চৌধুরীকে গুরুত্ব দেননি, যখন কিনা ঘটনাবলী চাইবাসায় ঘটেছিল । ]