বিশ্বাস ঘাতক লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
বিশ্বাস ঘাতক লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

রবিবার

মন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায় আয়োজিত অনুষ্ঠানে শৈলেশ্বর ঘোষ

যিনি বলেছিলেন আধুনিকতার শবদেহের ওপর উল্লাসময় নৃত্য করবেন তিনি শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানে যোগ দিয়ে হাংরি জেনারেশনের নাম কলঙ্কিত করলেন
                                                  

শুক্রবার

একটি কবিতার জন্য : তাহসিন মল্লিক

একটি কবিতার জন্য ১৯৬৪ সালে মলয় রায়চৌধুরীর বিরুদ্ধে মকদ্দমা করেছিল তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গ সরকার। মলয়ের হাতে হাতকড়া পরিয়ে ও কোমরে দড়িবেঁধে প্রথমে থানায় এবং থানা থেকে ছয়-সাতজন অপরাধীর সঙ্গে রাস্তা দিয়ে হাঁটিয়ে কোর্টে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। মলয়ের বিরুদ্ধে ৩৫ মাস মামলাটি চলে প্রথমে নিম্ন আদালতে, যেখানে মলয়ের একমাস জেলের সাজা ঘোষিত হয় ও তারপর কলকাতা উচ্চ আদালতে, যেখানে তিনি বেকসুর ছাড়া পান। মলয়ের পক্ষে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন তরুণ সান্যাল, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, জ্যোতির্ময় দত্ত, সত্রাজিৎ দত্ত ও অজয় হালদার। পাঠকের হয়ত আশ্চর্য লাগবে, মলয়ের বিরুদ্ধে পুলিসের পক্ষের সাক্ষী ছিলেন শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় ও উৎপলকুমার বসু। দুজন পুলিস ইনফর্মার, পবিত্র বল্লভ ও সমীর বসু, ছিলেন পুলিসের ভুয়ো সাক্ষী, যাঁরা মলয়ের পরিচিত না হওয়া সত্ত্বেও কোর্টে জানান যে মলয়ের সঙ্গে তাঁদের বহুবার কফিহাউসে দেখা হয়েছে। সবচেয়ে লজ্জার যে দুজন হাংরি আন্দোলনকারী রাজসাক্ষী , অর্থাৎ অ্যাপ্রুভার, হয়ে মলয়ের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেন; তাঁরা দুজন হলেন শৈলেশ্বর ঘোষ ও সুভাষ ঘোষ।এঁদের সাক্ষ্যের কারণেই নিম্ন আদালত মলয়কে সাজা দিয়েছিল ।

বৃহস্পতিবার

ডন মাইকেল কর্লিওনি : হাংরি আন্দোলন -- এক অভূতপূর্ব দ্রোহের বিস্ফোরণ...

হাংরি আন্দোলন — এক অভূতপূর্ব দ্রোহের বিস্ফোরণ…

487 বার পঠিত
হাংরি আন্দোলন, বাঙলা সাহিত্যের এক অদ্ভুত ক্রান্তিকালে আরও অদ্ভুতুড়ে এক আন্দোলনের নাম।মাত্র ২১ বছর বয়েসে কলকাতার কবি মলয় রায় চৌধুরীর মাথার পেছন দিকের গ্রে সেলগুলোতে যখন এই আন্দোলনের দামামা প্রথম বেজে উঠল, তখন কেউ হয়তবা ধারনাও করতে পারেননি যে একসময় এই আন্দোলনই পাল্টে দেবে রবীন্দ্র-নজরুল পরবর্তী বাঙলা সাহিত্যের স্রোতধারা, বদলে দেবে অন্য সংস্কৃতি থেকে ধার করা ময়ুর পুচ্ছ দিয়ে কালজয়ী সাহিত্য তৈরির মত সাময়িক আত্মঘাতী প্রবনতাকে…


স্বদেশী আন্দোলনের মাধ্যমে জাতীয়তাবাদী নেতাদের দেখানো এক সুখী-সমৃদ্ধ উন্নত দেশের স্বপ্ন যখন টকে গিয়ে পচতে শুরু করল আর সেই পচনের ধারা ধীরে ধীরে বাঙলা সংস্কৃতির সৃজনশীলতাকে খেতে শুরু করে কালজয়ী সাহিত্যিক জন্মাবার সব পথ রুদ্ধ করে দেবার সকল আয়োজন প্রায় শেষ করে এনেছে, তখনই আবির্ভাব ক্ষুধিতের আন্দোলন বা ক্ষুধার্তের আন্দোলনের যা বাঙলা সাহিত্যের ইতিহাসে হাঙ্গরি আন্দোলন নামে সমধিক প্রচলিত।

ইংরেজ কবি জিওফ্রে চসারের “ ইন দি সাওয়ার হাংরি টাইম থেকে অনুপ্রানিত এ আন্দোলনে অনুরনিত হয়েছিল তৎকালীন সময়ের আমেরিকার বিখ্যাত বিট জেনারেশন আর ইংল্যান্ডের অ্যাংরি ইয়াং ম্যান আন্দোলনগুলো। মূলত যে মতবাদ এ আন্দোলনকে আরও বেগবান করেছে সেটা হল সমাজতাত্ত্বিক অসওয়াল্ড স্পেংলারের দি ডিক্লাইন অব দি ওয়েস্ট গ্রন্হটির দার্শনিক তত্ত্ব। তিনি বলেছিলেন,একটি সংস্কৃতি কেবল সরলরেখা বরাবর যায় না; তা একযোগে বিভিন্ন দিকে প্রসারিত হয় । তা হল জৈবপ্রক্রিয়া, এবং সেকারণে সমাজটির নানা অংশের কার কোনদিকে বাঁকবদল ঘটবে তা আগাম বলা যায় না । যখন কেবল নিজের সৃজনক্ষমতার ওপর নির্ভর করে, তখন সংস্কৃতিটি বিকশিত ও সমৃদ্ধ হয় । তার সৃজনক্ষমতা ফুরিয়ে গেলে, তা বাইরে থেকে যা পায় ত-ই আত্মসাৎ করতে থাকে, খেতে থাকে, তার ক্ষুধা তখন তৃপ্তিহীন । । 

হাংরি আন্দোলনের কুশিলবদের মনে হয়েছিল, দেশভাগের ফলে বাঙলা সংস্কৃতির সৃজনক্ষমতা নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে ধার করা সাংস্কৃতিক ঐশ্বর্য কেবল আমাদের সংস্কৃতির কফিনে শেষ পেরেকই ঠুকে দেবে না, উনিশ শতকের মত সাহিত্য দিকপাল জন্মানোর প্রক্রিয়া পুরোপুরি রুদ্ধ করে দেবে।তাদের এ ভাবনার পেছনে যথেষ্ট যুক্তিও ছিল। তার মধ্যে সবচেয়ে বড় যুক্তিটা হয়তোবা হতে পারে সুকান্তের অকাল মৃত্যু এবং তারপরে বাঙলা সাহিত্যের হাল ধরবার মত আর কোন উজ্জ্বল নক্ষত্রের অনুপস্থিতি। ফলে সাহিত্যজগতে সৃষ্টি হয় এক বিশাল শূন্যতা। এটা ছাড়া এই আন্দোলনের কারন আর কি কি থাকতে পারে সে ব্যাপারে পাঠকের কাছে মতামত আশা করছি। সাহিত্যের প্রতিটি শাখায় মেধার মৌলিকত্বকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে যখন সর্বভুক প্রজাতির খাদক হবার মাধ্যমে(লেখক ও পাঠক উভয়ই)বাঙলা সাহিত্যকেই একটা ভাগাড়ে পরিনত করবার চেষ্টা চলছিল, তখনই এইসব সাহিত্যদৈনের বিরুদ্ধে হাংরি আন্দোলনের প্রকাশ ঘটে ঝঞ্ঝারবেগে, সমাজ-সংসার সব সচকিত করে দিয়ে…

১৯৬১ সালের নভেম্বরে পাটনা শহর থেকে একটি ইশতেহার(না, ভুল পড়েননি)প্রকাশ করবার মাধ্যমে হাংরি আন্দোলনের সূচনা করেন মলয় রায় চৌধুরী, তার দাদা সমীর রায় চৌধুরী, সমীরের বন্ধু শক্তি এবং মলয়ের বন্ধু হারাধন ধাড়া ওরফে দেবী রায়। পরে তাদের সাথে যোগ দিয়ে আন্দোলনকে বেগবান করেন সুবিমল বসাক, ফালগুনি রায়,বিনয় মজুমদার, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়,প্রদীপ চৌধুরী,ত্রিদিব মিত্র,উৎপলকুমার বসু,বাসুদেব দাশগুপ্ত,রবীন্দ্র গুহ,অনিল করনজাই,সুভাষ ঘোষ,সুবো আচার্য,শৈলেশ্বর ঘোষ প্রমুখ… এখানে বলে রাখা ভালো মলয়ের দাদার শ্যালিকা শীলা চট্টোপাধ্যায়ের প্রেমিক ছিলেন শক্তি চট্টোপাধ্যায় এবং তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্হ হে প্রেম হে নৈঃশব্দ্য-এর প্রেমের কবিতাগুলো শীলার প্রেমে লিখিত ।

হাংরি আন্দোলনের উদ্দেশ্য সংবলিত প্রথম ইশতিহার মলয় রায় চৌধুরীর লেখনি থেকে সরাসরি তুলে দেয়া হল—
১. অ্যারিস্টটলের বাস্তবতাকে কখনও নকল করা হবে না, কিন্ত বলাতপ্রস্তুতির মাধ্যমে আচমকা জাপটে ধরতে হবে অপ্রস্তুত ছেনালি অস্তি ।
২. নৈঃশব্দকে অটুট রেখে নির্বাককে বাস্তব হয়ে উঠতে হবে ।
৩. ঠিক সেই রকম সৃষ্টি-উন্মার্গে চালিত হতে হবে যাতে আগে থাকতে তৈরি পৃথিবীকে চুরমার করে পুনর্বার বিশৃঙ্খলা থেকে শুরু করা যায় ।
৪. লেখকের চেতনাকে বর্জন করে প্রতিটি অন্য বোধ-জরায়ুকে কাজে লাগানো হবে ।
৫. ফাঁস করে দেয়া হবে যে, কেবল কান্তি- সত্তা হিসাবেই জীবন ও অস্তিত্ব স্বীকৃত ।
৬. অন্যের প্রদত্ত বোধ- জ্ঞানের চেয়ে বরং সমস্তরকম সন্দেহ ও অসহায়তাকে গ্রহণ করা হবে ।
৭. দ্বিপদ-উন্নতিকামী প্রাণীদের তাবৎ মূল্যবোধকে আক্রমণ করে ছারখার করা হবে ।
৮. চরম সততার উদ্দেশ্যে সবরকম চাটুকারদের মাগিদের শপৎপূর্বক পরিত্যাগ করা হবে ।
৯. আত্মাবিষ্কারের পর লেখা আর আঁকা ছেড়ে দেয়া হবে ।
আজ এ পর্যন্তই…  :) এর পরের কিস্তিতে হাংরি আন্দোলনের কুশিলবদের সৃষ্টিকর্ম, তাদের সংস্কার তাদের কার্যক্রমের বিরুদ্ধে সরকারের মামলা, আন্দোলনের সমাপ্তি ও পুনঃআন্দোলনের চেষ্টা এবং বাঙলা চলচিত্রে হাংরি আন্দোলনের প্রভাব নিয়ে আলোচনা করা যাবে…

হাংরি আন্দোলন ও শক্তি চট্টোপাধ্যায়


হাংরি আন্দোলন ও শক্তি চট্টোপাধ্যায়


untitled bমলয় রায়চৌধুরী
দাদা সমীর রায়চোধুরী, তাঁর বন্ধু শক্তি চট্টোপাধ্যায়, যিনি চাইবাসায় দাদার নিমডি পাহাড়টিলার চালাবাড়িতে দু’বছরের বেশি ছিলেন, আমি, এবং আমার বন্ধু দেবী রায়, আমরা চারজন ১৯৬১ সালের নভেম্বরে, পাটনায় আমাদের বাড়িতে বসে কয়েকদিনের আলোচনার পর নির্ণয় নিই যে আমরা উত্তরঔপনিবেশিক পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক ও সাহিত্যের প্রেক্ষিতে “হাংরি আন্দোলন” নামে একটা আন্দোলন আরম্ভ করব, যার রূপরেখা আমি আগেই ছকে রেখেছিলুম, তা অন্য তিনজনকে বোঝাই, এবং তাঁরা রাজি হন । “হাংরি” শব্দটা আমি পেয়েছিলুম জিওফ্রে চসারের কবিতার লাইন In Sowre Hungry Tyme থেকে এবং তাত্ত্বিক বনেদ গড়েছিলুম ইতিহাসের দার্শনিক অসওয়াল্ড স্পেংলারের The Decline Of The West বই থেকে । উপস্হিত তিনজনই তা অনুমোদন করেন । ঠিক হয় যে প্রতি সপ্তাহে এক পাতার বুলেটিন প্রকাশ করা হবে, আর তা কলকাতার কফিহাউস, কলেজ, সংবাদপত্র দপতর ইত্যাদিতে ফ্রি বিলি করা হবে, তার খরচ আমি আর দাদা দেবো ।

কলকাতায় শক্তি চট্টোপাধ্যায় আমাদের চেয়ে বেশি পরিচিত ছিলেন বলে তাঁকে নেতৃত্ব নিতে বলা হয়, এবং তিনি তৎক্ষণাত রাজি হন । হাওড়ায় দেবী রায় যে বস্তিবাড়িতে থাকতেন, তাকেই প্রকাশকের ঠিকানা হিসাবে ঘোষণা করা ঠিক হয়, কেননা শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কোনো নির্দিষ্ট আস্তানা ছিল না, কলকাতার উল্টোডাঙার যে বস্তিতে উনি থাকতেন সেখানে কেউ যাক তা চাইতেন না, এবং তিনি দাদার শ্যালিকা শীলা চট্টোপাধ্যায়ের গভীর প্রেমে পড়েছিলেন বলে, অধিকাংশ সময়ে চাইবাসাতেই থাকতে চাইতেন ; দাদা লম্বা ট্যুরে গেলে শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে মধুটোলায় নিজের শশুরবাড়িতে অতিথি হিসাবে রেখে যেতেন । একবার দাদা চাকুরিসূত্রে সামুদ্রিক জাহাজে ট্রেনিং নিতে গিয়েছিলেন, বেশ কয়েক মাসের জন্য, তখন শক্তি চট্টোপাধ্যায় দাদার শশুরবাড়িতে এতোদিন ছিলেন যে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর খোঁজে এসে অবাক হয়ে বলেন, “তুই এখানে ইস্টিশান পুঁতে ফেলেছিস ?” তাঁর প্রেমিকা কলেজে পড়তে গেলে শক্তি চট্টোপাধ্যায় ফিরে আসার রাস্তায় কোনো গাছতলায় দাঁড়িয়ে বহুক্ষণ অপেক্ষা করতেন ।

শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কাব্যগ্রন্হ “হে প্রেম হে নৈঃশব্দ্য” এই প্রেমের ফসল । তার আগে তিনি ঔপন্যাসিক হবার কথা ভাবছিলেন, উপন্যাস লিখে টাকা রোজগারের আশায় ; “কুয়োতলা” ( রচনাকাল ১৯৫৬-৫৭; প্রকাশিত ১৯৬১ সালে ) নামে একটা উপন্যাস লিখেছিলেন, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অপু চরিত্রের সঙ্গে তাঁর নিজের মিল ও প্রকৃতির বর্ণনায় তাঁর নিজের বহড়ু গ্রামের সাদৃশ্য খুঁজে পেয়ে । তারপরেও তিনি “কুয়োতলা” গ্রন্হের নায়ক নিরুপমকে নিয়ে একাধিক উপন্যাস লিখেছেন, কিন্তু “কুয়োতলা”র পর্যায়ের লিখতে পারেননি একটিও, ততদিনে তাঁর সৃজনশীল একাগ্রতা কেন্দ্রীভূত হয়েছে কবিতায়, এবং একের পর এক অসাধারণ কবিতা লিখে গেছেন ।

শক্তি চট্টোপাধ্যায় মদ খেতে ভালোবাসতেন ; চাইবাসার মধুটোলায়, মধ্যবিত্ত বাড়ির তরুণীর সঙ্গে প্রেম করার সময়েও তাঁর অভ্যাস ছাড়তে পারেননি, তাঁদের বাড়িতে অতিথি হয়ে থাকার সময়েও মহুয়ার মদ আর আদিবাসী হাটের হাড়িয়া খেয়ে ফিরেছেন । মাতাল বলতে যা বোঝায়, তা উনি হতেন বলে মনে হয় না আমার, পোশাকে মদ ছিটিয়ে মাতালের অভিনয়ও করতে দেখেছি ওনাকে ।

১৯৬৩ সালে উনি যে হাংরি আন্দোলন থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে নিলেন, তার দুটি কারণের একটি হল, প্রেমিকাকে বিয়ে করতে না পারা, এবং সেই ব্যাপারে দাদা সমীর রায়চৌধুরী আর আমার হাত ছিল বলে ওনার ঘোর সন্দেহ । নিজের প্রেম নিয়ে লেখা “কিন্নর কিন্নরী” ( ১লা বৈশাখ ১৩৮৪ বঙ্গাব্দে প্রকাশিত ) উপন্যাসে, যে বইতে তিনি নিরুপম-এর বদলে পার্থ নাম দিয়েছেন নায়ককে, তাতে হদিশ দিয়েছেন অন্যের ষড়যন্ত্রের । অনেকে প্রশ্ন তোলেন যে প্রেমিকাকে না পাওয়ার জন্য হাংরি আন্দোলনের বিরোধীতা, আর আমার বিরুদ্ধে মামলায় পুলিশের পক্ষের সাক্ষী হলেন, এটা কি বিশ্বাসযোগ্য ? আমার বক্তব্য হল যে ষাঠ বছর আগের যুবক-যুবতীরা প্রেমে ব্যর্থ হলে অমনধারাই আচরণ করতেন, এখনকার যুবক-যুবতীদের পক্ষে যা বুঝে-ওঠা সম্ভব নয় ।

চাইবাসা থেকে কলকাতায় ফিরে তিনি রূপচাঁদ পক্ষী ছদ্মনামে চারটি ব্যর্থ প্রেমের কাহিনি লিখেছিলেন : “অম্বা ও দেবব্রত”, “রামচন্দ্র ও শর্বরী”, “সোম ও তারা” এবং “অর্জুন ও উত্তরা” । হাংরি আন্দোলনের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ককে সাহিত্যে ধরে রাখার জন্য ১৩৮১ বঙ্গাব্দে তিনি “হৃদয়পুর” নামে একটি উপন্যাস লেখেন, যার নায়ক নিরুপম বাড়ি থেকে রাজপথে বেরিয়ে সামনে যা দেখে, মানুষসুদ্দু লাল মোটরগাড়ি, বাসের কাচ, জুতোর দোকান থেকে জুতো, বিশাল নমুনা-কলম, বিশাল নমুনা-ফুটবল, চারফুট লম্বা মদের বোতল, তা-ই খেতে থাকে ।

প্রেমিকাকে না পেয়ে শক্তি চট্টোপাধ্যায় বুঝতে পেরেছিলেন যে তিনি যদি বেকার না হতেন, এবং সাহিত্যিক হিসাবে খ্যাত হতেন, তাহলে সমীর রায়চোধুরীর শশুর তাঁকে জামাই হিসাবে স্বীকৃতি দিতেন । ১৯৬৩ সালেই তিনি একটি সংবাদপত্রের সম্পাদকীয় দপতরে চাকরির আহ্বান পেলেন, শর্ত ছিল যে তাঁকে হাংরি আন্দোলন ত্যাগ করতে হবে । তিনি যে হাংরি আন্দোলন ত্যাগ করেছেন তা প্রমাণের জন্য এক সন্ধ্যায় কলেজ স্ট্রিট কফি হাউসের সামনে কয়েকজন বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে, যে দলে সেই পত্রিকার সাংবাদিকও ছিলেন, ঘিরে ধরলেন হাংরি আন্দোলনের গল্পকার সুবিমল বসাককে । সে এক কেলেঙ্কারি দৃশ্য, মাতালের কুখ্যাতিকে ভাঙিয়ে নেবার এর চেয়ে ভালো সুযোগ আর কীই বা হতে পারে । সেসময়ে সুবিমল বসাকের চেহারা ছিল কুস্তিগিরের, তাই তেমন কোনো ঘটনা ঘটেনি, পারস্পরিক হুমকি ছাড়া ।
১৯৬২ সাল জুড়ে শক্তি চট্টোপাধ্যায় হাংরি আন্দোলন নিয়ে যথেষ্ট আগ্রহান্বিত ছিলেন, এটি যে একটি জলবিভাজক আন্দোলন হিসাবে দেখা দিয়েছে, তাও মেনে নিয়েছিলেন, অশোক চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত “সম্প্রতি” পত্রিকায় হাংরি আন্দোলন নিয়ে একটা ছোটো লেখাও লিখেছিলেন, আমার ব্যাখ্যা করা অসওয়াল্ড স্পেংলারের বক্তব্যকে সম্প্রসারিত করে, অর্থাৎ “সভ্যতা ও সংস্কৃতি হল জৈব প্রক্রিয়া, কোন দিকে তার বাঁকবদল ঘটবে তা আগে থাকতে বলা যায় না ; একটি সংস্কৃতির অবসান সেই পর্যায়ে আরম্ভ হয়, যখন তার নিজের সৃজনক্ষমতা ফুরিয়ে গিয়ে সংস্কৃতিটি নির্বিচারে যা পায় তা-ই খেতে থাকে, তার ক্ষুধা তখন তৃপ্তিহীন। হেগেলের এই তর্কটি ভুল যে ইতিহাস যুক্তিসংগতভাবে একটি রেখা বরাবর এগোয়। ।”

“কৃত্তিবাস” গোষ্ঠীর যে কবি-লেখকরা হাংরি আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, উৎপলকুমার বসু, বিনয় মজুমদার প্রমুখ, তাঁরা শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ডাকেই যোগ দিয়েছিলেন । শক্তি চট্টোপাধ্যায় সেসময়ে শেয়ালদার কাছে একটা কোচিং ক্লাস চালাতেন, সেখানে পড়াতেন বাসুদেব দাশগুপ্ত, তিনিও শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ডাকে হাংরি আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন । ১৯৬১ থেকে ১৯৬৩ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ , প্রায় প্রতিটি বুলেটিনে তাঁর কবিতা প্রকাশিত হতো । অন্যান্য যাঁরা যোগ দিয়েছিলেন তাঁরা এসেছিলেন সুবিমল বসাক ও দেবী রায়ের ডাকে ।

আমার লেখা প্রথম ইংরেজি বুলেটিনে আনন্দ বাগচী ও অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের কবিতার সমালোচনা ছিল, যা শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের পছন্দ হয়নি ; তিনি উষ্মা প্রকাশ করায় বুলেটিনটি দ্বিতীয়বার প্রকাশ করা হয়, বিতর্কিত প্যারাটি বাদ দিয়ে । রাজনৈতিক ইশতাহারে ( ১৫ নং ) একটা ঘোষণা সম্পর্কেও উষ্মা প্রকাশ করেছিলেন উনি, এই তর্কবিন্দুটি নিয়ে কবি কৃষ্ণ ধর পর-পর দু’দিন প্রধান সম্পাদকীয় লিখেছিলেন “যুগান্তর” সংবাদপত্রে । ঘোষণাটি ছিল এরকম : “বেশ্যার মৃতদেহ এবং গর্দভের লেজের মাঝামাঝি কোথাও সেই স্হানটি দেখিয়ে দেয়া হবে, যেটা বর্তমান সময়ে একজন রাজনীতিকের।” বুলেটিনের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতাকেন্দ্রগুলোর প্রতি আক্রমণ আমরা যতো বাড়িয়ে তুলেছি, উনি ততো অস্বস্তি বোধ করেছেন ।

১৯৬৪ সালে আমাকে ও সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়কে আমেরিকার আইওয়া পোয়েট্রি ওয়র্কশপ থেকে লেখা চিঠিতে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় আরোপ করেছিলেন যে “কৃত্তিবাস” গোষ্ঠীকে ভেঙে দেবার জন্যই আমরা ষড়যন্ত্র করে হাংরি আন্দোলন আরম্ভ করেছি ; অমন চিঠি সম্ভবত শক্তি চট্টোপাধ্যায়কেও লিখে থাকবেন। বলা বাহুল্য যে “কৃত্তিবাস”কে আমরা ঔপনিবেশিক সাহিত্যতন্ত্রের একটি পত্রিকাগোষ্ঠী বলে মনে করতুম, আন্দোলন নয় বা ঔপনিবেশিক ডিসকোর্সের কাউন্টার ডিসকোর্স নয় । শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা ইংরেজিতে অনুবাদ করে হাংরি বুলেটিনে আমিই প্রকাশ করেছি, কিন্তু সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় অ্যালেন গিন্সবার্গকে বুঝিয়েছিলেন যে আমি শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে দিয়ে ইংরেজি কবিতা লিখিয়ে তাঁর প্রতিভাকে খর্ব করছি । “কৃত্তিবাস” একটি পত্রিকা, এবং সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মৃত্যুর পরও তা প্রকাশিত হয়ে চলেছে ।

১৯৬৪ সালের সেপ্টেম্বরে এগারোজন হাংরি আন্দোলনকারীর বিরুদ্ধে ১২০বি এবং ২৯২ ইনডিয়ান পিনাল কোডের ধারায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বেরোয়, তাঁরা হলেন সমীর রায়চৌধুরী, উৎপলকুমার বসু, দেবী রায়, সুবিমল বসাক, শৈলেশ্বর ঘোষ, প্রদীপ চৌধুরী, সুভাষ ঘোষ, সুবো আচার্য, রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়, বাসুদেব দাশগুপ্ত, এবং আমি । কিন্তু গ্রেপ্তার হই আমি, দেবী, শৈলেশ্বর, সুভাষ, প্রদীপ আর দাদা । উৎপল গ্রেপ্তার হননি, কিন্তু যোগমায়া দেবী কলেজে তাঁর অধ্যাপনার চাকরি থেকে বরখাস্ত হন । প্রদীপ চৌধুরী বিশ্বভারতী থেকে রাস্টিকেট হন । আমাকে হাতে হাতকড়া পরিয়ে কোমরে দড়ি বেঁধে বাড়ি থেকে থানা আর থানা থেকে আদালতে সাতজন চোর-ডাকাতের সঙ্গে রাস্তা দিয়ে হাঁটিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় ।

লক্ষণীয় যে এফ আই আর-এ শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের নাম ছিল না । কিন্তু হাংরি আন্দোলন থেকে নিজের দূরত্ব প্রমাণ করার জন্য তিনি যেচে লালবাজারে গিয়ে পুলিশের কাছে আন্দোলনের বিরুদ্ধে স্টেটমেন্ট দিয়েছিলেন, এবং ব্যাংকশাল কোর্টে হাংরি মামলায় আমার বিরুদ্ধে পুলিশের পক্ষের সাক্ষী হয়েছিলেন । আন্দোলনের বিরুদ্ধে স্টেটমেন্ট দিয়ে রাজসাক্ষী হয়েছিলেন শৈলেশ্বর ঘোষ আর সুভাষ ঘোষও, কিন্তু তাঁরা তা করেছিলেন মামলা থেকে অব্যহতি পাবার জন্য । শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের তো তেমন পরিস্হিতি ছিল না । দাদা সমীর রায়চৌধুরী মনে করেন যে, ব্যর্থ প্রেমের প্রতিশোধ ছাড়াও, হাংরি আন্দোলনে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের অংশগ্রহণকারী হয়ে থাকার প্রতি তাঁর দৃষ্টিকোণ বদলে দিয়েছিল তাঁর ব্যক্তিগত নিরাপত্তাবোধ, সংবাদপত্রে চাকরির শর্ত, কলকাতায় পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে সম্পর্ক, এবং প্রতিষ্ঠা ও খ্যাতির চাপ । ব্যাংকশাল কোর্টের জজসাহেব আমাকে একমাসের কারাদণ্ড দিয়েছিলেন পুলিশ পক্ষের সাক্ষী আর রাজসাক্ষীদের দেয়া সাক্ষ্যের ওপর নির্ভর করে ।

শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় ও উৎপলকুমার বসু আমার বিরুদ্ধে পুলিশের পক্ষের সাক্ষী হয়েছেন জানার পর, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তৎক্ষণাত আমার পক্ষে সাক্ষ্য দিতে রাজি হন ; তার আগে তিনি সাক্ষ্য দেবেন না বলেছিলেন । সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের চেকমেট !

শুক্রবার

সুবো আচার্য, হাংরি আন্দোলন, সাক্ষাৎকার

( সুবো আচার্য ছিলেন হাংরি আন্দোলনকারী । তাঁর বিরুদ্ধেও গ্রেপতারি পরোয়ানা ছিল । কিন্তু তিনি সেসময়ে ত্রিপুরার একটি গ্রামে গিয়ে গা ঢাকা দেন। পরে পুলিশ কেবল মলয় রায়চৌধুরীর বিরুদ্ধে মামলা করেছে শুনে সুবো আচার্য ত্রিপুরা থেকে ফেরেন, এবং দেওঘরে গিয়ে অনুকূল ঠাকুরের শিষ্যত্ব নিয়ে সাহিত্যজগত থেকে উধাও হয়ে যান । স্টেট ব্যাংকের চিফ ম্যানেজার হিসাবে অবসর নেবার পর কলকাতায় ফিরলে 'চন্দ্রগ্রহণ' পত্রিকার সম্পাদক প্রণবকুমার চট্টোপাধ্যায় তাঁকে খুঁজে বের করে এই সাক্ষাৎকারটি নেন । আগ্রহীরা পড়ে সুবো আচার্যের পলায়ন ও পুনরাবির্ভাব ও নির্বাণের গল্প পাবেন সাক্ষাৎকারটিতে । 'চন্দ্রগ্রহণ' পত্রিকা, বসন্ত সংখ্যা, ২০১৪, ৭ বরদাকান্ত রোড, দমদম, কলকাতা ৭০০ ০৩০, মুঠোফোন : ৯৮৩১৬৭৯৩৭৭ )
প্রশ্ন : আপনার সম্পর্কে আমরা কিছুই জানি না । হাংরি আন্দোলন মামলায় যাঁরা রাজসাক্ষী হয়েছিলেন, তাঁদের মুচলেকা থেকে তাঁদের পারিবারিক তথ্য পাওয়া যায় । আপনি যদি আপনার জন্ম, বাবা-মা, পরিবার, বাল্যকাল নিয়ে কিছু বলেন তাহলে ভালো হয় ।
উত্তর: আর দশটা বাঙালি মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেরা যেভাবে মানুষ হয়, আমিও সেভাবেই মানুষ হয়েছি -- খুব অল্প বয়সেই, দেশভাগের সামান্য আগে আমরা বাঁকুড়ায় চলে আসি --- সেখানেই আমার বড়ো হওয়া --- স্কুল-কলেজের পরে কলকাতায় এসে পড়াশুনো -- প্রথমে প্রেসিডেন্সি কলেজের মাধ্যমে  কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ( ড. হরপ্রসাদ মিত্রের সৌজন্যে ) কিন্তু অল্প কিছুদিন পরেই যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে তুলনামূলক সাহিত্যের পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ক্লাসে ভর্তি হই -- পরে এমন সব ঘটনা ঘটতে থাকে, যে একসময় আমি বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে চলে আসি আমার তখনকার বন্ধু প্রদীপ চৌধুরীর সঙ্গে -- মূল কারণ ছিল কবিতা লেখা ও জীবনকে দেখা -- এছাড়া আর কিছু নয় --- তখনও হাংরি জেনারেশানের কারুর সঙ্গে আলাপও হয়নি --- আমার এ সিদ্ধান্ধ একজনই মাত্র সমর্থন করেছিলেন -- তিনি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় -- আয়ওয়া থেকে একটি চিঠিতে লিখেছিলেন --"যেভাবে জীবন কাটাতে চাইছ সেটা দিব্য"-- তারও প্রায় বছরখানেক বাদে যোগাযোগ হয় শৈলেশ্বর, সুভাষ, বাসুদেব, দেবী রায় আর ফালগুনী রায়ের সঙ্গে --- বন্ধুত্ব হয়, ভাববিনিময় হয়, একসঙ্গে উন্মত্ত জীবনযাপন শুরু হয় -- কলকাতার নাড়িনক্ষত্র, অন্ধিসন্ধি, গলিঘুঁজি দেখতে দেখতে চোখের ওপর থেকে যেন একটা পর্দা সরে যায় -- মলয়ের সঙ্গে জীবনে দুবারই দেখা হয়েছে --- একবার দুমকায় সমীরদার কোয়ার্টারে তাঁর আম্ন্ত্রণে গিয়ে -- দ্বিতীয়বার মলয় যখন সাহিত্যসংক্রান্ত মামলা মিটে যাওয়ার পর সুবিমল আর ত্রিদিবকে নিয়ে আমার তখনকার চাকরি স্হলে এসেছিলেন -- তখন সদ্য পিতৃহীন হয়েছি -- বিধবা মা আর এক দাদার সঙ্গে থাকতাম--- সঙ্গী ছিল গ্রন্হ, গ্রন্হ, গ্রন্হ --- লেখা আর লেখা আর লেখা আর বিরতিহীন, একাকী মদ্যপান আর মৃত্যুচিন্তা-- মৃত্যুর চিন্তা আমার সর্বক্ষণের সঙ্গী ছিল -- জীবনের এক বিচিত্র উদঘাটন হতে থাকে আমার কাছে --বাড়ির কাছেই ছিল একটা শ্মশান -- মধ্যরাতে ছাদে দাঁড়িয়ে মদ্যপ এক মৃত্যুচিন্তাকাতর যুবা, যে কয়েকবছর আগেও ধর্মতলা এলাকায় সন্ধ্যেয় ট্র্যাফিক অগ্রাহ্য করে উচ্চস্বরে কবিতা আবৃত্তি করতে করতে রাস্তা পেরোতো--- কলকাতা কিন্তু কবিকে অসন্মান করেনি -- নয়তো কবেই মরে যেতুম -- দেঘরে 'সৎসঙ্গ আশ্রমে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের সমীপে পৌঁছোই মৃত্যুরহস্য জানার জন্য -- তাঁরই নির্দেশে আমার দীক্ষা -- তাঁর দুটি মাত্র ছোট বাক্য বুঝতে আমার বছর আষ্টেক সময় লেগেছিল -- জীবনের দিগন্ত খুলে যেতে থাকে -- তাঁরই অনুপ্রেরণায় আমি যাবতীয় ধর্মগ্রন্হ থেকে হাহরণ করতে থাকি সারকথাগুলি--- জীবনের রাস্তাটাই সম্পূর্ণ বদলে যায় -- কথা যদি আমি বলি যে, তিনি সর্বক্ষণ আমার সঙ্গে থাকেন-- তাহলে লোকে পাগল বলবে আমায় । এই যে আপনার প্রশ্নগুলির উত্তর লিখছি এখনও তিনি আমার সঙ্গে আছেন --- ফলে সত্য থেকে বিচ্যুত হওয়া বা অহং নিয়ে মত্ত হহোয়ার কোনো উপায়ই নেই । তাঁর অনন্ত করুণা ও দয়ায় আমি গোটা জীবনটাকে দেখতে পাই -- শুধু দেখি না, মৃত্যুর ওপরে বসে প্রার্থনা করি, "অন্ধজনে দেহ আলো, মৃত্যুজনে দেহ প্রাণ--"
প্রশ্ন : হাংরি আন্দোলনে আপনি কার মাধ্যমে যোগ দিলেন ? কবে নাগাদ আপনার মনে হল যে এই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে আপনি আত্মপ্রকাশ করতে পারবেন ? যে কাজকর্মের জন্য ষাটের অন্যান্য গোষ্ঠীর তুলনায় হাংরিদের খ্যাতি, তাতে কি অংশ নিতেন ? খালাসিটোলা যাওয়া, গাঁজা-হ্যাশিশ টানা, দলবেঁধে যত্রতত্র যাওয়া, ইত্যাদিতে অংশ নিয়েছেন কি ? হাংরি আন্দোলন মকদ্দমায় আপনার বিরুদ্ধেও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ছিল । পুলিশ কি আপনার খোঁজে গিয়েছিল ? গ্রেপ্তার হলে মুচলেকা দিতেন ? মকদ্দমার সময়ে বন্ধুদের সমর্থনে নিম্ন/উচ্চ আদালতে যেতেন ? মকদ্দমার সময়ে আপনি কোথায় থাকতেন ?
উত্তর : আমি, যতদূর মনে পড়ে, শৈলেশ্বর, সুভাষ, বাসুদেব এবং প্রদীপের সঙ্গেই মেলামেশা করতাম -- মলয়ের সঙ্গে যোগাযোগ হয় বহু পরে -- কারুর বেঁধে দেয়া ম্যানিফেস্টো বা নিয়মে লেখার কথা ভাবিনি কখনও, ফলে আমার ব্যাপারটা ছিল আমার মতন । লেখার ব্যাপারে আমার সেরকম কোনও বাসনা ছিল না -- শেক্সপিয়ার এর ঐ লাইনটা আমি খুব সমর্থন করি --"অ্যাম্বিশান ইজ এ থিং হুইচ মেকস অ্যান এনজেল এ সিনার" । প্রতিষ্ঠা বা নানারকম বিশেষণে ভূষিত হওয়া নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই । মলয়ের মামলা চলার সময়ে আমি ত্রিপুরায় থাকতাম -- তেলিয়ামুড়া নামে একটা জায়গায় স্কুলশিক্ষক ছিলাম -- কলকাতার সঙ্গে কোনো যোগাযোগ ছিল না -- ফলে এদিকের কিছুই জানতাম না । ওখানে ছমাসের বেশি থাকার পর আমি কলকাতায় ফিরে আসি । না, পুলিশ আমার সম্পর্কে কি কি করেছিল জানি না -- তবে, ওরা একটা ক্ষতি করেছিল -- ওদেই অ্যাডভার্স রিপোর্টের জন্য মিনিস্ট্রি অফ এক্সটারনাল অ্যাফেয়ার্স এ আমার প্রায় হওয়া একটা চাকরি শেষ অব্দি হয়নি -- মনে পড়ে, খুব ব্যথা পেয়েছিলাম -- বাস্তব ক্ষতি হয়েছিল দুটো -- আমার পিতৃদেব খুব হতাশ অবস্হায় চলে গিয়েছিলেন -- এবং যে মেয়েটি আমার জন্য বহু বছর অপেক্ষা করেছিল, সে শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যা করে । কিন্তু এতে ওদের আর কি যায় আসে । আজ আমারও কিছু এসে যায় না । ইট ইজ এ পার্ট অফ দি গেম । ধ্বংস ও সৃষ্টির লীলা ছাড়া একে আর কি বলা যায় !
প্রশ্ন : আপনি কি নিজেকে প্রতিষ্ঠানবিরোধী মনে করেন ? অনেকে অভিযোগ করেন যে হাংরিরা প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার কথা বলে অথচ গোষ্ঠীপতি দাদা ও বইবাজারের বাণিজ্যিক কর্তাদের ধরে সংকলন প্রকাশ করতে এবং তার জন্য টাকা নিতে, তাদের বাধে না । এ বিষয়ে আপনার অবস্হান যদি স্পষ্ট করেন ।
উত্তর : এই চিন্তা থেকে আমি লক্ষ মাইল দূরে । তাছাড়া আমি বোধহয়, সেরকম গুরুত্বপূর্ণ কিছু ছিলাম না । শক্তি বা সন্দীপন সম্পর্কে কিছু বলতে পারবো না । তবে এদেশে প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার কথা বলে প্রাতিষ্ঠানিকতার প্রতি লোভ অনেকেরই আছে । সকলেই তো আর সতীনাথ ভাদুড়ি বা শঙ্খ ঘোষ নন । তাছাড়া লেখাটাই তো কথা, মূল ব্যাপার ।
প্রশ্ন : 'কথা ও কাহিনি' প্রকাশিত সংকলনটি সম্পাদনা করেছিলেন সমীর চৌধুরী । সম্পাদকীয় পড়ে আমাদের মনে হয়েছে যে হাংরি আন্দোলন সম্পর্কে সমীর চৌধুরীর কোনো ধারণা ছিল না । তিনি কয়েকজনের রচনা নিয়ে দপ্তরির কাজ করেছেন । আপনি কী বলেন ?
উত্তর : আপনার কথাই তো ঠিক ।
প্রশ্ন : দে'জ থেকে প্রকাশিত হাংরি সংকলনটিকে অনেকে বলেন 'দারা-পুত্র-পরিবার' সংকলন । যে চারজন হাংরি আন্দোলনের সূত্রপাত করেছিলেন, তাঁদের রচনা এই সংকলনে নেই । যাঁদের কার্যকলাপের জন্য হাংরি আন্দোলনের খ্যাতি, তাঁদের রচনা নেই । যাঁদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বেরিয়েছিল, তাঁদের অধিকাংশের রচনা নেই । তার পরিবর্তে আছে অমুকের স্ত্রী, তমুকের শ্যালক, তমুকের আত্মীয়, পাঁচের দশকের কবি, ইত্যাদি । আপনি সৎপথের ধার্মিক মানুষ হয়ে কোন তর্কে এই সংকলনে নিজেকে অন্তর্ভুক্ত করলেন ?
উত্তর : ঐ সংকলনের কথা আমি জেনেছি 'দেশ' পত্রিকার বিজ্ঞাপন থেকে -- প্রদীপ চৌধুরীর টেলিফোন পেয়ে । আমি করলে অবশ্যই অন্যরকম হতো । মলয়কে বাদ দেয়া মানে তো শিরচ্ছেদ করা ।
প্রশ্ন : আপনি অনুকূল ঠাকুরের শরণাপন্ন কেন হলেন ? আপনি কি হাংরি আন্দোলনের জীবনে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন বা অধঃপতনের পথে চলে যাচ্ছিলেন ? আপনার কি মনে হয়েছিল যে হাংরিদের জীবন প্রকৃতপক্ষে একটি ইঁদুরকল, এবং তা থেকে মুক্তি প্রয়োজন ? হাংরি আন্দোলনের সঙ্গে কি অনুকূল ঠাকুরের মতবিরোধ আছে ? অনেকে তেমনটাই মনে করেন । আপনি কি বলবেন ?
উত্তর : প্রশ্নের প্রথম অংশ সম্পর্কে কিছুই বলবো না । শুধু দেবীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথা সম্পর্কে বলি -- বই পড়ে কখনও ভগবানের অনুভূতি হয় না -- ঈশ্বরের জ্ঞান পেতে হলে কি করতে হয় ? ভগবান শ্রীরামকৃষ্ণদেব বলেছেন, "ঈশ্বর শুদ্ধ মনের গোচর" -- আগে জলে নামতে হবে তবে তো সাঁতার -- ডাঙায় সাঁতার দিলে বুকের ছাল-চামড়া ছিঁড়ে যাবে । কবি সমর সেনের 'বাবু বৃত্তান্ত' পড়লে এমন একটা দৃষ্টান্ত পাবেন যা অফুরন্ত হাসির খোরাক হয়ে আছে । হাংরিরা অসম্পূর্ণ -- ঠাকুর সম্পূর্ণ -- তিনি দ্বন্দ্বাতীতং গান সদৃশং ।
প্রশ্ন : আপনি কোনো কাব্যগ্রন্হ প্রকাশ করেননি কেন ? অথচ আপনি আপনার কবিতা 'কথা ও কাহিনি' এবং 'দে'জ' প্রকাশিত সংকলনে অন্তর্ভুক্তির জন্য দিয়েছেন ? আপনি তো স্টেট ব্যাঙ্কের উঁচু পদে ছিলেন, মাইনেও ভালো পেতেন, তবু কাব্যগপ্রন্হ প্রকাশ করলেন না কেন ? আমরা, সাধারণ পাঠকরা, আপনার একটি কাব্যগপ্রন্হ খুঁজে বেড়াই ।
উত্তর : ভীষণ টাকার অভাব -- নয়তো, প্রকাশক পেলে হয়তো একটি বই বার করা যেতো ।
প্রশ্ন : আপনি কি মেডিটেশন করেন ? মেডিটেশনের সময়ে আপনার মনে কি কোনো কবিতার উন্মেষ ঘটার সম্ভাবনা দেখা দেয় ? এখনকার তরুণ কবিদের মেডিটেশান সম্পর্কে কোনো পথনির্দেশ দিতে পারেন কি ?
উত্তর : পরামর্শ দিলে কেউ কি শুনবেন ? স্বামী বিবেকানন্দের 'ইন সার্চ অফ গড অ্যাণ্ড আদার পোয়েমস' পড়েছেন ? সন্ত কবীরের দোহা পড়লে বিস্ময়ে মূক হয়ে যেতে হয় -- এগুলো সবই মেডিটেশনের পথে পাওয়া -- কবীর পড়তে পড়তে আমি বার বার দেখি রবীন্দ্রনাথের অনেক আগেই তিনি অনেক কথা বলেছেন যা রবীন্দ্রনাথে ঘুরে ফিরে এসেছে । তবে ব্যক্তিটি তো রবীন্দ্রনাথ -- অসম্ভব এবং প্রবল পরিপাক শক্তি ছিল তাঁর । কবীরের ব্যবহৃত শব্দগুচ্ছ রবীন্দ্রনাথ বাংলায় এনেছেন ঈষৎ পরিবর্তিত করে । এবং মনে হবে এসবই রবীন্দ্রনাথের ।
প্রশ্ন : সুভাষ ঘোষ ও বাসুদেব দাশগুপ্ত সিপিএম-এ যোগ দিয়ে ছিলেন, অথচ হাংরি পত্রিকাও প্রকাশ করতেন । সুভাষ ঘোষের বাড়িতে জ্যোতি বসুর ফোটো ঝোলানো থাকত, লাল ঝাণ্ডার ভাঁড়ার ছিল । তাঁরা দুজনেই সিপিএম-এর মিছিলে অংশ নিতেন । তাঁদের এই রাজনৈতিক কার্যকলাপ কি প্রতিষ্ঠানের আশ্রয়ে তাঁদের সুবিধাভোগী প্রমাণ করে না ? আপনার কি মনে হয় ?
উত্তর : কি জানি, ওদের রাজনৈতিক মতামত নিয়ে কখনও আমার সঙ্গে কথা হয়নি । বাসুদেবের শেষ দিকের রাজনৈতিক উপন্যাস আমার একেবারেই ভালো লাগেনি ।
প্রশ্ন : 'চন্দ্রগ্রহণ' পত্রিকার হাংরি আন্দোলন সংখ্যা ( সেপ্টেম্বর-অক্টোবর ২০১৩ ) পড়ে আপনার কি মনে হয়েছে যে 'কথা ও কাহিনি' এবং 'দেজ' থেকে প্রকাশিত সংকলনগুলির তুলনায় এটি একটি সামগ্রিক কাজ, এবং সেকারণে প্রশংসনীয় ?
উত্তর : কিছুই হয় না --- যতক্ষণ না দেখছি ততক্ষণ কোনও মন্তব্য করা ঠিক হবে না ।
প্রশ্ন : আপনি কি জানেন যে হাংরি আন্দোলন নিয়ে পিএইচ ডি এবং এম ফিল হয়েছে ? ওয়েসলিয়ান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মারিনা ডি হেলার হাংরি আন্দোলন নিয়ে গবেষণা করেছেন ? ইউটা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনামিকা বন্দ্যোপাধ্যায় ফিল্ম তুলে নিয়ে গেছেন ? ইউ টিউবে হাংরি কবিতা পাঠ করে রেকর্ড করেছেন বাংলাদেশ, আমেরিকা, কানাডা ইত্যাদি দেশের কবিরা ? ফালগুনী রায়ের কবিতা নিয়ে ফিল্ম করেছেন শর্মী পাণ্ডে ? মলয় রায়চৌধুরীর 'প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার' কবিতাটি নিয়ে ফিল্ম করেছেন মৃগাঙ্কশেখর গঙ্গোপাধ্যায় ? এই সংবাদগুলো শুনে আপনার কেমন প্রতিক্রিয়া হয় ? 'বাইশে শ্রাবণ' নামে একটি ফিল্মে প্রখ্যাত পরিচালক গৌতম ঘোষ জনৈক হাংরি কবির ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন, জানেন ? ফিল্মটি আপনি দেখে থাকলে আপনার প্রতিক্রিয়া জানতে চাইব ।
উত্তর : সিনেমাটা আমার সেভাবে দেখা হয়নি । তবে গৌতম ঘোষ একজন ব্রিলিয়ান্ট অভিনেতা -- সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেনের পরে দুজন আমার খুব প্রিয় পরিচালক -- একজন আমার একদাকালের বন্ধু বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত -- অন্যজন অবশ্যই দি ম্যাসকুলাইন বয় অফ মাই টাইম, গৌতম ঘোষ । তৃতীয়জন সৃজিৎ মুখোপাধ্যায় । তবে যা বর্ণনা শুনেছি, আমরা একটু অন্যরকম ছিলাম । দৃশ্যত আমাদের অবয়বেই খানিকটা পাগলামির ভাব ছিল। কিন্তু আমরা আত্মহত্যা করিনি -- একটা অনুসন্ধান ছিল আমাদের -- সেটা অবিশ্যি এক একজনের এক একরকম । অ্যালেন গিন্সবার্গের তো শেষ পর্যন্ত বৌদ্ধদর্শনে খুব বিশ্বাস হয়েছিল । যদিও ওঁর ঈশ্বরানুভূতির ব্যাপারটা সেভাবে আমাদের প্রভাবিত করেনি  -- যা ওঁদের প্রবল ক্ষতি করেছে তা হল নানা রকমের নেশা । বাহিরের চেষ্টায় কিছু হবে না ভাই -- এটা সম্পূর্ণ অন্তর্গত ব্যাপার । প্রণব, শ্মশানে গেলেই কি সব হয় ? ঈশ্বরলাভের জন্য বহু জন্মজন্মান্তের সুকৃতি লাগে । আর লাগে সংকল্প, লাগে "মুখ্য হরিকথা -নিরূপণ" করে যাওয়া । মানুষের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার ঈশ্বরকে বা মূল উৎসকে খুঁজে পাওয়া -- সেটা হলেই সমস্ত অসম্পূর্ণতা তুচ্ছ হয়ে যায় । কবিতা মানে তো আমার কাছে আজ 'দি জার্নি টোয়ার্ডস দি ইটারনাল ট্রুথ -- আমি কি চাই ? এ টাচ অফ দি ইনফিনিট -- এ টাচ- এ রিয়াল টাচ । কোনো অজ্ঞাত কারণে আমার বেঁচে থাকা নয় । শংকরাচার্য বলতেন --ব্রহ্ম সত্য, জগত মিথ্যা-- বুদ্ধও তাই বলতেন -- সূক্ষ্ম ভাবনা থেকে সূক্ষমতর ভাবনায় যেতে হবে -- বাসনার দাস হলে নির্বাণের পথ বন্ধ হয়ে যায় । সেইজন্যেই সহস্রমুখ চেতনার অধিকারী হতে হয় ।