Protest Literature লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
Protest Literature লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

মঙ্গলবার

বিমলকুমার মুখোপাধ্যায়, বাংলা বিভাগের প্রধান, ক.বি. : "রবীন্দ্রনাথ ও হাংরি আন্দোলন"

এক আন্দোলন বাংলা সাহিত্যে দেখা দিয়েছিল, চারিদিকে মাতন লাগিয়ে । এই আন্দোলনের স্রষ্টা মলয় রায়চৌধুরীর মুখেই শোনা যেতে পারে কোন তাত্বিক সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে এগিয়েছিলেন সেদিনকার হাংরি প্রজন্মের লেখকরা । সেই আন্দোলনের লেখকরা সাহিত্যের পৃষ্ঠায় স্হায়ী চিহ্ণ মুদ্রিত করে যেতে যদি না-ও পারেন, তবু কিছুই কি ছিল না তাঁদের ? অন্তত একটা প্রতিবাদ তো ছিল । আজকের ভারতীয় সাহিত্য 'দলিত আন্দোলনের' পুরোগামী তাঁরা । বিরাট কিছু না করতে পারলেও নিম্নবর্গের মানুষের সাহিত্যের 'কন্টেন্ট' ও 'ফর্ম' নিয়ে কিছু করার কথা ভেবেছিল অন্তত :

"বাংলা সাহিত্যে আমাদের আগে -- আবির্ভাব কথাটা বোধহয় যুৎসই -- আমাদের আবির্ভাবের আগে, কবি-সাহিত্যিক মানে ছিল সাতে নেই পাঁচে নেই ঢুলু-চোখে কাঁধে ব্যাগ ঝোলানো খদ্দরের পাঞ্জাবি-পাজামায় পথের দাবির প্রমথেশ, উস্কো খুস্কো, উদাস, বুকনি-প্রধান, বুর্জোয়া বাংলায় ভদ্দর লোকদের শব্দবন্ধ-বাক্যগঠন, আমরা ভালো তোমরা খারাপ, রবীন্দ্রনাথের গড়ে দেওয়া ভাষা-পৃথিবীর পারফিউম-মাখা হাই-ইনকাম গ্রুপের জাবর । সমাজের নিচুতলা মানে কল্লোল আর কালি-কলমের পাতিবুর্জোয়া আইডিয়ালিজম । ভালো বাংলায় গপ্পো । বাঙালির রেনেসঁস নিয়ে উনিশ শতকের হই-হল্লার পরেও, ষাটের দশকের শুরুতে, সাহিত্যিকদের সামাজিক দায়িত্ব মানে ছিল কেবল ভাষা-সাহিত্যকে প্রভাবিত করা, ভাষার মাধ্যমে ভবিষ্যৎ-সাহিত্যকে প্রভাবিত করা নয় । ফলে চল্লিশ দশকের নানা গরমাগরম লেকচার-কবিতা সত্বেও, ভাষা বিশেষ প্রভাবিত করছে না বঙ্গসমাজের চিন্তাকাঠামোকে । সাহিত্য জিনিসটা তথাকথিত সুকুমার বৃত্তি হিসেবে থেকে গেছে । রবীন্দ্রনাথ যে শব্দভাণ্ডার তৈরি করে গেছেন তা থেকে তিরিশের কবি-লেখকরাও নিজেদের আলাদা করতে পারেননি । ইসকুল কলেজের মাস্টাররা ভদ্দরলোকের ভাষাতেই চক্কোর কাটেন । ব্রাত্যদের সিনট্যাক্স ও ডিকশন ভাষাতে ঢোকাবার কলজে গড়ে ওঠেনি । তাতে এচআইজি বাঙালিরা লজ্জা পান । হাংরি আন্দোলনে সুবিমল বসাক আর সুভাষ ঘোষ সবচেয়ে আগে এই চেষ্টা করেন । কল্লোল লেখকদের প্রচেষ্টাকে আমি খাটো করছি না । তাঁদের অভিজ্ঞতা বাইরের জিনিস নিয়ে এলেও, জীবনের বিস্তারকে সামাজিক প্রেক্ষিত তাঁরা দিয়েছিলেন । হাংরি আন্দোলনে কবি-লেখকরা সমাজের  নিচুতলা থেকে লেখালিখিতে এসেছিলেন আর স্বাভাবিকভাবে সঙ্গে এনেছিলেন নিচুতলার শক-ওয়েভ । কলমে আড় রাখেননি তাঁরা।" ( মলয় রায়চৌধুরী প্রণীত 'হাংরি কিংবদন্তি' প্রথম খণ্ড, ১৯৯৫ )

'নিচুতলার শকওয়েভ' আনার জন্য কলমের আড় ভাঙতে চেয়েছিলেন হাংরি আন্দোলনের সেদিনের তরুণরা, এমনকি তাঁদের পক্ষে মনোবিজ্ঞানী এবং কবি-সমালোচকের প্রবল সাক্ষ্য সত্বেও, অশ্লীলতার অভোযোগ ওঠে । মলয় রায়চৌধুরীকে বলতে হয়েছে, "সাহিত্যকে অহেতুক সংশোধন করার চেষ্টা করার দরকার নেই, যাতে কথাবার্তা ও আত্মপ্রকাশের স্বাধীনতা খর্ব হয়।" মলয় দাবি করেছেন, তাঁদের সাহিত্য-ভাবনার কিছু মৌলিক ব্যালার শনাক্ত করা যাচ্ছে 'দলিত সাহিত্য আন্দোলনে' ।

যবনিকা টানার পূর্বমুহূর্তে মনে হচ্ছে, সাহিত্যের উপাদানগত পরিচয়, মানুষের জীবনে সাহিত্যের ভূমিকা, সাহিত্যের উদ্দেশ্য, সাহিত্যের ভাষা-শব্দ-নীতি-শালীনতা এবং আনুষঙ্গিক অনেক প্রশ্ন এদেশে গত একশো বছর ধরে উঠে এসেছে এক-একটা আন্দোলনের চেহারা নিয়ে । কোনও দিন তার মীমাংসা হয়নি দুচার কথায় । 

তবু আমরা পেয়েছিলাম রবীন্দ্রনাথ নামক এক ব্যক্তিত্ব যিনি পঁয়ষট্টি বছর ধরে সৃষ্টির বিভিন্ন প্রান্তে নিমগ্ন থেকে ও মননের গভীর থেকে চিরকালীন এবং সমকালীন সাহিত্যের সমস্যা সমাধানের অনেক সূত্রের সন্ধান দিয়ে গেছেন বাঙালি পাঠকদের । ভারতীয় অলঙ্কারশাস্ত্র ও পাশ্চাত্য সমালোচনাশাস্ত্র পৃথক ও সন্মিলিতভাবে রবীন্দ্রনাথের নন্দনতাত্বিক সিদ্ধান্ত অপরের মতাদর্শের সঙ্গে যদি মিলেও যায়, তবু রবীন্দ্রনাথের সিদ্ধান্তে কেউ প্রভাব বিস্তার করতে পারেননি একান্তভাবে । কিটস-এর একটি মন্তব্য অনেকবার ফিরে ফিরে এসেছে রবীন্দ্র রচনায় । অথচ নন্দনতাত্বিক রবীন্দ্রনাথকে শুধুই রোমান্টিক বলে চিহ্ণিত করা সঙ্গত হবে না । আবার উপনিষদের সচ্চিদানন্দ ব্রহ্মের প্রসঙ্গ, অলঙ্কারশাস্ত্রের রসের প্রসঙ্গ  কোনও ভারতীয় দর্শনেই রবীন্দ্রনাথ তাঁর চিন্তার গতিকে স্তব্ধ রাখেননি । 

এই কারণেই একালের বিদগ্ধদের পশ্চিম গোলার্ধের কাছে পাহাড়-প্রমাণ মতবাদের ঋণ সবৃদ্ধিমূলে বেড়ে উঠলেও সঙ্কটকালে রবীন্দ্রনাথই একমাত্র নির্ভরযোগ্য উত্তমর্ণ, যিনি কোনও গোষ্ঠীনির্ভর "প্রতিষ্ঠানের" সদস্য ছিলেন না । স্বমতে দীক্ষা দানে প্রয়াসী ধর্মগুরু বা রাজনীতির পাণ্ডা ছিলেন না তিনি । সহানুভূতি প্রকাশের সততার জন্যই তিনি বংশীবাদক, যাঁর চলার সুরে অনুগামীদের সংখ্যা বৃদ্ধি করেই চলেছে । সমকালের বিশিষ্ট্য সমস্যাকে যথোচিত গুরুত্ব দিয়ে রবীন্দ্রনাথের নান্দনিক ঐতিহ্যকে যে হাংরি আন্দোলনকারীরা বহন করে চলেছেন, এই মুহূর্তে প্রতিকূলের চরণাহত হওয়ার আশঙ্কা হয়তো তাঁদের নেই ।
( বাংলা আকাদেমি পত্রিকা, নভেম্বর ১৯৯৭ সংখ্যায় প্রকাশিত প্রবন্ধ )

রবিবার

হাংরি জেনারেশন নিয়ে বাংলাদেশের মুক্তচিন্তা সাইটের মতামত

সময়টা ইংরেজি ১৯৬৪ সাল। সেপ্টেম্বর মাসে ইনডিয়ান পিনাল কোডের ১২০বি, ২৯২ এবং ২৯৪ ধারায় ১১ জন কবির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছিল । তাঁরা হলেন: মলয় রায়চৌধুরী,, শৈলেশ্বর ঘোষ , দেবী রায় , সুভাষ ঘোষ, প্রদীপ চৌধুরী, রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়, উৎপলকুমার বসু, সমীর রায়চৌধুরী, বাসুদেব দাশগুপ্ত, সুবো আচার্য এবং সুবিমল বসাক । এঁদের মধ্যে প্রথম ছয়জনকে গ্রেপতার করা ছয়েছিল এবং কলকাতার ব্যাংকশাল কোর্টে তোলা হয়েছিল । মলয় রায়চৌধুরীকে হাতে হাতকড়া এবং কোমরে দড়ি পরে হেঁটেছিলেন কোলকাতার রাস্তায় চোর- ডাকাতের পাশে।

কিন্তু কেন? কেন ফেরারী হয়ে যান সুবো আচার্য ও রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়? কেন বিশ্বভারতী থেকে রাসটিকিট হন প্রদীপ চৌধুরী? উৎপলকুমার বসু অধ্যাপনা থেকে বরখাস্ত হন? বেছে বেছে কেন কবিদের দেয়া হল যন্ত্রণা?
উত্তর টা আমরা পরে খুজব। তার আগে বাংলা সাহিত্যের ভাঙ্গা-গড়া নিয়ে একটু নাড়াচাড়া করে আসি। প্রথমেই বলে নিচ্ছি সাহিত্য হচ্ছে শিল্পের খুবই সরল একটি শাখা। যেমন শাখা চারুকলা কিংবা সঙ্গীত। আমরা সারা পৃথিবী জুড়ে অনেক শিল্প বিপ্লব এর কথা শুনেছি, পড়েছি। ১৭, ১৮ শতক এর Amatory Fiction বা যৌন কাল্পনিক সাহিত্য। যার উল্লেখযোগ্য লেখক হচ্ছেন Eliza Haywood, Delarivier Manley। এরপর সময়ের স্রোত বেয়ে ঘটেছে আরও অনেক। ১৭ শতকের Cavalier Poets যার উল্লেখযোগ্য লেখকদ্বয় Richard Lovelace, William Davenant। এরপর John Donne, George Herbert, Andrew Marvell প্রমুখ সাহিত্যক এর Metaphysical poets। আলেকজান্ডার পোপ, জোনাথোন সুইফট এর চিরায়ত আদর্শ, বিদ্রুপ and সংশয়বাদ কে আশ্রয় করে “দ্য অগাস্তান” আন্দোলন করলেন ১৮ শতকে। ১৯ শতকে যুক্তি, বিজ্ঞান সব ফেলে আবেগ আর কল্পনাকে আশ্রয় করে ভিক্টর হুগো, ক্যামিলো ক্যাস্তেলো “অবাধ কল্পনাপ্রবণতা”য় বেঁধে ধরলেন সাহিত্য কে। এরপর Dark romanticism, Realism আরও কত কি..!!


বাংলা সাহিত্যেও এরকম দুটি আন্দোলন হয়েছিল। যার একটি ১৯৬১-১৯৬৫ তে আর একটি ১৯৬৯ এ। ১৯৬১-১৯৬৫ এর এই আন্দোলনটি বাংলা সাহিত্যের প্রথম আন্দোলন। বাঁধ ভাঙার আওআজ তুলে, ইশতাহার প্রকাশের মাধ্যমে, বাংলা শিল্প ও সাহিত্যের যে একমাত্র আন্দোলন হয়েছে, তার নাম হাংরি মুভমেন্ট বা ক্ষুধার্ত আন্দোলন । আর্তি বা কাতরতা শব্দগুলো মতাদশর্টিকে সঠিক তুলে ধরতে পারবে না বলে, আন্দোলনকারীরা শেষমেষ এই হাংরি শব্দটি গ্রহণ করেন । উত্তর-ঔপনিবেশিক ভারতবর্ষে্র ঔপনিবেশিক সাহিত্যকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে দিয়ে নিজেদের স্বত্বার বহিঃপ্রকাশ ই ছিল এই আন্দোলন এর আপাত অভিপ্রায়। ১৯৬১ সালের নভেম্বরে পাটনা শহর থেকে একটি ইশতাহার প্রকাশের মাধ্যমে হাংরি আন্দোলনের সূত্রপাত করেছিলেন।


মলয় রায় চৌধুরী এই বিখ্যাত সাহিত্য আন্দলেনের মূল পথিকৃৎ। সেলুকাস এই কবির সাথে ছিলেন কবির দাদা সমীর রায় চৌধুরী, আন্দলনের সম্পাদনায় ও বিতরণে ছিলেন কবি দেবী রায় এবং নেতৃত্বে ছিলেন কবি শক্তি চট্রোপাধ্যায়।
১৯৬১ সাল দেশভাগের ফলে পশ্চিমবঙ্গ এই ভয়ংকর অবসানের মুখে সাহিত্য, ওদিকে আবার পচে গলে পড়ে যাচ্ছে উন্নত ভারত বর্ষের স্বপ্ন। কবি মলয় রায় নিজে বলেছিলেন, “স্বদেশী আন্দোলনের সময় জাতিয়তাবাদী নেতারা যে সুখী, সমৃদ্ধ, উন্নত ভারতবর্ষের স্বপ্ন দেখেছিলেন, তা টকে গিয়ে পচতে শুরু করেছে উত্তর ঔপনিবেশিক কালখণ্ডে ”।
তিনি ওসওয়াল্ড স্পেংলার এর লেখা "The Decline of the West" বইটির মূল বক্তব্য থেকে এই আন্দোলনের দর্শন গড়ে তুলেছিলেন | Oswald Spengler এই বইটিতে বলেছিলেন, কোনো সংস্কৃতির ইতিহাস কেবল একটি সরল রেখা বরাবর যায় না, তা একযোগে বিভিন্ন দিকে প্রসারিত হয় ; তা হল জৈবপ্রক্রিয়া, এবং সেকারণে নানা অংশের কার কোন দিকে বাঁকবদল ঘটবে তা আগাম বলা যায় না| যখন কেবল নিজের সৃজনক্ষমতার উপর নির্ভর করে তখন সংস্কৃতিটি নিজেকে বিকশিত ও সমৃদ্ধ করতে থাকে, তার নিত্যনতুন স্ফূরণ ও প্রসারণ ঘটতে থাকে | কিন্তু একটি সংস্কৃতির অবসান সেই সময় আরম্ভ হয় যখন তার নিজের সৃজনক্ষমতা ফুরিয়ে গিয়ে তা বাইরে থেকে যা পায় তাই আত্মসাৎ করতে থাকে, খেতে থাকে, তার ক্ষুধা তৃপ্তিহীন | তাঁর মনে হয়েছিল যে দেশভাগের ফলে পশ্চিমবঙ্গ ভয়ংকর অবসানের মুখে পড়েছে, এবং উনিশ শতকের মনীষীদের পর্যায়ের বাঙালীর আবির্ভাব আর সম্ভব নয় |


তাঁর মনে হয়েছিল যে কিছুটা হলেও এর বিরুদ্ধে দাঁড়ানো দরকার,আওয়াজ তোলা দরকার, আন্দোলন প্রয়োজন।
অর্থাৎ দেশভাগোত্তর বাঙালির কালখণ্ডটিকে কবিগণ হাংরিরূপে চিহ্ণিত করতে চাইলেন।হাংরি আন্দোলনকারীরা শব্দটি আহরণ করেছিলেন ইংরেজি ভাষার কবি Geoffrey Chaucer এর In Swore Hungry Time বাক্যটি থেকে।
আর সেই ভাবনা থেকেই কবি মলয় রায় তাঁর দাদা সমীর রায়, দুই বন্ধু দেবী রায় এবং শক্তি চট্টোপাধ্যায় এর সাথে ধারনাটি ব্যাখ্যা করেন এবং হাংরি আন্দোলনের প্রস্তাবনা দেন পড়ে তাদের এবং অন্যান্য তরুণ লেখক কবি শিল্পীদের নিয়ে এই আন্দোলন শুরু করেন | নভেম্বর ১৯৬১ সালে প্রথম হাংরি বুলেটিন প্রকাশিত করা হয় পাটনা থেকে এবং সেখানে বাংলা ছাপাবার প্রেস না পাওয়ায় বুলেটিনটি প্রকাশিত করা হয় ইংরেজীতে | অতি স্বল্প কালের মধ্যেই হিন্দী ও নেপালী ভাষাতেও এই আন্দোলন ছড়িয়েছিল। ১৯৬২-৬৩ সালে আন্দোলনে মিশে যান বিনয় মজুমদার, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, উৎপলকুমার বসু, সুবিমল বসাক, ত্রিদিব মিত্র, ফালগুনী রায়, আলো মিত্র, রবীন্দ্র গুহ, সুভাষ ঘোষ, প্রদীপ চৌধুরী, সুবো আচার্য, অরুপরতন বসু, বাসুদেব দাশগুপ্ত, সতীন্দ্র ভৌমিক, শৈলেশ্বর ঘোষ, হরনাথ ঘোষ, নীহার গুহ, আজিতকুমার ভৌমিক, অশোক চট্টোপাধ্যায়, অমৃততনয় গুপ্ত, ভানু চট্টোপাধ্যায়, শংকর সেন, যোগেশ পাণ্ডা, মনোহর দাশ, তপন দাশ, শম্ভু রক্ষিত, মিহির পাল, রবীন্দ্র গুহ, সুকুমার মিত্র, দেবাশিষ মুখোপাধ্যায় প্রমুখ । অনিল করঞ্জাই এবং করুণানিধান নামের দুজন চিত্রকরও ছিলেন এই আন্দোলনে ।


এই আন্দোলন কে নিয়ে স্বয়ং মলয় রায়চৌধুরীর লেখা, দিল্লী থেকে প্রকাশিত পত্রিকা "দিগঙ্গন" এর উত্সব সংখ্যা ২০০৪ এ প্রকাশিত "প্রতিসন্দর্ভের স্মৃতি" প্রবন্ধতে তিনি বলেন,
"ইউরোপের শিল্প-সাহিত্য আন্দোলনগুলো সংঘটিত হয়েছিল একরৈখিক ইতিহাসের ধারণার বনেদের ওপর; কল্লোল বা কৃত্তিবাস গোষ্ঠী যে নবায়ন এনেছিলেন সে কাজগুলো ছিল কলোনিয়াল ইসথেটিক রিয়্যালিটি বা ঔপনিবেশিক বাস্তবতার চৌহদ্দির মধ্যে, কেন না সেগুলো ছিল যুক্তিগ্রন্হনা-নির্ভর, এবং তাঁদের মনোবীজে অনুমিত ছিল যে ব্যক্তিপ্রতিস্বের চেতনা ব্যাপারটি একক, নিটোল ও সমন্বিত ।" তঁরা বললেন, "এই ভাবকল্পের প্রধান গলদ হল যে তার সন্দর্ভগুলো নিজেদেরকে পূর্বপুরুষদের তুলনায় উন্নত মনে করে, এবং স্হানিকতেকে ও অনুস্তরীয় আস্ফালনকে অবহেলা করে । ওই ভাবকল্পে যে বীজ লুকিয়ে থাকে, তা যৌথতাকে বিপন্ন আর বিমূর্ত করার মাধ্যমে যে-মননর্স্তাস তৈরি করে, তার দরুন প্রজ্ঞাকে যেহেতু কৌমনিরপেক্ষ ব্যক্তিলক্ষণ হিসাবে প্রতিষ্ঠা দেয়া হয়, সমাজের সুফল আত্মসাৎ করার প্রবণতায় ব্যক্তিদের মাঝে ইতিহাসগত স্হানাঙ্ক নির্ণয়ের হুড়োহুড়ি পড়ে যায় । গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে ব্যক্তিক তত্ত্বসৌধ নির্মাণ । ঠিক এই কারণেই, ইউরেপীয় শিল্প-সাহিত্য আন্দোলনগুলো খতিয়ে দেখলে দেখা যায় যে ব্যক্তিপ্রজ্ঞার আধিপত্যের দামামায় সমাজের কান ফেটে এমন রক্তাক্ত যে সমাজের পাত্তাই নেই কোনো । কৃত্তিবাস গোষ্ঠীর দিকে তাকালে দেখা যাবে যে পঁজিবলবান প্রাতিষ্ঠানিকতার দাপটে এবং প্রতিযোগী ব্যক্তিবাদের লালনে শতভিষা গোষ্ঠী যেন অস্তিত্বহীন । এমনকি কৃত্তিবাস গোষ্ঠিও সীমিত হয়ে গেছে মাত্র কয়েকজন মেধাসত্তবাধিকারীর নামে । পক্ষান্তরে, ঔপনিবেশিক ননগদনতন্ত্রের আগেকার প্রাকঔপনিবেশিক ডিসকোর্সের কথা ভাবা হয়, তাহলে দেখা যায় যে পদাবলী সাহিত্য নামক ম্যাক্রো পরিসরে সংকুলান ঘটেছে বৈষ্ণব ও শাক্ত কাজ, মঙ্গলকাব্য নামক পরিসরে সংকুলান ঘটেছে মনসা, চণ্ডী, শিব, কালিকা বা ধর্মঠাকুরের মাইক্রো-পরিসর । লক্ষ্মণিয় যে প্রাকৌপনিবেশিক কালখণ্ডে সন্দর্ভ গুরুত্ত্বপূর্ণ ছিল, তার রচয়িতা নয় । তার কারন সৃজনশীলতার ক্ষেত্রে ব্যাক্তি মালিকানার উদ্ভব ও বিকাশ ইউরোপীয় অধিবিদ্যাদত মননবিশ্বের ফসল।”


হাংরি আন্দোলনকারিরা প্রধানত একপৃষ্ঠার বুলেটিন প্রকাশ করতেন । এক পাতার বুলেটিনে তঁরা কবিতা, রাজনীতি, ধর্ম, অশ্লীলতা, জীবন, ছোটগল্প, নাটক, উদ্দেশ্য, দর্শন ইত্যাদি বিষয়ে ইশতাহার লেখা ছাড়াও, কবিতা, গদ্য, অনুগল্প, স্কেচ ইত্যাদি প্রকাশ করেছিলেন । বুলেটিনগুলো হ্যান্ডবিলের মতন কলকাতার কলেজ স্ট্রিট কফি হাউস, পত্রিকা দপতর, কলেজগুলোর বাংলা বিভাগ ও লাইব্রেরি ইত্যাদিতে তাঁরা বিতরন করতেন । হাংরি আন্দোলনের কথা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার এইটি-ই প্রধান কারণ বলে মনে করেন গবেষকরা । কিন্তু হ্যান্ডবিলের মতন প্রকাশ করায় তাঁরা ক্ষতি করেছেন নিজেদের, কারন অধিকাংশ বুলেটিন সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়নি।

১৯৬৩-৬৫ সালের মাঝে হাংরি আন্দোলনকারীরা কয়েকটি পত্রিকাও প্রকাশ করেছিলেন । সেগুলো হল, সুবিমল বসাক সম্পাদিত প্রতিদ্বন্দ্বী, ত্রিদিব মিত্র সম্পাদিত উন্মার্গ, মলয় রায়চৌধুরী সম্পাদিত জেব্রা, দেবী রায় সম্পাদিত চিহ্ণ, প্রদীপ চৌধুরী সম্পাদিত ফুঃ সতীন্দ্র ভৌমিক সম্পাদিতএষণা, এবং আলো মিত্র সম্পাদিত ইংরেজি দি ওয়েস্ট পেপার ।
১৯৬৩ সালের শেষদিকে সুবিমল বসাক, দেবী রায় ও মলয় রায়চৌধুরীর কিছু-কিছু কর্মকাণ্ডের কারণে হাংরি আন্দোলন বাঙালির সংস্কৃতিতে প্রথম প্রতিষ্ঠানবিরোধী গোষ্ঠী হিসাবে পরিচিত হয় । বহু আলোচক হাংরি আন্দোলনকারীদের সে সময়ের কার্যকলাপে দাদাইজম প্রভাব লক্ষ্য করেছেন । এই কারণে শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, সতীন্দ্র ভৌমিক প্রমুখ হাংরি আন্দোলন ত্যাগ করেন ।এই সমস্ত কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তাঁরা দাবী করতেন যে অচলায়তনকে ভাঙা যাবে । অবশ্য তাঁদের অনুকরণে পরবর্তীকালে বহু প্রতিষ্ঠানবিরোধী লেখক এসেছেন বাংলা সাহিত্যে ।


১৯৬৪ সালে, তত্কালীন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্ল চন্দ্র সেনের রাজত্যকালে, মলয় রায়চৌধুরী, প্রদীপ চৌধুরী, সুভাষ ঘোষ, দেবী রায়, শৈলেশ্বর ঘোষ ও সমীর রায়চৌধুরীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করার অভিযোগ এনে গ্রেপ্তার করা হয়| পরে অন্য সবাইকে ছেড়ে দিয়ে শুধু মলয় রায়চৌধুরীর বিরুদ্ধে অশ্লীল সাহিত্য রচনা করার অভিযোগে মামলা করা হয়, তাঁর "প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার” কবিতাটির জন্য | হাংরি আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে্ল৩৫ মাস, অর্থাৎ ১৯৬৭ পর্যন্ত মামলা চলতে থাকে।


২৬ জুলাই ১৯৬৭ তে উচ্চ আদালত মলয় রায় চৌধুরী কে বেকসুর খালাস করে দেন। আর এভাবেই শেষ হয় ক্ষুধিত কবিদের হাহাকার। চোর ডাকাতের পাশে হাতকড়া পড়ে হেঁটে যাওয়া কবি এবং কবি আর তাদের ম্লান হয়ে যাওয়া কষ্ট ঢাকা পড়ে যায় এক নূতন সম্ভাবনায়।


হাংরি আন্দোলনকারীরা বৈপ্লবিক পরিবর্তনএর প্রথম ফল পাওয়া গেল নামকরণে যেমন, আবার এসেছি ফিরে, মানুষের বাচ্চা, আমি আর লীনা হঁটে চলেছি, ক্ষেপচুরিয়াস, ইত্যাদি । হাংরি আন্দোলন প্রথম যৌথভাবে প্রন্তিকের ডিসকোর্সকে স্হান করে দিল । হাংরি আন্দোলনকারীদের কবিতায় একটি ছবি সম্পূর্ণ গড়ে ওঠার আগেই তা মিলিয়ে গিয়ে আরেকটি ছবি ভেসে ওঠে । বাংলা কবিতায় এটি এখন প্রতিষ্ঠিত শৈলী । কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগীব প্রধান ড. তরুণ মুখোপাধ্যায় এদের ব্যপারে লিখেছেন, "ভাষায়, ছন্দে, অলংকার, স্তবকে তুমুল ভাংচুর" করেছেন তাঁরা”।

হাংরি জেনারেশন সম্পর্কে পার্বণ মাজাহারের ধ্যানধারণা

পুলিশি পাহারার মধ্যদিয়ে হাতে কোমরে দড়িবেঁধে চোর-ডাকাতের মতো আদালতে হাজির করা হচ্ছে একজনকে, রাষ্ট্রের চোখে তিনি আসামি। একটি কবিতায় অশ্লীলতার দায়ে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পুলিশের এই আয়োজন। আসামীর  নাম কবি মলয় রায়চৌধুরী তার  রচিত সে কবিতাটির নাম ‘প্রচন্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’।  সাহিত্যে অশ্লীলতার দায়ে মামলাটি ৩৫ মাস চলমান থাকে। নিম্ন আদালতের রায়ে এক মাসের সাঁজা হয় মলয় রায়চৌধুরীর, পরে উচ্চ আদালতে বেকুসর ছাড়া পান। প্রচন্ড বৈদ্যুতিক ছুতার কোন স্বতন্ত্র কবিতা না হয়ে একটি সাহিত্য আন্দোলনের প্রতিনিধি হয়ে উঠল, কবি মলয় রায়চৌধুরীর এই আলোচিত কবিতা যে আন্দোলনের প্রতিনিধিত্ব করে তার নাম ‘হাংরি আন্দোলন’। হাংরি আন্দোলনের আন্দোলনকারীরা হাংরি জেনারেশনের কবি সাহিত্যিক হিসেবে পরিচিত। দেশভাগের পরবর্তী সময়ে বাংলা সাহিত্যে একধরনের প্রচলিত ধারায় পদচারণের দৃশ্যত অনুকরণ ইচ্ছা এবং তার প্রতিফলন  বাংলা সাহিত্যে এক স্থবিরতার জন্ম দেয়। এক প্রকারের স্থবির অবস্থা চলতে থাকে, এই স্থবিরতা ভেঙে দিতে ক্ষুদার্ত তরুণ কয়েকজন কবি-সাহিত্যিক মিলে ইস্তেহার বের করেন, পত্রিকা-হেন্ডবিলে প্রকাশ করতে থাকেন তাদের রচনা। ক্ষুধার্ত কবিদের সে সমস্ত সাহিত্য সে সময়ে রাষ্ট্র ও তার অনুগামীদের ভাল্লাগ্লোনা! রাষ্ট্র সে সাহিত্য আন্দোলনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলো!

জার্মান সমাজতাত্ত্বিক অসওয়াল্ড স্পেংলারের ‘দি ডিক্লাইন অব দি ওয়েস্ট’ গ্রন্থটি ছিলো হাংরি আন্দোলনের তাত্ত্বিকভিত্তি। এই বইয়ের দর্শনগত দিকদিয়ে সে সময়ের বাংলা সাহিত্য ও সামাজিক অবস্থাকে  ক্ষুৎপীড়িত  অবক্ষয় হিসেবে দেখলেন হাংরি জেনারেশনের কবিরা। স্পেংলারের মতো তারাও ভাবলেন, সংস্কৃতি কখনই একটি সরলরেখা বরাবর চলতে পারে না, পূর্ব পরিকল্পনা ছাড়াই সময়ে সময়ে তার পরিধি বিস্তার ঘটে। সংস্কৃতির গতিবিধি একটি জৈবিক প্রক্রিয়া। সংস্কৃতির সে গতিবিধি নিজস্ব সৃজনশীলতার দ্বারা বিকশিত ও সমৃদ্ধ করা সম্ভব। তবে সে সৃজনশীলতায় ঘটতি দেখা দিলে সংস্কৃতি অনান্য সমাজের দ্বারা প্রভাবিত হতে থাকবে, তৈরি হবে এক ক্ষুধার্ত পরিস্থিতির । হাংরি অন্দোলনের কবি সাহিত্যিকরা ৬০’র  দশককে ক্ষুৎকাতর সময় হিসেবে চিহ্নিত করেন। দেশভাগে পর থেকে জন্ম নিয়েছে এই  ক্ষুৎকাতরতার যা কাটিয়ে উঠতেই হাংরি আন্দোলনের সুত্রপাত। হাংরি আন্দোলনের সাহিত্যিকরা  তাদের আন্দোলনকে কাউন্টার কালচারাল মুভমেন্ট এবং তাঁদের সাহিত্যকর্মকে কাউন্টার ডিসকোর্স  হিসেবে প্রচার করেন।
 
১৯৬১ সালের নভেম্বর মাসে কলকাতার পাটনা থেকে ইস্তেহার প্রকাশের মধ্যদিয়ে হাংরি আন্দোলনের  জন্ম। শুরুর দিকে সমীর রায়চৌধুরী, মলয় রায়চৌধুরী, শক্তি চট্টোপাধ্যায় এবং দেবী রায়ের মতো কবি সাহিত্যিকরা ছিলেন এই অন্দোলনের দিকনির্দেশক হিসেবে , ১৯৬২ -৬৩’তে যুক্ত হন বিনয় মজুমদার, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, উৎপলকুমার বসু, সুবিমল বসাক, ত্রিদিব মিত্র ও ফালগুনী রায়ের মতো বাঙালি কবি সাহিত্যিকরা।

এই সাহিত্য আন্দোলনের প্রচারণা জন্য শুরু থেকেই  প্রকাশ হতো  একপৃষ্ঠার ব্যলেটিন। কলকাতার বিভিন্ন লাইব্রেরি, কফি হাউজে, কলেজগুলোতে  এবং পত্রিকা দফতরে বিতরণের মধ্য দিয়েই চলতো প্রচার অভিযান। এই প্রচারনার ফলে চারদিকে আন্দোলনের কথা পৌঁছাতে থাকে, অন্যদিকে এই সফলতার পাশাপাশি ১৯৬৩-৬৫ তে বেশকিছু পত্রিকাও প্রকাশিত হয় সেগুলোর মধ্যে সুবিমল বসাক সম্পাদিত প্রতিদ্বন্দ্বী, ত্রিদিব মিত্র সম্পাদিত উন্মার্গ, মলয় রায়চৌধুরী সম্পাদিত জেব্রা, দেবী রায় সম্পাদিত চিহ্ণ, প্রদীপ চৌধুরী সম্পাদিত ফুঃ অন্যতম ।

এসব বুলেটিন ও পত্রিকায় প্রকাশিত হয় কবিতা , অনুগল্প, নাটক, চিত্রকর্ম যার মধ্যদিয়ে উঠে আসে ধর্ম, রাজনীতি, জীবনবোধ,দর্শন । শিল্প বা আর্ট বলতে যা বুঝি তা যে ইউরুপিয়দের দ্বারা সংজ্ঞায়িত তাও সামনে নিয়ে আসেন মলয় রায়চৌধুরীরা, বাংলার শিল্প বা আর্ট তৈরী যে অতিসাধারণদের হাত ধরেও হয়েছিলো তাও গুরুত্ব সহকারে জায়গা পায় ইস্তেহারে, কবিগান ও কবিগানের ভাষারীতি যে অনন্য  বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন শিল্প তার প্রসঙ্গও জায়গা পায় আন্দোলনের ইস্তেহারে। শিল্প সৃষ্টিতেও শ্রোণীবৈষম্য যে একটি বিশেষ স্থান নিয়ে আছে, কাকে শিল্পী বলা হবে তাতে পুঁজিবাদের প্রভাব নিয়েও সচেতন অবস্থান হাংরি বুলেটনে উঠে আসে। প্রতিষ্ঠান বিরোধীরা ছিলো হাংরি জেনারেশন কবিদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য,তাঁরা প্রতিষ্ঠান বিরোধী প্রথম বাঙ্গালী সাহিত্যিক হিসেবে পরিচিত।

তাত্ত্বিক ও দর্শনগত বিষয়াদির কারণে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় সহ ইউরুপে হাংরি আন্দোলনের  পক্ষে সমর্থন তৈরী হয়। বিখ্যাত ইংরেজ কবি কবি অ্যালেন গিন্সবার্গ কলকাতায় থাকাকালীন ইংরেজি হাংরি বুলেটিনগুলো সংগ্রহ করে পরবর্তীতে স্ট্যনফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে দান করেন।

১৯৬৪ সালে মলয় রায়চৌধুরীর বিরুদ্ধে অশ্লীলতার দায়ে ‘প্রচন্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ সংক্রান্ত মামলায় সুভাষ ঘোষ ও শৈলেশ্বর ঘোষের মুচলেকা দেওয়া এবং আন্দোলনরত শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় ও উৎপলকুমার বসুর পুলিশের পক্ষে সাক্ষ্য দেওয়া সহ অনেকের অংশগ্রহণের কথা অস্বীকৃতির ফলে হাংরি অন্দোলনের সমাপ্তি ঘটে। পরবর্তীতে সত্তর দশকের দিকে অরুণেষ ঘোষ প্রকাশ করেন জিরাফ, অলোক গোস্বামী প্রকাশ করেন কনসেনত্রশান ক্যাম্প, সুভাষ ঘোষ সম্পাদনা করেন আর্তনাদ ইত্যাদি পত্রিকাতে আবারো হাংরি আন্দোলনকে জিইয়ে রাখার চেষ্টা হয় তবে তাও অচিরেই ব্যর্থ হয়।

শুক্রবার

একটি কবিতা : শুদ্ধ বসু

ওঃ মরে যাব মরে যাব মরে যাব
আমার চামড়ার লহমা জ্বলে যাচ্ছে অকাট্য তুরুপে
আমি কী কোর্বো কোথায় যাব ওঃ কিছুই ভাল্লাগছে না
সাহিত্য-ফাহিত্য লাথি মেরে চলে যাব শুভা
শুভা আমাকে তোমার তর্মুজ আঙরাখার ভেতর চলে যেতে দাও
চুর্মার অন্ধকারে জাফ্রান মশারির আলুলায়িত ছায়ায়
সমস্ত নোঙর তুলে নেবার পর শেষ নোঙর আমাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে
আর আমি পার্ছি না, অজস্র কাঁচ ভেঙে যাচ্ছে কর্টেক্সে
আমি জানি শুভা, যোনি মেলে ধরো, শান্তি দাও
প্রতিটি শিরা অশ্রুস্রোত বয়ে নিয়ে যাচ্ছে হৃদয়াভিগর্ভে
শাশ্বত অসুস্হতায় পচে যাচ্ছে মগজের সংক্রামক স্ফুলিঙ্গ
মা, তুমি আমায় কঙ্কালরূপে ভূমিষ্ঠ করলে না কেন ?
তাহলে আমি দুকোটি আলোকবষহ ঈশ্বরের পোঁদে চুমো খেতুম
কিন্তু কিছুই ভলো লাগছে না আমার কিচ্ছু ভালো লাগছে না
একাধিক চুমো খেলে আমার গা গুলোয়
ধর্ষণকালে নারীকে ভুলে গিয়ে শিল্পে ফিরে এসেছি কতদিন
কবিতার আদিত্যবর্ণা মূত্রাশয়ে
এসব কী হচ্ছে জানি না তবু বুকের মধ্যে ঘটে যাচ্ছে অহরহ
সব ভেঙে চুরমার করে দেব শালা
ছিন্নভিন্ন করে দেব তোমাদের পাঁজরাবদ্ধ উৎসব
শুভাকে হিঁচড়ে উঠিয়ে নিয়ে যাব আমার ক্ষুধায়
দিতেই হবে শুভাকে
ওঃ মলয়
কোল্কাতাকে আর্দ্র ও পিচ্ছিল বরাঙ্গের মিছিল মনে হচ্ছে আজ
কিন্তু আমাকে নিয়ে আমি কী কোর্বো বুঝতে পার্ছি না
আমার স্মৃতিশক্তি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে
আমাকে মৃত্যুর দিকে যেতে দাও একা
আমাকে ধর্ষণ ও মরে যাওয়া শিখে নিতে হয়নি
প্রস্রাবের পর শেষ ফোঁটা ঝাড়ার দায়িত্ব আমায় শিখতে হয়নি
অন্ধকারে শুভার পাশে গিয়ে শুয়ে পড়া শিখতে হয়নি
শিখতে হয়নি নন্দিতার বুকের ওপর শুয়ে ফরাসি চামড়ার ব্যবহার
অথচ আমি চেয়েছিলুম আলেয়ার নতুন জবার মতো যোনির সুস্হতা
যোনোকেশরে কাঁচের টুকরোর মতন ঘামের সুস্হতা
আজ আমি মগজের শরণাপন্ন বিপর্যয়ের দিকে চলে এলুম
আমি বুঝতে পার্ছি না কী জন্যে আমি বেঁচে থাকতে চাইছি
আমার পূর্বপুরুষ লম্পট সাবর্ণচৌধুরীদের কথা আমি ভাবছি
আমাকে নতুন ও ভিন্নতর কিছু কোর্তে হবে
শুভার স্তনের ত্বকের মতো বিছানায় শেষবার ঘুমোতে দাও আমায়
জন্মমুহূর্তের তীব্রচ্ছটা সূর্যজখম মনে পড়ছে
আমি আমার নিজের মৃত্যু দেখে যেতে চাই
মলয় রায়চৌধুরীর প্রয়োজন পৃথিবীর ছিল না
তোমার তীব্র রূপালি য়ূটেরাসে ঘুমোতে দাও কিছুকাল শুভা
শান্তি দাও, শুভা শান্তি দাও
তোমার ঋতুস্রাবে ধুয়ে যেতে দাও আমার পাপতাড়িত কঙ্কাল
আমাকে তোমার গর্ভে আমারই শুক্র থেকে জন্ম নিতে দাও
আমার বাবা-মা আন্য হলেও কি আমি এরকম হতুম ?
সম্পূর্ণ ভিন্ন এক শুক্র থেকে মলয় ওর্ফে আমি হতে পার্তুম ?
আমার বাবার অন্য নারীর গর্ভে ঢুকেও কি মলয় হতুম ?
শুভা না থাকলে আমিও কি পেশাদার ভদ্রলোক হতুম মৃত ভায়ের মতন ?
ওঃ বলুক কেউ এসবের জবাবদিহি করুক
শুভা, ওঃ শুভা
তোমার সেলোফেন সতীচ্ছদের মধ্যে দিয়ে পৃথিবীটা দেখতে দাও আমায়
পুনরায় সবুজ তোশকের ওপর চলে এসো শুভা
যেমন ক্যাথোড রশ্মিকে তীক্ষ্ণধী চুম্বকের আঁচ মেরে তুলতে হয়
১৯৫৬ সালের সেই হেস্তনেস্তকারী চিঠি মনে পড়ছে
তখন ভাল্লুকের ছাল দিয়ে সাজানো হচ্ছিল তোমার ক্লিটোরিসের আশপাশ
পাঁজর নিকুচি করা ঝুরি তখন তোমার স্তনে নামছে
হুঁশাহুঁশহীন গাফিলতির বর্ত্মে স্ফীত হয়ে উঠছে নির্বোধ আত্মীয়তা
আ আ আ আ আ আ আ আ আ আঃ
মরে যাব কিনা বুঝতে পার্ছি না
তুল্কালাম হয়ে যাচ্ছে বুকের ভেতরকার সমগ্র অসহায়তায়
সব কিছু ভেঙে তছনছ করে দিয়ে যাব
শিল্পের জন্যে সক্কোলকে ভেঙে খান-খান করে দোব
কবিতার জন্যে আত্মহত্যা ছাড়া স্বাভাবিকতা নেই
শুভা
আমাকে তোমার লাবিয়া ম্যাজোরার স্মরণাতীত অসংযমে প্রবেশ কোর্তে দাও
দুঃখহীন আয়াসের অসম্ভাব্যতায় যেতে দাও
বেসামাল হৃদয়বত্তার স্বর্ণসবুজে
কেন আমি হারিয়ে যাইনি আমার মায়ের যোনিবর্ত্মে ?
কেন আমি পিতার আত্মমৈথুনের পর তাঁর পেচ্ছাপে বয়ে যাইনি ?
কেন আমি রজোস্রাবে মিশে যাইনি শ্লেষ্মায় ?
অথচ আমার নীচে চিত আধবোজা অবস্হায়
আরামগ্রহণকারিণী শুভাকে দেখে ভীষণ কষ্ট হয়েছে আমার
এরকম অসহায় চেহারা ফুটিয়েও নারী বিশ্বাসঘাতিনী হয়
আজ মনে হয় নারী ও শিল্পের মতো বিশ্বাসঘাতিনী কিছু নেই
এখন আমার হি২স্র হৃৎপিণ্ড অসম্ভব মৃত্যুর দিকে যাচ্ছে
মাটি ফুঁড়ে জলের ঘূর্ণি আমার গলা ওব্দি উঠে আসছে
আমি মরে যাব
ওঃ এসমস্ত কী ঘটছে আমার মধ্যে
আমি আমার হাত হাতের চেটো খুঁজে পাচ্ছি না
পায়জামায় শুকিয়ে-যাওয়া বীর্য থেকে ডানা মেলছে
৩০০০০০ শিশু উড়ে যাচ্ছে শুভার স্তনমণ্ডলীর দিকে
ঝাঁকে-ঝাঁকে ছুঁচ ছুটে যাচ্ছে রক্ত থেকে কবিতায়
এখন আমার জেদি ঠ্যাঙের চোরাচালান সেঁদোতে চাইছে
হিপ্নোটিক শব্দরাজ্য থেকে ফাঁসানো মৃত্যুভেদী যৌনপর্চুলায়
ঘরের প্রত্যেকটা দেয়ালে মার্মুখি আয়না লাগিয়ে আমি দেখছি
কয়েকটা ন্যাংটো মলয়কে ছেড়ে দিয়ে তার আপ্রতিষ্ঠিত খেয়োখেয়ি
( হাংরি বুলেটিন, ১৯৬৪ )
----------------------------------
( এই কবিতাটির জন্য ১৯৬৪ সালে মলয় রায়চৌধুরীর বিরুদ্ধে মকদ্দমা করেছিল তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গ সরকার। মলয়ের হাতে হাতকড়া পরিয়ে ও কোমরে দড়িবেঁধে প্রথমে থানায় এবং থানা থেকে ছয়-সাতজন অপরাধীর সঙ্গে রাস্তা দিয়ে হাঁটিয়ে কোর্টে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। মলয়ের বিরুদ্ধে ৩৫ মাস মামলাটি চলে প্রথমে নিম্ন আদালতে, যেখানে মলয়ের একমাস জেলের সাজা ঘোষিত হয় ও তারপর কলকাতা উচ্চ আদালতে, যেখানে তিনি বেকসুর ছাড়া পান। মলয়ের পক্ষে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন তরুণ সান্যাল, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, জ্যোতির্ময় দত্ত, সত্রাজিৎ দত্ত ও অজয় হালদার। পাঠকের হয়ত আশ্চর্য লাগবে, মলয়ের বিরুদ্ধে পুলিসের পক্ষের সাক্ষী ছিলেন শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় ও উৎপলকুমার বসু। দুজন পুলিস ইনফর্মার, পবিত্র বল্লভ ও সমীর বসু, ছিলেন পুলিসের ভুয়ো সাক্ষী, যাঁরা মলয়ের পরিচিত না হওয়া সত্ত্বেও কোর্টে জানান যে মলয়ের সঙ্গে তাঁদের বহুবার কফিহাউসে দেখা হয়েছে। সবচেয়ে লজ্জার যে দুজন হাংরি আন্দোলনকারী রাজসাক্ষী , অর্থাৎ অ্যাপ্রুভার, হয়ে মলয়ের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেন; তাঁরা দুজন হলেন শৈলেশ্বর ঘোষ ও সুভাষ ঘোষ।এঁদের সাক্ষ্যের কারণেই নিম্ন আদালত মলয়কে সাজা দিয়েছিল ।)

বৃহস্পতিবার

সুবোধ সরকার : আন্দোলনের 'এক্সপায়ারি ডেট' হয় ? [ হাংরি আন্দোলন ]

সুবোধ সরকার : আন্দোলনের 'এক্সপায়ারি ডেট' হয় ? [ হাংরি আন্দোলন ]

                                    


কবিতা লেখে একজন কিন্তু ফুটবল খেলে এগারো জন ।

আন্দোলন করতে লোক লাগে । পত্রিকা লাগে । চাঁদা তুলতে হয় । টাকা লাগে । কিন্তু যিনি লেখেন, তাঁর কিছু লাগে না । তাঁর লাগে একটা কলম, সাদা কাগজ, আর এক বাটি আগুন -- যেটা তাঁর মাধায় থাকে । যাঁরা দেখতে পান, তাঁরা দেখেন, লেখকের মাথা থেকে চুলের ভিতর দিয়ে মাঘ নিশীথের ধোঁয়া বেরিয়ে আসছে । 

বাংলা কবিতায় আন্দোলন হয়েছে, কিন্তু তেমন কোনও কাজে লাগেনি । গত পঞ্চাশ বছরে সবচেয়ে বড়ো আন্দোলনের নাম 'হাংরি' । 'টাইম' ম্যাগাজিনে  তার কাইনি ছাপা হয়েছিল, আবার এদিকে উচ্চ আদালতে উঠেছিল । এত বড় সৌভাগ্য আর কোনো সাহিত্য আন্দোলন উদযাপন করতে পারেনি ।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় একটা চিঠি লিখছেন আয়ওয়া থেকে সমীর রায়চৌধুরীকে ।

আমেরিকার 'বিট আন্দোলন' ১৯৬৪ সালের মধ্যে শেষ হয়ে গিয়েছে -- সেটাই জানাচ্ছেন সুনীল । তিনি লিখছেন, 'বিট আন্দোলন সম্পূর্ণ ভেঙে গেছে  -- সবাই বিচ্ছিন্ন, অনেকের সঙ্গে অনেকের ঝগড়া । একমাত্র অ্যালেনই আনকমপ্রোমাইজিং এখনও । বিট আন্দোলন মরে ভুত হয়ে গেছে -- এখন ওর নকল আন্দোলন আমাদের ভারতবর্ষে আরম্ভ হওয়া স্বাভাবিক । আমি আয়ওয়া ছাড়ছি ১০/১২ তারিখ । তারপর কিছুদিন নিউ ইয়র্ক । তারপর মার্গারিটের সঙ্গে দেখা করব প্যারিসে । তারপর যদি পয়সা থাকে লণ্ডন ও রোমে দু'চারদিন ।'

'গোখরোর আন্দোলিত উহুরু' নামে একটি গদ্যে মলয় রায়চৌধুরী চুরমার করে ছেড়ে দেওয়া একটি মন্তব্য করেছিলেন -- 'কবিতা হল আস্তিনের ভেতর থেকে ঝলসানো বাহুর সিগনালিঙ । কবিতার বিষয়বস্তু এখন আমি । আমিই সিসমোগ্রাফ, আমিই ভূমিকম্প, আমিই ভাঙাচোরা খেতখামার।' এই কথা যিনি লিখতে পারেন, তিনি কবি নন, তিনি 'ঋষি' । কিছুটা হাত গোটানো, কিছুটা মস্তান, কিন্তু তিনি ঋষি এবং একজন হাংরি । এই মহৎ কথাগুলো বলে ফেলে মলয় কি হাংরি আন্দোলনের কফিনে শেষ পেরেকটি মেরে দিলেন ? কেননা তিনি নিজেই বলছেন, 'আমি মনে করি ১৯৬৫ সনে যেদিন পুলিশ আমাকে চার্জশিটের সঙ্গে শৈলেশ্বর, সুভাষ প্রভৃতির মুচলেকা দেয়, সেদিনই হাংরি আন্দোলন ভেঙে যায় ।' কী আশ্চর্য ! সুনীল লিখছেন এক বছর আগে আয়ওয়া থেকে, বিট আন্দোলন মরে ভুত হয়ে গিয়েছে । আর মলয় বলছেন হাংরি শেষ হয়ে গেল ।
                                                                 

সেই সময়, ১৯৬৪, মির্জাপুর স্ট্রিট থেকে একটি কুশ্রী লিফলেট ছাড়া হয় বাজারে, তার রচয়িতা ও প্রকাসক ছিলেন পাঁচের দশকের পাঁচটি ( তিনটিও বলা যায় ) শ্রেষ্ঠ ভূকম্পনের একটি -- 'ফিরে এসো চাকার' কবি বিনয় মজুমদার ।

কী লেখা হয়েছিল লিফলেটে ? একটি অংশ তুলে দিই :
'শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের অনিপুণ নপুংসকরূপ আশা করি এ যাবৎ পাঠাকপাঠিকা স্বচক্ষে দেখার সুযোগ পাননি । -- কবিটির জন্ম কি কুকুর আর গাধার সঙ্গমজাত ফল ?...রেকটাম বিট করে দিয়েচি বলেই এইসব কেঁচোবৃন্দ বীটনিক নাম নিয়েছিল।'

একজন বৃহৎ কবি আরেকজন বৃহৎ কবিকে এত খারাপ ভাষায় আক্রমণ করতে পারেন, আগে জানা ছিল না । তবে কে কাকে আক্রমণ করছেন, সেটা আমার বিষয় নয় । কবিরাই তো কবিদের সবচেয়ে খারাপ ভাষায় আক্রমণ করে এসেছেন সারা পৃথিবীতে । কবিরাই কবিদের সহ্য করতে পারেন না, কবিরাই আবার অন্যদের বলেন অসহিষ্ণু, গভীরে নেমে খোঁজ করলেই দেখা যাবে এসব ব্যক্তিগত কারণে । রাষ্ট্র, সমাজ, ধর্ম -- ওগুলো সব আসলে 'বাহানা'। মহম্মদ দারউইস বলেছিলেন : 'তোমার কুৎসা ওরা করতই, এতদিন অপেক্ষা করছিল একটা রাষ্ট্রীয় সংকটের জন্য, সংকটের সময় একজন কবিকে পেটানো অনেক সহজ হয়ে যায়, সংকটের জন্য কে দায়ী, সেটা তৎক্ষণাৎ বিচার করা যায় না, কিন্তু অন্ধকার ঝোপে লাঠি চালানো যায় ।'
                             

একটা আন্দোলন কি তুবড়ির মতো আকাশে উঠে, মাটিতে নামতে নামতেই ফুরিয়ে যায় ? একটা আন্দোলন কি 'এক্সপায়ারি ডেট'-সমেত জন্ম লাভ করে ?আমি সাহিত্যের ইতিহাসের ছাত্র হিসাবে লক্ষ করেছি আকাশে উঠতে এবং আকাশ থেকে নামতে এবং ছাই হয়ে ভস্ম হয়ে মাটিতে ঝরে পড়তে গেলেও একটা যুগ লাগে । নিজেকে বিনাশ করে ভস্ম নিজেই ঝরে পড়ে মাটিতে, কিন্তু মাটির পোড়া অংশ তখন ইতিহাসের নবীন মাথা তুলে ধরে । সেটা 'হাংরি' যেমন করেছে, 'শ্রুতি'ও করেছে । কিন্তু নাম হল 'কৃত্তিবাস'-এর । নাম হয়েছে 'কবিতা'র । এখানেই তো মজা ! 'কবিতা' কোনো ঘোষিত আন্দোলন করেনি । কিন্তু বুদ্ধদেব বসুর নেতৃত্বে 'কবিতা' হয়ে উঠল সবচেয়ে বড় 'গেম চেঞ্জার' । শত অপমানের ভিতর মাথা তুলে দাঁড়ালেন বরিশালের জীবনানন্দ দাশ । একাই হয়ে উঠলেন একটি জাতি । একাই হয়ে উঠলেন একটি ভাষা । একাই হয়ে উঠলেন একটি উপমহাদেশ ।

হাংরিদের সঙ্গে থেকে এবং নিজেকে আপৎকালীন অবস্হায় সরিয়ে নিয়ে সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় লিখেছিলেন, 'আমি বিশ্বাস করি একজন লেখক একাই তার মৌলিক ভাষাশৈলী নিয়ে একশো । সে নিজেই মানুষ, সভ্যতা এবং সমাজ বিপ্লবের স্হাবর নিদর্শন । কাজেই অনেকে মিলেজুলে ওভাবে হয় না ।'

অনেকে মিলে ফুটবল খেলতে হয়, মৃগয়ায় যেতে হয়, পাহাড় কাটতে হয়, কিন্তু ভাষা তৈরি করার সময় কেউ পাশে থাকেন না , তখন একজন লেখক একা এবং নিষ্ঠুর, তিনি জানেন তাঁকে বিরাট পাহাড়ের ভিতর নিজের গাঁইতি চালিয়ে একটা গুহা বানাতে হবে ।

গুহাগাত্রে প্রতিটি বাক্যের শেষে যেন তাঁর সই থাকে ।

আমরা জানি প্রতিটি বাক্যের শেষে কোনও লেখক সই করেন না, কিন্তু সই থেকে যায় ।
[ প্রতিদিন ( ছুটি ) পত্রিকায় ১৪ই মে ২০১৭ তারিখে প্রকাশিত ]

শুক্রবার

অজিত রায় : আভাঁগার্দ আন্দোলন - হাংরি আন্দোলন

                                     

নষ্ট তৈজসে সমলৈঙ্গিক গিল্টি

অজিত রায়

কলকাতা-কেন্দ্রিক ন্যাকাচিত্তির সাহিত্যের এঁদো কপচাবাজি এবং তার ভেক্টর প্রতিষ্ঠানের মুখে জোর থাপ্পড় মেরে তার গিল্টি-করা দাঁত উখড়ে তার ভেতরকার মালকড়ি ফাঁস করে দিতে আজ থেকে তিপ্পান্ন বছর আগে দানা বেঁধেছিল বাংলা সাহিত্যের প্রথম আভাঁগার্দ আন্দোলন ----- হাংরি জেনারেশন।  যা ছিল আক্ষরিক অর্থেই কলকাতার বাইরের কবি-লেখকদের নয়াল সংযোজন।  তাঁরা এসেছিলেন এমন এক মিলিউ থেকে যেখানে বাংলার তথাকথিত ভদ্রায়তনিক সংস্কৃতির কোনও শিস-ই গজাবার নয়।  জীবনের অনেকরকম শিক্ষা থেকে বঞ্চিত থাকতে হয় যেখানে।  হাংরি সাহিত্যের কলিন অধ্যয়নে এই প্রেক্ষাপটটি সর্বাগ্রে মাথায় রাখতে হবে।  এই হাঙ্গামার প্রধান স্রষ্টা মলয় রায়চৌধুরীর শৈশব অতিবাহিত হয়েছিল বিহারের ভয়ঙ্কর কুচেল অধ্যুষিত বাখরগঞ্জ বস্তিতে।  তাঁর টায়ার ছোটবেলা অতিক্রান্ত মুসলিম অধ্যাসিত দরিয়াপুর মহল্লায়।  সেই অস্বাচ্ছন্দ্য, অখল জ্বালা, ক্ষোভ আর বিদ্রোহকে বুকে করে মলয়ের বেড়ে ওঠা।  সংস্কৃতির একেবারে নিচেকার পাদানি থেকে আসা, নিম্নবিত্ত থেকে মধ্যবিত্তে ওঠার প্রতিটি মানুষী শঠতার সাক্ষী, স্পেঙলারের সংস্কৃতি ও অবক্ষয়কালীন সর্বগ্রাস তত্ত্বে তা-খাওয়া একজন বাইশ-তেইশ বছরের কৃষ্টিদোগলা বা কালচারাল বাস্টার্ড লেখালেখির মাঠে এলে যা ঘটবে, সেটা তো রফা হয়েই ছিল।


১৯৫৯-৬০।  বৃটিশবীর্যিত মুলুকের পোঁদে গাঁড়সা পুঁতে গাদি সামলাচ্ছেন নেহেরু।  দেশের দুই প্রান্তে পার্টিশানের টসটসে পাঁচড়া।  পুব পাকিস্তান থেকে আগত অন্যৎপুষ্ট মানুষের কিছু থোপনা তখনও আনলোড হচ্ছে শেয়ালদার টেসেলেটেড চাতালে।  হাভাতে মানুষের কেরবালা বিধানবাবুর গড় জুড়ে ছিৎরে পড়ছে।  দেশভাগের সময় পুব বাঙলা থেকে যে কিশোরগুলো বাবা-মায়ের কড়ে ধরে কলকাতায় এসেছিল, তারা এদণ্ডে গাগতরে বেতর, কিন্তু বয়সে ও মগজে সাজোয়ান।  দেশভাগের খসা চোকলা।  কাঁধের চিক্কুটে ঝোলায় কবিতার লাজুক খাতা আর কলা-ওঠা টিনের সুটকেশ ঢুয়ে কলকাতার রাস্তায় গলিঘুঁজিতে এক রাত্তির হিল্লের মনসুবায় চোখমুখ কালিয়ে ঘুরে বেড়ায় আর সাঁঝের আলা মদ্দিম হলে সারমেয় অধ্যাসিত ফুটপাতে, হয়ত-বা কোনও দয়াল বন্ধুর ঘাড়ে অথবা গেরস্ত বাড়ির হেঁসেল-ঠোরে রাত গুজরান।  ইহাদের প্রত্যেকের বুকে কবিতা নামের পিলপিলে গণ্ডুপদটি ক্ষণে ক্ষণে ঢসন মারে।  ইহারা সকলে প্রবল কবিতা-পিশাচ।  পিশাচ, কেননা ইহাদের মাঘার ঘিলুতে জবরদস্ত পুঁজরক্ত যাহা গোপন আঁধারে কলম দিয়া চোয়ায় আর দেউলের দেউটি সহসা নিভায়।


ষাটোত্তর গরদিশের দিনগুলি।  গেরস্তের জবরদখল-করা হেঁসেলে আচকা নোটিশ হয়ে গেল।  ভাঙা আয়না, দাঁড় টুনানো চিরুনি, তেলের শিশি, জীর্ণ ফতুয়া, কলা-ওঠা টিনের সুটকেশ আর লজ্জাবতী কবিতার ধুকড়ি নিয়ে পথে দাঁড়াল সুভাষ।  সুভাষ শলা করল, ----- শৈল, চ, দুজনে মিলে একটা ঘর নিই।  টালায় ১৬-বি শ্যামচরণ মুখার্জি স্ট্রিটের একতলায় দুর্গন্ধ-পীড়িত ফালি-খানেক ঘর যোগাড়ও হয়ে গেল।  খিড়কির পাল্লা সরালেই ড্রেনের ধারে পাছা ঝুলিয়ে নিত্যকর্মে ব্যস্ত কৃশগাঁড় বিভীষিকা।


সুভাষের গেরামের ইশকূলে কমপয়সার চাকরি।  দু-বেলা যুৎসই অন্ন জোটে না বটে, কিন্তু গদ্যের হাতটি খাসা।  তাহাতে ড্যাশ ও হাইফেনের যাচাই ভুরিভোজ।  শৈলেশ্বরেরও মতিগতি উনিশবিশ।  অল্প পড়াশোনা।  ভাঙাচোরা ফ্যামিলির ছেলে।  অশহুরে, তথা জন্মলব্ধ সারল্য ও সততা।  ফলে মানিকজোড় হতে সূর্যঘড়ি লাগেনি।  দুজনেই টিউশানি ধরে, আর ছাড়ে।  হপ্তায় দু-দেড় দিন ভিজিট, আর চার-পাঁচদিন একুনে নাগা।  ফলে আট থেকে দশদিনের মাথায় জবাব হয়ে যায়।  খাওয়ার পয়সা নেই।  বৃদ্ধ পিতা পঙ্গুত্বের লেংগি খেয়ে খাটের প্রাণী।  ছাত্র-রাজনীতির গাজোয়ারি-প্রসূত 'লম্বা' হাঁকন বাবদ আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে নীমসম্বন্ধ।  ফলে, দিনগুলি বেজায় নড়বড়ে, জীবনযাত্রা ধূরিপথহীন।  সাহিত্য করা তো দূর অস্ত, সাহিত্যের জিগির-মাত্রে পিছদাঁড়ায় কাঁপন।  ডাইনির ছমছমে খিখি অষ্টপ্রহর।  ক্কচিৎ পকেটে বাড়তি খুচরো জুটলে শ্যালদার চোরা-হোটেলে জলের সঙ্গে পাঞ্চ করে, ভরদুপুরে কান্ট্রি-লিকার।  শ্যামবাজারের জন্তা হোটেলে ছ'আনায় ভরপেট খানা।  লেটনাইটে ঘুমের ধাক্কায়, বাড়ি।  একজনের ঘুম জুটত, অন্যজনের জুটত না।  শৈলেশ্বরের ছিল ইনসোমনিয়ার ব্যামো।  সারা-সারারাত মরা মাছের নিস্পন্দ চাউনি সিলিং-পানে।


সুভাষরা একসময় ক'জন বন্ধু মিলে 'এষণা' নামে একটা কাগজ বের করত।  খুবই পাতি, অতীব বালখিল্য সে কাগজ।  সুভাষ-বাদে অন্যরা সবাই মামুলি মাস্টারবেট-করা লেখক, মানে পার্ট-টাইম।  অল্প খিঁচে নিল, ব্যস, সাহিত্যের বাঘ মারা হয়ে গেল।  আপিসে-আপিসে কেরানিগিরি, আর রোববার সকালে পাঁচ পয়সায় আধ প্যাকেট ক্যাপস্টান কিনে শ্যামবাজার কফিহাউসে ধুন্ধুমার আড্ডা।  কফির কাপ আর তামাকের কড়া ধোঁয়ায় বাঙালির বেড়ে বাফুনারি।  শৈলেশ্বর-সুভাষরা ইন্টেলেকচুয়াল নয়, গেঁয়ো বুদ্ধি, গেঁয়ো কথাবার্তা।  অপরপ্রান্তে, ধাউড়দের মুখে বিদিশি বই, ফরেন-কলমচিদের রেফারেন্স।  ইনজিরির ছররা।  দুজনের মধ্যে শৈলেশ্বরের বুদ্ধি একটু খোলা, মওকা বুঝে, সময় থাকতে কাগজটাকে নিজের হেফাজতে নিল।  কাপ্তানি সুভাষের, কিন্তু কলকাঠি শৈলর হাতে।  অবশ্য, চারটে মাত্র ইস্যুই হাপিস হয়েছিল 'এষণা'র।। হাংরি জেনারেশান সাহিত্যের ঐ ছিল গর্ভ-সূচনা।  অচিরেই এষণার ছাদনায় এসে ভেঁড়ে প্রদীপ আর সুবো।


এবং আরও একজন।  বছরটা ১৯৬৩।

ছেলেটির বয়স কুড়ি।  রুজির যোগাড়ে গোড়ার দিকে থাকত কলকাতায়।  টালা ব্রিজের কাছে খেলাত বাবু লেনে।  বারোঘর এক উঠোনের একটি পোড়া বাড়িতে।  সারাদিন রুজির খোঁজে, ফিরত রাত নিবিড়ে।  পড়ে ন্যুনাধিক একটা হিল্লে হলে, অশোক নগরের উদ্বাস্তু কলোনিতে পাকাপোক্ত নোঙর।  সেও ছিল দেশভাগের ঠাঁটা চোকলা।  ডাঁসা বাঙাল।  জিরজিরে শরীর।  উপদ্রুত মন।  চাঁচাড়ি-ঘেরা তার এক-কাটরা বাড়ি।  ছেঁড়া শাড়ির গাঁঠরি।  বাতায় ঠোঁসা সরষে তেলের শিশি।  একটিপ তেল মেখে, শ্যালো টিপে দু-বালতি জলে স্নান সেরে ও গামছায় সর্বাঙ্গ মুছে, ভাঙা আয়নার সামনে ব্যাকব্রাশে টেরি চিরে দরমার দরজা ভেজিয়ে এক রোববার সে ঐ 'এষণা'র ঠেকে।  লেট এন্ট্রি।

ছেলেটির নাম বাসুদেব দাশগুপ্ত।


হালিতেই সে ঝুলি থেকে বের করে এগিয়ে দ্যায় একটি লিটল ম্যাগাজিন।  পবিত্র বল্লভ সম্পাদিত 'উপদ্রুত'।  তাহাতে একটি দীর্ঘ গদ্য, ---- নাম 'রন্ধনশালা'।  সে বলেছিল, 'গল্প'।

বাসুদেব 'রন্ধনশালা' রচনা করেন একষট্টিতে।  তেষট্টিতে সেটি ম্যাগাজিনে কৃষ্ণহরফ পায়।  গদ্যটি গ্রন্থত্ব লাভ করে উৎপলকুমার বসুর হেফাজতে, ১৯৬৫-তে।  শুধু এই রন্ধনশালার কথাই যদি বলতে হয়, এবং ১৯৬৩-র প্রথম আলোকনের সালটিকেই যদি ধরতে হয়, বলব, সেই সময়ের প্রেক্ষিতে ভারতবর্ষের সহস্র সহস্র বছরের সর্বঅস্তিত্বগ্রাসী ক্ষুধার এ-তুল্য বহিঃপ্রকাশ এবং তার এহেন গ্রাম্য আদিম রাস্টিক তথা অস্বস্তিকর ভাষায় আত্মপ্রকাশ একটা বড়সড় তহেলকার চেয়ে বিন্দুমাত্র উনিশ ছিল না।  এ ছিল এমন লেখা, যা পড়ার পর, বাংলা সাহিত্যের পাঠক আগের যা-কিছু পড়া সমস্ত হকহকিয়ে বমি করে দ্যায়।  বাংলা গদ্যের শেলফ প্রায় খালি হয়ে যায় রন্ধনশালা পৌঁছনোর পর।


রন্ধনশালার হব্যাশে সেদিন আকখা কলকাতা তোলপাড়।  খাসির ল্যাজ তুলে যাঁরা মাংসের বহর আন্দাজাতে পটু, সেইসব ঘোড়েল সমালোচকেরা অব্দি রচনাটিকে ফ্রানজ কাফকা, লুই ফার্দিনান্দ সিলিন এবং গিন্সবার্গ-এর সঙ্গে গুলিয়ে ফেলতে বাধ্য হয়েছিলেন।  বাসু-বন্ধু শৈলেশ্বর কবুল করেছিলেন : ইমাজিনেটিভ সাহিত্যের এহেন উদাহরণ বাংলাভাষায় খুব বেশি নেই।  বাস্তব অভিজ্ঞতাই লেখকের পা রাখার জায়গা, তারপরই বাসুদেব পাঠককে নিয়ে যান এক সম্পূর্ণ নতুন অভিজ্ঞতার মধ্যে।


আসলে, শৈলেশ্বর জানাচ্ছেন, তাঁদের মধ্যে যে ছোটলোক বা সংখ্যালঘুর মনোভাব কাজ করছিল, রন্ধনশালা ও তৎ-পরবর্তী গদ্যসমূহে সেটাকেই ঝাড়বাতির তলায় মেলে ধরেছিলেন বাসুদেব দাশগুপ্ত।


শৈলেশ্বর-বাসুদেব-সুভাষ-প্রদীপ-সুবো ----- এঁরা প্রত্যেকে ছিলেন একে-অপরের মতো, একই পেরিফেরির জীব। প্রত্যেকের জীবনের ব্ল্যাক-কমেডি উনিশবিশ একই খেপের।  চোখের সামনে দৃশ্যের পর দৃশ্য দেশভাগ, রক্ততোলা বেবুঝ দাঙ্গা, যুবতীর অস্মিতা-হরণ, লাখো মানুষের বুকে ভুখা ত্রাস, জঠরে জঠরে কান্না।  প্রায় প্রত্যেকের বাল্য ও যৌবন অস্বচ্ছন্দ, নিহায়ৎ গরিব, ছোটলোক আর অশিক্ষিত ফ্যামিলি থেকে আগত, বুকে অখল জ্বালা, ক্ষোভ আর বিদ্রোহকে কোলদাবা করে বেড়ে ওঠা।  আধুনিকতা নাম্নী সালংকরা পিশাচিনির পাছায় এঁরা চুমু খেতে পারেননি।  প্রত্যেকে কমবেশি লিজলিজে, ঘরকুনো, আত্মভুক।  ফলত, পরস্পরের বন্ধুত্ব সামীপ্য পেতে দেরি হয়নি।  সেই বন্ধুত্বের তলা ও তলানি ছিল কঠিন সিলেবেলে গাঁথা।  পাঁচজনের মধ্যে একটা সমকামী-সুলভ এঁঠেল প্রেম, ভাষান্তরে 'আত্মা-বিনির্মিত নির্বাক সম্পর্ক' ডেভালপ করেছিল।  এঁরা একে-অপরের নেশাতেই বিভোল থাকতেন।  এঁরা কে কত বড় লেখক ছিলেন, আদৌ ছিলেন কিনা, সেটা বড় কথা নয়।  বড় যেটা হলো, এঁরা অন্যদের মতো ফাঁপা-বুলি বা False Note লিখতেন না, নিজেরা ভুগে লিখতেন।  এঁদের লেখালেখির পেছনে একটিই আর্জি ছিল ----- পৃথিবীর সেই আদিতম মন্ত্রটি ------ 'আত্মানং বিদ্ধি' (know thyself), নিজেকে জানো।  অধ্যাত্মবিদ্যার এই মূল কথা রবীন্দ্রনাথেও প্রতিধ্বনিত ----- "অসীম যিনি স্বয়ং করেছেন সাধনা / মানুষের সীমানায়, / তাকেই বলে 'আমি'।"  আমি-র দুটো ডানা ---- শরীর আর মন।  প্রথমটি লোকাল, দ্বিতীয়টি গ্লোবাল।  উভয়ে মিশে গ্লোকাল।  এই দুই ডানাবিশিষ্ট যানে আরূঢ় হয়ে চলে আমি-র জীবনযাত্রা, জার্নি অফ লাইফ।  শরীরে ভর করে মহামনের সঙ্গে মনের যোগবন্ধনের প্রচেষ্টা।  হাংরি লেখকদের সরাসরি একটাই বিষয় ছিল ---- এঁদের লেখার বিষয় ছিল 'আমি'।  সেখানে কোনো মেকি অবগুণ্ঠন ছিল না।  বনেদি সমালোচকদের চোখে এঁরা 'নিরক্ষর' বলে দাগায়িত হলেও, মনে রাখতে হবে এঁরা কোনরকম ধান্দাবাজিতে না ঢুকে, যৎসামান্য সংঘশক্তি নিয়ে এবং 'নিজেদের জীবনচর্চাকে কাঁচামাল হিশেবে ব্যবহার করে' লেখালেখি করতেন।  যা অচিরেই, প্রতিষ্ঠান এমনকি প্রশাসনের বুকেও মৃদু হাড়কাঁপ ধরিয়ে দিয়েছিল।


পাঠক, এই এঁরা, যাঁদের কথা আপনি পড়ছেন, এঁদের একজন যা ভাবতেন, সকলে তা ভাবতেন।  এঁরা একই হারে চলমান বাংলা কবিতা আর গদ্যকে অ্যানিমিক ভাবতেন।  দেশভাগের আগে ও পরে সবুজপত্র, দেশ, কল্লোল, কবিতা, পরিচয়, পূর্বাশা প্রভৃতি 'শহুরে বাঙালি মানসের সমৃদ্ধ ও প্রত্যয়পূর্ণ চিন্তাক্ষেত্র' নামে পরিচিত ন্যাকাচিত্তির সাহিত্যবাজির যে ধারা বাংলা সাহিত্যকে অবক্ষয় আর প্যানপ্যানানির চূড়ান্তে এনে ছেড়েছিল, তার বিরুদ্ধে ষাট দশকের গোড়ায় এইসব হাংরি লেখকরাই হেনেছিলেন প্রথম ও সর্বাধিক জবরদস্ত ধাক্কা।  সে-কারণে প্রতিষ্ঠানের ক্যামপ্রাডর নমস্যদের বিগ্রহে মাটি খসে খড় বেরিয়ে যেতে দেখা গেছিল।  মাত্র দু-আড়াই জন কবি আর লেখককে এঁরা, বাসু-শৈলরা নিজেদের মতো করে 'আবিষ্কার' করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে জীবনানন্দ, ------ যিনি, বিদ্যায়তনিক উলেমাদের চোখে, এমন শব্দ ব্যবহার করেছেন যারা কবিতায় দূরে থাক 'ভদ্দরসমাজে' পর্যন্ত অচল।  সুতরাং, কফিঘরের আঁতেল ধোঁয়ায় ঘুরপাক না খেয়ে, এঁরা বুঁদ থাকতেন জীবনানন্দেই।  আর একজন এঁদের কিছুটা সমীহ আদায় করেছিলেন, তিনি মানিক বাড়ুজ্জে।  তিনি নাকি মানুষের ভিৎরি ফাঁপা অর্থহীন অঞ্চলকে ভারি সুন্দর ঢঙে ফাঁস করতে পারতেন, এঁদের মতে।  কিন্তু, পরে কমিউনিজমের 'কুচক্করে' ফেঁসে তাঁর লেখার ধার ও বহুমাত্রিকতা খসে পড়ে, এঁদের মতে।  একমাত্রিকতাই অবশ্য বামবাজ লেখকদের আগমার্ক ছিল, সেও এঁরা বুঝতেন।  এঁরা আরও টের পেয়েছিলেন যে সুভাষ মুখুজ্জের কবিতাগুলো আসলে শিশুতোষ ছড়া, আর সময় সেনীয় সাহিত্য স্রেফ শহুরে ধাউড়বাজি।  সন্দীপন চ্যাটার্জীর বিশেষত 'বিজনের রক্তমাংস' এঁদের ভালো লেগেছিল, কিন্তু অচিরেই যখন ফাঁস হয়ে গেল সন্দীপন আসলে স্প্যানিশ দার্শনিক উনামুনোর দ্যাখাদেখি লেখায় অসুস্থতার প্র্যাকটিস ওরফে ভাঁড়ামি করছেন, তখন এঁদের অ্যাবাউট টার্ন শুরু হয়ে যায়।  এঁরা এও খোঁজ পেয়েছিলেন, যে, লেখার সার্টিফিকেটের জন্য যাঁরা বুদ্ধদেব বসু, বিমল কর আর 'দেশ'-এর দোরে ধন্না লাগাতেন, সেই রোম্যান্টিকদের অন্যতম শিরোমণি সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়।  এঁরা সবই বুঝতেন, শুধু ঠিকঠাক সমঝে উঠতে পারতেন না শক্তি চ্যাটার্জীকে।  হ্যাঁ, এঁদের মতে, শক্তি চট্টোপাধ্যায় একটু বেশিই 'খেলেছেন'।  শক্তির কোন কোন কবিতা এঁদের চমকে দিত।  তারপরেই কোন লেখা মনে হতো এক্কেবারে 'পাইল করা মাল'।  কী ব্যাপার??  কফিহাউসে কানাঘুষো খবর উড়েছিল, কোন এক উঠতি কবির কবিতার খাতা নাকি শক্তির ব্যাগ থেকে খোয়া গেছে।  তারপর থেকেই নাকি অমন চেকনাই শক্তির কবিতায়।  ধন্দ কাটে না।  বর্ধমানের দামোদরে একদিন উদোম হয়ে নাইতে নেমেছেন শৈলেশ্বর, বুকজলে দাঁড়ানো উৎপলকুমার বসুকে জিগোলেন, 'কী দাদা, কথাডা কি সত্যি?'  উৎপলও কেমন, রহস্যমতন হেসে জানালেন, 'আমিও তো ভাই আপনাদের মতোই শুনছি।' ------ বলেই ডুব।


এবার সংক্ষেপে বুঝে নেওয়া যাক হাংরি-তোড়ফোড়ের প্রেক্ষাপট, বা সময়ের ডিম-লেয়ারটা।  অর্থাৎ কলকাতা বা হুগলি-চত্ত্বরের সন্নিহিত এলাকায় সেসময় কী-এমন ঘটেছিল যার দরুন ডাল-ভাত খাওয়া বাঙালি বাড়ির কিছু যুবা অমন-একটা ভাব-ঘূর্ণির ঝড়ে একজাই ক্ষেপে উঠল, ----- তার প্রেক্ষিতটা।


দেশভাগ হলো, 'স্বাধীনতা' নিয়ে শাঁখ-আবির হলো ----- আর তার পরপরই কবিরা কড়ে আঙুল ফাঁসিয়ে বাংলা কবিতার ন্যাড় আটকে দিলেন।  তাঁরা পাল্লা দিয়ে মেতে উঠলেন 'শহিদপ্রণাম' আর 'নয়া শপথ' গোছের টাইমপাশে।  পাশাপাশি অবশ্য বাংলা কবিতার পালে রোম্যান্টিক হওয়া লাগালেন রাম বসু, বটকৃষ্ণ দে।  তখন তো এমনি, নতুন কবি মাত্রেই রোম্যান্টিক আর তাতে কড়ারি তামা-তুলসী নিয়ে উঠে আসছে একটি নাম ----- দেবদাস পাঠক।  পুরনো কবিদের মধ্যে অজিত দত্ত, প্রমথনাথ বিশী, বনফুল আর খুব করে দাপাতে লেগেছেন প্রেমেন মিত্তির।  জীবনানন্দ বাদে অচিন্ত্যকুমার, শামসুর রাহমান, বিরাম মুখো, গোবিন্দ চক্কোত্তি, দীনেশ দাসদেরও হেব্বি বোলবালা।  উদিক থেকে আবার স্তবকান্তরে ছন্দান্তর ঘটিয়ে কবিতায় বিরল ছোঁক এনে দিয়েছেন নীরেন চক্কোত্তি।  চলছে পঞ্চাশের খেলা।  দ্যাখাদেখি কল্যাণ সেনগুপ্ত, অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তরাও নেমে পড়লেন আসরে।  বিজ্ঞপ্তি দেওয়া শুরু হলো যে 'আচ্ছে দিন' ফিরে আসছে বাংলা কবিতার।  যুদ্ধ-দাঙ্গা-দেশভাগ-রিফিউজি সমস্যা কাটিয়ে কবিতার স্বাস্থ্যে রিটার্ন আসছে নুরানি দ্যুতি।  শবেবরাত।  আখেরি চাহার শুম্বা।


আসলে ঘটনা ছিল বিলকুল উলোট।  আসলে চল্লিশ-পঞ্চাশ থেকেই বাংলা কবিতা পাঠক লস করতে শুরু করেছিল।  শঙ্খ-সুনীল-শক্তি-ফণীভূষণদের আসরে নামতে সামান্য লেট, এমন দিনে, ৫০-এর শুরুতেই বুদ্ধদেব বসু রটিয়ে দিলেন :'ছন্দ, মিল, স্তবকবিন্যাসের শৃঙ্খলা, এ-সব বন্ধনেই কবির মুক্তি।'  বুদ্ধিবাদী এনজয়মেন্টের ব্রেকিং নিউজ।  পঞ্চাশের লক্ষ্মীঘরানার ফোকাসবাজ কবিরা সেটা ঝপসে গিলে ফেললেন।  বিষয়ে ন্যাকাচিত্তির রোমান্টিকতা আর আঙ্গিকে রকমারি বেগুনপোড়া এনে তাঁরা 'ফাটিয়ে' দিতে চাইলেন বাংলা বাজার।  আলোক সরকার এসময় আঙ্গিকে আর শব্দের বিন্যাস নিয়ে এত কসরৎ করেন যে প্রতিটি কবিতা থেকে ক্র্যাকের পড়পড় শব্দ বেরুতে থাকে।  উপরন্তু, আনন্দ বাগচী রবীন্দ্র-গানের ফাটা রেকর্ডগুলো বাজিয়ে বাজিয়ে পাঠকের মূত্রপুটের বেঁটে দুববো ঘাসে মাচিশ ধরিয়ে দিলেন।  এসব করে পঞ্চাশের কবিরা এই ভেবে স্বমেহনের তৃপ্তি লাভ করলেন যে বাংলা কবিতায় 'প্রগাঢ় প্রতীতির সুর' দেখা দিয়েছে আর স্পষ্ট হয়েছে তার এক্সপোজ-ভঙ্গি।  কিন্তু এতে পাঠ্য-পাঠকের জগদ্দল সমস্যাটাই আরও বুকবাড়া পেল।  বিষয়ের গরিমা বাতায় ঠুঁসে স্রেফ আঙ্গিকের প্রাকটিস যে বাংলা কবিতার পক্ষে অশুভ হতে পারে তা যেন কেউ কেউ বুঝতে পেরেছিলেন।  সময়টা ছিল ৫০-এর মাঝামাঝি, বাংলা কবিতা তার সহজ-সুগম পথ ছেড়ে অচিরেই ন্যাকানাদা লিরিক আর আঙ্গিক-সর্বস্ব শব্দচচ্চড়ি হয়ে উঠল।


ফলে, অনিবার্যভাবেই ষাটে ঘটল সর্বস্তরিক তোড়ফোড়।  ষাট, কেবলমাত্র একটি সময়-চিহ্ন নয়, সময়ের শান্তশায়ী বুকে একটি পিরেনিয়াল আঁচড়, এক প্রবল ঘূর্ণাবর্ত ----- সত্তর ক্রশ করে আশিতে এসে যার পরিক্রমা সমিল হয়।  বাংলা কবিতাধারায় ঐ ন্যাকাচিত্তির কলাকৈবল্যবাদ আর লিরিকবাজির প্র্যাকটিসের খেলাপে প্রচণ্ড অনাস্থা আর বিরক্তি গনগনে অমর্ষ হয়ে আছড়ে পড়েছিল ষাটের ঐ হো-হাঙ্গামার দিনে, যখন প্রকাশ্য ডে-লাইটে ফুটপাথের হাঁড়িকাঠে গলা-ফাঁসানো পঞ্চাশিয়া কবিতার হালাল প্রত্যক্ষ করেছিল কলকাতা।  ন্যাকাচোদা ধুতি-কবিদের ফুল-দুববো কালচারের বিরুদ্ধে আধপেটা ছোটলোক ভবঘুরে বাউণ্ডুলে গাঁজাখোর চুল্লুখোর চরসখোর রেন্ডিগামী কবিদের তীব্র সাব-অলটার্ন আর ডায়াসপোরিক কাউন্টার কালচার চাক্ষুষ করেছে দিনদাহাড়ে ব্যাংক-রবারির ফিলমি কারকিতে।  ছোটলোকদের ওই ধরদবোচা অ্যাকশানে গাঁড় ফেটে গিয়েছিল প্রতিষ্ঠানের ধামাধরা ক্লিন-শেভড পাউডার-পমেটমপ্রিয় পঞ্চাশের কবিদের।  তাঁদের ভীতি সাব্যস্ত হয় যখন বাসুদেব দাশগুপ্তর 'রন্ধনশালা'কে চালিয়ে দেওয়া হয় 'বিবর'-এর ব্রিডিং ক্যাপসুল হিশেবে।  অন্যদিকে, কবিতার ক্ষেত্রে, মলয়-শৈলদের ঐ ভয়-পাওয়া কাউন্টার-অ্যাটাক দানা পেয়েছিল শঙ্খ ঘোষের এই শব্দগুচ্ছে : 'আত্ম অস্তিত্বের গূঢ়মূল আবিষ্কার, মৃত্যুর বোধ, অসুন্দর শয়তান আর পাপের ধ্যান একদল কবিকে একটি বিচ্ছিন্ন কুঠুরির মধ্যে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।'  এমনকি, সন্ত্রাসের পাল বুদ্ধদেবের হিক্কে-তোলা বোদলেয়রী বাতাবরনকে উচ্ছ্বাসভরে স্বাগত জানিয়ে ফেলেছিল।  এতে-করে পঞ্চাশের ল্যাসল্যাসানি ধরা তো পড়েই যায়, চল্লিশের কন্ডোমফোলা ফক্কাবাজিও ফাঁস হয়ে যায় একই লপ্তে।


সাহিত্যের আখড়ায় গোষ্ঠীতন্ত্র নয়াল কিছু নয়।  সাহিত্য নিয়ে আড্ডা, হুজুগ আর বাওয়াল যুগে যুগে।  সেই কোন ১৯০৫ থেকে পয়লা বিশ্বযুদ্ধের শেষ অব্দি লন্ডনের ব্লুমসবেরি মহল্লার এক থুত্থুড়ে কোঠায় ফি বেস্পতি সাঁঝে জমা হতেন সস্বামী ভার্জিনিয়া উলফ, রজার ফ্রাই, ক্লাইভ বেল, জন মেনার্ড কিন্স, ই এম ফর্স্টার, লিটন স্ট্র্যাচি, ডানকান গ্রান্ট প্রমুখ বুদ্ধিজীবীরা।  ইংরেজি সাহিত্যের ইতিহাসে ঐ আড্ডাবাজরা 'ব্লুমসবেরি গ্রূপ' নামে বিখ্যাত।  মোটামুটি ঐ ধাঁচেরই ছিল বাংলার বিনয় সরকার, সুনীতি চাটুজ্জে, সতীশচন্দ্র মুখুজ্জেদের 'ডন সোসাইটি'; এবং কিছু পরে প্রেমেন্দ্র-অচিন্ত্য-মানিক-প্রমুখের 'কল্লোল গোষ্ঠী'।  যদিও জাতে ও চরিত্রে কিঞ্চিৎ আলাদা, কিন্তু তিনটিই ছিল নিছক আড্ডা-বিশেষ।  সাহিত্যের আড্ডা।  যা পরবর্তী কালে সাহিত্যের কিছু খাস সামিয়ানায় ঠেক পেতে কলকাতার কফি হাউসে আরও-অঙ্ক-কষে হতো, এবং যা এখন আরো-অন্যভাবে, অন্যত্রও হয়।  বুকফেয়ার, নন্দনচত্ত্বরে, ইভন ফেসবুকে এবং ব্লগে।  কিন্তু সাহিত্য তথা শিল্পে সেরম বাওয়াল ওরফে মুভমেন্ট যদি কিছু হয়ে থাকে, আমাদের রামায়ণ-মহাভারত-চৈতন্যের লীলাখেলা-সমূহ বাদ দিয়ে, তাহলে তার বিসমিল্লা ধরতে হয় ১৮৩০-এর ফরাসি বোহেমিয়ানদের হুল্লোড় থেকেই।  তথাকথিত প্রতিষ্ঠান-বিরোধী আন্দোলনের ঐ ছিল সাড়াজাগানো পয়লা ভেঁপু।  এবং পরবর্তী কালে সারা পৃথিবী জুড়ে সেই বিগউল ফোঁকা অব্যাহত থাকে।  ফলে, মার্কিন ইন্টেলেকচুয়ালদের মাথায় হঠাৎ 'Angry' ঠাপ্পাটা দেখে তেমন হাসি নির্গত করার কারণ ছিল না বিশুদ্ধবাদীদের।  কারণ ঐ মার্কিন অ্যাংরিরা এতখানিই বাগী আর রাগী ছিল যে নিজেদেরকে 'ইন্টেলেকচুয়াল' বলতেও ওরা রীঢ়া বোধ করত।  ওরা নিজেদের জাহির করত 'Anti-Intellectual' বলে।  আসলে, জ্যাক কেরুয়াক, লরেন্স ফেরলিংগোটি, অ্যালেন গিন্সবার্গ, গেগরি করসো, ই ই কামিংস, কেনেথ রেকথ, হেনরি মিলার প্রভৃতি আমেরিকান কবি-লেখকদের, তথাকথিত সামাজিক ধ্যানধারণার প্রতি প্ৰচণ্ড রকমের অনীহা ও আক্রোশ থেকে গড়ে ওঠা ঐ গোষ্ঠী নিজেদের জাহির করত 'বিট' বলে।  বিট মানে হেরো, পরাস্ত, হতাশ, গাণ্ডু আর এইরকম আরও কিছু।  'অ্যাংরি' কথাটা তো খচমচ করত চল্লিশের দশকের জ্যাজ বাজিয়েদের ঠেকে।  তাছাড়া, মোটামুটি ঐ সময়েই ইংল্যান্ডের একদল তিক্ত-বিরক্ত-রাগী লেখক সেখানকার গঙ্গাজলী সাহিত্যকে লাথিয়ে রাতারাতি দাগি হয়েছিলেন 'Angry Young Men' নামে।  অ্যাংরিরা ছিলেন জন ওয়েন, জন ব্রেন, কিংসলি অ্যামিশ প্রমুখ।  অ্যাংরি আর বিটরা একসময় একটা জয়েন্ট অ্যান্থলজিও বের করে।  যে-কারণে ঐ দুই বাওয়াল-পার্টিকে অভিন্ন ভেবে কিছু মানুষ চরম ভুল করেছিল।  কিন্তু, ভুল তো ভুলই।  আসলে হয়েছিল কি, কেরুয়াকের সুহৃদ হারবার্ট হাংকি তখন কুচেল দুনিয়ায় গহন চলাফেরায় মগ্ন এবং তাঁকে ছিঁচকে চোর, মাস্তান আর মাতাল-গাঁজাখোর বলে চেনানোর জন্যে 'বিট' খিস্তিটা চালু ছিল।  এবং, খুব অবান্তর হবে না যদি ধরা হয় কেরুয়াক উক্ত লিংক থেকেই শব্দটা গেঁড়িয়েছিলেন।


এই বিটদের সঙ্গে বাঙালি যুবাদের হাংরি হাঙ্গামাকে গুলিয়ে ফেলার বেওকুফি বা ধাউড়বাজি ঠিক হবে না।  আবার 'হাংরি'র স্রোত-সূত্র যে 'ক্ষুধার্ত' বা 'কাঙাল' ---- এটা ঠিক না।  কেননা, প্রতিষ্ঠান বিরোধীরা কখনই মার্কামারা হতে রাজি নয়, তারা হামেহাল শেষধাপের জন্য ত্বরায়।  আর, ধাপগুলো হলো অবিরাম নিচের দিকে, ঘাস আর মাটির দিকে।  'মার্কা' ব্যাপারটা মৌলবাদের লক্ষণ।  প্রতিষ্ঠানের কারকিত।  যেমন আমাদের পৌরাণিক নামগুলো।  সূর্য, চন্দ্র, পৃথিবী, জল, বায়ু, শিব, কৃষ্ণ, রাম, সীতা প্রত্যেকেরই হাজারটা করে নাম।  পাড়ার মাস্তান থেকে শুরু করে লোকসভার মেম্বার, এঁদের অনেকগুলো করে নাম।  যত গুণের ঘাট, তত নামের বাড়।  তাছাড়া, এটাও ফ্যাক্ট, যে, ব্যক্তিকে অভিধায়িত করার জন্য যেসব শব্দকলাপ আমাদের চারপাশে ডাঁই করা আছে, এখনও, সবই সেই ব্রিটিশ মাস্টারবেশিয়ানদের নিচুড়ে-যাওয়া বইপত্র, ডিক্সনারি আর আধুনিকতাবাদী বুকনি-বীর্য থেকে হাসিল।  আসলে কিন্তু, শেষ বিশ্বযুদ্ধোত্তর দুনিয়ার যে হালচাল, রাজনীতিক-আর্থিক অবস্থা, তাতে সেরকম মর্ডানিস্ট স্পেশেলাইজড ব্যক্তিত্ব গড়ে ওঠার সারবীজ সব পচে-হেজে গেছে।  এখন আধুনিকতা ব্যাপারটাই একখানি ধ্রুপদী জোচ্চোর ও ধাপ্পাবাজ।

যাই হোক।  বলবার কথা এই, হাঙ্গামার শরিকরাও যেভাবে দাবি করেছেন, ---- হাংরি, আর-পাঁচটা সাহিত্য আন্দোলনের মতোই, পূর্বাপর স্বমেহিত ছিল, তাতে কোনো বাহ্যিক ক্যাটালিটিকের কলকাঠি ছিল না।  যে-কারণে এই হাঙ্গামার আবির্ভাব-কালটি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ।  পঞ্চাশের শেষে, বিশেষত ষাটের দশকের শুরুশুরুতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রায় একই ধাঁচে তরুণ-তরুণীদের মধ্যে ব্যাপক অনাস্থা আর বিক্ষোভ দেখা দেয়।  তাদের নিজ-নিজ রাষ্ট্রের শাসনতন্ত্র, সমাজ, চালু ধর্মীয় নীতিকানুন, আর্থিক বন্দোবস্তি আর কালচারাল বাতাবরন তামাম-কিছু ঐ নাগর-যুবাদের কাছে চরম অসহনীয়, সুতরাং পরম ত্যাজ্য ও বর্জনীয় ঠাহর হতে থাকে।  প্যারিস, বার্লিন, প্রাগ্ব থেকে বার্কলি, জাকার্তা, কলম্বিয়া, পিকিং ----- বিভিন্ন শহরে, বিশেষ করে কলেজ-ইউনিভার্সিটির ছেলেমেয়েরা প্রবল বাগী ও তোড়ফোড়-প্রবণ হয়ে ওঠে।  লিহাজা, বিক্ষোভের ঐ চোনা সাহিত্যের জলকেও লোনা করে ফেলবে, এ তো অতি লাজিম কথা।


বিশেষত, দেশভাগটা বাঙালির সত্যিকারের পাইন মেরে দিয়েছিল।  ঐ প্রেক্ষাপটে, যখন নিত্যনতুন মৃত্যুপদ ও ভীতিপদ বাঙালির বত্রিশ ইঞ্চি পোস্তবাটা-বুক ক্ষণে ক্ষণে ভেবড়ে দিচ্ছে, মুহুর্মুহু মূক করে দিচ্ছে আস্ত-একটা বাতেল্লাবাজ জাতিকে, চেতনা সন্ত্রস্ত ও দৃষ্টি ঘোলাটে হয়ে, নালা থেকে ভাত কুড়িয়ে খাচ্ছে অনাহারী নেড়ি ও মানুষের ছা, ------ আমরা তখনও অবিশ্বাস্য নজরে দেখতে পাই হাজার বছরের ঝরঝরে মূল্যবোধগুলো বাঙালির জীবনে নতুন ধারণার পথ দেখাবে বলে, তখনও, রক্তচক্ষু মেলে দাঁড়িয়ে!  নতুন শক্তি জীবনকে পথ দেখাতে চায়, তখনও।  ঐ রক্তচক্ষুগুলো কাদের??  কোটি কোটি মূক ও মূঢ়ের বেদনাকে মূর্ত ধ্বনিতে তবদিল করতে উঠে আসে অই, কারা???  আমরা দেখতে পাচ্ছি, বাঙলা মায়ের আনাচ-কানাচ থেকে, অন্ধগলি আর ঘুঁজিপথ থেকে বেরিয়ে আসছে অশিক্ষিত নিরক্ষর অর্ধ-নিরক্ষর ভাঙা-ভাষা ভাঙা-বানানের একগুচ্ছ অন্ত্যজ, অপর, সাব-অলটার্ন, ডায়াসপোরিক ছোটলোক।  নপুংসক বুর্জোয়া শ্যাল-কুত্তায়  নুচে খাবে বাংলা সাহিত্যকে, তার আগেই টিনের সুটকেশ, ভাঙা মগ, ছেঁড়া পাজামা, নোংরা গেঞ্জি ও বিষ্ঠা-লাঞ্ছিত মুর্দাফরাসের কেরবালা হা-রেরে তরিবতে ধেয়ে এলো বাংলা সংস্কৃতির মূল বিতর্দির দিকে।  গোড়ার দিকে এদের পিওর লাথখোর বলে মনে হবে, এদের ভাষা গেঁয়ো আর এদের কথাবার্তা অশ্লীল স্ল্যাং-মাফিক মনে হবে, ----  সেটা একরকম রফা।  মৃতের চিতায় অগ্নি-অস্তিত্বের ঐ ছিল পূর্বাভাস।


হাংরি জেনারেশন আন্দোলন ছিল, নাকি হুজুগ?  হাংরি আন্দোলনের স্রষ্টা কে?  ----- এই দুটি বিতর্ক এত এত দফা এত এত এত ভাবে দলিত মর্দিত ধর্ষিত হয়েছে যে তাকে এখন কেঁদেই বাঁচতে দেওয়া উচিত।  বিশেষত দ্বিতীয় প্রশ্নটি।  জঙ্গল মে মোর নাচা, কিসনে দেখা?  প্রত্যেকে বলে আমি, আমি, আমি।  অক্ষরের গোলামি থুয়ে অক্ষরের মালিক হওয়ার সাধ, প্রত্যেকের।  তাঁরা মেতে উঠেছেন অন্ধকারে, অহংকারে, ব্যক্তিগত আরোপে, আমিত্বের বহ্বাস্ফোটে।  আমি, আমি, আমি।  আয়ে গওয়া হরামিয়ন সব, একে মারে যান আফত-মা হ্যায়। ----- বিতর্কটি এখন যেন এই বলছে, কঁকিয়ে, ----- এবং খাবি খেয়ে মরছে।


১৯৬২।  'সম্প্রতি' পত্রিকার থার্ড সংকলনে বিনয় মজুমদারের 'ফিরে এসো চাকা'র সমীক্ষা বেরুল 'হাংরি জেনারেশন সংক্রান্ত প্রস্তাব' শিরোনামে।  লেখক : শক্তি চট্টোপাধ্যায়।  অনেকের ধারণা, বাসু-সুভাষ-শৈলরাও খেয়েছিলেন, যে, এই লেখা থেকেই হাংরি জেনারেশন নামের সূত্রপাত।  ধারণাটা কিছু বাতাসও পেয়েছিল ১৯৬৪-৬৫ সালে হাংরি মামলায় 'this literary movement was started by me' বলে শক্তির স্টেটমেন্ট জমা পড়ায়।  হাংরি গোষ্ঠীর এককালীন গড়িমসি সদস্য সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ও নাকি ঐ মর্মে বয়ান রুজু করেছিলেন।  কিন্তু শক্তির এ লেখা তো বেরিয়েছিল বাষট্টি সনে; অথচ, ১৯৬১ সনের নভেম্বর-ডিসেম্বরেই ছেপে গিয়েছিল 'হাংরি জেনারেশন' নামে ১/৮ ডবলক্রাউন সাইজের ইস্তেহারটি, তাতে বার্জাস টাইপে পরিষ্কার ছাপা হয়েছিল : স্রষ্টা মলয় রায়চোধুরী, নেতা শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সম্পাদক দেবী রায়।


আসলে, পরে জানা যায়, হাংরি জেনারেশন ছিল এমনই এক চ্যাংমাছ, কারো একার মুঠোয় বেশিক্ষণ ধরা থাকেনি।  হাঙ্গামার ধূসর সূচনালগ্নের আরেক শরিক, বিলেত-রিটার্ন কলেজ-প্রভাষক উৎপলকুমার বসু পরবর্তীতে (১৯৯৪) জানালেন : "হাংরি জেনারেশন সেভাবে কোন সংগঠিত আন্দোলন ছিল না।  যার খুশী, যেখান থেকে পারে হাংরি জেনারেশন নাম দিয়ে বুলেটিন বের করে বাজারে ছেড়ে দিত।  এই আন্দোলন ছিল অনিয়ন্ত্রিত।  কতকগুলো ফতোয়া মলয় সমীর শক্তি লিখেছিল।  এগুলোর নিচে অনেকের নাম বসিয়ে দেয়া হ'ত।  বহু ক্ষেত্রেই যাদের নাম দেওয়া হচ্ছে তাদের জিজ্ঞাসাও করা হঁ'ত না।  ..... হাংরিদের সেভাবে কোন কাগজও ছিল না।  হয়ত ত্রিপুরা থেকে একটা কাগজ বেরল, নাম দিয়ে দিল ---- হাংরি জেনারেশন বুলেটিন নম্বর ১২।  হয়ত তার ১০ বা ১১ বেরোয়নি।"


আসলে, ১৯৬২-৬৩ সনে পশ্চিম বাংলার সাহিত্যে এই বাওয়ালমুখী পালাবদলের তীব্র চাগাড়ে দুটি প্রধান উপ-কেন্দ্র গড়ে উঠেছিল কলকাতা শহরের বুকে।  একটি কেন্দ্রের মধ্যমণি ছিলেন বাসুদেব দাশগুপ্ত, শৈলেশ্বর ঘোষ, সুভাষ ঘোষ, প্রদীপ চৌধুরী এবং সুবো আচার্য।  অপর কেন্দ্রে ছিলেন মলয় রায়চোধুরী, সমীর রায়চোধুরী, দেবী রায় এবং সুবিমল বসাক।  উভয় কেন্দ্রের সদস্যরাই, কমবেশি, তথাকথিত ছোটলোক, গরিব আর অশিক্ষিত ফ্যামিলি থেকে আগত।  এবং প্রত্যেকের বয়স ছিল বিশ-পঁচিশের কোঠায়।  যে-বয়সে যত আলো পড়ে, তত ভয় কমে।  উপকেন্দ্র যেহেতু দুটি, সুতরাং দু-রকমের হাংরি বাওয়াল শুরু হয়েছিল।  একটা, শৈল-বাসু-সুভাষদের বস্তি-কলকাতার 'ছোটলোকি' বাওয়াল; এখানে যে-দলের নাম দেওয়া যাক হাংরি -- 'এ' গ্রূপ।  অন্যটা মলয়-সুবিমলদের ডায়াসপোরিক বাওয়াল, অর্থাৎ 'বি'-গ্রূপ।  দ্বিতীয় গ্রূপের সর্বময় কর্তা ছিলেন পাটনার ছোটলোক আর কুচেল অধ্যুষিত দরিয়াপুর মহল্লার নামচিন ষ্টুডিওঅলা রঞ্জুবাবুর ছোটছেলে বিশ বছরের ফনকু ওরফে ফনা, অথবা ইমলিতলার মুল্লু খান ওরফে মলয় রায়চোধুরী, সেটা জোরও ধরেছিল মলয়ের জোরদার ইস্তেহারি ভাষার চটকে, অপেক্ষাকৃত বেশি;  আর, তাঁদের সে-টিমও ছিল বেশ ভারি।  বহু পুরনো জ্ঞানপাপী সে-দলে ভিড়েছিল।  'এ' গ্রূপ এই 'বি' গ্রূপের নাম দিয়েছিল 'চুলকে দেওয়া হাংরি জেনারেশন'।  প্রথম গ্রূপটি মলয়কে 'মফসসলের অজ্ঞাত গাড়োল' বলেও চালাতে চেয়েছিল ব্যক্তিগত আক্রোশবশত।  তাঁরা, প্রত্যেকে ছিলেন, কেউ কেউ ছদ্মভাবে, মলয়ের বিরোধীপক্ষ।  বিশেষত আশির দশকে পুনরুত্থিত মলয়ের নিজেকে হাংরি আন্দোলনের স্রষ্টা বলে চালানো, কিছু-কিছু ক্ষেত্রে তাঁর ইতিহাস-বিকৃতি এবং মাত্রাতিরিক্ত আত্মপ্রচারে দাগা পেয়েই প্রথম গ্রূপটির গোসা ধরতামাশি পেয়েছিল এবং তাঁরা পাগলের মতো ক্ষেপে উঠেছিলেন।  সুতরাং প্রথম দলটির ঐ পাঁচ শরিক যাঁরা আন্দোলন-চলাকালীন, ষাটের দশকে যা নিয়ে একেবারেই মাথা ঘামাননি, আশি ও তৎ-পরবর্তী পিরিয়ডে মলয়ের মতই, নিজেদেরকে 'হাংরি আন্দোলনের স্রষ্টা' হিশেবে প্রচার করা শুরু করে দেন।  দায়িত্ব না নিয়ে একটু হাস্যচ্ছলে বলি, হাংরি লেখকদের মধ্যে কেউ আধুনিকতাবাদীদের মতো 'ডক্টরেট' ছিলেন না, ----- সাহিত্য, ইতিহাস, দর্শন, মনোবিজ্ঞান কোন কিছুতেই একজনও 'উলেমা' ছিলেন না বলে এহেন পারস্পরিক কাদাহোলি।  আমি কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে কুম্ভলস চাই না, অতএব কোন্দলটি এড়িয়ে যাচ্ছি।


এ-কথা ঠিক যে হাংরি কোন ইজম ছিল না।  ছিল একটা স্টাইল বা আইডিয়া।  আরও বলতে পারি, একটা ঘটনা, বাংলাভাষায় সেভাবে যা আগে কখনো ঘটেনি।  বাংলা সাহিত্যের তথাকথিত মূল ধারা থেকে বিচ্ছিন্ন অনাদৃত এক উপদ্রুত এলাকা থেকে বিশাল এক ঢেউ, উঠে এসে, আছড়ে পড়েছিল এজি-গোয়িং সাহিত্যের ল্যাসলেসে মসৃণ চত্ত্বরে।  সমাজের একেবারে নিচুতলার ভাষা ও ভাবনাকে সাহিত্যের কাছাকাছি নিয়ে আসার, পক্ষান্তরে বাংলা সাহিত্যের লিরিকফুলের বাগানকে তছনছ করে নতুন প্রতিমান প্রতিষ্ঠার তাগিদে হাংরি ছিল প্রথম আর তখনো-অব্দি একলোতা বৈপ্লবিক সমীহা।
 









পি. এস. কাজল : হাংরি আন্দোলন এবং একজন হাংরি কবি

হাংরি আন্দোলন এবং একজন হাংরি কবি

আন্দোলনের  শুরু : ১৯৬১  সালের নভেম্বরের দিকে পাটনা শহর হতে এ আন্দোলন শুরু হয় । যে কবিরা এ আন্দোলন শুরু করেছিলেন তাদের মধ্যে মলয় রায় চৌধুরী, ত্রিদিব মিত্র , সুনিমল বসাক, শক্তি চট্রোপাধ্যায়, সমীর রায় চৌধুরী এবং বিনয় মজুমদার  ছিলেন অন্যতম । বাঙলা বা ভারতীয় ইতিহাসে ইশতেহার বিলি করে সাহিত্য আন্দোলন মনে হয় এর (হাংরি) বাইরে আর নেই । যদিও প্রথম প্রকাশিত ইশতেহারটি ইংরেজি ভাষায় করা হয়েছিল । তার কারন তৎকালে পাটনায় কোন বাংলা প্রেস ছিল না । ১৯৬১ হতে ১৯৬৪ পযর্ন্ত এ আন্দোলন বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করতে সমর্থ  হয়েছিল । বেশ কিছু বাস্তব অবস্থার কারনে সরকারের কোপানলে পড়ে এবং কয়েকজন হাংরি কবির বিশ্বাসঘাতকতার জন্য ১৯৬৪ সালের পর এ আন্দোলন তার প্রকাশ্যতা হারায় ।  নকশাল বাড়ীর আনোলনের পর উত্তর বঙ্গের তরুন কবিরা এ আন্দালনকে আবার জীবন দান করার চেষ্টা করেছিলেন । কিন্তু তাত্বিক ভিত্তি না থাকায় তারা সফলতা পায় বলে অনেকে মনে করেন ।      আর এ আন্দোলকে যারা সমর্থন করতো এবং  কবিতায়- চেতনায় ধারন করতো তারা ইতিহাসে হাংরি কবি বা হাংরি জেনারেশন নামে পরিচিত ।
ছবি- হাংরি আন্দোলনের ইশতেহার-১৯৬৪
হাংরি আন্দোলন: ত্রিদিব মিত্র কবিতা

হাংরি জেনারেশন আন্দোলন: রাজসাক্ষী সুভাষ ঘোষ-এর মুচলেকা
সুভাষ ঘোষ-এর মুচলেকা:
আমার নাম সুভাষচন্দ্র ঘোষ। গত এক বৎসর যাবত আমি কলেজ স্ট্রিট কফি হাউসে যাতায়াত করছি। সেখানে আমার সঙ্গে এক দিন হাংরি আন্দোলনের উদ্ভাবক মলয় রায়চৌধুরীর পরিচয় হয়। সে আমার কাছ থেকে একটা লেখা চায়। হাংরি জেনারেশন বুলেটিনের খবর আমি জানি বটে কিন্তু হাংরি আন্দোলনের যে কী উদ্দেশ্য তা আমি জানি না। আমি তাকে আমার একটা লেখা দিই যা দেবী রায় সম্পাদিত হাংরি জেনারেশন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। আমি তা আমার রুমমেট শৈলেশ্বর ঘোষের কাছ থেকে পাই। সে হাংরি বুলেটিনের একটা প্যাকেট পেয়েছিল। আমি এই ধরণের আন্দোলনের সঙ্গে কখনও নিজেকে জড়াতে চাইনি, যা আমার মতে খারাপ। আমি ভাবতে পারি না যে এরকম একটা পত্রিকায় আমার আর্টিকেল ‘হাঁসেদের প্রতি’ প্রকাশিত হবে। আমি হাংরি আন্দোলনের আদর্শে বিশ্বাস করি না, আর এই লেখাটা প্রকাশ হবার পর আমি ওদের সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন করেছি।
(স্বাক্ষরের তারিখ ২ সেপ্টেম্বর ১৯৬৪ )
সুভাষ ঘোষ পরে একটি ফ্যাসিস্ট রাজনৈতিক দলে যোগ দেন, যে দলটি পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে নারকীয় অত্যাচার চালিয়েছিল। তিনি এই দলের সদস্য হন এবং দলের রাজনৈতিক মিছিলে ও র‌্যালিতে দলের পতাকা নিয়ে ইনক্লাব জিন্দাবাদ করে বেড়াতেন। তিনি ভুলে গিয়েছিলেন যে হাংরি জেনারেশন আন্দোলন একটি প্রতিষ্ঠানবিরোধী আন্দোলন । তাঁর এই অধৎপতনের কারণে পরবর্তীকালে তাঁর কলম থেকে আর উল্লেখযোগ্য লেখা বেরোয়নি।
হাংরি জেনারেশন : রাজসাক্ষী শৈলেশ্বর ঘোষ-এর মুচলেকা
হাংরি জেনারেশন সাহিত্য আন্দোলনে সবচেয়ে লজ্জার ঘটনা ছিল দুই জন আন্দোলনকারীর রাজসাক্ষী হওয়া। এনারা দুইজন হলেন শৈলেশ্বর ঘোষ ও সুভাষ ঘোষ। কেবল রাজসাক্ষী হওয়াই নয়, এনারা দুই জন মুচলেকাও লিখে দিয়েছিলেন। মলয় রায়চৌধুরীর যখন নিম্ন আদালতে একমাসের কারাদণ্ডের আদেশ হল, এনাদের টিকিটিও দেখতে পাওয়া যায়নি। প্রায় দশ বছর চুপচাপ থেকে এনারা আবার উদয় হন। হাংরি জেনারেশন শব্দটি এড়িয়ে এনারা ক্ষুধার্ত নাম দিয়ে পত্রিকা প্রকাশ করা আরম্ভ করেন। তা এই জন্য যে মুচলেকায় তাঁরা লিখে দিয়েছিলেন যে হাংরি জেনারেশন আন্দোলন ও ম্যাগাজিনের সঙ্গে তাঁদের কোনও সম্পর্ক নেই।
তারপর আটের দশকে মলয় রায়চৌধুরী পূনর্বার কবিতা লেখা আরম্ভ করলে এবং বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় মলয় রায়চৌধুরীর সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হতে থাকলে এনাদের মনে হয় যে তাঁদের মৌরসিপাট্টা বুঝি শেষ হতে চলল। কিন্তু পাঠকবর্গ ইতোমধ্যে তাঁদের কুকর্মের কথা জেনে গিয়েছিলেন। এনারা দুইজন বহু ছোকরাকে জুটিয়ে পুনরায় হাংরি জেনারেশনের জাওয়াজ তোলেন। পাঠক আর তাঁদের বিশ্বাস করছে না দেখে তাঁরা হাংরি জেনারেশন সংকলন বা হাংরি জেনারেশন সমগ্র ইত্যাদি নামে ঢাউস গ্রন্হাবলী বাজারে ছাড়তে আরম্ভ করেন। এই গ্রন্হগুলিতে মলয় রায়চৌধুরী তো ছিলেনই না, উপরন্তু প্রধান-প্রধান হাংরি আন্দোলনকারীদেরো পাওয়া যাবে না। ১৯৬১-এর মূল আন্দোলনকারীরা রাজসাক্ষীদের সাথে যোগাযোগ রাখতে চাননি, লেখাও দেননি। শেষ পর্যন্ত এই দুইজন বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে বিশ্বাসঘাতক প্রতিপন্ন হন যা অধ্যাপক শিবনারায়ণ রায় তাঁর জিজ্ঞাসা পত্রিকার সম্পাদকীয়তেও লিখেছিলেন।
বিশ্বাসঘাতক দুইজনের মুচলেকা নিম্নে দেয়া হল:
শৈলেশ্বর ঘোষ:
আমার নাম শৈলেশ্বর ঘোষ। আমার জন্ম বগুড়ায় আর বড় হয়েছি বালুরঘাটে। আমি ১৯৫৩ সনে বালুরঘাট হাই ইংলিশ স্কুল থেকে স্কুল ফাইনাল পাশ করেছি, ১৯৫৫ সনে বালুরঘাট কলেজ থেকে আই এস সি, ১৯৫৮ সনে বালুরঘাট কলেজ থেকে বি এ, আর ১৯৬২ সনে কলকাতার সিটি কলেজ থেকে বাংলায় স্পেশাল অনার্স। ১৯৬৩ সনে সেপ্টেম্বর মাসের শেষ দিকে একদিন কলেজ স্ট্রিট কফিহাউসে দেবী রায় ওরফে হারাধন ধাড়া নামে একজন তাঁর হাংরি জেনারেশন ম্যাগাজিনের জন্য আমাকে লিখতে বলেন। তারপরেই আমি হাংরি আন্দোলনের লেখকদে৪র সঙ্গে পরিচিত হই। আমি ব্যক্তিগতভাবে খ্যাতিমান লেখক সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, রবীন্দ্র দত্ত, বাসুদেব দাশগুপ্ত, প্রদীপ চৌধুরী এবং উৎপলকুমার বসুকে চিনি। গত এপ্রিল মাসে একদিন কলেজ স্ট্রিট কফিহাউসে মলয় রায়চৌধুরীর সঙ্গে আমার দেখা হয়, এবং তিনি আমার কাছে কয়েকটা কবিতা চান। তাঁর কাছ থেকে একটা পার্সেল পেয়েছি। আমি মলয় রায়চৌধুরীকে চিনি। তিনি হাংরি আন্দোলনের স্রষ্টা। হাংরি জেনারেশন ম্যাগাজিনে আমি মোটে দুবার কবিতা লিখেছি। মলয় আমাকে কিছু লিফলেট আর দু তিনটি পত্রিকা পাঠিয়েছিলেন কিন্তু সেগুলি সম্পর্কে কোনো নির্দেশ তিনি আমাকে দেননি। সাধারণত এই সব কাগজপত্র আমার ঘরেই থাকত। এটুকু ছাড়া হাংরি আন্দোলন সম্পর্কে আমি আর কিছু জানি না। অশ্লীল ভাষায় লেখা আমার আদর্শ নয়। ১৯৬২ থেকে আমি হুগলি জেলার ভদ্রকালীতে ভূপেন্দ্র স্মৃতি বিদ্যালয়ে স্কুল টিচার। মাইনে পাই দু’শ দশ টাকা। বর্তমান সংখ্যা হাংরি বুলেটিনের প্রকাশনার পর, যা কিনা আমার অজান্তে ও বিনা অনুমতিতে ছাপা হয়, আমি এই সংস্হার সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন করেছি। ভবিষ্যতে আমি হাংরি আন্দোলনের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক রাখব না এবং হাংরি পত্রিকায় লিখব না

হত্যাকাণ্ড
ত্রিদিব মিত্র
আমাকে বারবার জীবন থেকে হড়কে জীবনের ফঁদাই পড়তে হচ্ছে
মৃত্যু কেবলই কেবলই প্রতারণা করছে আমার সঙ্গে
চারটে বাঘ আর তিনটে বুনো শুয়োরের
ধ্বস্তাধস্তি চলছে আবছা জ্যোৎস্নায়
আমার মিথ্যে জিভ থেকেই সত্যের চ্যালেঞ্জ ফঁড়ে
ঝলসা দিচ্ছে মানু-বাচ্চাদের
তাদের কান্না শুনে বধির হয়ে যাচ্ছে আমার কান
আনন্দে সাততলা অব্দি লাফিয়ে উঠছে আমার জিভ
প্রেমিকার কষ্ট দেখে আনন্দে কঁদে উঠেছিলাম আমি
চুমু খেতে গিয়ে আলজিভ শুকিয়ে আসছে আমার
চারিদিকের ভিজে স্যাঁতসেতে অন্ধকার থেকে
আমি দানব না যিশুকৃষ্ট বুঝতে না পেরে
রেস্তঁরায় ভিড় করছে মেয়েমানুষেরা
আজ আর কোনো রাস্তা খঁজে পাচ্ছে না কেউ সরলভাবে হাঁটবার
সব রাস্তাই লুটিয়ে থাকে
সব পাপোষের তলায় গড়িয়ে যায় ধুলোর ঝড়
সব জীবনের মথ্যেই ভয়ংকর কাঁপানো অর্থহীনতা শূন্যতা
আঃ মৃত্যু বাঞ্চোৎ মৃত্যু
অপমৃত্যুও ফেরার হয়ে পালাচ্ছে আমার ভয়া
কেননা আমি বুঝে গেছি মৃত্যুর দমবন্ধ ভান
কেননা আমি মৃত্যুর কাছে গিয়েছিলাম সরল চোখে
ভয়ে কঁচকে গিয়েছিল তার চোখ
অন্ধ চোখে কঁদে উঠেছিল মাথা নিচূ করে
এবং খালি হাতে নির্জন রোদে ফিরতে হল আমাকে জটিল চোখে
নিজেকে নিজের থেকেও লুকিয়ে রাখতে পারছি না আর
আমার নপুংসকতা দেখে তুমি হেসে উঠেছিলে-আমার ভালবাসা
ভয় আর ভালবাসার মধ্যে শুয়ে তুমি ফিরে গেলে ভয়ের কাছে
বঁচার তাগিদে তুমি ফিরে এলে মগজের কাছ-বরাবর
ফালতু মগজের জ্যামিতিক অঙ্ক থেকে ছিটকে বেরিয়ে এলাম আমি বিশৃঙ্খলায়
সভ্যকে ঘৃণা করেও লুকিয়ে রইলে সভ্যতার কলকব্জায়
বদহজম থেকে তৈরি হল আমার বদরাগ
সমাজের ভুল চেতনা থেকে নিজেকে ঝুলিয়ে দিলাম শূন্যের বেতারে
টেলিফোনের মধ্যে দিয়ে রোজ তিন কোটি চুমু
এপার-ওপার করছে পৃথিবীময়
রেলের মোটা তার বেয়ে উড়ে যাচ্ছে ৭৪ কোটি মাছি
আমার শরীরের চারিদিকে অসংখ্য ‘টোপ’
নিজেকে ঝাঁঝরা করে জীবনের সঙ্গে মানুষের সঙ্গে
খেলতে চাইলাম চাতুরী
তোমার প্রতারণা থেকে ভালবাসা আলাদা করতে পারছি না একদম
আমি ভাবছি আমাদের প্রথম অভিসম্পাতের কথা
আমি ভাবছি আমাদের শেষ চুম্বনের কথা
আমার দিব্যজ্যোতি আমার আম্ধকার
আমার চারধারে বেইজ্জতি আর বেলেল্লাপনা বারবার
চলছে মানুষের
আমি বুঝতে পারছি মানুষ মানুষকে ভালবাসতে পারছে না
….মানুষ মানুষকে কোনোদিনই ভালবাসেনি
উঁচু বাড়ির মাথা থেকে লাফিয়ে পড়ছে হৃদয়সুদ্ধ লাশ
আমি দেখতে পাচ্ছি প্রয়োজন কিরকম মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে আকাশের দিকে
আমার ধর্ম কি মনে করতে পারছি না কোনোদিন বুঝিনি বলে
আমার শিরা থেকে রক্ত ছিনিয়ে নেবে বলে
স্হায়ী-অস্হায়ী যুদ্ধ চলছে মানুষের আগুপিছু
পাঁজর গুঁড়ো করে বেরিয়ে আসছে রজনীগন্ধার ডানা
অ্যালকহলিক রক্তের ফেনা থেকে তৈরি হচ্ছে আঁশটৈ ক্ষুরধার ভালবাসা
আমি ক্রমশ প্রেম থেকে শরীরহীনতায় ভাসছি
প্রেমিকার বেগুনি মুখ জ্বলে উঠছে ফঁসে যাচ্ছে প্রয়োজনমত
অদরকারি কাগজপত্রে ঢেলে দিচ্ছি আমার বর্তমান
কবিতা আমার বুক থেকে শুষে নিচ্ছে আমার আয়ু
আমার ভালবাসা রক্তমাংস থেকে মানুষ তৈরি করছে তাদের ফিচলেমি
অসুস্হ ভালবাসা ফিরিয়ে আনবার জন্য
মনুষ্যযন্ত্রের সঙ্গে হায় তুমিও
আমার সকল উত্তাপ জযো করে তৈরি করলাম লালগোলাপের পালক
ব্যবসায়িক উৎপাদন থেকে কুড়িয়ে নিলে তুমি একমুঠো প্রতারণা
আগুনের হল্কা চুঁড়ে দিলে আমার গায়ে
শিশুর মত হেসে উঠলাম আমি
পুড়ে গেল আমার সমস্ত শরীর
আকাশ ঘঁষে ছুটে গেল আমার ক্রোধ
স্বাধীনতার হাতে হাত রাখতে পারছে না কেউ ভয়ে
ওঃ
আমার আর সবার মাঝখানে গজিয়ে উঠছে একটা সুদীর্ঘ গভীর ফাটল
আমি বুঝতে পারছি আমার দ্বারা কিছুই হবে না
নিজেকেও তেমন করে ভালবাসা হল না আমার
এই এক জন্মেই হাঁপিয়ে উঠছি আমি
এক সঙ্গেই হাসছি আর হাসছি না
ওঃ ক্লান্তি ক্লান্তি – অক্লান্ত আওয়াজ – আঁকাবাঁকা টানেল –
লুপ – পরিসংখ্যান – ক্ষুধা – মহব্বৎ – ঘৃণা –
কেবল বোঝা বয়েই জীবন চলে যায় ১০১% লোকের
আত্মাকে খঁজে পাওয়া যাচ্ছে না সমস্ত শরীর ছেঁকেও
বিপ্লবউত্তেজনানারীসংঘর্ষহিংস্রতাবন্যনীরবতা নাচছে
আমি একবারও নিজের দিকে তাকাতে পারছি না ফিরে
মানুষের কোনো কাজই করে উঠতে পারলাম না আজ ওব্দি
ফালতু অব্যবহার্য হয়ে কুঁকড়ে শুয়ে আছি বমিওঠা চোখে
মগজে চোলাই কারবার চলছে গুপ্ত ক্ষমতার
কষ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে লালা ওরফে আমার ভালবাসা আমার অসহায়তা
মানুষের রক্তাক্ত পেঁজা শরীরের পাহাড় দিয়ে তৈরি হচ্ছে
অক্ষম আর আঊর্ব স্বাধীনতা
মানুষের ক্ষীণ শরীর বেয়ে শরীর ঘিরে শরীর ধরে চলেছে
অসংখ্য বিশৃঙ্খল শৃঙ্খলা
ওঃ আমি কোনো দিনই ভালবাসতে চাইনি
আঃ…………………………….আঃ
কলজে গঁড়িয়ে যায় চাপা হিংস্রতায়
বুকের ভেতর ইনজিনের চাপা ক্রোধ
রক্তের উত্তেজনে থেকে তৈরি হচ্ছে বন্যতা
অস্তিত্বহীন আত্মার পায়ে স্বেচ্ছায় প্রণাম রেখেছিল সুবো
তিন মাস জঘন্য নীরবতার পর আঁৎকে উঠে কুঁকড়ে গিয়েছিল প্রদীপ
মানুষের সাহসিকতাকে ভুল করে সন্দেহ করতে শিখেছি
ভুল জেনে ভুল মানুষের সঙ্গে মিশে
আমি চালাক হতে ভুলে যাচ্ছি স্বেচ্ছায়
ভাঁটার সঙ্গে সঙ্গে চতুরতা মূর্খতাও গড়িয়ে যাচ্ছে অন্ধকারে
ত্রিদিবের মুখ ত্রিদিব নিজেই কতদিন চিনতে পারেনি
আদপে সত্য কোনো স্পষ্ট মুখ খঁজে পাচ্ছি না নিজের
“মানুষের নিজস্ব কোনো চরিত্র নেই” বলতে ককিয়ে উঠেছিল
৩৫২ কোটি মানুষ তায় ঐতিহ্য আর পোষা চরিত্রহীনতা
ওঃ অসম্ভব কষ্ট হচ্ছে এখন
কে বা কারা গলা টিপে ধরছে ভুল করে
আমার ।
তাদের অজান্তেই…
(১৯৬৩ সালে শিবপুরের পুরানো বাড়িতে থাকাকালীন রচিত, এবং মলয় রাচৌধুরী সম্পাদিত ‘জেব্রা’ পত্রিকার দ্বিতীয় সংখ্যায় প্রকাশিত । )
অনেকে মনে করেন হাংরি আন্দোলন শেষ হয়ে গেছে । কিন্তু বর্তমান আধুনিক কবিদের  ( সরকারি দালাল গুলোকে বাদ দিলে যারা থাকে ) লেখা কবিতা বা তাদের চিন্তা চেতনা দেখলে আমার মনে হয় না এ আন্দোলন শেষ হয়ে গেছে । তবে এটা ঠিক আন্দোলনের রকমেরও পরিবর্তন হয়েছে । কিন্তু প্রতিবাদের ভাষা হারিয়ে যায় নি তবে পরিবর্তন হয়েছে ভাষার স্বাভাবিক পরিবর্তনশীলতার মত । আর স্পেংলারের সংস্কৃতি সংগা বা পরিবর্তনের নিয়মকে যথার্থ  ধরলে , আমাদের বর্তমান সংস্কৃতি কি স্বাভাবিক গতিধারায় চলছে । আমাদের সংস্কৃতি কি নিজ সমাজ হতে খাদ্য বা বেচে থাকার মত উপাদা  পাচ্ছে ? উত্তর যদি হয় না তবে আমাদের সংস্কৃতি কোন পথে যাবে ?

বৃহস্পতিবার

হাংরি আন্দোলনে মলয় রায়চৌধুরীর কবিতা -- প্রবীর চ্যাটার্জি

বিশ শতকের ষাট বা ছয়ের দশক বাংলা কবিতার ইতিহাস যে-কারণে স্মরণীয় হয়ে আছে, তার মথ্যে হাংরি আন্দোলন অন্যতম, এ-বিষয়ে দ্বিমত নেই । আর এই হাংরি আন্দোলনের অন্যতম নেতা মলয় রায়চৌধুরী । যিনি আজও সৃজনক্ষম । গদ্যে-পদ্যে যিনি তাঁর মৌলিক চিন্তাভাবনা ও প্রতিবাদ অক্ষয় করে চলেছেন । কারো আনুকুল্য বা হাততালির প্রত্যাশা করেন না । ভুল কি ঠিক, সে-বিচার করবে ইতিহাস বা মহাকাল । পরোয়াহীন এই লেখককে তাঁর নিজস্ব ভাষামুদ্রা ও ভঙ্গির জন্য অভিবাদন জানাতেই হয় । আমরা জানি প্রথাভাঙার স্পর্ধা তখন সরকার মানতে পারেনি । কাব্যে অশ্লীলতার জন্য মলয় রায়চৌধুরীকে গ্রেপতার করা হয় ।



বাংলা কবিতায় রবীন্দ্রনাথের পর নতুন সুর শুনিয়েছিলেন তিরিশের কবিরা । চল্লিশের কবিদের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও প্রতিবাদী ভঙ্গি আরেক মাত্রা যোগ করেছিল । আত্মকথন ও আত্মরতিকে সম্বল করে অন্যরকম স্বাদ নিয়ে এলেন পঞ্চাশের কবিরা । আর ষাটের কবিরা, বিশেষভাবে 'হাংরি আন্দোলন' আমূল নাড়া দিলো বাংলা কবিতার সনাতন ঐতিহ্যকে, নিয়মানুবর্তিতাকে । কবিতার ভাষায়, ছন্দে, অলংকারে, স্তবকে তুমুল ভাংচুর পাঠকের অভ্যস্ত চোখ ও কানকে বিব্রত করে তুলল । বিশেষত মলয় রায়চৌধুরীর লেখায় যৌনতার সঙ্গে এলো ব্যঙ্গ, আত্মপরিহাস ও অসহায় মানুষের নিস্ফলতার যন্ত্রণা । কিভাবে মলয় রায়চৌধুরী তাঁর কবিতায় আত্মপ্রক্ষেপ ঘটিয়েও নিরপেক্ষ হয়ে যান, সামাজিক ঘটনার দ্রষ্টা হন, নির্মম সমালোচনায় শাণিত গিস্পাত হয়ে ওঠেন, তা তাঁর কবিতাগুলি পড়লে টের পাওয়া যায় ।



হাংরি আন্দোলন চলাকালীন তার তিনটি কবিতা সাড়া জাগায় | সেই তিনটি হচ্ছে "জখম", "প্রচন্ড বৈদ্যুতিক ছুতার",এবং

"রবীন্দ্রনাথের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা" |  আগের লেখাতে আমি  "প্রচন্ড বৈদ্যুতিক ছুতার" কবিতাটি প্রকাশ করেছি | আজ প্রকাশ করলাম :-



"রবীন্দ্রনাথের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা"

                             -----------মলয় রায়চৌধুরী



আজ দেখি এলুমিনিয়াম বাক্সে গোছ করা আমারই মড়া

অর্ধেক পাঁজর পুড়ে গেছে রাবার জ্বালানো আঁচে

আমাকে ক্ষমা করো

মানুষের মগজ নষ্ট হোক আমার

আমার নখ দাঁত নষ্ট হোয়ে যাক

হাতির আঁদুয়া দিয়ে বেঁধে রাখো আমায়

দেখতে চাই রক্তের ভেতর হাঙ্গর আফানি দেয় কিনা

লাথি লেগে ভাতের থালার ওপর জলের গ্লাস উল্টে পড়ুক

আমাকে ক্ষমা করো 

সন্তানের আত্মমৈথুন করা হাতে মুখাগ্নি

উলুঘাস - বুনোটের শেকড়ের পাশে পোকাদের নিঃশব্দ সঙ্গম

এতদিন এদের মুখে থুথু ছিটিয়ে দিতে পারিনি

ধানকাটা নিয়ে এ বছর অনেক লাশ পড়ে গেল

বাইসন শিকারের জন্য বেতলার জঙ্গলে আমাদের চিত্কার

হরিনের মাংস কাটা হয়েছিল কোদাল দিয়ে

আমার ছেলে - মেয়েরা খরগোশের চোখ উপরে

খেলা করছিল বেতলার দুর্গে

এলুমিনিয়াম বাক্সে আমার লাশ বাঁচিয়ে তুলতে চাইছি

আমাকে ক্ষমা করুন

Transliteration

bisa satakera sata ba chayera dasaka banla kabitara itihasa ye-karane smaraniya haye ache, tara mathye hanri andolana an'yatama, e-bisaye dbimata ne'i . ara e'i hanri andolanera an'yatama neta malaya rayacaudhuri . yini aja'o srjanaksama . gadye-padye yini tamra maulika cintabhabana o pratibada aksaya kare calechena . karo anukulya ba hatatalira pratyasa karena na . bhula ki thika, se-bicara karabe itihasa ba mahakala . paroyahina e'i lekhakake tamra nijasba bhasamudra o bhangira jan'ya abhibadana janate'i haya . amara jani prathabhanara spardha takhana sarakara manate pareni . kabye aslilatara jan'ya malaya rayacaudhurike grepatara kara haya .



banla kabitaya rabindranathera para natuna sura suniyechilena tirisera kabira . callisera kabidera rajanaitika prajna o pratibadi bhangi areka matra yoga karechila . atmakathana o atmaratike sambala kare an'yarakama sbada niye elena pancasera kabira . ara satera kabira, bisesabhabe 'hanri andolana' amula nara dilo banla kabitara sanatana aitihyake, niyamanubartitake . kabitara bhasaya, chande, alankare, stabake tumula bhancura pathakera abhyasta cokha o kanake bibrata kare tulala . bisesata malaya rayacaudhurira lekhaya yaunatara sange elo byanga, atmaparihasa o asahaya manusera nisphalatara yantrana . kibhabe malaya rayacaudhuri tamra kabitaya atmapraksepa ghatiye'o nirapeksa haye yana, samajika ghatanara drasta hana, nirmama samalocanaya sanita gispata haye othena, ta tamra kabitaguli parale tera pa'oya yaya .



hanri andolana calakalina tara tinati kabita sara jagaya | se'i tinati hacche "jakhama", "pracanda baidyutika chutara",ebam

"rabindranathera kache ksama prarthana" | agera lekhate ami "pracanda baidyutika chutara" kabitati prakasa karechi | aja prakasa karalama :-



"rabindranathera kache ksama prarthana"

-----------malaya rayacaudhuri



aja dekhi eluminiyama bakse gocha kara amara'i mara

ardheka pamjara pure geche rabara jbalano amce

amake ksama karo

manusera magaja nasta hoka amara

amara nakha damta nasta hoye yaka

hatira amduya diye bemdhe rakho amaya

dekhate ca'i raktera bhetara hangara aphani deya kina

lathi lege bhatera thalara opara jalera glasa ulte paruka

amake ksama karo

santanera atmamaithuna kara hate mukhagni

ulughasa - bunotera sekarera pase pokadera nihsabda sangama

etadina edera mukhe thuthu chitiye dite parini

dhanakata niye e bachara aneka lasa pare gela

ba'isana sikarera jan'ya betalara jangale amadera citkara

harinera mansa kata hayechila kodala diye

amara chele - meyera kharagosera cokha upare

khela karachila betalara durge

eluminiyama bakse amara lasa bamciye tulate ca'ichi

amake ksama karuna

সমীর রায়চৌধুরী - হাংরি সময় থেকে অধুনান্তিক সময়ে : শুভাশিস ভট্টাচার্য

সমীর রায়চৌধুরী   – হাংরি সময় থেকে অধুনান্তিক সময়ে



আমরা সম্প্রতি হারালাম কবি ও সাহিত্যিক শ্রদ্ধেয় শ্রী সমীর রায়চৌধুরীকে । সমীর রায়চৌধুরী  এমন একজন গাছ-মানুষ, যার ছায়ায়  গত শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে শুরু করে এই শতাব্দীর দ্বিতীয় দশক পর্যন্ত কয়েক প্রজন্মের কবি এবং সাহিত্যিকরা, প্রচলিত বাজারি প্রাতিষ্ঠানিক স্বাতন্ত্র্য-হীন সাহিত্য ভাবনার  পরম্পরার যাঁতাকল থেকে বেরিয়ে, বাংলা সাহিত্যের ভাষা, বিষয়, উপস্থাপনা, বিন্যাস ইত্যাদির দিগন্তকে প্রসারিত করার পরীক্ষা নিরীক্ষায়  উৎসাহিত হয়েছেন।
হাংরি আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা সমীর রায়চৌধুরীর জন্ম মামার বাড়ি ২৪ পরগণার  পাণিহাটিতে ১৯৩৩ সালে। তাঁর দাদামশায় কিশোরীমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন ম্যালেরিয়া রোগের কারণ আবিষ্কারকারী স্যার রোনাল্ড রসের সহগবেষক। সমীর কলকাতার আদি নিবাসী  সাবর্ণ-রায়চৌধুরী পরিবারের উত্তরপাড়া শাখার সন্তান।  তাঁর বাবা রঞ্জিত রায়চৌধুরী ছিলেন পাটনা শহরের প্রাচীনতম ফটোগ্রাফি সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা। জ্যাঠামশাই প্রমোদ রায়চৌধুরী ছিলেন পাটনা শহরের মিউজিয়ামের কিপার অব পেইনটিংস অ্যান্ড স্কাল্পচার।

স্কুল জীবন পাটনায় কাটিয়ে ১৯৪৯ সালে তিনি কলকাতার সিটি কলেজে গিয়ে বিজ্ঞান শাখায় ভর্তি হন,  এবং সেই সূত্রে পরিচিত হন সহপাঠী কবি দীপক মজুমদারের সঙ্গে। সিটি কলেজের দেয়াল পত্রিকায় প্রকাশিত অন্য এক সহপাঠী কবির কবিতাকে ভালো লাগাকে কেন্দ্র করে আলাপ হয় কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে। দীপক মজুমদার এবং সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে বন্ধুত্বের সূত্রে কৃত্তিবাস গোষ্ঠীতে সক্রিয় ভাবে জড়িয়ে পরেন। কৃত্তিবাস গোষ্ঠীতে যুক্ত থাকার সময়ে তাঁর দুটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিল : ‘ঝর্ণার পাশে শুয়ে আছি’  এবং ‘আমার ভিয়েতনাম’ । এই সময়ে তিনি ব্যক্তিগত উদ্যোগে এবং নিজ অর্থে প্রকাশ করেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়-এর কাব্য গ্রন্থ ‘একা এবং কয়েকজন’। কৃত্তিবাস গোষ্ঠী ত্যাগের পর, হাংরি আন্দোলন-এর কারণে তাঁর কবিতায় লক্ষণীয় বাঁক-বদল ঘটে, এবং তা প্রতিফলিত হয় তাঁর পরবর্তী কাব্যগ্রন্থ ‘জানোয়ার‘ এবং ‘আমার ভিয়েৎনাম’-এ । সেই সময়ে, নিমডি নামের সাঁওতাল গ্রামের পাহাড়চূড়ায়, তাঁর চাইবাসার বাড়িটি, হয়ে উঠেছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্য-কেন্দ্র। ৫০ ও ৬০ দশকের বহু কবি ও লেখকের রচনায় চাইবাসার কথা বারবার উচ্চারিত হয়েছে। নিমডিতে তার বাড়িতে দুই বছরের বেশী ছিলেন কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়।  শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কাব্যগ্রন্থ “হে প্রেম হে নৈঃশব্দ্য”-এর প্রেমের কবিতা গুলি এই পর্বের লেখা।

১৯৬১ সালের নভেম্বরে তিনি ছোট ভাই  মলয় রায়চৌধুরী, শক্তি চট্টোপাধ্যায়  ও  দেবী রায়ের সঙ্গে হাংরি আন্দোলন  শুরু করেন।  পরে হাংরি আন্দোলনে যোগ দেন উৎপলকুমার বসু, বিনয় মজুমদার, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, সুবিমল বসাক, অনিল করঞ্জাই, করুণানিধান মুখোপাধ্যায়, ফাল্গুনী রায়,  ত্রিদিব মিত্র ও আলো মিত্র, প্রদীপ চৌধুরী, সুবো আচার্য, অরূপরতন বসু, বাসুদেব দাশগুপ্ত, সুভাষ ঘোষ, সতীন্দ্র ভৌমিক, হরনাথ ঘোষ, নীহার গুহ, শৈলেশ্বর ঘোষ, অশোক চট্টোপাধ্যায়, অমৃততনয় গুপ্ত, ভানু চট্টোপাধ্যায়, শঙ্কর সেন, যোগেশ পাণ্ডা, মনোহর দাশ প্রমুখ।

হাংরি আন্দোলনকারীরা ‘হাংরি’ শব্দটি পেয়েছিলেন ইংরেজি ভাষার কবি জিওফ্রে চসারের ‘ইন দি সাওয়ার হাংরি টাইম’ বাক্যটি থেকে। তাত্ত্বিক ভিত্তি হয়েছিল সমাজতাত্ত্বিক অসওয়াল্ড স্পেংলারের ‘দি ডিক্লাইন অব দি ওয়েস্ট’ গ্রন্থটির দর্শন থেকে। স্পেংলারের মতে ‘সংস্কৃতি’ একটি জৈব প্রক্রিয়া। একটি সংস্কৃতির ইতিহাস সরল রৈখিক নয়, তা একযোগে বিভিন্ন দিকে প্রসারিত হয় এবং সেকারণে সমাজটির নানা অংশের কার কোন দিকে বাঁক বদল ঘটবে তা আগাম বলা যায় না। স্পেংলার ‘সংস্কৃতি’ এবং ‘সভ্যতা’ এই দুই শব্দকে  দুটি পৃথক অর্থে ব্যাবহার করেছেন। তাঁর মতে, ‘সংস্কৃতি’ সৃজনশীল এবং “হয়ে ওঠার” প্রক্রিয়া। ‘সংস্কৃতি’ অন্তর্মুখী এবং তার শক্তির প্রকাশ নিজেকে বিকশিত ও সমৃদ্ধ করার উদ্দেশ্যে। সময়ের নিয়মে একসময় সেই সংস্কৃতির সৃজন ক্ষমতা ফুরিয়ে যায় তখন তার “হয়ে ওঠার” প্রক্রিয়ার অবসান হয় এবং সে পরিণত হয় ‘সভ্যতা’য়।  ‘সভ্যতা’ বহির্মুখী এবং  তার শক্তির প্রকাশ নিজেকে বিকশিত করার কাজে নয় বরং নিজেকে প্রসারিত করার উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়, তখন সে বাইরে থেকে যা পায় তা-ই আত্মসাৎ করতে থাকে, তখন তার ক্ষুধা তৃপ্তিহীন। স্পেংলার মতে ‘সংস্কৃতি’ অন্তর্মুখী তাই সে জীবনের প্রতি আন্তরিক এবং সৎ। কিন্তু ‘সভ্যতা’ যেহেতু বহির্মুখী সে হয়ে ওঠে কৃত্রিম এবং অসৎ।  

হাংরি আন্দোলনকারীরা  উত্তর-ঔপনিবেশিক বাংলা ভূখণ্ডে কৃত্রিম, অসৎ, সৃজন-ক্ষমতাহীন স্পেংলারের ‘সভ্যতা’র প্রতিবিম্ব দেখেছিলেন যেখানে জীবনের সৎ, আদিম এবং কাঁচা অনুভূতি গুলিকে সভ্যতার মুখোশে ঢেকে পরম্পরার স্তূপীকৃত জঞ্জালকে সাহিত্যের নামে বাজারে পণ্য করা হয়। হাংরি আন্দোলনকারীদের যুদ্ধ ছিল আধিপত্য-প্রণালীর বিরুদ্ধে।  রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, আর্থিক, নৈতিক, নান্দনিক, ধার্মিক, সাহিত্যিক, শৈল্পিক ইত্যাদি সমস্ত রকম আধিপত্যের প্রণালীবদ্ধতাকে ভেঙে ফেলে পরিসরটিকে মুক্ত করা ছিল আন্দোলনের উদ্দেশ্য, অভিমুখ, উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং গন্তব্য। তারা শিল্পের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে শুরু করলেন কাউন্টার কালচারাল আন্দোলন, এবং নিজেদের সাহিত্য-ভাবনাকে তারা বললেন কাউন্টার ডিসকোর্স।

কবি মলয় রায়চৌধুরীর ভাষায় -  “সেই সময়কার প্রধান সাহিত্যিক সন্দর্ভের তুলনায় হাংরি আন্দোলন যে প্রতি-সন্দর্ভ গড়ে তুলতে চাইছিল, সে রদবদল ছিল দার্শনিক এলাকার, বৈসাদৃশ্যটা ডিসকোর্সের, পালা বদলটা ডিসকার্সিভ প্র্যাকটিসের, বৈভিন্ন্যটা কথন-ভাঁড়ারের, পার্থক্যটা উপলব্ধির স্তরায়নের , তফাতটা প্রস্বরের, তারতম্যটা কৃতি-উৎসের । তখনকার প্রধান মার্কেট-ফ্রেন্ডলি ডিসকোর্সটি ব্যবহৃত হতো কবি-লেখকের ব্যক্তিগত তহবিল সমৃদ্ধির উদ্দেশ্যে । হাংরি আন্দোলনকারীরা সমৃদ্ধ করতে চাইলেন ভাষার তহবিল, অন্ত্যজ শব্দের তহবিল, শব্দার্থের তহবিল, নিম্নবর্গীয় বুলির তহবিল, সীমালঙ্ঘনের তহবিল, অধঃস্তরীয় বাক-বৈশিষ্ট্যের তহবিল, স্পৃষ্টধ্বনির তহবিল, শব্দোদ্ভটতার তহবিল,  প্রভাষার তহবিল, ভাষিক ভারসাম্যহীনতার তহবিল, রূপধ্বনির প্রকরণের তহবিল, বিপর্যাস সংবর্তনের তহবিল, স্বরন্যাসের তহবিল, পংক্তির গতিচাঞ্চল্যের তহবিল, সন্নিধির তহবিল, পরোক্ষ উক্তির তহবিল, পাঠবস্তুর অন্তঃস্ফোটক্রিয়ার তহবিল, বাক্যের অধোগঠনের তহবিল, খণ্ডবাক্যের তহবিল, তড়িত ব্যঞ্জনার তহবিল, অপস্বর-উপস্বরের তহবিল, সাংস্কৃতিক সন্নিহিতির তহবিল, বাক্য-নোঙরের তহবিল, শীৎকৃত ধ্বনির তহবিল, সংহিতাবদলের তহবিল, যুক্তিচ্ছেদের তহবিল, আপতিক ছবির তহবিল, সামঞ্জস্যবদলের তহবিল, কাইনেটিক রূপকল্পের তহবিল ইত্যাদি।“

হাংরি আন্দোলনের শতাধিক বুলেটিনের অধিকাংশ সমীর রায়চৌধুরীর  খরচে প্রকাশিত হয়েছিল।  হাংরি আন্দোলনের সময় লেখা সমীর রায়চৌধুরীর “হণির জন্মদিন” কবিতায় সেই কাউন্টার ডিসকোর্সের প্রতিফলন দেখা যায়। কবিতা শ্লীল এবং অশ্লীলের ছুঁৎমার্গ থেকে বেরিয়ে পড়ে জীবনের অনুসন্ধানে। অকৃত্রিম জীবন সবসময় শিল্প-রুচিসম্মত নিয়মাবলী মেনে চলে না, তাই জীবনের অনুসন্ধানে কবিতাকে যুদ্ধ ঘোষণা করতে হয় শিল্পের বিরুদ্ধে -

‘মধ্যরাত্রে শূন্য খোলা রাজপথে যুগ্ম শিশ্ন তুলে ধরে আমি ও সুনীল
কলকাতা চুরমার করে
বহুবার ছুটে গেছি মেটিয়াবুরুজে।
ন্যাংটো করে অভিলাষ কুমারীর দেহ খুঁড়ে সন্দীপন ভেঙেছে প্রাসাদ,
সমরেন্দ্র বিলিয়েছে রূপসী বেশ্যার গৃহে কোম্পানির বিজয় টনিক—’
(হণির জন্মদিন -  সমীর রায়চৌধুরী - হাংরি বুলেটিন ১৯৬২)

আদিম এবং অকৃত্রিম জীবনের যে সমস্ত সৎ শব্দ এবং অনুভূতিগুলো তদানীন্তন বাংলা সাহিত্যে অচ্ছুত ছিল সেগুলি অনায়াসে গিলে ফেলে জন্ম নেয়  ক্ষুৎকাতর কবিতা –

‘মসৃণ চাবুক হাতে বাগনানে ভয়ংকর কাফ্রী হয়ে গেছি
আমরা সদলবলে  দ্রৌপদীর দীর্ঘবস্ত্রহরণের ওই লিঙ্গ প্রধান প্রহসনে
মনোবেদনার জন্য মহিলার তলপেটে  ছেয়েছি বাগান’
(হণির জন্মদিন -  সমীর রায়চৌধুরী - হাংরি বুলেটিন ১৯৬২)

হাংরি আন্দোলনের কারণে ১৯৬৪ সালে তিনি গ্রেফতার বরণ করেন, যদিও তাঁর বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ না থাকায় অচিরে মুক্তি পান। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল যে তিনি তরুণদের বিপথগামী করছেন (ভারতীয় দণ্ড সংহিতার ২৯৪ ধারা)। হাংরি আন্দোলনের সময়কাল খুবই সংক্ষিপ্ত , ১৯৬১ থেকে ১৯৬৫ পর্যন্ত। কিন্তু তার প্রভাব বাংলা সাহিত্য-মননে বিশেষ ভাবে প্রতিফলিত হয়েছে এবং হাংরি আন্দোলনের বীজ থেকে পরবর্তী কালে আরো অনেক সাহিত্য আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছে। গ্রেপ্তারির অপমানের কারণে, এবং ১৯৬৫ সালে হাংরি আন্দোলন  প্রকৃত অর্থে ফুরিয়ে যাওয়ায়,   প্রায় তিন দশক লেখালিখি থেকে দূরে সরে ছিলেন । ৯০ দশকে তিনি আবার লেখালিখিতে ফিরে আসেন, এবং তা কবি, ছোট-গল্পকার ও ভাবুক ও “হাওয়া-৪৯” পত্রিকার সম্পাদক রূপে ।

নব্বই দশকের শুরুতে সমীর রায়চৌধুরী  ‘হাওয়া ৪৯’  নামে একটি ত্রৈমাসিক সাহিত্য-পত্রিকা সম্পাদনা শুরু করেন । ‘উনপঞ্চাশ বায়ু’ বলতে সংস্কৃতে অবচেতন মনের অবস্থা বোঝায়। ‘হাওয়া ৪৯’   সাহিত্য ও বিজ্ঞানকে একটি মঞ্চে একত্রিত করে তিনি নবতর একটি সাহিত্য-চিন্তা প্রণয়ন করেন । পরবর্তীকালে পত্রিকাটি সাহিত্যতত্ত্ব ও ভাষাতত্ত্বের পত্রিকা হয়ে ওঠে, এবং তাকে আলোচকরা  ‘অধুনান্তিক’ বলে স্বীকৃতি দেন । এই ধারায় রচিত তাঁর কবিতা এবং ছোটগল্পের সংকলন  সম্পূর্ণ ভিন্ন ধারার বাংলা লেখা হিসাবে স্থান করে নিতে পেরেছে ।
‘অধুনান্তিক’ ভাবনা কোনো নিছক সাহিত্যতত্ত্ব নয় এটি একটি আর্থ-সাংস্কৃতিক এবং ঐতিহাসিক কালখণ্ডের যুগলক্ষণ। যে কালখণ্ডে আমাদের ভাবনা, সরল রৈখিক না হয়ে, হয়ে ওঠে বহুমুখী এবং কোন একটি কেন্দ্রে ঘনীভূত না হওয়ার কারণে তৈরি হয় ভাবনার বিশৃঙ্খল জটিলতা। এই কালখণ্ডে সর্বব্যাপী  ডিজিটাল মিডিয়া আমাদের উপলব্ধিকে প্রভাবিত করে সর্বক্ষণ। সর্বব্যাপী  টেলিভিশন, মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট আমাদের পারিপার্শ্বিক প্রত্যক্ষ বাস্তবতার ভাবনাকে একই সময়ে যুক্ত করে পৃথিবীর অন্য-প্রান্তে হতে থাকা অপ্রত্যক্ষ বাস্তবতার সাথে এবং দুরের কল্পলোকের সাথে । আমরা একই সাথে অনেক কিছুর সাথে যুক্ত। আর একসাথে অনেক কিছুর সাথে যুক্ত হওয়ার কারণে আমরা সমস্ত কিছু থেকে অসংযুক্ত। আমাদের এই কালখণ্ডে ভাবনার এই বিশৃঙ্খল জটিলতাই আমাদের চালিকা শক্তি। এই আর্থ-সামাজিক পরিসরে বিভিন্ন গোষ্ঠীর মানুষের কথ্য ভাষার সাথে, বিভিন্ন ডিজিটাল মিডিয়ার ভাষা, টেলিভিশন, সংবাদপত্র, বিজ্ঞাপন এবং উন্মুক্ত বাজারের ভাষার সংকরায়নে তৈরি হচ্ছে অধুনান্তিক ভাষা।

সমীর রায়চৌধুরীর অধুনান্তিক পর্বের বিভিন্ন কবিতায় আমাদের এই কালখণ্ডের প্রতিফলন দেখা যায়। সমীর রায়চৌধুরীর মতে, অধুনান্তিক কালখণ্ডে কবিতা সরল রৈখিক হবে না, তার থাকবে বহু শিকড়, বহু কেন্দ্রবিন্দু-

‘তাহলে দূর্গাপুর থেকে আজই ফিরলেন ঐ রজতশুভ্র
আমি তো মিনিং ব্যাপারটার একেবারে দোরগোড়ায় পৌঁছে গেছি
একটা বিশ্ব ব্যাকরণের যোগান অর্থবোধকতা খুঁজছে বানান
দূর্গাপুরে কি পাত্রী দেখলেন নাকি কবিদের সঙ্গে
রথীনের বউ বেশ ছোট সাইজের ভূত আর চোরের ভয়’
(একটি বহুরৈখিক টেক্সট - সমীর রায়চৌধুরী)

কোন কিছুই সম্পূর্ণ বুঝে ফেলার চেষ্টা বৃথা হবে কারণ ‘মিনিং থামতে জানে না   না কোনো শেষকথা নেই…’

‘রজতশুভ্র নতুন কিছু লিখছে নাকি এখনও সেই রসুলপুর
ধরুন আনন্দ কত রকমের এক গোলে জেতার আনন্দ
লোডশেডিঙে আচমকা ফিরে আসা আলো
পুরোনো প্রেমিকার সঙ্গে হঠাৎ উল্টোদিকের বাসের জানলায়
কুড়িয়ে পাওয়া পঞ্চম জর্জের আধুলি রসুলপুর মানে
একটা কিছু ভর করলেই মুশকিল
মিনিং থামতে জানে না   না কোনো শেষকথা নেই…’
(একটি বহুরৈখিক টেক্সট - সমীর রায়চৌধুরী)

একটি কবিতাকে বিভিন্ন ভাবে অনুভব করা যাবে — একই পাঠ্য-বস্তু থেকে জন্ম নেবে বহু পাঠ্য-বস্তু। একটা পর্যায়ে কবিতার পাঠ্য-বস্তু আর শুধুমাত্র কবিতার নিজস্ব সম্পত্তি হিসেবে থাকবে না। কবিতার মধ্যে ঢুকে পড়বে গল্প-প্রবন্ধ-চিত্রকলা-সিনেমা-বিজ্ঞাপন— অর্থাৎ কবিতা হয়ে উঠবে মুক্ত-মুখী,  অসীম। বস্তু তার উপমার বাঁধন ছেড়ে শুধু মাত্র বস্তু হিসেবেই প্রতিফলিত হবে আর প্রতীকের মৃত্যু ঘটবে কবিতায়।

‘—সবাই ঘড়িতে ঢুকছে— ঘড়ি স্বয়ং পাখি হয়ে ফুড়ুৎ—
নারীর আড়মোড়া, পুরুষের হনহনে হাঁটার ভঙ্গি, ঘড়ির
সেকেন্ডের কাঁটা, উড়োপাখির ডানা,— ডানা থেকে
ঝরে পড়ছে প্রসাধনসামগ্রী টুকিটাকি গ্যাজেট আসবাব—
জড়ো হচ্ছে রদ্দি বাতিল কাবাড়ির আস্তানায়—
কবি হুমড়ি খেয়ে বেছে নিচ্ছেন উপমা প্রতীক লোগো—‘
(ছাদনাতলার ক্রসকানেকশন - দৃশ্য তিন: সময় - সমীর রায়চৌধুরী)

এভাবেই সমীর রায়চৌধুরী তার সাহিত্য-যাপনে প্রচলিত প্রাতিষ্ঠানিক সাহিত্য ভাবনার পরম্পরার জঞ্জাল থেকে বাংলা সাহিত্যের ভাষা, বিষয়, উপস্থাপনা, বিন্যাসকে মুক্ত করে আমাদের সমৃদ্ধ করেছেন।

‘আমার সম্পর্কে সবার ধারণার ধারক সমীর
সবার ধারণা এক নয় …
আমি সমীর নয় এই ধারণা
একান্ত আমার’
(সমীরের খামতিগুলো: ৬ - সমীর রায়চৌধুরী)

অধুনান্তিক পর্বে তাঁর দুটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে, ‘মাংসের কস্তুরীকল্প’ এবং ‘অপূর্বময়ী স্মৃতি বিদ্যালয়’ ।
ছোটোগল্পকার হিসাবে তাঁর ফিকশানগুলোয় তিনি এনেছেন জাদুবাস্তবতা, বিশেষ করে ‘বহুজাতিক ভুতের গল্পের খসড়া’, ‘আলজাজিরা’, ‘সিগারেটের তিরোভাব’ এবং ‘টিনিদির হাত’-এ।

বাংলা সাহিত্য ওনার কাছে বিশেষ ভাবে ঋণী এবং ২২ শে জুন ২০১৬ সালে ওনার প্রয়াণে বেশ খানিকটা গরিব হয়ে পড়ল । উনি বেঁচে থাকবেন, আমাদের মাঝে ওনার সাহিত্য দর্শনের প্রতিফলনে। লেখাটি শেষ করব শ্রী সমীর রায়চৌধুরীকে প্রণাম জানিয়ে এবং ওনার লেখা কয়েকটি কবিতার মাধ্যমে ওনাকে শ্রদ্ধা জানিয়ে।

(কৃতজ্ঞতা স্বীকার – শ্রদ্ধেয় সাহিত্যিক এবং কবি মলয় রায়চৌধুরীর সহায়তা ছাড়া এই লেখাটি সম্ভব হত না। ওনার কাছ থেকে হাংরি আন্দোলন সম্বন্ধে অনেক কিছু জানতে পেরেছি, যা আমাকে সমৃদ্ধ করেছে । উনি আমার এই লেখাটি সম্পাদনা করে দিয়েছেন এবং সমীর রায়চৌধুরীর কবিতা গুলি প্রকাশের অনুমতি দিয়েছেন)

(বিধিসম্মত সতর্কীকরণ – সমীর রায়চৌধুরীর কবিতা গুলি প্রাপ্তবয়স্ক এবং প্রাপ্তমনস্ক পাঠকের জন্য।  কবিতাগুলি পাঠ করা, বা না করা, পাঠকের স্বাধীনতা এবং পাঠ প্রতিক্রিয়ার দায়িত্ব সম্পূর্ণই পাঠকের)


হণির জন্মদিন

সাতলক্ষ যুবতীর পোঁদে লাথি মেরে
ভেবেছিলাম কাতরানি গড়াবে প্রচুর,
মধ্যরাত্রে শূন্য খোলা রাজপথে যুগ্ম শিশ্ন তুলে ধরে আমি ও সুনীল
কলকাতা চুরমার করে
বহুবার ছুটে গেছি মেটিয়াবুরুজে।
ন্যাংটো করে অভিলাষ কুমারীর দেহ খুঁড়ে সন্দীপন ভেঙেছে প্রাসাদ,
সমরেন্দ্র বিলিয়েছে রূপসী বেশ্যার গৃহে কোম্পানির বিজয় টনিক—
শক্তি যে কিঞ্চিৎ ভীতু
                  সে-ও তবু হাওয়ায় ছুঁড়িয়াছে লাথি,
সঙ্গোপনে ফুলকুমারীর প্রতি;
মসৃণ চাবুক হাতে বাগনানে ভয়ংকর কাফ্রী হয়ে গেছি।
আমরা সদলবলে  দ্রৌপদীর দীর্ঘবস্ত্রহরণের ওই লিঙ্গ প্রধান প্রহসনে
মনোবেদনার জন্য মহিলার তলপেটে  ছেয়েছি বাগান।
অকস্মাৎ ঘুম ভেঙ্গে প্রত্যুষের বিছানায় দেখি—
নীলপদ্ম রেখে গেছে প্রতিহারী আস্ফালন মায়াবী প্রহার,
করুণ ফোয়ারা বেয়ে ঝরে পড়ে  আশ্চর্য প্রসার,
অকস্মাৎ ত্রুটিহীন পরিচর্যা দাবি করে আমাদের প্রসূত সন্তান—
প্রত্যেকের ঘরে ঘরে তন্ন তন্ন করে খুঁজে দেখি।


একটি বহুরৈখিক টেক্সট

তাহলে দূর্গাপুর থেকে আজই ফিরলেন ঐ রজতশুভ্র
আমি তো মিনিং ব্যাপারটার একেবারে দোরগোড়ায় পৌঁছে গেছি
একটা বিশ্ব ব্যাকরণের যোগান অর্থবোধকতা খুঁজছে বানান
দূর্গাপুরে কি পাত্রী দেখলেন নাকি কবিদের সঙ্গে
রথীনের বউ বেশ ছোট সাইজের ভূত আর চোরের ভয়
যেভাবে চিনির শিশি খুঁজে বের করে এক রতি পিঁপড়ে
বুঝে ফেলাকে যে জন্যে বলা হয়েছিল অবগতি
এবার প্লেটোর গুহার বিপরীত দিকে
ঐ রসুলপুর সেই ব্রাশ ফেলে যাওয়ার স্মৃতি মেলোডি
ঘটনা স্থির দর্শক গতিময় ঘটনা খুঁজছে দর্শক
কপালে একটা ছোট্ট কাটা দাগ আর সব ভালো মেয়েটার কি হলো
বৈদ্যবাটির হাইটটা কম তবে হাতে রেখেছেন তো
ছেলে কি বলছে কোয়ান্টাম নিয়ে ভাবছে কেরিয়ারিস্ট
প্রেম করার সময় নেই
সেই যে মাছ ধরা ট্রলারের ডেরিকে দাঁড়িয়ে দেখেছিলেন অচেনা পাখির ঝাঁক
সম্ভাব্য সফলতার নিশ্চয়তার চিরকুট
রজতশুভ্র নতুন কিছু লিখছে নাকি এখনও সেই রসুলপুর
ধরুন আনন্দ কত রকমের এক গোলে জেতার আনন্দ
লোডশেডিঙে আচমকা ফিরে আসা আলো
পুরোনো প্রেমিকার সঙ্গে হঠাৎ উল্টোদিকের বাসের জানলায়
কুড়িয়ে পাওয়া পঞ্চম জর্জের আধুলি রসুলপুর মানে
একটা কিছু ভর করলেই মুশকিল
মিনিং থামতে জানে না   না কোনো শেষকথা নেই…

 
ছাদনাতলার ক্রসকানেকশন  

দৃশ্য তিন: সময়

দেয়ালে ঘড়ি, ঘড়ি থেকে বেরিয়ে কয়েকজন ব্যস্ত পুরুষ
হনহন করে এগিয়ে গেল, বের হলো আড়মোড়া ভাঙা
নারীভঙ্গি,— হনহনে লোকগুলোর একজন নারীকে
দেখছে, নারীশরীর প্লটজমিতে পালটে যায়— অন্যজন
মাথা হেঁট করে কুকুরে যেভাবে মাংস শোঁকে, জমি
দেখছে খুঁটিয়ে— নারী এবার দেখছে গাছের ডালে
বসা ফিঙে, লোকটাকে ইশারায় দেখায়
ঐ জমিটা যেখানে পাখি বসে! পাখি ডাল
ছেড়ে সকলের জমির উপর দিয়ে উড়ে যায়—
পাখির পেছনে ছুটতে থাকে হনহনে পুরুষের ভিড়—
 —সবাই ঘড়িতে ঢুকছে— ঘড়ি স্বয়ং পাখি হয়ে ফুড়ুৎ—
নারীর আড়মোড়া, পুরুষের হনহনে হাঁটার ভঙ্গি, ঘড়ির
সেকেন্ডের কাঁটা, উড়োপাখির ডানা,— ডানা থেকে
ঝরে পড়ছে প্রসাধনসামগ্রী টুকিটাকি গ্যাজেট আসবাব—
জড়ো হচ্ছে রদ্দি বাতিল কাবাড়ির আস্তানায়— কবি হুমড়ি
খেয়ে বেছে নিচ্ছেন উপমা প্রতীক লোগো—  
Tags:
নীড়বাসনা শ্রাবণ ১৪২৩