মুচলেকা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
মুচলেকা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শনিবার

উত্তম দাশ : মলয় রায়চৌধুরী ও হাংরি আন্দোলন


         প্রচণ্ড অবিশ্বাস, ঘৃণা ও প্রত্যাখ্যান এই ত্রিবিধ নৈরাজ্যে ষাট দশকের শুরুতে আত্মার একটা ছটফটানি মলয় রায়চৌধুরী যখন সবে টের পাচ্ছেন তখন তিনি পাটনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির ছাত্র । জীবনের মুখোমুখি দাঁড়াবার বয়েস । নিজেকে চিনে নেবার, অস্তিত্বের স্বরূপ আবিষ্কারের সময় । ততদিনে চিনে নেবার অবকাশ হয়েছে স্বদেশকে, সমাজ তার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কাঠামো খুলে ধরেছে সামনে । স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে চোদ্দ বছর আগে । দেশবিভাগ, শেকড়হীন মানুষের বিলিব্যবস্হা, দেশপপেম ততদিনে মুনাফা তুলছে । পরিবারের গঠন পালটাচ্ছে ; শহর গ্রাম ব্যবধান বাড়ছে, নীতিবোধ ভাঙছে, বিশ্বাসের তলানি এ পপজন্ম চেখে দেখার ফুরসৎ পায়নি । বাংলা কবিতায় রবীন্দ্রবিরোধ রাজনৈতিক মুনাফার জন্য মাত্র প্রয়োজন, ত্রিশ-চল্লিশের কবিতা গতানুগতিক হচ্ছে নির্জীব কবিদের হাতে । পঞ্চাশ সবে জাগছে । নিজস্ব ভূমি আবিষ্কার হয়নি ।
        বিদেশি সাহিত্যের সঙ্গে মলয়ের পরিচয় তখনও নিবিড় নয় । এই সময়ে হঠাৎ ইংরেজ কবি চসারের In the sowre hungry tyme পঙক্তিটি গিরে ধরল তাঁকে । একান থেকে তুলে নিলেন হাংরি শব্দটি । অসওয়াল্ড স্পেংলারের সাংস্কৃতিক অবক্ষয় বিষয়ক কনসেপ্টে খুঁজে পেলেন হাংরি শব্দের দার্শনিক ভিত্তি । এই সময়ের প্রতিক্রিয়া দাদার বন্ধু শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে জানালেন তিনি । শক্তিও তখন পাটনায় । উৎসাহ দিলেন । [ মলয় ইংরেজিতে কবিতার একটি ইশতাহার প্রকাশ করলেন ১৯৬১ সালের নভেম্বরে Hungry Generation নামে ; সেই ইশতাহার ১৯৬২ সালে আরও দুবার পরিমার্জিত আকারে প্রকাশিত হয়েছিল । বাংলা ইশতাহার প্রকাশিত হয়েছিল ইংরেজি ইশতাহারের পরে । ] ১৯৬২ সালের এপ্রিলে বাংলা ইশতাহারটি প্রকাশ করলেন মলয় ‘হাংগরি জেনারেশন’ । স্রষ্টা : মলয় রায়চৌধুরী, ; নেতৃত্ব : শক্তি চট্টোপাধ্যায় ; সম্পাদনা : দেবী রায় । ততদিনে অবশ্য দলবল বেড়েছে । কিন্তু হাংরি জেনারেশনের প্রথম বাংলা বুলেটিনটি গুরুত্বপূর্ণ । পরবর্তী সময়ে যাঁরা হাংরি আন্দোলনের সরিক হয়েছিলেন, ধরে নিতে হবে এই বুলেটিনের বয়ানে তাঁদের সায় ছিল । অন্তত তাঁরা মেনে নিয়েছিলেন এই আন্দোলনকে । মলয়ের লেখা বুলেটিনের সঙ্গে মৌল কোনো বিরোধ তাঁদের আদর্শগত কারণে ছিল না ; থাকলে একদল তরুণ নিশ্চয় এভাবে সংগঠিত হতে পারতেন না । আমি ভুলি না যে একটা আন্দোলন যৌথ চিন্তার ফসল । পরবর্তীকালে হাংরি আন্দোলনে এই যৌথ চিন্তার রূপ দেখবো । কিন্তু প্রাথমিক স্তরে একজন তাত্বিকের আনুগত্ব মেনে নেওয়াই সঙ্গত । তাত্বিক মলয় প্রথম বুলেটিনে লিখেছেন :-

         “কবিতা এখন জীবনের বৈপরীত্যে আত্মস্হ । সে আর জীবনের সামঞ্জস্যকারক নয়, অতিপ্রজ অন্ধ বল্মীক নয়, নিরলস যুক্তিগ্রন্হন নয় । এখন, এই সময়ে, অনিবার্য গভীরতার সন্তৃস্তদৃক ক্ষুধায় মানবিক প্রয়োজন এমনভাবে আবির্ভূত যে, জীবনের কোনো অর্থ বের করার প্রয়োজন শেষ । এখন প্রয়োজন অনর্থ বের করা, প্রয়োজন মেরু বিপর্যয়, প্রয়োজন নৈরাত্মসিদ্ধি । প্রাগুক্ত ক্ষুধা কেবল পৃথিবীবিরোধিতার নয়, তা মানবিক, দৈহিক এবং শারীরিক । এ ক্ষুধার একমাত্র লালনকর্তা কবিতা, কারণ কবিতা ব্যতীত আর কী আছে জীবনে ! মানুষ, ঈশ্বর, গণতন্ত্র এবং বিজ্ঞান পরাজিত হয়ে গেছে । কবিতা এখন একমাত্র আশ্রয় ।
         কবিতা থাকা সত্বেও, অসহ্য মানবজীবনের সমস্ত প্রকার অসম্বদ্ধতা । অন্তরজগতের নিষ্কুন্ঠ বিদ্রোহে, অন্তরাত্মার নিদারুণ বিরক্তিতে, রক্তের প্রতিটি বিন্দুতে রচিত হয় কবিতা --- উঃ, তবু মানবজীবন কেন এমন নিষ্প্রভ ! হয়তো, কবিতা এবং জীবনকে ভিন্নভাবে দেখতে যারা অভ্যস্ত, তাদের অপ্রয়োজনীয় অস্তিত্ব এই সংকটের নিয়ন্ত্রক ।
         কবিতা বলে যাকে আমরা মনে করি, জীবনের থেকে মোহমুক্তির প্রতি ভয়ংকর আকর্ষণের ফলাফল তা কেবল নয় । ফর্মের খাঁচায় বিশ্বপ্রকৃতির ফাঁদ পেতে রাখাকে আর কবিতা বলা হয় না । এমন কি, প্রত্যাখ্যাত পৃথিবী থেকে পরিত্রাণের পথরূপেও কবিতার ব্যবহার এখন হাস্যকর । ইচ্ছে করে, সচেতনতায়, সম্পূর্ণরূপে আরণ্যকতার বর্বরতার মধ্যে মুক্ত কাব্যিক প্রজ্ঞার নিষ্ঠুরতার দাবির কাছে আত্মসমর্পণই কবিতা । সমস্ত প্রকার নিষিদ্ধতার মধ্যে তাই পাওয়া যাবে অন্তর্জগতের গুপ্তধন । কেবল, কেবল কবিতা থাকবে আত্মায় ।
         ছন্দে গদ্য লেখার খেলাকে কবিতা নাম দিয়ে চালাবার খেলা এবার শেষ হওয়া প্রয়োজন । টেবলল্যাম্প ও সিগারেট জ্বালিয়ে, সেরিব্রাল কর্টেক্সে কলম ডুবিয়ে কবিতা বানাবার কাল শেষ হয়ে গেছে । এখন কবিতা রচিত হয় অর্গাজমের মতো স্বতঃস্ফূর্তিতে । যেহেতু ত্রশ্নু বলাৎকারের পরমুহূর্তে কিংবা বিষ খেয়ে অথবা জলে ডুবে ‘সচতনভাবে বিহ্বল’ হলেই এখন কবিতা লেখা সম্ভব । শিল্পের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা কবিতা সৃষ্টির প্রথম শর্ত । শখ করে, ভেবে ভেবে, ছন্দে গদ্য লেখা হয়তো সম্ভব, কিন্তু কবিতা রচনা তেমন করে কোনো দিনই সম্ভব নয়। অর্থবঞ্জনাঘন হোক অথবা ধ্বনিপারম্পর্যে শ্রুতিমধুর, বিক্ষুব্ধ প্রবল চঞ্চল অন্তরাত্মার ও বহিরাত্মার ক্ষুধা নিবৃত্তির শক্তি না থাকলে, কবিতা সতীত মতো চরিত্রহীনা, প্রিয়তমার মতো যোনিহীনা, ঈশ্বরীর মতো অনুন্মেষিনী হয়ে যেতে পারে ।”

         হাংরি জেনারেশনের বিরুদ্ধে প্রচলিত যে অভিযোগ যৌনতা এবং জান্তব ক্ষুধা ও জৈবতার, তার ইঙ্গিতমাত্র নেই মলয়ের ইশতাহারে । যদিও জীবনের সামগ্রিক ক্ষুধাকে তিনি বলেছেন -- ‘মানসিক, দৈহিক এবং শারীরিক।’ তবু তাঁর বিশ্লেষণ যেখানে এসে থেমেছে সেখানে এ ক্ষুধা আত্মিক । অন্তরাত্মা ও বহিরাত্মার ক্ষুধা নিবৃত্তির সামর্থ্যে কবিতা আসলে বস্তুগত জীবন ও আত্মিক জীবনের মেলবন্ধন । কবিতা যেখানে জীবনের একমাত্র আশ্রয় সেখানে কবিতা ও জীবন একার্থক অথচ জীবনের সংকট কবিতা ও জীবনকে ভিন্নভাবে দেখা। কবিতা-বানিয়েদের মলয় দেখেছেন ক্ষমাহীন, কবিতা তাঁর কাছে অরগ্যাজমের মতো স্বতঃস্ফূর্ত, সুতরাং ‘সচেতনভাবে বিহ্বল’ হলেই কবিতা সৃষ্টি সম্ভব । অরগ্যাজম বলতে যে জৈববৃত্তি বোঝায় তা কখনই উদ্দীপনাহীন ও স্বতঃস্ফূর্ত নয় । বৈজ্ঞানিক সত্যে উপমাটি ব্যর্থ । এখানে আমাদের মেনে নিতে হবে কবিতার স্বতঃস্ফূর্তি মলয়ের ধারণামতো । অনেকটা রোমান্টিক কবিদের স্পন্টেনিয়াস ওভারফ্লো অফ পাওয়ারফুল ফিলিংস, অবশ্যই রোমান্টিকদের মতো আবেগে আত্মসমর্পণ নয়, কল্পজগৎ তৈরি নয়, সচেতন বিহ্বল অবস্হাই মলয়ের ধারণায় কবিতা সৃষ্টির শর্ত, ‘অন্তরাত্মার ও বহিরাত্মার ক্ষুধা নিবৃত্তির শক্তি’ না থাকলে তাকে মলয় কবিতা বলতে রাজি হননি । নিঃসন্দেহে অভিনব । বশেষত বহিরাত্মার ক্ষুধা নিবৃত্তি । কিন্তু এই অভিনব মতবাদ থেকেই হাংরি আন্দোলন শুরু ।

         এতদিনে হাংরি-সংগঠন শক্তি সঞ্চয় করেছে, একে-একে জড়ো হয়েছেন সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, উৎপলকুমার বসু, সমীর রায়চৌধুরী, সুবো আচার্য, শৈলেশ্বর ঘোষ, সুভাষ ঘোষ, দেবী রায়, প্রদীপ চৌধুরী, সুবিমল বসাক,বাসুদেব দাশগুপ্ত, রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়, ফালগুনী রায়, অরণি বসু, শম্ভু রক্ষিত, ত্রিদিব মিত্র, তপন দাস, মিহির পাল প্রমুখ । তালিকায় প্রথম তিনজন পঞ্চাশের, বাকিরা সময়ের দিক থেকে ষাট দশকের অর্থাৎ শক্তিকে নিয়ে হাংরি গোষ্ঠীভূক্ত হয়েছেন পঞ্চাশের চারজন কবি । কিন্তু প্রশ্ন, পঞ্চাশের এই চার কবির ষাটের অনুজ কবিদের সঙ্গে নতুন আন্দোলনে শরিক হবার প্রয়োজন হল কেন ? এই সময়ে শরৎকুমার মুখোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় ‘কৃত্তিবাস’ বেরিয়েছে । সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তখন আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়র্কশপ প্রোগ্রামে আমেরিকায় । ‘কৃত্তিবাস’-এর পপকাশনা নিয়ে চিন্তিত অথচ শরৎ-এর ওপরে আস্হা রেকেই তাঁকে চলতে হচ্ছে । ‘স্বপ্ন সংকলন’-এর পরিকল্পনা তাঁর মাথায় । অথচ গুছিয়ে উঠছে না কিছুই । লেখক নির্বাচনে দ্বিধাদ্বন্দ্ব চলছে বন্ধুদের সঙ্গে । শরৎ-এর সম্পাদিত ‘কৃত্তিবাস’ পেয়ে সুনীল আমেরিকা থেকে যে চিঠি সমীরকে লিখেছিলেন তাতে ‘কৃত্তিবাস’ গোষ্ঠীতে যে ভাঙন ধরেছে তারই ইঙ্গিত । এই সময়ে আরো একটি ঘটনা -- তন্ময় দত্তের কবিতার খাতা চুরি । সুনীল বলেছেন, জীবনানন্দের পর সবচেয়ে সক্তিমান কবি তন্ময় । অভিমানে তিনি কবিতা লেখা ছেড়ে দেন । 

         বন্ধুদের মধ্যে এমনি নানা অসন্তোষ এবং ‘কৃত্তিবাস’-এর সম্ভাবনায় সন্দিহান হয়ে নতুন কিছু করার প্রবণতায় মলয়ের দাদা সমীরকে কেন্দ্র করে সন্দীপন উৎপল যোগ দিলেন হাংরি আন্দোলনে । শক্তি আগেই যুক্ত । তুলনায় প্রতিষ্ঠিত এই চার লেখকের সমর্থন পেয়ে হাংরি আন্দোলনে জোর এলো । আগেই বলেছি ইতিমধ্যে অনেক তরুণ সংঘবদ্ধ এই আন্দোলন ঘিরে । নানা চিন্তার ছাপ আসছে । আন্দোলন সম্পর্কে নানাজন নিজের মতো ফতোয়া দিচ্ছেন । মলয়ের চিন্তায় যে নির্দিষ্টতা ছিল,নানা চিন্তার চাপে ছড়িয়ে পড়ায় আন্দোলনকে স্পষ্ট রূপরেখায় বেঁধে দিতে হাংরি আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য নির্ণায়ক নিয়মবিধির একটি ইশতাহার রচিত হলো । লিখলেন মলয় :-
  1. The merciless exposure of the self in its entirety .
  2. To present in all nakedness all aspects of the self and thing before it.
  3. To  catch a glimpse of the exploded self at a particular moment.
  4. To challenge every value with a view to accepting or rejecting the same.
  5. To consider everything at the start to be nothing but a ‘thing’ with a view to testing whether it is living or lifeless.
  6. Not to take reality as it is but to examine it in all its aspects.
  7. To seek to find out a mode of communication, by abolishing the accepted modes of Prose and Poetry which would instantly establish a communication between the poet and his reader.
  8. To use the same words in poetry as are used in ordinary conversation.
  9. To reveal the sound of the word, used in ordinary conversation, more sharply in the poem.
  10. To break loose the traditional association of words and to coin unconventional and here-to-fore unaccepted combination of words.
  11. To reject traditional forms of poetry and allow poetry to take its original forms.
  12. To admit without qualification that poetry is the ultimate religion of man.
  13. To transmit dynamically the message of the restless existence and the sense of disgust in a razor sharp language.
  14. Personal ultimatum.

         এই চৌদ্দটি সূত্রের মূল লুকিয়ে আছে কি লিখব আর কি ভাবে লিখব এই তত্বের ওপর । সম্পূর্ণ অহং-এর ক্ষমাহীন প্রকাশ, বিশেষ মুহূর্তে বিস্ফারিত আত্মার আভাস সম্পূর্ণ নিজস্ব শব্দবন্ধে ও প্রকাশ রীতিতে । ঐতিহ্য অস্বীকার, পপচলিত রীতি প্রত্যাহার, এবং তার প্রকাশ প্রাত্যহিক ভাষায়, কিন্তু কামড় বসাবে তীক্ষ্ণ । অস্হির অস্তিত্বের যন্ত্রণা ও চরম বিতৃষ্ণা লোক-প্রচলিত মূল্যবোধকে ধ্বংস করে প্রতিষ্ঠিত করবে কবিতাকে । ধর্মে কিছু পাওয়ার নেই । সমাজে প্রত্যাখ্যাত, রাজনীতি বন্ধ্যা --- একমাত্র আশ্রয় কবিতা । সমস্ত ভাঙচুরের মধ্যে দাঁড়িয়ে জীবনের অর্থকে ফলবানের চিন্তা নিঃসন্দেহে শিল্পীর ।

         ঐতিহ্যগত মূল্যবোধকে অস্বীকার, প্রচলিত ধারার বিপক্ষে দাঁড়িয়ে কবিতার নতুন চেহারা আবিষ্কার প্রকৃতই সাহসী ও মৌলিক । নতুন কবিতার জন্য নতুন সূত্র অনুস্ধানও স্বাভাবিক । কিন্তু তত্ব নির্ভর করে কিংবা ইশতাহার মেনে কবিতা লেখা, দলবদ্ধভাবে সম্ভব কিনা সে প্রশ্ন জাগতে পারে । ইশতেহারের সূত্রগুলো দলবদ্ধ সকলের ভেতর থেকে উঠে আসা কিনা সে প্রশ্নও উঠতে পারে । যদি ধরে নেওয়া যায় ইশতাহারের সূত্র ধরেই হাংরি আন্দোলনের সংঘবদ্ধতা তা হলে মেনে নিতে হয় এ আন্দোলনের জোর ছিল । জোর যে ছিল তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ প্রতিরোধ শুরু হয়ে গেল দ্রুত । তবে সে সংবাদ সমর্থনের নয়, বিরুদ্ধতার । লেখালিখির জন্য যতটা, তার চেয়ে অনেক বেশি এঁদের জীবনযাত্রা এবং শিল্প-অসম্পর্কিত ক্রিয়াকলাপ একটা টেনশনের আবহাওয়া তৈরি করল । 

         এ সবই হয়তো জীবনের প্রতি, সমাজের প্রতি ঘৃণা ও বিতৃষ্ণা থেকে উপজাত । চূড়ান্ত প্রত্যাখ্যান উভয়তই, ফলে এই বিকার । নাকি শুধু স্টান্ট ! শুধু স্টান্ট হলে মূল আন্দোলনই অর্থহীন । মনে হয় না শুধু স্টান্টের পেছনে এতগুলি তাজা ছেলে জুটেছিল । নিজেদের ধ্বংসের পথই কি নির্মাণ করেছিল হাংরি ছেলেরা ? এবং একই সঙ্গে এঁদের ধ্বংসের চক্রান্ত গড়ে উঠেছিল এদেশে, বিভিন্ন সংবাদপত্রের বিরুদ্ধবাদী সংবাদে এবং বুদ্ধিজীবীদের প্রতিক্রিয়ায় । এই সময়ে মলয়কে লেখা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের একটি চিঠি খুবই জরুরি। চিঠিতে কোনো তারিখ নেই । পোস্টের স্হান আমেরিকার আইওয়া সিটি, তারিখ ১০ জুন ১৯৬৪ । উত্তরপাড়ায় ১৯৬৪ সালের জুনের ১৬ তারিখে । মলয়, সুনীলের বন্ধু সমীরের ভাই, তাঁর স্নেহভাজন ও প্রিয়জন । কিন্তু হাংরির অসামাজিক ও শিল্পসম্পর্কহীন ক্রিয়াকলাপে ক্ষুব্ধ সুনীল তাঁর মনোভাব স্পষ্ট বলেছেন । নিশ্চিতই সুনীলের কলকাতার বন্ধুরা তাঁর ক্ষোভের ইন্ধন যুগিয়েছিলেন । কিন্তু সুনীল এ-চিঠিতে মলয়ের কবিতাকেই সরাসরি অগ্রাহ্য করেছেন । যদিও কিছুদিন আগে সমীরকে লেখা চিঠিতে ‘কৃত্তিবাস’ থেকেই মলয়ের বই প্রকাশের অভীপ্সার কথা আমরা জানি । সুনীল লিখেছিলেন : ‘মলয়ের বই তো ওকে কৃত্তিবাস থেকেই বার করতে বলেছি, সাহিত্য প্রকাশক কোনো দরকার নেই । 

         ‘কৃত্তিবাস’ থেকে মলয়ের বই প্রকাশের ইচ্ছা কি শুধু বন্ধুকৃত্যের জন্য, বন্ধুর ভাইয়ের প্রতি স্নেহের টানই তার কারণ ? নাকি কবি হাসাবেই মলয়ের যোগ্যতা তখনও অবধি স্বীকৃত ছিল তাঁর । কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যে এই ধরণের বদল তবে কি বন্ধুদের উসকানির ফল ? সুনীলের কাছে কবিতার আন্দোলনের চেয়ে ভালো কবিতা লেখা জরুরি । এতে আপত্তির কারণ নেই । এ তাঁর নিজস্ব ধারণা । কিন্তু হাংরি আন্দোলন ভেঙে দেবার কথা বললেন কেন ? ঈর্ষা নয় । কারণ এঁদের লেখার জৌলস তিনি স্বীকার করেননি, লেখার জগতে এঁদের তিনি প্রতিদ্বন্দ্বীও মনে করেননি । তবে কি হাংরির লেখকরা তাঁকে নানাভাবে উত্যক্ত করেছিল বলেই এই উত্তেজনা ? কিন্তু এতখানি উত্তেজনা কি সম্ভব, একেবারে হাংরি আন্দোলন ভেঙে দেবার মতো । নাকি শক্তি, সন্দীপন ও উৎপলের কৃত্তিবাসগোষ্ঠী ত্যাগ ও হাংরি আন্দোলনে যোগ কৃত্তিবাসী বন্ধুদের প্রতিশোধস্পৃহ করে তুলেছিল ? এঁদেরই কেউ কি সুনীলের উত্তেজনার কারণ সরবরাহকারী ? 

         হাংরি আন্দোলন প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে । সুনীলের চিঠিতে যা ছিল আভাস, এদেশে তা তখন নাড়া দেওয়া সংবাদ ।  ১৯৬৪-এর ১৭ জুলাই ‘যুগান্তর’ দৈনিকে সংবাদ বেরুচ্ছে ‘সাহিত্যে বিটলেমী’ এই শিরোনামে । এ সংবাদ হাংরি আন্দোলনের দিক থেকে নঙর্থক । কিন্তু অনেক সত্য এখানে লুকিয়ে আছে । প্রচলিত ধারণা, পুলিশী গ্রেফতার এবং মামলা হাংরি আন্দোলনকে রাতারাতি খ্যাতি দিয়েছে । কিন্তু এ সংবাদ হাংরি আন্দোলনের বিরুদ্ধে পুলিশী ব্যবস্হা গ্রহণের দুমাস আগের । অথচ দেখছি সংবাদেই প্রকাশিত হয়েছে হাংরি আন্দোলন ও এর লেখকরা ইতিমধ্যে বিদেশে আলোচিত । সাংবাদিক জানাননি, এদেশে ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলে এঁদের শেকড় ততদিনে অনেকদূর নেমে গেছে । হিন্দী তরুণ লেখকদের একটা অংশ প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়েছেন এই আন্দোলনে । পুলিশ এঁদের ওপর ন্জর রাখছে, রাখছিল, তার প্রমাণ পাওয়া গেল দুমাসের মধ্যেই । পুলিশ নজর রেখেছিল কেন ? কিছু তরুণ লেখকের প্রথাবিরোধী লেখার জন্য ? শাসকগোষ্ঠী এবং সবরকম কতৃত্বকে অস্বীকার ও আক্রমণ করার জন্য ? বন্ধ্যা রাজনীতি , প্রচলিত বিশ্বাস ও ঐতিহ্যের প্রতি প্রবল বিতৃষ্ণায় তীব্র ছটফটানি পুলিশি আইনে অপরাধমূলক ছিল কি ? নাকি কেউ পুলিশকে এঁদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছিলেন ? এসব কূট প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে আমাদের । ধীরে ধীরে তথ্য যাচাই করে ।

         এখন পর্যন্ত ‘দৈনিক যুগান্তর’-এর সংবাদ জানাচ্ছে এঁদের জীনযাত্রা ও লেখা বদ্ধ-বাঙালি জীবনে নাড়া দিতে শুরু করেছে । সংবাদের যোগ্য করে তুলেছেন এঁরা নিজেদের ।কী অন্তর্দৃষ্টিতে এঁরা দেখতে পেয়েছিলেন রাজনৈতিক পাণ্ডাদের । যাঁদের স্হান হবে ‘গণিকার মৃতদেহ ও গর্দভের লেজের মাঝামাঝি কোথাও’ । শুধু রাজনীতি নয়, সমস্ত ভারতবর্ষের অন্ধকার অনেক আগে থেকে আঁচ করার অপরাধ করে ফেলেছিলেন এঁরা। এবং সে শুধু সর্বস্ব পণ করে শিল্প করতে গিয়ে । দৈনিক যুগান্তরের সংবাদে  হাংরি আন্দোলনের ক্রিয়াকাণ্ডের উপরিতলের চেহারাটাই ফুটে উঠেছে, ভেতরের চেহারা কিছু পরিমাণে ধরার চেষ্টা দেখা যায় দুদিন পরের ‘আর মিছিলের শহর নয়’ শিরোনামের সম্পাদকীয়তে । প্রয়োজনীয় অংশ এরকম : ‘’বাংলাদেশে দলাদলিতে দীর্ণ বিশ্বাসহীন রাজনীতি আজ নিজের মস্তক চর্বণ করিতে ব্যস্ত । এই আবহাওয়ার জন্যই কি সমাজে এক ধরণের নিরাশাবাদ জন্ম লাভ করিতেছে, যার চেহারা ড্রেন-পাইপ মস্তানি, যার আওয়াজ রাস্তার রোমিওদের শিস, এবং সাহিত্যের ‘ক্ষুৎকাতরতার’ মধ্যে ভয়াবহভাবে প্রকাশ পাইতেছে ? কাজেই ইহা আশ্চর্য নয়, এই সব বিকৃতির উপাসকরা, যারা ‘হাংরি জেনারেশন’ নাম ধারণ করিয়াছে, তারা পরম শ্রদ্ধাহীন অবজ্ঞায় ‘গণিকার মৃতদেহ ও গর্দভের লেজের কোথাও’ রাজনীতিকদের স্‌আন নির্দেশ করিতে চাহিতেছে । কলিকাতার ক্ষুধার্ত ছেলেরা এই ধিক্কার দিতেছে এবং আত্মধিক্কারের মধ্যে বন্দী হইতেছে ; ইহা কি বন্ধ্যা রাজনীতিকদের প্রায়শ্চিত্ত অথবা অসুস্হ সমাজের অভিশাপ?”

         সম্পাদকীয় স্তম্ভের লেখক প্রশ্ন তুলেছেন, উত্তর দেননি । দিলে বলতে হতো ‘বন্ধ্যা-রাজনীতিকদের প্রায়শ্চিত্ত ও অসুস্হ সমাজের অভিশাপ’ এই ক্ষুধার্ত ছেলেদের টেনে নিয়ে এসেছে শেষ আশ্রয়স্হল কবিতায় । তবে ভিন্নরূপের কবিতা নিশ্চয়ই, আমাদের সংস্কারের বাইরের কবিতা, ইরিটেটিভ কিন্তু নিজেকে চেনার জন্য অব্যর্থ । অন্তত হাংরি লেখকদের দৃষ্টিকোণ থেকে । হাংরি আন্দোলন সংবাদে ও সম্পাদকীয়তে এনেছে যে নঙর্থক প্রতিক্রিয়া, সে প্রতিক্রিয়ার টেনশন থেকে কলকাতার পুলিশ ১৯৬৪ সালের সেপ্টেম্বরের গোড়ায় হাংরি লেখকদের বিরুদ্ধে অ্যাকশানে নামলো । এ এস আই কালীকিঙ্কর দাসের অভিযোগের ভিত্তিতে কলকাতার জোড়াবাগান থানার এস আই এস এন পাল এই দিনেই এফ আই আর করলেন ।

         একই দিনের অভিযোগ ও এফ আই আর ( সেকশান ১২০ বি এবং ২৯২ আইপিসি ) --- কলকাতা পুলিশের সুনাম খুব অর্থবহ । হাংরি জেনারেশনের অভিযুক্ত বুলেটিনে যাঁদের লেখা ছিল সবাইকে অভিযুক্ত করা হলো । অর্থাৎ ঢাকি ঢুলি সব । কালীকিঙ্কর দাস জানিয়েছিলেন ‘ক্রেডিবল ইনফরমেশান’ থেকে হাংরি জেনারেশনের প্রচারের কথা জানতে পারেন । পুলিশ শাখার ইনফরমাররা যেভাবে সমাজের বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে থাকে তাতে কলকাতা পুলিশের ইনটেলিজেন্স ব্রাঞ্চের পক্ষে হাংরি ক্রিয়াকাণ্ডের খোঁজ পাওয়া খুবই সবাভাবিক ঘটনা । কিন্তু পুলিশ হঠাৎ হাংরি জেনারেশন সম্পর্কে এত তৎপর হলো কেন ? কিন্তু কত ছিল হাংরি বুলেটিনের প্রচার সংখ্যা ? কজন পাঠক পয়সা খরচ করে ও পত্রিকা কিনত ? অর্থাৎ যে সময়ে কলকাতার বই-স্টল আলো করে পর্ণগ্রাফি বিক্রি হতো, সেসময়ে কতজন পাঠক রেস্ত খরচ করে  অশ্লীল লেখা জেনে হাংরি জেনারেশন বুলেটিন সংগ্রহ করত ? সুকুমারমতি বালক-বালিকাদের বিপথগামী হবার কতখানি সম্ভাবনা ছিল ও পত্রিকা পড়ে ? মূলত কবিতার মগজ এবং যে পপকাশভঙ্গীতে লেখা সে যুগে কবিতা পাঠকদের ক্ষেত্রেও তা ছিল প্রায় অসহনীয় । তা হলে “টু করাপ্ট দি মাইন্ড অফ দি কমন রিডার’ একথা আসছে কি করে ? সাধারণ পাঠকের সংজ্ঞা কি ? 

         তবু তর্কের খাতিরে ধরে নেওয়া যাক পুলিশ তার দৃষ্টিকোন থেকে হাংরির লেখাকে নৈতিকভাবে অশ্লীল মনে করেছে । আমার সংশয়ী মন এখানে অন্য ইন্ধন খুঁজে ফিরছে হয়তো । অভোযোগ দায়ের ও মামলা চালানোর সময়ে পুলিশের মনোভাব পরিবর্তন হয়নি ধরা যেতে পারে । কারণ যে অভিযোগ পুলিশ তুলবে তাকে তথ্য প্রমাণে আদালতে পপতিষ্ঠা করবে, এটাই স্বাভাবিক । আমি এখানে একটা চিঠির উল্লেখ রাখতে চাই।  কিছু পরবর্তীকালের । কিন্তু বর্তমান প্রসঙ্গে প্রাসঙ্গিক । ১৯৬৫ সালের ২৭ জানুয়ারি ‘ইনডিয়ান কংগ্রেস ফর কালচারাল ফ্রিডাম’-এর এগজিকিউটিভ সেক্রেটারি মিস্টার এ. বি. শাহ মলয়কে এই চিঠিতে লিখেছেন :

“I met the Deputy Commissioner of Police the other day after we met at the Office of the Radical Humanist in Calcutta. I was told that they would not have liked to bother themselves with the ‘hungry Generation’ but for the fact that a number of citizens to whom the writings of your group were made available, insisted on some action being taken.”

        তাহলে দেখা যাচ্ছে, পুলিশের দক্ষতা বা সক্রিয়তা নয়, কিছু নাগরিকের চাপাচাপিতেই পুলিশ হাংরিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্হা নিতে অগ্রসর হয় । প্রশ্ন, এই নীতিবাদী নাগরিকরা কারা ? কেন তারা হাংরিদের বিরুদ্ধে পুলিশকে সক্রিয় করলেন ? পুলিশ হাংরি জেনারেশনের এগারোজনকে অভিযুক্ত করে গ্রেপ্তার করেছিল ছয়জনকে । অথচ মামলা দায়ের করল একজনের বিরুদ্ধে । স্টেট বনাম মলয় রায়চৌধুরী । কিন্তু মলয় যে অভোযোগে অভিযুক্ত, অন্যদের তা থাকে নিষ্কৃতি পাবার কথা নয় । আসলে পেছনে আরও কিছু ঘটনা ঘটে গিয়েছে, এর মধ্যে হাংরি লেখকরা অনেকেই জবানবন্দি দিয়ে বসে আছেন পুলিশের কাছে । মধ্যবিত্ত বাঙালির নিরাপত্তাবোধ উসকে দিয়েছিল তাঁদের অস্তিত্ব । শিল্পের জন্য কারাবরণের চেয়ে হাংরি আন্দোলন থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করা অনেক জরুরি ছিল সেসময়ে । আসলে সে সময়ে হাংরির নেতৃত্ব ও সংগঠন মলয়ের হাতে । সম্পাদক প্রকাশক হিসাবে যাঁর নামই থাক, মলয়ই সবকিছুর নিয়ন্ত্রক । অবশ্যই বন্ধুরা জানতেন, কিন্তু থানা-পুলিশের ভয়ে ওঞ্চাশের লেখকদের মতই সুভাষ বা শৈলেশ্বর কেউ হাংরি জেনারেশনের কোনো দায়িত্ব নিতে চাননি । সবাই সম্পর্ক ত্যাগের কথাই বলেছেন । ব্যতিক্রম প্রদীপ চৌধুরী ।

         অ্যালেন গিন্সবার্গ আবু সয়ীদ আইয়ুবকে হাংরি লেখকদের সাহায্য করার আবেদন জানিয়ে চিঠি লিখেছিলেন, সেই আবু সয়ীদ মলয় এবং তাঁর সঙ্গীদের লেখক বলে মেনে নিতে পারেননি । এবং লেখার জন্য কেউ এদেশে পুলিশীপীড়ন ভোগ করেছে বলেও তাঁর জানা নেই বলেছেন । অ্যালেন গিন্সবার্গকে ৩১ অক্টোবর ১৯৬৪ যখন আবু সয়ীদ চিঠিতে এসব লিখেছেন, তখন কিন্তু কলকাতা পুলিশ হাংরি লেককদের বিরুদ্ধে মামলা সাজাচ্ছে । আবু সয়ীদের চিঠিটি এইরকম :-

পার্ল রোড, কলকাতা,
৩১ অক্টোবর ১৯৬৪
প্রিয় শ্রীগিন্সবার্গ
         আপনার ১৩ তারিখের উদ্দেশ্যহীন অবমাননাকর চিঠি পেয়ে আমি বিস্মিত । আপনি যে কংগ্রেস ফর কালচারাল ফ্রিডমকে কমিউনিস্টদের দ্বারা চিহ্ণিত একটি জোচ্চোর বুলশিট উদারনৈতিক আঁতেলদে কমিউনিস্টবিরোধী সিনডিকেট বলে মনে করেন, তাতে আমি অবাক হইনি ; কেননা আমি কখনও কংগ্রেস ফর কালচারাল ফ্রিডামকে আপনার লেবেল 'বুর্জোয়া' কিংবা 'শ্রদ্ধেয়' থেকে মুক্ত করার কথা ভাবিনি ।
         যদি কোনো পরিচিত ভারতীয় সাহিত্যিক বা বুদ্ধিজীবি তাদের সাহিত্যিক বা বৌদ্ধিক কাজের জন্য পুলিশের অবদমনের শিকার হতো , আমি নিশ্চিত যে ভারতীয় কংগ্রেস ফর কালচারাল ফ্রিডাম আপনার অপমানজনক ওসকানি ছাড়াই হস্তক্ষেপ করতো ।  আমি আপনাকে জানিয়ে আনন্দিত যে তেমন কোনো কিছুই সাম্প্রতিককালে এদেশে ঘটেনি । মলয় রায়চৌধুরী ও তাঁর হাংরি জেনারেশনের তরুণ বন্ধুরা, আমার জ্ঞানমতে তেমন কোনো রচনা লিখে উঠতে পারেনি, যদিও তারা আত্মপ্রচার করে লিফলেট ছাপিয়ে বিলি করেছে  এবং গণ্যমান্য লোকেদের চিঠি নোংরা ও অশ্লীল ভাষায় প্রকাশ করেছে ( আমি আশা করি আপনি স্বীকার করবেন যে 'ফাক' শব্দটি অশ্লীল এবং 'বাস্টার্ড' শব্দটি নোংরা, অন্তত এই বাক্যটিতে, "গাঙশালিক স্কুলের জারজদের ধর্ষণ করো", তারা এর চেয়েও খারাপ   ভাষায় কবিদের নাম উল্লেখ করে লিখতে ইতস্তত করেনি )। সম্প্রতি তারা একজন মহিলাকে ভাড়া করে তার উন্মুক্ত বুক দেখাবার প্রদর্শনীর আয়োজন করেছিল এবং সেই আশ্চর্যজনক আভাঁগার্দ প্রদর্শনী দেখার জন্য অনেকের সঙ্গে আমাকেও আহ্বান করেছিল । আপনি পৃথিবীর ওই পারে বসে কলকাতায় এই ধরণের বয়ঃসন্ধিকালীন ইয়ার্কিকে প্রচার করায় আপনার সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা বলে চালাতে পারেন । আশা করি আমার যা দায়িত্ব তা পালন করার জন্য আপনি আমাকে আপনার মতের সঙ্গে পার্থক্য সমর্থন করবেন ।
         পুলিশের পক্ষে নিশ্চয়ই বোকামি হয়েছে এই যুবকদের গড়া ফাঁদে পড়ে তাদের কয়েকজনকে কয়েক দিনের জন্য হেফাজতে নেয়া ( তাদের সবাইকে এখন ছেড়ে দেয়া হয়েছে ) আর তার দ্বারা তাদের প্রচারে সুবিধা করে দেয়া এবং জনসাধারণের সহানুভূতি সংগ্রহ করা -- তারা তাদের ইয়ার্কির মাধ্যমে নিজেদের প্রচারই চাইছিল ।
         আপনার মতের সঙ্গে আমার এ-ব্যাপারে মিল নেই যে ইনডিয়ান কমিটি ফর কালচারাল ফ্রিডামের প্রধান কাজ হলো মার্কিন বিটনিক কবিদের কাঁচা অনুকরণকারীদের সাহায্য করা । ইউরোপীয় সাহিত্য সম্পর্কে আপনার জ্ঞানকে আমি শ্রদ্ধা করি কিন্তু আমার ভাষার সাহিত্যকদের মূল্যায়ন করার ক্ষমতাকে আপনার নির্দেশে খর্ব করতে পারি না -- যে ভাষা সম্পর্কে আপনি নিজের অজ্ঞতা বেছে নিয়েছেন ।
         আপনার সঙ্গে গূঢ় পার্থক্য সত্ত্বেও এবং আপনার কয়েকটি অসাধারণ কবিতাকে ভালোলাগা সত্ত্বেও আপনাকে শুভেচ্ছা জানাই ।
                                                                   ভবদীয়
                                                              আবু সয়ীদ আইয়ুব

         শৈলেশ্বর ও সুভাষের জবানবন্দিতে সাহসের অভাব ছিল । যে আত্মিক অসহায়বোধ তাঁদের হাংরি আন্দোলনে প্রাণিত করেছে, গ্রেফতার ও মামলার মুখোমুখি তাই তাঁদের বৈষয়িক অসহায়বোধে দাঁড় করিয়েছে । সুযোগ খুঁজেছেন নিস্তারের । এমনকি হাংরির সঙ্গে সম্পর্ক ছেদের মুচলেকার বিনিময়েও কাঙ্খিত ছিল মুক্তি । এসব কার্যকলাপ ও মনোভাব দলের অন্য সদস্যদের মধ্যে ভুল ধারণার জন্ম দিতে পারে, বিশেষ করে মলয়ের । সামাজিক সব মূল্যবোধকে যাঁরা অবিশ্বাস করে এগিয়েছিলেন, যা কিছু প্রচলিত তাকেই সন্দেহ করা, শেষ পর্যন্ত বন্ধুত্বের ক্ষেত্রেও  এ অবিশ্বাস মাথা চাড়া দিয়েছিল । শৈলেশ্বরের জবানবন্দি পরবর্তী সময়ে মলয়ের ক্ষোভ ও ঘৃণার কারণ ।

         ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতায় অশ্লীলতার দোষারোপে আলিপুর ব্যাঙ্কশাল কোর্টের নয় নম্বর কোর্টে প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট শ্রী এ কে মিত্র মলয়ের দোশো টাকা জরিমানা অনাদায়ে এক মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দিলেন সঙ্গে অভিযুক্ত রচনাগুলোর বিনষ্টির আদেশ । কলকাতা হাইকোর্টে অবশ্য এ-মামলা টেকেনি । বেকসুর খালাস পেয়েছিলেন মলয় । কিন্তু অনেক টেনশন ও অর্থ খরচের পর । শুধু কি তাই ? বন্ধু বিচ্ছেদ ঘটে গেল হাংরি লেখকদের সঙ্গে ।
-----------------------
ঋণস্বীকার : মহাদিগন্ত

রবিবার

তামারা ইয়াসমিন - হাংরি মুভমেন্ট : কালচারাল বাস্টার্ড আর হা-ভবঘুরেদের বিপ্লব

8 Sep 2018
Tamara Yasmin
https://roar.media/bangla/main/literature/hungry-movement-an-unsung-cultural-revolution
3242 Views
ষাটের দশক। দেশভাগের পর পশ্চিম বাংলায় এক বিশৃঙ্খল অবস্থা। একদিকে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সাথে উদ্বাস্তু কলোনিতে বাড়ছে মানুষের ভিড়, অন্যদিকে স্বরাজের স্বপ্নকে গুঁড়িয়ে চলছে স্বার্থ আর নোংরা রাজনীতির নগ্ন খেলা। ঠিক এই সময় আবির্ভাব ঘটলো একদল তরুণ কবির। এক পাতার বুলেটিনে তারা জীবন, দর্শন, রাজনীতি আর যৌনতা বিষয়ে কবিতা, গদ্য, অনুগল্প আর স্কেচ ছাপালো। তারপর কফি হাউজ, পত্রিকা দপ্তর, কলেজের বাংলা বিভাগ আর লাইব্রেরি গিয়ে বিলি করতে থাকলো হ্যান্ডবিল আকারে। কলকাতার মোড়গুলোতে দাঁড়িয়ে পাঠ করলো তাদের রচনাগুলো। রচনাপাঠের জায়গাকে ঘিরে হাজারো মানুষের ভিড় জমে যায়। রবীন্দ্রনাথ আর জীবনানন্দের ভক্ত বাঙালি এমন ধারার কবিতা আগে শোনেনি। কোনো কোনো কবিতার প্রথম লাইনটাই ধাক্কা দিয়ে গেল- “তিন বিধবা গর্ভ করে শুয়ে আছি পুণ্য বিছানায়”। আবার কোনোটায় উঠে এলো বাস্তব জীবনের প্রহসন- “আমি খালি পেটে ইন্টারভ্যু দিতে গিয়ে বলে এলুম অর্থমন্ত্রীর কাকিমার নাম”। বাংলা সাহিত্যকে এই প্রথমবারের মতো বুদ্ধিজীবীদের সভা থেকে নামিয়ে আনা হলো রাস্তায়, সাধারণ মানুষের মাঝে। যে তরুণ কবিরা এই বিপ্লব ঘটালো, তারা নিজেদের দাবি করল 'হাংরি জেনারেশন' হিসেবে। আর এই ক্ষুধার্ত কবিদের নেতৃত্ব দিলেন ২১ বছরের এক তরুণ, মলয় রায়চৌধুরী; ভবিষ্যতে যিনি নিজের পরিচয় দিতে গিয়ে বলবেন ‘একজন কালচারাল বাস্টার্ড’।
Advertisement
আন্দোলনের সময় মলয় রায়চৌধুরী;
তবে শুধু কবিতা লিখেই ক্ষান্ত হননি এই ক্ষুধার্ত কবির দল। ১৯৬৩ সালের কথা। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী, এমএলএ, সচিব, লেখক এবং সাংবাদিকরা পেতে থাকলেন বিভিন্ন ধরনের মুখোশ। কোনোটা জন্তু-জানোয়ারের, কোনোটা দানবের। জোকার, মিকি মাউস, দেবতা- কোনো ধরনের মুখোশই বাদ গেল না। প্রতিটি মুখোশের সাথে লেখা থাকে, “দয়া করে মুখোশটা খুলে ফেলুন”। অন্যদিকে কবি সাহিত্যিকদের পাঠানো হলো বিয়ের কার্ড। তাতে লেখা "Fuck the Bastards of Gungshalik School of Poetry"। মূলধারার বাণিজ্যিক পত্রিকাগুলোতে ছোটগল্পের নামে আসতে লাগল সাদা কাগজ, আর বুক রিভিউয়ের জন্য পাঠানো হতো জুতোর বাক্স। প্রথাগত সাহিত্য আর সংস্কারের বিরুদ্ধে ক্রমে আরও জোরদার হলো 'হাংরি মুভমেন্ট'। কখনো তারা একটি বইয়ের দাম ধরলেন এক লক্ষ টাকা বা কয়েকটি টি বি সিল, আবার কখনো চিত্রপ্রদর্শনীর আয়োজন করে শেষদিন পুড়িয়ে ফেললেন সমস্ত চিত্রকর্ম। কিন্তু প্রশাসনকে খেপিয়ে হাংরিয়ালিস্টদের এই আন্দোলন বেশিদিন চলতে পারল না। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ছয় কবির হাতে হাতকড়া পরানো হলো অশ্লীল রচনা আর রাষ্ট্রদ্রোহিতার দায়ে। কিন্তু, সাহিত্য কি কখনো অশ্লীল হয়? নাকি এর পুরোটাই ছিল প্রতিষ্ঠিত সমাজের মুখোশধারী ভীত সুশীল শ্রেণীর ষড়যন্ত্র?
হাংরি মুভমেন্টের কথা উঠে এসেছে চলচ্চিত্রেও। সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের 'বাইশে শ্রাবণ' চলচ্চিত্রের নিবারণ চক্রবর্তীর কথা মনে আছে নিশ্চয়ই? নিবারণরূপী গৌতম ঘোষকে সৃজিত হাজির করেছিলেন একজন হাংরিয়ালিস্ট কবির চরিত্রে। উদ্ধত, অহংকারী আর খ্যাপাটে নিবারণ সিস্টেম নিয়ে বললেন- "একটা পঁচে যাওয়া সিস্টেম, প্রত্যেকটা মানুষ পঁচে যাওয়া। কয়েকটা লাশ ঘুরে বেড়াচ্ছে।” এই সিস্টেমের সাথে হাংরি প্রজন্মের দ্বন্দ্ব ছিল প্রকাশ্য। হাংরিয়ালিস্ট কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্ল সেনকে উদ্দেশ্য করে লিখেছিলেন,
"কবিতা ভাতের মতো কেন লোকে নিতেই পারছে না
যুদ্ধ বন্ধ হলে নেবে? ভিখারিও কবিতা বুঝেছে
তুমি কেন বুঝবে না হে অধ্যাপক মুখ্যমন্ত্রী সেন?"
https://assets.roar.media/assets/GqqnkqBIEQg5T0G9_16602232_1368676819869867_6703701947626399845_o.jpg
হাংরি আন্দোলনের ইশতেহার; Source: revolvy.com
হাংরি আন্দোলনকারীরা তাদের মুভমেন্টকে 'কালচারাল কাউন্টার' বলতেন। পশ্চিমা বিশ্বে তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী একটি প্রজন্ম, কালচারাল কাউন্টার ঘটিয়ে নতুনধারার এক সমাজের বীজ বুনে ফেলেছে। আমেরিকার 'বিট জেনারেশন' আর ব্রিটেনের 'অ্যাংরি ইয়াংম্যান' গোষ্ঠির লেখকেরা মূলধারার সাহিত্য-সংস্কৃতিতে আঘাত হেনে বিশ্বে জনপ্রিয়। অনেকে এজন্য হাংরি জেনারেশনকে বিট জেনারেশনের সাথে তুলনা করলেন। বিট জেনারেশনের অনুপ্রেরণাতে হোক বা যেভাবেই হোক না কেন, ১৯৬১ সালে পাটনা থেকে রীতিমতো ইশতেহার ছাপিয়ে আন্দোলন শুরু করলেন মলয় রায়চৌধুরী। বিদ্রোহ ঘোষণা করলেন প্রচলিত ধারার সাহিত্য আর সমাজ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে। কবিতার ইশতেহারে তিনি লিখলেন, “শিল্পের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা কবিতা সৃষ্টির প্রথম শর্ত”। লিখলেন, “এখন কবিতা রচিত হয় অরগ্যাজমের মতো স্বতঃস্ফূর্তিতে”। রাজনৈতিক ইশতেহারে বললেন,“রাজনৈতিক বিশ্বাসের চেহারা পালটে দেওয়া হবে”। এই হাংরিয়ালিস্টদের ইশতেহারে লিড দিলেন উল্টোডাঙা বস্তির বাসিন্দা কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়, আর প্রকাশক ও সম্পাদক হাওড়া বস্তিবাসী দেবী রায়। মলয়ের বড় দাদা সমীর রায়চৌধুরী প্রথম জীবনে কৃত্তিবাসের সাথে যুক্ত থাকলেও এই আন্দোলনে সম্পৃক্ত হন। হাংরি বুলেটিন ছাপানোর অধিকাংশ খরচ সমীরই দিতেন। ১৯৬২-৬৩ সালে হাংরি আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত হন বিনয় মজুমদার, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, উৎপলকুমার বসু, সুবিমল বসাক, ত্রিদিব মিত্র, ফালগুনী রায়, আলো মিত্র, অনিল করঞ্জাই, রবীন্দ্র গুহ, সুভাষ ঘোষ, করুণাবিধান মুখোপাধ্যায়, বাসুদেব দাশগুপ্ত, শৈলেশ্বর ঘোষ, হরনাথ ঘোষ, নীহার গুহ, প্রদীপ চৌধুরী, সুবো আচার্য, অরুপরতন বসু, সতীন্দ্র ভৌমিক, অজিতকুমার ভৌমিক, অশোক চট্টোপাধ্যায়, অমৃততনয় গুপ্ত, ভানু চট্টোপাধ্যায়, শংকর সেন, যোগেশ পাণ্ডা, তপন দাশ, মনোহর দাশ, শম্ভু রক্ষিত, মিহির পাল, সুকুমার মিত্র, দেবাশিষ মুখোপাধ্যায় প্রমুখ।
হাংরি আন্দোলনের লেখকেরা। ঘড়ির কাঁটার অভিমুখে: শৈলেশ্বর ঘোষ, মলয় রায়চৌধুরী, সুভাষ ঘোষ, বাসুদেব দাশগুপ্ত, ডেভিড গার্সিয়া এবং সুবিমল বসাক;
মলয় এই আন্দোলনের ধারণা নিয়েছিলেন ইংরেজ কবি জিওফ্রে চসারের বাক্য “The Sour Hungry Time” আর জার্মান দার্শনিক অসওয়াল্ড স্পেংলারের ‘The Decline of the West’ গ্রন্থ থেকে। শৈলেশ্বর ঘোষের মতে, ‘হাংরি জেনারেশন’ শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন শক্তি চট্টোপাধ্যায়। ১৯৬২ সালে বিনয় মজুমদারের কবিতার সমালোচনা করতে গিয়ে শক্তি বলেছিলেন, বিদেশের সাহিত্যকেন্দ্রে যে ধরনের আন্দোলন চলছে, তেমন আন্দোলন এখানে হলে তা কেবলমাত্র ক্ষুধা সংক্রান্ত হতে পারে। “ওদিকে ওদেশে সামাজিক অবস্হা অ্যাফ্লুয়েন্ট, ওরা বিট বা অ্যাংরি হতে পারে। আমরা কিন্তু ক্ষুধার্ত।” শক্তির এই ক্ষুধা অবশ্য শুধু আক্ষরিক অর্থেই ক্ষুধা ছিল না। তা ছিল সাহিত্যে মনের ভাব প্রকাশের ক্ষুধা, যথার্থ শব্দ প্রয়োগের ক্ষুধা, সৃষ্টির আকাঙ্ক্ষা আর অবদমিত বাসনা পূরণের ক্ষুধা। 

হাংরিয়ালিস্টদের এই ক্ষুধার্ত কার্যক্রম বুঝতে হলে তাদের সামাজিক অবস্থাটা বুঝতে হবে। এই হাংরি জেনারেশনের কবিরা শৈশব এবং কৈশোরে দেশভাগ দেখেছে। এদের একটি বড় অংশ বেড়ে উঠেছিল পূর্ব বাংলা থেকে আগত উদ্বাস্তু পরিবারে। তাদের আর্থ-সামাজিক নিরাপত্তা ছিল না। যারা পশ্চিমবঙ্গের ছিলেন, তাদেরও অনেকে বেড়ে উঠেছিলেন মানবেতর পরিবেশে। এই লেখকেরা জীবনকে যেভাবে দেখেছেন, সেভাবেই কবিতায় ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছেন। কবিদের মধ্যে হাংরিরা কেবল মাইকেল মধুসূদন আর জীবনানন্দকে শ্রদ্ধা করতেন। মলয় অবশ্য ভালোবাসতেন রবীন্দ্রনাথের গান। সেই সময় পশ্চিম বাংলায় বামপন্থীরা সক্রিয়। কিন্তু এই হাংরি জেনারেশনকে আকৃষ্ট করতে পারলেন না তারা। এই তরুণেরা মার্কসকেও নাকচ করে দিয়েছিলেন। মার্কসবাদের সীমাবদ্ধতাগুলো সোভিয়েত ভাঙার ২৫ বছর পূর্বেই অনুধাবন করেছিলেন এই বিপ্লবীরা। এবার তারা কবিতা, স্কেচ আর পোস্টারে তুলে আনলেন সমাজকে। ‘জখম’ কবিতায় মলয় লিখলেন-
“মানুষের দেয়া আইনানুগ মৃত্যুদণ্ড পেয়ে কেবল মানুষই মরে যাচ্ছে
ফ্যাক্ট্রি আর বিবাহ দুটোরই রেজিস্ট্রি হয়ে চোলেছে নিয়মমাফিক
কোল্কাতায় মদের ব্যবসা থেকে নৈতিক মাইনে পাচ্ছে ৪৫০০০ ডান হাত
১ একরে ১৩৫ জোড়া পায়ের ঠেসাঠেসি আরাম খাচ্ছে ১৯৬৫ মডেলের কোল্কাতা”

হাংরি ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে অনিল করঞ্জাইয়ের স্কেচ;
হাংরি মুভমেন্ট দ্রুতই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। দেশীয় পত্রিকাগুলো আন্দোলনকারীদের নিয়ে মুখরোচক সব সংবাদ লিখে চলল। তাদের প্রতিষ্ঠানবিরোধী কর্মকাণ্ড পত্রিকায় নিয়মিত ছাপতে থাকলো। শিরোনামে লিখলো: “হা-ঘরে সম্প্রদায়”, “কাব্যচর্চার নামে বিকৃত যৌনলালসা”, “সাহিত্যে বিটলেমি কী এবং কেন?”, "Erotic Lives & Loves of Hungry Generation"। কলকাতা, বেনারস আর নেপাল গিয়ে হিপীনীদের সাথে তাদের অবাধ যৌনচর্চার বর্ণনা ছাপালো কিছু সংবাদপত্র। হাংরিয়ানদের বিরুদ্ধে নানারকম অপপ্রচারও শুরু হল। বলা হলো, তারা বিটনিকদের মতো মাদকাসক্ত। প্রকৃতপক্ষে, হাংরিয়ালিস্টরা সৃজনশীলতা বৃদ্ধির আশায় মাদক নিতেন না। ব্যক্তিবিশেষে মদ্যপান বা নেশাদ্রব্যের অভ্যাস থাকলেও তা আন্দোলনের সাথে সামগ্রিকভাবে জড়িত ছিল না। হাংরি কবিদের বিকৃত যৌনতার ধারক বলেও চালানোর চেষ্টা হলো। শৈলেশ্বর ঘোষ ও সুভাষ ঘোষ মেসে এক ঘরে থাকতেন, তাই ছড়ানো হল তারা সমকামী। এভাবে সত্য-মিথ্যে মিশিয়ে গণমাধ্যমে নানাভাবে প্রচার চলতে লাগল।

কল্লোল আর কৃত্তিবাসী গোষ্ঠী যা পারেনি, হাংরিরা কিন্তু তা-ই করে দেখিয়েছিলেন। হাংরি কবিতাগুলো বাকিদের চোখের সামনেই আমেরিকার লিটল ম্যাগাজিনগুলোতে প্রকাশিত হচ্ছিলো। ১৯৬৪ সালের ১০ই জুন আমেরিকা থেকে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় মলয়কে চিঠি লিখলেন-
"কলকাতা শহরটা আমার, ফির গিয়ে আমি ওখানে রাজত্ব করব। দু'একজন বন্ধুবান্ধব ওই দলে আছে বলে নিতান্ত স্নেহবশতই তোমাদের হাংরি জেনারেশন গোড়ার দিকে ভেঙে দিইনি। এখনও সে ক্ষমতা রাখি। লেখার বদলে হাঙ্গামা ও আন্দোলন করার দিকেই তোমার লক্ষ্য বেশি। যতো খুশি আন্দোলন করো, বাংলা কবিতার এতে কিছু এসে যায় না ।"
হাংরিদের এই অভ্যুত্থানে মূলধারার বাংলা কবিতায় পরিবর্তন হয়তো তাৎক্ষণিকভাবে দেখা গেল না, কিন্তু প্রতিষ্ঠিত কবি-সাহিত্যিক আর প্রশাসনের হর্তাকর্তাদের প্রতিক্রিয়াটা ঠিকই দেখা গেল। ১৯৬৫ সালের সেপ্টেম্বরে এগারো জন হাংরি আন্দোলনকারীর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হলো। মলয় রায়চৌধুরী, মলয়ের দাদা সমীর রায়চৌধুরী, দেবী রায়, সুভাষ ঘোষ, শৈলেশ্বর ঘোষ, প্রদীপ চৌধুরী- এই ছয় কবিকে গ্রেপ্তার করলো পুলিশ। এই লেখকদের বাড়িঘর তল্লাশী করার সময় পুলিশ বহু লেখা নষ্ট করলো। পাশাপাশি বই, ফাইল, টাইপরাইটার ইত্যাদিসহ সব ধরনের কাগজপত্র উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া হলো। এগুলো আর কখনও ফেরত দেয়া হয়নি। হাতে হাতকড়া আর কোমরে দড়ি বেঁধে রাস্তা দিয়ে হাঁটিয়ে আদালতে নেওয়া হয় মলয় রায়চৌধুরীকে। জিজ্ঞাসাবাদের পর মলয় ছাড়া বাকিদের ছেড়ে দেওয়া হলো। মলয়ের 'প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার' নামের কবিতাটিকে অশ্লীল আখ্যা দিয়ে চার্জশিট গঠন করল পুলিশ। মলয় লিখেছিলেন-
“আমাকে তোমার গর্ভে আমারই শুক্র থেকে জন্ম নিতে দাও
আমার বাবা-মা অন্য হলেও কি আমি এরকম হতুম ?
সম্পূর্ণ ভিন্ন এক শুক্র থেকে মলয় ওর্ফে আমি হতে পার্তুম ?
আমার বাবার অন্য নারীর গর্ভে ঢুকেও কি মলয় হতুম ?
শুভা না থাকলে আমিও কি পেশাদার ভদ্রলোক হতুম মৃত ভায়ের মতন ?
ওঃ বলুক কেউ এসবের জবাবদিহি করুক
শুভা, ওঃ শুভা
তোমার সেলোফেন সতীচ্ছদের মধ্যে দিয়ে পৃথিবীটা দেখতে দাও আমায়”
তৎকালীন পত্রিকা এই কবিতাকে 'বেহুদা' বললেও এই একটিমাত্র কবিতাই পরবর্তীতে সমগ্র দক্ষিণ এশিয়া থেকে জায়গা করে নিয়েছিল ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশিত, ‘Modern And Postmodern Poetry of the Millenium’  সংকলনে।
যে ১১ জনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছিল, তাদের কারও কারও চাকরি চলে গেল, কারও হলো বদলি। সবার স্বাভাবিক জীবন নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। ভয়ে অনেকে আন্দোলন ছেড়ে দিলেন। এই সময় বদলে যায় চিত্র। মলয়ের সাথে যিনি ছিলেন হাংরি বুলেটিনের লিডার, সেই শক্তি চট্টোপাধ্যায় আদালতে গিয়ে সাক্ষ্য দিলেন তার বিপক্ষে। অন্যদিকে মলয়ের পক্ষে সাক্ষী দিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। ভরা আদালতে সুনীল বললেন, কবিতাটিতে কোনো অশ্লীলতা নেই। নিম্নআদালত সাজা দিলেও পরবর্তীতে উচ্চআদালতের দেওয়া রায়ে, ১৯৬৭ সালে বেকসুর খালাস পেলেন মলয় রায়চৌধুরী।

মলয় রায়চৌধুরী সম্পাদিত জেব্রা পত্রিকার প্রচ্ছদ;
হাংরি জেনারেশন তৎকালীন সমাজের প্রথাগত নীতিবোধ আর চেতনায় দারুণ আঘাত হেনেছিল।  প্রতিঘাতে তাদেরও আক্রান্ত হতে হয়েছিল। কিন্তু এরপর আর হাংরি মুভমেন্ট জ্বলে উঠতে পারেনি। হ্যান্ডবিল আকারে প্রকাশিত হাংরি বুলেটিনগুলো দ্রুত ছড়িয়ে পড়লেও সেগুলো সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়নি। বুলেটিনের বাইরে হাংরি আন্দোলনকারীরা জেব্রা, প্রতিদ্বন্দ্বী, উন্মার্গ, চিহ্ন, এষণা, ফুঃসতীন্দ্র এবং দি ওয়েস্ট পেপার নামে কয়েকটি পত্রিকাও প্রকাশ করেছিল। কলকাতার লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরি ও গবেষণাকেন্দ্র এবং ঢাকার বাংলা একাডেমি মিলে এর মাত্র কয়েকটি বুলেটিন আর পত্রিকা সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়।
‘হাংরি জেনারেশন’ যেসব সাহিত্যিকদের জন্ম দিয়েছে, তারা ব্যক্তিগত জীবনে এক অর্থে অসফল হলেও তাদের এই আন্দোলন পরবর্তীতে বাংলা সাহিত্যের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। নাগরিক জীবন ও রাষ্ট্রযন্ত্রের অসঙ্গতিকে, এত অল্প সময়ে এভাবে কলমের আঘাতে আর কোনো সাহিত্যকেন্দ্রিক আন্দোলন, জর্জরিত করতে পারেনি।

তথ্যসূত্র

১। ক্ষুধার্ত সংকলন; সম্পাদনা: শৈলেশ্বর ঘোষ; প্রকাশক: সাহিত্য অকাদেমী, নিউ দিল্লি; প্রকাশকাল: ১৯৯৫

মন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায় আয়োজিত অনুষ্ঠানে শৈলেশ্বর ঘোষ

যিনি বলেছিলেন আধুনিকতার শবদেহের ওপর উল্লাসময় নৃত্য করবেন তিনি শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানে যোগ দিয়ে হাংরি জেনারেশনের নাম কলঙ্কিত করলেন
                                                  

হাংরি জেনারেশন নিয়ে বাংলাদেশের মুক্তচিন্তা সাইটের মতামত

সময়টা ইংরেজি ১৯৬৪ সাল। সেপ্টেম্বর মাসে ইনডিয়ান পিনাল কোডের ১২০বি, ২৯২ এবং ২৯৪ ধারায় ১১ জন কবির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছিল । তাঁরা হলেন: মলয় রায়চৌধুরী,, শৈলেশ্বর ঘোষ , দেবী রায় , সুভাষ ঘোষ, প্রদীপ চৌধুরী, রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়, উৎপলকুমার বসু, সমীর রায়চৌধুরী, বাসুদেব দাশগুপ্ত, সুবো আচার্য এবং সুবিমল বসাক । এঁদের মধ্যে প্রথম ছয়জনকে গ্রেপতার করা ছয়েছিল এবং কলকাতার ব্যাংকশাল কোর্টে তোলা হয়েছিল । মলয় রায়চৌধুরীকে হাতে হাতকড়া এবং কোমরে দড়ি পরে হেঁটেছিলেন কোলকাতার রাস্তায় চোর- ডাকাতের পাশে।

কিন্তু কেন? কেন ফেরারী হয়ে যান সুবো আচার্য ও রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়? কেন বিশ্বভারতী থেকে রাসটিকিট হন প্রদীপ চৌধুরী? উৎপলকুমার বসু অধ্যাপনা থেকে বরখাস্ত হন? বেছে বেছে কেন কবিদের দেয়া হল যন্ত্রণা?
উত্তর টা আমরা পরে খুজব। তার আগে বাংলা সাহিত্যের ভাঙ্গা-গড়া নিয়ে একটু নাড়াচাড়া করে আসি। প্রথমেই বলে নিচ্ছি সাহিত্য হচ্ছে শিল্পের খুবই সরল একটি শাখা। যেমন শাখা চারুকলা কিংবা সঙ্গীত। আমরা সারা পৃথিবী জুড়ে অনেক শিল্প বিপ্লব এর কথা শুনেছি, পড়েছি। ১৭, ১৮ শতক এর Amatory Fiction বা যৌন কাল্পনিক সাহিত্য। যার উল্লেখযোগ্য লেখক হচ্ছেন Eliza Haywood, Delarivier Manley। এরপর সময়ের স্রোত বেয়ে ঘটেছে আরও অনেক। ১৭ শতকের Cavalier Poets যার উল্লেখযোগ্য লেখকদ্বয় Richard Lovelace, William Davenant। এরপর John Donne, George Herbert, Andrew Marvell প্রমুখ সাহিত্যক এর Metaphysical poets। আলেকজান্ডার পোপ, জোনাথোন সুইফট এর চিরায়ত আদর্শ, বিদ্রুপ and সংশয়বাদ কে আশ্রয় করে “দ্য অগাস্তান” আন্দোলন করলেন ১৮ শতকে। ১৯ শতকে যুক্তি, বিজ্ঞান সব ফেলে আবেগ আর কল্পনাকে আশ্রয় করে ভিক্টর হুগো, ক্যামিলো ক্যাস্তেলো “অবাধ কল্পনাপ্রবণতা”য় বেঁধে ধরলেন সাহিত্য কে। এরপর Dark romanticism, Realism আরও কত কি..!!


বাংলা সাহিত্যেও এরকম দুটি আন্দোলন হয়েছিল। যার একটি ১৯৬১-১৯৬৫ তে আর একটি ১৯৬৯ এ। ১৯৬১-১৯৬৫ এর এই আন্দোলনটি বাংলা সাহিত্যের প্রথম আন্দোলন। বাঁধ ভাঙার আওআজ তুলে, ইশতাহার প্রকাশের মাধ্যমে, বাংলা শিল্প ও সাহিত্যের যে একমাত্র আন্দোলন হয়েছে, তার নাম হাংরি মুভমেন্ট বা ক্ষুধার্ত আন্দোলন । আর্তি বা কাতরতা শব্দগুলো মতাদশর্টিকে সঠিক তুলে ধরতে পারবে না বলে, আন্দোলনকারীরা শেষমেষ এই হাংরি শব্দটি গ্রহণ করেন । উত্তর-ঔপনিবেশিক ভারতবর্ষে্র ঔপনিবেশিক সাহিত্যকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে দিয়ে নিজেদের স্বত্বার বহিঃপ্রকাশ ই ছিল এই আন্দোলন এর আপাত অভিপ্রায়। ১৯৬১ সালের নভেম্বরে পাটনা শহর থেকে একটি ইশতাহার প্রকাশের মাধ্যমে হাংরি আন্দোলনের সূত্রপাত করেছিলেন।


মলয় রায় চৌধুরী এই বিখ্যাত সাহিত্য আন্দলেনের মূল পথিকৃৎ। সেলুকাস এই কবির সাথে ছিলেন কবির দাদা সমীর রায় চৌধুরী, আন্দলনের সম্পাদনায় ও বিতরণে ছিলেন কবি দেবী রায় এবং নেতৃত্বে ছিলেন কবি শক্তি চট্রোপাধ্যায়।
১৯৬১ সাল দেশভাগের ফলে পশ্চিমবঙ্গ এই ভয়ংকর অবসানের মুখে সাহিত্য, ওদিকে আবার পচে গলে পড়ে যাচ্ছে উন্নত ভারত বর্ষের স্বপ্ন। কবি মলয় রায় নিজে বলেছিলেন, “স্বদেশী আন্দোলনের সময় জাতিয়তাবাদী নেতারা যে সুখী, সমৃদ্ধ, উন্নত ভারতবর্ষের স্বপ্ন দেখেছিলেন, তা টকে গিয়ে পচতে শুরু করেছে উত্তর ঔপনিবেশিক কালখণ্ডে ”।
তিনি ওসওয়াল্ড স্পেংলার এর লেখা "The Decline of the West" বইটির মূল বক্তব্য থেকে এই আন্দোলনের দর্শন গড়ে তুলেছিলেন | Oswald Spengler এই বইটিতে বলেছিলেন, কোনো সংস্কৃতির ইতিহাস কেবল একটি সরল রেখা বরাবর যায় না, তা একযোগে বিভিন্ন দিকে প্রসারিত হয় ; তা হল জৈবপ্রক্রিয়া, এবং সেকারণে নানা অংশের কার কোন দিকে বাঁকবদল ঘটবে তা আগাম বলা যায় না| যখন কেবল নিজের সৃজনক্ষমতার উপর নির্ভর করে তখন সংস্কৃতিটি নিজেকে বিকশিত ও সমৃদ্ধ করতে থাকে, তার নিত্যনতুন স্ফূরণ ও প্রসারণ ঘটতে থাকে | কিন্তু একটি সংস্কৃতির অবসান সেই সময় আরম্ভ হয় যখন তার নিজের সৃজনক্ষমতা ফুরিয়ে গিয়ে তা বাইরে থেকে যা পায় তাই আত্মসাৎ করতে থাকে, খেতে থাকে, তার ক্ষুধা তৃপ্তিহীন | তাঁর মনে হয়েছিল যে দেশভাগের ফলে পশ্চিমবঙ্গ ভয়ংকর অবসানের মুখে পড়েছে, এবং উনিশ শতকের মনীষীদের পর্যায়ের বাঙালীর আবির্ভাব আর সম্ভব নয় |


তাঁর মনে হয়েছিল যে কিছুটা হলেও এর বিরুদ্ধে দাঁড়ানো দরকার,আওয়াজ তোলা দরকার, আন্দোলন প্রয়োজন।
অর্থাৎ দেশভাগোত্তর বাঙালির কালখণ্ডটিকে কবিগণ হাংরিরূপে চিহ্ণিত করতে চাইলেন।হাংরি আন্দোলনকারীরা শব্দটি আহরণ করেছিলেন ইংরেজি ভাষার কবি Geoffrey Chaucer এর In Swore Hungry Time বাক্যটি থেকে।
আর সেই ভাবনা থেকেই কবি মলয় রায় তাঁর দাদা সমীর রায়, দুই বন্ধু দেবী রায় এবং শক্তি চট্টোপাধ্যায় এর সাথে ধারনাটি ব্যাখ্যা করেন এবং হাংরি আন্দোলনের প্রস্তাবনা দেন পড়ে তাদের এবং অন্যান্য তরুণ লেখক কবি শিল্পীদের নিয়ে এই আন্দোলন শুরু করেন | নভেম্বর ১৯৬১ সালে প্রথম হাংরি বুলেটিন প্রকাশিত করা হয় পাটনা থেকে এবং সেখানে বাংলা ছাপাবার প্রেস না পাওয়ায় বুলেটিনটি প্রকাশিত করা হয় ইংরেজীতে | অতি স্বল্প কালের মধ্যেই হিন্দী ও নেপালী ভাষাতেও এই আন্দোলন ছড়িয়েছিল। ১৯৬২-৬৩ সালে আন্দোলনে মিশে যান বিনয় মজুমদার, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, উৎপলকুমার বসু, সুবিমল বসাক, ত্রিদিব মিত্র, ফালগুনী রায়, আলো মিত্র, রবীন্দ্র গুহ, সুভাষ ঘোষ, প্রদীপ চৌধুরী, সুবো আচার্য, অরুপরতন বসু, বাসুদেব দাশগুপ্ত, সতীন্দ্র ভৌমিক, শৈলেশ্বর ঘোষ, হরনাথ ঘোষ, নীহার গুহ, আজিতকুমার ভৌমিক, অশোক চট্টোপাধ্যায়, অমৃততনয় গুপ্ত, ভানু চট্টোপাধ্যায়, শংকর সেন, যোগেশ পাণ্ডা, মনোহর দাশ, তপন দাশ, শম্ভু রক্ষিত, মিহির পাল, রবীন্দ্র গুহ, সুকুমার মিত্র, দেবাশিষ মুখোপাধ্যায় প্রমুখ । অনিল করঞ্জাই এবং করুণানিধান নামের দুজন চিত্রকরও ছিলেন এই আন্দোলনে ।


এই আন্দোলন কে নিয়ে স্বয়ং মলয় রায়চৌধুরীর লেখা, দিল্লী থেকে প্রকাশিত পত্রিকা "দিগঙ্গন" এর উত্সব সংখ্যা ২০০৪ এ প্রকাশিত "প্রতিসন্দর্ভের স্মৃতি" প্রবন্ধতে তিনি বলেন,
"ইউরোপের শিল্প-সাহিত্য আন্দোলনগুলো সংঘটিত হয়েছিল একরৈখিক ইতিহাসের ধারণার বনেদের ওপর; কল্লোল বা কৃত্তিবাস গোষ্ঠী যে নবায়ন এনেছিলেন সে কাজগুলো ছিল কলোনিয়াল ইসথেটিক রিয়্যালিটি বা ঔপনিবেশিক বাস্তবতার চৌহদ্দির মধ্যে, কেন না সেগুলো ছিল যুক্তিগ্রন্হনা-নির্ভর, এবং তাঁদের মনোবীজে অনুমিত ছিল যে ব্যক্তিপ্রতিস্বের চেতনা ব্যাপারটি একক, নিটোল ও সমন্বিত ।" তঁরা বললেন, "এই ভাবকল্পের প্রধান গলদ হল যে তার সন্দর্ভগুলো নিজেদেরকে পূর্বপুরুষদের তুলনায় উন্নত মনে করে, এবং স্হানিকতেকে ও অনুস্তরীয় আস্ফালনকে অবহেলা করে । ওই ভাবকল্পে যে বীজ লুকিয়ে থাকে, তা যৌথতাকে বিপন্ন আর বিমূর্ত করার মাধ্যমে যে-মননর্স্তাস তৈরি করে, তার দরুন প্রজ্ঞাকে যেহেতু কৌমনিরপেক্ষ ব্যক্তিলক্ষণ হিসাবে প্রতিষ্ঠা দেয়া হয়, সমাজের সুফল আত্মসাৎ করার প্রবণতায় ব্যক্তিদের মাঝে ইতিহাসগত স্হানাঙ্ক নির্ণয়ের হুড়োহুড়ি পড়ে যায় । গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে ব্যক্তিক তত্ত্বসৌধ নির্মাণ । ঠিক এই কারণেই, ইউরেপীয় শিল্প-সাহিত্য আন্দোলনগুলো খতিয়ে দেখলে দেখা যায় যে ব্যক্তিপ্রজ্ঞার আধিপত্যের দামামায় সমাজের কান ফেটে এমন রক্তাক্ত যে সমাজের পাত্তাই নেই কোনো । কৃত্তিবাস গোষ্ঠীর দিকে তাকালে দেখা যাবে যে পঁজিবলবান প্রাতিষ্ঠানিকতার দাপটে এবং প্রতিযোগী ব্যক্তিবাদের লালনে শতভিষা গোষ্ঠী যেন অস্তিত্বহীন । এমনকি কৃত্তিবাস গোষ্ঠিও সীমিত হয়ে গেছে মাত্র কয়েকজন মেধাসত্তবাধিকারীর নামে । পক্ষান্তরে, ঔপনিবেশিক ননগদনতন্ত্রের আগেকার প্রাকঔপনিবেশিক ডিসকোর্সের কথা ভাবা হয়, তাহলে দেখা যায় যে পদাবলী সাহিত্য নামক ম্যাক্রো পরিসরে সংকুলান ঘটেছে বৈষ্ণব ও শাক্ত কাজ, মঙ্গলকাব্য নামক পরিসরে সংকুলান ঘটেছে মনসা, চণ্ডী, শিব, কালিকা বা ধর্মঠাকুরের মাইক্রো-পরিসর । লক্ষ্মণিয় যে প্রাকৌপনিবেশিক কালখণ্ডে সন্দর্ভ গুরুত্ত্বপূর্ণ ছিল, তার রচয়িতা নয় । তার কারন সৃজনশীলতার ক্ষেত্রে ব্যাক্তি মালিকানার উদ্ভব ও বিকাশ ইউরোপীয় অধিবিদ্যাদত মননবিশ্বের ফসল।”


হাংরি আন্দোলনকারিরা প্রধানত একপৃষ্ঠার বুলেটিন প্রকাশ করতেন । এক পাতার বুলেটিনে তঁরা কবিতা, রাজনীতি, ধর্ম, অশ্লীলতা, জীবন, ছোটগল্প, নাটক, উদ্দেশ্য, দর্শন ইত্যাদি বিষয়ে ইশতাহার লেখা ছাড়াও, কবিতা, গদ্য, অনুগল্প, স্কেচ ইত্যাদি প্রকাশ করেছিলেন । বুলেটিনগুলো হ্যান্ডবিলের মতন কলকাতার কলেজ স্ট্রিট কফি হাউস, পত্রিকা দপতর, কলেজগুলোর বাংলা বিভাগ ও লাইব্রেরি ইত্যাদিতে তাঁরা বিতরন করতেন । হাংরি আন্দোলনের কথা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার এইটি-ই প্রধান কারণ বলে মনে করেন গবেষকরা । কিন্তু হ্যান্ডবিলের মতন প্রকাশ করায় তাঁরা ক্ষতি করেছেন নিজেদের, কারন অধিকাংশ বুলেটিন সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়নি।

১৯৬৩-৬৫ সালের মাঝে হাংরি আন্দোলনকারীরা কয়েকটি পত্রিকাও প্রকাশ করেছিলেন । সেগুলো হল, সুবিমল বসাক সম্পাদিত প্রতিদ্বন্দ্বী, ত্রিদিব মিত্র সম্পাদিত উন্মার্গ, মলয় রায়চৌধুরী সম্পাদিত জেব্রা, দেবী রায় সম্পাদিত চিহ্ণ, প্রদীপ চৌধুরী সম্পাদিত ফুঃ সতীন্দ্র ভৌমিক সম্পাদিতএষণা, এবং আলো মিত্র সম্পাদিত ইংরেজি দি ওয়েস্ট পেপার ।
১৯৬৩ সালের শেষদিকে সুবিমল বসাক, দেবী রায় ও মলয় রায়চৌধুরীর কিছু-কিছু কর্মকাণ্ডের কারণে হাংরি আন্দোলন বাঙালির সংস্কৃতিতে প্রথম প্রতিষ্ঠানবিরোধী গোষ্ঠী হিসাবে পরিচিত হয় । বহু আলোচক হাংরি আন্দোলনকারীদের সে সময়ের কার্যকলাপে দাদাইজম প্রভাব লক্ষ্য করেছেন । এই কারণে শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, সতীন্দ্র ভৌমিক প্রমুখ হাংরি আন্দোলন ত্যাগ করেন ।এই সমস্ত কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তাঁরা দাবী করতেন যে অচলায়তনকে ভাঙা যাবে । অবশ্য তাঁদের অনুকরণে পরবর্তীকালে বহু প্রতিষ্ঠানবিরোধী লেখক এসেছেন বাংলা সাহিত্যে ।


১৯৬৪ সালে, তত্কালীন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্ল চন্দ্র সেনের রাজত্যকালে, মলয় রায়চৌধুরী, প্রদীপ চৌধুরী, সুভাষ ঘোষ, দেবী রায়, শৈলেশ্বর ঘোষ ও সমীর রায়চৌধুরীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করার অভিযোগ এনে গ্রেপ্তার করা হয়| পরে অন্য সবাইকে ছেড়ে দিয়ে শুধু মলয় রায়চৌধুরীর বিরুদ্ধে অশ্লীল সাহিত্য রচনা করার অভিযোগে মামলা করা হয়, তাঁর "প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার” কবিতাটির জন্য | হাংরি আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে্ল৩৫ মাস, অর্থাৎ ১৯৬৭ পর্যন্ত মামলা চলতে থাকে।


২৬ জুলাই ১৯৬৭ তে উচ্চ আদালত মলয় রায় চৌধুরী কে বেকসুর খালাস করে দেন। আর এভাবেই শেষ হয় ক্ষুধিত কবিদের হাহাকার। চোর ডাকাতের পাশে হাতকড়া পড়ে হেঁটে যাওয়া কবি এবং কবি আর তাদের ম্লান হয়ে যাওয়া কষ্ট ঢাকা পড়ে যায় এক নূতন সম্ভাবনায়।


হাংরি আন্দোলনকারীরা বৈপ্লবিক পরিবর্তনএর প্রথম ফল পাওয়া গেল নামকরণে যেমন, আবার এসেছি ফিরে, মানুষের বাচ্চা, আমি আর লীনা হঁটে চলেছি, ক্ষেপচুরিয়াস, ইত্যাদি । হাংরি আন্দোলন প্রথম যৌথভাবে প্রন্তিকের ডিসকোর্সকে স্হান করে দিল । হাংরি আন্দোলনকারীদের কবিতায় একটি ছবি সম্পূর্ণ গড়ে ওঠার আগেই তা মিলিয়ে গিয়ে আরেকটি ছবি ভেসে ওঠে । বাংলা কবিতায় এটি এখন প্রতিষ্ঠিত শৈলী । কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগীব প্রধান ড. তরুণ মুখোপাধ্যায় এদের ব্যপারে লিখেছেন, "ভাষায়, ছন্দে, অলংকার, স্তবকে তুমুল ভাংচুর" করেছেন তাঁরা”।

হাংরি জেনারেশন সম্পর্কে পার্বণ মাজাহারের ধ্যানধারণা

পুলিশি পাহারার মধ্যদিয়ে হাতে কোমরে দড়িবেঁধে চোর-ডাকাতের মতো আদালতে হাজির করা হচ্ছে একজনকে, রাষ্ট্রের চোখে তিনি আসামি। একটি কবিতায় অশ্লীলতার দায়ে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পুলিশের এই আয়োজন। আসামীর  নাম কবি মলয় রায়চৌধুরী তার  রচিত সে কবিতাটির নাম ‘প্রচন্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’।  সাহিত্যে অশ্লীলতার দায়ে মামলাটি ৩৫ মাস চলমান থাকে। নিম্ন আদালতের রায়ে এক মাসের সাঁজা হয় মলয় রায়চৌধুরীর, পরে উচ্চ আদালতে বেকুসর ছাড়া পান। প্রচন্ড বৈদ্যুতিক ছুতার কোন স্বতন্ত্র কবিতা না হয়ে একটি সাহিত্য আন্দোলনের প্রতিনিধি হয়ে উঠল, কবি মলয় রায়চৌধুরীর এই আলোচিত কবিতা যে আন্দোলনের প্রতিনিধিত্ব করে তার নাম ‘হাংরি আন্দোলন’। হাংরি আন্দোলনের আন্দোলনকারীরা হাংরি জেনারেশনের কবি সাহিত্যিক হিসেবে পরিচিত। দেশভাগের পরবর্তী সময়ে বাংলা সাহিত্যে একধরনের প্রচলিত ধারায় পদচারণের দৃশ্যত অনুকরণ ইচ্ছা এবং তার প্রতিফলন  বাংলা সাহিত্যে এক স্থবিরতার জন্ম দেয়। এক প্রকারের স্থবির অবস্থা চলতে থাকে, এই স্থবিরতা ভেঙে দিতে ক্ষুদার্ত তরুণ কয়েকজন কবি-সাহিত্যিক মিলে ইস্তেহার বের করেন, পত্রিকা-হেন্ডবিলে প্রকাশ করতে থাকেন তাদের রচনা। ক্ষুধার্ত কবিদের সে সমস্ত সাহিত্য সে সময়ে রাষ্ট্র ও তার অনুগামীদের ভাল্লাগ্লোনা! রাষ্ট্র সে সাহিত্য আন্দোলনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলো!

জার্মান সমাজতাত্ত্বিক অসওয়াল্ড স্পেংলারের ‘দি ডিক্লাইন অব দি ওয়েস্ট’ গ্রন্থটি ছিলো হাংরি আন্দোলনের তাত্ত্বিকভিত্তি। এই বইয়ের দর্শনগত দিকদিয়ে সে সময়ের বাংলা সাহিত্য ও সামাজিক অবস্থাকে  ক্ষুৎপীড়িত  অবক্ষয় হিসেবে দেখলেন হাংরি জেনারেশনের কবিরা। স্পেংলারের মতো তারাও ভাবলেন, সংস্কৃতি কখনই একটি সরলরেখা বরাবর চলতে পারে না, পূর্ব পরিকল্পনা ছাড়াই সময়ে সময়ে তার পরিধি বিস্তার ঘটে। সংস্কৃতির গতিবিধি একটি জৈবিক প্রক্রিয়া। সংস্কৃতির সে গতিবিধি নিজস্ব সৃজনশীলতার দ্বারা বিকশিত ও সমৃদ্ধ করা সম্ভব। তবে সে সৃজনশীলতায় ঘটতি দেখা দিলে সংস্কৃতি অনান্য সমাজের দ্বারা প্রভাবিত হতে থাকবে, তৈরি হবে এক ক্ষুধার্ত পরিস্থিতির । হাংরি অন্দোলনের কবি সাহিত্যিকরা ৬০’র  দশককে ক্ষুৎকাতর সময় হিসেবে চিহ্নিত করেন। দেশভাগে পর থেকে জন্ম নিয়েছে এই  ক্ষুৎকাতরতার যা কাটিয়ে উঠতেই হাংরি আন্দোলনের সুত্রপাত। হাংরি আন্দোলনের সাহিত্যিকরা  তাদের আন্দোলনকে কাউন্টার কালচারাল মুভমেন্ট এবং তাঁদের সাহিত্যকর্মকে কাউন্টার ডিসকোর্স  হিসেবে প্রচার করেন।
 
১৯৬১ সালের নভেম্বর মাসে কলকাতার পাটনা থেকে ইস্তেহার প্রকাশের মধ্যদিয়ে হাংরি আন্দোলনের  জন্ম। শুরুর দিকে সমীর রায়চৌধুরী, মলয় রায়চৌধুরী, শক্তি চট্টোপাধ্যায় এবং দেবী রায়ের মতো কবি সাহিত্যিকরা ছিলেন এই অন্দোলনের দিকনির্দেশক হিসেবে , ১৯৬২ -৬৩’তে যুক্ত হন বিনয় মজুমদার, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, উৎপলকুমার বসু, সুবিমল বসাক, ত্রিদিব মিত্র ও ফালগুনী রায়ের মতো বাঙালি কবি সাহিত্যিকরা।

এই সাহিত্য আন্দোলনের প্রচারণা জন্য শুরু থেকেই  প্রকাশ হতো  একপৃষ্ঠার ব্যলেটিন। কলকাতার বিভিন্ন লাইব্রেরি, কফি হাউজে, কলেজগুলোতে  এবং পত্রিকা দফতরে বিতরণের মধ্য দিয়েই চলতো প্রচার অভিযান। এই প্রচারনার ফলে চারদিকে আন্দোলনের কথা পৌঁছাতে থাকে, অন্যদিকে এই সফলতার পাশাপাশি ১৯৬৩-৬৫ তে বেশকিছু পত্রিকাও প্রকাশিত হয় সেগুলোর মধ্যে সুবিমল বসাক সম্পাদিত প্রতিদ্বন্দ্বী, ত্রিদিব মিত্র সম্পাদিত উন্মার্গ, মলয় রায়চৌধুরী সম্পাদিত জেব্রা, দেবী রায় সম্পাদিত চিহ্ণ, প্রদীপ চৌধুরী সম্পাদিত ফুঃ অন্যতম ।

এসব বুলেটিন ও পত্রিকায় প্রকাশিত হয় কবিতা , অনুগল্প, নাটক, চিত্রকর্ম যার মধ্যদিয়ে উঠে আসে ধর্ম, রাজনীতি, জীবনবোধ,দর্শন । শিল্প বা আর্ট বলতে যা বুঝি তা যে ইউরুপিয়দের দ্বারা সংজ্ঞায়িত তাও সামনে নিয়ে আসেন মলয় রায়চৌধুরীরা, বাংলার শিল্প বা আর্ট তৈরী যে অতিসাধারণদের হাত ধরেও হয়েছিলো তাও গুরুত্ব সহকারে জায়গা পায় ইস্তেহারে, কবিগান ও কবিগানের ভাষারীতি যে অনন্য  বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন শিল্প তার প্রসঙ্গও জায়গা পায় আন্দোলনের ইস্তেহারে। শিল্প সৃষ্টিতেও শ্রোণীবৈষম্য যে একটি বিশেষ স্থান নিয়ে আছে, কাকে শিল্পী বলা হবে তাতে পুঁজিবাদের প্রভাব নিয়েও সচেতন অবস্থান হাংরি বুলেটনে উঠে আসে। প্রতিষ্ঠান বিরোধীরা ছিলো হাংরি জেনারেশন কবিদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য,তাঁরা প্রতিষ্ঠান বিরোধী প্রথম বাঙ্গালী সাহিত্যিক হিসেবে পরিচিত।

তাত্ত্বিক ও দর্শনগত বিষয়াদির কারণে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় সহ ইউরুপে হাংরি আন্দোলনের  পক্ষে সমর্থন তৈরী হয়। বিখ্যাত ইংরেজ কবি কবি অ্যালেন গিন্সবার্গ কলকাতায় থাকাকালীন ইংরেজি হাংরি বুলেটিনগুলো সংগ্রহ করে পরবর্তীতে স্ট্যনফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে দান করেন।

১৯৬৪ সালে মলয় রায়চৌধুরীর বিরুদ্ধে অশ্লীলতার দায়ে ‘প্রচন্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ সংক্রান্ত মামলায় সুভাষ ঘোষ ও শৈলেশ্বর ঘোষের মুচলেকা দেওয়া এবং আন্দোলনরত শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় ও উৎপলকুমার বসুর পুলিশের পক্ষে সাক্ষ্য দেওয়া সহ অনেকের অংশগ্রহণের কথা অস্বীকৃতির ফলে হাংরি অন্দোলনের সমাপ্তি ঘটে। পরবর্তীতে সত্তর দশকের দিকে অরুণেষ ঘোষ প্রকাশ করেন জিরাফ, অলোক গোস্বামী প্রকাশ করেন কনসেনত্রশান ক্যাম্প, সুভাষ ঘোষ সম্পাদনা করেন আর্তনাদ ইত্যাদি পত্রিকাতে আবারো হাংরি আন্দোলনকে জিইয়ে রাখার চেষ্টা হয় তবে তাও অচিরেই ব্যর্থ হয়।

বুধবার

মলয় রায়চৌধুরীর বিরুদ্ধে নালিশ ও হাংরি আন্দোলনকারীদের মুচলেকা


মলয় রায়চৌধুরীর বিরুদ্ধে নালিশ ও হাংরি আন্দোলনকারীদের মুচলেকা


শক্তি চট্টোপাধ্যায় : ( বয়স ৩১ বছর ) পিতা বামাচরণ চ্যাটার্জি । ঠিকানা ৪ অধরচন্দ্র দাস লেন, কলকাতা।
আমার নাম শক্তি চট্টোপাধ্যায় । আমি একজন স্নাতক এবং লেখক । আমি ইউএসআইস-এ একজন ক্যাজুয়াল অনুবাদক । এটা ঘটনা যে এই আন্দোলন কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে আমি আরম্ভ করেছিলাম। তারা প্রাথমিক উদ্দেশ্য থেকে সরে গেছে দেখে আমি এই আন্দোলনের সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন করেছি । আমি হাংরি জেনারেশন নামে পুস্তিকাটি দেখেছি যাতে আমার নাম প্রকাশকরূপে দেখানো হয়েছে । এই তথাকথিত হাংরি জেনারেশনের সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক ছিল না এবং আমি তা প্রকাশ করিনি । আমি মলয় রায়চৌধুরী ও তার দাদা সমীর রায়চৌধুরীএবং সুভাষ ঘোষ, শৈলেশ্বর ঘোষ, প্রদীপ চৌধুরী ও উৎপলকুমার বসুকে চিনি । আমি মলয় রায়চৌধুরীর হাতের লেখার সঙ্গে পরিচিত । এই পুস্তিকাটি কোথা থেকে ছাপানো হয়েছে এবং কে এর খরচ দিয়েছে তা আমি জানি না ।
আমার মতে মলয় রায়চৌধুরীর রচনাগুলো মানসিক বিকৃতিতে পরিপূর্ণ এবং তার ভাষা নোংরা ।
আমি পুস্তিকাটির একটি কপি দেখেছি এবং মলয় রায়চৌধুরীর লেখা ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ শিরোনামের কবিতাটির ঘোর নিন্দা করেছি । ( ১৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৫, স্বাক্ষর শক্তি চট্টোপাধ্যায় ) । মলয় রায়চৌধুরীর বিরুদ্ধে পুলিশ পক্ষের সাক্ষী।
পবিত্র বল্লভ : ( বয়স ২২ বছর ) পিতা ঠাকুরদাস বল্লভ । ঠিকানা ২৮/এ পাইকপাড়া রো, কলকাতা ৩৭।
আমার নাম পবিত্র বল্লভ । ১৯৬৩ সালে আমি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর পাশ করেছি । কামারহাটির সাগর দত্ত ফ্রি হাই ইংলিশ স্কুলে আমি সহশিক্ষক । প্রথমদিকে যে আইডয়া নিয়ে হাংরি জেনারেশন আরম্ভ হয়েছিল তা আমি গ্রহণ করেছিলাম কিন্তু প্রাসঙ্গিক পুস্তিকাটি প্রকশের পর আমি বুঝতে পারি যে তারা মূল ধ্যানধারণা থেকে বিচ্যুত হয়েছে এবং তাদের সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন করি । যতোদূর আমার মনে আছে দুই বছর পূর্বে হাংরি জেনারেশনের দ্বিতীয় বা তৃতীয় সংখ্যায় আমার নাম কেবল প্রকাশিত হয়েছিল । তাদের সঙ্গে সম্পর্ক শেষ হবার পর আমি কোনো লেখা দিইনি । কোথা থেকে রচনাগুলি প্রকাশিত হয় এবং কে ছাপার খরচ দেয় তা আমি জানি না ।
আমার মতে তাদের রচনাবলী মানসিক বিকৃতিতে পূর্ণ এবং ভাষা বেশ নোংরা । আমি পুস্তিকাটির একটি কপি দেখেছি এবং মলয় রায়চৌধুরীর ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতাটির ঘোর নিন্দা করেছি । আমি মলয় রায়চৌধুরীর হাতের লেখার সঙ্গে পরিচিত । ( ৪ সেপ্টেম্বর ১৯৬৪, স্বাক্ষর পবিত্র বল্লভ ) । মলয় রায়চৌধুরীর বিরুদ্ধে পুলিশ পক্ষের সাজানো সাক্ষী ।
শৈলেশ্বর ঘোষ : ( বয়স ২৬ বছর ) পিতা বিশেশ্বর ঘোষ । ঠিকানা ১৬/বি শ্যামাচরণ মুখার্জি স্টপিট, কলকাতা এবং রঘুনাথপুর গ্রাম, পুলিশ স্টেশান বালুরঘাট, জেলা দিনাজপুর, পশ্চিমবঙ্গ ।
আমার নাম শৈলেশ্বর ঘোষ। আমার জন্ম বগুড়ায় আর বড় হয়েছি বালুরঘাটে। আমি ১৯৫৩ সনে বালুরঘাত হাই ইংলিশ স্কুল থেকে স্কুল ফাইনাল পাশ করেছি, ১৯৫৫ সনে বালুরঘাট কলেজ থেকে আই এস সি, ১৯৫৮ সনে বালুরঘাট কলেজ থেকে বি এ, আর ১৯৬২ সনে কলকাতার সিটি কলেজ থেকে বাংলায় স্পেশাল অনার্স। ১৯৬৩ সনে সেপ্টেম্বর মাসের শেষ দিকে একদিন কলেজ স্ট্রিট কফি হাউসে দেবী রায় ওরফে হারাধন থাড়া নামে একজন তাঁর হাংরি জেনারেশন ম্যাগাজিনের জন্য আমাকে লিখতে বলেন। তারপরেই আমি হাংরি আন্দোলনের লেখকদের সঙ্গে পরিচিত হই। আমি ব্যক্তিগতভাবে খ্যাতিমান লেখক সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, রবীন্দ্র দত্ত, বাসুদেব দাশগুপ্ত, প্রদীপ চৌধুরী এবং উৎপলকুমার বসুকে চিনি। গত এপ্রিল মাসে একদিন কলেজ স্ট্রিট কফিহাউসে মলয় রায়চৌধুরীর সঙ্গে আমার দেখা হয়, এবং তিনি আমার কাছে কয়েকটা কবিতা চান। তাঁর কাছ থেকে জানতে পারি যে হাংরি জেনারেশন প্রকাশিত হবে । একমাস আগে  তাঁর কাছ থেকে একটা পার্সেল পেয়েছি, তাতে কপিগুলো ছিল। আমি মলয় রায়চৌধুরীকে চিনি। তিনি হাংরি আন্দোলনের স্রষ্টা। হাংরি জেনারেশন ম্যাগাজিনে আমি মোট দুবার কবিতা লিখেছি। মলয় আমাকে কিছু লিফলেট আর দুতিনটি পত্রিকা পাঠিয়েছিলেন কিন্তু সেগুলি সম্পর্কে কোন নির্দেশ তিনি আমাকে দেননি। সাধারণত এইসব কাগজপত্র আমার ঘরেই থাকত। এটুকু ছাড়া হাংরি আন্দোলন সম্পর্কে আমি আর কিছু জানি না। অশ্লীল ভাষায় লেখা আমার আদর্শ নয়। আমি উপরোক্ত ঠিকানায় ৪৫ টাকা মাসিক ভাড়ায় আমার আত্মীয় সুভাষ ঘোষের সঙ্গে গত দুই বছর যাবত রয়েছি । ১৯৬২ থেকে আমি হুগলি জেলার ভদ্রকালীতে ভূপেন্দ্র স্মৃতি বিদ্যালয়ে স্কুল টিচার। মাইনে পাই দু’শ দশ টাকা। বর্তমান সংখ্যা হাংরি বুলেটিনের প্রকাশনার পর, যা কিনা আমার অজান্তে ও বিনা অনুমতিতে ছাপা হয়, আমি এই সংস্হার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছি। ভবিষ্যতে আমি হাংরি আন্দোলনের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক রাখব না এবং হাংরি পত্রিকায় লিখব না। আমি অশ্লীল রচনা লিখব না এবং তা আমার সাহিত্যিক নির্ণয় । বর্তমান বুলেটিনটি ছাপিয়েছেন প্রদীপ চৌধুরী। ( ২ সেপ্টেম্বর ১৯৬৪, স্বাক্ষর শৈলেশ্বর ঘোষ ) । মলয় রায়চৌধুরীর বিরুদ্ধে পুলিশ পক্ষের রাজসাক্ষী ।
                                            

সমীর বসু : ( বয়স ২৩ বছর ) । পিতা রাখালচন্দ্র বসু । ঠিকানা ৫/এ মোতিলাল শীল লেন, কলকাতা ১১
আমি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতকোত্তর ও বর্তমানে বেকার । আমি একজন লেখক এবং কলেজ স্ট্রিট কফিহাউসে প্রায়ই যেতাম, যেখানে সন্ধ্যাবেলায় কলকাতার কমবয়সী লেখকরা একত্রিত হন । আমি হাংরি জেনারেশনের উদ্যোক্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায়, উৎপলকুমার বসু, মলয় রায়চৌধুরী ও সমীর রায়চৌধুরী সম্পর্কে জানতে পেয়েছিলাম ।
আমি এবং আরও কয়েকজন লেখক অর্থাৎ আনন্দ চট্টোপাধ্যায়, মলয় দাশগুপ্ত, শংকর দে ও অন্যান্য অনেকে সাহিত্যের সম্পর্কে  হাংরি জেনারেশনের মতাদর্শ অনুমোদন করিনি ।
আমার মতে তাদের রচনাবলী মানসিক বিকৃতির প্রকাশ এবং ভাষা অত্যন্ত নোংরা । বিদেশি বিট কবিদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে এই আন্দোলন শক্তি চট্টোপাধ্যায় আরম্ভ করেছিলেন কিন্তু মলয় রায়চৌধুরী এই আন্দোলনের নেতা নন । আমাকেও হাংরি জেনারেশনে লিখতে বলা হয়েছিল কিন্তু আমি অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেছিলাম ।
ওরা কফিহাউসে যে ম্যানিফেস্টোগুলো বিতরণ করত তার কয়েকটা আমি পেয়েছিলাম । এই বিশেষ পুস্তিকাটি মলয় রায়চৌধুরীর উদ্যোগে প্রকাশিত হয়েছিল । আমি তাকে দেখেছি কফিহাইসে লেখকদের কাছ থেকে লেখা চাইতে । এই পুস্তিকাটি আমি দেখেছি এবং মলয়ের লেখা ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতাটি তৎক্ষণাৎ নিন্দা করেছি ।
আমি মনে করি যে সাহিত্যের নামে এই ধরণের অশ্লীলতা এখনই বন্ধ করে দেয়া উচিত ।
( ৪ সেপ্টেম্বর, ১৯৬৪, স্বাক্ষর সমীর বসু ) । মলয় রায়চৌধুরীর বিরুদ্ধে পুলিশ পক্ষের সাজানো সাক্ষী ।
সুভাষ ঘোষ: ( বয়স ২৭ বছর ) । পিতা শরৎচন্দ্র ঘোষ । ঠিকানা ১৬বি শ্যামাচরণ মুখার্জি স্টিট, কলকাতা ২ এবং গ্রাম শেখেরপোলা, পুলিশ স্টেশান বগুড়া, পোস্ট ভবানীগঞ্জ, জেলা বগুড়া, পূর্ব পাকিস্তান ।
আমার নাম সুভাষচন্দ্র ঘোষ, পিতা শরৎচন্দ্র ঘোষ। আমি ১৬বি শ্যামাচরণ স্ট্রিট, কলকাতা-২-এর একতলার একটি ঘরে শৈলেশ্বর ঘোষের সঙ্গে থাকি, যে আমার দূর সম্পর্কের আত্মীয় । বাড়ির মালিক অমূল্য দে ঐ বাড়িতেই থাকেন এবং আমাদের কাছ থেকে ৪৫ টাকা মাসিক ভাড়া আর ইলেকট্রিক খরচের জন্য দুই টাকা নেন।আমি এবং শৈলেশ্বর ঐ ঘরে গত দুই বছর থেকে রয়েছি । ১৯৪৯ বা ১৯৬০ সালে আমি বগুড়া থেকে বালুরঘাটে মাইগ্রেট করি এবং আমার খুড়তুতো ভাই মৃণালকান্তি ঘোষ, যিনি একজন ব্যবসায়ী তাঁর  বাড়িতে আশ্রয় নিই । বালুরঘাটে আমাকে বালুরঘাট হাই স্কুলে ক্লাস এইটে ভর্তি করা হয় এবং ১৯৫৩ সালে আমি সেখান থেকে স্কুল ফাইনাল পাস করি । ১৯৫৫ সালে বালুরঘাট কলেজ থেকে আইএস সি পাশ করি । সাধারণত আমি আমার খরচ আমার পিতা এবং বিশেষ করে আমার বড়ো ভাই অতুলচন্দ্র ঘোষ, যিনি দ্বারভাঙ্গা শুগার মিলে কাজ করেন তাঁর কাছ থেকে পেতাম ।
১৯৫৫ সালে আমি কলকাতায় আসি ও বিদ্যাসাগর কলেজে বিএসসি পড়ার জন্য ভর্তি হই এবং কর্নওয়ালিস স্ট্রিট, কলকাতায় বিদ্যাসাগর লজে থাকা আরম্ভ করি ।
১৯৫৭ সালে আমি বিএসসি পাশ করি। তারপর, অর্থাৎ ১৯৫৮ সালে সিটি কলেজে বিএ কোর্সে ভর্তি হয়ে এক বছরের জন্য পড়ি । ব্যক্তিগত কারণের জন্য আমি ঐ কলেজে ছাত্র হিসাবে উইথড্র করে নিয়ে ১৯৬০ সালে প্রাইভেটে পরীক্ষা দিই । সেই বছরই আমি হজুরি মল লেনের ( মুচিপাড়া  পুলিশ স্টেশান ) বেঙ্গল লাইব্রেরি অ্যাসোশিয়েশান থেকে লাইব্রেরিয়ানশিপের সার্টিফিকেট কোর্স পাশ করি । ১৯৬১ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ডিপ্লোমার জন্য ভর্তি হই এবং ১৯৬২ সালে সাফল্যের সঙ্গে পাশ করি । ১৯৬২ সালে আমি হুগলি ইন্সটিটিউট অফ টেকনোলজিতে মাসিক ১৮৯ টাকায় গ্রন্হাগারিকের চাকরি পাই এবং এক বছর কাজ করার পর পদত্যাগ করে বালুরঘাটে আমার অসুস্হ পিতাকে দেখতে যাই ; তিনি মারা যান । ১৯৬৩ সালের নভেম্বর বা ডিসেম্বর মাসে  আমি কলকাতায় ফিরে এসে ইনটারভিউ দিই এবং জুলাই ১৯৬৪ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বেলেঘাটাস্হিত ডিগ্রি কলেজ অফ সেরামিক টেকনোলজিতে গ্রন্হাগারিকের চাকরি পাই ।
গত এক বৎসর যাবত আমি কলেজ স্ট্রিট কফিহাউসে যাতায়াত করছি । সেখানে একদিন হাংরি আন্দোলনের উদ্ভাবক মলয় রায়চৌধুরীর সঙ্গে পরিচয় হয় ; সে জানায় যে সে একজন লেখক । সে আমার কাছ থেকে একটা লেখা চায় । হাংরি জেনারেশন বুলেটিনের প্রকাশের খবর আমি জানি বটে কিন্তু হাংরি আন্দোলনের যে ঠিক কী উদ্দেশ্য তা আমি জানি না । আমি তাকে আমার একটা লেখা দিই যা দেবী রায় সম্পাদিত হাংরি জেনারেশন পত্রিকায় প্রকাশিত হয় । আমি তা আমার রুম মেট শৈলেশ্বর ঘোষের কাছ থেকে পাই । সে হাংরি বুলেটিনের একটা প্যাকেট পেয়েছিল। আমি প্রদীপ চৌধুরী, সুবো আচার্য, বাসুদেব দাশগুপ্ত, উৎপলকুমার বসু, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় এবং অন্যান্য লেখকদের সঙ্গে ১৯৬৪ সালে দেখা করি ।
আমি এই ধরণের আন্দোলনের সঙ্গে কখনও নিজেকে জড়াতে চাইনি, যা আমার মতে খারাপ । আমি ভাবতে পারি না যে এরকম একটা পত্রিকায় আমার আর্টিকেল ‘হাঁসেদের প্রতি’ প্রকাশিত হবে । আমি হাংরি আন্দোলনের আদর্শে বিশ্বাস করিনা, আর এই লেখাটা প্রকাশ হবার পর আমি ওদের সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন করেছি । অশ্লীল রচনা লেখা আমার উদ্দেশ্য নয় এবং পূর্বেও ছিল না । ( ২ সেপ্টেম্বর ১৯৬৪, স্বাক্ষর সুভাষ ঘোষ ) । মলয় রায়চৌধুরীর বিরুদ্ধে পুলিশ পক্ষের রাজসাক্ষী ।
                                                  

উৎপলকুমার বসু : ( বয়স ২৮ বছর ) । পিতা : পি.কে. বসু । ঠিকানা : ২৫ রয়েড স্ট্রিট, কলকাতা ২৬
আমি অবিবাহিত এবং আমার বয়স ২৮ বছর । বর্তমানে আমি ২৫ রয়েড স্ট্রিটে থাকি । আমি জিওলজিতে স্নাতকোত্তর এবং আশুতোষ কলেজে লেকচারার হিসাবে যুক্ত ।
১৯৬২ সালে বা তার কাছাকাছি সময়ে হাংরি জেনারেশন প্রকাশনা সর্বপ্রথম আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করে । আমি সাহিত্য আন্দোলনে আগ্রহী ছিলাম । পরে আমি মলয় রায়চৌধুরীর সঙ্গে পরিচিত হই এবং তার দাদা সমীর রায়চৌধুরী আমার পূর্বপরিচিত । এই গোষ্ঠীর একত্রিত হবার জায়গা ছিল কলেজ স্ট্রিট কফিহাউস এবং ক্রমে-ক্রমে আমি অন্য সদস্যদের সঙ্গেও পরিচিত হই, যথা শৈলেশ্বর, সুভাষ এবং দেবী রায় ওরফে হারাধন ধাড়া এবং তাদের অনুরোধে আমি বিভিন্ন সময়ে হাংরি জেনারেশন পুস্তিকায় প্রকাশের জন্য লেখা ও কবিতা দিয়েছি । প্রকাশনাটি কোথা থেকে ছাপানো হতো এবং কে এর ছাপাবার খরচ দিতেন তা আমি জানি না ।
১৯৬৪ সালে গ্রীষ্মের সময়ে মলয় পাটনা থেকে কলকাতায় এসে আমাকে জানান তিনি পুস্তিকা প্রকাশের ব্যবস্হা করছেন এবং আমাকে একটি লেখা দিতে অনুরোধ করেন । আমি ‘কুসংস্কার’ নামে একটি লেখা দিই । আমি ব্যক্তিগতভাবে পাণ্ডুলিপি মলয়কে দিয়েছিলাম ও তারপরে কলকাতা ছেড়ে ডালহাউসি রওনা দিই, যেখানে আমি প্রায় দু’মাস ছিলাম । কলকাতায় ফিরে আমি কলেজ স্ট্রিট কফিহাউসে পুস্তিকাটির একটি কপি দেখতে পাই । পরে আমি ডাকেও একটি কপি পাই ।
আমার মতে মলয় রায়চৌধুরীর রচনাবলী নিদারুণ বিরক্তি ও ননসেন্সের বোধ বহন করে । আমি মনে করি ওদের সাহিত্য আন্দোলন দুশ্চরিত্রতায় অধঃপতিত হয়েছে এবং সেকারণে আমি হাংরি জেনারেশনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছি । মলয়ের হাতের লেখা দেখার সুযোগ আমার হয়েছে ।
( ৫ এপ্রিল ১৯৬৫ , স্বাক্ষর উৎপলকুমার বসু )। মলয় রায়চৌধুরীর বিরুদ্ধে পুলিশের পক্ষের সাক্ষী ।
সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় : ( বয়স ৩০ বছর ) । পিতা : ইউ এন চ্যাটার্জি । ঠিকানা : ১৮ সারদা চ্যাটার্জি লেন, হাওড়া ।
আমি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক এবং কলকাতা কর্পোরেশনে অ্যাসিসট্যান্ট ইন্সপেক্টরের চাকরি করি । সেই সঙ্গে আমি একজন লেখক এবং কলেজ স্ট্রিট কফিহাউসে যেতাম যেখানে সন্ধ্যাবেলায় কলকাতার তরুণ সাহিত্যিকরা একত্রিত হন । সমীর রায়চৌধুরী আমার ব্যক্তিগত বন্ধু । হাংরি জেনারেশনের উদ্যোক্তা অর্থাৎ শক্তি চট্টোপাধ্যায়, মলয় রায়চৌধুরী ও অন্যান্যদের সঙ্গে আমি পরিচিত হই । যদিও আমি হাংরি জেনারেশনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নই, সাহিত্য আন্দোলনে আমার আগ্রহ ছিল । হাংরি জেনারেশনের কয়েকটি ম্যানিফেস্টোতে আমার রচনার বিজ্ঞাপন আছে । একটি প্রকাশনায় আমার নাম প্রকাশক হিসাবে ছাপা হয়েছে । তা করা হয়েছে লেখক হিসাবে আমার খ্যাতি ব্যবহার করার জন্য কিন্তু যেহেতু আগে থাকতে আমার অনুমতি নেয়া হয়নি, আমি প্রতিবাদ করি । বর্তমান প্রকাশনাটিও আমার চোখে পড়েছে । একজন কবি হিসাবে আমি মলয় রায়চৌধুরীর  ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতাটির বিষয়বস্তু কিংবা ভাষাকে অনুমোদন করি না । মলয় রায়চৌধুরীর সঙ্গে চিঠিপত্রে আমার যোগাযোগ ছিল, সে সাহিত্যিক বিষয়ে আমার মতামত চাইতো । ( ১৫ মার্চ ১৯৬৫, স্বাক্ষর সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় ) । মলয় রায়চৌধুরীর বিরুদ্ধে পুলিশের পক্ষের সাক্ষী ।