Anti-Establishment লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
Anti-Establishment লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

সোমবার

হাংরি জেনারেশন - একটি আভাঁগার্দ আন্দোলন : আলী হায়দার শেখ আবদুর রহমান


হাংরি জেনারেশনঃ একটি আভাঁগার্দ আন্দোলন

 ২৩:৪৯, ২৭ এপ্রিল ২০২০  ব্লগ

১৯৬৪ সাল। ঐ বছরের সেপ্টেম্বর মাসে ভারতীয় পেনাল কোডের ১২০(বি), ২৯২ এবং ২৯৪ ধারায় ১১ জন 
কবির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছিলো। তারা হলেন- মলয় রায়চৌধুরী, সমীর রায়চৌধুরী,
 শৈলেশ্বর ঘোষ,  সুভাষ ঘোষ, দেবী রায়, উৎপল কুমার বসু, প্রদীপ চৌধুরী, রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়, 
বাসুদেব দাশগুপ্ত,  সুবো আচার্য এবং  সুবিমল বসাক।
 এদের মধ্যে ছয়জনকে গ্রেফতার করে কোলকাতার ব্যাঙ্কশাল কোর্টে তোলা হয়েছিলো। 
মলয় রায়চৌধুরীকে হাতে হাতকড়া এবং কোমরে দড়ি বেঁধে হাঁটিয়ে আনা হয় চোর-ডাকাতের মত।
 কিন্তু কেন?

দেশভাগের পর পশ্চিম বাংলায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সাথে উদ্বাস্তু শরণার্থীর ভিড়,
 অন্যদিকে অর্থনৈতিক স্বরাজের
 খোয়াবকে গুঁড়িয়ে চলেছে স্বার্থ আর নোংরা রাজনীতির নগ্ন খেলা। ঠিক এই সময় আবির্ভাব ঘটলো
 আভাগার্দ রূপে একদল
 তরুণ কবির। এক পাতার বুলেটিনে তারা যাপিত জীবন, দর্শন, রাজনীতি, গল্প, অণুগল্প সর্বোপরি
 কবিতা হ্যান্ডবিল
 আকারে ছাপিয়ে বিলি করতে লাগলেন প্রতিষ্ঠিত স্বীকৃত সাহিত্য তীর্থের বিপরীতে প্রান্তিক
 কফি হাউজ, চা-স্টল,
 গলির মোড়ে-মোড়ে। রবীন্দ্র-জীবনানন্দ বলয়ের বাহিরে এইসব কবিতা ধাক্কা দিয়ে গেলো
 গণমানুষের চিত্তকে। 
বাংলা সাহিত্যকে এই প্রথমবারের মত গতানুগতিক সাহিত্যিক অক্ষরবাদী বুদ্ধিজীবীদের সভা 
থেকে নামিয়ে আনা হলো রাস্তায়,
 সাধারণ মানুষের মাঝে। পোস্ট-কলোনিয়াল ভারতবর্ষের ঔপনিবেশিক সাহিত্যকে বুড়ো আঙ্গুল 
দেখিয়ে দিয়ে নিজেদের
 স্বত্ত্বার বহিঃপ্রকাশই ছিল এই আন্দোলন এর আপাত অভিপ্রায়।
 যেসব কবিরা এই বিপ্লব ঘটালো তারা নিজেদের দাবী করলো 'হাংরি জেনারেশন' হিসেবে। 

আর্তি বা কাতরতা শব্দগুলো মতাদর্শটিকে সঠিক তুলে ধরতে পারবে না বলে, আন্দোলনকারীরা
 শেষাবধি হাংরি 
শব্দটি গ্রহণ করেন । হাংরি আন্দোলন, এই শব্দবন্ধটি বাংলাভাষায় ঠিক সেভাবে প্রবেশ করেছে যে
 ভাবে মুসলিম লিগ, 
কমিউনিস্ট পার্টি বা কংগ্রেস দল ইত্যাদি সংকরায়িত শব্দবন্ধগুলো।
 আর এই ক্ষুধার্ত তরুণ কবিদের নেতৃত্ব দিলেন,
 পাটনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের ২১ বছরের এক তরুণ তুর্কি- মলয় রায়চৌধুরী- 
যিনি নিজেকে পরিচয় দিলেন, 'একজন কালচারাল বাস্টার্ড'।

১৯৫৯-৬০ সালে ইতিহাসের দর্শন এবং মার্ক্সবাদের উত্তরাধিকার নিয়ে দুইটি লেখা নিয়ে কাজ করার সময়
 হাংরি আন্দোলনের প্রয়োজনটা মলয় রায়চৌধুরী অনুভব করেন। ‘হাংরি’ শব্দটি প্রথমে পেয়েছিলেন কবি
 Geoffrey Chaucer এর 'In Swore Hungry Time' বাক্যটি থেকে। আর আন্দোলনের তত্ত্ব গড়েছিলেন
 Oswald Spengler এর লেখা 'The Decline of the West' বইটি থেকে। Spengler এর এই তত্ত্বটির 
সারমর্ম নিয়ে মলয় রায়চৌধুরী ‘প্রতিসন্দর্ভের স্মৃতি’ নামে একটি প্রবন্ধে লিখেছিলেনঃ

'একটি সংস্কৃতির ইতিহাস কেবল একটি সরলরেখা বরাবর যায় না, তা একযোগে

বিভিন্ন দিকে প্রসারিত হয়; তা হল জৈবপ্রক্রিয়া, এবং সেকারণে সমাজটির নানা

অংশের কার কোন দিকে বাঁকবদল ঘটবে তা আগাম বলা যায় না। যখন কেবল

নিজের সৃজনক্ষমতার ওপর নির্ভর করে তখন সংস্কৃতিটি নিজেকে বিকশিত ও সমৃদ্ধ

করতে থাকে, তার নিত্যনতুন স্ফুরণ ও প্রসারণ ঘটতে থাকে।

কিন্তু একটি সংস্কৃতির অবসান

সেই সময়ে আরম্ভ হয় যখন তার নিজের সৃজনক্ষমতা ফুরিয়ে গিয়ে তা

বাইরে থেকে যা

পায় তাই আত্মসাৎ করতে থাকে, খেতে থাকে, তার ক্ষুধা তৃপ্তিহীন।'


আর সেই ভাবনা থেকেই কবি মলয় রায় তাঁর দাদা সমীর রায়, দুই বন্ধু দেবী রায় এবং শক্তি চট্টোপাধ্যায়
 এর সাথে
 ধারনাটি ব্যাখ্যা করে হাংরি আন্দোলনের প্রস্তাবনা দেন এবং অন্যান্য তরুণ লেখক কবি শিল্পীদের নিয়ে
 এই আন্দোলন 
শুরু করেন। নভেম্বর ১৯৬১ সালে প্রথম হাংরি বুলেটিন প্রকাশিত করা হয় পাটনা থেকে এবং সেখানে 
বাংলা ছাপাবার 
প্রেস না পাওয়ায় বুলেটিনটি প্রকাশিত করা হয় ইংরেজীতে। অতি স্বল্প কালের মধ্যেই হিন্দী ও 
নেপালী ভাষাতেও এই আন্দোলন
 ছড়িয়েছিল। ১৯৬২-৬৩ সালে আন্দোলনে মিশে যান বিনয় মজুমদার, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, 
উৎপলকুমার বসু, সুবিমল বসাক, 
ত্রিদিব মিত্র, ফালগুনী রায়, আলো মিত্র, রবীন্দ্র গুহ, সুভাষ ঘোষ, প্রদীপ চৌধুরী, সুবো আচার্য, 
অরুপরতন বসু, বাসুদেব দাশগুপ্ত, 
সতীন্দ্র ভৌমিক, শৈলেশ্বর ঘোষ, হরনাথ ঘোষ, নীহার গুহ, আজিতকুমার ভৌমিক, অশোক চট্টোপাধ্যায়,
 অমৃততনয় গুপ্ত, 
ভানু চট্টোপাধ্যায়, শংকর সেন, যোগেশ পাণ্ডা, মনোহর দাশ, তপন দাশ, শম্ভু রক্ষিত, মিহির পাল,
 রবীন্দ্র গুহ, সুকুমার মিত্র, 
দেবাশিষ মুখোপাধ্যায় প্রমুখ । অনিল করঞ্জাই এবং করুণানিধান নামের দুজন চিত্রকরও 
ছিলেন এই আন্দোলনে। 
ঢাকার হাংরি আন্দোলনকারীদের মধ্যে ছিলেন বুলবুল খান মাহবুব, অশোক সৈয়দ, আসাদ চৌধুরী, 
শহিদুর রহমান, 
প্রশান্ত ঘোষাল, মুস্তফা আনোয়ার সহ আরো অনেকে। অনেকেই তখনও জানতেন না যে মলয়রা
 প্রথম হাংরি বুলেটিনগুলো
 ইংরেজিতে কেন প্রকাশ করেছিলেন। ফলে বিভিন্ন অঞ্চলে আন্দোলন আরম্ভ হয়েছিলো ইংরেজিতে 
ইশতেহার প্রকাশের মধ্য দিয়ে।
কবিতার ইশতেহারে মলয় লিখেছিলেনঃ
‘শিল্পের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা কবিতা সৃষ্টির প্রথম শর্ত’। ‘এখন কবিতা রচিত হয় অরগ্যাজমের 
মতো স্বতঃস্ফূর্তিতে। 
প্রথম ইংরেজি ইশতেহারে কবিতা সম্পর্কে লেখেন-

'Poetry is no more a civilizing manoeuvre, a replanting of the bamboozled gardens; 
it is a holocaust, a violent and somnambulistic jazzing of the hymning five, 
a sowing of the 
tempestual hunger.

Poetry is an activity of the narcissistic spirit. Naturally, we have discarded the

 blankety-blank 
school of modern poetry, the darling of the press, where poetry does not
 Resurrection itself
 in an orgasmic flow, but words come up bubbling in an artificial muddle. 
In the prosed-rhyme 
of those born-old half-literates, you must fail to find that scream of
 desperation of a thing 
wanting to be man, the man wanting to be spirit.

Poetry of the younger generation too has died in the dressing room, 

as most of the younge
r prosed-rhyme writers, afraid of the satanism, the vomitous horror, 
the self-elected crucifixion 
of the artist that makes a man a poet, fled away to hide in the hairs.

Poetry from Achintya to Ananda and from Alokeranjan to Indraneel, has been cryptic, 
short-hand, cautiously glamourous, flattered by own sensitivity like a public school prodigy. 
Saturated with self-consciousness, poems have begun to appear from the tomb of logic
 or the bier of unsexed rhetoric.

১৯৬২ সালে হাংরিদের প্রথম বাংলা ইশতেহার প্রকাশ হয় যার শেষ লাইন ছিলো,
'কবিতা সতীর মতো চরিত্রহীনা, প্রিয়তমার মতো যোনিহীনা ও ঈশ্বরীর মতো অনুষ্মেষিণী।'

আন্দোলনের মুল উদ্দেশ্য নির্ণায়ক নিয়মবিধির ইশতেহারে মলয় লিখলেন-

1. The merciless exposure of the self in its entirety.

2. To prevent in all nakedness, all aspects of the self and thing before it.

3. To catch a glimpse of the exploded self at a particular moment.

4. To challenge every value with a view to accepting or rejecting the same.

5. To consider everything at the start to be nothing but a 'thing' with a view to testing
 whether it is living or lifeless.

6. Not to take reality as it is but to examine it in all its aspects.

7. To seek to find out a mode of communication, by abolishing the accepted modes of
 Prose and Poetry which would instantly establish a communication between the
 poet and his reader.

8. To use the same words in poetry as are used in ordinary conversation.

9. To reveal the sound of the word, used in ordinary conversation, 

more sharply in the poem.

10. To break loose the traditional association of words and to coin unconventional 
and here-to-fore unaccepted combination of words.

11. To reject traditional forms of poetry and allow poetry to take its original forms.

12. To admit without qualification that poetry is the ultimate religion of man.

13. To transmit dynamically the message of the restless existence and 

the sense of disgust
 in a razor sharp language. 

14. Personal ultimatum.

তবে কেবলমাত্র কবিতা লিখেই ক্ষান্ত হননি এই ক্ষুধার্ত কবির দল। ১৯৬৩ সালের কথা।
 রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী, এমএলএ, সচিব, লেখক এবং সাংবাদিকরা হাংরিয়ালিস্টদের থেকে পেতে 
থাকলেন বিভিন্ন ধরনের মুখোশ। কোনোটা জন্তু-জানোয়ারের,
 কোনোটা দানবের। জোকার, মিকি মাউস, দেবতা- কোনো ধরনের মুখোশই বাদ গেল না। 
প্রতিটি মুখোশের সাথে লেখা থাকে,
 “দয়া করে মুখোশটা খুলে ফেলুন”। অন্যদিকে কবি সাহিত্যিকদের পাঠানো হলো বিয়ের কার্ড।
 তাতে লেখা "Fuck the Bastards of Gungshalik School of Poetry"।
 মূলধারার বাণিজ্যিক পত্রিকাগুলোতে ছোটগল্পের নামে আসতে লাগল সাদা কাগজ, 
আর বুক রিভিউয়ের জন্য
 পাঠানো হতো জুতোর বাক্স। প্রথাগত সাহিত্য আর সংস্কারের বিরুদ্ধে ক্রমে আরও জোরদার হলো
 'হাংরি মুভমেন্ট'।
 কখনো তারা একটি বইয়ের দাম ধরলেন এক লক্ষ টাকা বা কয়েকটি টি বি সিল, 
আবার কখনো চিত্রপ্রদর্শনীর 
আয়োজন করে শেষদিন পুড়িয়ে ফেললেন সমস্ত চিত্রকর্ম।

কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্ল সেনকে উদ্দেশ্য করে লিখেছিলেন-

"কবিতা ভাতের মতো কেন লোকে নিতেই পারছে না
যুদ্ধ বন্ধ হলে নেবে? ভিখারিও কবিতা বুঝেছে
তুমি কেন বুঝবে না হে অধ্যাপক মুখ্যমন্ত্রী সেন?"

‘জখম’ কবিতায় মলয় লিখলেন-

"মানুষের দেয়া আইনানুগ মৃত্যুদণ্ড পেয়ে কেবল মানুষই মরে যাচ্ছে
ফ্যাক্ট্রি আর বিবাহ দুটোরই রেজিস্ট্রি হয়ে চোলেছে নিয়মমাফিক
কোল্কাতায় মদের ব্যবসা থেকে নৈতিক মাইনে পাচ্ছে ৪৫০০০ ডান হাত
১ একরে ১৩৫ জোড়া পায়ের ঠেসাঠেসি আরাম খাচ্ছে ১৯৬৫ মডেলের কোল্কাতা”

'হাবিজাবি' কবিতায় সুবিমল বসাক লিখেন-

আমারে মাইরা ফেলনের এউগা ষড়যন্ত্র হইসে
চারো কোনা দিয়া ফুসফুস আওয়াজ কানে আহে
ছাওয়াগুলান সইরা যায় হুমকে থিক্যা
অরাআমারে এক্কেরে শ্যায করতে সায়
আমি নিজের ডাকাইত্যা হাতেরে লইয়া সচেত্তন আসি
কেউ আইয়া চ্যারায় দিশায় চ্যাবা কথা কয় না
আমি সুপসাপ থাকি
ভালাসির গুছাইয়া আমি কথা কইতে পারি না
২ কইতে গিয়া সাত হইয়া পড়ে
১৫ সাইলে ৯ আইয়া হাজির হব
ছ্যাব ফেলনের লাইগ্যা বিচড়াইতাসি অহন
আহ, আমার দাঁত মাজনের বুরুশ পাইতাসি না
বিশ্বাস করেন, কেউ একজনা আমার মুহের সকরা খাবার খাইসে।

'একটি উজ্জ্বল মাছ' কবিতায় বিনয় মজুমদার লেখেন-

একটি উজ্জ্বল মাছ একবার উড়ে
দৃশ্যত সুনীল কিন্তু প্রকৃত প্রস্তাবে স্বচ্ছ জলে
পুনরায় দুবে গেল - এই স্মিত দৃশ্য দেখে নিয়ে
বেদনার গাঢ় রসে আপক্ব রক্তিম হলো ফল ।
বিপন্ন মরাল ওড়ে, আবিরাম পলায়ন করে,
যেহেতু সকলে জানে তার শাদা পালকের নীচে
রয়েছে উদগ্র উষ্ণ মাংস আর মেদ;
স্বল্পায়ু বিশ্রাম নেয় পরিশ্রান্ত পাহাড়ে পাহাড়ে;
সমস্ত জলীয় গান বাষ্পীভূত হয়ে যায়, তবু
এমন সময়ে তুমি, হে সমুদ্রমৎস্য তুমি... তুমি...
কিম্বা,দ্যাখ,ইতস্তত অসুস্হ বৃক্ষেরা
পৃথিবীর পল্লবিত ব্যাপ্ত বনস্হলী
দীর্ঘ দীর্ঘ ক্লান্ত শ্বাসে আলোড়িত করে
তবু সব বৃক্ষ আর পুষ্পকুঞ্জ যে যার ভূমিতে দূরে দূরে
চিরকাল থেকে ভাবে মিলাইবে শ্বাসরোধী কথা।

১৯৬৪ এর সেপ্টেম্বরে রাষ্টের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন মলয় রায়চৌধুরী,
 প্রদীপ চৌধুরী, সুভাষ ঘোষ, দেবী রায়, শৈলেশ্বর ঘোষ এবং সমীর রায়চৌধুরী। এই একই অভিযোগে 
উৎপলকুমার বসু, সুবিমল বসাক, বাসুদেব দাশগুপ্ত, সুবো আচার্য এবং রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে 
ওয়ারেন্ট ইস্যু হলেও তাঁরা প্রেপ্তার এড়িয়ে যেতে পেরেছিলেন। হাতে হাতকড়া পরিয়ে,
 কোমরে দড়ি বেঁধে চোর-ডাকাতদের 
সঙ্গে তাদেরকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো-করা হয়েছিলো ঘন্টার পর ঘন্টা জেরা। 
এরপর রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের
 অভিযোগ তুলে নিয়ে ১৯৬৫ সালের মে মাসে মলয় ছাড়া বাদবাকি সবাইকে 
ছেড়ে দেয়া হলো। তার বিরুদ্ধে দায়ের করা
 মামলায় বলা হয়েছিলো যে সাম্প্রতিক হাংরি বুলেটিনে প্রকাশিত ‘প্রচন্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতাটি অশ্লীল।
কবিতাটির প্রথম কয়েক লাইনঃ


'ওঃ মরে যাব মরে যাব মরে যাব
আমার চামড়ার লহমা জ্বলে যাচ্ছে অকাট্য তুরুপে
আমি কী কোর্বো কোথায় যাব ওঃ কিছুই ভাল্লাগছে না
সাহিত্য-ফাহিত্য লাথি মেরে চলে যাব শুভা
শুভা আমাকে তোমার তর্মুজ-আঙরাখার ভেতরে চলে যেতে দাও
চুর্মার অন্ধকারে জাফ্রান মশারির আলুলায়িত ছায়ায়
সমস্ত নোঙর তুলে নেবার পর শেষ নোঙর আমাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে
আর আমি পার্ছিনা, অজস্র কাঁচ ভেঙে যাচ্ছে কর্টেক্সে
আমি যানি শুভা, যোনি মেলে ধরো, শান্তি দাও।'


মলয়ের বিরুদ্ধে এই মামলা দায়ের করা সম্ভব হয়েছিলো শৈলেশ্বর ঘোষ এবং সুভাষ ঘোষ রাজসাক্ষী 
হয়েছিলেন বলে।
 এরপর আদালতে তোলা হলে হাংরি বুলেটিনের লিডার শক্তি চট্টোপাধ্যায় সাক্ষ্য দিলেন মলয়ের বিপক্ষে, 
অন্যদিকে পক্ষে সাক্ষী দিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। 
আদালতে সুনীল বলেছিলেন, কবিতাটিতে তিনি কোনো অশ্লীলতা পাননি।
 ফলে নিম্নআদালতে সাজা হবার পরেও উচ্চআদালতের দেওয়া রায়ে 
১৯৬৭ সালে খালাস পেয়েছিলেন মলয় রায়চৌধুরী।
 ওদিকে যাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছিলো তাদের কারো কারো চাকরি চলে গেলো, 
কয়েকজনকে করা হলো বদলি। ফলে একপ্রকারে বন্ধ হয়ে গেলো হাংরি আন্দোলন।

ছবিঃ ব্যাংকশাল কোর্টৈ মলয় রায়চৌধুরীর দণ্ডাদেশ 

বাংলা সাহিত্যে হাংরি আন্দোলনের প্রভাবঃ

❑ হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের প্রথম ও প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো তাঁরা সাহিত্যকে পণ্য হিসাবে
 চিহ্নিত করতে 
অস্বীকার করেছিলেন। কেবল তাই নয়; তাঁরা এক পৃষ্ঠার লিফলেট প্রকাশ করতেন ও বিনামূল্যে
 আগ্রহীদের মাঝে
 বিতরণ করতেন। তাঁরাই প্রথম ফোলডার-কবিতা, পোস্ট-কার্ড কবিতা ও পোস্টারে কবিতা ও 
কবিতার পংক্তির সূত্রপাত করেন।

❑ হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ অবদান প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা। তাঁদের আগমনের পূর্বে
 প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা 
করার কথা সাহিত্যকরা চিন্তা করেন নাই। সুভাষ ঘোষ বলেছেন প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার অর্থ সরকার
 বিরোধিতা নয়, 
সংবাদপত্র বিরোধিতা নয়; হাংরি জেনারেশনের বিরোধ প্রচলিত সাহিত্যের মৌরসি পাট্টাকে উৎখাত
 করে নবতম মূল্যবোধ
 সঞ্চারিত করার। নবতম শৈলী, প্রতিদিনের বুলি, পথচারীর ভাষা, ছোটোলোকের কথার ধরণ, 
ডিকশন, উদ্দেশ্য, 
শব্দ ব্যবহার, চিন্তা ইত্যাদি । পশ্চিমবঙ্গে বামপন্থী সরকার স্বত্তেও বামপন্থী কবিরা মধ্যবিত্ত মূল্যবোধ
 থেকে নিষ্কৃতি পান নাই।
 শ্রমিকের কথ্য-ভাষা, বুলি, গালাগাল, ঝগড়ার অব্যয় তাঁরা নিজেদের রচনায় প্রয়োগ করেন নাই।

❑ হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের তৃতীয় অবদান কবিতা ও গল্প-উপন্যাসে ভাষাকে 
ল্যাবিরিন্থাইন করে প্রয়োগ করা। 
এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ মলয় রায়চৌধুরীর কবিতা ও গল্প-উপন্যাস। মলয় রায়চৌধুরী সর্বপ্রথম 
পশ্চিমবাংলার সমাজে 
ডিসটোপিয়ার প্রসঙ্গ উত্থাপন করেন। বামপন্থীগণ যখন ইউটোপিয়ার স্বপ্ন প্রচার করছিলেন
 সেই সময়ে মলয় রায়চৌধুরী 
চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেন ডিসটোপিয়ার দরবারি কাঠামো।

❑ হাংরি জেনারেশন আন্দোলনে সাবঅলটার্ন অথবা নিম্নবর্গের লেখকদের গুরুত্ব 
প্রদান করতে দেখা গিয়েছিল। 
আন্দোলনের বুলেটিনগুলোর সম্পাদক ছিলেন চাষি পরিবারের সন্তান হারাধন ধাড়া।
 সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়সহ তৎকালীন
 কবিরা তাঁর এমন সমালোচনা করেছিলেন যে তিনি এফিডেভিট করে ‘দেবী রায়’ নাম নিতে বাধ্য হন।
 এছাড়া আন্দোলনে ছিলেন নিম্নবর্গের চাষী পরিবারের শম্ভু রক্ষিত, তাঁতি পরিবারের সুবিমল বসাক,
 জাহাজের খালাসি অবনী ধর, মালাকার পরিবারের নিত্য মালাকার ইত্যাদি ।
পরবর্তীকালে প্রচুর সাবঅলটার্ন 
কবি-লেখকগণকে বাংলা সাহিত্যের অঙ্গনে দেখা গেল।

❑ হাংরি জেনারেশনের পূর্বে কবিতা-গল্প-উপন্যাস রচিত হতো ঔপনিবেশিক মূল্যবোধ অনুযায়ী 
একরৈখিক রীতিতে। 
তাঁদের ছিল লিনিয়রিটি, দিশাগ্রস্ত লেখা, একক গলার জোর, কবিরা ধ্বনির মিল দিতেন, সময়কে মনে 
করতেন প্রগতি।
 এক রৈখিকতা এসেছিল ইহুদি ও খ্রিস্টান ধর্মগ্রন্থের কাহিনির অনুকরণে। আমাদের দেশে বহুকাল যাবত 
সেকারণে ইতিহাস রচিত হয়েছে কেবল দিল্লির সিংহাসন বদলের। 
সারা ভারত জুড়ে যে বিভিন্ন রাজ্য ছিল তাদের 
ইতিহাস অবহেলিত ছিল। হাংরি জেনারেশনের কবি-লেখকগণ একরৈখিকতা বর্জন করে বহুরৈখিক রচনার 
সূত্রপাত ঘটালেন।

❑ হাংরি জেনারেশনের পূর্বে শব্দার্থকে সীমাবদ্ধ রাখার প্রচলন ছিল। রচনা ছিল কবির ‘আমি’র প্রতিবেদন।
 হাংরি জেনারেশনের কবি-লেখকরা বলেছেন কথা চালিয়ে যাবার কথা। বলেছেন যে কথার শেষ নেই।
 নিয়েছেন শব্দার্থের ঝুঁকি। রচনাকে মুক্তি দিয়েছেন আত্মমনস্কতা থেকে। 
হাংরি জেনারেশনের এই কৌম মূল্যবোধ গ্রহণ করে নিয়েছেন পরবর্তীকালের কবি-লেখকরা।
 এই প্রভাব সামাজিক স্তরে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ।

❑ হাংরি জেনারেশনের পূর্বে নাক-উঁচু সংস্কৃতির রমরমা ছিল, প্রান্তিককে অশোভন মনে করা হতো,
 শ্লীল ও অশ্লীলের ভেদাভেদ করা হতো, ব্যবধান গড়ে ভেদের শনাক্তকরণ করা হতো। 
হাংরি জেনারেশনের কবি ও লেখকরা সংস্কৃতিকে সবার জন্য অবারিত করে দিলেন।
 বিলোপ ঘটালেন সাংস্কৃতিক বিভাজনের।

হাংরি আন্দোলনকারীদের সাহিত্যের ভাষা আসলে ভূমিকম্পের মতো। 
সেই ভূমিকম্প প্রচলিতের ভিতে আঘাত করেছিল, ক্ষত সৃষ্টি করেছিলো। 
যার আফটার এফেক্টে একপ্রকার উপকার হয়েছে বাংলা সাহিত্যের। 
সর্বোপরি সাহিত্যের সরলরৈখিকতাকে ভেঙ্গেচুরে ফেলতে এরকম আরো আন্দোলন বাংলা সাহিত্যে জরুরী।

লিখেছেন আলী হায়দার শেখ আবদুর রহমান। 

মঙ্গলবার

মলয় রায়চৌধুরীর 'নখদন্ত' - ডকুমেন্ট অব আ ট্র্যাজেডি টু বি কন্টিনিউড : শর্মিষ্ঠা ঘোষ




টাইপ এ : লেখক কাহিনী বুনবেন মনগড়া কিংবা তাও ঠিক নয় , কতগুলো জেনারেল হ্যাপেনিংস বা প্রোবাবিলিটির ওপর । চারপাশের বস্তু ও প্রাণীজগৎ কে ঘিরে ।

টাইপ বি : লেখক ডিটো ভাষ্য দেবেন সাংবাদিকের নির্লিপ্ততায় যা ঘটেছে ও ঘটছে চেনাজানা চৌহদ্দিতে ।

টাইপ সি : লেখক সত্যতথ্য ভিত্তিক ও গবেষণালব্ধ ফ্যাক্ট ফাইন্ডিংসকে বীভৎস বা করুণ রসে জারিত করে নাটকীয় ভাবে পরিবেশন করবেন ।

টাইপ ডি : এইসব উপরিউক্ত বৈশিষ্ট্যের সম্মেলনে লেখক কথাকারের ভণিতা সহ পেশ করবেন । কতগুলি তথ্যের আগে পিছের কার্যকারণ তুলে ধরবেন । সামাজিক অর্থনৈতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং নিজস্ব ধ্যান ধারণা বিশ্বাস পছন্দ অপছন্দের আলোতে বিশ্লেষিত একটি বিশ্বাসযোগ্য উপস্হাপনা সেটি ।

মলয় রায়চৌধুরীর সম্পর্কে কিছুই না জেনে পড়তে বসেও মামুলি পাঠক চতুর্থ শ্রেণীভুক্ত করবেন তাঁকে ।
"নখদন্ত" শুরু ও শেষ হয় ডায়েরির মেজাজে , তার সাথে জুড়ে যায় কথকের নিজস্ব লেখন জগৎ , পর্যালোচনা , কাহিনী প্রসঙ্গে উঠে আসে রাজ্য রাজনীতি , অর্থনীতি , সমস্যা , অন্যায় , বঞ্চনা , শ্রমিক শ্রেণী বিশেষত পাট শিল্পের সমস্যা জনিত ঘটনাবলী । সত্য ঘটনা নির্ভর এক নিটোল গল্প যা একইসাথে একজন গবেষকের কাছেও যথেষ্ট আদরণীয় হতে পারে দ্বিবিধ কারণে । প্রতিষ্ঠান বিরোধীতার সাবটেক্সট , পোস্টমডার্নিজম ইত্যাদি নিয়ে আগ্রহীরা আবার পাশাপাশি একটি উচ্চমানের গবেষণালব্ধ তথ্যাবলী সমৃদ্ধ লেখা হিসেবে ।

সাধারণ ফিকশান ক্যাটেগরিতে ফেলতে গিয়ে এ লেখা এ কারণেই বাঁধে । আবার পাঠক 'মামুলি' এই কথা পলিটিক্যালি কারেক্টনেসের উর্দ্ধে উঠে বলা , কারণ জ্ঞানত এক শ্রেণীর পাঠক বিদ্যমান যারা বিস্তর তত্ত্বকথা ঠোঁটস্হ করে একটি টেক্সটের কলকব্জা ঢিলে করে অমুকবাদ তমুকবাদ কপচান । লেখক যখন ছকভাঙা কিছু দিয়ে জোর ধাক্কা মারতে চাইছেন তিনি এমন জ্ঞানপাপী পাঠককেই অধিক সমাদর করে থাকেন , তাতে মামুলি পাঠকের পাঠ প্রতিক্রিয়ার বিস্ময়বোধে বা ইস্থেটিক প্লেজারে কোন ঘাটতি পড়ে না । আর্টস ফর আর্টস সেক কথাটি তারা সিংহাসনে বসান বেশ নমো করেই । নৈকট্য না থাকুক , স্বীকৃতির অভাব তাদের শত্তুরেও খুঁজে পাবে না ।

তো , আমি এহেন গোলা পাঠক মলয় রায়চৌধুরী পাঠ করেছি আমার মত করেই , ডিকনস্ট্রাকশন করেছি আমার সাধ্য অনুযায়ী , ইউনিটি অব টাইম প্লেস অ্যাকশান মান্য করল কি করল না ভাবা বাদ দিয়ে বা ফার্স্ট পার্সন ন্যারেটিভের একটি বিপজ্জনক প্রবণতা , নিজ মতবাদের প্রতিফলন কাহিনী থ্রেডকে প্রভাবিত করতে পারে এই আশঙ্কা সাময়িক ভাবে সরিয়ে রেখে । রোমান এ ক্লেফ না বিলডানসরোমান তর্কাতর্কির পরেও যে সংবেদনশীলতা ভিখারি পাসওয়ান কেসের আগে পরে একটি তৃতীয় নয়নের উপস্হিতি মহাকালের দৃষ্টি না এড়ানো নেমেসিস হয়ে আসে তা অস্বীকার করা যায় না ।

পাট শিল্পাঞ্চলের এ টু জেড গুলে খেয়ে কঠোর পরিশ্রমের তথ্যকে শিল্পসম্মত উপস্হাপনের তোয়াক্কা না করেই জিরো নম্বর হয়ে যাওয়া মানুষগুলোর জন্য নরম একটা দুঃখবোধ মধ্যবিত্ত বাবুপাঠকের গালে বেশ ঠাস ঠাস করেই লাগে । জ্ঞানচক্ষু উন্মীলনের পাশাপাশি সুখি সুখি খাঁচার তোতার জীবন থেকে একেবারে আছড়ে পড়ে শব্দবানে । কোন রেয়াত নেই বিদগ্ধ জননেতাদের । কোন ছাড় নেই ডান বাম মধ্যবর্তী মতবাদের ধ্বজাধারীদের । কারণ পাটশিল্পের অবনমনের জন্য পাটকল ও উৎপাদক অঞ্চলের অবস্হানগত বিপ্রতীপ যতখানি দায়ী কোন অংশে কম দায়ী নয় রাষ্ট্রযন্ত্রের ক্যালাসনেস ও তাদের ডানহাত বাঁহাত মুষ্টিমেয় চালিকাশক্তি বনিক সম্প্রদায় । ক্রমাগত হাতবদল হওয়া মালিকানা , লিজ , পি এফ , গ্রাচুইটি মেরে পালিয়ে যাওয়া মালিক , কাঁচামালের নয়ছয় , কমিশন লোভী মধ্যস্বত্বভোগী , পচাগলা ট্রেড ইউনিয়ন লিডারশিপ , ঘুষের চক্করে ইমান বেচার দল , শুধু পাট কেন চোখ বুলালে চা শিল্পেও একইপ্রকারে বর্তমান ।

দু একটি ফেনোমেনা বাদ দলে উত্তরবঙ্গের বাসিন্দাদের কাছে এ ছবি চেনাই লাগবে । সময়টা আগে পিছে যেদিকেই গড়াক , শাসনে নীল লাল যে অবতারই থাকুক না কেন , বনাঞ্চলের অধিকার নিয়ে লড়াই করা লীলা গুরুং , ন্যায্য মজুরীর দাবীতে উত্তরকন্যা অভিযানে যাওয়া চা শ্রমিক , রেশন , পি এফ , গ্রাচুইটি হজম করে ফেলা বাবুলোগ , শাসকের ভয়ে টেবিলের নীচে লুকোন পুলিশ কোন জাপানী তেলে শ্রমিকদের শান্তিপুর্ণ আন্দোলনে ক্ষ্যাপা কুত্তা হয়ে ওঠে আজ ভৌগোলিক প্রেক্ষাপটের পরিবর্তনে বা সময়ের ব্যবধানে মলয় রায়চৌধুরী এবং একটি গোলা পাবলিকের অনুভবকে একই বিন্দুতে দাঁড় করায় ।

কিন্তু দিন শেষে তিনি মলয় রায়চৌধুরী । তাঁর প্রকাশ, তাঁর চলন, তাঁর ধার-ভার-নীরীক্ষা আলোচনাযোগ্য হয়ে ওঠে যথাযোগ্য কারণেই । ঘটনাচক্রে কাহিনীর সময় থেকে আজ পর্যন্ত অনেক জল গড়িয়ে গেছে , পাঠক দেখে ফেলেছে একের পর এক লোকোমোটিভ কারখানা , কার ফ্যাক্টরিস, ছোট বড় কাপড়ের কল , কাগজ কল , ইস্পাতের যন্ত্রাংশ , রং , নানাবিধ ফুড প্রোডাক্ট তৈরীর কারখানা লালবাতি জ্বেলেছে , গনেশ উল্টেছে এবং লক্ষ লক্ষ শ্রমিক ক্ষেত মজুর , জনমুনিষ , কুলি , ভিখিরি , চোর , ডাকাত , দেহোপজীবী , ফেরিওয়ালায় পরিণত হয়েছে , নিজ রাজ্য ছেড়ে পাড়ি জমিয়েছে দিল্লি , মুম্বাই , কেরল , অন্ধ্রপ্রদেশ এমনকি একটি দীর্ঘকালীন রাজত্ব করার কারণে ঘুণ ধরে যাওয়া শাসনব্যবস্হার শেষে নব্যজমানা শুরু হয়ে প্রায় এক দশক হতে চলেছে তখনও বিহার থেকে আগত , ঝাড়খন্ড থেকে আগত একসময়ের কাজহারানো পাটকল শ্রমিকদের কিস্যা অনেকটাই গা সওয়া লাগে । থার্ড ফোর্থ ফিফত ডিগ্রী পুলিশি টর্চারের সামনে আজ যখন আন্দোলনরত শিক্ষিত বেকারও অহরহ পড়ে সেই বিস্ময় সেই নৃশংসতা জনিত শিহরণ অনেকটাই প্রশমিত হয়ে যায় ।

তবু টাইম ডকুমেন্টেড এ লেখা তার নিজস্ব গুরুত্ব বজায় রাখবে ঐতিহাসিক কারণেও বটে । "ইতি শ্রী শ্রী পশ্চিমবঙ্গের সাতকাহন শেষ হইল " , না , আসলে শেষ হয় নি , কারণ একটা পিরিয়ড মাত্র শেষ হল , তাও আংশিক কারণ গোটাটাই অন্ধকারের চলাফেরা হতাশা আর ক্রোধজনিত মনোলগ , যা হারানো ডায়েরির পাতায় ফিরে আসে । শেষ হয় না , কারণ লেখক বর্তমান , শেষ হয় নি তাঁর দেখা শোনা । শেষ হয় নি পশ্চিমবঙ্গীয় কিস্যা ।

পালা বদল হয়েছে মাত্র , বদলায় নি কিছুই । যে ভাষ্যের কোন চরিত্র বলে , " খ্যাংরা কাঠির ওপর আলুর দম মার্কা এক নেতার জন্যেই পশ্চিমবঙ্গে তিরিশ বছর কম্পিউটার ঢুকতে পারেনি । তাই আজ মাথায় করে টাইপরাইটার বয়ে পরীক্ষাকেন্দ্রে যেতে হচ্ছে , " সে আসলে থেমে গেছে সেই নেতার জমানা শেষ হবার বহু আগেই । নোট আছে ডায়েরির পাতায় পাতায় যেমন থাকে । যেন মুখবন্ধ । কী কেন তার কৈফিয়ত । " 1.ইনভেন্ট আইডিওলজি টু সাপোর্ট অ্যাকশান । 2. ব্লেমিং আদার্স অর ইভেন্টস নট রিলেটেড টু ইউ ফর ইয়োর মিজারি ইজ এ ফয়েল অব ইয়োর উইথড্রল ফ্রম দি ওয়ার্লড । ... 4. কালচার ডাজ নট সিম্পলি রেসপন্ড টু পাওয়ার , ইট শেপস দি মরাল ওয়ার্লড ইন হুইচ পাওয়ার ইজ এক্সারসাইজড অ্যান্ড এনকাইনটার্ড । 5. সিডাকটিভ ডিগ্রেডেশান অব নলেজ । রিভাইভ ইয়োর প্রিডিলেকশানস । 6. অল পলিট্কাল অ্যাকশান গেটস সেল্ফ কনট্যামিনেটেড ।" যেন কোন বর্ণনার প্রেক্ষিত ও বর্ণনাকারীর নিউট্রালিটিটা ঘোষণা করা বেশ জরুরী । "

1. দি পাস্ট শুড বি অলটার্ড বাই দি প্রেজেন্ট অ্যাজ মাচ অ্যাজ দি প্রেজেন্ট ইজ ডায়রেক্টেড বাই দি পাস্ট । 2. মেমরি অবস্কিয়র্স ট্রুথ ।" যেখানে তিনি লিখছেন দেয়াল লিখনের কথা , ভুল হাতে পড়ে একটা স্বপ্নের অপমৃত্যুর পর নির্মম রসিকতা ," কমরেড তুমি আর গাঁড় মারবে না ? এখনও অনেক ...ইয়ে ...রয়েছে বাকি ।" হয়তো তখন ভাবা যায় নি দুহাজার আঠেরোর পশ্চিমবঙ্গে আরো অনেক নতুন নতুন শিল্পে লালবাতি জ্বলবে , কম্পিউটার আর ই জমানার মানুষও সমানভাবে খিস্তি করবে নতুন কোন লিডারকে , সমান প্রযোজ্য হবে , "

মিলের শপফ্লোরে জঙ্গল , দেয়ালে দেয়ালে কত সে অশথ গাছ । রাত্তিরে তোলাবাজ আর মস্তানদের অঙ্গনওয়াড়ি । আলোর বালাই নেই । লাখ লাখ ট্যাকার বিদ্যুৎ বিল বাকি । লাইন কাইট্টা দিসে । বাইরে দেয়ালে আর স্লোগান নাই । ঘুঁটের পর ঘুঁটের পর ঘুঁটে , তারপর ঘুঁটে , আবার ঘুঁটে । আমাগো ন্যাতা সাইনবোর্ড লয়্যা অননো মিলে গ্যাসেন গিয়া ... কবে যে মিলের জমিডা বিক্রয় হইব ।" কোথাও কি বদলেছে বিরোধী বা প্রতিবাদীদের ওপর শাসকদলের উস্কানিতে পুলিশি নির্যাতনের ইতিবৃত্ত ? এখনো কি হরহামেশা এসবের পর কর্তাদের নেতাদের বলতে শোনেন না " ওই ঘটনার কতা আমার জানা নেই । তবে খোঁজ নিচ্ছি " ? নির্বাচন চলাকালীন পোলিং অফিসার কে তুলে নিয়ে গিয়ে খুন করে রেল লাইনে ফেলে দিয়ে আত্মহত্যা বলে চালাতে দেখেন নি সম্প্রতি ? সেন্ট পলস এর ফেস্টে হাজার হাজার টাকা তোলা তুলছে না ইউনিয়ন ? অধ্যাপক , শিক্ষকদের গান পয়েন্টে হেনস্হা ঘটছে না প্রায় রোজ ? ঘটছে । কারণ রাজ্যটার নাম যাই হোক না কেন , কোন জায়গাতেই ফর দ্য পিপল , অব দ্য পিপল , বাই দ্য পিপল কোন ব্যাপার নেই , সংবিধানে সে যাই দাবী করা হোক না কেন ।

তাই মলয় রায়চৌধুরীর রাগ ক্ষোভ ব্যঙ্গ যতই পার্টিকুলার আইডিয়ালস বা লাইন অব পলিটিক্সকে আক্রমণ করুক না কেন , কোন আইডিয়াল রিপাবলিক বা ইউটোপিয়া খুব রিজনেবল চাওয়াও নয় । তাই পিরিয়ড পিস হিসেবেই বা শুধু বলি কেন এই টেক্সটকে , মাৎস্যন্যায়ের সর্বলক্ষণ বুকে করে চলা এক মায়া সভ্যতা সে নিজেকে টেনে নিয়েই চলে , ক্ষইতে ক্ষইতে , না ফুরোতে ফুরোতে , কাংগাল চামার বা সত্য আচার্যরা আজও নাম বদলে ধাম বদলে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে চলেছেন । আঠেরোটা ইউনিয়ান সেদিন যে সর্বনাশ করেছে আজ একটিমাত্রই কাফি । চাকরির পরীক্ষা দিতে জড়ো হওয়া টাইপরাইটার মাথার বেকারদের মহামিছিল শুধু বদলে গেছে কম্পিউটার জানা বেকারদের আত্মহত্যায় , ঘুষ দিতে না পারার আর লিডার ধরতে না পারার ব্যর্থতায় । হাসপাতালের ঘোষণা করা মরা বাচ্চা আজও দাফন করতে গেলে নড়ে ওঠে , মানুষের হাসপাতালে কুত্তার ডায়ালিসিস হয় , কোটি কোটি টাকার ওষুধ নয়ছয় হয় , পোড়াতে হাসপাতালের পর হাসপাতালে আগুন ধরানো হয়,  আজও জঙ্গমহল হাসছে বিজ্ঞাপনের পেছনে, না খেতে পেয়ে শবররা মরে যায় , নতুন নতুন কলকারখানা বন্ধ হয় রোজ আর সেসব সারানোর গুণিনরা বিষধর । " তারা যত বিষ ঝাড়েন তত বিষ বাড়ে । কত - কত বক্তৃতা আর ভাষণ ঝাড়েন সেসব গুণিনরা , গম্ভীর মুখে , নাক ফুলিয়ে , যন্তরের মতন বকরের পর বকরের পর বকর ।"

কই কিছুই তো একচুল বদলায় নি , সাদা ধুতি গিয়ে সাদা শাড়ি এসেছে , সর্বহারার নেতার বদলে হাওয়াই চটির নেত্রী এসেছে , পশ্চিমবঙ্গের 'বাংলা' নাম না রেখে "রসাতল" রাখার দাবীটি মোটেও বদলায়নি । সব 'নখদন্ত' নিয়ে বিদ্যমান । মলয় রায়চৌধুরী যদি প্রতিষ্ঠান বিরোধীতার ঐতিহ্য এখনো বর্তমান রেখে থাকেন আমরা নিশ্চয়ই এর একটি সিকুয়েল আশা করতে পারি !

পৃথা রায়চৌধুরী : মলয় রায়চৌধুরীর কবিতা




বিতর্ককে নস্যাৎ করে কজন হয়ে উঠেছেন নিজস্ব ঘরানার ব্র্যান্ড নেম? বিতর্ককে কবচকুন্ডল করেই আজও তিনি সোজা কথায় বলেন:

“একাই লড়েছিলুম।
কেউ বলেনি ‘হোক কলরব’
একাই নেমেছিলুম ব্যাংকশাল কোর্টের সিঁড়ি বেয়ে
সেদিন একাই ঘুরেছিলুম কলকাতার পথে সকাল পর্যন্ত” 

তাই তো মলয় রায়চৌধুরী হাজার কোটি মেকিদের থেকে এতটা ওপরে। একাই লড়েছেন আর জিতে গেছেন, আমাদের অনেকেরই ক্ষমতা নেই এভাবে রুখে দাঁড়াবার। নিজের প্রতি, নিজের কবিতার প্রতি, সৎ থাকতে তিনিই পেরেছিলেন, পেরেছিলেন নির্দ্বিধায় সাহিত্য অ্যাকাডেমি সহ বহু পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করতে।
“আমি লক্ষ্মীকান্ত, মহারাজা প্রতাপাদিত্যের অমাত্য, সাবর্ণ গোত্রের যোদ্ধা
আজ পর্যন্ত কেউ তরোয়াল চালানোয় আমাকে হারাতে পারেনি
কতো মুণ্ড এক কোপে ধরাশায়ী করেছি তার গোনাগুন্তি নেই
আমার বংশধরেরা তাই করবে একদিন, প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে–
ঘোড়ার পিঠে বসে চালাবে তরোবারি, যারাই সামনে আসবে মূর্খ মুণ্ড
গলা থেকে কেটে ফেলবে ধুলায়, সেসব মুণ্ড বেঁচে থাকবে, কথা বলবে
দরবারে গিয়ে যে-যার লেজটি নাড়িয়ে রাজা বা রানির সেবাদাস হয়ে
সারটা জীবনভর ঘেউ-ঘেউ করে ক্রমে-ক্রমে জীবাশ্মের রূপ নেবে”

লাইন কটা তুলে নিয়েছি ‘আমি লক্ষ্মীকান্ত, মহারাজা প্রতাপাদিত্যের অমাত্য’ কবিতা থেকে, শিহরিত হয়েছি বারবার এই কবিতা পড়ে, মনে মনে বলেছি, “যথার্থ! যথার্থ বলেছো মলয় রায়চৌধুরী, নিজের বংশগৌরবে গৌরবান্বিত তুমি। সেই আপোষহীন উচ্চশির লক্ষ্মীকান্তের বংশধর তুমি । সাবর্ণ রায়চৌধুরী বংশের ৩৪তম উত্তরপুরুষ, প্রতি পদে রয়েছো আপোষহীন, নির্ভীক।” ১৬ই জুলাই, ২০১৭ এই কবিতা আমি পড়ি ফেসবুকেই মলয় রায়চৌধুরীর পোস্টে। কবিতায় সাবর্ণ রায়চৌধুরীদের ইতিহাস জীবন্ত হয়ে উঠছে প্রতি শব্দে, ছত্রে আর আমাকে বলেছে, “চিনে নে!” এই কবিতায় কিন্তু আমরা কবির ভেতর দিয়েই মানুষটাকেও দেখতে পাচ্ছি, চিরকালের প্রাতিষ্ঠানিকতায় মাখানো অন্যায়ের বিরুদ্ধে মুখর হয়ে ওঠা, একা লড়াকু মানুষটা, যার হাতের কলম বরাবর তরোয়ালের মতোই ঝলসে উঠেছে, ফালাফালা করে দিয়েছে যা কিছু বস্তাপচা।
না, এখানে মানুষ মলয় রায়চৌধুরীকে নিয়ে মোটেই আলোচনা করতে বসিনি, সেই স্পর্ধা আমার নেই, মনে মনে কেবল এই ভেবে গর্বিত হই, এই মহান কবি, সম্পর্কে আমার জ্যাঠাশ্বশুর হন, আর এঁর লেখা পড়ে পড়ে শিউরে উঠি কেবল। নিজে যেহেতু কবিতা লিখি, তাই বিশেষ করে পড়ে ফেলি ওঁর কবিতা, বুঝি, কতটা আপাত সরল ভাষ্যের ভেতর দিয়ে উনি নিংড়ে বার করে আনেন মানুষের ভেতরের সমস্ত দ্বিধা, দ্বন্দ্ব, জটিল ভাবনা বা চলতে থাকা নানান সংঘাত। বসেছি জেঠুর কবিতা সম্পর্কে সামান্য দুকলম লিখতে,  কিন্তু প্রতি পদক্ষেপে যেন মনে হচ্ছে কবি মলয় রায়চৌধুরীর কবিতার সামনে আমরা সকলে এতোটাই ছোটো, যে তাঁর সব কবিতা নিয়ে আমরা আলোচনা তো করতে পারি, কিন্তু তা হয়ে দাঁড়ায় সুউচ্চ পর্বতের নীচে দাঁড়িয়ে ঘাড় উঁচু করে পর্বতশৃঙ্গের ভয়াল সৌন্দর্যকে ব্যাখ্যা করার সমতুল্য।
কবি তাঁর বহু বিতর্কিত ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতা লেখার ‘অপরাধে’ অশ্লীলতার দায়ে কারাবাস করেন, এ কথা সাহিত্য জগতের প্রতিটি মানুষ জানেন, এই কবিতা নিয়ে আজও প্রতিনিয়ত সাহিত্য সংক্রান্ত গবেষণা করা হয়, আন্তর্জাতিক স্তরেও। যা এককালে কবিকে অপমানজনক পরিস্থিতিতে দাঁড় করিয়েছিল, তা এখন একপ্রকার কিংবদন্তী। বড়ো বেশি শরীরধর্মী, যৌনতার আঁশটে ভাষায় লেখা এই কবিতা পড়ে আপাতভাবে শ্লীল সমাজ চোখে-মনে কাপড় বেঁধে গান্ধারী হয়ে যান আজও, অথচ কবিতাটির ভেতর যে চরম যন্ত্রণার প্রকাশ, তা বুঝে নিতে পারলে, এই কবিতা হয়ে ওঠে অমৃত, আপাত অশ্লীল ভাষ্যের গরল মন্থন করে পাঠক পেয়ে যান অমৃত। যন্ত্রণা অপরিসীম, কবিতাটির নিচের কটি লাইনে…

“প্রতিটি শিরা অশ্রুস্রোত বয়ে নিয়ে যাচ্ছে হৃদয়াভিগর্ভে
শাশ্বত অসুস্থতায় পচে যাচ্ছে মগজের সংক্রামক স্ফুলিঙ্গ
মা, তুমি আমায় কঙ্কালরূপে ভূমিষ্ঠ করলে না কেন ?
তাহলে আমি দুকোটি আলোকবর্ষ ঈশ্বরের পোঁদে চুমু খেতুম
কিন্তু কিছুই ভালো লাগে না আমার কিছুই ভালো লাগছে না”
আবার কতটা তীব্র ব্যথা অনুভব হলে কবি এমন অস্থির ভাবে লিখতে পারেন,

“আমি আমার নিজের মৃত্যু দেখে যেতে চাই
মলয় রায়চৌধুরীর প্রয়োজন পৃথিবীর ছিল না
তোমার তীব্র রূপালি য়ুটেরাসে ঘুমোতে দাও কিছুকাল শুভা
শান্তি দাও, শুভা শান্তি দাও”… 

পাঠক ঢুকে যান কবিতার ছত্রে ছত্রে রন্ধ্রে রন্ধ্রে, কি মারাত্মক আঘাত করেছেন কবি প্রতিষ্ঠানকে, ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে দিয়েছেন চাঁদ-তারা-নদী-তুমি আমি-ফল্গুধারা কাব্যভাষাকে। আর এই প্রচণ্ড বেগে হুড়মুড়িয়ে ঢুকে আসা কর্কশ সপাট কবিতাকে হজম করে নিতে তখনও বহু মানুষ পারেননি, আজও অনেকে পারেননা, বলাই বাহুল্য।
ঝলসে দেওয়া কবিতার কণ্ঠ তাঁর হয়তো ছোটবেলার অস্বাচ্ছন্দের জন্য বেড়ে ওঠা ক্ষোভ বিদ্রোহ ভরা বুকের একেবারে ভেতরের অনুভূতির জন্য। আবার এই কবিই ‘আমার জন্মদিন নেই’ কবিতায় লিখে ফেলেন,

“ঠাকুমা কবে জেঠা আর বাবাকে প্রসব করেছিলেন 
তার তিথি ঠাকুমা জানেন
প্রসবদিন পালনের তো কোনো রেওয়াজ নেই
তাই মা আমাকে কোন তিথিতে প্রসব করেছিলেন জানি
মায়ের কষ্টের গল্প জানি
হাসপাতালে ভর্তির গল্প জানি
কিন্তু আমার জন্মদিন জানি না”…
সাধারণ পাঠক আমি, কবির অন্তরাত্মা ছুঁয়ে বলি, এতটাও নরম ভাব এই রুক্ষ জমিতে থাকে ! কেবল বারুদ আর লাভা নিয়ে যে কবির বিচরণ, তার ভেতরের প্রকৃত মানুষের হৃদয় কে-ই বা সহজে বুঝেছে!
পাঠক যেন ক্রমাগত তড়িতাহত হতে থাকেন তাঁর বিজলীসম কবিতায় । কবির তাৎক্ষনিক মনের ভাব, চঞ্চলতা তিনি প্রকাশ করেন  ভিন্নধর্মী কবিতায়। আবার এই তিনিই ‘নখ কাটা ও প্রেম’ কবিতায় হঠাৎ লিখে ফেলেন, বলা ভালো প্রশ্ন করে বসেন,

“রবীন্দ্রনাথ, দেড়শ বছর পর একটা প্রশ্ন আপনাকে :
কে আপনার নখ কেটে দিত যখন বিদেশ-বিভুঁয়ে থাকতেন–
সেই বিদেশিনী ? নাকি চৌখশ সুন্দরী ভক্তিমতীরা ?” 

ভাবা যায়? নেকুপুষু প্রেমের কবিতা লিখে তুলতুলে ভাব ভাগ্যিস তিনি তাঁর কবিতায় আনেননি। বরাবর প্রথাভাঙ্গার নিদর্শন হয়েছে তাঁর প্রায় প্রতিটা কবিতা। কি অসামান্য প্রেম দেখিয়েছেন তিনি তাঁর ‘বুড়ি’ কবিতায়। গভীর প্রেম এই কবিতায়।

“এও আমাকে বলে এবার ঘুমোও
আর রাত জাগা স্বাস্হ্যের পক্ষে
খারাপ, এই বুড়ি যে আমার বউ
বিছানায় শুয়ে বলে, কাউকে নয়
কাউকে দিও না খবর, কারুক্কে নয়–
এ-কথাটা আমারই, কাউকে নয়
কারুক্কে বোলো না মরে গেছি ।“ 


মন খারাপ করে, গলায় ব্যথা-ব্যথা কষ্ট হয়, অথচ কি চরম প্রেম ! গভীর অনুভূতি, পরম ভরসা ফুটে ওঠে, প্রতি ছত্রে। বিষাদেরও যে এমন মিঠে সোয়াদ, তা বোধহয় এই কবিতা পড়লে তবেই বোঝা যায়। এ যেমন একাধারে প্রেমের কবিতা, তারই সাথে এ চিরশাশ্বত মৃত্যুচেতনার কবিতা। আমরা ভাবতে বাধ্য হই, এই এত আঁকড়ে থাকা, এত ভালোবাসা, এত জীবন প্রাচুর্যের মাঝেও মৃত্যুচেতনা কতটা ঘিরে রাখে আমাদের অবচেতন।
মলয় রায়চৌধুরীর দাদা,  অর্থাৎ স্বর্গত সমীর রায়চৌধুরীর মৃত্যুর পরের দিন লেখা কবির যে কবিতা, ‘সেন্স অফ লস’ এর স্তবগান’, তা যেন পাঠককে কবির জায়গায় বসিয়ে দেয়,

“কাল বাইশে জুন, ২০১৬, সকাল আটটা পনেরোয় দাদা মারা গেছেন 
দাদা সমীর রায়চৌধুরী”…………
“কাল, বাইশে জুন ২০১৬, সকাল আটটা পনেরোয় দাদা মারা গেছেন 
দাদা মানে মিনু” 

 
কবিতার প্রথম লাইন কবিতার মাঝামাঝি আবার ফিরে এসেছে। প্রথম লাইনের পরে এসেছে প্রয়াত দাদার পোশাকি নাম, আর মাঝখানে এসেছে দাদার ডাকনাম। এইভাবে একই লাইনের ব্যবহারে, অথচ দুবার দুরকম নামের ব্যবহারে আমরা আসল ‘সেন্স অফ লস’ বুঝতে পারি। বুঝতে পারি, কতটা জড়িয়ে রাখেন কবি তাঁর সদ্যপ্রয়াত দাদার স্মৃতি, কতটা হারাবার বোধ পীড়াদায়ক হয়ে উঠেছে কবির কাছে।


হাংরি আন্দোলনের সময়ে লেখা ‘জখম’ কবিতাটি মলয় রায়চৌধুরী এইভাবে আরম্ভ করেছেন :
“চাঁদোয়ায় আগুন লাগিয়ে তার নীচে শুয়ে আকাশের উড়ন্ত নীল দেখছি এখন
দুঃখ-কষ্টের শুনানী মুলতুবি রেখে আমি আমার সমস্ত সন্দেহকে জেরা করে নিচ্ছি
হাতের রেখার ওপর দিয়ে গ্রামোফোনের পিন চালিয়ে জেনে নিচ্ছি আমার ভবিষ্যত” 

হাংরি জেনারেশানের পুরোধা কবির নিজের বিশেষ প্রিয় কবিতা ‘জখম’ থেকে নেওয়া এই কটা লাইনে দ্রিম দ্রিম করে শুরুয়াতি সুর শোনা যায় এক অনন্ত ক্ষুব্ধ আহত অস্থির কণ্ঠের কবিতার। ‘জখম’ ভর্তি কবি হৃদয় থেকেই কাব্যধারায় বেরিয়ে আসে এই অনন্ত শোণিতাভ দীর্ঘ কবিতা, কবিতায় বারবার প্রয়োগ হয়েছে তাঁর নিরীক্ষার বিশেষ বানানরীতি…

“বুকের বাঁদিকের আর্মেচার পুড়ে গেছে বহুকাল
এখন চোখ জ্বালা কোর্ছে  মলয়ে কঙ্কাল জ্বালানো ধোঁয়ায়
আশপাশ দিয়ে ঘণ্টায় ৯৯ কিলোমিটার দরে উড়ে যাচ্ছে বদমতলব ঝড়
কব্জিতে ঘড়ির কাঁটা রেখে চলে যাচ্ছে সারসার সমদ্বিঠ্যাঙ মানুষের লাভলোক্সানময় দল”

আবার কি অনায়াস উচ্চারণে কবি তাঁর লেখা অবিস্মরণীয় ছত্রগুলোর ইংরেজি অনুবাদ করেছেন সময়ে সময়ে…
“armature on thye left turned slag long ago
now eyeflesh twitching in the smoke of malay’s burning
skeleton
dismantled tempests sweep by at 99mph
uniform queues of wristwatched zombies tattle”


রাজনৈতিক বা তৎকালীন সাম্প্রদায়িক যতো অসহিষ্ণুতা এবং অস্থিরতা যেন ফুটে ওঠে এই ‘জখম’ ভর্তি কবিতায়। যা তখন সত্যি ছিল, তা আজও চরম প্রাসঙ্গিক। তাই এটুকু বলাই যায়, কবি মলয় রায়চৌধুরী সময়ের থেকে এগিয়ে গিয়ে নিজের অন্তঃস্থল খুঁড়ে, সচেতনভাবে মানুষের কথা বলে যান তাঁর কবিতায়। তিনি কাব্যকথায় মানুষের অবচেতনের সমস্ত কথা এবং সচেতন যাপনের সার কথা সমস্তই বলে যান অকপট ভাবে।
এই কবি তাঁর কবিতা সম্পর্কে বলেছেন, তাঁর “কবিতা পায়”; ঠিক মানুষের বাকি সব পাওয়ার মতোই কবিতাও পায়। কবিতার সাথে কতটা ওতপ্রোত ভাবে সম্পৃক্ত হলে একাত্মতা থাকলে এবং কবিতার প্রতি একনিষ্ঠ থাকলে কেউ এই কথা বলতে পারেন, তা সাধারণের পক্ষে বোঝা হয়তো দুষ্কর। গতানুগতিকতার মন্থর চালে চলে আসতে থাকা বাংলা কবিতার রক্ষণশীল বেড়াকে তিনি তাঁর কথ্যভাষার বম্বশেলে গুঁড়িয়ে দিতেই “গেল গেল” রব যেমন উঠেছিলো, সেই রবের কারণগুলোকে কিন্তু লুকিয়ে-চুরিয়ে হলেও পড়ে ফেলত গোঁড়া বাঙালি । ভাষা সাহিত্যের তথাকথিত এলিট ক্লাস সেসব না পড়ে ফেললে, নিজেদের টলোমলো আসন সামলে রাখার জিগিরে কীভাবে  গেল-গেল রবের হিড়িক তুলতেন?
ভয় পেয়েছিলেন কি এই আগুন কলমকে তাঁরা?

সম্প্রতি পড়লাম তাঁর কবিতা ‘রাষ্ট্রের বহি-খাতা’; পড়েই নিজেকে এবং অসংখ্য মানুষের অত্যন্ত সমস্যাসংকুল জীবনের এক মোক্ষম প্রশ্নের সম্মুখীন দাঁড়াতে হল, আমরা কি হরেদরে সকলেই এই সাংবিধানিক গণতন্ত্রের চাকার চোখে নিজের দেশে অভিবাসী মাত্র? আমাদের নাগরিকত্ব, আমাদের স্বদেশের শেকড় কি কেবল সরকারের ঠাপ্পা মারা, সরকারী শিলমোহর আঁকা কয়েক টুকরো কাগজের মুখাপেক্ষি?

 দলিল থাকলেও ফেলে দিতুম, তবে দলিলের জেরক্স 
দেখেছিলুম, ষোড়শ শতকের কারোর ফার্সিতে লেখা নাম 
এখন রাখি কেমন করে প্রমাণ করবে যে ষোড়শ শতকের
সেই পূর্বপুরুষে ওর রক্তের শেকড় রয়েছে?  
বাড়ির ট্যাক্স বাবা দিতেন, তার আগে দাদু
দাদুর বাবা, তার আগে নবাবের খাজনা–
বিলডার ঘুষের ঠেলা মেরে মালিকানার
সমস্যা সমাধান করে ফেলেছিল 
এখন রাখি কেমন করে প্রমাণ করবে যে
 ভারতের সত্যিকারের নাগরিক?”

রাখি কবির বোন। বোনের ন্যায্য চিন্তার মধ্যে দিয়ে আসলে তিনি প্রতিফলিত করেছেন এই দেশের নাগরিকদের চিন্তাক্লিষ্ট চেহারা।

কবি শ্লেষাত্মক ভঙ্গীতে লিখে ফেলেছেন ‘রাস্তার কবিতা’। তার ছত্রে ছত্রে লেখা আছে, বলা ভালো বয়ান করা আছে আমাদের তুচ্ছতা। আপাতদৃষ্টিতে এখানে যা শুধু কবির দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতির লঘু বর্ণনা, তা আসলে গভীরে ঢুকে নাড়া দেয় আমাদের, বুঝিয়ে দেয়, এইটুকুই আমাদের মূল্য। চোখ বাঁধা অন্ধ আমাদের ঝাঁকুনি দেয় তাঁর সোজা সরল কথ্য ভাষায় লেখা গভীর অর্থবহ সমস্ত কবিতা।

“কাগজ কুড়োনোর কাজ আরম্ভ করে প্রথম ছেঁড়া নোংরা কাগজের টুকরো
তুলেই কাগজটা ছেড়ে দিতে হলো
কাগজটা দিয়ে দিলুম কুড়ানিকে
যে আঁস্তাকুড় থেকে কাগজ বাছাই করছিল
আসলে যে কাগজটা তুলেছিলুম সেটায় দেখলুম
আমারই একটা কবিতা, ‘কালিমাটি’ পত্রিকায় বহুদিন আগে 
প্রকাশিত হয়েছিল
মলয় রায়চৌধুরীর কবিতা নিয়ে লিখতে বসলে সামান্য কটা পাতায় তা সীমিত রাখা বড়ই কষ্টকর, অথচ সুবিশাল কিছু লেখা এখানে সম্ভব না, কারণ তা যে দুতিন পাতার ভেতর লিখতে হবে, তা কবি আগেই বলেছেন। তবুও সামান্য হয়তো বড়ো হয়ে গেল লেখাটা। তাঁর কবিতার কথা বলতে গেলে অবশ্যম্ভাবী ভাবেই আসবে ‘অবন্তিকা’র কথা। এক অনবদ্য প্রেমের কবিতা, ‘মাথা কেটে পাঠাচ্ছি, যত্ন করে রেখো’।

“মাথা কেটে পাঠাচ্ছি, যত্ন করে রেখো
মুখ দেখে ভালোবেসে বলেছিলে, “চলুন পালাই”
ভিতু বলে সাহস যোগাতে পারিনি সেই দিন, তাই
নিজের মাথা কেটে পাঠালুম, আজকে ভ্যালেনটাইনের দিন
ভালো করে গিফ্টপ্যাক করা আছে, “ভালোবাসি” লেখা কার্ডসহ

সব পাবে যা-যা চেয়েছিলে, ঘাম-লালা-অশ্রুজল, ফাটাফুটো ঠোঁট”… 

হেন প্রেমিক বা প্রেমিকা নেই, যার অন্তঃস্থল পর্যন্ত শিরশির করে উঠবে না এই কবিতা পাঠ করে।
“কি-বোর্ডে পাকাচুল পড়ে, তুলো দিয়ে সরিয়ে দিই ; চশমার লেন্সে পাকাচুল পড়ে, মুছে সরিয়ে দিই। তবু লেখালিখি ছাড়তে ইচ্ছে করে না”… সম্প্রতি কবি এমনটাই বলেছেন।

এক সাধারণ গুণমুগ্ধ পাঠিকার আসন থেকে চীৎকার করেছি, আরও, আরও লিখুন কবি, এত লিখুন যে আমাদের মগজের রক্তক্ষরণ যেন বন্ধ না হয়। রক্তের সরোবর বানান আমাদেরই হৃদয়ের ক্ষরণে, সেই সরোবরকে আয়না করে আমরা সকলে উঠে দাঁড়াই ঋজু দৃপ্ত কবিতার কাঁধে ভর করে। তাঁর নিজের ভাষায়, “কবিতা কেবল মঞ্চে বিড়বিড় করে পড়ার ব্যাপার নয়;  উন্মাদের মতো চীৎকার করে না পড়লে প্রতিষ্ঠান কষ্টযন্ত্রণার গোঙানি শুনতে পায় না।” শিখি তাঁর প্রতিটি উক্তি থেকেও। কবি মলয় রায়চৌধুরীর কাছে “কবিতার কোনও সংজ্ঞা নেই, নির্দেশিকা হয় না তাই যা ইচ্ছা, যেমন ভাবে ইচ্ছা লিখুন”… এই মানুষের কবিতা নিয়ে আলোচনা করা কি সহজ কথা? যিনি কবিতাকেই প্রেমিকা করে নিতে পারেন, তাঁর কবিতার কাছাকাছি গিয়ে তাকে স্পর্শ করাই নিজের মধ্যে এক সুবিশাল অর্জন।
“আবলুশ অন্ধকারে তলপেটে লাথি খেয়ে ছিটকে পড়ি
পিছমোড়া করে বাঁধা হাতকড়া স্যাঁতসেঁতে ধুলোপড়া মেঝে
আচমকা কড়া আলো জ্বলে উঠে চোখ ধাঁধায়
তক্ষুণি নিভে গেলে মুখে বুট জুতো পড়ে দু-তিনবার” 


তাঁর ‘আলো’ নামক কবিতার প্রথম চার লাইন উদ্ধৃত করে এই লেখা শেষ করছি। এই কবিতার মধ্যে দিয়ে কবি পেরেছিলেন সামগ্রিকরূপে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসকে ফুটিয়ে তুলতে। রাষ্ট্রের শাসনের নামে যে সন্ত্রাস, যার চাবুকের নীচে আলোহীন বাঁচতে-থাকা বোবা মানুষেরা প্রতিবাদী হলেই, তারা প্রথা ভাঙতে চেষ্টা করলেই, কি কি ঘটে যায়, তা ধরে রেখেছে এই কবিতার প্রতিটি শব্দ। অথচ লড়াকু প্রতিবাদী কবি কণ্ঠ লিখে ফেলে এই কবিতার শেষ লাইন দুটি মূল উপাদান হিসেবে…

“একসঙ্গে সব আলো আরেকবার নিভে গেলে
পরবর্তী আক্রমণ সহ্য করার জন্য নিজেকে তৈরি করে নিই।”

কলকাতার সাহিত্যজগত থেকে দূরে বসে কবি ভারতীয় সমাজের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা থেকে সচেতনভাবে সৃষ্টিতে মেতে লিখে চলেছেন ষাটের দশক থেকে জ্যা মুক্ত তীরের মতো ক্ষিপ্র ধারালো কবিতা। তাঁর লেখা স্বাধীন ও স্বতন্ত্র।
সত্যিই তিনি অসীম শক্তিশালী, আমার কাছে কবিতার ঈশ্বরসম বলেই, তাঁর কবিতার কাছে সহজ মনে না পৌঁছতে পারলে আজও শ্লীল-অশ্লীল, অথবা নানান দোহাই পাড়ে যারা, তাদের উদ্দেশ্যে কবির ভাষায় বলি,”আমাকে ধিক্কার দেয়া যায় আমাকে উপেক্ষা করা যায় না।” কারুর আনুকূল্য অথবা হাততালি, পুরস্কার ইত্যাদির পরোয়া না করে তিনি লিখে চলেছেন আজও তাঁর বাঁধনছাড়া বেপরোয়া নিজস্ব শৈলীতে।

মইনুল ইসলাম রিপন : হাংরি আন্দোলন

হাংরি আন্দোলন :-
বাংলা সাহিত্যে স্থিতাবস্থা ভাঙার আওয়াজ তুলে, ইশতেহার প্রকাশের মাধ্যমে, শিল্প ও সাহিত্যের যে একমাত্র আন্দোলন হয়েছে, তার নাম হাংরি আন্দোলন, যাকে অনেকে বলেন হাংরিয়ালিস্ট, ক্ষুধিত, ক্ষুৎকাতর, ক্ষুধার্ত আন্দোলন । আর্তি বা কাতরতা শব্দগুলো মতাদর্শটিকে সঠিক তুলে ধরতে পারবে না বলে, আন্দোলনকারীরা শেষাবধি হাংরি শব্দটি গ্রহণ করেন । হাংরি আন্দোলন, এই শব্দবন্ধটি বাংলাভাষায় ঠিক সেভাবে প্রবেশ করেছে যে ভাবে মুসলিম লিগ, কম্ম্যুনিস্ট পার্টি বা কংগ্রেস দল ইত্যাদি সংকরায়িত শব্দবন্ধগুলো । উত্তর-ঔপনিবেশিক ভারতবর্ষে ডিসকোর্সের সংকরায়ণকে স্বীকৃতি দেয়া তাঁদের কর্মকাণ্ডের অংশ ছিল । ১৯৬১ সালের নভেম্বরে পাটনা শহর থেকে একটি ইশতাহার প্রকাশের মাধ্যমে হাংরি আন্দোলনের সূত্রপাত করেছিলেন সমীর রায়চৌধুরী, মলয় রায়চৌধুরী, শক্তি চট্টোপাধ্যায় এবং হারাধন ধাড়া ওরফে দেবী রায় ।কবিতা সম্পর্কিত ইশতাহারটি ছিল ইংরেজিতে, কেন না পাটনায় মলয় রায়চৌধুরী বাংলা প্রেস পাননি । আন্দোলনের প্রভাবটি ব্যাপক ও গভীর হলেও, ১৯৬৫ সালে প্রকৃত অর্থে হাংরি আন্দোলন ফুরিয়ে যায় । নকশাল আন্দোলনের পর উত্তরবঙ্গ এবং ত্রিপুরার তরুণ কবিরা আন্দোলনটিকে আবার জীবনদান করার চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু তাত্ত্বিক ভিত্তিটি জানা না থাকায় তাঁরা আন্দোলনটিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারেননি ।

মলয় রায় চৌধুরী এ বিখ্যাত সাহিত্য আন্দোলনের পথিকৃৎ | কবির সাথে এই আন্দোলনের সংগঠনের
দায়িত্বে ছিলেন কবির দাদা সমীর রায়চৌধুরী, আন্দোলনের সম্পাদনা ও বিতরণে ছিলেন কবি দেবী রায় এবং নেতৃত্বে ছিলেন কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় |


কবি মলয় রায় চৌধুরী বলেছেন যে ১৯৬১ সালে মাত্র ২১ বছর বয়সে তাঁর মনে হয়েছিল যে, স্বদেশী
আন্দোলনের সময় জাতিয়তাবাদী নেতারা যে সুখী, সমৃদ্ধ, উন্নত ভারতবর্ষের স্বপ্ন দেখেছিলেন, তা টকে
গিয়ে পচতে শুরু করেছে উত্তর ঔপনিবেশিক কালখণ্ডে | ওসওয়াল্ড স্পেংলার এর লেখা "The Decline of the
West" বইটির মূল বক্তব্য থেকে তিনি এই আন্দোলনের দর্শন গড়ে তুলেছিলেন | স্পেংলারের মতে কোনো
সংস্কৃতির ইতিহাস কেবল একটি সরল রেখা বরাবর যায় না, তা একযোগে বিভিন্ন দিকে প্রসারিত হয় ; তা
হল জৈবপ্রক্রিয়া, এবং সেকারণে নানা অংশের কার কোন দিকে বাঁকবদল ঘটবে তা আগাম বলা যায় না |
যখন কেবল নিজের সৃজনক্ষমতার উপর নির্ভর করে তখন সংস্কৃতিটি নিজেকে বিকশিত ও সমৃদ্ধ করতে
থাকে, তার নিত্যনতুন স্ফূরণ ও প্রসারণ ঘটতে থাকে | কিন্তু একটি সংস্কৃতির অবসান সেই সময় আরম্ভ
হয় যখন তার নিজের সৃজনক্ষমতা ফুরিয়ে গিয়ে তা বাইরে থেকে যা পায় তাই আত্মসাৎ করতে থাকে,
খেতে থাকে, তার ক্ষুধা তৃপ্তিহীন | তাঁর মনে হয়েছিল যে দেশভাগের ফলে পশ্চিমবঙ্গ এই ভয়ংকর
অবসানের মুখে পড়েছে, এবং উনিশ শতকের মনীষীদের পর্যায়ের বাঙালীর আবির্ভাব আর সম্ভব নয় |
তাঁর মনে হয়েছিল যে কিঞ্চিদধিক হলেও, এমনকি যদি ডিরোজিওর পর্যায়েও না হয়, তবু হস্তক্ষেপ দরকার,
আওয়াজ তোলা দরকার, আন্দোলন প্রয়োজন |


সেই ভাবনা মতো মলয় এবং তাঁর দাদা সমীর, দুই বন্ধু দেবী রায় এবং শক্তি চট্টোপাধ্যায় কে নিয়ে, অন্যান্য
তরুণ লেখক কবি শিল্পীদের নিয়ে এই আন্দোলন শুরু করেন | নভেম্বর ১৯৬১ সালে প্রথম হাংরি বুলেটিন
প্রকাশিত করা হয় পাটনা থেকে এবং সেখানে বাংলা ছাপাবার প্রেস না পাওয়ায় বুলেটিনটি প্রকাশিত করা
হয় ইংরেজীতে | অতি স্বল্প কালের মধ্যেই হিন্দী ও নেপালী ভাষাতেও এই আন্দোলন ছড়িয়েছিল | 


এই নব ধারার প্রতিষ্ঠান বিরোধী আন্দোলনের জন্য মলয়ের চাকরি যায় | তত্কালীন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী
প্রফুল্ল চন্দ্র সেনের রাজত্যকালে, ১৯৬৪ সালে, মলয় রায়চৌধুরী, প্রদীপ চৌধুরী, সুভাষ ঘোষ, দেবী রায়,
শৈলেশ্বর ঘোষ ও সমীর রায়চৌধুরীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করার অভিযোগ এনে গ্রেপ্তার করা
হয় | পরে, এই অভিযোগ ধোপে টিকবে না দেখে, অন্য সবাইকে ছেড়ে দিয়ে শুধু মলয় রায়চৌধুরীর বিরুদ্ধে
অশ্লিল সাহিত্য রচনা করার অভিযোগে মামলা করা হয়, তাঁর "প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার" কবিতাটির জন্য |
আন্দোলনেরই কয়েকজন রাজসাক্ষী হয়ে যাওয়াতে নিচু আদালতে, মামলায় হেরে যান মলয় | কিন্তু ২৬
জুলাই ১৯৬৭ মহামান্য উচ্চ আদালত তাঁকে বেকসুর খালাস করে দেন | এই আন্দোলনের সেখানেই সমাপ্তি
ঘটে |


এই আন্দোলন কে নিয়ে স্বয়ং মলয় রায়চৌধুরীর লেখা, দিল্লী থেকে প্রকাশিত পত্রিকা "দিগঙ্গন" এর উত্সব
সংখ্যা ২০০৪ এ প্রকাশিত "প্রতিসন্দর্ভের স্মৃতি" প্রবন্ধ |


হাংরি আন্দোলন নিয়ে আগ্রহী পাঠকের জন্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে "হাংরি আন্দোলনের কাব্যদর্শন"- দেবী রায় (১৯৬৫), "Hungryalist Manifestoes/ ইস্তাহার সংকলন" (১৯৮৬), "হাংরি কিংবদন্তি" (১৯৯৪)-দে বুকস, "Hungryalist Interviews" edited by Ajit Ray, "বিষয় পোস্ট মর্ডানিটি" হাংরি আন্দোলনোত্তর সাক্ষাত্কার সংকলন ২০০৪, "হাংরি আন্দোলনের ইস্তাহার" আবার এসেছি ফিরে পাবলিকেশনস ২০০৭ প্রভৃতি |
                                                 
                                      মলয় রায়চৌধুরী

সোমবার

অনিন্দ্য সেনগুপ্ত : আনন্দবাজারের দৃষ্টিতে হাংরি জেনারেশন

'আনন্দবাজার পত্রিকা'-য় হাংরি জেনারেশন নিয়ে দুইটি লেখা পড়ে একদম মাইন্ড গট সুপ্রিমলি বগলড্‌। এরকম কিছু লাইন পাওয়া গেল একদম বেসিক তথ্যের নিরিখে -
১। ১৯৬১ সালে হাংরি জেনারেশনের প্রথম লিফলেটে এই আন্দোলনের ‘ক্রিয়েটর’ হিসেবে পরিচয়দাতা মলয় রায়চৌধুরী ১৯৬৪ সালেই এই আন্দোলনের সমাপ্তি ঘোষণা করেন।
২। যতই মলয় রায়চৌধুরী ... নিজের বুর্জোয়া অতীত নিয়ে গর্ব প্রকাশ করুন বা ১৯৬৪ সালে হাংরি জেনারেশনের মৃত্যু ঘোষণা করুন, তাতে তিনি যে ১৯৬৫-র আগে পর্যন্ত অর্থাৎ হাংরি জেনারেশনের প্রথম পর্বের এক জন ছিলেন এটা তো অপ্রমাণ হয় না।

অথচ শৈলেন সরকার লিখিত রিভিউটির দ্বিতীয় প্যারায়, যেখানে একগাদা উদ্ধৃতি-র আগে এই লাইনটি আছে "যেখানে শৈলেশ্বর ঘোষ সত্তর দশকে শুরু হওয়া ‘হাংরি জেনারেশন’ আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করেছেন"। '৬১-তে শুরু হওয়া আন্দোলন 'সত্তর দশক' হয়ে গেল কেমনে?
এই আন্দোলনটি নিয়ে খুব লেম্যান-গোত্রের উৎসাহ আছে বলেই রিভিউগুলি পড়তে গিয়েছিলাম - বদলে পাওয়া গেল মলয় রায়চৌধুরী আন্দোলনের শুরুতে ছিলেন না শেষে, আন্দোলনের পিতা ছিলেন না জারজ সন্তান জাতীয় চায়ের দোকানের আলোচনা। দুটি রিভিউতেই ছুতার 'কুঠার' হয়ে গেছে, হয় মুদ্রকের শশব্যস্ত ভূত বা আবাপ-তে অটোকারেক্টের নৃত্য চলছে। সৃজিতের 'বাইশে শ্রাবণ'-এর সময় থেকেই মিডিয়া ও কালচারে 'হাংরি' বেশ ইন-থিং হয়েছে বুঝতে পারছি, কিন্তু ইদানিং কিছু ভালো গবেষণা হচ্ছে বলেও জানা যায়। সেইসব গবেষকদের দিয়েও লেখানো যেত, তার বদলে এইসব মনবগলীয় লেখা এখন সর্বাধিক বিকৃত পত্রিকায় বেরোচ্ছে, যা থেকে না জানা যায় মুভমেন্টটি নিয়ে ন্যূনতম তথ্য, না বোঝা যায় বইয়ে কি আছেটা কি, মনোজ্ঞ সমালোচনা তো দূরে থাক! এইসব সাহিত্য আপনারা পছন্দ করেন না, সেটা সোজাসুজি বলে দিলেও তো হয়!
Comments
Anindya Sengupta
Anindya Sengupta Shubham Roy Choudhury Malay Raychaudhuri-r nijer lekhar jonyo eita; ekhane hungry related probondho-o achhe https://malayerprobondha.wordpress.com/Manage
· Reply · 3y
Sambit Basu
Sambit Basu kintu korunanidaan??
Manage
· Reply · 3y
Anindya Sengupta
Anindya Sengupta ??? seta ki?
Manage
· Reply · 3y
Sambit Basu
Sambit Basu moloy sirkei gigyes korte hobe..Karunanidan ke keu mone rekheche kina
Manage
· Reply · 3y
Sambit Basu
Sambit Basu hunger artist
Manage
· Reply · 3y
Sambit Basu
Sambit Basu naamta oirom..something like korunanidan
Manage
· Reply · 3y
Sambit Basu
Sambit Basu or karunanidhaan
Manage
· Reply · 3y
Sambit Basu
Sambit Basu or..bujhtei parcho...
Manage
· Reply · 3y
Sambit Basu
Sambit Basu tar sombondhe anondobajaar ek lobj-0 lekheni?!
Manage
· Reply · 3y
Anindya Sengupta
Anindya Sengupta Sambit korunanidan ar hunger artist-er jogajog bujhtey parlum na :)
Manage
· Reply · 3y
মলয় রায়চৌধুরী
মলয় রায়চৌধুরী ইনি হাংরি আন্দোলনের চিত্রকর করুণানিধান মুখোপাধ্যায় । ইনি এবং অনিল করঞ্জাই ছবি আঁকার ম্যানিফেস্টোটা লিখেছিলেন ।Manage
· Reply · 3y
Public posts
হাংরি জেনারেশন : মলয় রায়চৌধুরী (জন্ম : ২৯ অক্টোবর, ১৯৩৯): তিনি হাংরি জেনারেশনের জনক। কবিতা ছাড়াও সাহিত্যের অন্যান্য মাধ্যমেও তিনি তার সৃজনশীলতার অনবদ্য স্বাক্ষর রেখেছেন সমান ভাবে। মলয় রায়চৌধুরীর প্রতিদ্বন্দ্বী মলয় রায় নিজেই। পাঠকের সামনে তাকে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেবার কিছু নেই। এখানে যৎসামান্য বয়ান শুধুমাত্র সূ্ত্রমুখ হিসেবে দেওয়া হল। বলা হয়ে থাকে, আধুনিক বাংলা কবিতার ইতিহাসে তিনি এক বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব। তিনি ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতাটির জন্য গ্রেফতার ও কারাবরণ করেন। ...
Continue reading
হাংরি হাংরি করতে করতে মরে গেলো যারা।।
youtube.com
হাংরি আন্দোলনের সূত্রপাতের সময়ে পশ্চিমবঙ্গের আর্থ সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্হিতি আন্দোলনের পক্ষে যথেষ্ট অনুকুল ছিল। কিন্তু অনুকূল ছিল না প্রাতিষ্ঠানিক সাংস্কৃ...
আজ, সাহিত্যিক সুবিমল বসাকের জন্মদিন। তাঁর সম্পর্কে ফালগুনী রায় বলেছিলেন – ‘সুবিমল রবিঠাকুরের মত গান বা নাটক লেখেননি কোনদিন, সো হোয়াট? রবীন্দ্রনাথ না থাকলে সুবিমল লিখতেন না কি?’
bongodorshon.com
‘সুবিমল বসাকই একমাত্র সুবিমল বসাকের ইতিহাস’
ভালোবাসি তাই প্রেম করি না, মেয়েরা ফ্রেন্ড রিকুয়েষ্ট পাঠাবেন না ।
See all