রাজসাক্ষী লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
রাজসাক্ষী লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

রবিবার

অনির্বান সরকার : কবি মলয় রায়চৌধুরী ও একটি মামলা

কবি মলয় রায়চৌধুরি এবং একটি মামলা:
.
'আর্ট ফর আর্টস সেক'- রোমান্টিক এই ধারণার বিপরীতবিন্দুতে দাঁড়িয়ে একটি কাঁপিয়ে দেয়া সাহিত্য আন্দোলন শুরু হয়েছিলো ষাট দশকের কলকাতায়, যার নাম- হাংরি আন্দোলন। ১৯৬১ থেকে ১৯৬৫- সময় খুব বেশি নয়, মাত্র বছর চারেক, এর মাঝেই পাওয়া যাচ্ছিলো বাংলা সাহিত্যের বাঁকবদলের ইঙ্গিত। দুই ভাই মলয় রায়চৌধুরি আর সমীর রায়চৌধুরি, তাঁদের সাথে শক্তি চট্টোপাধ্যায় সুনির্মল বসু, দেবী রায় (আসল নাম- হারাধন ধাড়া)- এঁরা পাটনা থেকে ১৯৬১- তে প্রকাশ করেন একটি ইশতেহার। বাংলা ছাপানোর প্রেসের অভাবে ইংরেজিতেই ঐ ইশতেহার প্রকাশিত হয়। ইশতেহার প্রকাশ করে সাহিত্য আন্দোলন শুরু করার প্রথম নজির ছিলো ওইটি।
হাংরি আন্দোলনকারীরা কি করতেন? প্রথমত প্রবলভাবে প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা; কবিতায়, গল্পে ইচ্ছেমতো শব্দের প্রয়োগ- তৎকালে যেসব শব্দ বাংলা সাহিত্যে অরুচিকর বলে পরিত্যাজ্য ছিলো। তাঁরা 'মানুষের বাচ্চা', 'ঢপের কাগজ'- এইসব নামে প্রকাশ করতেন বুলেটিন। বুলেটিনের দাম লেখা থাকতো- কয়েক লক্ষ টাকা (সব বুলেটিনই প্রায় হারিয়ে গেছে, পশ্চিমবঙ্গের কিছু এবং ঢাকার বাংলা একাডেমিতে কয়েকটি শুধু সংরক্ষিত আছে)। শুধু তাই নয়, তাঁরা শুঁড়িখানা, কবরে, গোরস্থানে কবিতা পাঠের আসর বসানোর পাশাপাশি সমাজের প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিদের জীবজন্তুর মুখোশ পাঠিয়ে তাদের মুখোশগুলো খুলে ফেলার আহ্বান জানাতেন। পত্রিকা অফিসে জুতোর বাক্সে পাঠাতেন কবিতা, কিছুই না লিখে সাদা কাগজ পাঠাতেন- নাম দিতেন- 'ছোটগল্প'। অশ্লীল পোস্টার, লিফলেট এঁকে বিলি করতেন তাঁরা, ছবি প্রদর্শনীর পর ছবিতে আগুন ধরিয়ে দিতেন।
তাঁদের এই বৈপ্লবিক ব্যাপারস্যাপার তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গ সরকার ভালোভাবে নেয়নি। অবশ্য সরকারমাত্রেই জুজুর ভয় পায়।
.
* গ্রেফতার ও মামলা:
১৯৬৪ সালের সেপ্টেম্বরে ইণ্ডিয়ান পেনাল কোডের ১২০বি, ২৯২ এবং ২৯৪ ধারায় ১১ জন হাংরি আন্দোলনকারীর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হবেছিল । তাঁরা হলেন: সমীর রায়চৌধুরী, মলয় রায়চৌধুরি, দেবী রায় , সুভাষ ঘোষ , শৈলেশ্বর ঘোষ , প্রদীপ চৌধুরী, উৎপলকুমার বসু, রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়, বাসুদেব দাশগুপ্ত, সুবো আচার্য এবং সুবিমল বসাক । এঁদের মধ্যে প্রথম ছয়জনকে গ্রেফতার করা হয় এবং কলকাতার কোর্টে তোলা হয় । মলয় রায়চৌধুরিকে হাতে হাতকড়া এবং কোমরে দড়ি বঁধে রাস্তায় হঁটিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় চোর-ডাকাতদের সঙ্গে । মোকদ্দমার ফলে উৎপলকুমার বসু অধ্যাপনার চাকরি থেকে বরখাস্ত হন, প্রদীপ চৌধুরি রাসটিকেট হন বিশ্বভারতী থেকে, সমীর রায়চৌধুরি সরকারি চাকরি থেকে সাসপেন্ড হন, সুবিমল বসাক ও দেবী রায়কে কলকাতার বাইরে বদলি করে দেয়া হয়, সুবো আচার্য ও রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় ফেরার হয়ে যান । অনেকে হাংরি আন্দোলন ভয়ে ত্যাগ করেন । লালবাজারের কনফারেন্স রুমে মলয় রায়চৌধুরি এবং সমীর রায়চৌধুরিকে জেরা করেন একটি ইনভেসটিগেটিং বোর্ড যার সদস্যরা ছিলেন স্বরাষ্ট্র দফতর, পুলিশ প্রশাসন, কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা বিভাগ, ভারতীয় সেনার প্রতিনিধিরা এবং পশ্চিমবঙ্গের আ্যাডভোকেট জেনারেল । ১২০বি ধারাটি ছিল ষড়যন্ত্রের, এবং সেকারণে প্রত্যেক হাংরি আন্দোলনকারী সম্পর্কে ডোসিয়ার খুলে ফেলেছিলেন কলকাতা গোয়েন্দা বিভাগ । গ্রেফতারের সময়ে প্রত্যেকের বাড়ি লণ্ড-ভণ্ড করা হয়েছিল । বইপত্র, ডায়েরি, টাইপরাইটার, ফাইল, পাণ্ডুলিপি, কবিদের চিঠির সংগ্রহ ইত্যাদি যেগুলো পুলিশ নিয়ে গিয়েছিল তা আর তাঁরা ফেরত পাননি ।
.
* মলয় রায়চৌধুরি ও 'প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার':
কবি মলয় রায়চৌধুরি হাংরি আন্দোলনের একজন পুরোধা। শুরুর দিকে ভাই সমীর রায়চৌধুরি আর সুবিমল বসাক, দেবী রায়কে নিয়ে তিনিই হাংরি আন্দোলনের সূচনা করেন। যখন হাংরি আন্দোলনকারীদের গ্রেফতার করা হয়, তার মধ্যে মলয় রায়চৌধুরিও ছিলেন, এবং তার একটি কবিতার বিরুদ্ধেই মূলত অভিযোগ দায়ের করা হয়। কবিতাটির নাম 'প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার'।
কবিতাটি 'হাংরি বুলেটিন ১৯৬৪' সংখ্যায় প্রকাশের পর হাংরি আন্দোলনকারীদের মোট ১১ জনের বিরুদ্ধে আদালতে তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গ সরকার ভারতীয় দণ্ড বিধির ১২০বি (রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র), ২৯২ (সাহিত্যে অশ্লীলতা) এবং ২৯৪ (তরুণদের বিপথগামী করা) ধারায় গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়। এর মধ্যে মলয় রায়চৌধুরিসহ অন্যান্য যাঁরা সংখ্যাটিতে লিখেছিলেন তাঁদের মধ্যে ছয়জনকে কলকাতা পুলিশ গ্রেফতার করে। ১৯৬৫ সালের মে মাসে বাকি সবাইকে মুক্তি দেয়া হলেও মলয় রায়চৌধুরীর বিরুদ্ধে ২৯২ ধারায় চার্জশিট প্রদান করা হয় এবং ৩৫ মাসব্যাপী এ মামলা চলে। মলয়ের পক্ষে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, তরুণ সান্যাল, জ্যোতির্ময় দত্ত এবং সত্রাজিত দত্ত আর বিপক্ষে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন শক্তি চট্টোপাধ্যায় (আমি ঠিক জানিনা শক্তি বিপক্ষে কেন! বোধহয় তিনি ততদিনে এ আন্দোলন ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলেন) শৈলেশ্বর ঘোষ, সুভাষ ঘোষ, পবিত্র বল্লভ, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় এবং উৎপলকুমার বসু। নিম্ন আদালতে মলয় রায়চৌধুরীর ২০০ টাকা জরিমানা অনাদায়ে একমাসের কারাদণ্ডের আদেশ হয়েছিলো। ১৯৬৭ সালে কলকাতা উচ্চ আদালত মামলাটি খারিজ করে কবিতাটির সম্মান পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করেছিল। কবিতাটি ভারতের এবং ইউরোপের বিভিন্ন ভাষায় অনুদিত হয়েছে।
এই একটি মামলাতেই কিন্তু হাংরি জেনারেশনের খ্যাতি কলকাতার গণ্ডি ছাড়িয়ে পৃথিবীময় ছড়িয়ে পড়ে। বিখ্যাত 'টাইম' ম্যাগাজিনেও এঁদের নিয়ে আর্টিকেল প্রকাশিত হয়।
'প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার' কবিতার লিংক (নিজ দায়িত্বে পড়বেন):
http://www.somewhereinblog.net/blog/pompa007blog/28880937


.


মন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায় আয়োজিত অনুষ্ঠানে শৈলেশ্বর ঘোষ

যিনি বলেছিলেন আধুনিকতার শবদেহের ওপর উল্লাসময় নৃত্য করবেন তিনি শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানে যোগ দিয়ে হাংরি জেনারেশনের নাম কলঙ্কিত করলেন
                                                  

হাংরি জেনারেশন নিয়ে বাংলাদেশের মুক্তচিন্তা সাইটের মতামত

সময়টা ইংরেজি ১৯৬৪ সাল। সেপ্টেম্বর মাসে ইনডিয়ান পিনাল কোডের ১২০বি, ২৯২ এবং ২৯৪ ধারায় ১১ জন কবির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছিল । তাঁরা হলেন: মলয় রায়চৌধুরী,, শৈলেশ্বর ঘোষ , দেবী রায় , সুভাষ ঘোষ, প্রদীপ চৌধুরী, রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়, উৎপলকুমার বসু, সমীর রায়চৌধুরী, বাসুদেব দাশগুপ্ত, সুবো আচার্য এবং সুবিমল বসাক । এঁদের মধ্যে প্রথম ছয়জনকে গ্রেপতার করা ছয়েছিল এবং কলকাতার ব্যাংকশাল কোর্টে তোলা হয়েছিল । মলয় রায়চৌধুরীকে হাতে হাতকড়া এবং কোমরে দড়ি পরে হেঁটেছিলেন কোলকাতার রাস্তায় চোর- ডাকাতের পাশে।

কিন্তু কেন? কেন ফেরারী হয়ে যান সুবো আচার্য ও রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়? কেন বিশ্বভারতী থেকে রাসটিকিট হন প্রদীপ চৌধুরী? উৎপলকুমার বসু অধ্যাপনা থেকে বরখাস্ত হন? বেছে বেছে কেন কবিদের দেয়া হল যন্ত্রণা?
উত্তর টা আমরা পরে খুজব। তার আগে বাংলা সাহিত্যের ভাঙ্গা-গড়া নিয়ে একটু নাড়াচাড়া করে আসি। প্রথমেই বলে নিচ্ছি সাহিত্য হচ্ছে শিল্পের খুবই সরল একটি শাখা। যেমন শাখা চারুকলা কিংবা সঙ্গীত। আমরা সারা পৃথিবী জুড়ে অনেক শিল্প বিপ্লব এর কথা শুনেছি, পড়েছি। ১৭, ১৮ শতক এর Amatory Fiction বা যৌন কাল্পনিক সাহিত্য। যার উল্লেখযোগ্য লেখক হচ্ছেন Eliza Haywood, Delarivier Manley। এরপর সময়ের স্রোত বেয়ে ঘটেছে আরও অনেক। ১৭ শতকের Cavalier Poets যার উল্লেখযোগ্য লেখকদ্বয় Richard Lovelace, William Davenant। এরপর John Donne, George Herbert, Andrew Marvell প্রমুখ সাহিত্যক এর Metaphysical poets। আলেকজান্ডার পোপ, জোনাথোন সুইফট এর চিরায়ত আদর্শ, বিদ্রুপ and সংশয়বাদ কে আশ্রয় করে “দ্য অগাস্তান” আন্দোলন করলেন ১৮ শতকে। ১৯ শতকে যুক্তি, বিজ্ঞান সব ফেলে আবেগ আর কল্পনাকে আশ্রয় করে ভিক্টর হুগো, ক্যামিলো ক্যাস্তেলো “অবাধ কল্পনাপ্রবণতা”য় বেঁধে ধরলেন সাহিত্য কে। এরপর Dark romanticism, Realism আরও কত কি..!!


বাংলা সাহিত্যেও এরকম দুটি আন্দোলন হয়েছিল। যার একটি ১৯৬১-১৯৬৫ তে আর একটি ১৯৬৯ এ। ১৯৬১-১৯৬৫ এর এই আন্দোলনটি বাংলা সাহিত্যের প্রথম আন্দোলন। বাঁধ ভাঙার আওআজ তুলে, ইশতাহার প্রকাশের মাধ্যমে, বাংলা শিল্প ও সাহিত্যের যে একমাত্র আন্দোলন হয়েছে, তার নাম হাংরি মুভমেন্ট বা ক্ষুধার্ত আন্দোলন । আর্তি বা কাতরতা শব্দগুলো মতাদশর্টিকে সঠিক তুলে ধরতে পারবে না বলে, আন্দোলনকারীরা শেষমেষ এই হাংরি শব্দটি গ্রহণ করেন । উত্তর-ঔপনিবেশিক ভারতবর্ষে্র ঔপনিবেশিক সাহিত্যকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে দিয়ে নিজেদের স্বত্বার বহিঃপ্রকাশ ই ছিল এই আন্দোলন এর আপাত অভিপ্রায়। ১৯৬১ সালের নভেম্বরে পাটনা শহর থেকে একটি ইশতাহার প্রকাশের মাধ্যমে হাংরি আন্দোলনের সূত্রপাত করেছিলেন।


মলয় রায় চৌধুরী এই বিখ্যাত সাহিত্য আন্দলেনের মূল পথিকৃৎ। সেলুকাস এই কবির সাথে ছিলেন কবির দাদা সমীর রায় চৌধুরী, আন্দলনের সম্পাদনায় ও বিতরণে ছিলেন কবি দেবী রায় এবং নেতৃত্বে ছিলেন কবি শক্তি চট্রোপাধ্যায়।
১৯৬১ সাল দেশভাগের ফলে পশ্চিমবঙ্গ এই ভয়ংকর অবসানের মুখে সাহিত্য, ওদিকে আবার পচে গলে পড়ে যাচ্ছে উন্নত ভারত বর্ষের স্বপ্ন। কবি মলয় রায় নিজে বলেছিলেন, “স্বদেশী আন্দোলনের সময় জাতিয়তাবাদী নেতারা যে সুখী, সমৃদ্ধ, উন্নত ভারতবর্ষের স্বপ্ন দেখেছিলেন, তা টকে গিয়ে পচতে শুরু করেছে উত্তর ঔপনিবেশিক কালখণ্ডে ”।
তিনি ওসওয়াল্ড স্পেংলার এর লেখা "The Decline of the West" বইটির মূল বক্তব্য থেকে এই আন্দোলনের দর্শন গড়ে তুলেছিলেন | Oswald Spengler এই বইটিতে বলেছিলেন, কোনো সংস্কৃতির ইতিহাস কেবল একটি সরল রেখা বরাবর যায় না, তা একযোগে বিভিন্ন দিকে প্রসারিত হয় ; তা হল জৈবপ্রক্রিয়া, এবং সেকারণে নানা অংশের কার কোন দিকে বাঁকবদল ঘটবে তা আগাম বলা যায় না| যখন কেবল নিজের সৃজনক্ষমতার উপর নির্ভর করে তখন সংস্কৃতিটি নিজেকে বিকশিত ও সমৃদ্ধ করতে থাকে, তার নিত্যনতুন স্ফূরণ ও প্রসারণ ঘটতে থাকে | কিন্তু একটি সংস্কৃতির অবসান সেই সময় আরম্ভ হয় যখন তার নিজের সৃজনক্ষমতা ফুরিয়ে গিয়ে তা বাইরে থেকে যা পায় তাই আত্মসাৎ করতে থাকে, খেতে থাকে, তার ক্ষুধা তৃপ্তিহীন | তাঁর মনে হয়েছিল যে দেশভাগের ফলে পশ্চিমবঙ্গ ভয়ংকর অবসানের মুখে পড়েছে, এবং উনিশ শতকের মনীষীদের পর্যায়ের বাঙালীর আবির্ভাব আর সম্ভব নয় |


তাঁর মনে হয়েছিল যে কিছুটা হলেও এর বিরুদ্ধে দাঁড়ানো দরকার,আওয়াজ তোলা দরকার, আন্দোলন প্রয়োজন।
অর্থাৎ দেশভাগোত্তর বাঙালির কালখণ্ডটিকে কবিগণ হাংরিরূপে চিহ্ণিত করতে চাইলেন।হাংরি আন্দোলনকারীরা শব্দটি আহরণ করেছিলেন ইংরেজি ভাষার কবি Geoffrey Chaucer এর In Swore Hungry Time বাক্যটি থেকে।
আর সেই ভাবনা থেকেই কবি মলয় রায় তাঁর দাদা সমীর রায়, দুই বন্ধু দেবী রায় এবং শক্তি চট্টোপাধ্যায় এর সাথে ধারনাটি ব্যাখ্যা করেন এবং হাংরি আন্দোলনের প্রস্তাবনা দেন পড়ে তাদের এবং অন্যান্য তরুণ লেখক কবি শিল্পীদের নিয়ে এই আন্দোলন শুরু করেন | নভেম্বর ১৯৬১ সালে প্রথম হাংরি বুলেটিন প্রকাশিত করা হয় পাটনা থেকে এবং সেখানে বাংলা ছাপাবার প্রেস না পাওয়ায় বুলেটিনটি প্রকাশিত করা হয় ইংরেজীতে | অতি স্বল্প কালের মধ্যেই হিন্দী ও নেপালী ভাষাতেও এই আন্দোলন ছড়িয়েছিল। ১৯৬২-৬৩ সালে আন্দোলনে মিশে যান বিনয় মজুমদার, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, উৎপলকুমার বসু, সুবিমল বসাক, ত্রিদিব মিত্র, ফালগুনী রায়, আলো মিত্র, রবীন্দ্র গুহ, সুভাষ ঘোষ, প্রদীপ চৌধুরী, সুবো আচার্য, অরুপরতন বসু, বাসুদেব দাশগুপ্ত, সতীন্দ্র ভৌমিক, শৈলেশ্বর ঘোষ, হরনাথ ঘোষ, নীহার গুহ, আজিতকুমার ভৌমিক, অশোক চট্টোপাধ্যায়, অমৃততনয় গুপ্ত, ভানু চট্টোপাধ্যায়, শংকর সেন, যোগেশ পাণ্ডা, মনোহর দাশ, তপন দাশ, শম্ভু রক্ষিত, মিহির পাল, রবীন্দ্র গুহ, সুকুমার মিত্র, দেবাশিষ মুখোপাধ্যায় প্রমুখ । অনিল করঞ্জাই এবং করুণানিধান নামের দুজন চিত্রকরও ছিলেন এই আন্দোলনে ।


এই আন্দোলন কে নিয়ে স্বয়ং মলয় রায়চৌধুরীর লেখা, দিল্লী থেকে প্রকাশিত পত্রিকা "দিগঙ্গন" এর উত্সব সংখ্যা ২০০৪ এ প্রকাশিত "প্রতিসন্দর্ভের স্মৃতি" প্রবন্ধতে তিনি বলেন,
"ইউরোপের শিল্প-সাহিত্য আন্দোলনগুলো সংঘটিত হয়েছিল একরৈখিক ইতিহাসের ধারণার বনেদের ওপর; কল্লোল বা কৃত্তিবাস গোষ্ঠী যে নবায়ন এনেছিলেন সে কাজগুলো ছিল কলোনিয়াল ইসথেটিক রিয়্যালিটি বা ঔপনিবেশিক বাস্তবতার চৌহদ্দির মধ্যে, কেন না সেগুলো ছিল যুক্তিগ্রন্হনা-নির্ভর, এবং তাঁদের মনোবীজে অনুমিত ছিল যে ব্যক্তিপ্রতিস্বের চেতনা ব্যাপারটি একক, নিটোল ও সমন্বিত ।" তঁরা বললেন, "এই ভাবকল্পের প্রধান গলদ হল যে তার সন্দর্ভগুলো নিজেদেরকে পূর্বপুরুষদের তুলনায় উন্নত মনে করে, এবং স্হানিকতেকে ও অনুস্তরীয় আস্ফালনকে অবহেলা করে । ওই ভাবকল্পে যে বীজ লুকিয়ে থাকে, তা যৌথতাকে বিপন্ন আর বিমূর্ত করার মাধ্যমে যে-মননর্স্তাস তৈরি করে, তার দরুন প্রজ্ঞাকে যেহেতু কৌমনিরপেক্ষ ব্যক্তিলক্ষণ হিসাবে প্রতিষ্ঠা দেয়া হয়, সমাজের সুফল আত্মসাৎ করার প্রবণতায় ব্যক্তিদের মাঝে ইতিহাসগত স্হানাঙ্ক নির্ণয়ের হুড়োহুড়ি পড়ে যায় । গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে ব্যক্তিক তত্ত্বসৌধ নির্মাণ । ঠিক এই কারণেই, ইউরেপীয় শিল্প-সাহিত্য আন্দোলনগুলো খতিয়ে দেখলে দেখা যায় যে ব্যক্তিপ্রজ্ঞার আধিপত্যের দামামায় সমাজের কান ফেটে এমন রক্তাক্ত যে সমাজের পাত্তাই নেই কোনো । কৃত্তিবাস গোষ্ঠীর দিকে তাকালে দেখা যাবে যে পঁজিবলবান প্রাতিষ্ঠানিকতার দাপটে এবং প্রতিযোগী ব্যক্তিবাদের লালনে শতভিষা গোষ্ঠী যেন অস্তিত্বহীন । এমনকি কৃত্তিবাস গোষ্ঠিও সীমিত হয়ে গেছে মাত্র কয়েকজন মেধাসত্তবাধিকারীর নামে । পক্ষান্তরে, ঔপনিবেশিক ননগদনতন্ত্রের আগেকার প্রাকঔপনিবেশিক ডিসকোর্সের কথা ভাবা হয়, তাহলে দেখা যায় যে পদাবলী সাহিত্য নামক ম্যাক্রো পরিসরে সংকুলান ঘটেছে বৈষ্ণব ও শাক্ত কাজ, মঙ্গলকাব্য নামক পরিসরে সংকুলান ঘটেছে মনসা, চণ্ডী, শিব, কালিকা বা ধর্মঠাকুরের মাইক্রো-পরিসর । লক্ষ্মণিয় যে প্রাকৌপনিবেশিক কালখণ্ডে সন্দর্ভ গুরুত্ত্বপূর্ণ ছিল, তার রচয়িতা নয় । তার কারন সৃজনশীলতার ক্ষেত্রে ব্যাক্তি মালিকানার উদ্ভব ও বিকাশ ইউরোপীয় অধিবিদ্যাদত মননবিশ্বের ফসল।”


হাংরি আন্দোলনকারিরা প্রধানত একপৃষ্ঠার বুলেটিন প্রকাশ করতেন । এক পাতার বুলেটিনে তঁরা কবিতা, রাজনীতি, ধর্ম, অশ্লীলতা, জীবন, ছোটগল্প, নাটক, উদ্দেশ্য, দর্শন ইত্যাদি বিষয়ে ইশতাহার লেখা ছাড়াও, কবিতা, গদ্য, অনুগল্প, স্কেচ ইত্যাদি প্রকাশ করেছিলেন । বুলেটিনগুলো হ্যান্ডবিলের মতন কলকাতার কলেজ স্ট্রিট কফি হাউস, পত্রিকা দপতর, কলেজগুলোর বাংলা বিভাগ ও লাইব্রেরি ইত্যাদিতে তাঁরা বিতরন করতেন । হাংরি আন্দোলনের কথা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার এইটি-ই প্রধান কারণ বলে মনে করেন গবেষকরা । কিন্তু হ্যান্ডবিলের মতন প্রকাশ করায় তাঁরা ক্ষতি করেছেন নিজেদের, কারন অধিকাংশ বুলেটিন সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়নি।

১৯৬৩-৬৫ সালের মাঝে হাংরি আন্দোলনকারীরা কয়েকটি পত্রিকাও প্রকাশ করেছিলেন । সেগুলো হল, সুবিমল বসাক সম্পাদিত প্রতিদ্বন্দ্বী, ত্রিদিব মিত্র সম্পাদিত উন্মার্গ, মলয় রায়চৌধুরী সম্পাদিত জেব্রা, দেবী রায় সম্পাদিত চিহ্ণ, প্রদীপ চৌধুরী সম্পাদিত ফুঃ সতীন্দ্র ভৌমিক সম্পাদিতএষণা, এবং আলো মিত্র সম্পাদিত ইংরেজি দি ওয়েস্ট পেপার ।
১৯৬৩ সালের শেষদিকে সুবিমল বসাক, দেবী রায় ও মলয় রায়চৌধুরীর কিছু-কিছু কর্মকাণ্ডের কারণে হাংরি আন্দোলন বাঙালির সংস্কৃতিতে প্রথম প্রতিষ্ঠানবিরোধী গোষ্ঠী হিসাবে পরিচিত হয় । বহু আলোচক হাংরি আন্দোলনকারীদের সে সময়ের কার্যকলাপে দাদাইজম প্রভাব লক্ষ্য করেছেন । এই কারণে শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, সতীন্দ্র ভৌমিক প্রমুখ হাংরি আন্দোলন ত্যাগ করেন ।এই সমস্ত কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তাঁরা দাবী করতেন যে অচলায়তনকে ভাঙা যাবে । অবশ্য তাঁদের অনুকরণে পরবর্তীকালে বহু প্রতিষ্ঠানবিরোধী লেখক এসেছেন বাংলা সাহিত্যে ।


১৯৬৪ সালে, তত্কালীন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্ল চন্দ্র সেনের রাজত্যকালে, মলয় রায়চৌধুরী, প্রদীপ চৌধুরী, সুভাষ ঘোষ, দেবী রায়, শৈলেশ্বর ঘোষ ও সমীর রায়চৌধুরীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করার অভিযোগ এনে গ্রেপ্তার করা হয়| পরে অন্য সবাইকে ছেড়ে দিয়ে শুধু মলয় রায়চৌধুরীর বিরুদ্ধে অশ্লীল সাহিত্য রচনা করার অভিযোগে মামলা করা হয়, তাঁর "প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার” কবিতাটির জন্য | হাংরি আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে্ল৩৫ মাস, অর্থাৎ ১৯৬৭ পর্যন্ত মামলা চলতে থাকে।


২৬ জুলাই ১৯৬৭ তে উচ্চ আদালত মলয় রায় চৌধুরী কে বেকসুর খালাস করে দেন। আর এভাবেই শেষ হয় ক্ষুধিত কবিদের হাহাকার। চোর ডাকাতের পাশে হাতকড়া পড়ে হেঁটে যাওয়া কবি এবং কবি আর তাদের ম্লান হয়ে যাওয়া কষ্ট ঢাকা পড়ে যায় এক নূতন সম্ভাবনায়।


হাংরি আন্দোলনকারীরা বৈপ্লবিক পরিবর্তনএর প্রথম ফল পাওয়া গেল নামকরণে যেমন, আবার এসেছি ফিরে, মানুষের বাচ্চা, আমি আর লীনা হঁটে চলেছি, ক্ষেপচুরিয়াস, ইত্যাদি । হাংরি আন্দোলন প্রথম যৌথভাবে প্রন্তিকের ডিসকোর্সকে স্হান করে দিল । হাংরি আন্দোলনকারীদের কবিতায় একটি ছবি সম্পূর্ণ গড়ে ওঠার আগেই তা মিলিয়ে গিয়ে আরেকটি ছবি ভেসে ওঠে । বাংলা কবিতায় এটি এখন প্রতিষ্ঠিত শৈলী । কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগীব প্রধান ড. তরুণ মুখোপাধ্যায় এদের ব্যপারে লিখেছেন, "ভাষায়, ছন্দে, অলংকার, স্তবকে তুমুল ভাংচুর" করেছেন তাঁরা”।

হাংরি জেনারেশন সম্পর্কে পার্বণ মাজাহারের ধ্যানধারণা

পুলিশি পাহারার মধ্যদিয়ে হাতে কোমরে দড়িবেঁধে চোর-ডাকাতের মতো আদালতে হাজির করা হচ্ছে একজনকে, রাষ্ট্রের চোখে তিনি আসামি। একটি কবিতায় অশ্লীলতার দায়ে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পুলিশের এই আয়োজন। আসামীর  নাম কবি মলয় রায়চৌধুরী তার  রচিত সে কবিতাটির নাম ‘প্রচন্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’।  সাহিত্যে অশ্লীলতার দায়ে মামলাটি ৩৫ মাস চলমান থাকে। নিম্ন আদালতের রায়ে এক মাসের সাঁজা হয় মলয় রায়চৌধুরীর, পরে উচ্চ আদালতে বেকুসর ছাড়া পান। প্রচন্ড বৈদ্যুতিক ছুতার কোন স্বতন্ত্র কবিতা না হয়ে একটি সাহিত্য আন্দোলনের প্রতিনিধি হয়ে উঠল, কবি মলয় রায়চৌধুরীর এই আলোচিত কবিতা যে আন্দোলনের প্রতিনিধিত্ব করে তার নাম ‘হাংরি আন্দোলন’। হাংরি আন্দোলনের আন্দোলনকারীরা হাংরি জেনারেশনের কবি সাহিত্যিক হিসেবে পরিচিত। দেশভাগের পরবর্তী সময়ে বাংলা সাহিত্যে একধরনের প্রচলিত ধারায় পদচারণের দৃশ্যত অনুকরণ ইচ্ছা এবং তার প্রতিফলন  বাংলা সাহিত্যে এক স্থবিরতার জন্ম দেয়। এক প্রকারের স্থবির অবস্থা চলতে থাকে, এই স্থবিরতা ভেঙে দিতে ক্ষুদার্ত তরুণ কয়েকজন কবি-সাহিত্যিক মিলে ইস্তেহার বের করেন, পত্রিকা-হেন্ডবিলে প্রকাশ করতে থাকেন তাদের রচনা। ক্ষুধার্ত কবিদের সে সমস্ত সাহিত্য সে সময়ে রাষ্ট্র ও তার অনুগামীদের ভাল্লাগ্লোনা! রাষ্ট্র সে সাহিত্য আন্দোলনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলো!

জার্মান সমাজতাত্ত্বিক অসওয়াল্ড স্পেংলারের ‘দি ডিক্লাইন অব দি ওয়েস্ট’ গ্রন্থটি ছিলো হাংরি আন্দোলনের তাত্ত্বিকভিত্তি। এই বইয়ের দর্শনগত দিকদিয়ে সে সময়ের বাংলা সাহিত্য ও সামাজিক অবস্থাকে  ক্ষুৎপীড়িত  অবক্ষয় হিসেবে দেখলেন হাংরি জেনারেশনের কবিরা। স্পেংলারের মতো তারাও ভাবলেন, সংস্কৃতি কখনই একটি সরলরেখা বরাবর চলতে পারে না, পূর্ব পরিকল্পনা ছাড়াই সময়ে সময়ে তার পরিধি বিস্তার ঘটে। সংস্কৃতির গতিবিধি একটি জৈবিক প্রক্রিয়া। সংস্কৃতির সে গতিবিধি নিজস্ব সৃজনশীলতার দ্বারা বিকশিত ও সমৃদ্ধ করা সম্ভব। তবে সে সৃজনশীলতায় ঘটতি দেখা দিলে সংস্কৃতি অনান্য সমাজের দ্বারা প্রভাবিত হতে থাকবে, তৈরি হবে এক ক্ষুধার্ত পরিস্থিতির । হাংরি অন্দোলনের কবি সাহিত্যিকরা ৬০’র  দশককে ক্ষুৎকাতর সময় হিসেবে চিহ্নিত করেন। দেশভাগে পর থেকে জন্ম নিয়েছে এই  ক্ষুৎকাতরতার যা কাটিয়ে উঠতেই হাংরি আন্দোলনের সুত্রপাত। হাংরি আন্দোলনের সাহিত্যিকরা  তাদের আন্দোলনকে কাউন্টার কালচারাল মুভমেন্ট এবং তাঁদের সাহিত্যকর্মকে কাউন্টার ডিসকোর্স  হিসেবে প্রচার করেন।
 
১৯৬১ সালের নভেম্বর মাসে কলকাতার পাটনা থেকে ইস্তেহার প্রকাশের মধ্যদিয়ে হাংরি আন্দোলনের  জন্ম। শুরুর দিকে সমীর রায়চৌধুরী, মলয় রায়চৌধুরী, শক্তি চট্টোপাধ্যায় এবং দেবী রায়ের মতো কবি সাহিত্যিকরা ছিলেন এই অন্দোলনের দিকনির্দেশক হিসেবে , ১৯৬২ -৬৩’তে যুক্ত হন বিনয় মজুমদার, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, উৎপলকুমার বসু, সুবিমল বসাক, ত্রিদিব মিত্র ও ফালগুনী রায়ের মতো বাঙালি কবি সাহিত্যিকরা।

এই সাহিত্য আন্দোলনের প্রচারণা জন্য শুরু থেকেই  প্রকাশ হতো  একপৃষ্ঠার ব্যলেটিন। কলকাতার বিভিন্ন লাইব্রেরি, কফি হাউজে, কলেজগুলোতে  এবং পত্রিকা দফতরে বিতরণের মধ্য দিয়েই চলতো প্রচার অভিযান। এই প্রচারনার ফলে চারদিকে আন্দোলনের কথা পৌঁছাতে থাকে, অন্যদিকে এই সফলতার পাশাপাশি ১৯৬৩-৬৫ তে বেশকিছু পত্রিকাও প্রকাশিত হয় সেগুলোর মধ্যে সুবিমল বসাক সম্পাদিত প্রতিদ্বন্দ্বী, ত্রিদিব মিত্র সম্পাদিত উন্মার্গ, মলয় রায়চৌধুরী সম্পাদিত জেব্রা, দেবী রায় সম্পাদিত চিহ্ণ, প্রদীপ চৌধুরী সম্পাদিত ফুঃ অন্যতম ।

এসব বুলেটিন ও পত্রিকায় প্রকাশিত হয় কবিতা , অনুগল্প, নাটক, চিত্রকর্ম যার মধ্যদিয়ে উঠে আসে ধর্ম, রাজনীতি, জীবনবোধ,দর্শন । শিল্প বা আর্ট বলতে যা বুঝি তা যে ইউরুপিয়দের দ্বারা সংজ্ঞায়িত তাও সামনে নিয়ে আসেন মলয় রায়চৌধুরীরা, বাংলার শিল্প বা আর্ট তৈরী যে অতিসাধারণদের হাত ধরেও হয়েছিলো তাও গুরুত্ব সহকারে জায়গা পায় ইস্তেহারে, কবিগান ও কবিগানের ভাষারীতি যে অনন্য  বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন শিল্প তার প্রসঙ্গও জায়গা পায় আন্দোলনের ইস্তেহারে। শিল্প সৃষ্টিতেও শ্রোণীবৈষম্য যে একটি বিশেষ স্থান নিয়ে আছে, কাকে শিল্পী বলা হবে তাতে পুঁজিবাদের প্রভাব নিয়েও সচেতন অবস্থান হাংরি বুলেটনে উঠে আসে। প্রতিষ্ঠান বিরোধীরা ছিলো হাংরি জেনারেশন কবিদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য,তাঁরা প্রতিষ্ঠান বিরোধী প্রথম বাঙ্গালী সাহিত্যিক হিসেবে পরিচিত।

তাত্ত্বিক ও দর্শনগত বিষয়াদির কারণে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় সহ ইউরুপে হাংরি আন্দোলনের  পক্ষে সমর্থন তৈরী হয়। বিখ্যাত ইংরেজ কবি কবি অ্যালেন গিন্সবার্গ কলকাতায় থাকাকালীন ইংরেজি হাংরি বুলেটিনগুলো সংগ্রহ করে পরবর্তীতে স্ট্যনফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে দান করেন।

১৯৬৪ সালে মলয় রায়চৌধুরীর বিরুদ্ধে অশ্লীলতার দায়ে ‘প্রচন্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ সংক্রান্ত মামলায় সুভাষ ঘোষ ও শৈলেশ্বর ঘোষের মুচলেকা দেওয়া এবং আন্দোলনরত শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় ও উৎপলকুমার বসুর পুলিশের পক্ষে সাক্ষ্য দেওয়া সহ অনেকের অংশগ্রহণের কথা অস্বীকৃতির ফলে হাংরি অন্দোলনের সমাপ্তি ঘটে। পরবর্তীতে সত্তর দশকের দিকে অরুণেষ ঘোষ প্রকাশ করেন জিরাফ, অলোক গোস্বামী প্রকাশ করেন কনসেনত্রশান ক্যাম্প, সুভাষ ঘোষ সম্পাদনা করেন আর্তনাদ ইত্যাদি পত্রিকাতে আবারো হাংরি আন্দোলনকে জিইয়ে রাখার চেষ্টা হয় তবে তাও অচিরেই ব্যর্থ হয়।

বুধবার

মলয় রায়চৌধুরীর বিরুদ্ধে নালিশ ও হাংরি আন্দোলনকারীদের মুচলেকা


মলয় রায়চৌধুরীর বিরুদ্ধে নালিশ ও হাংরি আন্দোলনকারীদের মুচলেকা


শক্তি চট্টোপাধ্যায় : ( বয়স ৩১ বছর ) পিতা বামাচরণ চ্যাটার্জি । ঠিকানা ৪ অধরচন্দ্র দাস লেন, কলকাতা।
আমার নাম শক্তি চট্টোপাধ্যায় । আমি একজন স্নাতক এবং লেখক । আমি ইউএসআইস-এ একজন ক্যাজুয়াল অনুবাদক । এটা ঘটনা যে এই আন্দোলন কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে আমি আরম্ভ করেছিলাম। তারা প্রাথমিক উদ্দেশ্য থেকে সরে গেছে দেখে আমি এই আন্দোলনের সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন করেছি । আমি হাংরি জেনারেশন নামে পুস্তিকাটি দেখেছি যাতে আমার নাম প্রকাশকরূপে দেখানো হয়েছে । এই তথাকথিত হাংরি জেনারেশনের সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক ছিল না এবং আমি তা প্রকাশ করিনি । আমি মলয় রায়চৌধুরী ও তার দাদা সমীর রায়চৌধুরীএবং সুভাষ ঘোষ, শৈলেশ্বর ঘোষ, প্রদীপ চৌধুরী ও উৎপলকুমার বসুকে চিনি । আমি মলয় রায়চৌধুরীর হাতের লেখার সঙ্গে পরিচিত । এই পুস্তিকাটি কোথা থেকে ছাপানো হয়েছে এবং কে এর খরচ দিয়েছে তা আমি জানি না ।
আমার মতে মলয় রায়চৌধুরীর রচনাগুলো মানসিক বিকৃতিতে পরিপূর্ণ এবং তার ভাষা নোংরা ।
আমি পুস্তিকাটির একটি কপি দেখেছি এবং মলয় রায়চৌধুরীর লেখা ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ শিরোনামের কবিতাটির ঘোর নিন্দা করেছি । ( ১৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৫, স্বাক্ষর শক্তি চট্টোপাধ্যায় ) । মলয় রায়চৌধুরীর বিরুদ্ধে পুলিশ পক্ষের সাক্ষী।
পবিত্র বল্লভ : ( বয়স ২২ বছর ) পিতা ঠাকুরদাস বল্লভ । ঠিকানা ২৮/এ পাইকপাড়া রো, কলকাতা ৩৭।
আমার নাম পবিত্র বল্লভ । ১৯৬৩ সালে আমি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর পাশ করেছি । কামারহাটির সাগর দত্ত ফ্রি হাই ইংলিশ স্কুলে আমি সহশিক্ষক । প্রথমদিকে যে আইডয়া নিয়ে হাংরি জেনারেশন আরম্ভ হয়েছিল তা আমি গ্রহণ করেছিলাম কিন্তু প্রাসঙ্গিক পুস্তিকাটি প্রকশের পর আমি বুঝতে পারি যে তারা মূল ধ্যানধারণা থেকে বিচ্যুত হয়েছে এবং তাদের সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন করি । যতোদূর আমার মনে আছে দুই বছর পূর্বে হাংরি জেনারেশনের দ্বিতীয় বা তৃতীয় সংখ্যায় আমার নাম কেবল প্রকাশিত হয়েছিল । তাদের সঙ্গে সম্পর্ক শেষ হবার পর আমি কোনো লেখা দিইনি । কোথা থেকে রচনাগুলি প্রকাশিত হয় এবং কে ছাপার খরচ দেয় তা আমি জানি না ।
আমার মতে তাদের রচনাবলী মানসিক বিকৃতিতে পূর্ণ এবং ভাষা বেশ নোংরা । আমি পুস্তিকাটির একটি কপি দেখেছি এবং মলয় রায়চৌধুরীর ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতাটির ঘোর নিন্দা করেছি । আমি মলয় রায়চৌধুরীর হাতের লেখার সঙ্গে পরিচিত । ( ৪ সেপ্টেম্বর ১৯৬৪, স্বাক্ষর পবিত্র বল্লভ ) । মলয় রায়চৌধুরীর বিরুদ্ধে পুলিশ পক্ষের সাজানো সাক্ষী ।
শৈলেশ্বর ঘোষ : ( বয়স ২৬ বছর ) পিতা বিশেশ্বর ঘোষ । ঠিকানা ১৬/বি শ্যামাচরণ মুখার্জি স্টপিট, কলকাতা এবং রঘুনাথপুর গ্রাম, পুলিশ স্টেশান বালুরঘাট, জেলা দিনাজপুর, পশ্চিমবঙ্গ ।
আমার নাম শৈলেশ্বর ঘোষ। আমার জন্ম বগুড়ায় আর বড় হয়েছি বালুরঘাটে। আমি ১৯৫৩ সনে বালুরঘাত হাই ইংলিশ স্কুল থেকে স্কুল ফাইনাল পাশ করেছি, ১৯৫৫ সনে বালুরঘাট কলেজ থেকে আই এস সি, ১৯৫৮ সনে বালুরঘাট কলেজ থেকে বি এ, আর ১৯৬২ সনে কলকাতার সিটি কলেজ থেকে বাংলায় স্পেশাল অনার্স। ১৯৬৩ সনে সেপ্টেম্বর মাসের শেষ দিকে একদিন কলেজ স্ট্রিট কফি হাউসে দেবী রায় ওরফে হারাধন থাড়া নামে একজন তাঁর হাংরি জেনারেশন ম্যাগাজিনের জন্য আমাকে লিখতে বলেন। তারপরেই আমি হাংরি আন্দোলনের লেখকদের সঙ্গে পরিচিত হই। আমি ব্যক্তিগতভাবে খ্যাতিমান লেখক সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, রবীন্দ্র দত্ত, বাসুদেব দাশগুপ্ত, প্রদীপ চৌধুরী এবং উৎপলকুমার বসুকে চিনি। গত এপ্রিল মাসে একদিন কলেজ স্ট্রিট কফিহাউসে মলয় রায়চৌধুরীর সঙ্গে আমার দেখা হয়, এবং তিনি আমার কাছে কয়েকটা কবিতা চান। তাঁর কাছ থেকে জানতে পারি যে হাংরি জেনারেশন প্রকাশিত হবে । একমাস আগে  তাঁর কাছ থেকে একটা পার্সেল পেয়েছি, তাতে কপিগুলো ছিল। আমি মলয় রায়চৌধুরীকে চিনি। তিনি হাংরি আন্দোলনের স্রষ্টা। হাংরি জেনারেশন ম্যাগাজিনে আমি মোট দুবার কবিতা লিখেছি। মলয় আমাকে কিছু লিফলেট আর দুতিনটি পত্রিকা পাঠিয়েছিলেন কিন্তু সেগুলি সম্পর্কে কোন নির্দেশ তিনি আমাকে দেননি। সাধারণত এইসব কাগজপত্র আমার ঘরেই থাকত। এটুকু ছাড়া হাংরি আন্দোলন সম্পর্কে আমি আর কিছু জানি না। অশ্লীল ভাষায় লেখা আমার আদর্শ নয়। আমি উপরোক্ত ঠিকানায় ৪৫ টাকা মাসিক ভাড়ায় আমার আত্মীয় সুভাষ ঘোষের সঙ্গে গত দুই বছর যাবত রয়েছি । ১৯৬২ থেকে আমি হুগলি জেলার ভদ্রকালীতে ভূপেন্দ্র স্মৃতি বিদ্যালয়ে স্কুল টিচার। মাইনে পাই দু’শ দশ টাকা। বর্তমান সংখ্যা হাংরি বুলেটিনের প্রকাশনার পর, যা কিনা আমার অজান্তে ও বিনা অনুমতিতে ছাপা হয়, আমি এই সংস্হার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছি। ভবিষ্যতে আমি হাংরি আন্দোলনের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক রাখব না এবং হাংরি পত্রিকায় লিখব না। আমি অশ্লীল রচনা লিখব না এবং তা আমার সাহিত্যিক নির্ণয় । বর্তমান বুলেটিনটি ছাপিয়েছেন প্রদীপ চৌধুরী। ( ২ সেপ্টেম্বর ১৯৬৪, স্বাক্ষর শৈলেশ্বর ঘোষ ) । মলয় রায়চৌধুরীর বিরুদ্ধে পুলিশ পক্ষের রাজসাক্ষী ।
                                            

সমীর বসু : ( বয়স ২৩ বছর ) । পিতা রাখালচন্দ্র বসু । ঠিকানা ৫/এ মোতিলাল শীল লেন, কলকাতা ১১
আমি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতকোত্তর ও বর্তমানে বেকার । আমি একজন লেখক এবং কলেজ স্ট্রিট কফিহাউসে প্রায়ই যেতাম, যেখানে সন্ধ্যাবেলায় কলকাতার কমবয়সী লেখকরা একত্রিত হন । আমি হাংরি জেনারেশনের উদ্যোক্তা শক্তি চট্টোপাধ্যায়, উৎপলকুমার বসু, মলয় রায়চৌধুরী ও সমীর রায়চৌধুরী সম্পর্কে জানতে পেয়েছিলাম ।
আমি এবং আরও কয়েকজন লেখক অর্থাৎ আনন্দ চট্টোপাধ্যায়, মলয় দাশগুপ্ত, শংকর দে ও অন্যান্য অনেকে সাহিত্যের সম্পর্কে  হাংরি জেনারেশনের মতাদর্শ অনুমোদন করিনি ।
আমার মতে তাদের রচনাবলী মানসিক বিকৃতির প্রকাশ এবং ভাষা অত্যন্ত নোংরা । বিদেশি বিট কবিদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে এই আন্দোলন শক্তি চট্টোপাধ্যায় আরম্ভ করেছিলেন কিন্তু মলয় রায়চৌধুরী এই আন্দোলনের নেতা নন । আমাকেও হাংরি জেনারেশনে লিখতে বলা হয়েছিল কিন্তু আমি অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেছিলাম ।
ওরা কফিহাউসে যে ম্যানিফেস্টোগুলো বিতরণ করত তার কয়েকটা আমি পেয়েছিলাম । এই বিশেষ পুস্তিকাটি মলয় রায়চৌধুরীর উদ্যোগে প্রকাশিত হয়েছিল । আমি তাকে দেখেছি কফিহাইসে লেখকদের কাছ থেকে লেখা চাইতে । এই পুস্তিকাটি আমি দেখেছি এবং মলয়ের লেখা ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতাটি তৎক্ষণাৎ নিন্দা করেছি ।
আমি মনে করি যে সাহিত্যের নামে এই ধরণের অশ্লীলতা এখনই বন্ধ করে দেয়া উচিত ।
( ৪ সেপ্টেম্বর, ১৯৬৪, স্বাক্ষর সমীর বসু ) । মলয় রায়চৌধুরীর বিরুদ্ধে পুলিশ পক্ষের সাজানো সাক্ষী ।
সুভাষ ঘোষ: ( বয়স ২৭ বছর ) । পিতা শরৎচন্দ্র ঘোষ । ঠিকানা ১৬বি শ্যামাচরণ মুখার্জি স্টিট, কলকাতা ২ এবং গ্রাম শেখেরপোলা, পুলিশ স্টেশান বগুড়া, পোস্ট ভবানীগঞ্জ, জেলা বগুড়া, পূর্ব পাকিস্তান ।
আমার নাম সুভাষচন্দ্র ঘোষ, পিতা শরৎচন্দ্র ঘোষ। আমি ১৬বি শ্যামাচরণ স্ট্রিট, কলকাতা-২-এর একতলার একটি ঘরে শৈলেশ্বর ঘোষের সঙ্গে থাকি, যে আমার দূর সম্পর্কের আত্মীয় । বাড়ির মালিক অমূল্য দে ঐ বাড়িতেই থাকেন এবং আমাদের কাছ থেকে ৪৫ টাকা মাসিক ভাড়া আর ইলেকট্রিক খরচের জন্য দুই টাকা নেন।আমি এবং শৈলেশ্বর ঐ ঘরে গত দুই বছর থেকে রয়েছি । ১৯৪৯ বা ১৯৬০ সালে আমি বগুড়া থেকে বালুরঘাটে মাইগ্রেট করি এবং আমার খুড়তুতো ভাই মৃণালকান্তি ঘোষ, যিনি একজন ব্যবসায়ী তাঁর  বাড়িতে আশ্রয় নিই । বালুরঘাটে আমাকে বালুরঘাট হাই স্কুলে ক্লাস এইটে ভর্তি করা হয় এবং ১৯৫৩ সালে আমি সেখান থেকে স্কুল ফাইনাল পাস করি । ১৯৫৫ সালে বালুরঘাট কলেজ থেকে আইএস সি পাশ করি । সাধারণত আমি আমার খরচ আমার পিতা এবং বিশেষ করে আমার বড়ো ভাই অতুলচন্দ্র ঘোষ, যিনি দ্বারভাঙ্গা শুগার মিলে কাজ করেন তাঁর কাছ থেকে পেতাম ।
১৯৫৫ সালে আমি কলকাতায় আসি ও বিদ্যাসাগর কলেজে বিএসসি পড়ার জন্য ভর্তি হই এবং কর্নওয়ালিস স্ট্রিট, কলকাতায় বিদ্যাসাগর লজে থাকা আরম্ভ করি ।
১৯৫৭ সালে আমি বিএসসি পাশ করি। তারপর, অর্থাৎ ১৯৫৮ সালে সিটি কলেজে বিএ কোর্সে ভর্তি হয়ে এক বছরের জন্য পড়ি । ব্যক্তিগত কারণের জন্য আমি ঐ কলেজে ছাত্র হিসাবে উইথড্র করে নিয়ে ১৯৬০ সালে প্রাইভেটে পরীক্ষা দিই । সেই বছরই আমি হজুরি মল লেনের ( মুচিপাড়া  পুলিশ স্টেশান ) বেঙ্গল লাইব্রেরি অ্যাসোশিয়েশান থেকে লাইব্রেরিয়ানশিপের সার্টিফিকেট কোর্স পাশ করি । ১৯৬১ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ডিপ্লোমার জন্য ভর্তি হই এবং ১৯৬২ সালে সাফল্যের সঙ্গে পাশ করি । ১৯৬২ সালে আমি হুগলি ইন্সটিটিউট অফ টেকনোলজিতে মাসিক ১৮৯ টাকায় গ্রন্হাগারিকের চাকরি পাই এবং এক বছর কাজ করার পর পদত্যাগ করে বালুরঘাটে আমার অসুস্হ পিতাকে দেখতে যাই ; তিনি মারা যান । ১৯৬৩ সালের নভেম্বর বা ডিসেম্বর মাসে  আমি কলকাতায় ফিরে এসে ইনটারভিউ দিই এবং জুলাই ১৯৬৪ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বেলেঘাটাস্হিত ডিগ্রি কলেজ অফ সেরামিক টেকনোলজিতে গ্রন্হাগারিকের চাকরি পাই ।
গত এক বৎসর যাবত আমি কলেজ স্ট্রিট কফিহাউসে যাতায়াত করছি । সেখানে একদিন হাংরি আন্দোলনের উদ্ভাবক মলয় রায়চৌধুরীর সঙ্গে পরিচয় হয় ; সে জানায় যে সে একজন লেখক । সে আমার কাছ থেকে একটা লেখা চায় । হাংরি জেনারেশন বুলেটিনের প্রকাশের খবর আমি জানি বটে কিন্তু হাংরি আন্দোলনের যে ঠিক কী উদ্দেশ্য তা আমি জানি না । আমি তাকে আমার একটা লেখা দিই যা দেবী রায় সম্পাদিত হাংরি জেনারেশন পত্রিকায় প্রকাশিত হয় । আমি তা আমার রুম মেট শৈলেশ্বর ঘোষের কাছ থেকে পাই । সে হাংরি বুলেটিনের একটা প্যাকেট পেয়েছিল। আমি প্রদীপ চৌধুরী, সুবো আচার্য, বাসুদেব দাশগুপ্ত, উৎপলকুমার বসু, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় এবং অন্যান্য লেখকদের সঙ্গে ১৯৬৪ সালে দেখা করি ।
আমি এই ধরণের আন্দোলনের সঙ্গে কখনও নিজেকে জড়াতে চাইনি, যা আমার মতে খারাপ । আমি ভাবতে পারি না যে এরকম একটা পত্রিকায় আমার আর্টিকেল ‘হাঁসেদের প্রতি’ প্রকাশিত হবে । আমি হাংরি আন্দোলনের আদর্শে বিশ্বাস করিনা, আর এই লেখাটা প্রকাশ হবার পর আমি ওদের সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন করেছি । অশ্লীল রচনা লেখা আমার উদ্দেশ্য নয় এবং পূর্বেও ছিল না । ( ২ সেপ্টেম্বর ১৯৬৪, স্বাক্ষর সুভাষ ঘোষ ) । মলয় রায়চৌধুরীর বিরুদ্ধে পুলিশ পক্ষের রাজসাক্ষী ।
                                                  

উৎপলকুমার বসু : ( বয়স ২৮ বছর ) । পিতা : পি.কে. বসু । ঠিকানা : ২৫ রয়েড স্ট্রিট, কলকাতা ২৬
আমি অবিবাহিত এবং আমার বয়স ২৮ বছর । বর্তমানে আমি ২৫ রয়েড স্ট্রিটে থাকি । আমি জিওলজিতে স্নাতকোত্তর এবং আশুতোষ কলেজে লেকচারার হিসাবে যুক্ত ।
১৯৬২ সালে বা তার কাছাকাছি সময়ে হাংরি জেনারেশন প্রকাশনা সর্বপ্রথম আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করে । আমি সাহিত্য আন্দোলনে আগ্রহী ছিলাম । পরে আমি মলয় রায়চৌধুরীর সঙ্গে পরিচিত হই এবং তার দাদা সমীর রায়চৌধুরী আমার পূর্বপরিচিত । এই গোষ্ঠীর একত্রিত হবার জায়গা ছিল কলেজ স্ট্রিট কফিহাউস এবং ক্রমে-ক্রমে আমি অন্য সদস্যদের সঙ্গেও পরিচিত হই, যথা শৈলেশ্বর, সুভাষ এবং দেবী রায় ওরফে হারাধন ধাড়া এবং তাদের অনুরোধে আমি বিভিন্ন সময়ে হাংরি জেনারেশন পুস্তিকায় প্রকাশের জন্য লেখা ও কবিতা দিয়েছি । প্রকাশনাটি কোথা থেকে ছাপানো হতো এবং কে এর ছাপাবার খরচ দিতেন তা আমি জানি না ।
১৯৬৪ সালে গ্রীষ্মের সময়ে মলয় পাটনা থেকে কলকাতায় এসে আমাকে জানান তিনি পুস্তিকা প্রকাশের ব্যবস্হা করছেন এবং আমাকে একটি লেখা দিতে অনুরোধ করেন । আমি ‘কুসংস্কার’ নামে একটি লেখা দিই । আমি ব্যক্তিগতভাবে পাণ্ডুলিপি মলয়কে দিয়েছিলাম ও তারপরে কলকাতা ছেড়ে ডালহাউসি রওনা দিই, যেখানে আমি প্রায় দু’মাস ছিলাম । কলকাতায় ফিরে আমি কলেজ স্ট্রিট কফিহাউসে পুস্তিকাটির একটি কপি দেখতে পাই । পরে আমি ডাকেও একটি কপি পাই ।
আমার মতে মলয় রায়চৌধুরীর রচনাবলী নিদারুণ বিরক্তি ও ননসেন্সের বোধ বহন করে । আমি মনে করি ওদের সাহিত্য আন্দোলন দুশ্চরিত্রতায় অধঃপতিত হয়েছে এবং সেকারণে আমি হাংরি জেনারেশনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছি । মলয়ের হাতের লেখা দেখার সুযোগ আমার হয়েছে ।
( ৫ এপ্রিল ১৯৬৫ , স্বাক্ষর উৎপলকুমার বসু )। মলয় রায়চৌধুরীর বিরুদ্ধে পুলিশের পক্ষের সাক্ষী ।
সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় : ( বয়স ৩০ বছর ) । পিতা : ইউ এন চ্যাটার্জি । ঠিকানা : ১৮ সারদা চ্যাটার্জি লেন, হাওড়া ।
আমি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক এবং কলকাতা কর্পোরেশনে অ্যাসিসট্যান্ট ইন্সপেক্টরের চাকরি করি । সেই সঙ্গে আমি একজন লেখক এবং কলেজ স্ট্রিট কফিহাউসে যেতাম যেখানে সন্ধ্যাবেলায় কলকাতার তরুণ সাহিত্যিকরা একত্রিত হন । সমীর রায়চৌধুরী আমার ব্যক্তিগত বন্ধু । হাংরি জেনারেশনের উদ্যোক্তা অর্থাৎ শক্তি চট্টোপাধ্যায়, মলয় রায়চৌধুরী ও অন্যান্যদের সঙ্গে আমি পরিচিত হই । যদিও আমি হাংরি জেনারেশনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নই, সাহিত্য আন্দোলনে আমার আগ্রহ ছিল । হাংরি জেনারেশনের কয়েকটি ম্যানিফেস্টোতে আমার রচনার বিজ্ঞাপন আছে । একটি প্রকাশনায় আমার নাম প্রকাশক হিসাবে ছাপা হয়েছে । তা করা হয়েছে লেখক হিসাবে আমার খ্যাতি ব্যবহার করার জন্য কিন্তু যেহেতু আগে থাকতে আমার অনুমতি নেয়া হয়নি, আমি প্রতিবাদ করি । বর্তমান প্রকাশনাটিও আমার চোখে পড়েছে । একজন কবি হিসাবে আমি মলয় রায়চৌধুরীর  ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতাটির বিষয়বস্তু কিংবা ভাষাকে অনুমোদন করি না । মলয় রায়চৌধুরীর সঙ্গে চিঠিপত্রে আমার যোগাযোগ ছিল, সে সাহিত্যিক বিষয়ে আমার মতামত চাইতো । ( ১৫ মার্চ ১৯৬৫, স্বাক্ষর সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় ) । মলয় রায়চৌধুরীর বিরুদ্ধে পুলিশের পক্ষের সাক্ষী ।

শুক্রবার

একটি কবিতার জন্য : তাহসিন মল্লিক

একটি কবিতার জন্য ১৯৬৪ সালে মলয় রায়চৌধুরীর বিরুদ্ধে মকদ্দমা করেছিল তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গ সরকার। মলয়ের হাতে হাতকড়া পরিয়ে ও কোমরে দড়িবেঁধে প্রথমে থানায় এবং থানা থেকে ছয়-সাতজন অপরাধীর সঙ্গে রাস্তা দিয়ে হাঁটিয়ে কোর্টে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। মলয়ের বিরুদ্ধে ৩৫ মাস মামলাটি চলে প্রথমে নিম্ন আদালতে, যেখানে মলয়ের একমাস জেলের সাজা ঘোষিত হয় ও তারপর কলকাতা উচ্চ আদালতে, যেখানে তিনি বেকসুর ছাড়া পান। মলয়ের পক্ষে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন তরুণ সান্যাল, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, জ্যোতির্ময় দত্ত, সত্রাজিৎ দত্ত ও অজয় হালদার। পাঠকের হয়ত আশ্চর্য লাগবে, মলয়ের বিরুদ্ধে পুলিসের পক্ষের সাক্ষী ছিলেন শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় ও উৎপলকুমার বসু। দুজন পুলিস ইনফর্মার, পবিত্র বল্লভ ও সমীর বসু, ছিলেন পুলিসের ভুয়ো সাক্ষী, যাঁরা মলয়ের পরিচিত না হওয়া সত্ত্বেও কোর্টে জানান যে মলয়ের সঙ্গে তাঁদের বহুবার কফিহাউসে দেখা হয়েছে। সবচেয়ে লজ্জার যে দুজন হাংরি আন্দোলনকারী রাজসাক্ষী , অর্থাৎ অ্যাপ্রুভার, হয়ে মলয়ের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেন; তাঁরা দুজন হলেন শৈলেশ্বর ঘোষ ও সুভাষ ঘোষ।এঁদের সাক্ষ্যের কারণেই নিম্ন আদালত মলয়কে সাজা দিয়েছিল ।

অজিত রায় : আভাঁগার্দ আন্দোলন - হাংরি আন্দোলন

                                     

নষ্ট তৈজসে সমলৈঙ্গিক গিল্টি

অজিত রায়

কলকাতা-কেন্দ্রিক ন্যাকাচিত্তির সাহিত্যের এঁদো কপচাবাজি এবং তার ভেক্টর প্রতিষ্ঠানের মুখে জোর থাপ্পড় মেরে তার গিল্টি-করা দাঁত উখড়ে তার ভেতরকার মালকড়ি ফাঁস করে দিতে আজ থেকে তিপ্পান্ন বছর আগে দানা বেঁধেছিল বাংলা সাহিত্যের প্রথম আভাঁগার্দ আন্দোলন ----- হাংরি জেনারেশন।  যা ছিল আক্ষরিক অর্থেই কলকাতার বাইরের কবি-লেখকদের নয়াল সংযোজন।  তাঁরা এসেছিলেন এমন এক মিলিউ থেকে যেখানে বাংলার তথাকথিত ভদ্রায়তনিক সংস্কৃতির কোনও শিস-ই গজাবার নয়।  জীবনের অনেকরকম শিক্ষা থেকে বঞ্চিত থাকতে হয় যেখানে।  হাংরি সাহিত্যের কলিন অধ্যয়নে এই প্রেক্ষাপটটি সর্বাগ্রে মাথায় রাখতে হবে।  এই হাঙ্গামার প্রধান স্রষ্টা মলয় রায়চৌধুরীর শৈশব অতিবাহিত হয়েছিল বিহারের ভয়ঙ্কর কুচেল অধ্যুষিত বাখরগঞ্জ বস্তিতে।  তাঁর টায়ার ছোটবেলা অতিক্রান্ত মুসলিম অধ্যাসিত দরিয়াপুর মহল্লায়।  সেই অস্বাচ্ছন্দ্য, অখল জ্বালা, ক্ষোভ আর বিদ্রোহকে বুকে করে মলয়ের বেড়ে ওঠা।  সংস্কৃতির একেবারে নিচেকার পাদানি থেকে আসা, নিম্নবিত্ত থেকে মধ্যবিত্তে ওঠার প্রতিটি মানুষী শঠতার সাক্ষী, স্পেঙলারের সংস্কৃতি ও অবক্ষয়কালীন সর্বগ্রাস তত্ত্বে তা-খাওয়া একজন বাইশ-তেইশ বছরের কৃষ্টিদোগলা বা কালচারাল বাস্টার্ড লেখালেখির মাঠে এলে যা ঘটবে, সেটা তো রফা হয়েই ছিল।


১৯৫৯-৬০।  বৃটিশবীর্যিত মুলুকের পোঁদে গাঁড়সা পুঁতে গাদি সামলাচ্ছেন নেহেরু।  দেশের দুই প্রান্তে পার্টিশানের টসটসে পাঁচড়া।  পুব পাকিস্তান থেকে আগত অন্যৎপুষ্ট মানুষের কিছু থোপনা তখনও আনলোড হচ্ছে শেয়ালদার টেসেলেটেড চাতালে।  হাভাতে মানুষের কেরবালা বিধানবাবুর গড় জুড়ে ছিৎরে পড়ছে।  দেশভাগের সময় পুব বাঙলা থেকে যে কিশোরগুলো বাবা-মায়ের কড়ে ধরে কলকাতায় এসেছিল, তারা এদণ্ডে গাগতরে বেতর, কিন্তু বয়সে ও মগজে সাজোয়ান।  দেশভাগের খসা চোকলা।  কাঁধের চিক্কুটে ঝোলায় কবিতার লাজুক খাতা আর কলা-ওঠা টিনের সুটকেশ ঢুয়ে কলকাতার রাস্তায় গলিঘুঁজিতে এক রাত্তির হিল্লের মনসুবায় চোখমুখ কালিয়ে ঘুরে বেড়ায় আর সাঁঝের আলা মদ্দিম হলে সারমেয় অধ্যাসিত ফুটপাতে, হয়ত-বা কোনও দয়াল বন্ধুর ঘাড়ে অথবা গেরস্ত বাড়ির হেঁসেল-ঠোরে রাত গুজরান।  ইহাদের প্রত্যেকের বুকে কবিতা নামের পিলপিলে গণ্ডুপদটি ক্ষণে ক্ষণে ঢসন মারে।  ইহারা সকলে প্রবল কবিতা-পিশাচ।  পিশাচ, কেননা ইহাদের মাঘার ঘিলুতে জবরদস্ত পুঁজরক্ত যাহা গোপন আঁধারে কলম দিয়া চোয়ায় আর দেউলের দেউটি সহসা নিভায়।


ষাটোত্তর গরদিশের দিনগুলি।  গেরস্তের জবরদখল-করা হেঁসেলে আচকা নোটিশ হয়ে গেল।  ভাঙা আয়না, দাঁড় টুনানো চিরুনি, তেলের শিশি, জীর্ণ ফতুয়া, কলা-ওঠা টিনের সুটকেশ আর লজ্জাবতী কবিতার ধুকড়ি নিয়ে পথে দাঁড়াল সুভাষ।  সুভাষ শলা করল, ----- শৈল, চ, দুজনে মিলে একটা ঘর নিই।  টালায় ১৬-বি শ্যামচরণ মুখার্জি স্ট্রিটের একতলায় দুর্গন্ধ-পীড়িত ফালি-খানেক ঘর যোগাড়ও হয়ে গেল।  খিড়কির পাল্লা সরালেই ড্রেনের ধারে পাছা ঝুলিয়ে নিত্যকর্মে ব্যস্ত কৃশগাঁড় বিভীষিকা।


সুভাষের গেরামের ইশকূলে কমপয়সার চাকরি।  দু-বেলা যুৎসই অন্ন জোটে না বটে, কিন্তু গদ্যের হাতটি খাসা।  তাহাতে ড্যাশ ও হাইফেনের যাচাই ভুরিভোজ।  শৈলেশ্বরেরও মতিগতি উনিশবিশ।  অল্প পড়াশোনা।  ভাঙাচোরা ফ্যামিলির ছেলে।  অশহুরে, তথা জন্মলব্ধ সারল্য ও সততা।  ফলে মানিকজোড় হতে সূর্যঘড়ি লাগেনি।  দুজনেই টিউশানি ধরে, আর ছাড়ে।  হপ্তায় দু-দেড় দিন ভিজিট, আর চার-পাঁচদিন একুনে নাগা।  ফলে আট থেকে দশদিনের মাথায় জবাব হয়ে যায়।  খাওয়ার পয়সা নেই।  বৃদ্ধ পিতা পঙ্গুত্বের লেংগি খেয়ে খাটের প্রাণী।  ছাত্র-রাজনীতির গাজোয়ারি-প্রসূত 'লম্বা' হাঁকন বাবদ আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে নীমসম্বন্ধ।  ফলে, দিনগুলি বেজায় নড়বড়ে, জীবনযাত্রা ধূরিপথহীন।  সাহিত্য করা তো দূর অস্ত, সাহিত্যের জিগির-মাত্রে পিছদাঁড়ায় কাঁপন।  ডাইনির ছমছমে খিখি অষ্টপ্রহর।  ক্কচিৎ পকেটে বাড়তি খুচরো জুটলে শ্যালদার চোরা-হোটেলে জলের সঙ্গে পাঞ্চ করে, ভরদুপুরে কান্ট্রি-লিকার।  শ্যামবাজারের জন্তা হোটেলে ছ'আনায় ভরপেট খানা।  লেটনাইটে ঘুমের ধাক্কায়, বাড়ি।  একজনের ঘুম জুটত, অন্যজনের জুটত না।  শৈলেশ্বরের ছিল ইনসোমনিয়ার ব্যামো।  সারা-সারারাত মরা মাছের নিস্পন্দ চাউনি সিলিং-পানে।


সুভাষরা একসময় ক'জন বন্ধু মিলে 'এষণা' নামে একটা কাগজ বের করত।  খুবই পাতি, অতীব বালখিল্য সে কাগজ।  সুভাষ-বাদে অন্যরা সবাই মামুলি মাস্টারবেট-করা লেখক, মানে পার্ট-টাইম।  অল্প খিঁচে নিল, ব্যস, সাহিত্যের বাঘ মারা হয়ে গেল।  আপিসে-আপিসে কেরানিগিরি, আর রোববার সকালে পাঁচ পয়সায় আধ প্যাকেট ক্যাপস্টান কিনে শ্যামবাজার কফিহাউসে ধুন্ধুমার আড্ডা।  কফির কাপ আর তামাকের কড়া ধোঁয়ায় বাঙালির বেড়ে বাফুনারি।  শৈলেশ্বর-সুভাষরা ইন্টেলেকচুয়াল নয়, গেঁয়ো বুদ্ধি, গেঁয়ো কথাবার্তা।  অপরপ্রান্তে, ধাউড়দের মুখে বিদিশি বই, ফরেন-কলমচিদের রেফারেন্স।  ইনজিরির ছররা।  দুজনের মধ্যে শৈলেশ্বরের বুদ্ধি একটু খোলা, মওকা বুঝে, সময় থাকতে কাগজটাকে নিজের হেফাজতে নিল।  কাপ্তানি সুভাষের, কিন্তু কলকাঠি শৈলর হাতে।  অবশ্য, চারটে মাত্র ইস্যুই হাপিস হয়েছিল 'এষণা'র।। হাংরি জেনারেশান সাহিত্যের ঐ ছিল গর্ভ-সূচনা।  অচিরেই এষণার ছাদনায় এসে ভেঁড়ে প্রদীপ আর সুবো।


এবং আরও একজন।  বছরটা ১৯৬৩।

ছেলেটির বয়স কুড়ি।  রুজির যোগাড়ে গোড়ার দিকে থাকত কলকাতায়।  টালা ব্রিজের কাছে খেলাত বাবু লেনে।  বারোঘর এক উঠোনের একটি পোড়া বাড়িতে।  সারাদিন রুজির খোঁজে, ফিরত রাত নিবিড়ে।  পড়ে ন্যুনাধিক একটা হিল্লে হলে, অশোক নগরের উদ্বাস্তু কলোনিতে পাকাপোক্ত নোঙর।  সেও ছিল দেশভাগের ঠাঁটা চোকলা।  ডাঁসা বাঙাল।  জিরজিরে শরীর।  উপদ্রুত মন।  চাঁচাড়ি-ঘেরা তার এক-কাটরা বাড়ি।  ছেঁড়া শাড়ির গাঁঠরি।  বাতায় ঠোঁসা সরষে তেলের শিশি।  একটিপ তেল মেখে, শ্যালো টিপে দু-বালতি জলে স্নান সেরে ও গামছায় সর্বাঙ্গ মুছে, ভাঙা আয়নার সামনে ব্যাকব্রাশে টেরি চিরে দরমার দরজা ভেজিয়ে এক রোববার সে ঐ 'এষণা'র ঠেকে।  লেট এন্ট্রি।

ছেলেটির নাম বাসুদেব দাশগুপ্ত।


হালিতেই সে ঝুলি থেকে বের করে এগিয়ে দ্যায় একটি লিটল ম্যাগাজিন।  পবিত্র বল্লভ সম্পাদিত 'উপদ্রুত'।  তাহাতে একটি দীর্ঘ গদ্য, ---- নাম 'রন্ধনশালা'।  সে বলেছিল, 'গল্প'।

বাসুদেব 'রন্ধনশালা' রচনা করেন একষট্টিতে।  তেষট্টিতে সেটি ম্যাগাজিনে কৃষ্ণহরফ পায়।  গদ্যটি গ্রন্থত্ব লাভ করে উৎপলকুমার বসুর হেফাজতে, ১৯৬৫-তে।  শুধু এই রন্ধনশালার কথাই যদি বলতে হয়, এবং ১৯৬৩-র প্রথম আলোকনের সালটিকেই যদি ধরতে হয়, বলব, সেই সময়ের প্রেক্ষিতে ভারতবর্ষের সহস্র সহস্র বছরের সর্বঅস্তিত্বগ্রাসী ক্ষুধার এ-তুল্য বহিঃপ্রকাশ এবং তার এহেন গ্রাম্য আদিম রাস্টিক তথা অস্বস্তিকর ভাষায় আত্মপ্রকাশ একটা বড়সড় তহেলকার চেয়ে বিন্দুমাত্র উনিশ ছিল না।  এ ছিল এমন লেখা, যা পড়ার পর, বাংলা সাহিত্যের পাঠক আগের যা-কিছু পড়া সমস্ত হকহকিয়ে বমি করে দ্যায়।  বাংলা গদ্যের শেলফ প্রায় খালি হয়ে যায় রন্ধনশালা পৌঁছনোর পর।


রন্ধনশালার হব্যাশে সেদিন আকখা কলকাতা তোলপাড়।  খাসির ল্যাজ তুলে যাঁরা মাংসের বহর আন্দাজাতে পটু, সেইসব ঘোড়েল সমালোচকেরা অব্দি রচনাটিকে ফ্রানজ কাফকা, লুই ফার্দিনান্দ সিলিন এবং গিন্সবার্গ-এর সঙ্গে গুলিয়ে ফেলতে বাধ্য হয়েছিলেন।  বাসু-বন্ধু শৈলেশ্বর কবুল করেছিলেন : ইমাজিনেটিভ সাহিত্যের এহেন উদাহরণ বাংলাভাষায় খুব বেশি নেই।  বাস্তব অভিজ্ঞতাই লেখকের পা রাখার জায়গা, তারপরই বাসুদেব পাঠককে নিয়ে যান এক সম্পূর্ণ নতুন অভিজ্ঞতার মধ্যে।


আসলে, শৈলেশ্বর জানাচ্ছেন, তাঁদের মধ্যে যে ছোটলোক বা সংখ্যালঘুর মনোভাব কাজ করছিল, রন্ধনশালা ও তৎ-পরবর্তী গদ্যসমূহে সেটাকেই ঝাড়বাতির তলায় মেলে ধরেছিলেন বাসুদেব দাশগুপ্ত।


শৈলেশ্বর-বাসুদেব-সুভাষ-প্রদীপ-সুবো ----- এঁরা প্রত্যেকে ছিলেন একে-অপরের মতো, একই পেরিফেরির জীব। প্রত্যেকের জীবনের ব্ল্যাক-কমেডি উনিশবিশ একই খেপের।  চোখের সামনে দৃশ্যের পর দৃশ্য দেশভাগ, রক্ততোলা বেবুঝ দাঙ্গা, যুবতীর অস্মিতা-হরণ, লাখো মানুষের বুকে ভুখা ত্রাস, জঠরে জঠরে কান্না।  প্রায় প্রত্যেকের বাল্য ও যৌবন অস্বচ্ছন্দ, নিহায়ৎ গরিব, ছোটলোক আর অশিক্ষিত ফ্যামিলি থেকে আগত, বুকে অখল জ্বালা, ক্ষোভ আর বিদ্রোহকে কোলদাবা করে বেড়ে ওঠা।  আধুনিকতা নাম্নী সালংকরা পিশাচিনির পাছায় এঁরা চুমু খেতে পারেননি।  প্রত্যেকে কমবেশি লিজলিজে, ঘরকুনো, আত্মভুক।  ফলত, পরস্পরের বন্ধুত্ব সামীপ্য পেতে দেরি হয়নি।  সেই বন্ধুত্বের তলা ও তলানি ছিল কঠিন সিলেবেলে গাঁথা।  পাঁচজনের মধ্যে একটা সমকামী-সুলভ এঁঠেল প্রেম, ভাষান্তরে 'আত্মা-বিনির্মিত নির্বাক সম্পর্ক' ডেভালপ করেছিল।  এঁরা একে-অপরের নেশাতেই বিভোল থাকতেন।  এঁরা কে কত বড় লেখক ছিলেন, আদৌ ছিলেন কিনা, সেটা বড় কথা নয়।  বড় যেটা হলো, এঁরা অন্যদের মতো ফাঁপা-বুলি বা False Note লিখতেন না, নিজেরা ভুগে লিখতেন।  এঁদের লেখালেখির পেছনে একটিই আর্জি ছিল ----- পৃথিবীর সেই আদিতম মন্ত্রটি ------ 'আত্মানং বিদ্ধি' (know thyself), নিজেকে জানো।  অধ্যাত্মবিদ্যার এই মূল কথা রবীন্দ্রনাথেও প্রতিধ্বনিত ----- "অসীম যিনি স্বয়ং করেছেন সাধনা / মানুষের সীমানায়, / তাকেই বলে 'আমি'।"  আমি-র দুটো ডানা ---- শরীর আর মন।  প্রথমটি লোকাল, দ্বিতীয়টি গ্লোবাল।  উভয়ে মিশে গ্লোকাল।  এই দুই ডানাবিশিষ্ট যানে আরূঢ় হয়ে চলে আমি-র জীবনযাত্রা, জার্নি অফ লাইফ।  শরীরে ভর করে মহামনের সঙ্গে মনের যোগবন্ধনের প্রচেষ্টা।  হাংরি লেখকদের সরাসরি একটাই বিষয় ছিল ---- এঁদের লেখার বিষয় ছিল 'আমি'।  সেখানে কোনো মেকি অবগুণ্ঠন ছিল না।  বনেদি সমালোচকদের চোখে এঁরা 'নিরক্ষর' বলে দাগায়িত হলেও, মনে রাখতে হবে এঁরা কোনরকম ধান্দাবাজিতে না ঢুকে, যৎসামান্য সংঘশক্তি নিয়ে এবং 'নিজেদের জীবনচর্চাকে কাঁচামাল হিশেবে ব্যবহার করে' লেখালেখি করতেন।  যা অচিরেই, প্রতিষ্ঠান এমনকি প্রশাসনের বুকেও মৃদু হাড়কাঁপ ধরিয়ে দিয়েছিল।


পাঠক, এই এঁরা, যাঁদের কথা আপনি পড়ছেন, এঁদের একজন যা ভাবতেন, সকলে তা ভাবতেন।  এঁরা একই হারে চলমান বাংলা কবিতা আর গদ্যকে অ্যানিমিক ভাবতেন।  দেশভাগের আগে ও পরে সবুজপত্র, দেশ, কল্লোল, কবিতা, পরিচয়, পূর্বাশা প্রভৃতি 'শহুরে বাঙালি মানসের সমৃদ্ধ ও প্রত্যয়পূর্ণ চিন্তাক্ষেত্র' নামে পরিচিত ন্যাকাচিত্তির সাহিত্যবাজির যে ধারা বাংলা সাহিত্যকে অবক্ষয় আর প্যানপ্যানানির চূড়ান্তে এনে ছেড়েছিল, তার বিরুদ্ধে ষাট দশকের গোড়ায় এইসব হাংরি লেখকরাই হেনেছিলেন প্রথম ও সর্বাধিক জবরদস্ত ধাক্কা।  সে-কারণে প্রতিষ্ঠানের ক্যামপ্রাডর নমস্যদের বিগ্রহে মাটি খসে খড় বেরিয়ে যেতে দেখা গেছিল।  মাত্র দু-আড়াই জন কবি আর লেখককে এঁরা, বাসু-শৈলরা নিজেদের মতো করে 'আবিষ্কার' করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে জীবনানন্দ, ------ যিনি, বিদ্যায়তনিক উলেমাদের চোখে, এমন শব্দ ব্যবহার করেছেন যারা কবিতায় দূরে থাক 'ভদ্দরসমাজে' পর্যন্ত অচল।  সুতরাং, কফিঘরের আঁতেল ধোঁয়ায় ঘুরপাক না খেয়ে, এঁরা বুঁদ থাকতেন জীবনানন্দেই।  আর একজন এঁদের কিছুটা সমীহ আদায় করেছিলেন, তিনি মানিক বাড়ুজ্জে।  তিনি নাকি মানুষের ভিৎরি ফাঁপা অর্থহীন অঞ্চলকে ভারি সুন্দর ঢঙে ফাঁস করতে পারতেন, এঁদের মতে।  কিন্তু, পরে কমিউনিজমের 'কুচক্করে' ফেঁসে তাঁর লেখার ধার ও বহুমাত্রিকতা খসে পড়ে, এঁদের মতে।  একমাত্রিকতাই অবশ্য বামবাজ লেখকদের আগমার্ক ছিল, সেও এঁরা বুঝতেন।  এঁরা আরও টের পেয়েছিলেন যে সুভাষ মুখুজ্জের কবিতাগুলো আসলে শিশুতোষ ছড়া, আর সময় সেনীয় সাহিত্য স্রেফ শহুরে ধাউড়বাজি।  সন্দীপন চ্যাটার্জীর বিশেষত 'বিজনের রক্তমাংস' এঁদের ভালো লেগেছিল, কিন্তু অচিরেই যখন ফাঁস হয়ে গেল সন্দীপন আসলে স্প্যানিশ দার্শনিক উনামুনোর দ্যাখাদেখি লেখায় অসুস্থতার প্র্যাকটিস ওরফে ভাঁড়ামি করছেন, তখন এঁদের অ্যাবাউট টার্ন শুরু হয়ে যায়।  এঁরা এও খোঁজ পেয়েছিলেন, যে, লেখার সার্টিফিকেটের জন্য যাঁরা বুদ্ধদেব বসু, বিমল কর আর 'দেশ'-এর দোরে ধন্না লাগাতেন, সেই রোম্যান্টিকদের অন্যতম শিরোমণি সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়।  এঁরা সবই বুঝতেন, শুধু ঠিকঠাক সমঝে উঠতে পারতেন না শক্তি চ্যাটার্জীকে।  হ্যাঁ, এঁদের মতে, শক্তি চট্টোপাধ্যায় একটু বেশিই 'খেলেছেন'।  শক্তির কোন কোন কবিতা এঁদের চমকে দিত।  তারপরেই কোন লেখা মনে হতো এক্কেবারে 'পাইল করা মাল'।  কী ব্যাপার??  কফিহাউসে কানাঘুষো খবর উড়েছিল, কোন এক উঠতি কবির কবিতার খাতা নাকি শক্তির ব্যাগ থেকে খোয়া গেছে।  তারপর থেকেই নাকি অমন চেকনাই শক্তির কবিতায়।  ধন্দ কাটে না।  বর্ধমানের দামোদরে একদিন উদোম হয়ে নাইতে নেমেছেন শৈলেশ্বর, বুকজলে দাঁড়ানো উৎপলকুমার বসুকে জিগোলেন, 'কী দাদা, কথাডা কি সত্যি?'  উৎপলও কেমন, রহস্যমতন হেসে জানালেন, 'আমিও তো ভাই আপনাদের মতোই শুনছি।' ------ বলেই ডুব।


এবার সংক্ষেপে বুঝে নেওয়া যাক হাংরি-তোড়ফোড়ের প্রেক্ষাপট, বা সময়ের ডিম-লেয়ারটা।  অর্থাৎ কলকাতা বা হুগলি-চত্ত্বরের সন্নিহিত এলাকায় সেসময় কী-এমন ঘটেছিল যার দরুন ডাল-ভাত খাওয়া বাঙালি বাড়ির কিছু যুবা অমন-একটা ভাব-ঘূর্ণির ঝড়ে একজাই ক্ষেপে উঠল, ----- তার প্রেক্ষিতটা।


দেশভাগ হলো, 'স্বাধীনতা' নিয়ে শাঁখ-আবির হলো ----- আর তার পরপরই কবিরা কড়ে আঙুল ফাঁসিয়ে বাংলা কবিতার ন্যাড় আটকে দিলেন।  তাঁরা পাল্লা দিয়ে মেতে উঠলেন 'শহিদপ্রণাম' আর 'নয়া শপথ' গোছের টাইমপাশে।  পাশাপাশি অবশ্য বাংলা কবিতার পালে রোম্যান্টিক হওয়া লাগালেন রাম বসু, বটকৃষ্ণ দে।  তখন তো এমনি, নতুন কবি মাত্রেই রোম্যান্টিক আর তাতে কড়ারি তামা-তুলসী নিয়ে উঠে আসছে একটি নাম ----- দেবদাস পাঠক।  পুরনো কবিদের মধ্যে অজিত দত্ত, প্রমথনাথ বিশী, বনফুল আর খুব করে দাপাতে লেগেছেন প্রেমেন মিত্তির।  জীবনানন্দ বাদে অচিন্ত্যকুমার, শামসুর রাহমান, বিরাম মুখো, গোবিন্দ চক্কোত্তি, দীনেশ দাসদেরও হেব্বি বোলবালা।  উদিক থেকে আবার স্তবকান্তরে ছন্দান্তর ঘটিয়ে কবিতায় বিরল ছোঁক এনে দিয়েছেন নীরেন চক্কোত্তি।  চলছে পঞ্চাশের খেলা।  দ্যাখাদেখি কল্যাণ সেনগুপ্ত, অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তরাও নেমে পড়লেন আসরে।  বিজ্ঞপ্তি দেওয়া শুরু হলো যে 'আচ্ছে দিন' ফিরে আসছে বাংলা কবিতার।  যুদ্ধ-দাঙ্গা-দেশভাগ-রিফিউজি সমস্যা কাটিয়ে কবিতার স্বাস্থ্যে রিটার্ন আসছে নুরানি দ্যুতি।  শবেবরাত।  আখেরি চাহার শুম্বা।


আসলে ঘটনা ছিল বিলকুল উলোট।  আসলে চল্লিশ-পঞ্চাশ থেকেই বাংলা কবিতা পাঠক লস করতে শুরু করেছিল।  শঙ্খ-সুনীল-শক্তি-ফণীভূষণদের আসরে নামতে সামান্য লেট, এমন দিনে, ৫০-এর শুরুতেই বুদ্ধদেব বসু রটিয়ে দিলেন :'ছন্দ, মিল, স্তবকবিন্যাসের শৃঙ্খলা, এ-সব বন্ধনেই কবির মুক্তি।'  বুদ্ধিবাদী এনজয়মেন্টের ব্রেকিং নিউজ।  পঞ্চাশের লক্ষ্মীঘরানার ফোকাসবাজ কবিরা সেটা ঝপসে গিলে ফেললেন।  বিষয়ে ন্যাকাচিত্তির রোমান্টিকতা আর আঙ্গিকে রকমারি বেগুনপোড়া এনে তাঁরা 'ফাটিয়ে' দিতে চাইলেন বাংলা বাজার।  আলোক সরকার এসময় আঙ্গিকে আর শব্দের বিন্যাস নিয়ে এত কসরৎ করেন যে প্রতিটি কবিতা থেকে ক্র্যাকের পড়পড় শব্দ বেরুতে থাকে।  উপরন্তু, আনন্দ বাগচী রবীন্দ্র-গানের ফাটা রেকর্ডগুলো বাজিয়ে বাজিয়ে পাঠকের মূত্রপুটের বেঁটে দুববো ঘাসে মাচিশ ধরিয়ে দিলেন।  এসব করে পঞ্চাশের কবিরা এই ভেবে স্বমেহনের তৃপ্তি লাভ করলেন যে বাংলা কবিতায় 'প্রগাঢ় প্রতীতির সুর' দেখা দিয়েছে আর স্পষ্ট হয়েছে তার এক্সপোজ-ভঙ্গি।  কিন্তু এতে পাঠ্য-পাঠকের জগদ্দল সমস্যাটাই আরও বুকবাড়া পেল।  বিষয়ের গরিমা বাতায় ঠুঁসে স্রেফ আঙ্গিকের প্রাকটিস যে বাংলা কবিতার পক্ষে অশুভ হতে পারে তা যেন কেউ কেউ বুঝতে পেরেছিলেন।  সময়টা ছিল ৫০-এর মাঝামাঝি, বাংলা কবিতা তার সহজ-সুগম পথ ছেড়ে অচিরেই ন্যাকানাদা লিরিক আর আঙ্গিক-সর্বস্ব শব্দচচ্চড়ি হয়ে উঠল।


ফলে, অনিবার্যভাবেই ষাটে ঘটল সর্বস্তরিক তোড়ফোড়।  ষাট, কেবলমাত্র একটি সময়-চিহ্ন নয়, সময়ের শান্তশায়ী বুকে একটি পিরেনিয়াল আঁচড়, এক প্রবল ঘূর্ণাবর্ত ----- সত্তর ক্রশ করে আশিতে এসে যার পরিক্রমা সমিল হয়।  বাংলা কবিতাধারায় ঐ ন্যাকাচিত্তির কলাকৈবল্যবাদ আর লিরিকবাজির প্র্যাকটিসের খেলাপে প্রচণ্ড অনাস্থা আর বিরক্তি গনগনে অমর্ষ হয়ে আছড়ে পড়েছিল ষাটের ঐ হো-হাঙ্গামার দিনে, যখন প্রকাশ্য ডে-লাইটে ফুটপাথের হাঁড়িকাঠে গলা-ফাঁসানো পঞ্চাশিয়া কবিতার হালাল প্রত্যক্ষ করেছিল কলকাতা।  ন্যাকাচোদা ধুতি-কবিদের ফুল-দুববো কালচারের বিরুদ্ধে আধপেটা ছোটলোক ভবঘুরে বাউণ্ডুলে গাঁজাখোর চুল্লুখোর চরসখোর রেন্ডিগামী কবিদের তীব্র সাব-অলটার্ন আর ডায়াসপোরিক কাউন্টার কালচার চাক্ষুষ করেছে দিনদাহাড়ে ব্যাংক-রবারির ফিলমি কারকিতে।  ছোটলোকদের ওই ধরদবোচা অ্যাকশানে গাঁড় ফেটে গিয়েছিল প্রতিষ্ঠানের ধামাধরা ক্লিন-শেভড পাউডার-পমেটমপ্রিয় পঞ্চাশের কবিদের।  তাঁদের ভীতি সাব্যস্ত হয় যখন বাসুদেব দাশগুপ্তর 'রন্ধনশালা'কে চালিয়ে দেওয়া হয় 'বিবর'-এর ব্রিডিং ক্যাপসুল হিশেবে।  অন্যদিকে, কবিতার ক্ষেত্রে, মলয়-শৈলদের ঐ ভয়-পাওয়া কাউন্টার-অ্যাটাক দানা পেয়েছিল শঙ্খ ঘোষের এই শব্দগুচ্ছে : 'আত্ম অস্তিত্বের গূঢ়মূল আবিষ্কার, মৃত্যুর বোধ, অসুন্দর শয়তান আর পাপের ধ্যান একদল কবিকে একটি বিচ্ছিন্ন কুঠুরির মধ্যে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।'  এমনকি, সন্ত্রাসের পাল বুদ্ধদেবের হিক্কে-তোলা বোদলেয়রী বাতাবরনকে উচ্ছ্বাসভরে স্বাগত জানিয়ে ফেলেছিল।  এতে-করে পঞ্চাশের ল্যাসল্যাসানি ধরা তো পড়েই যায়, চল্লিশের কন্ডোমফোলা ফক্কাবাজিও ফাঁস হয়ে যায় একই লপ্তে।


সাহিত্যের আখড়ায় গোষ্ঠীতন্ত্র নয়াল কিছু নয়।  সাহিত্য নিয়ে আড্ডা, হুজুগ আর বাওয়াল যুগে যুগে।  সেই কোন ১৯০৫ থেকে পয়লা বিশ্বযুদ্ধের শেষ অব্দি লন্ডনের ব্লুমসবেরি মহল্লার এক থুত্থুড়ে কোঠায় ফি বেস্পতি সাঁঝে জমা হতেন সস্বামী ভার্জিনিয়া উলফ, রজার ফ্রাই, ক্লাইভ বেল, জন মেনার্ড কিন্স, ই এম ফর্স্টার, লিটন স্ট্র্যাচি, ডানকান গ্রান্ট প্রমুখ বুদ্ধিজীবীরা।  ইংরেজি সাহিত্যের ইতিহাসে ঐ আড্ডাবাজরা 'ব্লুমসবেরি গ্রূপ' নামে বিখ্যাত।  মোটামুটি ঐ ধাঁচেরই ছিল বাংলার বিনয় সরকার, সুনীতি চাটুজ্জে, সতীশচন্দ্র মুখুজ্জেদের 'ডন সোসাইটি'; এবং কিছু পরে প্রেমেন্দ্র-অচিন্ত্য-মানিক-প্রমুখের 'কল্লোল গোষ্ঠী'।  যদিও জাতে ও চরিত্রে কিঞ্চিৎ আলাদা, কিন্তু তিনটিই ছিল নিছক আড্ডা-বিশেষ।  সাহিত্যের আড্ডা।  যা পরবর্তী কালে সাহিত্যের কিছু খাস সামিয়ানায় ঠেক পেতে কলকাতার কফি হাউসে আরও-অঙ্ক-কষে হতো, এবং যা এখন আরো-অন্যভাবে, অন্যত্রও হয়।  বুকফেয়ার, নন্দনচত্ত্বরে, ইভন ফেসবুকে এবং ব্লগে।  কিন্তু সাহিত্য তথা শিল্পে সেরম বাওয়াল ওরফে মুভমেন্ট যদি কিছু হয়ে থাকে, আমাদের রামায়ণ-মহাভারত-চৈতন্যের লীলাখেলা-সমূহ বাদ দিয়ে, তাহলে তার বিসমিল্লা ধরতে হয় ১৮৩০-এর ফরাসি বোহেমিয়ানদের হুল্লোড় থেকেই।  তথাকথিত প্রতিষ্ঠান-বিরোধী আন্দোলনের ঐ ছিল সাড়াজাগানো পয়লা ভেঁপু।  এবং পরবর্তী কালে সারা পৃথিবী জুড়ে সেই বিগউল ফোঁকা অব্যাহত থাকে।  ফলে, মার্কিন ইন্টেলেকচুয়ালদের মাথায় হঠাৎ 'Angry' ঠাপ্পাটা দেখে তেমন হাসি নির্গত করার কারণ ছিল না বিশুদ্ধবাদীদের।  কারণ ঐ মার্কিন অ্যাংরিরা এতখানিই বাগী আর রাগী ছিল যে নিজেদেরকে 'ইন্টেলেকচুয়াল' বলতেও ওরা রীঢ়া বোধ করত।  ওরা নিজেদের জাহির করত 'Anti-Intellectual' বলে।  আসলে, জ্যাক কেরুয়াক, লরেন্স ফেরলিংগোটি, অ্যালেন গিন্সবার্গ, গেগরি করসো, ই ই কামিংস, কেনেথ রেকথ, হেনরি মিলার প্রভৃতি আমেরিকান কবি-লেখকদের, তথাকথিত সামাজিক ধ্যানধারণার প্রতি প্ৰচণ্ড রকমের অনীহা ও আক্রোশ থেকে গড়ে ওঠা ঐ গোষ্ঠী নিজেদের জাহির করত 'বিট' বলে।  বিট মানে হেরো, পরাস্ত, হতাশ, গাণ্ডু আর এইরকম আরও কিছু।  'অ্যাংরি' কথাটা তো খচমচ করত চল্লিশের দশকের জ্যাজ বাজিয়েদের ঠেকে।  তাছাড়া, মোটামুটি ঐ সময়েই ইংল্যান্ডের একদল তিক্ত-বিরক্ত-রাগী লেখক সেখানকার গঙ্গাজলী সাহিত্যকে লাথিয়ে রাতারাতি দাগি হয়েছিলেন 'Angry Young Men' নামে।  অ্যাংরিরা ছিলেন জন ওয়েন, জন ব্রেন, কিংসলি অ্যামিশ প্রমুখ।  অ্যাংরি আর বিটরা একসময় একটা জয়েন্ট অ্যান্থলজিও বের করে।  যে-কারণে ঐ দুই বাওয়াল-পার্টিকে অভিন্ন ভেবে কিছু মানুষ চরম ভুল করেছিল।  কিন্তু, ভুল তো ভুলই।  আসলে হয়েছিল কি, কেরুয়াকের সুহৃদ হারবার্ট হাংকি তখন কুচেল দুনিয়ায় গহন চলাফেরায় মগ্ন এবং তাঁকে ছিঁচকে চোর, মাস্তান আর মাতাল-গাঁজাখোর বলে চেনানোর জন্যে 'বিট' খিস্তিটা চালু ছিল।  এবং, খুব অবান্তর হবে না যদি ধরা হয় কেরুয়াক উক্ত লিংক থেকেই শব্দটা গেঁড়িয়েছিলেন।


এই বিটদের সঙ্গে বাঙালি যুবাদের হাংরি হাঙ্গামাকে গুলিয়ে ফেলার বেওকুফি বা ধাউড়বাজি ঠিক হবে না।  আবার 'হাংরি'র স্রোত-সূত্র যে 'ক্ষুধার্ত' বা 'কাঙাল' ---- এটা ঠিক না।  কেননা, প্রতিষ্ঠান বিরোধীরা কখনই মার্কামারা হতে রাজি নয়, তারা হামেহাল শেষধাপের জন্য ত্বরায়।  আর, ধাপগুলো হলো অবিরাম নিচের দিকে, ঘাস আর মাটির দিকে।  'মার্কা' ব্যাপারটা মৌলবাদের লক্ষণ।  প্রতিষ্ঠানের কারকিত।  যেমন আমাদের পৌরাণিক নামগুলো।  সূর্য, চন্দ্র, পৃথিবী, জল, বায়ু, শিব, কৃষ্ণ, রাম, সীতা প্রত্যেকেরই হাজারটা করে নাম।  পাড়ার মাস্তান থেকে শুরু করে লোকসভার মেম্বার, এঁদের অনেকগুলো করে নাম।  যত গুণের ঘাট, তত নামের বাড়।  তাছাড়া, এটাও ফ্যাক্ট, যে, ব্যক্তিকে অভিধায়িত করার জন্য যেসব শব্দকলাপ আমাদের চারপাশে ডাঁই করা আছে, এখনও, সবই সেই ব্রিটিশ মাস্টারবেশিয়ানদের নিচুড়ে-যাওয়া বইপত্র, ডিক্সনারি আর আধুনিকতাবাদী বুকনি-বীর্য থেকে হাসিল।  আসলে কিন্তু, শেষ বিশ্বযুদ্ধোত্তর দুনিয়ার যে হালচাল, রাজনীতিক-আর্থিক অবস্থা, তাতে সেরকম মর্ডানিস্ট স্পেশেলাইজড ব্যক্তিত্ব গড়ে ওঠার সারবীজ সব পচে-হেজে গেছে।  এখন আধুনিকতা ব্যাপারটাই একখানি ধ্রুপদী জোচ্চোর ও ধাপ্পাবাজ।

যাই হোক।  বলবার কথা এই, হাঙ্গামার শরিকরাও যেভাবে দাবি করেছেন, ---- হাংরি, আর-পাঁচটা সাহিত্য আন্দোলনের মতোই, পূর্বাপর স্বমেহিত ছিল, তাতে কোনো বাহ্যিক ক্যাটালিটিকের কলকাঠি ছিল না।  যে-কারণে এই হাঙ্গামার আবির্ভাব-কালটি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ।  পঞ্চাশের শেষে, বিশেষত ষাটের দশকের শুরুশুরুতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রায় একই ধাঁচে তরুণ-তরুণীদের মধ্যে ব্যাপক অনাস্থা আর বিক্ষোভ দেখা দেয়।  তাদের নিজ-নিজ রাষ্ট্রের শাসনতন্ত্র, সমাজ, চালু ধর্মীয় নীতিকানুন, আর্থিক বন্দোবস্তি আর কালচারাল বাতাবরন তামাম-কিছু ঐ নাগর-যুবাদের কাছে চরম অসহনীয়, সুতরাং পরম ত্যাজ্য ও বর্জনীয় ঠাহর হতে থাকে।  প্যারিস, বার্লিন, প্রাগ্ব থেকে বার্কলি, জাকার্তা, কলম্বিয়া, পিকিং ----- বিভিন্ন শহরে, বিশেষ করে কলেজ-ইউনিভার্সিটির ছেলেমেয়েরা প্রবল বাগী ও তোড়ফোড়-প্রবণ হয়ে ওঠে।  লিহাজা, বিক্ষোভের ঐ চোনা সাহিত্যের জলকেও লোনা করে ফেলবে, এ তো অতি লাজিম কথা।


বিশেষত, দেশভাগটা বাঙালির সত্যিকারের পাইন মেরে দিয়েছিল।  ঐ প্রেক্ষাপটে, যখন নিত্যনতুন মৃত্যুপদ ও ভীতিপদ বাঙালির বত্রিশ ইঞ্চি পোস্তবাটা-বুক ক্ষণে ক্ষণে ভেবড়ে দিচ্ছে, মুহুর্মুহু মূক করে দিচ্ছে আস্ত-একটা বাতেল্লাবাজ জাতিকে, চেতনা সন্ত্রস্ত ও দৃষ্টি ঘোলাটে হয়ে, নালা থেকে ভাত কুড়িয়ে খাচ্ছে অনাহারী নেড়ি ও মানুষের ছা, ------ আমরা তখনও অবিশ্বাস্য নজরে দেখতে পাই হাজার বছরের ঝরঝরে মূল্যবোধগুলো বাঙালির জীবনে নতুন ধারণার পথ দেখাবে বলে, তখনও, রক্তচক্ষু মেলে দাঁড়িয়ে!  নতুন শক্তি জীবনকে পথ দেখাতে চায়, তখনও।  ঐ রক্তচক্ষুগুলো কাদের??  কোটি কোটি মূক ও মূঢ়ের বেদনাকে মূর্ত ধ্বনিতে তবদিল করতে উঠে আসে অই, কারা???  আমরা দেখতে পাচ্ছি, বাঙলা মায়ের আনাচ-কানাচ থেকে, অন্ধগলি আর ঘুঁজিপথ থেকে বেরিয়ে আসছে অশিক্ষিত নিরক্ষর অর্ধ-নিরক্ষর ভাঙা-ভাষা ভাঙা-বানানের একগুচ্ছ অন্ত্যজ, অপর, সাব-অলটার্ন, ডায়াসপোরিক ছোটলোক।  নপুংসক বুর্জোয়া শ্যাল-কুত্তায়  নুচে খাবে বাংলা সাহিত্যকে, তার আগেই টিনের সুটকেশ, ভাঙা মগ, ছেঁড়া পাজামা, নোংরা গেঞ্জি ও বিষ্ঠা-লাঞ্ছিত মুর্দাফরাসের কেরবালা হা-রেরে তরিবতে ধেয়ে এলো বাংলা সংস্কৃতির মূল বিতর্দির দিকে।  গোড়ার দিকে এদের পিওর লাথখোর বলে মনে হবে, এদের ভাষা গেঁয়ো আর এদের কথাবার্তা অশ্লীল স্ল্যাং-মাফিক মনে হবে, ----  সেটা একরকম রফা।  মৃতের চিতায় অগ্নি-অস্তিত্বের ঐ ছিল পূর্বাভাস।


হাংরি জেনারেশন আন্দোলন ছিল, নাকি হুজুগ?  হাংরি আন্দোলনের স্রষ্টা কে?  ----- এই দুটি বিতর্ক এত এত দফা এত এত এত ভাবে দলিত মর্দিত ধর্ষিত হয়েছে যে তাকে এখন কেঁদেই বাঁচতে দেওয়া উচিত।  বিশেষত দ্বিতীয় প্রশ্নটি।  জঙ্গল মে মোর নাচা, কিসনে দেখা?  প্রত্যেকে বলে আমি, আমি, আমি।  অক্ষরের গোলামি থুয়ে অক্ষরের মালিক হওয়ার সাধ, প্রত্যেকের।  তাঁরা মেতে উঠেছেন অন্ধকারে, অহংকারে, ব্যক্তিগত আরোপে, আমিত্বের বহ্বাস্ফোটে।  আমি, আমি, আমি।  আয়ে গওয়া হরামিয়ন সব, একে মারে যান আফত-মা হ্যায়। ----- বিতর্কটি এখন যেন এই বলছে, কঁকিয়ে, ----- এবং খাবি খেয়ে মরছে।


১৯৬২।  'সম্প্রতি' পত্রিকার থার্ড সংকলনে বিনয় মজুমদারের 'ফিরে এসো চাকা'র সমীক্ষা বেরুল 'হাংরি জেনারেশন সংক্রান্ত প্রস্তাব' শিরোনামে।  লেখক : শক্তি চট্টোপাধ্যায়।  অনেকের ধারণা, বাসু-সুভাষ-শৈলরাও খেয়েছিলেন, যে, এই লেখা থেকেই হাংরি জেনারেশন নামের সূত্রপাত।  ধারণাটা কিছু বাতাসও পেয়েছিল ১৯৬৪-৬৫ সালে হাংরি মামলায় 'this literary movement was started by me' বলে শক্তির স্টেটমেন্ট জমা পড়ায়।  হাংরি গোষ্ঠীর এককালীন গড়িমসি সদস্য সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ও নাকি ঐ মর্মে বয়ান রুজু করেছিলেন।  কিন্তু শক্তির এ লেখা তো বেরিয়েছিল বাষট্টি সনে; অথচ, ১৯৬১ সনের নভেম্বর-ডিসেম্বরেই ছেপে গিয়েছিল 'হাংরি জেনারেশন' নামে ১/৮ ডবলক্রাউন সাইজের ইস্তেহারটি, তাতে বার্জাস টাইপে পরিষ্কার ছাপা হয়েছিল : স্রষ্টা মলয় রায়চোধুরী, নেতা শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সম্পাদক দেবী রায়।


আসলে, পরে জানা যায়, হাংরি জেনারেশন ছিল এমনই এক চ্যাংমাছ, কারো একার মুঠোয় বেশিক্ষণ ধরা থাকেনি।  হাঙ্গামার ধূসর সূচনালগ্নের আরেক শরিক, বিলেত-রিটার্ন কলেজ-প্রভাষক উৎপলকুমার বসু পরবর্তীতে (১৯৯৪) জানালেন : "হাংরি জেনারেশন সেভাবে কোন সংগঠিত আন্দোলন ছিল না।  যার খুশী, যেখান থেকে পারে হাংরি জেনারেশন নাম দিয়ে বুলেটিন বের করে বাজারে ছেড়ে দিত।  এই আন্দোলন ছিল অনিয়ন্ত্রিত।  কতকগুলো ফতোয়া মলয় সমীর শক্তি লিখেছিল।  এগুলোর নিচে অনেকের নাম বসিয়ে দেয়া হ'ত।  বহু ক্ষেত্রেই যাদের নাম দেওয়া হচ্ছে তাদের জিজ্ঞাসাও করা হঁ'ত না।  ..... হাংরিদের সেভাবে কোন কাগজও ছিল না।  হয়ত ত্রিপুরা থেকে একটা কাগজ বেরল, নাম দিয়ে দিল ---- হাংরি জেনারেশন বুলেটিন নম্বর ১২।  হয়ত তার ১০ বা ১১ বেরোয়নি।"


আসলে, ১৯৬২-৬৩ সনে পশ্চিম বাংলার সাহিত্যে এই বাওয়ালমুখী পালাবদলের তীব্র চাগাড়ে দুটি প্রধান উপ-কেন্দ্র গড়ে উঠেছিল কলকাতা শহরের বুকে।  একটি কেন্দ্রের মধ্যমণি ছিলেন বাসুদেব দাশগুপ্ত, শৈলেশ্বর ঘোষ, সুভাষ ঘোষ, প্রদীপ চৌধুরী এবং সুবো আচার্য।  অপর কেন্দ্রে ছিলেন মলয় রায়চোধুরী, সমীর রায়চোধুরী, দেবী রায় এবং সুবিমল বসাক।  উভয় কেন্দ্রের সদস্যরাই, কমবেশি, তথাকথিত ছোটলোক, গরিব আর অশিক্ষিত ফ্যামিলি থেকে আগত।  এবং প্রত্যেকের বয়স ছিল বিশ-পঁচিশের কোঠায়।  যে-বয়সে যত আলো পড়ে, তত ভয় কমে।  উপকেন্দ্র যেহেতু দুটি, সুতরাং দু-রকমের হাংরি বাওয়াল শুরু হয়েছিল।  একটা, শৈল-বাসু-সুভাষদের বস্তি-কলকাতার 'ছোটলোকি' বাওয়াল; এখানে যে-দলের নাম দেওয়া যাক হাংরি -- 'এ' গ্রূপ।  অন্যটা মলয়-সুবিমলদের ডায়াসপোরিক বাওয়াল, অর্থাৎ 'বি'-গ্রূপ।  দ্বিতীয় গ্রূপের সর্বময় কর্তা ছিলেন পাটনার ছোটলোক আর কুচেল অধ্যুষিত দরিয়াপুর মহল্লার নামচিন ষ্টুডিওঅলা রঞ্জুবাবুর ছোটছেলে বিশ বছরের ফনকু ওরফে ফনা, অথবা ইমলিতলার মুল্লু খান ওরফে মলয় রায়চোধুরী, সেটা জোরও ধরেছিল মলয়ের জোরদার ইস্তেহারি ভাষার চটকে, অপেক্ষাকৃত বেশি;  আর, তাঁদের সে-টিমও ছিল বেশ ভারি।  বহু পুরনো জ্ঞানপাপী সে-দলে ভিড়েছিল।  'এ' গ্রূপ এই 'বি' গ্রূপের নাম দিয়েছিল 'চুলকে দেওয়া হাংরি জেনারেশন'।  প্রথম গ্রূপটি মলয়কে 'মফসসলের অজ্ঞাত গাড়োল' বলেও চালাতে চেয়েছিল ব্যক্তিগত আক্রোশবশত।  তাঁরা, প্রত্যেকে ছিলেন, কেউ কেউ ছদ্মভাবে, মলয়ের বিরোধীপক্ষ।  বিশেষত আশির দশকে পুনরুত্থিত মলয়ের নিজেকে হাংরি আন্দোলনের স্রষ্টা বলে চালানো, কিছু-কিছু ক্ষেত্রে তাঁর ইতিহাস-বিকৃতি এবং মাত্রাতিরিক্ত আত্মপ্রচারে দাগা পেয়েই প্রথম গ্রূপটির গোসা ধরতামাশি পেয়েছিল এবং তাঁরা পাগলের মতো ক্ষেপে উঠেছিলেন।  সুতরাং প্রথম দলটির ঐ পাঁচ শরিক যাঁরা আন্দোলন-চলাকালীন, ষাটের দশকে যা নিয়ে একেবারেই মাথা ঘামাননি, আশি ও তৎ-পরবর্তী পিরিয়ডে মলয়ের মতই, নিজেদেরকে 'হাংরি আন্দোলনের স্রষ্টা' হিশেবে প্রচার করা শুরু করে দেন।  দায়িত্ব না নিয়ে একটু হাস্যচ্ছলে বলি, হাংরি লেখকদের মধ্যে কেউ আধুনিকতাবাদীদের মতো 'ডক্টরেট' ছিলেন না, ----- সাহিত্য, ইতিহাস, দর্শন, মনোবিজ্ঞান কোন কিছুতেই একজনও 'উলেমা' ছিলেন না বলে এহেন পারস্পরিক কাদাহোলি।  আমি কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে কুম্ভলস চাই না, অতএব কোন্দলটি এড়িয়ে যাচ্ছি।


এ-কথা ঠিক যে হাংরি কোন ইজম ছিল না।  ছিল একটা স্টাইল বা আইডিয়া।  আরও বলতে পারি, একটা ঘটনা, বাংলাভাষায় সেভাবে যা আগে কখনো ঘটেনি।  বাংলা সাহিত্যের তথাকথিত মূল ধারা থেকে বিচ্ছিন্ন অনাদৃত এক উপদ্রুত এলাকা থেকে বিশাল এক ঢেউ, উঠে এসে, আছড়ে পড়েছিল এজি-গোয়িং সাহিত্যের ল্যাসলেসে মসৃণ চত্ত্বরে।  সমাজের একেবারে নিচুতলার ভাষা ও ভাবনাকে সাহিত্যের কাছাকাছি নিয়ে আসার, পক্ষান্তরে বাংলা সাহিত্যের লিরিকফুলের বাগানকে তছনছ করে নতুন প্রতিমান প্রতিষ্ঠার তাগিদে হাংরি ছিল প্রথম আর তখনো-অব্দি একলোতা বৈপ্লবিক সমীহা।
 









পি. এস. কাজল : হাংরি আন্দোলন এবং একজন হাংরি কবি

হাংরি আন্দোলন এবং একজন হাংরি কবি

আন্দোলনের  শুরু : ১৯৬১  সালের নভেম্বরের দিকে পাটনা শহর হতে এ আন্দোলন শুরু হয় । যে কবিরা এ আন্দোলন শুরু করেছিলেন তাদের মধ্যে মলয় রায় চৌধুরী, ত্রিদিব মিত্র , সুনিমল বসাক, শক্তি চট্রোপাধ্যায়, সমীর রায় চৌধুরী এবং বিনয় মজুমদার  ছিলেন অন্যতম । বাঙলা বা ভারতীয় ইতিহাসে ইশতেহার বিলি করে সাহিত্য আন্দোলন মনে হয় এর (হাংরি) বাইরে আর নেই । যদিও প্রথম প্রকাশিত ইশতেহারটি ইংরেজি ভাষায় করা হয়েছিল । তার কারন তৎকালে পাটনায় কোন বাংলা প্রেস ছিল না । ১৯৬১ হতে ১৯৬৪ পযর্ন্ত এ আন্দোলন বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করতে সমর্থ  হয়েছিল । বেশ কিছু বাস্তব অবস্থার কারনে সরকারের কোপানলে পড়ে এবং কয়েকজন হাংরি কবির বিশ্বাসঘাতকতার জন্য ১৯৬৪ সালের পর এ আন্দোলন তার প্রকাশ্যতা হারায় ।  নকশাল বাড়ীর আনোলনের পর উত্তর বঙ্গের তরুন কবিরা এ আন্দালনকে আবার জীবন দান করার চেষ্টা করেছিলেন । কিন্তু তাত্বিক ভিত্তি না থাকায় তারা সফলতা পায় বলে অনেকে মনে করেন ।      আর এ আন্দোলকে যারা সমর্থন করতো এবং  কবিতায়- চেতনায় ধারন করতো তারা ইতিহাসে হাংরি কবি বা হাংরি জেনারেশন নামে পরিচিত ।
ছবি- হাংরি আন্দোলনের ইশতেহার-১৯৬৪
হাংরি আন্দোলন: ত্রিদিব মিত্র‘র কবিতা

হাংরি জেনারেশন আন্দোলন: রাজসাক্ষী সুভাষ ঘোষ-এর মুচলেকা
সুভাষ ঘোষ-এর মুচলেকা:
আমার নাম সুভাষচন্দ্র ঘোষ। গত এক বৎসর যাবত আমি কলেজ স্ট্রিট কফি হাউসে যাতায়াত করছি। সেখানে আমার সঙ্গে এক দিন হাংরি আন্দোলনের উদ্ভাবক মলয় রায়চৌধুরীর পরিচয় হয়। সে আমার কাছ থেকে একটা লেখা চায়। হাংরি জেনারেশন বুলেটিনের খবর আমি জানি বটে কিন্তু হাংরি আন্দোলনের যে কী উদ্দেশ্য তা আমি জানি না। আমি তাকে আমার একটা লেখা দিই যা দেবী রায় সম্পাদিত হাংরি জেনারেশন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। আমি তা আমার রুমমেট শৈলেশ্বর ঘোষের কাছ থেকে পাই। সে হাংরি বুলেটিনের একটা প্যাকেট পেয়েছিল। আমি এই ধরণের আন্দোলনের সঙ্গে কখনও নিজেকে জড়াতে চাইনি, যা আমার মতে খারাপ। আমি ভাবতে পারি না যে এরকম একটা পত্রিকায় আমার আর্টিকেল ‘হাঁসেদের প্রতি’ প্রকাশিত হবে। আমি হাংরি আন্দোলনের আদর্শে বিশ্বাস করি না, আর এই লেখাটা প্রকাশ হবার পর আমি ওদের সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন করেছি।
(স্বাক্ষরের তারিখ ২ সেপ্টেম্বর ১৯৬৪ )
সুভাষ ঘোষ পরে একটি ফ্যাসিস্ট রাজনৈতিক দলে যোগ দেন, যে দলটি পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে নারকীয় অত্যাচার চালিয়েছিল। তিনি এই দলের সদস্য হন এবং দলের রাজনৈতিক মিছিলে ও র‌্যালিতে দলের পতাকা নিয়ে ইনক্লাব জিন্দাবাদ করে বেড়াতেন। তিনি ভুলে গিয়েছিলেন যে হাংরি জেনারেশন আন্দোলন একটি প্রতিষ্ঠানবিরোধী আন্দোলন । তাঁর এই অধৎপতনের কারণে পরবর্তীকালে তাঁর কলম থেকে আর উল্লেখযোগ্য লেখা বেরোয়নি।
হাংরি জেনারেশন : রাজসাক্ষী শৈলেশ্বর ঘোষ-এর মুচলেকা
হাংরি জেনারেশন সাহিত্য আন্দোলনে সবচেয়ে লজ্জার ঘটনা ছিল দুই জন আন্দোলনকারীর রাজসাক্ষী হওয়া। এনারা দুইজন হলেন শৈলেশ্বর ঘোষ ও সুভাষ ঘোষ। কেবল রাজসাক্ষী হওয়াই নয়, এনারা দুই জন মুচলেকাও লিখে দিয়েছিলেন। মলয় রায়চৌধুরীর যখন নিম্ন আদালতে একমাসের কারাদণ্ডের আদেশ হল, এনাদের টিকিটিও দেখতে পাওয়া যায়নি। প্রায় দশ বছর চুপচাপ থেকে এনারা আবার উদয় হন। হাংরি জেনারেশন শব্দটি এড়িয়ে এনারা ক্ষুধার্ত নাম দিয়ে পত্রিকা প্রকাশ করা আরম্ভ করেন। তা এই জন্য যে মুচলেকায় তাঁরা লিখে দিয়েছিলেন যে হাংরি জেনারেশন আন্দোলন ও ম্যাগাজিনের সঙ্গে তাঁদের কোনও সম্পর্ক নেই।
তারপর আটের দশকে মলয় রায়চৌধুরী পূনর্বার কবিতা লেখা আরম্ভ করলে এবং বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় মলয় রায়চৌধুরীর সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হতে থাকলে এনাদের মনে হয় যে তাঁদের মৌরসিপাট্টা বুঝি শেষ হতে চলল। কিন্তু পাঠকবর্গ ইতোমধ্যে তাঁদের কুকর্মের কথা জেনে গিয়েছিলেন। এনারা দুইজন বহু ছোকরাকে জুটিয়ে পুনরায় হাংরি জেনারেশনের জাওয়াজ তোলেন। পাঠক আর তাঁদের বিশ্বাস করছে না দেখে তাঁরা হাংরি জেনারেশন সংকলন বা হাংরি জেনারেশন সমগ্র ইত্যাদি নামে ঢাউস গ্রন্হাবলী বাজারে ছাড়তে আরম্ভ করেন। এই গ্রন্হগুলিতে মলয় রায়চৌধুরী তো ছিলেনই না, উপরন্তু প্রধান-প্রধান হাংরি আন্দোলনকারীদেরো পাওয়া যাবে না। ১৯৬১-এর মূল আন্দোলনকারীরা রাজসাক্ষীদের সাথে যোগাযোগ রাখতে চাননি, লেখাও দেননি। শেষ পর্যন্ত এই দুইজন বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে বিশ্বাসঘাতক প্রতিপন্ন হন যা অধ্যাপক শিবনারায়ণ রায় তাঁর জিজ্ঞাসা পত্রিকার সম্পাদকীয়তেও লিখেছিলেন।
বিশ্বাসঘাতক দুইজনের মুচলেকা নিম্নে দেয়া হল:
শৈলেশ্বর ঘোষ:
আমার নাম শৈলেশ্বর ঘোষ। আমার জন্ম বগুড়ায় আর বড় হয়েছি বালুরঘাটে। আমি ১৯৫৩ সনে বালুরঘাট হাই ইংলিশ স্কুল থেকে স্কুল ফাইনাল পাশ করেছি, ১৯৫৫ সনে বালুরঘাট কলেজ থেকে আই এস সি, ১৯৫৮ সনে বালুরঘাট কলেজ থেকে বি এ, আর ১৯৬২ সনে কলকাতার সিটি কলেজ থেকে বাংলায় স্পেশাল অনার্স। ১৯৬৩ সনে সেপ্টেম্বর মাসের শেষ দিকে একদিন কলেজ স্ট্রিট কফিহাউসে দেবী রায় ওরফে হারাধন ধাড়া নামে একজন তাঁর হাংরি জেনারেশন ম্যাগাজিনের জন্য আমাকে লিখতে বলেন। তারপরেই আমি হাংরি আন্দোলনের লেখকদে৪র সঙ্গে পরিচিত হই। আমি ব্যক্তিগতভাবে খ্যাতিমান লেখক সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, রবীন্দ্র দত্ত, বাসুদেব দাশগুপ্ত, প্রদীপ চৌধুরী এবং উৎপলকুমার বসুকে চিনি। গত এপ্রিল মাসে একদিন কলেজ স্ট্রিট কফিহাউসে মলয় রায়চৌধুরীর সঙ্গে আমার দেখা হয়, এবং তিনি আমার কাছে কয়েকটা কবিতা চান। তাঁর কাছ থেকে একটা পার্সেল পেয়েছি। আমি মলয় রায়চৌধুরীকে চিনি। তিনি হাংরি আন্দোলনের স্রষ্টা। হাংরি জেনারেশন ম্যাগাজিনে আমি মোটে দুবার কবিতা লিখেছি। মলয় আমাকে কিছু লিফলেট আর দু তিনটি পত্রিকা পাঠিয়েছিলেন কিন্তু সেগুলি সম্পর্কে কোনো নির্দেশ তিনি আমাকে দেননি। সাধারণত এই সব কাগজপত্র আমার ঘরেই থাকত। এটুকু ছাড়া হাংরি আন্দোলন সম্পর্কে আমি আর কিছু জানি না। অশ্লীল ভাষায় লেখা আমার আদর্শ নয়। ১৯৬২ থেকে আমি হুগলি জেলার ভদ্রকালীতে ভূপেন্দ্র স্মৃতি বিদ্যালয়ে স্কুল টিচার। মাইনে পাই দু’শ দশ টাকা। বর্তমান সংখ্যা হাংরি বুলেটিনের প্রকাশনার পর, যা কিনা আমার অজান্তে ও বিনা অনুমতিতে ছাপা হয়, আমি এই সংস্হার সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন করেছি। ভবিষ্যতে আমি হাংরি আন্দোলনের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক রাখব না এবং হাংরি পত্রিকায় লিখব না।

হত্যাকাণ্ড
ত্রিদিব মিত্র
আমাকে বারবার জীবন থেকে হড়কে জীবনের ফঁদাই পড়তে হচ্ছে
মৃত্যু কেবলই কেবলই প্রতারণা করছে আমার সঙ্গে
চারটে বাঘ আর তিনটে বুনো শুয়োরের
ধ্বস্তাধস্তি চলছে আবছা জ্যোৎস্নায়
আমার মিথ্যে জিভ থেকেই সত্যের চ্যালেঞ্জ ফঁড়ে
ঝলসা দিচ্ছে মানু-বাচ্চাদের
তাদের কান্না শুনে বধির হয়ে যাচ্ছে আমার কান
আনন্দে সাততলা অব্দি লাফিয়ে উঠছে আমার জিভ
প্রেমিকার কষ্ট দেখে আনন্দে কঁদে উঠেছিলাম আমি
চুমু খেতে গিয়ে আলজিভ শুকিয়ে আসছে আমার
চারিদিকের ভিজে স্যাঁতসেতে অন্ধকার থেকে
আমি দানব না যিশুকৃষ্ট বুঝতে না পেরে
রেস্তঁরায় ভিড় করছে মেয়েমানুষেরা
আজ আর কোনো রাস্তা খঁজে পাচ্ছে না কেউ সরলভাবে হাঁটবার
সব রাস্তাই লুটিয়ে থাকে
সব পাপোষের তলায় গড়িয়ে যায় ধুলোর ঝড়
সব জীবনের মথ্যেই ভয়ংকর কাঁপানো অর্থহীনতা শূন্যতা
আঃ মৃত্যু বাঞ্চোৎ মৃত্যু
অপমৃত্যুও ফেরার হয়ে পালাচ্ছে আমার ভয়া
কেননা আমি বুঝে গেছি মৃত্যুর দমবন্ধ ভান
কেননা আমি মৃত্যুর কাছে গিয়েছিলাম সরল চোখে
ভয়ে কঁচকে গিয়েছিল তার চোখ
অন্ধ চোখে কঁদে উঠেছিল মাথা নিচূ করে
এবং খালি হাতে নির্জন রোদে ফিরতে হল আমাকে জটিল চোখে
নিজেকে নিজের থেকেও লুকিয়ে রাখতে পারছি না আর
আমার নপুংসকতা দেখে তুমি হেসে উঠেছিলে-আমার ভালবাসা
ভয় আর ভালবাসার মধ্যে শুয়ে তুমি ফিরে গেলে ভয়ের কাছে
বঁচার তাগিদে তুমি ফিরে এলে মগজের কাছ-বরাবর
ফালতু মগজের জ্যামিতিক অঙ্ক থেকে ছিটকে বেরিয়ে এলাম আমি বিশৃঙ্খলায়
সভ্যকে ঘৃণা করেও লুকিয়ে রইলে সভ্যতার কলকব্জায়
বদহজম থেকে তৈরি হল আমার বদরাগ
সমাজের ভুল চেতনা থেকে নিজেকে ঝুলিয়ে দিলাম শূন্যের বেতারে
টেলিফোনের মধ্যে দিয়ে রোজ তিন কোটি চুমু
এপার-ওপার করছে পৃথিবীময়
রেলের মোটা তার বেয়ে উড়ে যাচ্ছে ৭৪ কোটি মাছি
আমার শরীরের চারিদিকে অসংখ্য ‘টোপ’
নিজেকে ঝাঁঝরা করে জীবনের সঙ্গে মানুষের সঙ্গে
খেলতে চাইলাম চাতুরী
তোমার প্রতারণা থেকে ভালবাসা আলাদা করতে পারছি না একদম
আমি ভাবছি আমাদের প্রথম অভিসম্পাতের কথা
আমি ভাবছি আমাদের শেষ চুম্বনের কথা
আমার দিব্যজ্যোতি আমার আম্ধকার
আমার চারধারে বেইজ্জতি আর বেলেল্লাপনা বারবার
চলছে মানুষের
আমি বুঝতে পারছি মানুষ মানুষকে ভালবাসতে পারছে না
….মানুষ মানুষকে কোনোদিনই ভালবাসেনি
উঁচু বাড়ির মাথা থেকে লাফিয়ে পড়ছে হৃদয়সুদ্ধ লাশ
আমি দেখতে পাচ্ছি প্রয়োজন কিরকম মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে আকাশের দিকে
আমার ধর্ম কি মনে করতে পারছি না কোনোদিন বুঝিনি বলে
আমার শিরা থেকে রক্ত ছিনিয়ে নেবে বলে
স্হায়ী-অস্হায়ী যুদ্ধ চলছে মানুষের আগুপিছু
পাঁজর গুঁড়ো করে বেরিয়ে আসছে রজনীগন্ধার ডানা
অ্যালকহলিক রক্তের ফেনা থেকে তৈরি হচ্ছে আঁশটৈ ক্ষুরধার ভালবাসা
আমি ক্রমশ প্রেম থেকে শরীরহীনতায় ভাসছি
প্রেমিকার বেগুনি মুখ জ্বলে উঠছে ফঁসে যাচ্ছে প্রয়োজনমত
অদরকারি কাগজপত্রে ঢেলে দিচ্ছি আমার বর্তমান
কবিতা আমার বুক থেকে শুষে নিচ্ছে আমার আয়ু
আমার ভালবাসা রক্তমাংস থেকে মানুষ তৈরি করছে তাদের ফিচলেমি
অসুস্হ ভালবাসা ফিরিয়ে আনবার জন্য
মনুষ্যযন্ত্রের সঙ্গে হায় তুমিও
আমার সকল উত্তাপ জযো করে তৈরি করলাম লালগোলাপের পালক
ব্যবসায়িক উৎপাদন থেকে কুড়িয়ে নিলে তুমি একমুঠো প্রতারণা
আগুনের হল্কা চুঁড়ে দিলে আমার গায়ে
শিশুর মত হেসে উঠলাম আমি
পুড়ে গেল আমার সমস্ত শরীর
আকাশ ঘঁষে ছুটে গেল আমার ক্রোধ
স্বাধীনতার হাতে হাত রাখতে পারছে না কেউ ভয়ে
ওঃ
আমার আর সবার মাঝখানে গজিয়ে উঠছে একটা সুদীর্ঘ গভীর ফাটল
আমি বুঝতে পারছি আমার দ্বারা কিছুই হবে না
নিজেকেও তেমন করে ভালবাসা হল না আমার
এই এক জন্মেই হাঁপিয়ে উঠছি আমি
এক সঙ্গেই হাসছি আর হাসছি না
ওঃ ক্লান্তি ক্লান্তি – অক্লান্ত আওয়াজ – আঁকাবাঁকা টানেল –
লুপ – পরিসংখ্যান – ক্ষুধা – মহব্বৎ – ঘৃণা –
কেবল বোঝা বয়েই জীবন চলে যায় ১০১% লোকের
আত্মাকে খঁজে পাওয়া যাচ্ছে না সমস্ত শরীর ছেঁকেও
বিপ্লবউত্তেজনানারীসংঘর্ষহিংস্রতাবন্যনীরবতা নাচছে
আমি একবারও নিজের দিকে তাকাতে পারছি না ফিরে
মানুষের কোনো কাজই করে উঠতে পারলাম না আজ ওব্দি
ফালতু অব্যবহার্য হয়ে কুঁকড়ে শুয়ে আছি বমিওঠা চোখে
মগজে চোলাই কারবার চলছে গুপ্ত ক্ষমতার
কষ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে লালা ওরফে আমার ভালবাসা আমার অসহায়তা
মানুষের রক্তাক্ত পেঁজা শরীরের পাহাড় দিয়ে তৈরি হচ্ছে
অক্ষম আর আঊর্ব স্বাধীনতা
মানুষের ক্ষীণ শরীর বেয়ে শরীর ঘিরে শরীর ধরে চলেছে
অসংখ্য বিশৃঙ্খল শৃঙ্খলা
ওঃ আমি কোনো দিনই ভালবাসতে চাইনি
আঃ…………………………….আঃ
কলজে গঁড়িয়ে যায় চাপা হিংস্রতায়
বুকের ভেতর ইনজিনের চাপা ক্রোধ
রক্তের উত্তেজনে থেকে তৈরি হচ্ছে বন্যতা
অস্তিত্বহীন আত্মার পায়ে স্বেচ্ছায় প্রণাম রেখেছিল সুবো
তিন মাস জঘন্য নীরবতার পর আঁৎকে উঠে কুঁকড়ে গিয়েছিল প্রদীপ
মানুষের সাহসিকতাকে ভুল করে সন্দেহ করতে শিখেছি
ভুল জেনে ভুল মানুষের সঙ্গে মিশে
আমি চালাক হতে ভুলে যাচ্ছি স্বেচ্ছায়
ভাঁটার সঙ্গে সঙ্গে চতুরতা মূর্খতাও গড়িয়ে যাচ্ছে অন্ধকারে
ত্রিদিবের মুখ ত্রিদিব নিজেই কতদিন চিনতে পারেনি
আদপে সত্য কোনো স্পষ্ট মুখ খঁজে পাচ্ছি না নিজের
“মানুষের নিজস্ব কোনো চরিত্র নেই” বলতে ককিয়ে উঠেছিল
৩৫২ কোটি মানুষ তায় ঐতিহ্য আর পোষা চরিত্রহীনতা
ওঃ অসম্ভব কষ্ট হচ্ছে এখন
কে বা কারা গলা টিপে ধরছে ভুল করে
আমার ।
তাদের অজান্তেই…
(১৯৬৩ সালে শিবপুরের পুরানো বাড়িতে থাকাকালীন রচিত, এবং মলয় রাচৌধুরী সম্পাদিত ‘জেব্রা’ পত্রিকার দ্বিতীয় সংখ্যায় প্রকাশিত । )
অনেকে মনে করেন হাংরি আন্দোলন শেষ হয়ে গেছে । কিন্তু বর্তমান আধুনিক কবিদের  ( সরকারি দালাল গুলোকে বাদ দিলে যারা থাকে ) লেখা কবিতা বা তাদের চিন্তা চেতনা দেখলে আমার মনে হয় না এ আন্দোলন শেষ হয়ে গেছে । তবে এটা ঠিক আন্দোলনের রকমেরও পরিবর্তন হয়েছে । কিন্তু প্রতিবাদের ভাষা হারিয়ে যায় নি তবে পরিবর্তন হয়েছে ভাষার স্বাভাবিক পরিবর্তনশীলতার মত । আর স্পেংলারের সংস্কৃতি সংগা বা পরিবর্তনের নিয়মকে যথার্থ  ধরলে , আমাদের বর্তমান সংস্কৃতি কি স্বাভাবিক গতিধারায় চলছে । আমাদের সংস্কৃতি কি নিজ সমাজ হতে খাদ্য বা বেচে থাকার মত উপাদা  পাচ্ছে ? উত্তর যদি হয় না তবে আমাদের সংস্কৃতি কোন পথে যাবে ?

বৃহস্পতিবার

দারাশিকো : ২২শে শ্রাবণ সিনেমায় হাংরি আন্দোলন

২২শে শ্রাবন: সিনেমায় হাংরি আন্দোলন

২২শে শ্রাবন পোস্টারগত শতকে ষাটের দশকে বেশ কিছু তরুন কবি মিলে ভিন্ন ধরনের কবিতা লেখা শুরু করেন। তাদের কবিতাগুলো প্রচলিত ধারার যেকোন কবিতার থেকে ভিন্ন ছিল। তাদের কবিতায় শব্দ চয়ন আপাতদৃষ্টিতে অসঙলগ্ন ছিল। সাধারণ দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে এই কবিতায় কোন ছন্দ ছিল না, এক শব্দের সাথে অন্য শব্দের স্থাপনে কোন মিল ছিল না, যৌনতার ব্যাপক প্রয়োগ ছিল ছন্দে-শব্দে-ভাবে। সাধারণত শিল্প-সাহিত্যে কোন আন্দোলন সংজ্ঞায়িত করেন সমালোচকরা, কখনো কখনো শিল্পী-সাহিত্যিকরাও এ ব্যাপারে ভূমিকা রাখেন। হাংরি আন্দোলনে জড়িত কবিরা নিজেরাই এই আন্দোলনকে ‘হাংরি আন্দোলন‘ হিসেবে পরিচিতি দেন। এই আন্দোলনই বাংলা সাহিত্যে একমাত্র আন্দোলন যা ইশতেহার প্রকাশের মাধ্যমে হয়েছে। ইংরেজি ভাষার কবি জিওফ্রে চসারের ‘ইন দি সাওয়ার হাংরি টাইম’ বাক্যটি থেকে হাংরি শব্দটি চয়নের মাধ্যমে তারা নিজেদেরকে হাংরিয়ালিস্ট হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তারা পাটনা থেকে বাংলা প্রেসের অভাবে ইংরেজিতে একটি বুলেটিন প্রকাশ করতো – যেখানে তাদের কবিতা, গল্প, চিত্র ইত্যাদি প্রকাশ করা হত। হাংরি আন্দোলন যারা শুরু করেছিলেন তাদের মধ্যে সমীর রায়চৌধুরী, মলয় রায়চৌধুরী, শক্তি চট্টোপাধ্যায় ইত্যাদি অন্যতম। ১৯৬১ সালের নভেম্বর থেকে শুরু হয়ে ১৯৬৫ সালেই শেষ হয়ে যায়।


হাংরি আন্দোলনের স্বরূপ বোঝার জন্য মলয় রায়চৌধুরীর ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতটি পড়া যেতে পারে। এই কবিতাটি অশ্লীলতার দায়ে অভিযুক্ত হয়েছিল নিম্ন আদালতে যা পরবর্তীতে উচ্চ আদালতে বাতিল হয়ে যায়। হাংরিয়ালিস্টদের কবিতা এই অশ্লীলতার অভিযোগে এত মাত্রায় অভিযুক্ত ছিল যে প্রকাশকরা তাদের লেখা ছাপাতে আগ্রহী ছিলেন না। এই অশ্লীলতা প্রশাসনকে বাধ্য করেছে কবিদের কোমরে দড়ি বাধঁতে, আদালতে মামলা ঠুকতে। মলয় রায়চৌধুরীর এই কবিতা-সংক্রান্ত হাংরি মামলায় শক্তি চট্টোপাধ্যায় রাজসাক্ষী ছিলেন, নিম্ন আদালতে অন্যান্য সাক্ষীদের মধ্যে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ছিলেন। সুনীল পরবর্তীতে এই আন্দোলন থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন। হাংরি আন্দোলন যতটা না বিখ্যাত তারচে’ বেশী কুখ্যাত হয়ে আছে এই অশ্লীলতার জন্য। বলা হয়, অশ্লীলতা থেকে উদ্ভুত মামলা মোকদ্দমাই এই আন্দোলনকে পরিচিত করেছে, অন্যথায় এই আন্দোলন বা কবিতাসমূহ স্মরনীয় হয়ে থাকার মত কিছু ছিল না।

ষাটের দশকে ঘটে যাওয়া এই হাংরি আন্দোলন সৃজিত মুখার্জীর দ্বিতীয় সিনেমা ‘২২শে শ্রাবন’ সিনেমায় স্থান পেলেও প্রতিষ্ঠিত হয় নি। ফলে ষাটের দশক নয়, বর্তমান সময়ে ঘটে যাওয়া ঘটনাবলীই ফুটে উঠেছে সিনেমায়। হাংরি আন্দোলন সিনেমায় এসেছে হাংরিয়ালিস্ট কবি নিবারণ চক্রবর্তী’র হাত ধরে। মানসিক বিকারগ্রস্থ এই কবি বর্তমান সময়েও হাংরি আন্দোলনকে নিজের মধ্যে ধরে রেখেছেন এবং কিছুটা মানসিক বিকারগ্রস্থ হয়ে গভীর রাতে এলোমেলো ভাবে ঘুরে বেড়ান, সেলফোনে তার কবিতার বইয়ের প্রকাশক রবীন্দ্রনাথের সাথে কথা বলেন, কবিতা আবৃত্তি করে শোনার রাতের মাতালদের। এই কবি পুলিশের খাতায় তালিকাভুক্ত কোন এক বইমেলায় আগুন ধরিয়ে দেয়ার অপরাধে। অবশ্য এই অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত শেষ পর্যন্ত মানসিক হাসপাতালে হয়েছিল। কোলকাতা শহরে ঘটে যাওয়া সিরিয়াল কিলিঙ একসময় এই কবির দিকেই আঙ্গুল তুলে ধরে।

সাইকোলজিক্যাল-ক্রাইম থ্রিলার এই সিনেমা কোলকাতা শহরে একের পর এক ঘটে যাওয়া নির্ভুল ছাপহীন নির্মম হত্যাকান্ড, খুনিকে ধরার জন্য পুলিশের প্রচেষ্টার পাশাপাশি বানিজ্যিক প্রয়োজনে ত্রিভুজ প্রেম, যৌনতার সুরসুরি আর মদ-বিড়ি-অশ্লীল খিস্তিখেউরের এক অপূর্ব সমন্বয়। অথচ যে গল্পকে ঘিরে সিনেমা সেই গল্পে ফাক ফোকর দিয়ে হাওয়া যাতায়াত করে। প্রবীর রায় চৌধুরী নামের বরখাস্ত হওয়া রগচটা কিন্তু মেধাবী পুলিশ অফিসারের সহযোগী হয়ে আরেক রগচটা পুলিশ অভিজিত পাকরাশী খুনির পেছনে তাড়া করলেও তাদের চরিত্র কতটুকু যৌক্তিক ছিল সে ব্যাপারে প্রশ্ন জাগে। এর পাশাপাশি আছে চিত্রনাট্যের বাহুল্য। প্রবীর রায় চৌধুরীর জীবনে স্ত্রী-পুত্র হারানোর বেদনা থাকলেও সেই বেদনার প্রভাব তার কর্মে পড়ে না – সেক্ষেত্রে এই বেদনার গল্প কি রগচটা পুলিশের প্রতি সহানুভূতি তৈরীর কৌশল? ক্রাইম থ্রিলারে টিভি চ্যানেলের নারী কর্মী থাকতেই পারে কিন্তু তার হাত ধরে ত্রিভুজ প্রেমের উপস্থাপন সিনেমার গতিকে রুদ্ধ করেছে, রাস্তা থেকে নামিয়ে ধানক্ষেতে নিয়ে গেছে। ফলে ক্রাইম থ্রিলার পাল্টে গিয়ে হয়েছে টক-মিষ্টি প্রেমের ছবি। ওদিকে খুনী তখন পরবর্তী খুনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। বিভিন্ন বিখ্যাত কবিতার যথাযথ এবং সুন্দর প্রয়োগ, বিশেষত প্রতিটি হত্যাকান্ডের সাথে চিরকুটে একটি কবিতা, সিনেমায় ভিন্ন স্বাদ এনে দিয়েছে। কিন্তু এই কবিতার সাথে হাংরি আন্দোলনকে যুক্ত করার যৌক্তিকতা খুজে পাওয়া ভার। মানসিকভাবে অসুস্থ্য হাংরিয়ালিস্ট কবি স্থলে মানসিক ভাবে অসুস্থ্য হতাশাগ্রস্থ কোন কবির কাজে কোন পার্থক্য খুজে পাওয়া যাবে না। সেক্ষেত্রে হাংরি আন্দোলন শুধুমাত্র সিনেমার অলঙ্কার, অন্য কথায়, বাহুল্য।

সৃজিতের প্রথম সিনেমা ‘অটোগ্রাফ’র মত এখানেও অন্যতম চরিত্র পুলিশ অফিসার অভিজিত তার বান্ধবীর সাথে লিভ টুগেদার করেন। প্রেম বা বিয়েকে এড়িয়ে লিভ টুগেদার কি কোলকাতার স্বাভাবিক চিত্রকে তুলে ধরা না লিভ টুগেদারকে প্রমোট করা সেটা বোঝা গেল না। একইভাবে প্রশ্ন তোলে মাত্রাহীন গালিগালাজ। অপ্রয়োজনীয় নোংরা এই খিস্তিখেউরের যৌক্তিকতা শুধু একজায়গাতেই – বোধহয় পরিচালক সৃজিত নিজেও একজন হাংরি আন্দোলনের সমর্থক। প্লটে আরেকটি বিশাল গর্ত খুজে পাওয়া যায় সিনেমার শেষপ্রান্তে, যেখানে একটি টুইস্ট সিনেমার মুখ পরিবর্তন করেছে, দর্শকপ্রিয় করেছে। মাইকেল মধূসুদন দত্তের মৃত্যুদিবসে খুনীর মৃত্যুর পরেই কাহিনীর সমাপ্তি হওয়া স্বাভাবিক। সিরিয়াল কিলিঙ সমস্যার সফল সমাধানে আবার পুলিশ বাহিনীতে মর্যাদার সাথে প্রবীর রায় চৌধুরী আসীন হওয়ায় গল্প শেষ হতে পারতো, কিন্তু শেষ না হওয়ায় বোঝা গেল – গল্পের শেষ বাকী। কিন্তু এই শেষের জন্য দর্শক প্রস্তুত ছিল কি? সিনেমার পুরোটায় কোন ক্লু ছিল না, আনসলভড কোন প্রশ্ন ছিল না – অথচ সিনেমার শেষপ্রান্তে এসে খুনী নিজেই উদ্যোগী হয়ে জানালেন – আজ ২২শে শ্রাবন, সুতরাং আজ আরও একটি হত্যাকান্ড ঘটবে। ফলে এই হত্যাকান্ডের বিষয়টি চাপিয়ে দেয়া, দর্শকের উপর বোঝা। যদি এমনটি হত যে খুনী ধরা পরার পরও হত্যাকান্ড ঘটে চলছে – সেক্ষেত্রে দর্শকও জানতো, রহস্যের আপাত সমাপ্তি আসলে নতুন রহস্যের শুরু। চিত্রনাট্যকার হিসেবে সৃজিত মুখার্জি তাই এখানে দুর্বল।

সিনেমায় ভালো লাগবে এর সিনেমাটোগ্রাফি। মোহনীয় লাইটিঙ করেছেন সৌমিক হালদার। বিশেষত প্রবীর রায় চৌধুরীর প্রথম উপস্থিতিতে মুখের একদিকে আলো অন্যদিকে শুধু চোখটিকে গাঢ় অন্ধকারে রাখার ফলে যে ভৌতিকতা তৈরী হয়েছে সেটা উপভোগ্য। ভালো লাগবে ছবির গানগুলোকেও। কিন্তু গানের সাথে এর দৃশ্যায়নের সামঞ্জস্যতা নিয়ে প্রশ্ন করলে উত্তর খুজে পাওয়া দুস্কর হবে। অন্যান্য বানিজ্যিক সিনেমার মতো এখানেও নারী শরীর গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। অভিনয়ের প্রসঙ্গে অভিজিত চরিত্রে পরমব্রত চ্যাটার্জী বেশ ভালো অভিনয় করেছেন, যদিও তার রগচটা আচরন কোথাও কোথাও ভিত্তিহীন – তবে এজন্য তাকে দোষ দেয়া যায় না, পরিচালকই এর দায় নিবেন। অটোগ্রাফ সিনেমার দুর্দান্ত অভিনেতা প্রসেনজিত রগচটা কখনো কখনো সীমালঙ্ঘনকারী পুলিশ অফিসার প্রবীর রায় চৌধুরী চরিত্রে রূপ দিয়েছেন। মজার ব্যাপার হল, প্রসেনজিতের এই রগচটা চরিত্রের পরিচয় পাওয়া যায় অন্যান্য চরিত্রের কথায়, বরং সারাদিন মদে ডুবে থাকা একজন মদখোর হিসেবে তার ভূমিকা বরং অনেক স্পষ্ট। সিনেমার প্রথম অর্ধেকে প্রসেনজিত যতটা গম্ভীর এবং কঠিন, শেষ অর্ধেকে ঠিক ততটাই কোমল এবং মিশুক। ফলে, তার চরিত্রত্রে অতি অভিনয় প্রকট। অমৃতা চরিত্রে রাইমা সেন অভিনয় করলেও তার উপস্থিতি যতটা না কাহিনীর প্রয়োজনে তারচে বেশী শরীরের প্রয়োজনে বলেই মনে হয়েছে। অপূর্ব সুন্দর চোখের অধিকারী এই নারী কেন শুধু তার শরীর দেখিয়ে দর্শক টানার চেষ্টা করেন সে আমার বোধগম্য নয়।

সিনেমার খুবই উল্লেখযোগ্য অস্তিবাচক দিক হল কবি-চিত্রপরিচালক গৌতম ঘোষের উপস্থিতি। দীর্ঘ ২৯ বছর পর তিনি ক্যামেরার সামনে দাড়ালেন হাংরিয়ালিস্ট কবি নিবারণ চক্রবর্তী চরিত্রে। সত্যিকারের অভিনয় পাওয়া গেল তার কাছ থেকে। গুনী এই ব্যক্তি প্রয়োজনে আবারও সামনে দাড়াবেন, সিনেমার চরিত্রকে নিজের মধ্যে মিশিয়ে তুলে ধরবেন এই প্রত্যাশা করা যায়।

সব মিলিয়ে সৃজিতের পারফর্ম্যান্স কেমন ২২শে শ্রাবন সিনেমায়? ভালো না। অন্তত: অটোগ্রাফ সিনেমার ফলে যে প্রত্যাশা তৈরী হয়েছিল, তা পূরণ করতে পারেন নি তিনি। অটোগ্রাফ সিনেমার নায়কের মতই তিনি সিনেমার বাজারে নিজের স্থান দখল করে নিয়েছেন সত্যি, কিন্তু দর্শকের মনে স্থান করে নিতে প্রয়োজনে আরও সময় ব্যয় করতে হবে তাকে। আনন্দবাজার পত্রিকার রিভিউতে দশে সাড়ে আট দেখে খুশী হওয়ার আগে তাকে বুঝতে হবে – আনন্দবাজার এই সিনেমার মিডিয়া পার্টনার, অর্থাৎ দশে সাড়ে আট তার যোগ্যতার বিচারে নয় বরং সিনেমার কাটতি বাড়ানোর পদ্ধতি।


নাজমুল হাসান দারাশিকো। প্রতিষ্ঠাতা ও কোঅর্ডিনেটর, বাংলা মুভি ডেটাবেজ (বিএমডিবি)। যোগাযোগ - darashiko@gmail.com
View all posts by দারাশিকো →

11 Comments on “২২শে শ্রাবন: সিনেমায় হাংরি আন্দোলন”

  1. ভালো লাগল। 
    প্রসেঞ্জিত আর গৌতম ঘোষ এর অভিনয় খুবই ভালো হয়েছে… কিন্তু শেষের দিকে প্রবীর রায়চৌধুরীর কোমলতা আমারো আজব লেগেছে। আর খুন টা হওয়ার পর মিস্ট্রি টা সল্ভ কেন করা গেল না আমার কাছে বোধগম্য না। ত্রিভুজ প্রেম টা কলকাতার ভাষায় পুরোই “বাকওয়াস” ছিল। :S
    তবে একদম লাস্ট সিন টা আমার কাছে বেশ ভালো লেগেছে। আর কবিতা গুলো চমৎকার।
  2. boss likhata bod hoi amar jonno aktu kothin hoye gase……amar kintu bes valoi lagse chobita……asole bos chobita muloto typically thriller….ar triangle lovestory….ta nari chorittro dhukano r ki…banijjik karonei…kintu hangrialistic movement ta sei vabe ai cinemar topic noi…tension tai ai chobir mul jayga……ar gali galazer bepar ta boss bastobota police er khetre to aro chorom bastobota…apni ses drisser bepare jeta bolsen ota thik ami bujte parini ..amar kache sobcheye chorom sequence ai last scene tai…tak laganor moto drisso……..ami to bolbo bangla cinemai serial killing er moto topic…khubi welcome jananor bisoy…gan gula drisser sathe osonglogno ata thik…….
    1. ভাই সুমন, ভালো লাগা না লাগা আপেক্ষিক ব্যাপার – আমার যা ভালো লাগে আপনার তা ভালো নাও লাগতে পারে।
      ছবিটা থ্রিলার তাতে কোন সন্দেহ নেই, কিন্তু একটা ভালো সিনেমা তখনই ভালো সিনেমা হয় যখন তার গল্পটা সুগঠিত হয় – অন্তত: সিনেমা নিয়ে কিঞ্চিত পড়াশোনায় তাই বুঝেছি। হাঙরিয়ালিস্ট মুভমেন্ট এই সিনেমার টপিক নয় জানি, কিন্তু ফেলনাও নয়। কারণ কাহিনীর অন্যতম চরিত্র গৌতম ঘোষের চরিত্র নির্মানের পেছনে কিন্তু হাংরিয়ালিস্ট মুভমেন্টই বড় কারণ। কিন্তু সেভাবে ফুটল কই?
      শেষ দৃশ্যটা তো সিনেমার অযৌক্তিক পার্ট মনে হয়েছে। সিনেমা যদি গৌতম ঘোষের মৃত্যুর সাথে সাথেই শেষ হয়ে যেত তবে দর্শকের কোন আফসোস থাকতো না বলেই মনে হয়। বাকী অংশটুকু জোর করে থ্রিলার তৈরীর চেষ্টা।
      তবে আপনার মন্তব্য খুবই গুরুত্বপূর্ন। সিনেমা নির্মাতারা দর্শকের জন্য সিনেমা বানান, সমালোচকের জন্য নন। দর্শকের চোখ এড়িয়ে যদি সিনেমায় গরুকে গাছে তুলতে পারেন – তবে তাই সিনেমা। সেখানেই সিনেমার এবং সিনেমা নির্মাতার সাফল্য।
      আপনার মন্তব্য আমার কাছে সবসময়ই গুরুত্বপূর্ন।ভালো থাকুন সুমন
  3. boss mone hoi aktu rag korsen…..goru k gache tolar kothati kintu setai bole…rag koiren na boss taile to shadin vabe kisu bolte parum na….jak….ami ottonto shadaron akjon dorshok….cinemar tattik knowledge amar sei orthe nai……tobu o arektu boli…..boss akhon indian cinemai jeta hocche seta k amar vasshai semi art cinema boli…ai jemon dhorun….22 se shrabon a….hangrialistic movement ba shakti chottopaddhay ba moloy rai chawdhuri ba rabindronath,kichu kobitar line ba goutom ghosh nije…era sobai cinematir art factor…intelectual dhorshokder chahida r ki….abar sundori nayika ba prem ba sexual appeal…kingba prosenjit er moto taroka…ara cinematir..commercial content…amar moto shadharon dorshoker chahida…..ta na hole kobi character ta jodi shudu berthotar glani te vora manoshik varsammohin….kobi holeo kisu ese jeto na…….kobi shekhane joto ta na hangrialistic tar cheye besi kobita na chapar bethai kator…akta rohosso…….among somajer proti tar grina…..jai hok ses drisso niye aktu boli…….chobir prothom thekei jekono dorshoker ee mone hobe kobitie khuni…abong sese giye jodi tai ber hoi je kobi serial kiiler tahole ar thriller thaklo kothai…tobe hai apni jeta bolechen je goutom ghoser mrittur por o khuner ghotona cholte thakle atao onno rokom hoto……ai suspence maintain korte giye hoito director goutom ghos k khuni koren ni….asole thriller a taski khawar moto bepar na thakle to boss jay na…….valo thaiken……
    1. Sumon Boss……….Chorom Bolchen……. I m agree with u…..amr kacheo movie ta oshadharon lagche……R movie te amon kono kahini nai je amra take Gorur gache chorar shathe tulona korte pari…..ekjon k dekhlam je kina BD er kichu shakib khan type movie like kore shundor review dite pare,bt ei movie like kore na…….ashole amar mone hoy eita Deshattodhodh er karone
      1. দারাশিকো’র ব্লগে স্বাগতম এস আই জয়।
        আমি জানি না আপনি কার কথা বলেছেন যিনি দেশাত্মবোধ থেকে শাকিব খানের টাইপ সিনেমার ভালো রিভিউ লিখে, কিন্তু এই সিনেমাকে ‘লাইক’ করে না – বাণিজ্যিক বাংলা সিনেমা নিয়ে আমার দুটো রিভিউ আছে, তাই আমার পজিশন ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন বোধ করছি।
        আমি বাংলাদেশের সিনেমা দেখার সময় ‘বাংলাদেশীদের নির্মিত সিনেমা’ দেখছি এমন একটা চিন্তা নিয়েই দেখতে বসি। আবার হলিউডের একটা সিনেমা দেখার সময় হলিউড/ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে প্রথম শ্রেনীর কারও সিনেমা দেখছি সেরকম প্রস্তুতি থাকে। কোলকাতার সিনেমার ক্ষেত্রেও এই একই রকম চিন্তা থাকে।
        বাংলাদেশী কোন সিনেমাকে সাম্প্রতিক সময়ের কোলকাতা বা হলিউড/ইউরোপিয়ান সিনেমার সাথে তুলনা করা বোকামী। একই ভাবে কোলকাতার সিনেমার জন্যও প্রযোজ্য। কিন্তু কোলকাতার সিনেমা ক্রমাগত উন্নতি করছে এবং এই সিনেমাটা সম্পর্কে বাংলাদেশী দর্শকদের মধ্যে অনেক প্রশংসামূলক বাক্য আমি দেখেছি। সিনেমাটা উপভোগ্য, কিন্তু বিশ্লেষন করতে গেলে এই সিনেমার ত্রুটিগুলো বের হয়ে আসে – আমি সেগুলো তুলে ধরেছি। দর্শক ভালোভাবে গ্রহণ করেছে বলে সেই সিনেমার ত্রুটি নাই তা কিন্তু নয়। বিশ্ব সিনেমায় অনেক অনেক সিনেমা আছে যা দর্শকরা গ্রহন করে নাই, ভালো ব্যবসা করে নাই, কিন্তু অ্যাকাডেমিক সিনেমা হিসেবে সিনেমাগুলো কয়েকশ বছরের জন্য রেফারেল হয়ে থাকবে। আপনি যদি ‘রান্না উপাদেয় হল কিনা’ এই ভিত্তিতে বিবেচনা করেন তাহলে আপনিই সঠিক, কিন্তু আপনি যদি ‘রান্না স্বাস্থ্যসম্মত হলো কিনা’ সেই বিবেচনা করেন তবে আমার রিভিউকে সঠিক বলতে হবে। আর হ্যা, আপনি যদি স্বাস্থ্যসম্মত রান্নার চেয়ে উপাদেয় রান্নাকে পছন্দ করেন তবে এই নিয়ে তর্ক করা সম্পূর্ন বৃথা।
        ভালো থাকুন জয়। আবার আসবেন।