Literary Movement লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
Literary Movement লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
মঙ্গলবার
হাংরি আন্দোলনকারীরা আছেন সর্বত্র
লেবেলসমূহ:
হাংরি আন্দোলন,
হাংরি কিংবদন্তি,
হাংরি জেনারেশন,
Hungry Generation,
Hungryalism,
Literary Movement
অভিজিৎ গাঙ্গুলি : বিনয় মজুমদার ও হাংরি আন্দোলন
জন্মদিনে শ্রদ্ধাঞ্জলি…._/”\_
বিনয় মজুমদার বা মংটু (জন্ম:১৭ সেপ্টেম্বর, ১৯৩৪- মৃত্যু: ১১ ডিসেম্বর, ২০০৬) একজন বিশিষ্ট ভারতীয় বাঙালি কবি ও ইঞ্জিনিয়ার।১৯৫৮ সালের জানুয়ারি মাসে, অর্থাৎ ছাত্রজীবন সমাপ্ত হবার কয়েকমাস পরেই এনবিএ থেকে প্রকাশিত হয় "অতীতের পৃথিবী" নামক একটি অনুবাদ গ্রন্থ। এই বছরেই গ্রন্থজগৎ থেকে বের হয় তাঁর প্রথম কাব্য গ্রন্থ 'নক্ষত্রের আলোয়'।তিনি মোট বিশটির কাছাকাছি কাব্যগ্রন্থ লিখেছেন। যার মধ্যে "ফিরে এসো চাকা" তাঁকে সবচেয়ে বেশি খ্যাতি দিয়েছে।তার মৃত্যুর কয়েক বছর আগে তাঁকে দুটি বড় পুরস্কার দেওয়া হয়, রবীন্দ্র পুরস্কার এবং একাডেমি পুরস্কার।
Remembering and Paying Tribute on Birth Anniversary ..... _/"\_
Binoy Majumdar (17 September 1934 - 11 December 2006) was a Bengali poet. During the 1960s he had joined the Hungry generation movement for a short time but departed because of differences with its leader Shakti Chattopadhyay. However, he had published several poems in the Hungryalist bulletins and one of them viz., 'Ekti Ujwal Maach' became quite famous and popular among academicians. The period from 1958-1962 saw Binoy's poetry thrive. Apart from Phire Esho, Chaka, he wrote other books, such as: Nakshatrer Aaloy (In the light of the stars), Eeshwariyo (Godly), Adhikantu (Excessive), Aghraaner Anubhutimala (The emotions of the month of Aghran), Balmikir Kabita (The Poetry of Balmiki). An anthology of Binoy's poems was published by Dey's Publishing House of Calcutta under the name Binoy Majumdarer Srestho Kabita (Selected Poems of Binoy Majumdar) in 1981.Binoy's poetry has been appreciated by literary critics. He won several awards such as Rabindra Puraskar,Sudhindranath Dutta Puraskar,Krittibas Puraskar etc., and the most notable award being the Sahitya Academy Award in 2005, just a year before his death.
বিনয় মজুমদার বা মংটু (জন্ম:১৭ সেপ্টেম্বর, ১৯৩৪- মৃত্যু: ১১ ডিসেম্বর, ২০০৬) একজন বিশিষ্ট ভারতীয় বাঙালি কবি ও ইঞ্জিনিয়ার।১৯৫৮ সালের জানুয়ারি মাসে, অর্থাৎ ছাত্রজীবন সমাপ্ত হবার কয়েকমাস পরেই এনবিএ থেকে প্রকাশিত হয় "অতীতের পৃথিবী" নামক একটি অনুবাদ গ্রন্থ। এই বছরেই গ্রন্থজগৎ থেকে বের হয় তাঁর প্রথম কাব্য গ্রন্থ 'নক্ষত্রের আলোয়'।তিনি মোট বিশটির কাছাকাছি কাব্যগ্রন্থ লিখেছেন। যার মধ্যে "ফিরে এসো চাকা" তাঁকে সবচেয়ে বেশি খ্যাতি দিয়েছে।তার মৃত্যুর কয়েক বছর আগে তাঁকে দুটি বড় পুরস্কার দেওয়া হয়, রবীন্দ্র পুরস্কার এবং একাডেমি পুরস্কার।
Remembering and Paying Tribute on Birth Anniversary ..... _/"\_
Binoy Majumdar (17 September 1934 - 11 December 2006) was a Bengali poet. During the 1960s he had joined the Hungry generation movement for a short time but departed because of differences with its leader Shakti Chattopadhyay. However, he had published several poems in the Hungryalist bulletins and one of them viz., 'Ekti Ujwal Maach' became quite famous and popular among academicians. The period from 1958-1962 saw Binoy's poetry thrive. Apart from Phire Esho, Chaka, he wrote other books, such as: Nakshatrer Aaloy (In the light of the stars), Eeshwariyo (Godly), Adhikantu (Excessive), Aghraaner Anubhutimala (The emotions of the month of Aghran), Balmikir Kabita (The Poetry of Balmiki). An anthology of Binoy's poems was published by Dey's Publishing House of Calcutta under the name Binoy Majumdarer Srestho Kabita (Selected Poems of Binoy Majumdar) in 1981.Binoy's poetry has been appreciated by literary critics. He won several awards such as Rabindra Puraskar,Sudhindranath Dutta Puraskar,Krittibas Puraskar etc., and the most notable award being the Sahitya Academy Award in 2005, just a year before his death.
লেবেলসমূহ:
বিনয় মজুমদার,
হাংরি আন্দোলন,
Literary Movement,
Malay Roychoudhury
সোমবার
শুজা মাহমুদ : হাংরি জেনারেশন আন্দোলন আছে, থাকবে
Hungryalist movement // হাংরি জেনারেশন // হাংরি জেনারেশন আন্দোলন
একটি সতর্কবাণী : এই শিরোনামের পোস্ট গুলি বয়স নয় মনন ও চিন্তায় যারা প্রাপ্ত বয়স্ক শুধু মাত্র তাদের জন্য।
রফিক ভাই, হাংরি জেনারেশন, ষাটের দশকের একটি মুছে যাওয়া আধ্যায়, তুলে এনেছেন সম্প্রতি তাঁর টাইম লাইনে । এই প্রসঙ্গে আমরা পরস্পরের সাথে আলাপ-চারিতায় আমাদের কৈশরে ফিরে গিয়েছি এবং স্মৃতি চারণ করেছি। মুরাদ জানতে চেয়েছে হাংরি জেনারেশনের কথা। বাংলায় ( উভয় বাংলায় ) কবিদের মধ্যে এখন আর শোনা যায় না, ষাটের দশকের প্রথমার্ধের সেই আন্দোলনের কথা। অথচ পশ্চিম বঙ্গে এবং বিশ্ব সাহিত্যের পরিমণ্ডলে এখনও আলোচিত হচ্ছে কোলকাতার Hungryalist Movement সম্পর্কে। ২০১৪-১৫ তে বিবিসি একটি ডকুমেণ্টারি প্রচার করেছিল। যুক্তরাষ্ট্রে এবং ভারতের সাহিত্য সম্পর্কিত পত্র পত্রিকায় এই সেদিনও লেখা লেখি হয়েছে ও হচ্ছে সেই দ্রোহ কালের কবি ও কবিতাবলি নিয়ে। সিনেমা হচ্ছে অথবা সিনেমার কাহিনীতে সংযোজিত হচ্ছে দ্রোহী কবিদের কবিতা ( সেন্সরড ) ।
হাংরি জেনারেশন নিয়ে পোস্ট একটি পর্বে শেষ হবে না। তাই প্রথম পর্বে কবিতা ও গান ( বাইশে শ্রাবণ ছবিটি ওই থিমে তৈরি ও কবিতার অংশ বিশেষ সে সময়ের ) দিলাম। পরের পর্বে বিভিন্ন ওয়েবসাইট হাতড়ানো-লব্ধ তথ্যাদি, আমার ক্ষুদ্র জানা ও ধারনা থেকে লেখার চেষ্টা থাকবে। মলয় চৌধুরীর ছবি ( সিনেমা )-টা আপলোডের চেষ্টা করবো সেই সাথে। এতদসম্পর্কিত জানা তথ্য ও চিন্তা ভাবনা বিনিময়ের জন্য সকলের কাছে বিনীত আহ্বান রইলো । বিনয়ের সাথে আরেকটি স্বীকারোক্তি, যে জলে ডুব সাঁতার দিয়ে মুক্তা খুজবেন, হয়তো দেখবেন আমিও সেখানে ডুব সাঁতার দিচ্ছি। আমি সে জন্য আগেই ক্ষমা চেয়ে নিলাম।
একটি সতর্কবাণী : এই শিরোনামের পোস্ট গুলি বয়স নয় মনন ও চিন্তায় যারা প্রাপ্ত বয়স্ক শুধু মাত্র তাদের জন্য।
রফিক ভাই, হাংরি জেনারেশন, ষাটের দশকের একটি মুছে যাওয়া আধ্যায়, তুলে এনেছেন সম্প্রতি তাঁর টাইম লাইনে । এই প্রসঙ্গে আমরা পরস্পরের সাথে আলাপ-চারিতায় আমাদের কৈশরে ফিরে গিয়েছি এবং স্মৃতি চারণ করেছি। মুরাদ জানতে চেয়েছে হাংরি জেনারেশনের কথা। বাংলায় ( উভয় বাংলায় ) কবিদের মধ্যে এখন আর শোনা যায় না, ষাটের দশকের প্রথমার্ধের সেই আন্দোলনের কথা। অথচ পশ্চিম বঙ্গে এবং বিশ্ব সাহিত্যের পরিমণ্ডলে এখনও আলোচিত হচ্ছে কোলকাতার Hungryalist Movement সম্পর্কে। ২০১৪-১৫ তে বিবিসি একটি ডকুমেণ্টারি প্রচার করেছিল। যুক্তরাষ্ট্রে এবং ভারতের সাহিত্য সম্পর্কিত পত্র পত্রিকায় এই সেদিনও লেখা লেখি হয়েছে ও হচ্ছে সেই দ্রোহ কালের কবি ও কবিতাবলি নিয়ে। সিনেমা হচ্ছে অথবা সিনেমার কাহিনীতে সংযোজিত হচ্ছে দ্রোহী কবিদের কবিতা ( সেন্সরড ) ।
হাংরি জেনারেশন নিয়ে পোস্ট একটি পর্বে শেষ হবে না। তাই প্রথম পর্বে কবিতা ও গান ( বাইশে শ্রাবণ ছবিটি ওই থিমে তৈরি ও কবিতার অংশ বিশেষ সে সময়ের ) দিলাম। পরের পর্বে বিভিন্ন ওয়েবসাইট হাতড়ানো-লব্ধ তথ্যাদি, আমার ক্ষুদ্র জানা ও ধারনা থেকে লেখার চেষ্টা থাকবে। মলয় চৌধুরীর ছবি ( সিনেমা )-টা আপলোডের চেষ্টা করবো সেই সাথে। এতদসম্পর্কিত জানা তথ্য ও চিন্তা ভাবনা বিনিময়ের জন্য সকলের কাছে বিনীত আহ্বান রইলো । বিনয়ের সাথে আরেকটি স্বীকারোক্তি, যে জলে ডুব সাঁতার দিয়ে মুক্তা খুজবেন, হয়তো দেখবেন আমিও সেখানে ডুব সাঁতার দিচ্ছি। আমি সে জন্য আগেই ক্ষমা চেয়ে নিলাম।
লেবেলসমূহ:
Hungry Generation,
Literary Movement,
Malay Roychoudhury
বুধবার
হাংরি মামলায় মলয় রায়চৌধুরীর পক্ষে তরুণ সান্যালের সাক্ষ্য
তরুণ সান্যাল: হাংরি মকদ্দমায় সাক্ষ্য, ষাটের দশক
তরুণ : তরুণ কুমার সান্যাল ।
পেশকার: বলুন, যা বলব সত্য বলব, সত্য বই মিথ্যা বলব না, কিছু গোপন করব না ।
তরুণ: যা বলব সত্য বলব, সত্য বই মিথ্যা বলব না, কিছু গোপন করব না ।
সত্যেন বন্দ্যোপাধ্যায় (আসামী পক্ষের উকিল): তরুণবাবু, আপনি তো অধ্যাপনা করেন?
তরুণ: আমি স্কটিশচার্চ কলেজে ইকনমিক্সের অধ্যাপক । এছাড়া আমি সুরেন্দ্রনাথ কলেজে রাত্রি বিভাগে পার্টটাইম লেকচারার হিসাবে ইকনমিক্স ও সট্যাটিসটিক্স পড়াই । আমার লেখা অনেক টেক্সটবুক আছে । আমি কবিতা ও প্রবন্ধ লিখি এবং সেগুলি বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয় ।
সত্যেন: আপনি এই কবিতাটা পড়ুন । এটা মেটেরিয়াল একজিবিট ওয়ান, ইয়োর অনার ।
তরুণ: জোরে-জোরে পড়ব কি?
বিচারক অমল মিত্র: না, মনে-মনে পড়ুন । কবিতাটা কি আগে পড়েছেন?
তরুণ: সমস্তটা না পড়লে ঠিক বলতে পারব না ।
সত্যেন: পড়লেন?
তরুণ: হ্যাঁ, মনে পড়েছে , আগে পড়েছিলাম । এই ইস্যুটা আমি প্রথম দেখি আমৃত কার্যালয়ে ।
সত্যেন: পড়ে শারীরিক ও মানসিক কোনও বৈলক্ষণ ঘটছে কি?
তরুণ: না । আমি তো আপনাদের সামনেই দাঁড়িয়ে রয়েছি ।
সত্যেন: পড়বার পর কোনও সাইকো-সোম্যাটিক পরিবর্তন অনুভব করছেন কি?
তরুণ: সামান্যতম নয়।
সত্যেন: কবিতাটি কি আপনার অশ্লীল মনে হল?
তরুণ: অশ্লীল বলতে আপনি কি মনে করেন?
সত্যেন: বাংলা ভাষায় অশ্লীল বলে একটা শব্দ আছে? এখন সেই শব্দটার যে অর্থ আপনি বোঝেন । আপনার সেই মতামত অনুযায়ী কবিতাটি অশ্লীল কি না ?
তরুণ: আমার মতে কবিতাটিকে কোনো মতেই অশ্লীল বলা যেতে পারে না ।
সত্যেন: দ্যাটস অল ইয়োর অনার ।
সরকারি উকিল: আচ্ছা মিস্টার সান্যাল, এই যে আপনি জিগ্যেস করছিলেন অশ্লীলতা বলতে কি বোঝায়, তা এক্ষেত্রে অশ্লীলতা বলতে আপনি নিজে কি মনে করেন?
তরুণ: আমার মতে অশ্লীলতা দুই ধরণের । প্রথম, যা ব্যক্তিক । এবং দ্বিতীয়, যা সমষ্টিগত বা সামাজিক । অশ্লীলতা ব্যক্তিবিশেষকে প্রভাবান্বিত করতে পারে, আবার এমন অশ্লীলতা আছে যা সমাজের ক্ষতি করতে পারে । যা কিছু চৈতন্যের অপনয়ন ঘটায়, তাকেই আমি মূলত অশ্লীল বলে মনে করব । যদি ব্যক্তি চৈতন্যের অপনয়ন ঘটে…..
বিচারক অমল মিত্র: ওয়েল প্রফেসর ইউ বেটার স্পিক ইন ইংলিশ । দিস বেঙ্গলি সিমস টু বি টু হার্ড ফর দি কোর্ট ।
তরুণ: থ্যাংক ইউ মি লর্দ । আমি আরও সহজ বাংলায় বলার চেষ্টা করছি ।
বিচারক অমল মিত্র: ইংরেজিতেই বলুন, তাতে আমাদের সুবিধে হবে ।
তরুণ: টু মি অবসিন মিনস সামথিং হুইচ কজেজ মেন্টাল ডিপ্র্যাভিটি টু অ্যান ইনডিভিজুয়াল । হোয়েন সামথিং বিকামস দি কজ অব ডিপ্রেভিং দি সোসাইটি আই উড কনসিডার দ্যাট টু বি অবসিন ।
বিচারক অমল মিত্র: হোয়াট ডু ইউ মিন বাই সোসাইটি ইনদিস প্রিটেকস্ট ? ডু ইউ মিন এ গ্রুপ অব পার্সনস ?
তরুণ: ইয়েস একজ্যাক্টলি মি লর্ড।
বিচারক অমল মিত্র: ইফ ইউ ফাইন্ড এনি অব ইয়োর পিউপিলস ইন দি কলেজ রিডিং এ পোয়েম অব দিস সর্ট হোয়াট উড ইউ ডু?
তরুণ: আই ওন্ট মাইন্ড ।
বিচারক অমল মিত্র: হোয়াট উড বি দি এফেক্ট অব দিস পোয়েম অন এ ম্যান ওন দি স্ট্রিট?
তরুণ: আই ডোন্ট ফাইন্ড এনি ডিফারেন্স ।
বিচারক অমল মিত্র: ডু ইউ মিন টু সে দিস পোয়েম উড হ্যাভ দি সেম এফেক্ট অন এ ম্যান অন দি স্ট্রিট এন্ড এ স্টুডেন্ট অব থ্রি ইয়ার্স ডিগ্রি কোর্স?
তরুণ: ইয়েস আই থিংক সো । হি উড হ্যাভ দি প্লেজার অব রিডিং এ পিস অব আর্ট ।
সরকারী উকিল: আপনি নিজেও কি এরকম কবিতা লেখেন?
তরুণ: নিশ্চই না । এক্সকিউজ মি, এই পয়েন্টটা আমি একটু পরিষ্কারভাবে বলতে চাই ।
সরকারী উকিল: ডাজন্ট ম্যাটার । ওতেই হবে। আপনি কি এরকম কবিতা আরও পড়েছেন?
তরুণ: আমেরিকায় একজন বিখ্যাত কবি ছিলেন, যিনি এইভাবে কবিতা লিখতেন । তাঁর নাম হুইটম্যান ।
সরকারী উকিল: আমরা বিদেশের কথা জানতে চাই না । আপনি হাংরি জেনারেশানে কখনও কনট্রিবিউট করেছেন?
তরুণ: না ।
সরকারী উকিল: তাহলে সাবস্ক্রাইব করেছেন?
তরুণ: কখনই না ।
সরকারী উকিল: দ্যাটস অল ।
(হাওয়া ৪৯ পত্রিকার বৈশাখ ২০০১ সংখ্যা থেকে পুনঃপ্রকাশিত )
লেবেলসমূহ:
Anti-Establishment,
Literary Movement,
Malay Roychoudhury,
Tarun Sanyal
শুক্রবার
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় : "মলয় ইচ্ছে করেই আমার আমেরিকা-বাসের সময়টা বেছে নিয়েছিল"
হাংরি জেনারেশন আন্দোলনকে বেশির ভাগ কবি-লেখক কেন ঈর্ষা করেন ?
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়-এর ঈর্ষা : "মলয় ইচ্ছে করেই আমার আমেরিকা-বাসের সময়টা বেছে নিয়েছিল"
বাসব রায়কে দেয়া সাক্ষাৎকারে, গৌহাটির
'যুগশঙ্খ' পত্রিকায় ২০০৬ সালে প্রকাশিত, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বলেছিলেন, "মলয়
ইচ্ছে করেই আমার আমেরিকা-বাসের সময়টা বেছে নিয়েছিল ।" মলয় রায়চৌধুরী
সেসময়ে একজন অচেনা প্রবাসী যুবক ছিলেন এবং দাদা সমীর রায়চৌধুরীর সঙ্গে
পরামর্শ করে হাংরি আন্দোলন আরম্ভ করতে চাইছিলেন ।
পরবর্তীকালে হাংরি আন্দোলনের খ্যাতি বা কুখ্যাতি যেভাবে সারা ইউরোপ আমেরিকায় সাড়া ফেলেছিল, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় হাংরি আন্দোলনের বিরুদ্ধে প্রচার চালিয়ে গেছেন । সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় দুটি কারণে হাংরি আন্দোলনের পপতি ঈর্ষান্বিত ছিলেন । প্রথম, তিনি মনে করতেন তাঁর 'কৃত্তিবাস' গোষ্ঠীকে ভেঙে ফেলার জন্য হাংরি আন্দোলন আরম্ভ করা হয়েছে, এবং যেহেতু তিনি কলকাতায় নেই, মলয় রায়চৌধুরী সেই সুযোগটি নিয়েছেন । দ্বিতীয়, তিনি মনে করতেন, বাংলা সাহিত্যে কোনো আন্দোলন হলে তার নেতৃত্ব থাকা উচিত তাঁর নিয়ন্ত্রণে ; মলয় রায়চৌধুরী নেতৃত্ব শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের হাতে দিয়ে ভুল করেছেন কেননা নেতৃত্ব দেবার মতো সাংগঠনিক ক্ষমতা ও যোগাযোগ শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের নেই ।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কৃত্তিবাস পত্রিকায় হাংরি আন্দোলনের বিরুদ্ধে সম্পাদকীয় লিখেছিলেন । হাংরি আন্দোলনকে ভেঙে দেবার হুমকি দিয়ে আমেরিকা থেকে মলয় রায়চৌধুরীকে চিঠি দিয়েছিলেন । সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়কে আমেরিকা থেকে চিঠি দিয়ে বলেছিলেন হাংরি আন্দোলন থেকে বেরিয়ে যেতে ।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় যদি হাংরি আন্দোলনের সাহিত্যের বিরোধী থাকতেন তাহলে বাসব রায়কে বলতেন না যে, "মলয় ইচ্ছে করেই আমার আমেরিকা-বাসের সময়টা বেছে নিয়েছিল।" প্রকৃতপক্ষে তিনি ঈর্ষান্বিত ছিলেন ।
পরবর্তীকালে হাংরি আন্দোলনের খ্যাতি বা কুখ্যাতি যেভাবে সারা ইউরোপ আমেরিকায় সাড়া ফেলেছিল, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় হাংরি আন্দোলনের বিরুদ্ধে প্রচার চালিয়ে গেছেন । সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় দুটি কারণে হাংরি আন্দোলনের পপতি ঈর্ষান্বিত ছিলেন । প্রথম, তিনি মনে করতেন তাঁর 'কৃত্তিবাস' গোষ্ঠীকে ভেঙে ফেলার জন্য হাংরি আন্দোলন আরম্ভ করা হয়েছে, এবং যেহেতু তিনি কলকাতায় নেই, মলয় রায়চৌধুরী সেই সুযোগটি নিয়েছেন । দ্বিতীয়, তিনি মনে করতেন, বাংলা সাহিত্যে কোনো আন্দোলন হলে তার নেতৃত্ব থাকা উচিত তাঁর নিয়ন্ত্রণে ; মলয় রায়চৌধুরী নেতৃত্ব শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের হাতে দিয়ে ভুল করেছেন কেননা নেতৃত্ব দেবার মতো সাংগঠনিক ক্ষমতা ও যোগাযোগ শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের নেই ।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কৃত্তিবাস পত্রিকায় হাংরি আন্দোলনের বিরুদ্ধে সম্পাদকীয় লিখেছিলেন । হাংরি আন্দোলনকে ভেঙে দেবার হুমকি দিয়ে আমেরিকা থেকে মলয় রায়চৌধুরীকে চিঠি দিয়েছিলেন । সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়কে আমেরিকা থেকে চিঠি দিয়ে বলেছিলেন হাংরি আন্দোলন থেকে বেরিয়ে যেতে ।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় যদি হাংরি আন্দোলনের সাহিত্যের বিরোধী থাকতেন তাহলে বাসব রায়কে বলতেন না যে, "মলয় ইচ্ছে করেই আমার আমেরিকা-বাসের সময়টা বেছে নিয়েছিল।" প্রকৃতপক্ষে তিনি ঈর্ষান্বিত ছিলেন ।
মঙ্গলবার
এক রাজদ্রোহী রাজকুমারের কাহিনি : মলয় রায়চৌধুরী সম্পর্কে কলিম খান
এক রাজদ্রোহী রাজকুমারের কাহিনি : মলয় রায়চৌধুরী সম্পর্কে কলিম খান
Kalim Khan
প্রথম পর্ব : ষড়যন্ত্র : মারণ
( কোরাণ ও গীতা : পুনঃপাঠ )মহম্মদ কহিলেন : হে আবুবক্কর ! মদিনা হইতে এই বিশাল সৈন্যবাহিনী লইয়া যে উদ্দেশ্যে হেথায় আসিয়াছি, তাহা বুঝি আর সফল হইল না । দেখো, সন্মুখসমরে আজ আমারই কোরেশ বংশের বংশজগণ । আর দেখো, উভয় সেনার মধ্যে আমারই পিতৃব্যগণ পিতামহগণ আচার্য্যগণ মাতুলগণ ভাতৃগণ পুত্রগণ পৌত্রগণ মিত্রগণ শ্বশুরগণ সুহৃদগণ অবস্হান করিতেছেন । আমি কাহাকে হত্যা করিব ? হে আবুবক্কর ! যুদ্ধেচ্ছু এই সকল স্বজনদিগকে সন্মুখে অবস্হিত দেখিয়া আমার শরীর অবসন্ন হইতেছে এবং মুখ শুষ্ক হইতেছে । ইহা সত্য যে, ৩৬০টি প্রতিমা প্রতিষ্ঠা করিয়া ইহারা যুগযুগান্ত ধরিয়া আরববাসীগণকে প্রতারিত করিতেছে, আর ওই প্রতীকগুলির সাহায্যে পুরাতন জীবনব্যবস্হায় তাহাদিগকে মোহগ্রস্হ করিয়া রাখিয়াছে, তাহাদের ধনসম্পদ ভোগ করিতেছে । ইহাও সত্য যে, আমি এই বংশেরই এক কনিষ্ঠতম ও অবহেলিত অবক্ষিপ্ত উত্তরাধিকারী, এক দুয়ো-রাজকুমার । তথাপি এক্ষণে ইহাদিগকে সমরাঙ্গনে সন্মুখস্হ দেখিয়া আমার হস্তপদ অবসন্ন হইয়া আসিতেছে ।
আবুবক্কর কহিলেন : অয় মুহম্মদ ! এই সঙ্কট সময়ে স্বর্গহানিকর অকীর্তিকর তোমার এই মোহ কোথা হইতে উপস্হিত হইল ? এ যুদ্ধ স্বার্থপ্রণোদিত নহে, ইহা জেহাদ, ধর্মযুদ্ধ । হে পরন্তপ ! তুচ্ছ হৃদয়ের দুর্বলতা ত্যাগ করিয়া যুদ্ধার্থে উথ্থিত হও ! জেহাদ অপেক্ষা ইমানদার মোমিনের পক্ষে শ্রেয়ঃ আর কিছুই নাই । হে ধনঞ্জয় ! এই যুদ্ধ জগৎপিতার নিয়মে স্বয়ং উপস্হিত হইয়াছে । ইহা আমাদের নিমিত্ত জন্নাতের দ্বার উন্মুক্ত করিবে । অতএব যুদ্ধার্থে উথ্থিত হও । অন্যথায় মহারথগণ মনে করিবেন, তুমি ভয়বশত যুদ্ধে বিরত হইতেছ, দয়াবশত নহে । সুতরাং যাহারা তোমাকে বহু সন্মান করেন, তাহাদিগের নিকট তুমি লঘুতাপ্রাপ্ত হইবে । তোমার শত্রুরাও তোমার সামর্থ্যের নিন্দা করিয়া অনেক অবাচ্য কথা বলিবে । তাহা অপেক্ষা অধিক দুঃখকর আর কী আছে ? এক হস্তে অধর্মের বিনাশ ও অপর হস্তে ধর্মের প্রতিষ্ঠা নিমিত্ত তুমি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। ধর্মভ্রষ্টদিগকে হত্যা করিতে দ্বিধা কিসের ? সুতরাং হে সব্যসাচী, যুদ্ধে কৃতনিশ্চয় হইয়া উথ্থান করো।
সব্যসাচী কহিলেন : ইহা সত্য যে, ইহারা ধর্মভ্রষ্ট । এই কৌরবগণ আমাদিগের ন্যায় ইক্ষাকু বংশজ হইলেও ইহারা ধর্মের অমর্যাদা করিয়াছে । প্রজাপালন বিষয়ে ইহাদিগের দুঃশাসনের কোনও সীমা নাই । ইহাও সত্য যে, আমরা এই বংশেরই অবহেলিত অবক্ষিপ্ত উত্তরাধিকারী, এই রাজবংশের দুয়ো-রাজকুমার এবং ইহারা আমাদিগকে আশৈশব প্রবঞ্চনা করিয়া আসিতেছে, সাধারণ প্রজাদিগের তো কথাই নাই । সেই হেতু ধর্মপ্রতিষ্ঠার স্বার্থেই ইহাদিগকে ক্ষমতাচ্যুত করা প্রয়োজন । কিন্তু এতৎসত্বেও, স্বজন ও গুরুজনদিগকে বধ করিয়া কীরূপে প্রাণধারণ করিব, এইরূপ চিন্তাপ্রযুক্ত হইয়া চিত্তের দীনতায় আমি অভিভূত হইতেছি । প্রকৃত ধর্ম কী, এ বিষয়ে আমার চিত্ত বিমূঢ় হইতেছে । ধর্মপ্রতিষ্ঠার নিমিত্ত এ আমি কাহার হত্যাকারী হইতে চলিয়াছি ? অতএব হে কৃষ্ণ ! যাহাতে শুভ হয়, আমাকে নিশ্চিত করিয়া তাহা বলো !
শ্রীকৃষ্ণ কহিলেন : প্রকৃতপক্ষে তুমি কাহারও হত্যাকারী নহ। স্বজন বা গুরুজন যাহাই হউন, যাহারা অন্যায়কারী, প্রজাবৃন্দের প্রতি নির্দয়, অচলায়তন রূপে সমাজের উপর প্রতিষ্ঠিত, তাঁহারা ধর্মভ্রষ্ট হইয়াছেন । কাল সমুপস্হিত হইলে স্বয়ং শিব ধর্মভ্রষ্টদিগের মহিমাহরণ করিয়া তাহাদিগকে হনন করিয়া রাখেন । এক্ষেত্রেও তাহাই হইয়াছে, তুমি নিমিত্তমাত্র । সত্যের জন্য, ধর্মের জন্য, স্বজন ও গুরুজনদিগের উপর বাণনিক্ষেপ করিলে কদাচ অধর্ম হয় না। সুতরাং, তুমি নিঃসংশয়ে যুদ্ধে প্রবৃত্ত হও । যাহারা সত্যের নিমিত্ত ধর্মের নিমিত্ত পিতৃব্য ও পিতামহ প্রভৃতি স্বজনগণকে নিকেশ করিতে দ্বিধা করেন না, তাহারাই প্রকৃত ধার্মিক । ইতিহাস তাহার সাক্ষী । অতএব, হে পাশুপতধারী মোমিন ! হে দুয়ো-রাজকুমার ! হে বংশদ্রোহী! তুমি যুদ্ধ করো ।
দ্বিতীয় পর্ব : ষড়যন্ত্র : মোহন
( দেবীপুরাণ : পুনঃপাঠ )ঋষিগণ কহিলেন : হে পণ্ডিতপ্রবর ! যথার্থ পথপ্রদর্শক নেতাই গুরুপদবাচ্য । তাঁহাকে সম্যকরূপে অবগত না-হইয়া তাঁহার অনুসরণ করা উচিত নহে । ইহা জানিয়াও অসুরগণ কী প্রকারে ভুল নেতৃত্বের দ্বারা প্রবঞ্চিত হইলেন, এক্ষণে সে বিষয়ে আমাদিগের কৌতূহল নিবারুণ করুন ।
বৈশ্যম্পায়ন কহিলেন : বৃহস্পতি ও শুক্রাচার্য উভয়েই ভৃগুর সন্তান হইলেও তাঁহাদের অভিমত ভিন্ন ছিল । সেই কারণে সুরাসুর সংগ্রামে তাঁহারা যথাক্রমে দেবতা ও অসুরগণের পরামর্শদাতারূপে তাহাদের গুরুর আসনে অধিষ্ঠিত হইয়াছিলেন ।
একদা অসুরগণকে সংযত থাকিতে বলিয়া শুক্রাচার্য্য তপস্যার উদ্দেশ্যে গভীর অরণ্যে প্রবেশ করিলেন । একথা জানিতে পারিয়া দেবগুরু বৃহস্পতি স্বল্পকাল অতিবাহিত হইলে শুক্রাচার্য্যের রূপ ধারণপূর্বক তথায় উপস্হিত হইলেন । তাঁহাকে সমুপস্হিত দেখিয়া অসুরগণ তাঁহাদিগের গুরুদেব প্রত্যাবর্তন করিয়াছেন, এইরূপ প্রত্যয় করিল এবং তাঁহাকে পাদ্য অর্ঘ্য দানে যথাবিহিত সন্মান প্রদর্শনপূর্বক তাঁহার উপদেশের জন্য অপেক্ষা করিতে লাগিল । অনন্তর শুক্রাচার্য্যরূপী বৃহস্পতি তাহাদিগকে বলিলেন, বৈরিতা কুলক্ষয়ের কারণ । বৈরিতার কারণ বাসনা, অতএব বাসনা পরিত্যাগ করো । বাসনা না থাকিলে কেহই তোমাদিগকে বশীভূত করিতে পারিবে না । অতএব তোমরা বাসনামুক্ত হও, মস্তকমুণ্ডনকরতঃ গৈরিক বস্ত্র ধারণ করিয়া আচারনিষ্ঠ হও । আচারনিষ্ঠগণকে দেবতাও জয় করিতে পারিবে না । গুরুদেবের আদেশ শিরোধার্য করিয়া অসুরগণ তাহাই করিতে লাগিলেন । ইহার ফলে তাহাদিগের হৃদয় হইতে অসূয়াভাব ক্রমে তিরোহিত হইতে লাগিল ।
ইট্যবসরে, দৈত্যগুরু শুক্রাচার্য্য তাঁহার তপস্যা সমাপনান্তে তথায় সমাগত হইলেন । দেবগুরু বৃহস্পতিকে অসুরগণের গুরুপদে অধিষ্ঠিত দেখিয়া তিনি যারপরনাই বিস্মিত ও ক্রুদ্ধ হইয়া অসুরগণকে কহিলেন— এ কাহাকে তোমরা আমার আসনে প্রতিষ্ঠিত করিয়াছ ? ইনি যে দেবগুরু বৃহস্পতি, তাহা কি তোমরা উপলবদ্ধি করিতে পারো নাই ? তোমাদিগকে বিপথগামী করিবার জন্য আমার অনুপস্হিতির সুযোগ গ্রহণ করিয়া এ প্রবঞ্চক তোমাদিগের সহিত প্রতারণা করিয়াছে । ইনি আমাদিগের ন্যায় স্বর্গদ্রোহী নহেন । তোমাদের নেতার আসন গ্রহণ করিয়া তোমাদের সংগ্রামকে ধ্বংস করাই এই প্রতারকের একমাত্র উদ্দেশ্য ।
ইহা শুনিয়া শুক্রাচার্য্যরূপী বৃহস্পতি কহিলেন : হে অসুরগণ! অবধান করো ! আমার উপদেশে তোমরা অজেয় হইতে চলিয়াছ দেখিয়া দেবগুরু বৃহস্পতি তোমাদিগকে প্রতারণা করিবার উদ্দেশ্যে এক্ষণে আমার রূপ ধারণ করিয়া তোমাদিগের সন্মুখে উপস্হিত হইয়াছেন । ইনি দেবগুরু বৃহস্পতি । অবিলম্বে ইহার মুখে চুনকালি দিয়া গর্দভের পৃষ্ঠে আরোহন করাইয়া পশ্চাতে হ্ল্লা লাগাইয়া দাও এবং বিতাড়ন করো । অসুরগণ তাহাই করিল ।
কিয়ৎকাল অতিবাহিত হইলে, অসুরগণ একদিন হৃদয়ঙ্গম করিল, তাহারা প্রবঞ্চিত হইয়াছে । কিন্তু তখন তাহাদিগের আর কিছুই করিবার রহিল না ।
এইভাবে অসুরগণ ছদ্ম-দেবদ্রোহীকে তাহাদের নেতারূপে বরণ করিয়া মোহগ্রস্ত হইয়াছিল এবং সম্পূর্ণরূপে প্রবঞ্চিত হইয়াছিল ।
তৃতীয় পর্ব : ষড়যন্ত্র : স্তম্ভন
( মুক্তধারা : পুনঃপাঠ )এক যে ছিল রাজা । তার ছিল দুই রানি, সুয়োরানি আর দুয়োরানি। সুয়োরানি সুখে থাকে রাজপ্রাসাদে আর দুয়োরানি থাকে বনের প্রান্তে, ছোট নদীর ধারে, কুঁড়ে ঘরে। দুয়োরানির ছেলে সেই নদীতে নৌকাবায় । পারানির কড়িতে তাদের দিন কাটে । কিন্তু একদিন তার সাধের নদী শুকিয়ে গেল । কারণ, দেশের রাজ-বিভূতি বাঁধ বেঁধেছেন । কেবল জলধারা নয়, ঈশ্বরের করুণার সকল ধারার সামনেই বাঁধ বেঁধেছেন তাঁরা । লোকে বিস্বাসই করতে পারল না যে, দেবতা তাদের যে জল দিয়েছেন, কোনও মানুষ তা বন্ধ করতে পারে । কিন্তু বন্ধ হল, করুণাধারার সব শাখাই ক্রমশ শুকোতে লাগল, আর প্রজাদের জীবন উঠল অতীষ্ঠ হয়ে । এদিকে একদিন দুয়োরানির ছেলে জানতে পারল সে রাজপুত্তুর । সে গেল রাজার কাছে, বললে, রাজপুত্রের অধিকার চাইনে । কেবল ঈশ্বরের করুণাধারার সামনে দেয়া তোমাদের ওই বাঁধগুলো খুলে দাও, এই প্রার্থনা । শুনে সুয়ো-রাজপুত্রেরা অবাক হলো । তারা সেপাই ডাকল, সান্ত্রী ডাকল । ঘাড়ধাক্কা দিয়ে রাজবাড়ি থেকে বার করে ছুঁড়ে ফেলে দিলো রাস্তায় ।
ধুলো ঝেড়ে সে উঠে দাঁড়াল । তারপর গেল শিবতরাইয়ের প্রজাদের কাছে । সেখানে গিয়ে সে অবাক হয়ে গেল । সে দেখল, ধনঞ্জয় বৈরাগীর ছদ্মবেশে সুয়োরানির এক ছেলে । আর, তার পেছনে শিবতরাইয়ের মানুষগুলো চলেছে মুক্তধারার বাঁধ ভাঙতে । তখন সেই দুয়ো-রাজকুমার সবাইকে ডেকে বলতে লাগল, ওই বৈরাগী আসল বৈরাগী নয়, ও তো ছদ্মবেশী সুয়ো-রাজকুমার, ও তোমাদের ঠকাবে । এক নদীর মুখেই ওরা বাঁধ বাঁধেনি । সর্বহারার মুখেই ওরা বাঁধ বেঁধেছে । সেগুলি ভাঙতে হলে, তাদের রহস্য জানতে হবে । সেসব আমি জেনে এসেছি । আমার কথা শোনো । কিন্তু দু’চারজন আধপাগলা ছাড়া কেউ তার কথায় কান দিল না ।
কথাটা গেল মিথ্যে-বৈরাগীর কানে, সে বললে — ওটা বদ্ধ পাগল । ছন্নছাড়া । খেতে পায়না, হাংরি, তাই মিথ্যে কথা বলে । ওর মুখে চুনকালি মাখিয়ে গর্দভের পিঠে চড়িয়ে পিছনে ভিড়ের হল্লা লাগিয়ে দাও । মজা পেয়ে প্রজারা তাই করলে ।
এরপর গাধার পিঠে সওয়ার দুয়ো-রাজকুমারের আর কিছুই করার রইলো না । তাই সে কেবল চিৎকার করে । চিৎকারের জন্য চিৎকার । চিৎকারের ভিতরে চিৎকার । চিৎকার করতে করতে একদিন সে বিস্মৃতিলোকে চলে গেলো ।
তারপর অনেকদিন কেটে গেলে, শিবতরাইয়ের প্রজারা বুঝল তারা ঠকেছে । অতএব, তারা খোঁজ করতে লাগল সেই দুয়ো-রাজকুমারের, যে জানত সব বাঁধের রহস্য । কিন্তু তাকে আর পাওয়া গেল না । তখন যে আধপাগলারা সেসময় তার কথা শুনেছিল মন দিয়ে, তাদেরকে ধরা হলো । বাঁধ ভাঙার রহস্য ওই আধপাগলারা দুয়ো-রাজকুমারের কাছ থেকে জেনে-বুঝে নিয়েছিল কি না, সেটা জানার জন্য । কিন্তু কেউই সেসব কথা ঠিকঠাক বলতে পারল না ।
রাজপ্রাসাদ থেকেও দুয়ো-রাজকুমারের খোঁজখবর করা হলো । কিন্তু তাকে পাওয়া গেল না, পাওয়া গেল তার গাধাটাকে । তাকেই নিয়ে এসে ফুলমালা দিয়ে চন্দনের টিপ পরিয়ে রাজসভায় আনা হলো । রাজা সেই গাধাটাকেই শিরোপা দিলেন আর রাজপুরোহিত দিলেন আশীর্বাদ । সবাই বলে উঠল — সাধু, সাধু !
চতুর্থ পর্ব : ষড়যন্ত্র : বিদ্বেষণ
( অভিচারতন্ত্র : পুনঃপাঠ )
মানুষের উপর মানুষের চড়ে বসাকে বলা হয় ‘অভিচরণ’ বা ‘অভিচার’ । আদিকালে সর্বপ্রথম যে-পদ্ধতির সাহায্যে এই কর্মটি করা হতো, তাকে বলা হতো ‘শ্যেনযাগাদি’ অর্থাৎ অন্য গোষ্ঠীর লোকেদের উপর দলবদ্ধ লুঠতরাজ বা ছিনতাই । তবে সে সবই ছিল সাময়িক । তার সাহায্যে বহুকালের জন্য বা চিরকালের জন্য কারও উপর চেপে বসা যেত না । সেই উদ্দেশ্যে একদিন ভারতবর্ষ আবিষ্কার করে এক অভিনব প্রক্রিয়া —‘মূলনিখনন ও পদধূলিগ্রহণ’। এই প্রক্রিয়া প্রয়োগ করে সমাজের স্বাভাবিক জ্ঞানপ্রবাহের উপর বাঁধ বাঁধা হয় ও বৈদিকযুগের সূত্রপাত করা হয় । এটিই পৃথিবীর প্রথম বাঁধ ও আদি বাঁধ । ঈশ্বরের করুণার অন্যান্য ধারাগুলিকে বাঁধ বেঁধে নিয়ন্ত্রণ করার কথা তখনও ভাবা হয়নি ।
তা সে যাই হোক, সেই ‘মূলনিখনন ও পদধূলিগ্রহণ’ উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছি বলে এখনও আমরা ‘বড়ো শত্রুকে উঁচু পিঁড়ি’ দিই ; যার সর্বনাশ করা দরকার তার মূর্তি গড়ে পূজা করি ও তার নীতি অমান্য করি এবং এভাবেই আমরা আজও শিব রাম গান্ধী মার্কস রবীন্দ্রনাথের পূজা করি ও তাঁদের নীতি অমান্য করে থাকি।
দুষমনকে ‘পূজা করে মেরে ফেলার’ এই বৈদিক নীতির বিপরীতে একসময় তান্ত্রিক নীতিরও জন্ম হয় এই ভারতবর্ষেই । ‘নিয়ন্ত্রণসাধন’কে তখন বলা হতিও যন্ত্র, যা দিয়ে অন্যদের নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা চালানো হতো, ঘাড়ের উপর চেপে বসা ক্ষমতাকে উৎখাত করার চেষ্টা চালানো হতো । তান্ত্রিকেরা শত্রুকে নিয়ন্ত্রণ করার উপায় হিসেবে ছয় রকম ‘নিয়ন্ত্রণসাধন’ বা যন্ত্র আবিষ্কার করেছিলেন— মারণ, মোহন, স্তম্ভন ( শত্রুকে স্ট্যাগন্যান্ট করে দেয়া ), বিদ্বেষণ ( ডিভাইড অ্যাণ্ড রুল ), উচ্চাটন ( স্বদেশভ্রংশন বা শত্রুকে তার কনটেক্সট থেকে উৎখাত করে দেয়া ) ও বশীকরণ । এই যন্ত্রগুলি প্রধানত বাঁধ ভাঙার কাজেই ব্যবহৃত হতো । বৈদিকদের পূজা করে মেরে ফেলার বিপরীতে তান্ত্রিকেরা এই ছয় রকম যন্ত্র ব্যবহার করতেন বলে, বৈদিকপন্হীদের কালচারে এই ‘ষড়যন্ত্র’ ঘৃণ্য ও নিন্দাজনক হয়ে যায় এবং আধুনিক যুগে পৌঁছে পরিণত হয় ‘কন্সপিরেসি’তে, যদিও তান্ত্রিক কালচারে ‘ষড়যন্ত্র’ যথারীতি প্রশংসাযোগ্য ও গৌরবজনক হয়েই থেকে যায় । অর্থাৎ কিনা, ভারতের তান্ত্রিক ঐতিহ্য অনুসারে ষড়যন্ত্রের প্রয়োগ অত্যন্ত ভালো কাজ এবং তা আদৌ কন্সপিরেসি নয়।
তবে নিয়ন্ত্রণসাধনের এই চর্চা এখানেই থেমে থাকেনি । যুগ বহুদূর এগিয়ে চলে এসেছে, যন্ত্রকে করে তোলা হয়েছে ‘মোস্ট সফিসটিকেটেড’, ক্ষমতা হয়েছে নিরঙ্কুশ । শাসক ও বিদ্রোহীর হাতে ওইসকল যন্ত্রের বিপুল বিকাশ ঘটেছে । বিকাশ ঘটেছে শাসক এবং বিদ্রোহীরও । এখন শাসকের বহু রূপ, বহু সুয়ো ; বিদ্রোহীরও বহু রূপ, বহু দুয়ো । বহু ক্ষেত্রে শাসকই বিদ্রোহীর পোশাক পরে নেয়, কোনও কোনও দুয়ো ভুয়ো-বিদ্রোহী হয়ে সুয়োর দলে ভিড়ে যায় । তাছাড়া, এখন বাঁধের সংখ্যাও প্রচুর, যত ধারা ততো বাঁধ, বাঁধের নিচে বাঁধ, উপরে বাঁধ, সাপোর্টিং বাঁধ, কতো কী ! এমনকি লোকদেখানো মিথ্যে বাঁধও রয়েছে, বিদ্রোহী জনগণের আক্রোশ যার উপর ফেটে পড়ে বেরিয়ে যেতে পারবে, ডায়লুট ও ডাইভার্টেড হয়ে যেতে পারবে, অথচ প্রকৃত বাঁধটা থেকে যাবে অক্ষত ।
আরও আছে, এখনকার প্রতিটি বাঁধের পাথরপ্রতিমার রূপগুণও ভিন্ন ভিন্ন, পৃথক পৃথক স্পেশালিস্ট বা দক্ষ বিভূতিদের দিয়ে বানানো । এসব বাঁধ ভাঙতে গেলে বিদ্রোহীদেরও ভিন্ন ভিন্ন শাখার স্পেশালিস্ট হতে হয়, দক্ষ হতে হয়, অনেক তপজপ করতে হয় । কেননা এমন ব্যবস্হা করে রাখা হয়েছে যাতে কৃষিবিজ্ঞানী সাংস্কৃতিক বাঁধের রহস্য জানতে না পারেন, জীববিজ্ঞানী রাজনৈতিক বাঁধের রহস্য জানতে না পারেন…ইত্যাদি ইত্যাদি। কারণ প্রতিটি বাঁধই সেই সেই বিষয়ের প্রতীকের পাথরপ্রতিমা দিয়ে গড়া । তাই, একালে একজন দুয়ো-রাজকুমারে কিছুই হবার নয় । যতোগুলি বাঁধ, বলতে গেলে ততোজন দক্ষ দুয়ো-রাজকুমার লাগে সেগুলি ভাঙবার আয়োজন করতে।
তাই একালে দুয়ো-রাজকুমারের সংখ্যাও খুব কম নয় । এর ভিতর আবার জালি দুয়ো-রাজকুমার তো রয়েছেই । তার ওপর, কখনও বা কোনও কোনও দক্ষ দুয়ো-রাজকুমারকে রাতারাতি ফুটপাত বদল করতেও দেখা যায় । অবশ্য তার জন্য তাদের ফ্ল্যাট নিতে হয় ‘কনখল’-এ । ‘কনখল’ সেই বিখ্যাত কমপ্লেক্স, যেখানে দাঁড়িয়ে আদি দক্ষ বলেছিল, ‘কৌ ন খল অর্থাৎ কে খল নহে ? সব্বাই খল । অতএব আমিও কেন খল হবো না ?’ এই বলে, সেও খল হয়ে যায় । সেই জন্য, সেই ভিত্তিভূমির নাম হয়ে যায় ‘কনখল’ । এলাকার ফুটপাত-বদল-পারদর্শী দক্ষেরা সেই কমপ্লেক্সে আশ্রয় নিয়ে ঘোষণা করে, ‘কে খল নহে ? সব্বাই খল । কেউ কথা রাখেনি । অতএব আমিও কথা রাখব না ।’ —এই বলে তারা সুযোগ পাওয়া মাত্রই সুয়ো-রাজকুমারের দলে ভিড়ে যায় । তাই প্রকৃত বিদ্রোহী দুয়ো-রাজকুমারকে চিনতে পারা এযুগের এক কঠিন সমস্যা ।
আবার বাঁ৭ ভাঙার ক্ষেত্রেও রয়েছে সমস্যা । পালটা প্রতীকের পাথরপ্রতিমা না বসিয়ে বাঁধের বর্তমান পাথরকে সরানোর কোনও উপায় রাখা হয়নি । আর সেটা করতে গেলেই নতুন প্রতীকের বাঁধ নির্মিত হয়েযায় । ফলে, যে ভাঙতে আসে, দেখা যায়, পাকে চক্রে সে আগের বাঁধ ভেঙে তার স্হানে নতুন আর একটা বাঁধ বেঁধে ফেলেছে নিজের অগোচরেই ।
এই সমস্যার মুখোমুখি হয়ে, সাম্প্রতিক কালের অধুনান্তিক ( পোস্টমডার্ন ) তান্ত্রিক বিদ্রোহীরা একটি অভিনব পন্হা উদ্ভাবন করেছেন । বাঁধের উৎখাতযোগ্য পাথরপ্রতিমাকে অত্যন্ত স্বল্পায়ু প্রতীক দিয়ে সরিয়ে ফেলা । এ যেন মানববোমা । উদ্দিষ্ট প্রতীকটাকে ধ্বংস করে দিয়ে নিজেও মরে যাবে । এমন জ্ঞানের ব্যবহার, যা পুরোনো জ্ঞানকে মেরে ফেলবে অথচ নতুন ‘জ্ঞানের বোঝা’ হয়ে দেখা দেবে না ।
পঞ্চম পর্ব : যড়যন্ত্র : উচ্চাটন
( অ্যান্টি এস্টাবলিশমেন্ট রিভোল্ট প্রোগ্রামিং : অ্যান আইটি এক্সপ্লোর )সবাই জানেন কমপিউটারের দুনিয়ায় উইনডোর নানা ভারশন প্রকাশিত হয়েছে । উইনডো ৯৫, উইনডো ০৭, উইনডো ৯৮ ভারসন ১, উইনডো ৯৮ ভারসন ২, উইনডো মিলেনিয়াম ভারসন ইত্যাদি ইত্যাদি । তবে যেটা অনেকেই নজর করেননি, তা হল প্রতিষ্ঠান বিরোধিতারও অনেকগুলি ভারসন আমাদের মার্কেটে চালু আছে । প্রতিটি ভারসনের আবার অনেকগুলি করে এডিশন রয়েছে । যার যেটা পছন্দ তিনি সেটা কেনেন, ব্যবহার করেন । ক্রেতার অবগতির জন্য এখানে কয়েকটি ভারসনের একটি করে এডিশন-এর অতি সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দেওয়া হল ।
ষষ্ঠ পর্ব : প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা : ভারসন ১
( লঞ্চড বাই শিবশম্ভু পাষণ্ড/সনাতন এডিশন )ইট ইজ আ প্রিমিটিভ এডিশন অ্যান্ড প্রেজেন্টলি নট অ্যাভেলেবল ইন দ্য মার্কেট।
সপ্তম পর্ব : প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা : ২
( লঞ্চড বাই বাল্মীকি/চণ্ডাশোক এডিশন )১) শাসক…ব্রাহ্মণ
২) শাসিত…ক্ষত্রিয় বৈশ্য শুদ্র ও অন্যান্য ম্লেচ্ছ সম্প্রদায়
৩) বিরোধের কারণ…সামাজিক মুক্তধারার উপরে নির্মিত বাঁধ
৪) বাঁধের কারিগর…কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন বেদব্যাস ও তাঁর শিষ্যগণ
৫) বাঁধ গড়ার উপাদান…সামাজিক প্রতীকের পাথরপ্রতিমা দিয়ে দিয়ে
৬) বাঁধ ভাঙার মন্ত্র…পালটা প্রতীকের পাথর দিয়ে দিয়ে
৭) সুয়ো-রাজকুমার…রাবণ অ্যাসোশিয়েটস
৮) দুয়ো-রাজকুমার…রাজকুমার সিদ্ধার্থ গৌতম
৯) ছদ্ম দুয়ো-রাজকুমার…বিভীষণ
১০) বিদ্রোহের নেতা…দাশরথীগণ
১১) ছদ্ম বিদ্রোহী নেতা…ঃঃঃঃঃঃঃঃ
১২) বিদ্রোহের ( স্লো ) গান…রাম নাম সত্য হ্যায়
১৩ ) আধপাগলা…জটায়ু
১৪ ) গাধা…হনুমান
অষ্টম পর্ব : প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা : ভারসন ৩
( লঞ্চড বাই কে.ডি.বেদব্যাস/রিঅ্যাকটিভ এডিশন )১) শাসক…দেবগণ
২) শাসিত…অসুরগণ
৩) বিরোধের কারণ…সামাজিক মুক্তধারার উপরে নির্মিত বাঁধ
৪) বাঁধের কারিগর…বিশ্বকর্মা
৫) বাঁধ গড়ার উপাদান…সামাজিক প্রতীকের পাথর দিয়ে দিয়ে
৬) বাঁধ ভাঙার মন্ত্র…পালটা প্রতীকের পাথর দিয়ে দিয়ে
৭) সুয়ো-রাজকুমার…গন্ধর্বগণ
৮) দুয়ো-রাজকুমার…শঙ্করাচার্য
৯) ছদ্ম দুয়ো-রাজকুমার…কুমারিল ভট্ট
১০ ) বিদ্রোহের নেতা…জরৎকারুপুত্র আস্তীক
১১) ছদ্ম বিদ্রোহী নেতা…ঃঃঃঃঃঃঃঃ
১২ ) বিদ্রোহের ( স্লো ) গান…চাতুর্ব্বর্ণ্যব্যবস্হানং যস্মিন দেশে প্রবর্ততে । আর্যদেশঃ স বিজ্ঞেয়
১৩ ) আধপাগলা…লোমশ মুনি
১৪ ) গাধা…যাদবগণ
নবম পর্ব : প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা : ভারসন ৪
( লঞ্চড বাই কার্ল মার্কস/প্যারি কমিউন এডিশন )১) শাসক…সহস্রমুখ বুর্জোয়া
২) শাসিত…সর্বহারা শ্রমিক কৃষক পেটিবুর্জোয়া শ্রেণি
৩) বিরোধের কারণ…কেবলমাত্র রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তধারার উপরে নির্মিত বাঁধগুলি
৪) বাঁধের কারিগর…যন্ত্ররাজ বিভূতি ও ভৈরবমন্ত্রে দীক্ষিত সন্ন্যাসীর দল
৫) বাঁধ গড়ার উপাদান…রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতীকের পাথর দিয়ে দিয়ে
৬) বাঁধ ভাঙার মন্ত্র…বন্দুকের নল । পালটা প্রতীকের পাথর দিয়ে দিয়ে
৭) সুয়ো-রাজকুমার…সাম্রাজ্যবাদী নবীন বুর্জোয়া/প্রতিবিপ্লবী
৮) দুয়ো-রাজকুমার…ডিক্লাসড ( অবক্ষিপ্ত ) বুদ্ধিজীবী
৯) ছদ্ম দুয়ো-রাজকুমার…পাতিবুর্জোয়া
১০ ) বিদ্রোহের নেতা…কমিউনিস্ট বিপ্লবী
১১) ছদ্ম বিদ্রোহী নেতা…অতিবিপ্লবী
১২) বিদ্রোহের ( স্লো ) গান…ইনকিলাব জিন্দাবাদ/জাগো জাগো জাগো সর্বহারা
১৩) আধপাগলা…কমিউনিস্ট সাহিত্য ও সংস্কৃতি কর্মী
১৪ ) গাধা…একনিষ্ঠ কমিউনিস্ট কর্মী ( শ্রমিক কৃষক )
দশম পর্ব : প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা : ভারসন ৫
( লঞ্চড বাই রবীন্দ্রনাথ ট্যাগোর/সেকেন্ড ওয়র্ল্ড ওয়ার এডিশন । )১) শাসক…রাজা রণজিৎ
২) শাসিত…উত্তরকূট ও শিবতরাইয়ের প্রজাবৃন্দ
৩) বিরোধের কারণ…মুক্তধারার উপর নির্মিত বাঁধ
৪) বাঁধের কারিগর…যন্ত্ররাজ বিভূতি ও ভৈরবমন্ত্রে দীক্ষিত সন্ন্যাসীর দল
৫) বাঁধ গড়ার উপাদান…ঃঃঃঃঃঃঃঃ
৬) বাঁধ ভাঙার মন্ত্র…ছিদ্রস্হানে আঘাত
৭) সুয়ো-রাজকুমার…ঃঃঃঃঃঃঃঃ
৮) দুয়ো-রাজকুমার…’স্বজনবিদ্রোহী’ খুড়ো বিশ্বজিৎ ও যুবরাজ অভিজিৎ
৯) ছদ্ম দুয়ো-রাজকুমার…ঃঃঃঃঃঃঃঃ
১০) বিদ্রোহের নেতা…ধনঞ্জয় বৈরাগী
১১) ছদ্ম বিদ্রোহী নেতা…ঃঃঃঃঃঃঃঃ
১২) বিদ্রোহের ( স্লো ) গান…বাঁধ ভেঙে দাও বাঁধ ভেঙে দাও দাআআআআও
১৩) আধপাগলা…গণেশ
১৪ ) গাধা…সঞ্জয়
একাদশতম পর্ব : প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা : ভারসন ৬
( লঞ্চড বাই পবং এক্সক্লুসিভস / লেটেস্ট এডিশন )১) শাসক…প্রগতিশীল ( মার্কসবাদী, কমিউনিস্ট, বিপ্লবী)
২) শাসিত…জনগণ
৩) বিরোধের কারণ…সর্বহারার মুখে নির্মিত বাঁধসমূহ
৪) বাঁধের কারিগর…প্রত্যেক ধারার নিজ-নিজ যন্ত্ররাজ বিভূতি ও তত্তদ সন্ন্যাসীর দল
৫) বাঁধ গড়ার উপাদান…তত্তদ ধারার নিজস্ব প্রতীকের পাথর দিয়ে দিয়ে
৬) বাঁধ ভাঙার মন্ত্র…ছিদ্রস্হানে আঘাত । সেই ধারার পালটা প্রতীক দিয়ে প্রতীকবদল ।
৭ ) সুয়ো-রাজকুমার…বাবুবংশের উত্তরাধিকারীগণ, বাবুভায়াগণ
৮) দুয়ো-রাজকুমার…হাংরি, শাস্ত্রবিরোধী, নকশাল, বিচ্ছিন্নতাবাদী, পোস্টমডার্ন ইত্যাদি
৯) ছদ্ম দুয়ো-রাজকুমার…মার্কসবাদী কমিউনিস্ট বিপ্লবী
১০) বিদ্রোহের নেতা…মার্কসবাদী কমিউনিস্ট বিপ্লবী
১১) ছদ্ম বিদ্রোহী নেতা…মার্কসবাদী কমিউনিস্ট বিপ্লবী, অতিবিপ্লবী, উগ্রপন্হী
১২) বিদ্রোহের ( স্লো ) গান…কে চেল্লায় শালা, কে চেল্লায় এই ভোরবেলা
১৩ ) আধপাগলা…শম্ভু রক্ষিত অ্যান্ড অ্যাসিসিয়েটস
১৪ ) গাধা…সেকেন্ড লাইন হাংরি, শাস্ত্রবিরোধী ও নকশাল এবং ফোর্থ লাইন মার্কসবাদী
দ্বাদশতম পর্ব : ‘প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা : মিলেনিয়াম ভারসন’
( দিস প্রডাক্ট ইজ নাউ অ্যাবানডন্ড । অ্যাকর্ডিং টু কমপিউটার ইনজিনিয়ার্স, দ্য এসট্যাবলিশমেন্ট রিভোল্ট প্রোগ্রামিং ইজ বিকামিং অবসলিট ইন দ্য প্রেজেন্ট কনটেক্সট । )বলে রাখা ভালো, এই অ্যান্টি-এসট্যাবলিশমেন্ট রিভোল্ট প্রোগ্রামিং স্বভাবতই ভালনারেবল । কোনো অ্যান্টি-ভাইরাস ব্যবস্হাই একে বাঁচানোর ক্ষেত্রে সফল হতে পারেনি । অর্থাৎ এই প্রোগ্রাম আদৌ ভাইরাসপ্রুফ নয় । যখন তখন ক্র্যাশ করে যায় । এই প্রোগ্রামিং যে আজকাল আর তেমন বিকোচ্ছে না, সেটাই তার অন্যতম কারণ ।
আরও কারণ আছে । আজকের মানবসমাজ একাকারের যুগে পা রেখে ফেলেছে । ফলে, শাসক-শাসিতের অ্যান্টাগনিজম ক্রমশ কমপ্লিমেন্টারির দিকে টাল খেয়ে যাচ্ছে । গোটা ব্যবস্হাটা, তার সমগ্র প্রেক্ষাপট ,সবই ‘এফেক্টিভ ফ্যাক্টর’ রূপে সক্রিয় হয়ে উঠেছে । মানবসমাজ, জীবজগৎ ও জড়জগৎকে নিয়ে যে-সমগ্রব্যবস্হা, সেটি ঠিক থাকছে কি না, মানব সভ্যতার অস্তিত্বের পক্ষে অনুকূল থাকছে কি না, সেসব কথাও আজ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে । অথচ প্রচলিত ধনতান্ত্রিক বা সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্হাগুলি এই পরিস্হিতির তুলনায় সেকেলে হয়ে গেছে বা যাচ্ছে । বিজ্ঞানী মারি গেলম্যান-এর মতে, …neither greedy capitalists nor dogmatic communists have sufficient respect for the larger system of which we are merely a part. স্বভাবতই প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার প্রোগ্রামিংগুলিও আজকের প্রেক্ষিতে সেকেলে হয়ে গেছে । সন্মুখস্হ পরিস্হিতির বিচার বিবেচনা করে আজকের দিনের পোস্টমডার্ন চিন্তাবিদরা এমন অদ্বৈত প্রোগ্রামিং-এর কথা ভাবতে শুরু করেছেন, যা বদ্ধধারাগুলিকে কেবল মুক্তধারাতেই পরিণত করবে না ; সমগ্র ব্যবস্হাটিকেও আরও সুসংহত করবে । আর, সেটা করতে গিয়ে তাঁরা বিগত যুগের প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার প্রোগ্রামিংসমূহের সমস্ত অর্জনগুলিরও সারসংগ্রহ করে নিচ্ছেন ।
সংগৃহীত ও সারে কী রয়েছে ? শাসক-শাসিতের ( পুরুষ-প্রকৃতির, কনটেন্ট-ফর্মের ) দ্বৈতাদ্বৈত অস্তিত্বের পরিবর্তনের মূল যে-কারিকা, তার সরবরাহ ঘটে শাসিতের তরফ থেকে নয় ; শাসকের তরফ থেকেই । শাসিত তো শাসকের বিরোধী হয়ে থাকেই । কিন্তু তাতে কিছু হয় না । যে গোপন কথাগুলির ওপর ক্ষমতা টিকে থাকে, তার সব কথা শাসিতেরা কখনও জানতে পারে না বলেই শাসন সম্ভব হয় । জানতে পারে তারাই যারা ওই প্রাসাদের অংশ, উত্তরাধিকারী । সেই কারণে দলছুট প্রাসাদত্যাগী দুয়ো-রাজকুমারেরা বিদ্রোহীর দলে যোগ না দিলে কোনও রাজপ্রাসাদেরই পতন সম্ভব নয় ; এটাই ছিল এতদিনের অঙ্ক। তাই শাসনের সমস্ত খেলাই এতদিন ছিল ওই বিদ্রোহী রাজকুমারের আসনটিকে ঘিরে । কারণ তার ভূমিকার ওপরই নির্ভর করত ব্যবস্হাটি বদলাবে কি না । সেই কারণে দুয়ো-রাজকুমারের তপস্যা ভেস্তে দেওয়ার খেলা, তার ভূমিকাকে নানাভাবে বিগড়ে দেয়ার খেলাই ক্ষমতার অন্যতম খেলা ছিল । সেই কারণে, বিদ্রোহী নেতা ও দুয়ো-রাজকুমারকে আগেভাগে গুমখুন করে তার আসনটি শাসকই ছদ্মবেশীদের বসিয়ে দখল করে রেখে দিত । কিন্তু সম্প্রতি ট্রান্সপারেন্সির ডাক দিয়ে বিশ্বের সমস্ত দুয়ো-রাজকুমারেরা ক্ষমতার সেই সব খেলাই ভেস্তে দিয়েছে, দিচ্ছে । এখন কেবল ডিসক্লোজ করে যাও । কেবল মেলে ধরা, যাতে সবাই সবকিছি দেখতে পায় । এতে শাসক-শাসিতের পরিচালক-পরিচালিতে উন্নীত না হয়ে কোনও উপায়ই থাকে না । শাসন অবসানের এযুগের এই পথ ।
ত্রয়োদশতম পর্ব : ‘ষড়যন্ত্র : বশীকরণ’
( শেষ দুয়ো-রাজকুমারের কলাপ : এক ডক্টরেরটকামী ছাত্রের থিসিস থেকে )বাংলার সাহিত্য সংস্কৃতির ক্ষেত্রে দুয়ো-রাজকুমার ঠিক কী কী করেছিলেন, তা জানার জন্য আমি তাঁর বিষয়ে অনুসন্ধান চালাই । এক সময় জানতে পারি, তিনি যাদের সঙ্গে থাকতেন, সেই আধপাগলা মানুষগুলি তাঁর সম্পর্কে অনেক কিছু জানেন । তাঁর অনেক নথিপত্রও নাকি তাঁদের কাছে রয়েছে । একথা জানতে পারার পর, আমি সেই আধপাগলা মানুষগুলির খোঁজখবর করি এবং অনেক তেল পুড়িয়ে অবশেষে তাদের দু;জনকে খুঁজে বার করতে সক্ষম হই । তাঁদের সঙ্গে আমার যে কথোপকথন হয়েছিল, তা নিম্নে বর্ণিত হল :
আমি : শুনেছি, আপনাদের সঙ্গে দুয়ো-রাজকুমারের ক্লোজ রিলেশান ছিল?
আধপাগলা ১ : ক্লোজ রিলেশান কোথায় দেখলে ? ও তো ডিসক্লোজ রিলেশান । যতো পারো ডিসক্লোজ করে দাও । কোনও আবরণ যেন না থাকে । আবরণেই তো বাধা । আটকা আটকি । ঢেকে চেপে রাখা । অন্ধকার করে রাখা । অন্ধ করে রাখা । অন্ধকারে কী হয় জানো ? জানো না ? শ্বাপদেরা বাসা বাঁধে ।
আমি : বলছিলুম কী, দুয়ো-রাজকুমারের সাথে আপনাদের আলাপ হল কেমন করে ?
আধপাগলা ২ : সে অনেক কথা । পেথম সে এসেচিল ভোলানাথ সেজে । আমার ঠাকুদ্দার বাবার বাবাদেরও আগে, অনেকেই তাকে দেখেছিল ।
আমি : তার কথা আমি জানতে চাইছি না । যার সঙ্গে মুক্তির দশক এবং তারপরেও আপনাদের দেখা হয়েছিল, তার কথা বলুন । তার সাথে আপনাদের আলাপ হল কেমন করে, ঘনিষ্ঠতা হল কেমন করে ?
আধপাগলা ২ : ঘনিষ্ঠতা আর হল কই ? ঘন হবার আগেই তো ইষ্টদেবতা বাধ সাধলেন । গাধা এলো, গাধার টুপি এলো, চুনকালি মাখানো হল, তারপর সব হাহা হিহি হয়ে গেল । তাতে ইষ্ট ছিল না অনিষ্ট ছিল সে তো আর ঠাহর করা গেল না ।
আধপাগলা ১ : যতদূর জানি, ও এসেছিল অঙ্গদেশের পাটলিপুত্র থেকে । শুনেছি বাবুকালচারের যে দুয়োরানি বাংলার বাইরে প্রত্যন্ত শহরগুলিতে আশ্রয় নিয়েছিল, ও তাদেরই এক সন্তান । সাবর্ণ চৌধুরী নামে কলকাতার যে-বিখ্যাত বাবু রাজবংশের প্রতিষ্ঠা, ও সেই বাবুকালচারের একজন অবহেলিত অবক্ষিপ্ত উত্তরাধিকারী, এক দুয়ো-রাজকুমার ।
আমি : শুনেছি, ওই দুয়ো-রাজকুমার যাচ্ছেতাই গালাগালি করত, অশ্লীল ভাষায় কথা বলত, অশালীন গান গাইত, গাঁজা ভাঙ খেতো, নোংরা জীবন যাপন করত — এসব ক সত্যি ?
আধপাগলা ১ : আমরা তো সবাই বস্তিতে থাকি, থাকি গণ্ডগাঁয়ে, আর ও তো আমদের সাথেই থাকত । আমাদের জীবন যাপন যেরকম, সেরকমই থাকত । সেটা অশ্লীল কি অশ্লীল নয়, সে আপনারাই জানেন । আর গালাগালির কথা যদি বলেন, সে তো আপনি থাকলেও করতেন । নিজের ভাই হয়ে সুয়ো-রাজকুমাররা ওর সাথে কোন মন্দ ব্যবহারটা করতে বাকি রেখেছিল শুনি ? ও যে ডেলি দু’চারটা খুনখারাবি করেনি, কেবল শালা-বাঞ্চোৎ করেছে, সেটাই তো অনেক ভদ্র ব্যবহার ।
আমি : শুনেছি, সেপাইরা ওকে যখন জেলখানায় নিয়ে যায়, তখন এক-দু’জন সুয়ো-রাজকুমারই ওর হয়ে সত্যিমিথ্যে সাক্ষ্য দিয়েছিল, বলেছিল. ‘কই, ও তো রাজার মাকে ডাইনি বলেনি, যে ওটাকে ছেড়ে দে ।’ কথাটা কি ঠিক ?
আধপাগলা ২ : আরে সেটাই তো কাল হল । যে এক-দু’জন দুয়ো রাজকুমার ‘কনখল’ কমপ্লেক্সে ফ্ল্যাট কিনে সুয়ো-রাজকুমারের দলে ভিড়ে গিয়েছিল, তারাই ওরকম সাক্ষ্য দয়েছিল । তাই, ওর মনের এক কোণায় একটা বিশ্বাস থেকে গেল যে, সকল সুয়ো-রাজকুমার সমান শয়তান নয়, এক-দু’জন ভালো হয় । কিন্তু ‘কনখল’-এর বাসিন্দা মাত্রেই যে ‘সচ্ছল’ ( সচ-ছল বা সৎ সেজে ছলনাকারী ) হয়, সেটা সে খেয়াল করেনি । অনেকে বলে, ওই বিশ্বাসের জন্যেই ও নাকি হেরে গেল ।
আমি : সাংস্কৃতিক-বাঁধ ভাঙার কলাকৌশল সে নাকি খুব ভালোভাবেই জানত, আর সে-রহস্য আপনাদেরকে সে নাকি বলে গিয়েছে । কথাটা কি সত্যি ?
আধপাগলা ২ : আমাকে ওসব বলেনি বাবা । আমি সেসব কতা শুনিনি । বিশ্বাস করো ভাই, ওসব কতা আমি এক্কেরে শুনিনিকো । রাজার দেয়া বাঁধ বলে কতা । ভাঙব বললেই হল । সেপাই আচে না, সান্ত্রী আচে না ।
আধপাগলা ১ : দেখো বাছা । প্রত্যেক বাঁধের একটা না একটা ছিদ্র থাকে । সেটা সে জেনেছিল । সেখানে যন্ত্রাসুরকে আঘাত করলেই বাঁধটা ভেঙে পড়ে । কিন্তু কোন বাঁধের কোথায় ত্রুটি সেসব কথা আমার জানা নেই । যে দুয়ো-রাজকুমারের সাথে আমার দেখা হয়েছিল, সে কেবল সাহিত্য-সংস্কৃতির বাঁধের রহস্যগুলো বলত । তার সব কথা ভালো বোঝাও যেত না । তার দেওয়া একটা কাগজ আছে আমার কাছে, সেটায় সেসব সে লিখেও দিয়েছিল । তার কোনো কথাই আমার মাথায় ঢোকেনি । দেখো, তুমি বুঝতে পারো কি না ।
শেষ পর্ব : ম্লেচ্ছিতবিকল্প
সাহিত্য সংস্কৃতির সাবলীল ধারার সামনে ওরা বাঁধ বেঁধেছে অজস্র প্রতীকের পাথর দিয়ে । সেগুলিকে সাময়িক প্রত্যয়ের পাথরপ্রতিমা দিয়ে রিপ্লেস করে ফেলা দরকার । বাঁধটা যেহেতু বিশাল, অজস্র পাথর গেঁথে গেঁথে তৈরি, তাই এই ভেঙে ফেলার কাজটাও বিশাল । এটা সফল করবার জন্য আরও অনেকের হাত লাগানো দরকার । আমি আমার সধ্যমতো এই রিপ্লেসমেন্টের কাজগুলো করার চেষ্টা করে থাকি এইভাবে :-১) শিল্পের বিরুদ্ধে যুদ্ধঘোষণা ( একালের ) কবিতা রচনার প্রধান শর্ত ।
২) আমার রচনা বাংলা ভাষার একটি বিশেষ কাঠামোকে সর্বজনীন করে তোলার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ । প্রতিবাদ সংস্কৃতি পিটিয়ে কলকেতিয়া করে তোলার বিরুদ্ধে ।
৩) পশ্চিমবঙ্গে বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপকরা ঐতিহ্যের যে মানদণ্ড গড়ে ফেলেছেন তাকে অস্বীকার করাটা যেন তাঁদেরই অপমান করার উদ্দেশ্যে, এমন একটা ধুয়ো আজ সর্বজনস্বীকৃত । তাই শিল্প বানাবার বাঙালি চেতনা থেকে কবিতাকে মুক্ত করার চেষ্টাকে ভালো চোখে দেখা হয় না । ওদিকে কবিতা থেকে সিমবলিস্ট এবং সুররিয়ালিস্ট চাপ বাদ দেবার আইডিয়া আমার মাথায় ঘুরঘুর করছিল ।
৪) আমি মনে করি, কবিতায় ভাষার খেলা, ইমেজ গেম, রিদম গেম, মেটাফিজিক্স গেম অবশ্য বর্জনীয়, কেননা ওগুলির সাহায্যে মানুষের অসহায়তা নিয়ে জোচ্চুরি করা হয় ।
৫) আমি তো সিমবলিস্ট কবি নই যে একটা চিত্রকল্পকে কোনো কিছুর পপতীক হিসেবে সংজ্ঞায়িত করব । ( বিষয়, আঙ্গিক, উপমা, ছন্দ, প্রতীক, রূপক, অলঙ্কার — সর্বত্রই অ্যাটাক ) ।
৬) একদিকে চিৎকার, বিপরীতে ফিসফিসানি — এই দিয়ে আমি কবিতার আধুনিক স্বরকে ভেঙে দিই ।
৭) প্রেম ও অপ্রেম, শরীর ও মন ইত্যাদি যুগ্মবৈপরীত্য যেভাবে বাংলা কবিতায় তোয়াজ করা হয়েছে এতাবৎ এবং তার অন্তর্গত সন্ত্রাসটিকে কবিরা এতকাল যে-চেতনা প্রয়োগে বানচাল করেছেন, আমি তা সম্পূর্ণ অস্বীকার করে প্রেমকে সেনসরহীন স্বরূপে উপস্হাপন করি । প্রেম বা কবিতা এখন বিনোদন নয় ।
৮ ) আমি ষাটের দশকের শুরু থেকেই অলঙ্কার বর্জনের কথা বলে আসছি । অধুনান্তিক চেতনাটি নিরাভরণ । আমার কবিতায় কবিত্বের সন্ত্রাসকে উৎসাহিত প্ররোচিত করার প্রয়াস যাথার্থ দিতে চায় অলঙ্কারহীনতাকে । আমার কবিতা দার্শনিক স্তরে, সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক-আর্থিক-নৈতিক স্হিতাবস্হার বিরুদ্ধে একটি স্ব-স্বীকৃত দ্রোহতর্ক ।
৯ ) আমি সত্যিই শিল্পের বিরুদ্ধে ও সংস্কৃতির স্বপক্ষে বলতে চেয়েছিলুম । পরাবাস্তববাদের আদলে শিল্পবিরোধিতার পালটা শিল্পের কথা বলিনি ।
১০) সমস্ত কবিতার ক্ষেত্রে এক নিয়ম হতে পারে না । কনটেক্সট অনুসারে প্রত্যেকটির বয়নই তার মতো ।এমন কবিতাও অতএব হতে পারে, যেখানে ‘আলো’ প্রতিনিধিত্ব করে না কান্টিয় বা বৈদিক আলোর । কেননা এমন পরিস্হিতি তো দেখাই যাচ্ছে যেখানে ‘আলো’ নামক লোগোটি ঘৃণ্য হয়ে গেছে । রেললাইনে হাত-পা বাঁধা যে পড়ে আছে, তার কাছে আগন্তুক আলো কী ? কিংবা যে আগুনের পরশমণি থানার সেপাইদের জ্বলন্ত সিগারেট হয়ে কয়েদি চাষির লিঙ্গে ছ্যাঁকা হয়ে লাগে, তাকে কী বলা হবে ? এসব ক্ষেত্রে প্রথাবাহিত সাংস্কৃতিক অনুমানগুলিকে আমার কবিতা নস্যাৎ করতে চায় । কবির কন্ঠস্বর নামক বদল্যারীয় জীবনানন্দীয় তর্কটি এর দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হয় এবং উত্তরাধিকারমুক্ত করা হয় কবিত্বকে ।
১১ ) গতানুগতিক কবিতার অনুশাসনকে ছন্দের তেল চটচটে আঙ্গিকেই ভেঙে ফেলতে চাই বলে আমি কখনও কখনও ভাষার অনচ্ছ বৈশিষ্ট্যকে ব্যবহার করে থাকি, যাতে এমন একটা আদল পাওয়া যায়, যা বর্তমান অসম্বদ্ধতাকে অসংলগ্নতাকে আকস্মিকতার সন্নিবেশকে স্বতঃস্ফূর্ত করতে পারে । সেক্ষেত্রে তাই আমার কবিতার পাঠকৃতিটি ইচ্ছাকৃতভাবে ছেতরানো, ছেঁড়াখোঁড়া, তাপ্পিমারা, বহুরঙা ও আসক্তিবিরোধী ।
১২ ) ইংরেজরা বিদেয় হবার পর এবং দিল্লির দরবারে অজস্র জোকারের আবির্ভাবের ঘনঘটায় যে-ইতিহাসোত্তর কালখণ্ডটির হামলায় শব্দজগৎ ও ভাষাপৃথিবী আক্রান্ত, কবিতার ওই প্রোটোকলবর্জিত প্রতীকবাদবিরোধী এলাকাটির দখল নেয়া জরুরি ।
১৩ ) ‘সত্য’ যে সর্বজনীন নাও হতে পারে, সে কথাটা বলা দরকার বলেই বলি ।
১৪ ) আমি মনে করেছিলুম যে, একজন কবি হিসেবে মন ও দেহের যুগ্মবৈপরীত্যের তত্বটিকে চ্যালেঞ্জ জানানো দরকার আর সেটাই আমি করেছি, যেখানে পেরেছি ।
১৫ ) বাস্তবের তৈরি অবাস্তবতায়, স্হিরতার গড়া অস্হিরতায়, মুহূর্ত দিয়ে গড়া কালপ্রবাহে, অগতি থেকে উৎসারিত গতিতে, অবজেক্ট/সাবজেক্ট বিভাজনটি ভেঙে পড়ে ।
১৬ ) দাঙ্গাকে প্রান্তিকের ওপর চাপিয়ে দেয় কেন্দ্র অথচ তা মসনদের চাকুমালিকদের অন্দরমহলের গল্প । তারা যেহেতু ক্ষমতার কেন্দ্রে, সত্যের নিয়ন্তা তারাই । শাসক মাত্রেই আধিপত্যবাদী, তা সে যে-তত্বেরই মালিক হোক ।
১৭ ) কবিতায় ঝোড়ো হাওয়া আর পোড়ো বাড়ির ভাঙা দরজার মেলবন্ধন তখনই সম্ভব যখন বাস্তবে আধিপত্যবাদী শর্তগুলো মেনে নেওয়া হচ্ছে । আমার রচনার গেম-প্ল্যান মূলত সেই আদি সাংস্কৃতিক ভঙ্গুরতা থেকে উপজাত । হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘অবিদ্যমান যুদ্ধ’-এর মতো যা অবর্তমান সেইটেই আমার রচনায় উপস্হিত হয়ে দশ পঙক্তির খেলা করে । খেলাটি সমাপ্ত হিসাবে ঘোষিত হবে তখনই, যখন ধাঁধাটির সমাধান হবে। নয়তো চলতে থাকবে মর্মার্থ-সঙ্কটাপন্ন শব্দাবলীর ঝোড়ো হাওয়া । মাত্রাতিরিক্ত মিলের মাত্রাতিরিক্ত নাটুকেপনা চলতে থাকবে ।
১৮ ) ছবিগুলি ভাষার সাংস্কৃতিক নির্দেশের অন্তর্গত এবং তা দাঙ্গার সন্ত্রাসের বাইরেকার ‘আমির’ আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠিত করে । দাঙ্গার সন্ত্রাস স্ট্রাকচার্ড হয় । রাজপথে পড়ে থাকা সন্ত্রাস-পরবর্তী টুকিটাকি প্রকৃতপক্ষে অবাস্তব ঘটনাবলীর সত্য ।
১৯ ) প্রত্যন্তকে, আধুনিকতা যে নান্দনিক সন্ত্রাসে নিয়ে গিয়ে আছড়েছে, স্বগতোক্তি ছাড়া সমস্ত শব্দ এবং ধ্বনি সেই চত্বরে অর্থহীন । সন্ত্রাসের উপাদান এক্ষেত্রে স্তব্ধতা, শিশির, ঝিঁঝি, নক্ষত্র, শীত, পাথর ইত্যাদি যা সনাতনি কবিতায় তথাকথিত সৌন্দর্য বানাবার কাজে লাগে । মাত্রা গুনে-গুনে যে ধরণের ডিজিটাল কবিতা বাজারচালু, সেই ডিজিটাল যান্ত্রিক কবিত্ব ভাঙা হয়েছে । ছন্দের ভেতরে ভেতরে কোনও মানে ঢোকানো নেই, যা কিছু মানে তা উপরিতলেই ভাসছে ।
২০ ) ছয়ের দশকেও বাংলা কবিতায় থাকত চিত্র, চিত্রকল্প । আমি ব্যবহার করি উপচিত্র । রূপক নয়, লক্ষণগুলোই আমার হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ।
২১ ) লিরিকের জমিতে রোমান্টিক চেতনার চাষ ভালো হয়, কেননা লেখকের কোনো নৈতিক দায় থাকে না । আমি কবিতায় ভঙ্গুরতা আগাগোড়া বজায় রাখি কাঠামোটিকে ‘অ্যান্টিলিরিক’ করে তোলার জন্য । একদিকে লিরিকের অচলাবস্হা থেকে এবং অপরদিকে ক্ষমতার তাত্বিক খবরদারি থেকে দূরে থাকা দরকার । লেখাকে তাই কাউন্টার-হিগেমনিক করে তোলা দরকার ।
২২ ) প্রতিষ্ঠিত ফর্ম মাত্রেই প্রতিষ্ঠানের কুক্ষিগত, তাই তাকে ভাঙা জরুরি । জরুরি প্রতিষ্ঠিত জনপ্রিয় মনোভাবের অবিনির্মাণ । পাঠকৃতি যেন স্বেচ্ছায় আত্মদীর্ণ, অসমতল, দ্বন্দ্ব-আবিল, অক্ষহীন, দলছুট, আপত্তিসূচক, উভমুখী, অসংহত, ঘরাণা-বহির্ভূত এবং চোরা-আক্রমণাত্মক হয়ে যায় । কারণ কবি মানেই তো ‘চোরাযোদ্ধা’ ।
২৩ ) অত্যন্ত বেশি ব্যাকরণবোধ থেকে সাজানো-গোছানো সমাজের ধান্দার দরুন পয়দা হয় ওদের স্তালিন ও আমদের সঞ্জয় গান্ধির আদর্শ । শুভর কুহকে আত্মসমর্পণ করে নাৎসিরা অশুভর রাজপথ উদ্বোধন করেছিল । সবাইকে পিটিয়ে সমান করার ব্যাষ্টিবাদের শুভত্ব মূলত একটি মৌলবাদী জবরদস্তি যা গদ্য কবিতাকেও ঢোকাতে চায় ছন্দের তালিবানি জেলখানাণ এবং আধমাত্রা সিকিমাত্রার বেয়াদপিকে শায়েস্তা করতে চায় অ্যাকাডেমিক গেস্টাপোদের নাকচের অস্ত্র দ্বারা । আমার রচনা তা মানে না এবং না-মানার ঝুঁকি নেয় ।
২৪ ) কবিতায় আমি আপইয়েলিং ঢোকাই । আপওয়েলিং কোনো নির্মাণ নয়, সৃজনশীলতা নয়, পুনরাবৃত্তি নয়, ভাষাবয়ন নয় । ফ্রেম থেকে যাতে উপচিত্রগুলো বেরিয়ে যায়, তাই তাদের মধ্যে কোনও বার্তা পুরে দিই না । তারা অঙ্গপ্রত্যঙ্গহীন । যা চোখের সামনে তুলে ধরা যায় না, তাকেই তুলে ধরা । বিজ্ঞানীরা যেমন বলেন, যা চোখে দেখা যায় তার অস্তিত্ব নির্ভর করে, যা চোখে দেখা যায় তার ওপর। যেটা উপস্হিত ।
শুক্রবার
একটি কবিতা : শুদ্ধ বসু
ওঃ মরে যাব মরে যাব মরে যাব
আমার চামড়ার লহমা জ্বলে যাচ্ছে অকাট্য তুরুপে
আমি কী কোর্বো কোথায় যাব ওঃ কিছুই ভাল্লাগছে না
সাহিত্য-ফাহিত্য লাথি মেরে চলে যাব শুভা
শুভা আমাকে তোমার তর্মুজ আঙরাখার ভেতর চলে যেতে দাও
চুর্মার অন্ধকারে জাফ্রান মশারির আলুলায়িত ছায়ায়
সমস্ত নোঙর তুলে নেবার পর শেষ নোঙর আমাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে
আর আমি পার্ছি না, অজস্র কাঁচ ভেঙে যাচ্ছে কর্টেক্সে
আমি জানি শুভা, যোনি মেলে ধরো, শান্তি দাও
প্রতিটি শিরা অশ্রুস্রোত বয়ে নিয়ে যাচ্ছে হৃদয়াভিগর্ভে
শাশ্বত অসুস্হতায় পচে যাচ্ছে মগজের সংক্রামক স্ফুলিঙ্গ
মা, তুমি আমায় কঙ্কালরূপে ভূমিষ্ঠ করলে না কেন ?
তাহলে আমি দুকোটি আলোকবষহ ঈশ্বরের পোঁদে চুমো খেতুম
কিন্তু কিছুই ভলো লাগছে না আমার কিচ্ছু ভালো লাগছে না
একাধিক চুমো খেলে আমার গা গুলোয়
ধর্ষণকালে নারীকে ভুলে গিয়ে শিল্পে ফিরে এসেছি কতদিন
কবিতার আদিত্যবর্ণা মূত্রাশয়ে
এসব কী হচ্ছে জানি না তবু বুকের মধ্যে ঘটে যাচ্ছে অহরহ
সব ভেঙে চুরমার করে দেব শালা
ছিন্নভিন্ন করে দেব তোমাদের পাঁজরাবদ্ধ উৎসব
শুভাকে হিঁচড়ে উঠিয়ে নিয়ে যাব আমার ক্ষুধায়
দিতেই হবে শুভাকে
ওঃ মলয়
কোল্কাতাকে আর্দ্র ও পিচ্ছিল বরাঙ্গের মিছিল মনে হচ্ছে আজ
কিন্তু আমাকে নিয়ে আমি কী কোর্বো বুঝতে পার্ছি না
আমার স্মৃতিশক্তি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে
আমাকে মৃত্যুর দিকে যেতে দাও একা
আমাকে ধর্ষণ ও মরে যাওয়া শিখে নিতে হয়নি
প্রস্রাবের পর শেষ ফোঁটা ঝাড়ার দায়িত্ব আমায় শিখতে হয়নি
অন্ধকারে শুভার পাশে গিয়ে শুয়ে পড়া শিখতে হয়নি
শিখতে হয়নি নন্দিতার বুকের ওপর শুয়ে ফরাসি চামড়ার ব্যবহার
অথচ আমি চেয়েছিলুম আলেয়ার নতুন জবার মতো যোনির সুস্হতা
যোনোকেশরে কাঁচের টুকরোর মতন ঘামের সুস্হতা
আজ আমি মগজের শরণাপন্ন বিপর্যয়ের দিকে চলে এলুম
আমি বুঝতে পার্ছি না কী জন্যে আমি বেঁচে থাকতে চাইছি
আমার পূর্বপুরুষ লম্পট সাবর্ণচৌধুরীদের কথা আমি ভাবছি
আমাকে নতুন ও ভিন্নতর কিছু কোর্তে হবে
শুভার স্তনের ত্বকের মতো বিছানায় শেষবার ঘুমোতে দাও আমায়
জন্মমুহূর্তের তীব্রচ্ছটা সূর্যজখম মনে পড়ছে
আমি আমার নিজের মৃত্যু দেখে যেতে চাই
মলয় রায়চৌধুরীর প্রয়োজন পৃথিবীর ছিল না
তোমার তীব্র রূপালি য়ূটেরাসে ঘুমোতে দাও কিছুকাল শুভা
শান্তি দাও, শুভা শান্তি দাও
তোমার ঋতুস্রাবে ধুয়ে যেতে দাও আমার পাপতাড়িত কঙ্কাল
আমাকে তোমার গর্ভে আমারই শুক্র থেকে জন্ম নিতে দাও
আমার বাবা-মা আন্য হলেও কি আমি এরকম হতুম ?
সম্পূর্ণ ভিন্ন এক শুক্র থেকে মলয় ওর্ফে আমি হতে পার্তুম ?
আমার বাবার অন্য নারীর গর্ভে ঢুকেও কি মলয় হতুম ?
শুভা না থাকলে আমিও কি পেশাদার ভদ্রলোক হতুম মৃত ভায়ের মতন ?
ওঃ বলুক কেউ এসবের জবাবদিহি করুক
শুভা, ওঃ শুভা
তোমার সেলোফেন সতীচ্ছদের মধ্যে দিয়ে পৃথিবীটা দেখতে দাও আমায়
পুনরায় সবুজ তোশকের ওপর চলে এসো শুভা
যেমন ক্যাথোড রশ্মিকে তীক্ষ্ণধী চুম্বকের আঁচ মেরে তুলতে হয়
১৯৫৬ সালের সেই হেস্তনেস্তকারী চিঠি মনে পড়ছে
তখন ভাল্লুকের ছাল দিয়ে সাজানো হচ্ছিল তোমার ক্লিটোরিসের আশপাশ
পাঁজর নিকুচি করা ঝুরি তখন তোমার স্তনে নামছে
হুঁশাহুঁশহীন গাফিলতির বর্ত্মে স্ফীত হয়ে উঠছে নির্বোধ আত্মীয়তা
আ আ আ আ আ আ আ আ আ আঃ
মরে যাব কিনা বুঝতে পার্ছি না
তুল্কালাম হয়ে যাচ্ছে বুকের ভেতরকার সমগ্র অসহায়তায়
সব কিছু ভেঙে তছনছ করে দিয়ে যাব
শিল্পের জন্যে সক্কোলকে ভেঙে খান-খান করে দোব
কবিতার জন্যে আত্মহত্যা ছাড়া স্বাভাবিকতা নেই
শুভা
আমাকে তোমার লাবিয়া ম্যাজোরার স্মরণাতীত অসংযমে প্রবেশ কোর্তে দাও
দুঃখহীন আয়াসের অসম্ভাব্যতায় যেতে দাও
বেসামাল হৃদয়বত্তার স্বর্ণসবুজে
কেন আমি হারিয়ে যাইনি আমার মায়ের যোনিবর্ত্মে ?
কেন আমি পিতার আত্মমৈথুনের পর তাঁর পেচ্ছাপে বয়ে যাইনি ?
কেন আমি রজোস্রাবে মিশে যাইনি শ্লেষ্মায় ?
অথচ আমার নীচে চিত আধবোজা অবস্হায়
আরামগ্রহণকারিণী শুভাকে দেখে ভীষণ কষ্ট হয়েছে আমার
এরকম অসহায় চেহারা ফুটিয়েও নারী বিশ্বাসঘাতিনী হয়
আজ মনে হয় নারী ও শিল্পের মতো বিশ্বাসঘাতিনী কিছু নেই
এখন আমার হি২স্র হৃৎপিণ্ড অসম্ভব মৃত্যুর দিকে যাচ্ছে
মাটি ফুঁড়ে জলের ঘূর্ণি আমার গলা ওব্দি উঠে আসছে
আমি মরে যাব
ওঃ এসমস্ত কী ঘটছে আমার মধ্যে
আমি আমার হাত হাতের চেটো খুঁজে পাচ্ছি না
পায়জামায় শুকিয়ে-যাওয়া বীর্য থেকে ডানা মেলছে
৩০০০০০ শিশু উড়ে যাচ্ছে শুভার স্তনমণ্ডলীর দিকে
ঝাঁকে-ঝাঁকে ছুঁচ ছুটে যাচ্ছে রক্ত থেকে কবিতায়
এখন আমার জেদি ঠ্যাঙের চোরাচালান সেঁদোতে চাইছে
হিপ্নোটিক শব্দরাজ্য থেকে ফাঁসানো মৃত্যুভেদী যৌনপর্চুলায়
ঘরের প্রত্যেকটা দেয়ালে মার্মুখি আয়না লাগিয়ে আমি দেখছি
কয়েকটা ন্যাংটো মলয়কে ছেড়ে দিয়ে তার আপ্রতিষ্ঠিত খেয়োখেয়ি
( হাংরি বুলেটিন, ১৯৬৪ )
----------------------------------
( এই কবিতাটির জন্য ১৯৬৪ সালে মলয় রায়চৌধুরীর বিরুদ্ধে মকদ্দমা করেছিল তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গ সরকার। মলয়ের হাতে হাতকড়া পরিয়ে ও কোমরে দড়িবেঁধে প্রথমে থানায় এবং থানা থেকে ছয়-সাতজন অপরাধীর সঙ্গে রাস্তা দিয়ে হাঁটিয়ে কোর্টে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। মলয়ের বিরুদ্ধে ৩৫ মাস মামলাটি চলে প্রথমে নিম্ন আদালতে, যেখানে মলয়ের একমাস জেলের সাজা ঘোষিত হয় ও তারপর কলকাতা উচ্চ আদালতে, যেখানে তিনি বেকসুর ছাড়া পান। মলয়ের পক্ষে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন তরুণ সান্যাল, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, জ্যোতির্ময় দত্ত, সত্রাজিৎ দত্ত ও অজয় হালদার। পাঠকের হয়ত আশ্চর্য লাগবে, মলয়ের বিরুদ্ধে পুলিসের পক্ষের সাক্ষী ছিলেন শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় ও উৎপলকুমার বসু। দুজন পুলিস ইনফর্মার, পবিত্র বল্লভ ও সমীর বসু, ছিলেন পুলিসের ভুয়ো সাক্ষী, যাঁরা মলয়ের পরিচিত না হওয়া সত্ত্বেও কোর্টে জানান যে মলয়ের সঙ্গে তাঁদের বহুবার কফিহাউসে দেখা হয়েছে। সবচেয়ে লজ্জার যে দুজন হাংরি আন্দোলনকারী রাজসাক্ষী , অর্থাৎ অ্যাপ্রুভার, হয়ে মলয়ের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেন; তাঁরা দুজন হলেন শৈলেশ্বর ঘোষ ও সুভাষ ঘোষ।এঁদের সাক্ষ্যের কারণেই নিম্ন আদালত মলয়কে সাজা দিয়েছিল ।)
আমার চামড়ার লহমা জ্বলে যাচ্ছে অকাট্য তুরুপে
আমি কী কোর্বো কোথায় যাব ওঃ কিছুই ভাল্লাগছে না
সাহিত্য-ফাহিত্য লাথি মেরে চলে যাব শুভা
শুভা আমাকে তোমার তর্মুজ আঙরাখার ভেতর চলে যেতে দাও
চুর্মার অন্ধকারে জাফ্রান মশারির আলুলায়িত ছায়ায়
সমস্ত নোঙর তুলে নেবার পর শেষ নোঙর আমাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে
আর আমি পার্ছি না, অজস্র কাঁচ ভেঙে যাচ্ছে কর্টেক্সে
আমি জানি শুভা, যোনি মেলে ধরো, শান্তি দাও
প্রতিটি শিরা অশ্রুস্রোত বয়ে নিয়ে যাচ্ছে হৃদয়াভিগর্ভে
শাশ্বত অসুস্হতায় পচে যাচ্ছে মগজের সংক্রামক স্ফুলিঙ্গ
মা, তুমি আমায় কঙ্কালরূপে ভূমিষ্ঠ করলে না কেন ?
তাহলে আমি দুকোটি আলোকবষহ ঈশ্বরের পোঁদে চুমো খেতুম
কিন্তু কিছুই ভলো লাগছে না আমার কিচ্ছু ভালো লাগছে না
একাধিক চুমো খেলে আমার গা গুলোয়
ধর্ষণকালে নারীকে ভুলে গিয়ে শিল্পে ফিরে এসেছি কতদিন
কবিতার আদিত্যবর্ণা মূত্রাশয়ে
এসব কী হচ্ছে জানি না তবু বুকের মধ্যে ঘটে যাচ্ছে অহরহ
সব ভেঙে চুরমার করে দেব শালা
ছিন্নভিন্ন করে দেব তোমাদের পাঁজরাবদ্ধ উৎসব
শুভাকে হিঁচড়ে উঠিয়ে নিয়ে যাব আমার ক্ষুধায়
দিতেই হবে শুভাকে
ওঃ মলয়
কোল্কাতাকে আর্দ্র ও পিচ্ছিল বরাঙ্গের মিছিল মনে হচ্ছে আজ
কিন্তু আমাকে নিয়ে আমি কী কোর্বো বুঝতে পার্ছি না
আমার স্মৃতিশক্তি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে
আমাকে মৃত্যুর দিকে যেতে দাও একা
আমাকে ধর্ষণ ও মরে যাওয়া শিখে নিতে হয়নি
প্রস্রাবের পর শেষ ফোঁটা ঝাড়ার দায়িত্ব আমায় শিখতে হয়নি
অন্ধকারে শুভার পাশে গিয়ে শুয়ে পড়া শিখতে হয়নি
শিখতে হয়নি নন্দিতার বুকের ওপর শুয়ে ফরাসি চামড়ার ব্যবহার
অথচ আমি চেয়েছিলুম আলেয়ার নতুন জবার মতো যোনির সুস্হতা
যোনোকেশরে কাঁচের টুকরোর মতন ঘামের সুস্হতা
আজ আমি মগজের শরণাপন্ন বিপর্যয়ের দিকে চলে এলুম
আমি বুঝতে পার্ছি না কী জন্যে আমি বেঁচে থাকতে চাইছি
আমার পূর্বপুরুষ লম্পট সাবর্ণচৌধুরীদের কথা আমি ভাবছি
আমাকে নতুন ও ভিন্নতর কিছু কোর্তে হবে
শুভার স্তনের ত্বকের মতো বিছানায় শেষবার ঘুমোতে দাও আমায়
জন্মমুহূর্তের তীব্রচ্ছটা সূর্যজখম মনে পড়ছে
আমি আমার নিজের মৃত্যু দেখে যেতে চাই
মলয় রায়চৌধুরীর প্রয়োজন পৃথিবীর ছিল না
তোমার তীব্র রূপালি য়ূটেরাসে ঘুমোতে দাও কিছুকাল শুভা
শান্তি দাও, শুভা শান্তি দাও
তোমার ঋতুস্রাবে ধুয়ে যেতে দাও আমার পাপতাড়িত কঙ্কাল
আমাকে তোমার গর্ভে আমারই শুক্র থেকে জন্ম নিতে দাও
আমার বাবা-মা আন্য হলেও কি আমি এরকম হতুম ?
সম্পূর্ণ ভিন্ন এক শুক্র থেকে মলয় ওর্ফে আমি হতে পার্তুম ?
আমার বাবার অন্য নারীর গর্ভে ঢুকেও কি মলয় হতুম ?
শুভা না থাকলে আমিও কি পেশাদার ভদ্রলোক হতুম মৃত ভায়ের মতন ?
ওঃ বলুক কেউ এসবের জবাবদিহি করুক
শুভা, ওঃ শুভা
তোমার সেলোফেন সতীচ্ছদের মধ্যে দিয়ে পৃথিবীটা দেখতে দাও আমায়
পুনরায় সবুজ তোশকের ওপর চলে এসো শুভা
যেমন ক্যাথোড রশ্মিকে তীক্ষ্ণধী চুম্বকের আঁচ মেরে তুলতে হয়
১৯৫৬ সালের সেই হেস্তনেস্তকারী চিঠি মনে পড়ছে
তখন ভাল্লুকের ছাল দিয়ে সাজানো হচ্ছিল তোমার ক্লিটোরিসের আশপাশ
পাঁজর নিকুচি করা ঝুরি তখন তোমার স্তনে নামছে
হুঁশাহুঁশহীন গাফিলতির বর্ত্মে স্ফীত হয়ে উঠছে নির্বোধ আত্মীয়তা
আ আ আ আ আ আ আ আ আ আঃ
মরে যাব কিনা বুঝতে পার্ছি না
তুল্কালাম হয়ে যাচ্ছে বুকের ভেতরকার সমগ্র অসহায়তায়
সব কিছু ভেঙে তছনছ করে দিয়ে যাব
শিল্পের জন্যে সক্কোলকে ভেঙে খান-খান করে দোব
কবিতার জন্যে আত্মহত্যা ছাড়া স্বাভাবিকতা নেই
শুভা
আমাকে তোমার লাবিয়া ম্যাজোরার স্মরণাতীত অসংযমে প্রবেশ কোর্তে দাও
দুঃখহীন আয়াসের অসম্ভাব্যতায় যেতে দাও
বেসামাল হৃদয়বত্তার স্বর্ণসবুজে
কেন আমি হারিয়ে যাইনি আমার মায়ের যোনিবর্ত্মে ?
কেন আমি পিতার আত্মমৈথুনের পর তাঁর পেচ্ছাপে বয়ে যাইনি ?
কেন আমি রজোস্রাবে মিশে যাইনি শ্লেষ্মায় ?
অথচ আমার নীচে চিত আধবোজা অবস্হায়
আরামগ্রহণকারিণী শুভাকে দেখে ভীষণ কষ্ট হয়েছে আমার
এরকম অসহায় চেহারা ফুটিয়েও নারী বিশ্বাসঘাতিনী হয়
আজ মনে হয় নারী ও শিল্পের মতো বিশ্বাসঘাতিনী কিছু নেই
এখন আমার হি২স্র হৃৎপিণ্ড অসম্ভব মৃত্যুর দিকে যাচ্ছে
মাটি ফুঁড়ে জলের ঘূর্ণি আমার গলা ওব্দি উঠে আসছে
আমি মরে যাব
ওঃ এসমস্ত কী ঘটছে আমার মধ্যে
আমি আমার হাত হাতের চেটো খুঁজে পাচ্ছি না
পায়জামায় শুকিয়ে-যাওয়া বীর্য থেকে ডানা মেলছে
৩০০০০০ শিশু উড়ে যাচ্ছে শুভার স্তনমণ্ডলীর দিকে
ঝাঁকে-ঝাঁকে ছুঁচ ছুটে যাচ্ছে রক্ত থেকে কবিতায়
এখন আমার জেদি ঠ্যাঙের চোরাচালান সেঁদোতে চাইছে
হিপ্নোটিক শব্দরাজ্য থেকে ফাঁসানো মৃত্যুভেদী যৌনপর্চুলায়
ঘরের প্রত্যেকটা দেয়ালে মার্মুখি আয়না লাগিয়ে আমি দেখছি
কয়েকটা ন্যাংটো মলয়কে ছেড়ে দিয়ে তার আপ্রতিষ্ঠিত খেয়োখেয়ি
( হাংরি বুলেটিন, ১৯৬৪ )
----------------------------------
( এই কবিতাটির জন্য ১৯৬৪ সালে মলয় রায়চৌধুরীর বিরুদ্ধে মকদ্দমা করেছিল তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গ সরকার। মলয়ের হাতে হাতকড়া পরিয়ে ও কোমরে দড়িবেঁধে প্রথমে থানায় এবং থানা থেকে ছয়-সাতজন অপরাধীর সঙ্গে রাস্তা দিয়ে হাঁটিয়ে কোর্টে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। মলয়ের বিরুদ্ধে ৩৫ মাস মামলাটি চলে প্রথমে নিম্ন আদালতে, যেখানে মলয়ের একমাস জেলের সাজা ঘোষিত হয় ও তারপর কলকাতা উচ্চ আদালতে, যেখানে তিনি বেকসুর ছাড়া পান। মলয়ের পক্ষে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন তরুণ সান্যাল, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, জ্যোতির্ময় দত্ত, সত্রাজিৎ দত্ত ও অজয় হালদার। পাঠকের হয়ত আশ্চর্য লাগবে, মলয়ের বিরুদ্ধে পুলিসের পক্ষের সাক্ষী ছিলেন শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় ও উৎপলকুমার বসু। দুজন পুলিস ইনফর্মার, পবিত্র বল্লভ ও সমীর বসু, ছিলেন পুলিসের ভুয়ো সাক্ষী, যাঁরা মলয়ের পরিচিত না হওয়া সত্ত্বেও কোর্টে জানান যে মলয়ের সঙ্গে তাঁদের বহুবার কফিহাউসে দেখা হয়েছে। সবচেয়ে লজ্জার যে দুজন হাংরি আন্দোলনকারী রাজসাক্ষী , অর্থাৎ অ্যাপ্রুভার, হয়ে মলয়ের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেন; তাঁরা দুজন হলেন শৈলেশ্বর ঘোষ ও সুভাষ ঘোষ।এঁদের সাক্ষ্যের কারণেই নিম্ন আদালত মলয়কে সাজা দিয়েছিল ।)
লেবেলসমূহ:
Hungry Generation.,
Literary Movement,
Protest Literature
অজিত রায় : আভাঁগার্দ আন্দোলন - হাংরি আন্দোলন
নষ্ট তৈজসে সমলৈঙ্গিক গিল্টি
অজিত রায়
কলকাতা-কেন্দ্রিক ন্যাকাচিত্তির সাহিত্যের এঁদো কপচাবাজি এবং তার ভেক্টর
প্রতিষ্ঠানের মুখে জোর থাপ্পড় মেরে তার গিল্টি-করা দাঁত উখড়ে তার ভেতরকার
মালকড়ি ফাঁস করে দিতে আজ থেকে তিপ্পান্ন বছর আগে দানা বেঁধেছিল বাংলা
সাহিত্যের প্রথম আভাঁগার্দ আন্দোলন ----- হাংরি জেনারেশন। যা ছিল আক্ষরিক
অর্থেই কলকাতার বাইরের কবি-লেখকদের নয়াল সংযোজন। তাঁরা এসেছিলেন এমন এক
মিলিউ থেকে যেখানে বাংলার তথাকথিত ভদ্রায়তনিক সংস্কৃতির কোনও শিস-ই গজাবার
নয়। জীবনের অনেকরকম শিক্ষা থেকে বঞ্চিত থাকতে হয় যেখানে। হাংরি সাহিত্যের
কলিন অধ্যয়নে এই প্রেক্ষাপটটি সর্বাগ্রে মাথায় রাখতে হবে। এই হাঙ্গামার
প্রধান স্রষ্টা মলয় রায়চৌধুরীর শৈশব অতিবাহিত হয়েছিল বিহারের ভয়ঙ্কর কুচেল
অধ্যুষিত বাখরগঞ্জ বস্তিতে। তাঁর টায়ার ছোটবেলা অতিক্রান্ত মুসলিম
অধ্যাসিত দরিয়াপুর মহল্লায়। সেই অস্বাচ্ছন্দ্য, অখল জ্বালা, ক্ষোভ আর
বিদ্রোহকে বুকে করে মলয়ের বেড়ে ওঠা। সংস্কৃতির একেবারে নিচেকার পাদানি
থেকে আসা, নিম্নবিত্ত থেকে মধ্যবিত্তে ওঠার প্রতিটি মানুষী শঠতার সাক্ষী,
স্পেঙলারের সংস্কৃতি ও অবক্ষয়কালীন সর্বগ্রাস তত্ত্বে তা-খাওয়া একজন
বাইশ-তেইশ বছরের কৃষ্টিদোগলা বা কালচারাল বাস্টার্ড লেখালেখির মাঠে এলে যা
ঘটবে, সেটা তো রফা হয়েই ছিল।
১৯৫৯-৬০। বৃটিশবীর্যিত মুলুকের পোঁদে গাঁড়সা পুঁতে গাদি সামলাচ্ছেন
নেহেরু। দেশের দুই প্রান্তে পার্টিশানের টসটসে পাঁচড়া। পুব পাকিস্তান
থেকে আগত অন্যৎপুষ্ট মানুষের কিছু থোপনা তখনও আনলোড হচ্ছে শেয়ালদার
টেসেলেটেড চাতালে। হাভাতে মানুষের কেরবালা বিধানবাবুর গড় জুড়ে ছিৎরে পড়ছে।
দেশভাগের সময় পুব বাঙলা থেকে যে কিশোরগুলো বাবা-মায়ের কড়ে ধরে কলকাতায়
এসেছিল, তারা এদণ্ডে গাগতরে বেতর, কিন্তু বয়সে ও মগজে সাজোয়ান। দেশভাগের
খসা চোকলা। কাঁধের চিক্কুটে ঝোলায় কবিতার লাজুক খাতা আর কলা-ওঠা টিনের
সুটকেশ ঢুয়ে কলকাতার রাস্তায় গলিঘুঁজিতে এক রাত্তির হিল্লের মনসুবায় চোখমুখ
কালিয়ে ঘুরে বেড়ায় আর সাঁঝের আলা মদ্দিম হলে সারমেয় অধ্যাসিত ফুটপাতে,
হয়ত-বা কোনও দয়াল বন্ধুর ঘাড়ে অথবা গেরস্ত বাড়ির হেঁসেল-ঠোরে রাত গুজরান।
ইহাদের প্রত্যেকের বুকে কবিতা নামের পিলপিলে গণ্ডুপদটি ক্ষণে ক্ষণে ঢসন
মারে। ইহারা সকলে প্রবল কবিতা-পিশাচ। পিশাচ, কেননা ইহাদের মাঘার ঘিলুতে
জবরদস্ত পুঁজরক্ত যাহা গোপন আঁধারে কলম দিয়া চোয়ায় আর দেউলের দেউটি সহসা
নিভায়।
ষাটোত্তর গরদিশের দিনগুলি। গেরস্তের জবরদখল-করা হেঁসেলে আচকা নোটিশ হয়ে
গেল। ভাঙা আয়না, দাঁড় টুনানো চিরুনি, তেলের শিশি, জীর্ণ ফতুয়া, কলা-ওঠা
টিনের সুটকেশ আর লজ্জাবতী কবিতার ধুকড়ি নিয়ে পথে দাঁড়াল সুভাষ। সুভাষ শলা
করল, ----- শৈল, চ, দুজনে মিলে একটা ঘর নিই। টালায় ১৬-বি শ্যামচরণ
মুখার্জি স্ট্রিটের একতলায় দুর্গন্ধ-পীড়িত ফালি-খানেক ঘর যোগাড়ও হয়ে গেল।
খিড়কির পাল্লা সরালেই ড্রেনের ধারে পাছা ঝুলিয়ে নিত্যকর্মে ব্যস্ত কৃশগাঁড়
বিভীষিকা।
সুভাষের গেরামের ইশকূলে কমপয়সার চাকরি। দু-বেলা যুৎসই অন্ন জোটে না বটে,
কিন্তু গদ্যের হাতটি খাসা। তাহাতে ড্যাশ ও হাইফেনের যাচাই ভুরিভোজ।
শৈলেশ্বরেরও মতিগতি উনিশবিশ। অল্প পড়াশোনা। ভাঙাচোরা ফ্যামিলির ছেলে।
অশহুরে, তথা জন্মলব্ধ সারল্য ও সততা। ফলে মানিকজোড় হতে সূর্যঘড়ি লাগেনি।
দুজনেই টিউশানি ধরে, আর ছাড়ে। হপ্তায় দু-দেড় দিন ভিজিট, আর চার-পাঁচদিন
একুনে নাগা। ফলে আট থেকে দশদিনের মাথায় জবাব হয়ে যায়। খাওয়ার পয়সা নেই।
বৃদ্ধ পিতা পঙ্গুত্বের লেংগি খেয়ে খাটের প্রাণী। ছাত্র-রাজনীতির
গাজোয়ারি-প্রসূত 'লম্বা' হাঁকন বাবদ আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে নীমসম্বন্ধ।
ফলে, দিনগুলি বেজায় নড়বড়ে, জীবনযাত্রা ধূরিপথহীন। সাহিত্য করা তো দূর
অস্ত, সাহিত্যের জিগির-মাত্রে পিছদাঁড়ায় কাঁপন। ডাইনির ছমছমে খিখি
অষ্টপ্রহর। ক্কচিৎ পকেটে বাড়তি খুচরো জুটলে শ্যালদার চোরা-হোটেলে জলের
সঙ্গে পাঞ্চ করে, ভরদুপুরে কান্ট্রি-লিকার। শ্যামবাজারের জন্তা হোটেলে
ছ'আনায় ভরপেট খানা। লেটনাইটে ঘুমের ধাক্কায়, বাড়ি। একজনের ঘুম জুটত,
অন্যজনের জুটত না। শৈলেশ্বরের ছিল ইনসোমনিয়ার ব্যামো। সারা-সারারাত মরা
মাছের নিস্পন্দ চাউনি সিলিং-পানে।
সুভাষরা একসময় ক'জন বন্ধু মিলে 'এষণা' নামে একটা কাগজ বের করত। খুবই
পাতি, অতীব বালখিল্য সে কাগজ। সুভাষ-বাদে অন্যরা সবাই মামুলি
মাস্টারবেট-করা লেখক, মানে পার্ট-টাইম। অল্প খিঁচে নিল, ব্যস, সাহিত্যের
বাঘ মারা হয়ে গেল। আপিসে-আপিসে কেরানিগিরি, আর রোববার সকালে পাঁচ পয়সায় আধ
প্যাকেট ক্যাপস্টান কিনে শ্যামবাজার কফিহাউসে ধুন্ধুমার আড্ডা। কফির কাপ
আর তামাকের কড়া ধোঁয়ায় বাঙালির বেড়ে বাফুনারি। শৈলেশ্বর-সুভাষরা
ইন্টেলেকচুয়াল নয়, গেঁয়ো বুদ্ধি, গেঁয়ো কথাবার্তা। অপরপ্রান্তে, ধাউড়দের
মুখে বিদিশি বই, ফরেন-কলমচিদের রেফারেন্স। ইনজিরির ছররা। দুজনের মধ্যে
শৈলেশ্বরের বুদ্ধি একটু খোলা, মওকা বুঝে, সময় থাকতে কাগজটাকে নিজের হেফাজতে
নিল। কাপ্তানি সুভাষের, কিন্তু কলকাঠি শৈলর হাতে। অবশ্য, চারটে মাত্র
ইস্যুই হাপিস হয়েছিল 'এষণা'র।। হাংরি জেনারেশান সাহিত্যের ঐ ছিল
গর্ভ-সূচনা। অচিরেই এষণার ছাদনায় এসে ভেঁড়ে প্রদীপ আর সুবো।
এবং আরও একজন। বছরটা ১৯৬৩।
ছেলেটির বয়স কুড়ি। রুজির যোগাড়ে গোড়ার দিকে থাকত কলকাতায়। টালা ব্রিজের
কাছে খেলাত বাবু লেনে। বারোঘর এক উঠোনের একটি পোড়া বাড়িতে। সারাদিন রুজির
খোঁজে, ফিরত রাত নিবিড়ে। পড়ে ন্যুনাধিক একটা হিল্লে হলে, অশোক নগরের
উদ্বাস্তু কলোনিতে পাকাপোক্ত নোঙর। সেও ছিল দেশভাগের ঠাঁটা চোকলা। ডাঁসা
বাঙাল। জিরজিরে শরীর। উপদ্রুত মন। চাঁচাড়ি-ঘেরা তার এক-কাটরা বাড়ি।
ছেঁড়া শাড়ির গাঁঠরি। বাতায় ঠোঁসা সরষে তেলের শিশি। একটিপ তেল মেখে,
শ্যালো টিপে দু-বালতি জলে স্নান সেরে ও গামছায় সর্বাঙ্গ মুছে, ভাঙা আয়নার
সামনে ব্যাকব্রাশে টেরি চিরে দরমার দরজা ভেজিয়ে এক রোববার সে ঐ 'এষণা'র
ঠেকে। লেট এন্ট্রি।
ছেলেটির নাম বাসুদেব দাশগুপ্ত।
হালিতেই সে ঝুলি থেকে বের করে এগিয়ে দ্যায় একটি লিটল ম্যাগাজিন। পবিত্র
বল্লভ সম্পাদিত 'উপদ্রুত'। তাহাতে একটি দীর্ঘ গদ্য, ---- নাম 'রন্ধনশালা'।
সে বলেছিল, 'গল্প'।
বাসুদেব 'রন্ধনশালা' রচনা করেন একষট্টিতে। তেষট্টিতে সেটি ম্যাগাজিনে
কৃষ্ণহরফ পায়। গদ্যটি গ্রন্থত্ব লাভ করে উৎপলকুমার বসুর হেফাজতে, ১৯৬৫-তে।
শুধু এই রন্ধনশালার কথাই যদি বলতে হয়, এবং ১৯৬৩-র প্রথম আলোকনের সালটিকেই
যদি ধরতে হয়, বলব, সেই সময়ের প্রেক্ষিতে ভারতবর্ষের সহস্র সহস্র বছরের
সর্বঅস্তিত্বগ্রাসী ক্ষুধার এ-তুল্য বহিঃপ্রকাশ এবং তার এহেন গ্রাম্য আদিম
রাস্টিক তথা অস্বস্তিকর ভাষায় আত্মপ্রকাশ একটা বড়সড় তহেলকার চেয়ে
বিন্দুমাত্র উনিশ ছিল না। এ ছিল এমন লেখা, যা পড়ার পর, বাংলা সাহিত্যের
পাঠক আগের যা-কিছু পড়া সমস্ত হকহকিয়ে বমি করে দ্যায়। বাংলা গদ্যের শেলফ
প্রায় খালি হয়ে যায় রন্ধনশালা পৌঁছনোর পর।
রন্ধনশালার হব্যাশে সেদিন আকখা কলকাতা তোলপাড়। খাসির ল্যাজ তুলে যাঁরা
মাংসের বহর আন্দাজাতে পটু, সেইসব ঘোড়েল সমালোচকেরা অব্দি রচনাটিকে ফ্রানজ
কাফকা, লুই ফার্দিনান্দ সিলিন এবং গিন্সবার্গ-এর সঙ্গে গুলিয়ে ফেলতে বাধ্য
হয়েছিলেন। বাসু-বন্ধু শৈলেশ্বর কবুল করেছিলেন : ইমাজিনেটিভ সাহিত্যের এহেন
উদাহরণ বাংলাভাষায় খুব বেশি নেই। বাস্তব অভিজ্ঞতাই লেখকের পা রাখার
জায়গা, তারপরই বাসুদেব পাঠককে নিয়ে যান এক সম্পূর্ণ নতুন অভিজ্ঞতার মধ্যে।
আসলে, শৈলেশ্বর জানাচ্ছেন, তাঁদের মধ্যে যে ছোটলোক বা সংখ্যালঘুর মনোভাব
কাজ করছিল, রন্ধনশালা ও তৎ-পরবর্তী গদ্যসমূহে সেটাকেই ঝাড়বাতির তলায় মেলে
ধরেছিলেন বাসুদেব দাশগুপ্ত।
শৈলেশ্বর-বাসুদেব-সুভাষ-প্রদীপ-সুবো ----- এঁরা প্রত্যেকে ছিলেন একে-অপরের
মতো, একই পেরিফেরির জীব। প্রত্যেকের জীবনের ব্ল্যাক-কমেডি উনিশবিশ একই
খেপের। চোখের সামনে দৃশ্যের পর দৃশ্য দেশভাগ, রক্ততোলা বেবুঝ দাঙ্গা,
যুবতীর অস্মিতা-হরণ, লাখো মানুষের বুকে ভুখা ত্রাস, জঠরে জঠরে কান্না।
প্রায় প্রত্যেকের বাল্য ও যৌবন অস্বচ্ছন্দ, নিহায়ৎ গরিব, ছোটলোক আর
অশিক্ষিত ফ্যামিলি থেকে আগত, বুকে অখল জ্বালা, ক্ষোভ আর বিদ্রোহকে কোলদাবা
করে বেড়ে ওঠা। আধুনিকতা নাম্নী সালংকরা পিশাচিনির পাছায় এঁরা চুমু খেতে
পারেননি। প্রত্যেকে কমবেশি লিজলিজে, ঘরকুনো, আত্মভুক। ফলত, পরস্পরের
বন্ধুত্ব সামীপ্য পেতে দেরি হয়নি। সেই বন্ধুত্বের তলা ও তলানি ছিল কঠিন
সিলেবেলে গাঁথা। পাঁচজনের মধ্যে একটা সমকামী-সুলভ এঁঠেল প্রেম, ভাষান্তরে
'আত্মা-বিনির্মিত নির্বাক সম্পর্ক' ডেভালপ করেছিল। এঁরা একে-অপরের নেশাতেই
বিভোল থাকতেন। এঁরা কে কত বড় লেখক ছিলেন, আদৌ ছিলেন কিনা, সেটা বড় কথা
নয়। বড় যেটা হলো, এঁরা অন্যদের মতো ফাঁপা-বুলি বা False Note লিখতেন না,
নিজেরা ভুগে লিখতেন। এঁদের লেখালেখির পেছনে একটিই আর্জি ছিল ----- পৃথিবীর
সেই আদিতম মন্ত্রটি ------ 'আত্মানং বিদ্ধি' (know thyself), নিজেকে জানো।
অধ্যাত্মবিদ্যার এই মূল কথা রবীন্দ্রনাথেও প্রতিধ্বনিত ----- "অসীম যিনি
স্বয়ং করেছেন সাধনা / মানুষের সীমানায়, / তাকেই বলে 'আমি'।" আমি-র দুটো
ডানা ---- শরীর আর মন। প্রথমটি লোকাল, দ্বিতীয়টি গ্লোবাল। উভয়ে মিশে
গ্লোকাল। এই দুই ডানাবিশিষ্ট যানে আরূঢ় হয়ে চলে আমি-র জীবনযাত্রা, জার্নি
অফ লাইফ। শরীরে ভর করে মহামনের সঙ্গে মনের যোগবন্ধনের প্রচেষ্টা। হাংরি
লেখকদের সরাসরি একটাই বিষয় ছিল ---- এঁদের লেখার বিষয় ছিল 'আমি'। সেখানে
কোনো মেকি অবগুণ্ঠন ছিল না। বনেদি সমালোচকদের চোখে এঁরা 'নিরক্ষর' বলে
দাগায়িত হলেও, মনে রাখতে হবে এঁরা কোনরকম ধান্দাবাজিতে না ঢুকে, যৎসামান্য
সংঘশক্তি নিয়ে এবং 'নিজেদের জীবনচর্চাকে কাঁচামাল হিশেবে ব্যবহার করে'
লেখালেখি করতেন। যা অচিরেই, প্রতিষ্ঠান এমনকি প্রশাসনের বুকেও মৃদু
হাড়কাঁপ ধরিয়ে দিয়েছিল।
পাঠক, এই এঁরা, যাঁদের কথা আপনি পড়ছেন, এঁদের একজন যা ভাবতেন, সকলে তা
ভাবতেন। এঁরা একই হারে চলমান বাংলা কবিতা আর গদ্যকে অ্যানিমিক ভাবতেন।
দেশভাগের আগে ও পরে সবুজপত্র, দেশ, কল্লোল, কবিতা, পরিচয়, পূর্বাশা
প্রভৃতি 'শহুরে বাঙালি মানসের সমৃদ্ধ ও প্রত্যয়পূর্ণ চিন্তাক্ষেত্র' নামে
পরিচিত ন্যাকাচিত্তির সাহিত্যবাজির যে ধারা বাংলা সাহিত্যকে অবক্ষয় আর
প্যানপ্যানানির চূড়ান্তে এনে ছেড়েছিল, তার বিরুদ্ধে ষাট দশকের গোড়ায় এইসব
হাংরি লেখকরাই হেনেছিলেন প্রথম ও সর্বাধিক জবরদস্ত ধাক্কা। সে-কারণে
প্রতিষ্ঠানের ক্যামপ্রাডর নমস্যদের বিগ্রহে মাটি খসে খড় বেরিয়ে যেতে দেখা
গেছিল। মাত্র দু-আড়াই জন কবি আর লেখককে এঁরা, বাসু-শৈলরা নিজেদের মতো করে
'আবিষ্কার' করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে জীবনানন্দ, ------ যিনি, বিদ্যায়তনিক
উলেমাদের চোখে, এমন শব্দ ব্যবহার করেছেন যারা কবিতায় দূরে থাক 'ভদ্দরসমাজে'
পর্যন্ত অচল। সুতরাং, কফিঘরের আঁতেল ধোঁয়ায় ঘুরপাক না খেয়ে, এঁরা বুঁদ
থাকতেন জীবনানন্দেই। আর একজন এঁদের কিছুটা সমীহ আদায় করেছিলেন, তিনি মানিক
বাড়ুজ্জে। তিনি নাকি মানুষের ভিৎরি ফাঁপা অর্থহীন অঞ্চলকে ভারি সুন্দর
ঢঙে ফাঁস করতে পারতেন, এঁদের মতে। কিন্তু, পরে কমিউনিজমের 'কুচক্করে'
ফেঁসে তাঁর লেখার ধার ও বহুমাত্রিকতা খসে পড়ে, এঁদের মতে। একমাত্রিকতাই
অবশ্য বামবাজ লেখকদের আগমার্ক ছিল, সেও এঁরা বুঝতেন। এঁরা আরও টের
পেয়েছিলেন যে সুভাষ মুখুজ্জের কবিতাগুলো আসলে শিশুতোষ ছড়া, আর সময় সেনীয়
সাহিত্য স্রেফ শহুরে ধাউড়বাজি। সন্দীপন চ্যাটার্জীর বিশেষত 'বিজনের
রক্তমাংস' এঁদের ভালো লেগেছিল, কিন্তু অচিরেই যখন ফাঁস হয়ে গেল সন্দীপন
আসলে স্প্যানিশ দার্শনিক উনামুনোর দ্যাখাদেখি লেখায় অসুস্থতার প্র্যাকটিস
ওরফে ভাঁড়ামি করছেন, তখন এঁদের অ্যাবাউট টার্ন শুরু হয়ে যায়। এঁরা এও খোঁজ
পেয়েছিলেন, যে, লেখার সার্টিফিকেটের জন্য যাঁরা বুদ্ধদেব বসু, বিমল কর আর
'দেশ'-এর দোরে ধন্না লাগাতেন, সেই রোম্যান্টিকদের অন্যতম শিরোমণি সন্দীপন
চট্টোপাধ্যায়। এঁরা সবই বুঝতেন, শুধু ঠিকঠাক সমঝে উঠতে পারতেন না শক্তি
চ্যাটার্জীকে। হ্যাঁ, এঁদের মতে, শক্তি চট্টোপাধ্যায় একটু বেশিই
'খেলেছেন'। শক্তির কোন কোন কবিতা এঁদের চমকে দিত। তারপরেই কোন লেখা মনে
হতো এক্কেবারে 'পাইল করা মাল'। কী ব্যাপার?? কফিহাউসে কানাঘুষো খবর
উড়েছিল, কোন এক উঠতি কবির কবিতার খাতা নাকি শক্তির ব্যাগ থেকে খোয়া গেছে।
তারপর থেকেই নাকি অমন চেকনাই শক্তির কবিতায়। ধন্দ কাটে না। বর্ধমানের
দামোদরে একদিন উদোম হয়ে নাইতে নেমেছেন শৈলেশ্বর, বুকজলে দাঁড়ানো উৎপলকুমার
বসুকে জিগোলেন, 'কী দাদা, কথাডা কি সত্যি?' উৎপলও কেমন, রহস্যমতন হেসে
জানালেন, 'আমিও তো ভাই আপনাদের মতোই শুনছি।' ------ বলেই ডুব।
এবার সংক্ষেপে বুঝে নেওয়া যাক হাংরি-তোড়ফোড়ের প্রেক্ষাপট, বা সময়ের
ডিম-লেয়ারটা। অর্থাৎ কলকাতা বা হুগলি-চত্ত্বরের সন্নিহিত এলাকায় সেসময়
কী-এমন ঘটেছিল যার দরুন ডাল-ভাত খাওয়া বাঙালি বাড়ির কিছু যুবা অমন-একটা
ভাব-ঘূর্ণির ঝড়ে একজাই ক্ষেপে উঠল, ----- তার প্রেক্ষিতটা।
দেশভাগ হলো, 'স্বাধীনতা' নিয়ে শাঁখ-আবির হলো ----- আর তার পরপরই কবিরা কড়ে
আঙুল ফাঁসিয়ে বাংলা কবিতার ন্যাড় আটকে দিলেন। তাঁরা পাল্লা দিয়ে মেতে
উঠলেন 'শহিদপ্রণাম' আর 'নয়া শপথ' গোছের টাইমপাশে। পাশাপাশি অবশ্য বাংলা
কবিতার পালে রোম্যান্টিক হওয়া লাগালেন রাম বসু, বটকৃষ্ণ দে। তখন তো এমনি,
নতুন কবি মাত্রেই রোম্যান্টিক আর তাতে কড়ারি তামা-তুলসী নিয়ে উঠে আসছে একটি
নাম ----- দেবদাস পাঠক। পুরনো কবিদের মধ্যে অজিত দত্ত, প্রমথনাথ বিশী,
বনফুল আর খুব করে দাপাতে লেগেছেন প্রেমেন মিত্তির। জীবনানন্দ বাদে
অচিন্ত্যকুমার, শামসুর রাহমান, বিরাম মুখো, গোবিন্দ চক্কোত্তি, দীনেশ
দাসদেরও হেব্বি বোলবালা। উদিক থেকে আবার স্তবকান্তরে ছন্দান্তর ঘটিয়ে
কবিতায় বিরল ছোঁক এনে দিয়েছেন নীরেন চক্কোত্তি। চলছে পঞ্চাশের খেলা।
দ্যাখাদেখি কল্যাণ সেনগুপ্ত, অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তরাও নেমে পড়লেন আসরে।
বিজ্ঞপ্তি দেওয়া শুরু হলো যে 'আচ্ছে দিন' ফিরে আসছে বাংলা কবিতার।
যুদ্ধ-দাঙ্গা-দেশভাগ-রিফিউজি সমস্যা কাটিয়ে কবিতার স্বাস্থ্যে রিটার্ন
আসছে নুরানি দ্যুতি। শবেবরাত। আখেরি চাহার শুম্বা।
আসলে ঘটনা ছিল বিলকুল উলোট। আসলে চল্লিশ-পঞ্চাশ থেকেই বাংলা কবিতা পাঠক
লস করতে শুরু করেছিল। শঙ্খ-সুনীল-শক্তি-ফণীভূষণদের আসরে নামতে সামান্য
লেট, এমন দিনে, ৫০-এর শুরুতেই বুদ্ধদেব বসু রটিয়ে দিলেন :'ছন্দ, মিল,
স্তবকবিন্যাসের শৃঙ্খলা, এ-সব বন্ধনেই কবির মুক্তি।' বুদ্ধিবাদী
এনজয়মেন্টের ব্রেকিং নিউজ। পঞ্চাশের লক্ষ্মীঘরানার ফোকাসবাজ কবিরা সেটা
ঝপসে গিলে ফেললেন। বিষয়ে ন্যাকাচিত্তির রোমান্টিকতা আর আঙ্গিকে রকমারি
বেগুনপোড়া এনে তাঁরা 'ফাটিয়ে' দিতে চাইলেন বাংলা বাজার। আলোক সরকার এসময়
আঙ্গিকে আর শব্দের বিন্যাস নিয়ে এত কসরৎ করেন যে প্রতিটি কবিতা থেকে
ক্র্যাকের পড়পড় শব্দ বেরুতে থাকে। উপরন্তু, আনন্দ বাগচী রবীন্দ্র-গানের
ফাটা রেকর্ডগুলো বাজিয়ে বাজিয়ে পাঠকের মূত্রপুটের বেঁটে দুববো ঘাসে মাচিশ
ধরিয়ে দিলেন। এসব করে পঞ্চাশের কবিরা এই ভেবে স্বমেহনের তৃপ্তি লাভ করলেন
যে বাংলা কবিতায় 'প্রগাঢ় প্রতীতির সুর' দেখা দিয়েছে আর স্পষ্ট হয়েছে তার
এক্সপোজ-ভঙ্গি। কিন্তু এতে পাঠ্য-পাঠকের জগদ্দল সমস্যাটাই আরও বুকবাড়া
পেল। বিষয়ের গরিমা বাতায় ঠুঁসে স্রেফ আঙ্গিকের প্রাকটিস যে বাংলা কবিতার
পক্ষে অশুভ হতে পারে তা যেন কেউ কেউ বুঝতে পেরেছিলেন। সময়টা ছিল ৫০-এর
মাঝামাঝি, বাংলা কবিতা তার সহজ-সুগম পথ ছেড়ে অচিরেই ন্যাকানাদা লিরিক আর
আঙ্গিক-সর্বস্ব শব্দচচ্চড়ি হয়ে উঠল।
ফলে, অনিবার্যভাবেই ষাটে ঘটল সর্বস্তরিক তোড়ফোড়। ষাট, কেবলমাত্র একটি
সময়-চিহ্ন নয়, সময়ের শান্তশায়ী বুকে একটি পিরেনিয়াল আঁচড়, এক প্রবল
ঘূর্ণাবর্ত ----- সত্তর ক্রশ করে আশিতে এসে যার পরিক্রমা সমিল হয়। বাংলা
কবিতাধারায় ঐ ন্যাকাচিত্তির কলাকৈবল্যবাদ আর লিরিকবাজির প্র্যাকটিসের
খেলাপে প্রচণ্ড অনাস্থা আর বিরক্তি গনগনে অমর্ষ হয়ে আছড়ে পড়েছিল ষাটের ঐ
হো-হাঙ্গামার দিনে, যখন প্রকাশ্য ডে-লাইটে ফুটপাথের হাঁড়িকাঠে গলা-ফাঁসানো
পঞ্চাশিয়া কবিতার হালাল প্রত্যক্ষ করেছিল কলকাতা। ন্যাকাচোদা ধুতি-কবিদের
ফুল-দুববো কালচারের বিরুদ্ধে আধপেটা ছোটলোক ভবঘুরে বাউণ্ডুলে গাঁজাখোর
চুল্লুখোর চরসখোর রেন্ডিগামী কবিদের তীব্র সাব-অলটার্ন আর ডায়াসপোরিক
কাউন্টার কালচার চাক্ষুষ করেছে দিনদাহাড়ে ব্যাংক-রবারির ফিলমি কারকিতে।
ছোটলোকদের ওই ধরদবোচা অ্যাকশানে গাঁড় ফেটে গিয়েছিল প্রতিষ্ঠানের ধামাধরা
ক্লিন-শেভড পাউডার-পমেটমপ্রিয় পঞ্চাশের কবিদের। তাঁদের ভীতি সাব্যস্ত হয়
যখন বাসুদেব দাশগুপ্তর 'রন্ধনশালা'কে চালিয়ে দেওয়া হয় 'বিবর'-এর ব্রিডিং
ক্যাপসুল হিশেবে। অন্যদিকে, কবিতার ক্ষেত্রে, মলয়-শৈলদের ঐ ভয়-পাওয়া
কাউন্টার-অ্যাটাক দানা পেয়েছিল শঙ্খ ঘোষের এই শব্দগুচ্ছে : 'আত্ম
অস্তিত্বের গূঢ়মূল আবিষ্কার, মৃত্যুর বোধ, অসুন্দর শয়তান আর পাপের ধ্যান
একদল কবিকে একটি বিচ্ছিন্ন কুঠুরির মধ্যে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।' এমনকি,
সন্ত্রাসের পাল বুদ্ধদেবের হিক্কে-তোলা বোদলেয়রী বাতাবরনকে উচ্ছ্বাসভরে
স্বাগত জানিয়ে ফেলেছিল। এতে-করে পঞ্চাশের ল্যাসল্যাসানি ধরা তো পড়েই যায়,
চল্লিশের কন্ডোমফোলা ফক্কাবাজিও ফাঁস হয়ে যায় একই লপ্তে।
সাহিত্যের আখড়ায় গোষ্ঠীতন্ত্র নয়াল কিছু নয়। সাহিত্য নিয়ে আড্ডা, হুজুগ
আর বাওয়াল যুগে যুগে। সেই কোন ১৯০৫ থেকে পয়লা বিশ্বযুদ্ধের শেষ অব্দি
লন্ডনের ব্লুমসবেরি মহল্লার এক থুত্থুড়ে কোঠায় ফি বেস্পতি সাঁঝে জমা হতেন
সস্বামী ভার্জিনিয়া উলফ, রজার ফ্রাই, ক্লাইভ বেল, জন মেনার্ড কিন্স, ই এম
ফর্স্টার, লিটন স্ট্র্যাচি, ডানকান গ্রান্ট প্রমুখ বুদ্ধিজীবীরা। ইংরেজি
সাহিত্যের ইতিহাসে ঐ আড্ডাবাজরা 'ব্লুমসবেরি গ্রূপ' নামে বিখ্যাত।
মোটামুটি ঐ ধাঁচেরই ছিল বাংলার বিনয় সরকার, সুনীতি চাটুজ্জে, সতীশচন্দ্র
মুখুজ্জেদের 'ডন সোসাইটি'; এবং কিছু পরে
প্রেমেন্দ্র-অচিন্ত্য-মানিক-প্রমুখের 'কল্লোল গোষ্ঠী'। যদিও জাতে ও
চরিত্রে কিঞ্চিৎ আলাদা, কিন্তু তিনটিই ছিল নিছক আড্ডা-বিশেষ। সাহিত্যের
আড্ডা। যা পরবর্তী কালে সাহিত্যের কিছু খাস সামিয়ানায় ঠেক পেতে কলকাতার
কফি হাউসে আরও-অঙ্ক-কষে হতো, এবং যা এখন আরো-অন্যভাবে, অন্যত্রও হয়।
বুকফেয়ার, নন্দনচত্ত্বরে, ইভন ফেসবুকে এবং ব্লগে। কিন্তু সাহিত্য তথা
শিল্পে সেরম বাওয়াল ওরফে মুভমেন্ট যদি কিছু হয়ে থাকে, আমাদের
রামায়ণ-মহাভারত-চৈতন্যের লীলাখেলা-সমূহ বাদ দিয়ে, তাহলে তার বিসমিল্লা ধরতে
হয় ১৮৩০-এর ফরাসি বোহেমিয়ানদের হুল্লোড় থেকেই। তথাকথিত প্রতিষ্ঠান-বিরোধী
আন্দোলনের ঐ ছিল সাড়াজাগানো পয়লা ভেঁপু। এবং পরবর্তী কালে সারা পৃথিবী
জুড়ে সেই বিগউল ফোঁকা অব্যাহত থাকে। ফলে, মার্কিন ইন্টেলেকচুয়ালদের মাথায়
হঠাৎ 'Angry' ঠাপ্পাটা দেখে তেমন হাসি নির্গত করার কারণ ছিল না
বিশুদ্ধবাদীদের। কারণ ঐ মার্কিন অ্যাংরিরা এতখানিই বাগী আর রাগী ছিল যে
নিজেদেরকে 'ইন্টেলেকচুয়াল' বলতেও ওরা রীঢ়া বোধ করত। ওরা নিজেদের জাহির করত
'Anti-Intellectual' বলে। আসলে, জ্যাক কেরুয়াক, লরেন্স ফেরলিংগোটি,
অ্যালেন গিন্সবার্গ, গেগরি করসো, ই ই কামিংস, কেনেথ রেকথ, হেনরি মিলার
প্রভৃতি আমেরিকান কবি-লেখকদের, তথাকথিত সামাজিক ধ্যানধারণার প্রতি প্ৰচণ্ড
রকমের অনীহা ও আক্রোশ থেকে গড়ে ওঠা ঐ গোষ্ঠী নিজেদের জাহির করত 'বিট' বলে।
বিট মানে হেরো, পরাস্ত, হতাশ, গাণ্ডু আর এইরকম আরও কিছু। 'অ্যাংরি' কথাটা
তো খচমচ করত চল্লিশের দশকের জ্যাজ বাজিয়েদের ঠেকে। তাছাড়া, মোটামুটি ঐ
সময়েই ইংল্যান্ডের একদল তিক্ত-বিরক্ত-রাগী লেখক সেখানকার গঙ্গাজলী
সাহিত্যকে লাথিয়ে রাতারাতি দাগি হয়েছিলেন 'Angry Young Men' নামে।
অ্যাংরিরা ছিলেন জন ওয়েন, জন ব্রেন, কিংসলি অ্যামিশ প্রমুখ। অ্যাংরি আর
বিটরা একসময় একটা জয়েন্ট অ্যান্থলজিও বের করে। যে-কারণে ঐ দুই
বাওয়াল-পার্টিকে অভিন্ন ভেবে কিছু মানুষ চরম ভুল করেছিল। কিন্তু, ভুল তো
ভুলই। আসলে হয়েছিল কি, কেরুয়াকের সুহৃদ হারবার্ট হাংকি তখন কুচেল দুনিয়ায়
গহন চলাফেরায় মগ্ন এবং তাঁকে ছিঁচকে চোর, মাস্তান আর মাতাল-গাঁজাখোর বলে
চেনানোর জন্যে 'বিট' খিস্তিটা চালু ছিল। এবং, খুব অবান্তর হবে না যদি ধরা
হয় কেরুয়াক উক্ত লিংক থেকেই শব্দটা গেঁড়িয়েছিলেন।
এই বিটদের সঙ্গে বাঙালি যুবাদের হাংরি হাঙ্গামাকে গুলিয়ে ফেলার বেওকুফি বা
ধাউড়বাজি ঠিক হবে না। আবার 'হাংরি'র স্রোত-সূত্র যে 'ক্ষুধার্ত' বা
'কাঙাল' ---- এটা ঠিক না। কেননা, প্রতিষ্ঠান বিরোধীরা কখনই মার্কামারা হতে
রাজি নয়, তারা হামেহাল শেষধাপের জন্য ত্বরায়। আর, ধাপগুলো হলো অবিরাম
নিচের দিকে, ঘাস আর মাটির দিকে। 'মার্কা' ব্যাপারটা মৌলবাদের লক্ষণ।
প্রতিষ্ঠানের কারকিত। যেমন আমাদের পৌরাণিক নামগুলো। সূর্য, চন্দ্র,
পৃথিবী, জল, বায়ু, শিব, কৃষ্ণ, রাম, সীতা প্রত্যেকেরই হাজারটা করে নাম।
পাড়ার মাস্তান থেকে শুরু করে লোকসভার মেম্বার, এঁদের অনেকগুলো করে নাম।
যত গুণের ঘাট, তত নামের বাড়। তাছাড়া, এটাও ফ্যাক্ট, যে, ব্যক্তিকে
অভিধায়িত করার জন্য যেসব শব্দকলাপ আমাদের চারপাশে ডাঁই করা আছে, এখনও, সবই
সেই ব্রিটিশ মাস্টারবেশিয়ানদের নিচুড়ে-যাওয়া বইপত্র, ডিক্সনারি আর
আধুনিকতাবাদী বুকনি-বীর্য থেকে হাসিল। আসলে কিন্তু, শেষ বিশ্বযুদ্ধোত্তর
দুনিয়ার যে হালচাল, রাজনীতিক-আর্থিক অবস্থা, তাতে সেরকম মর্ডানিস্ট
স্পেশেলাইজড ব্যক্তিত্ব গড়ে ওঠার সারবীজ সব পচে-হেজে গেছে। এখন আধুনিকতা
ব্যাপারটাই একখানি ধ্রুপদী জোচ্চোর ও ধাপ্পাবাজ।
যাই হোক। বলবার কথা এই, হাঙ্গামার শরিকরাও যেভাবে দাবি করেছেন, ----
হাংরি, আর-পাঁচটা সাহিত্য আন্দোলনের মতোই, পূর্বাপর স্বমেহিত ছিল, তাতে
কোনো বাহ্যিক ক্যাটালিটিকের কলকাঠি ছিল না। যে-কারণে এই হাঙ্গামার
আবির্ভাব-কালটি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। পঞ্চাশের শেষে, বিশেষত ষাটের দশকের
শুরুশুরুতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রায় একই ধাঁচে তরুণ-তরুণীদের মধ্যে
ব্যাপক অনাস্থা আর বিক্ষোভ দেখা দেয়। তাদের নিজ-নিজ রাষ্ট্রের শাসনতন্ত্র,
সমাজ, চালু ধর্মীয় নীতিকানুন, আর্থিক বন্দোবস্তি আর কালচারাল বাতাবরন
তামাম-কিছু ঐ নাগর-যুবাদের কাছে চরম অসহনীয়, সুতরাং পরম ত্যাজ্য ও বর্জনীয়
ঠাহর হতে থাকে। প্যারিস, বার্লিন, প্রাগ্ব থেকে বার্কলি, জাকার্তা,
কলম্বিয়া, পিকিং ----- বিভিন্ন শহরে, বিশেষ করে কলেজ-ইউনিভার্সিটির
ছেলেমেয়েরা প্রবল বাগী ও তোড়ফোড়-প্রবণ হয়ে ওঠে। লিহাজা, বিক্ষোভের ঐ চোনা
সাহিত্যের জলকেও লোনা করে ফেলবে, এ তো অতি লাজিম কথা।
বিশেষত, দেশভাগটা বাঙালির সত্যিকারের পাইন মেরে দিয়েছিল। ঐ প্রেক্ষাপটে,
যখন নিত্যনতুন মৃত্যুপদ ও ভীতিপদ বাঙালির বত্রিশ ইঞ্চি পোস্তবাটা-বুক ক্ষণে
ক্ষণে ভেবড়ে দিচ্ছে, মুহুর্মুহু মূক করে দিচ্ছে আস্ত-একটা বাতেল্লাবাজ
জাতিকে, চেতনা সন্ত্রস্ত ও দৃষ্টি ঘোলাটে হয়ে, নালা থেকে ভাত কুড়িয়ে খাচ্ছে
অনাহারী নেড়ি ও মানুষের ছা, ------ আমরা তখনও অবিশ্বাস্য নজরে দেখতে পাই
হাজার বছরের ঝরঝরে মূল্যবোধগুলো বাঙালির জীবনে নতুন ধারণার পথ দেখাবে বলে,
তখনও, রক্তচক্ষু মেলে দাঁড়িয়ে! নতুন শক্তি জীবনকে পথ দেখাতে চায়, তখনও। ঐ
রক্তচক্ষুগুলো কাদের?? কোটি কোটি মূক ও মূঢ়ের বেদনাকে মূর্ত ধ্বনিতে
তবদিল করতে উঠে আসে অই, কারা??? আমরা দেখতে পাচ্ছি, বাঙলা মায়ের
আনাচ-কানাচ থেকে, অন্ধগলি আর ঘুঁজিপথ থেকে বেরিয়ে আসছে অশিক্ষিত নিরক্ষর
অর্ধ-নিরক্ষর ভাঙা-ভাষা ভাঙা-বানানের একগুচ্ছ অন্ত্যজ, অপর, সাব-অলটার্ন,
ডায়াসপোরিক ছোটলোক। নপুংসক বুর্জোয়া শ্যাল-কুত্তায় নুচে খাবে বাংলা
সাহিত্যকে, তার আগেই টিনের সুটকেশ, ভাঙা মগ, ছেঁড়া পাজামা, নোংরা গেঞ্জি ও
বিষ্ঠা-লাঞ্ছিত মুর্দাফরাসের কেরবালা হা-রেরে তরিবতে ধেয়ে এলো বাংলা
সংস্কৃতির মূল বিতর্দির দিকে। গোড়ার দিকে এদের পিওর লাথখোর বলে মনে হবে,
এদের ভাষা গেঁয়ো আর এদের কথাবার্তা অশ্লীল স্ল্যাং-মাফিক মনে হবে, ----
সেটা একরকম রফা। মৃতের চিতায় অগ্নি-অস্তিত্বের ঐ ছিল পূর্বাভাস।
হাংরি জেনারেশন আন্দোলন ছিল, নাকি হুজুগ? হাংরি আন্দোলনের স্রষ্টা কে?
----- এই দুটি বিতর্ক এত এত দফা এত এত এত ভাবে দলিত মর্দিত ধর্ষিত হয়েছে
যে তাকে এখন কেঁদেই বাঁচতে দেওয়া উচিত। বিশেষত দ্বিতীয় প্রশ্নটি। জঙ্গল
মে মোর নাচা, কিসনে দেখা? প্রত্যেকে বলে আমি, আমি, আমি। অক্ষরের গোলামি
থুয়ে অক্ষরের মালিক হওয়ার সাধ, প্রত্যেকের। তাঁরা মেতে উঠেছেন অন্ধকারে,
অহংকারে, ব্যক্তিগত আরোপে, আমিত্বের বহ্বাস্ফোটে। আমি, আমি, আমি। আয়ে
গওয়া হরামিয়ন সব, একে মারে যান আফত-মা হ্যায়। ----- বিতর্কটি এখন যেন এই
বলছে, কঁকিয়ে, ----- এবং খাবি খেয়ে মরছে।
১৯৬২। 'সম্প্রতি' পত্রিকার থার্ড সংকলনে বিনয় মজুমদারের 'ফিরে এসো চাকা'র
সমীক্ষা বেরুল 'হাংরি জেনারেশন সংক্রান্ত প্রস্তাব' শিরোনামে। লেখক :
শক্তি চট্টোপাধ্যায়। অনেকের ধারণা, বাসু-সুভাষ-শৈলরাও খেয়েছিলেন, যে, এই
লেখা থেকেই হাংরি জেনারেশন নামের সূত্রপাত। ধারণাটা কিছু বাতাসও পেয়েছিল
১৯৬৪-৬৫ সালে হাংরি মামলায় 'this literary movement was started by me' বলে
শক্তির স্টেটমেন্ট জমা পড়ায়। হাংরি গোষ্ঠীর এককালীন গড়িমসি সদস্য সন্দীপন
চট্টোপাধ্যায়ও নাকি ঐ মর্মে বয়ান রুজু করেছিলেন। কিন্তু শক্তির এ লেখা তো
বেরিয়েছিল বাষট্টি সনে; অথচ, ১৯৬১ সনের নভেম্বর-ডিসেম্বরেই ছেপে গিয়েছিল
'হাংরি জেনারেশন' নামে ১/৮ ডবলক্রাউন সাইজের ইস্তেহারটি, তাতে বার্জাস
টাইপে পরিষ্কার ছাপা হয়েছিল : স্রষ্টা মলয় রায়চোধুরী, নেতা শক্তি
চট্টোপাধ্যায়, সম্পাদক দেবী রায়।
আসলে, পরে জানা যায়, হাংরি জেনারেশন ছিল এমনই এক চ্যাংমাছ, কারো একার
মুঠোয় বেশিক্ষণ ধরা থাকেনি। হাঙ্গামার ধূসর সূচনালগ্নের আরেক শরিক,
বিলেত-রিটার্ন কলেজ-প্রভাষক উৎপলকুমার বসু পরবর্তীতে (১৯৯৪) জানালেন :
"হাংরি জেনারেশন সেভাবে কোন সংগঠিত আন্দোলন ছিল না। যার খুশী, যেখান থেকে
পারে হাংরি জেনারেশন নাম দিয়ে বুলেটিন বের করে বাজারে ছেড়ে দিত। এই
আন্দোলন ছিল অনিয়ন্ত্রিত। কতকগুলো ফতোয়া মলয় সমীর শক্তি লিখেছিল। এগুলোর
নিচে অনেকের নাম বসিয়ে দেয়া হ'ত। বহু ক্ষেত্রেই যাদের নাম দেওয়া হচ্ছে
তাদের জিজ্ঞাসাও করা হঁ'ত না। ..... হাংরিদের সেভাবে কোন কাগজও ছিল না।
হয়ত ত্রিপুরা থেকে একটা কাগজ বেরল, নাম দিয়ে দিল ---- হাংরি জেনারেশন
বুলেটিন নম্বর ১২। হয়ত তার ১০ বা ১১ বেরোয়নি।"
আসলে, ১৯৬২-৬৩ সনে পশ্চিম বাংলার সাহিত্যে এই বাওয়ালমুখী পালাবদলের তীব্র
চাগাড়ে দুটি প্রধান উপ-কেন্দ্র গড়ে উঠেছিল কলকাতা শহরের বুকে। একটি
কেন্দ্রের মধ্যমণি ছিলেন বাসুদেব দাশগুপ্ত, শৈলেশ্বর ঘোষ, সুভাষ ঘোষ,
প্রদীপ চৌধুরী এবং সুবো আচার্য। অপর কেন্দ্রে ছিলেন মলয় রায়চোধুরী, সমীর
রায়চোধুরী, দেবী রায় এবং সুবিমল বসাক। উভয় কেন্দ্রের সদস্যরাই, কমবেশি,
তথাকথিত ছোটলোক, গরিব আর অশিক্ষিত ফ্যামিলি থেকে আগত। এবং প্রত্যেকের বয়স
ছিল বিশ-পঁচিশের কোঠায়। যে-বয়সে যত আলো পড়ে, তত ভয় কমে। উপকেন্দ্র যেহেতু
দুটি, সুতরাং দু-রকমের হাংরি বাওয়াল শুরু হয়েছিল। একটা,
শৈল-বাসু-সুভাষদের বস্তি-কলকাতার 'ছোটলোকি' বাওয়াল; এখানে যে-দলের নাম
দেওয়া যাক হাংরি -- 'এ' গ্রূপ। অন্যটা মলয়-সুবিমলদের ডায়াসপোরিক বাওয়াল,
অর্থাৎ 'বি'-গ্রূপ। দ্বিতীয় গ্রূপের সর্বময় কর্তা ছিলেন পাটনার ছোটলোক আর
কুচেল অধ্যুষিত দরিয়াপুর মহল্লার নামচিন ষ্টুডিওঅলা রঞ্জুবাবুর ছোটছেলে বিশ
বছরের ফনকু ওরফে ফনা, অথবা ইমলিতলার মুল্লু খান ওরফে মলয় রায়চোধুরী, সেটা
জোরও ধরেছিল মলয়ের জোরদার ইস্তেহারি ভাষার চটকে, অপেক্ষাকৃত বেশি; আর,
তাঁদের সে-টিমও ছিল বেশ ভারি। বহু পুরনো জ্ঞানপাপী সে-দলে ভিড়েছিল। 'এ'
গ্রূপ এই 'বি' গ্রূপের নাম দিয়েছিল 'চুলকে দেওয়া হাংরি জেনারেশন'। প্রথম
গ্রূপটি মলয়কে 'মফসসলের অজ্ঞাত গাড়োল' বলেও চালাতে চেয়েছিল ব্যক্তিগত
আক্রোশবশত। তাঁরা, প্রত্যেকে ছিলেন, কেউ কেউ ছদ্মভাবে, মলয়ের বিরোধীপক্ষ।
বিশেষত আশির দশকে পুনরুত্থিত মলয়ের নিজেকে হাংরি আন্দোলনের স্রষ্টা বলে
চালানো, কিছু-কিছু ক্ষেত্রে তাঁর ইতিহাস-বিকৃতি এবং মাত্রাতিরিক্ত
আত্মপ্রচারে দাগা পেয়েই প্রথম গ্রূপটির গোসা ধরতামাশি পেয়েছিল এবং তাঁরা
পাগলের মতো ক্ষেপে উঠেছিলেন। সুতরাং প্রথম দলটির ঐ পাঁচ শরিক যাঁরা
আন্দোলন-চলাকালীন, ষাটের দশকে যা নিয়ে একেবারেই মাথা ঘামাননি, আশি ও
তৎ-পরবর্তী পিরিয়ডে মলয়ের মতই, নিজেদেরকে 'হাংরি আন্দোলনের স্রষ্টা' হিশেবে
প্রচার করা শুরু করে দেন। দায়িত্ব না নিয়ে একটু হাস্যচ্ছলে বলি, হাংরি
লেখকদের মধ্যে কেউ আধুনিকতাবাদীদের মতো 'ডক্টরেট' ছিলেন না, ----- সাহিত্য,
ইতিহাস, দর্শন, মনোবিজ্ঞান কোন কিছুতেই একজনও 'উলেমা' ছিলেন না বলে এহেন
পারস্পরিক কাদাহোলি। আমি কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে কুম্ভলস চাই না, অতএব কোন্দলটি
এড়িয়ে যাচ্ছি।
এ-কথা ঠিক যে হাংরি কোন ইজম ছিল না। ছিল একটা স্টাইল বা আইডিয়া। আরও
বলতে পারি, একটা ঘটনা, বাংলাভাষায় সেভাবে যা আগে কখনো ঘটেনি। বাংলা
সাহিত্যের তথাকথিত মূল ধারা থেকে বিচ্ছিন্ন অনাদৃত এক উপদ্রুত এলাকা থেকে
বিশাল এক ঢেউ, উঠে এসে, আছড়ে পড়েছিল এজি-গোয়িং সাহিত্যের ল্যাসলেসে মসৃণ
চত্ত্বরে। সমাজের একেবারে নিচুতলার ভাষা ও ভাবনাকে সাহিত্যের কাছাকাছি
নিয়ে আসার, পক্ষান্তরে বাংলা সাহিত্যের লিরিকফুলের বাগানকে তছনছ করে নতুন
প্রতিমান প্রতিষ্ঠার তাগিদে হাংরি ছিল প্রথম আর তখনো-অব্দি একলোতা বৈপ্লবিক
সমীহা।
লেবেলসমূহ:
মুচলেকা,
রাজসাক্ষী,
সাহিত্যে অশ্লীলতা,
Anti-Establishment,
Hungry Generation,
Literary Movement,
Protest Literature
পি. এস. কাজল : হাংরি আন্দোলন এবং একজন হাংরি কবি
হাংরি আন্দোলন এবং একজন হাংরি কবি
Posted by পিএস কাজল on 15/07/2012 in প্রবন্ধ, ব্লগ
আন্দোলনের শুরু :
১৯৬১ সালের নভেম্বরের দিকে পাটনা শহর হতে এ আন্দোলন শুরু হয় । যে কবিরা এ
আন্দোলন শুরু করেছিলেন তাদের মধ্যে মলয় রায় চৌধুরী, ত্রিদিব মিত্র , সুনিমল
বসাক, শক্তি চট্রোপাধ্যায়, সমীর রায় চৌধুরী এবং বিনয় মজুমদার ছিলেন
অন্যতম । বাঙলা বা ভারতীয় ইতিহাসে ইশতেহার বিলি করে সাহিত্য আন্দোলন মনে হয়
এর (হাংরি) বাইরে আর নেই । যদিও প্রথম প্রকাশিত ইশতেহারটি ইংরেজি ভাষায়
করা হয়েছিল । তার কারন তৎকালে পাটনায় কোন বাংলা প্রেস ছিল না । ১৯৬১ হতে
১৯৬৪ পযর্ন্ত এ আন্দোলন বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করতে সমর্থ হয়েছিল । বেশ কিছু
বাস্তব অবস্থার কারনে সরকারের কোপানলে পড়ে এবং কয়েকজন হাংরি কবির
বিশ্বাসঘাতকতার জন্য ১৯৬৪ সালের পর এ আন্দোলন তার প্রকাশ্যতা হারায় ।
নকশাল বাড়ীর আনোলনের পর উত্তর বঙ্গের তরুন কবিরা এ আন্দালনকে আবার জীবন দান
করার চেষ্টা করেছিলেন । কিন্তু তাত্বিক ভিত্তি না থাকায় তারা সফলতা পায়
বলে অনেকে মনে করেন । আর এ আন্দোলকে যারা সমর্থন করতো এবং কবিতায়-
চেতনায় ধারন করতো তারা ইতিহাসে হাংরি কবি বা হাংরি জেনারেশন নামে পরিচিত ।
ছবি- হাংরি আন্দোলনের ইশতেহার-১৯৬৪
হাংরি আন্দোলন: ত্রিদিব মিত্র‘র কবিতা
হাংরি জেনারেশন আন্দোলন: রাজসাক্ষী সুভাষ ঘোষ-এর মুচলেকা
সুভাষ ঘোষ-এর মুচলেকা:
আমার নাম সুভাষচন্দ্র ঘোষ। গত এক বৎসর যাবত
আমি কলেজ স্ট্রিট কফি হাউসে যাতায়াত করছি। সেখানে আমার সঙ্গে এক দিন হাংরি
আন্দোলনের উদ্ভাবক মলয় রায়চৌধুরীর পরিচয় হয়। সে আমার কাছ থেকে একটা লেখা
চায়। হাংরি জেনারেশন বুলেটিনের খবর আমি জানি বটে কিন্তু হাংরি আন্দোলনের যে
কী উদ্দেশ্য তা আমি জানি না। আমি তাকে আমার একটা লেখা দিই যা দেবী রায়
সম্পাদিত হাংরি জেনারেশন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। আমি তা আমার রুমমেট
শৈলেশ্বর ঘোষের কাছ থেকে পাই। সে হাংরি বুলেটিনের একটা প্যাকেট পেয়েছিল। আমি এই ধরণের আন্দোলনের সঙ্গে কখনও নিজেকে জড়াতে চাইনি, যা আমার মতে খারাপ। আমি ভাবতে পারি না যে এরকম একটা পত্রিকায় আমার আর্টিকেল ‘হাঁসেদের প্রতি’ প্রকাশিত হবে। আমি হাংরি আন্দোলনের আদর্শে বিশ্বাস করি না, আর এই লেখাটা প্রকাশ হবার পর আমি ওদের সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন করেছি।
(স্বাক্ষরের তারিখ ২ সেপ্টেম্বর ১৯৬৪ )
সুভাষ ঘোষ পরে একটি ফ্যাসিস্ট রাজনৈতিক দলে
যোগ দেন, যে দলটি পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে নারকীয় অত্যাচার চালিয়েছিল। তিনি এই
দলের সদস্য হন এবং দলের রাজনৈতিক মিছিলে ও র্যালিতে দলের পতাকা নিয়ে
ইনক্লাব জিন্দাবাদ করে বেড়াতেন। তিনি ভুলে গিয়েছিলেন যে হাংরি জেনারেশন
আন্দোলন একটি প্রতিষ্ঠানবিরোধী আন্দোলন । তাঁর এই অধৎপতনের কারণে
পরবর্তীকালে তাঁর কলম থেকে আর উল্লেখযোগ্য লেখা বেরোয়নি।
হাংরি জেনারেশন : রাজসাক্ষী শৈলেশ্বর ঘোষ-এর মুচলেকা
হাংরি জেনারেশন সাহিত্য আন্দোলনে সবচেয়ে
লজ্জার ঘটনা ছিল দুই জন আন্দোলনকারীর রাজসাক্ষী হওয়া। এনারা দুইজন হলেন
শৈলেশ্বর ঘোষ ও সুভাষ ঘোষ। কেবল রাজসাক্ষী হওয়াই নয়, এনারা দুই জন মুচলেকাও
লিখে দিয়েছিলেন। মলয় রায়চৌধুরীর যখন নিম্ন আদালতে একমাসের কারাদণ্ডের আদেশ
হল, এনাদের টিকিটিও দেখতে পাওয়া যায়নি। প্রায় দশ বছর চুপচাপ থেকে এনারা
আবার উদয় হন। হাংরি জেনারেশন শব্দটি এড়িয়ে এনারা ক্ষুধার্ত নাম দিয়ে
পত্রিকা প্রকাশ করা আরম্ভ করেন। তা এই জন্য যে মুচলেকায় তাঁরা লিখে
দিয়েছিলেন যে হাংরি জেনারেশন আন্দোলন ও ম্যাগাজিনের সঙ্গে তাঁদের কোনও
সম্পর্ক নেই।
তারপর আটের দশকে মলয় রায়চৌধুরী পূনর্বার
কবিতা লেখা আরম্ভ করলে এবং বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় মলয় রায়চৌধুরীর
সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হতে থাকলে এনাদের মনে হয় যে তাঁদের মৌরসিপাট্টা বুঝি
শেষ হতে চলল। কিন্তু পাঠকবর্গ ইতোমধ্যে তাঁদের কুকর্মের কথা জেনে
গিয়েছিলেন। এনারা দুইজন বহু ছোকরাকে জুটিয়ে পুনরায় হাংরি জেনারেশনের জাওয়াজ
তোলেন। পাঠক আর তাঁদের বিশ্বাস করছে না দেখে তাঁরা হাংরি জেনারেশন সংকলন
বা হাংরি জেনারেশন সমগ্র ইত্যাদি নামে ঢাউস গ্রন্হাবলী বাজারে ছাড়তে আরম্ভ
করেন। এই গ্রন্হগুলিতে মলয় রায়চৌধুরী তো ছিলেনই না, উপরন্তু প্রধান-প্রধান
হাংরি আন্দোলনকারীদেরো পাওয়া যাবে না। ১৯৬১-এর মূল আন্দোলনকারীরা
রাজসাক্ষীদের সাথে যোগাযোগ রাখতে চাননি, লেখাও দেননি। শেষ পর্যন্ত এই দুইজন
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে বিশ্বাসঘাতক প্রতিপন্ন হন যা অধ্যাপক শিবনারায়ণ
রায় তাঁর জিজ্ঞাসা পত্রিকার সম্পাদকীয়তেও লিখেছিলেন।
বিশ্বাসঘাতক দুইজনের মুচলেকা নিম্নে দেয়া হল:
শৈলেশ্বর ঘোষ:
আমার নাম শৈলেশ্বর ঘোষ। আমার জন্ম বগুড়ায় আর বড় হয়েছি বালুরঘাটে। আমি ১৯৫৩ সনে বালুরঘাট হাই ইংলিশ স্কুল থেকে স্কুল ফাইনাল পাশ করেছি, ১৯৫৫ সনে বালুরঘাট কলেজ থেকে আই এস সি, ১৯৫৮ সনে বালুরঘাট কলেজ থেকে বি এ, আর ১৯৬২ সনে কলকাতার সিটি কলেজ থেকে বাংলায় স্পেশাল অনার্স। ১৯৬৩ সনে সেপ্টেম্বর মাসের শেষ দিকে একদিন কলেজ স্ট্রিট কফিহাউসে দেবী রায় ওরফে হারাধন ধাড়া নামে একজন তাঁর হাংরি জেনারেশন ম্যাগাজিনের জন্য আমাকে লিখতে বলেন। তারপরেই আমি হাংরি আন্দোলনের লেখকদে৪র সঙ্গে পরিচিত হই। আমি ব্যক্তিগতভাবে খ্যাতিমান লেখক সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, রবীন্দ্র দত্ত, বাসুদেব দাশগুপ্ত, প্রদীপ চৌধুরী এবং উৎপলকুমার বসুকে চিনি। গত এপ্রিল মাসে একদিন কলেজ স্ট্রিট কফিহাউসে মলয় রায়চৌধুরীর সঙ্গে আমার দেখা হয়, এবং তিনি আমার কাছে কয়েকটা কবিতা চান। তাঁর কাছ থেকে একটা পার্সেল পেয়েছি। আমি মলয় রায়চৌধুরীকে চিনি। তিনি হাংরি আন্দোলনের স্রষ্টা। হাংরি জেনারেশন ম্যাগাজিনে আমি মোটে দুবার কবিতা লিখেছি। মলয় আমাকে কিছু লিফলেট আর দু তিনটি পত্রিকা পাঠিয়েছিলেন কিন্তু সেগুলি সম্পর্কে কোনো নির্দেশ তিনি আমাকে দেননি। সাধারণত এই সব কাগজপত্র আমার ঘরেই থাকত। এটুকু ছাড়া হাংরি আন্দোলন সম্পর্কে আমি আর কিছু জানি না। অশ্লীল ভাষায় লেখা আমার আদর্শ নয়। ১৯৬২ থেকে আমি হুগলি জেলার ভদ্রকালীতে ভূপেন্দ্র স্মৃতি বিদ্যালয়ে স্কুল টিচার। মাইনে পাই দু’শ দশ টাকা। বর্তমান সংখ্যা হাংরি বুলেটিনের প্রকাশনার পর, যা কিনা আমার অজান্তে ও বিনা অনুমতিতে ছাপা হয়, আমি এই সংস্হার সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন করেছি। ভবিষ্যতে আমি হাংরি আন্দোলনের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক রাখব না এবং হাংরি পত্রিকায় লিখব না।
আমার নাম শৈলেশ্বর ঘোষ। আমার জন্ম বগুড়ায় আর বড় হয়েছি বালুরঘাটে। আমি ১৯৫৩ সনে বালুরঘাট হাই ইংলিশ স্কুল থেকে স্কুল ফাইনাল পাশ করেছি, ১৯৫৫ সনে বালুরঘাট কলেজ থেকে আই এস সি, ১৯৫৮ সনে বালুরঘাট কলেজ থেকে বি এ, আর ১৯৬২ সনে কলকাতার সিটি কলেজ থেকে বাংলায় স্পেশাল অনার্স। ১৯৬৩ সনে সেপ্টেম্বর মাসের শেষ দিকে একদিন কলেজ স্ট্রিট কফিহাউসে দেবী রায় ওরফে হারাধন ধাড়া নামে একজন তাঁর হাংরি জেনারেশন ম্যাগাজিনের জন্য আমাকে লিখতে বলেন। তারপরেই আমি হাংরি আন্দোলনের লেখকদে৪র সঙ্গে পরিচিত হই। আমি ব্যক্তিগতভাবে খ্যাতিমান লেখক সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, রবীন্দ্র দত্ত, বাসুদেব দাশগুপ্ত, প্রদীপ চৌধুরী এবং উৎপলকুমার বসুকে চিনি। গত এপ্রিল মাসে একদিন কলেজ স্ট্রিট কফিহাউসে মলয় রায়চৌধুরীর সঙ্গে আমার দেখা হয়, এবং তিনি আমার কাছে কয়েকটা কবিতা চান। তাঁর কাছ থেকে একটা পার্সেল পেয়েছি। আমি মলয় রায়চৌধুরীকে চিনি। তিনি হাংরি আন্দোলনের স্রষ্টা। হাংরি জেনারেশন ম্যাগাজিনে আমি মোটে দুবার কবিতা লিখেছি। মলয় আমাকে কিছু লিফলেট আর দু তিনটি পত্রিকা পাঠিয়েছিলেন কিন্তু সেগুলি সম্পর্কে কোনো নির্দেশ তিনি আমাকে দেননি। সাধারণত এই সব কাগজপত্র আমার ঘরেই থাকত। এটুকু ছাড়া হাংরি আন্দোলন সম্পর্কে আমি আর কিছু জানি না। অশ্লীল ভাষায় লেখা আমার আদর্শ নয়। ১৯৬২ থেকে আমি হুগলি জেলার ভদ্রকালীতে ভূপেন্দ্র স্মৃতি বিদ্যালয়ে স্কুল টিচার। মাইনে পাই দু’শ দশ টাকা। বর্তমান সংখ্যা হাংরি বুলেটিনের প্রকাশনার পর, যা কিনা আমার অজান্তে ও বিনা অনুমতিতে ছাপা হয়, আমি এই সংস্হার সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন করেছি। ভবিষ্যতে আমি হাংরি আন্দোলনের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক রাখব না এবং হাংরি পত্রিকায় লিখব না।
হত্যাকাণ্ড
ত্রিদিব মিত্র
আমাকে বারবার জীবন থেকে হড়কে জীবনের ফঁদাই পড়তে হচ্ছে
মৃত্যু কেবলই কেবলই প্রতারণা করছে আমার সঙ্গে
চারটে বাঘ আর তিনটে বুনো শুয়োরের
ধ্বস্তাধস্তি চলছে আবছা জ্যোৎস্নায়
আমার মিথ্যে জিভ থেকেই সত্যের চ্যালেঞ্জ ফঁড়ে
ঝলসা দিচ্ছে মানু-বাচ্চাদের
তাদের কান্না শুনে বধির হয়ে যাচ্ছে আমার কান
আনন্দে সাততলা অব্দি লাফিয়ে উঠছে আমার জিভ
প্রেমিকার কষ্ট দেখে আনন্দে কঁদে উঠেছিলাম আমি
চুমু খেতে গিয়ে আলজিভ শুকিয়ে আসছে আমার
চারিদিকের ভিজে স্যাঁতসেতে অন্ধকার থেকে
আমি দানব না যিশুকৃষ্ট বুঝতে না পেরে
রেস্তঁরায় ভিড় করছে মেয়েমানুষেরা
আজ আর কোনো রাস্তা খঁজে পাচ্ছে না কেউ সরলভাবে হাঁটবার
সব রাস্তাই লুটিয়ে থাকে
সব পাপোষের তলায় গড়িয়ে যায় ধুলোর ঝড়
সব জীবনের মথ্যেই ভয়ংকর কাঁপানো অর্থহীনতা শূন্যতা
আঃ মৃত্যু বাঞ্চোৎ মৃত্যু
অপমৃত্যুও ফেরার হয়ে পালাচ্ছে আমার ভয়া
কেননা আমি বুঝে গেছি মৃত্যুর দমবন্ধ ভান
কেননা আমি মৃত্যুর কাছে গিয়েছিলাম সরল চোখে
ভয়ে কঁচকে গিয়েছিল তার চোখ
অন্ধ চোখে কঁদে উঠেছিল মাথা নিচূ করে
এবং খালি হাতে নির্জন রোদে ফিরতে হল আমাকে জটিল চোখে
নিজেকে নিজের থেকেও লুকিয়ে রাখতে পারছি না আর
আমার নপুংসকতা দেখে তুমি হেসে উঠেছিলে-আমার ভালবাসা
ভয় আর ভালবাসার মধ্যে শুয়ে তুমি ফিরে গেলে ভয়ের কাছে
বঁচার তাগিদে তুমি ফিরে এলে মগজের কাছ-বরাবর
ফালতু মগজের জ্যামিতিক অঙ্ক থেকে ছিটকে বেরিয়ে এলাম আমি বিশৃঙ্খলায়
সভ্যকে ঘৃণা করেও লুকিয়ে রইলে সভ্যতার কলকব্জায়
বদহজম থেকে তৈরি হল আমার বদরাগ
সমাজের ভুল চেতনা থেকে নিজেকে ঝুলিয়ে দিলাম শূন্যের বেতারে
টেলিফোনের মধ্যে দিয়ে রোজ তিন কোটি চুমু
এপার-ওপার করছে পৃথিবীময়
রেলের মোটা তার বেয়ে উড়ে যাচ্ছে ৭৪ কোটি মাছি
আমার শরীরের চারিদিকে অসংখ্য ‘টোপ’
নিজেকে ঝাঁঝরা করে জীবনের সঙ্গে মানুষের সঙ্গে
খেলতে চাইলাম চাতুরী
তোমার প্রতারণা থেকে ভালবাসা আলাদা করতে পারছি না একদম
আমি ভাবছি আমাদের প্রথম অভিসম্পাতের কথা
আমি ভাবছি আমাদের শেষ চুম্বনের কথা
আমার দিব্যজ্যোতি আমার আম্ধকার
আমার চারধারে বেইজ্জতি আর বেলেল্লাপনা বারবার
চলছে মানুষের
আমি বুঝতে পারছি মানুষ মানুষকে ভালবাসতে পারছে না
….মানুষ মানুষকে কোনোদিনই ভালবাসেনি
উঁচু বাড়ির মাথা থেকে লাফিয়ে পড়ছে হৃদয়সুদ্ধ লাশ
আমি দেখতে পাচ্ছি প্রয়োজন কিরকম মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে আকাশের দিকে
আমার ধর্ম কি মনে করতে পারছি না কোনোদিন বুঝিনি বলে
আমার শিরা থেকে রক্ত ছিনিয়ে নেবে বলে
স্হায়ী-অস্হায়ী যুদ্ধ চলছে মানুষের আগুপিছু
পাঁজর গুঁড়ো করে বেরিয়ে আসছে রজনীগন্ধার ডানা
অ্যালকহলিক রক্তের ফেনা থেকে তৈরি হচ্ছে আঁশটৈ ক্ষুরধার ভালবাসা
আমি ক্রমশ প্রেম থেকে শরীরহীনতায় ভাসছি
প্রেমিকার বেগুনি মুখ জ্বলে উঠছে ফঁসে যাচ্ছে প্রয়োজনমত
অদরকারি কাগজপত্রে ঢেলে দিচ্ছি আমার বর্তমান
কবিতা আমার বুক থেকে শুষে নিচ্ছে আমার আয়ু
আমার ভালবাসা রক্তমাংস থেকে মানুষ তৈরি করছে তাদের ফিচলেমি
অসুস্হ ভালবাসা ফিরিয়ে আনবার জন্য
মনুষ্যযন্ত্রের সঙ্গে হায় তুমিও
আমার সকল উত্তাপ জযো করে তৈরি করলাম লালগোলাপের পালক
ব্যবসায়িক উৎপাদন থেকে কুড়িয়ে নিলে তুমি একমুঠো প্রতারণা
আগুনের হল্কা চুঁড়ে দিলে আমার গায়ে
শিশুর মত হেসে উঠলাম আমি
পুড়ে গেল আমার সমস্ত শরীর
আকাশ ঘঁষে ছুটে গেল আমার ক্রোধ
স্বাধীনতার হাতে হাত রাখতে পারছে না কেউ ভয়ে
ওঃ
আমার আর সবার মাঝখানে গজিয়ে উঠছে একটা সুদীর্ঘ গভীর ফাটল
আমি বুঝতে পারছি আমার দ্বারা কিছুই হবে না
নিজেকেও তেমন করে ভালবাসা হল না আমার
এই এক জন্মেই হাঁপিয়ে উঠছি আমি
এক সঙ্গেই হাসছি আর হাসছি না
ওঃ ক্লান্তি ক্লান্তি – অক্লান্ত আওয়াজ – আঁকাবাঁকা টানেল –
লুপ – পরিসংখ্যান – ক্ষুধা – মহব্বৎ – ঘৃণা –
কেবল বোঝা বয়েই জীবন চলে যায় ১০১% লোকের
আত্মাকে খঁজে পাওয়া যাচ্ছে না সমস্ত শরীর ছেঁকেও
বিপ্লবউত্তেজনানারীসংঘর্ষহিংস্রতাবন্যনীরবতা নাচছে
আমি একবারও নিজের দিকে তাকাতে পারছি না ফিরে
মানুষের কোনো কাজই করে উঠতে পারলাম না আজ ওব্দি
ফালতু অব্যবহার্য হয়ে কুঁকড়ে শুয়ে আছি বমিওঠা চোখে
মগজে চোলাই কারবার চলছে গুপ্ত ক্ষমতার
কষ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে লালা ওরফে আমার ভালবাসা আমার অসহায়তা
মানুষের রক্তাক্ত পেঁজা শরীরের পাহাড় দিয়ে তৈরি হচ্ছে
অক্ষম আর আঊর্ব স্বাধীনতা
মানুষের ক্ষীণ শরীর বেয়ে শরীর ঘিরে শরীর ধরে চলেছে
অসংখ্য বিশৃঙ্খল শৃঙ্খলা
ওঃ আমি কোনো দিনই ভালবাসতে চাইনি
আঃ…………………………….আঃ
কলজে গঁড়িয়ে যায় চাপা হিংস্রতায়
বুকের ভেতর ইনজিনের চাপা ক্রোধ
রক্তের উত্তেজনে থেকে তৈরি হচ্ছে বন্যতা
অস্তিত্বহীন আত্মার পায়ে স্বেচ্ছায় প্রণাম রেখেছিল সুবো
তিন মাস জঘন্য নীরবতার পর আঁৎকে উঠে কুঁকড়ে গিয়েছিল প্রদীপ
মানুষের সাহসিকতাকে ভুল করে সন্দেহ করতে শিখেছি
ভুল জেনে ভুল মানুষের সঙ্গে মিশে
আমি চালাক হতে ভুলে যাচ্ছি স্বেচ্ছায়
ভাঁটার সঙ্গে সঙ্গে চতুরতা মূর্খতাও গড়িয়ে যাচ্ছে অন্ধকারে
ত্রিদিবের মুখ ত্রিদিব নিজেই কতদিন চিনতে পারেনি
আদপে সত্য কোনো স্পষ্ট মুখ খঁজে পাচ্ছি না নিজের
“মানুষের নিজস্ব কোনো চরিত্র নেই” বলতে ককিয়ে উঠেছিল
৩৫২ কোটি মানুষ তায় ঐতিহ্য আর পোষা চরিত্রহীনতা
ওঃ অসম্ভব কষ্ট হচ্ছে এখন
কে বা কারা গলা টিপে ধরছে ভুল করে
আমার ।
তাদের অজান্তেই…
মৃত্যু কেবলই কেবলই প্রতারণা করছে আমার সঙ্গে
চারটে বাঘ আর তিনটে বুনো শুয়োরের
ধ্বস্তাধস্তি চলছে আবছা জ্যোৎস্নায়
আমার মিথ্যে জিভ থেকেই সত্যের চ্যালেঞ্জ ফঁড়ে
ঝলসা দিচ্ছে মানু-বাচ্চাদের
তাদের কান্না শুনে বধির হয়ে যাচ্ছে আমার কান
আনন্দে সাততলা অব্দি লাফিয়ে উঠছে আমার জিভ
প্রেমিকার কষ্ট দেখে আনন্দে কঁদে উঠেছিলাম আমি
চুমু খেতে গিয়ে আলজিভ শুকিয়ে আসছে আমার
চারিদিকের ভিজে স্যাঁতসেতে অন্ধকার থেকে
আমি দানব না যিশুকৃষ্ট বুঝতে না পেরে
রেস্তঁরায় ভিড় করছে মেয়েমানুষেরা
আজ আর কোনো রাস্তা খঁজে পাচ্ছে না কেউ সরলভাবে হাঁটবার
সব রাস্তাই লুটিয়ে থাকে
সব পাপোষের তলায় গড়িয়ে যায় ধুলোর ঝড়
সব জীবনের মথ্যেই ভয়ংকর কাঁপানো অর্থহীনতা শূন্যতা
আঃ মৃত্যু বাঞ্চোৎ মৃত্যু
অপমৃত্যুও ফেরার হয়ে পালাচ্ছে আমার ভয়া
কেননা আমি বুঝে গেছি মৃত্যুর দমবন্ধ ভান
কেননা আমি মৃত্যুর কাছে গিয়েছিলাম সরল চোখে
ভয়ে কঁচকে গিয়েছিল তার চোখ
অন্ধ চোখে কঁদে উঠেছিল মাথা নিচূ করে
এবং খালি হাতে নির্জন রোদে ফিরতে হল আমাকে জটিল চোখে
নিজেকে নিজের থেকেও লুকিয়ে রাখতে পারছি না আর
আমার নপুংসকতা দেখে তুমি হেসে উঠেছিলে-আমার ভালবাসা
ভয় আর ভালবাসার মধ্যে শুয়ে তুমি ফিরে গেলে ভয়ের কাছে
বঁচার তাগিদে তুমি ফিরে এলে মগজের কাছ-বরাবর
ফালতু মগজের জ্যামিতিক অঙ্ক থেকে ছিটকে বেরিয়ে এলাম আমি বিশৃঙ্খলায়
সভ্যকে ঘৃণা করেও লুকিয়ে রইলে সভ্যতার কলকব্জায়
বদহজম থেকে তৈরি হল আমার বদরাগ
সমাজের ভুল চেতনা থেকে নিজেকে ঝুলিয়ে দিলাম শূন্যের বেতারে
টেলিফোনের মধ্যে দিয়ে রোজ তিন কোটি চুমু
এপার-ওপার করছে পৃথিবীময়
রেলের মোটা তার বেয়ে উড়ে যাচ্ছে ৭৪ কোটি মাছি
আমার শরীরের চারিদিকে অসংখ্য ‘টোপ’
নিজেকে ঝাঁঝরা করে জীবনের সঙ্গে মানুষের সঙ্গে
খেলতে চাইলাম চাতুরী
তোমার প্রতারণা থেকে ভালবাসা আলাদা করতে পারছি না একদম
আমি ভাবছি আমাদের প্রথম অভিসম্পাতের কথা
আমি ভাবছি আমাদের শেষ চুম্বনের কথা
আমার দিব্যজ্যোতি আমার আম্ধকার
আমার চারধারে বেইজ্জতি আর বেলেল্লাপনা বারবার
চলছে মানুষের
আমি বুঝতে পারছি মানুষ মানুষকে ভালবাসতে পারছে না
….মানুষ মানুষকে কোনোদিনই ভালবাসেনি
উঁচু বাড়ির মাথা থেকে লাফিয়ে পড়ছে হৃদয়সুদ্ধ লাশ
আমি দেখতে পাচ্ছি প্রয়োজন কিরকম মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে আকাশের দিকে
আমার ধর্ম কি মনে করতে পারছি না কোনোদিন বুঝিনি বলে
আমার শিরা থেকে রক্ত ছিনিয়ে নেবে বলে
স্হায়ী-অস্হায়ী যুদ্ধ চলছে মানুষের আগুপিছু
পাঁজর গুঁড়ো করে বেরিয়ে আসছে রজনীগন্ধার ডানা
অ্যালকহলিক রক্তের ফেনা থেকে তৈরি হচ্ছে আঁশটৈ ক্ষুরধার ভালবাসা
আমি ক্রমশ প্রেম থেকে শরীরহীনতায় ভাসছি
প্রেমিকার বেগুনি মুখ জ্বলে উঠছে ফঁসে যাচ্ছে প্রয়োজনমত
অদরকারি কাগজপত্রে ঢেলে দিচ্ছি আমার বর্তমান
কবিতা আমার বুক থেকে শুষে নিচ্ছে আমার আয়ু
আমার ভালবাসা রক্তমাংস থেকে মানুষ তৈরি করছে তাদের ফিচলেমি
অসুস্হ ভালবাসা ফিরিয়ে আনবার জন্য
মনুষ্যযন্ত্রের সঙ্গে হায় তুমিও
আমার সকল উত্তাপ জযো করে তৈরি করলাম লালগোলাপের পালক
ব্যবসায়িক উৎপাদন থেকে কুড়িয়ে নিলে তুমি একমুঠো প্রতারণা
আগুনের হল্কা চুঁড়ে দিলে আমার গায়ে
শিশুর মত হেসে উঠলাম আমি
পুড়ে গেল আমার সমস্ত শরীর
আকাশ ঘঁষে ছুটে গেল আমার ক্রোধ
স্বাধীনতার হাতে হাত রাখতে পারছে না কেউ ভয়ে
ওঃ
আমার আর সবার মাঝখানে গজিয়ে উঠছে একটা সুদীর্ঘ গভীর ফাটল
আমি বুঝতে পারছি আমার দ্বারা কিছুই হবে না
নিজেকেও তেমন করে ভালবাসা হল না আমার
এই এক জন্মেই হাঁপিয়ে উঠছি আমি
এক সঙ্গেই হাসছি আর হাসছি না
ওঃ ক্লান্তি ক্লান্তি – অক্লান্ত আওয়াজ – আঁকাবাঁকা টানেল –
লুপ – পরিসংখ্যান – ক্ষুধা – মহব্বৎ – ঘৃণা –
কেবল বোঝা বয়েই জীবন চলে যায় ১০১% লোকের
আত্মাকে খঁজে পাওয়া যাচ্ছে না সমস্ত শরীর ছেঁকেও
বিপ্লবউত্তেজনানারীসংঘর্ষহিংস্রতাবন্যনীরবতা নাচছে
আমি একবারও নিজের দিকে তাকাতে পারছি না ফিরে
মানুষের কোনো কাজই করে উঠতে পারলাম না আজ ওব্দি
ফালতু অব্যবহার্য হয়ে কুঁকড়ে শুয়ে আছি বমিওঠা চোখে
মগজে চোলাই কারবার চলছে গুপ্ত ক্ষমতার
কষ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে লালা ওরফে আমার ভালবাসা আমার অসহায়তা
মানুষের রক্তাক্ত পেঁজা শরীরের পাহাড় দিয়ে তৈরি হচ্ছে
অক্ষম আর আঊর্ব স্বাধীনতা
মানুষের ক্ষীণ শরীর বেয়ে শরীর ঘিরে শরীর ধরে চলেছে
অসংখ্য বিশৃঙ্খল শৃঙ্খলা
ওঃ আমি কোনো দিনই ভালবাসতে চাইনি
আঃ…………………………….আঃ
কলজে গঁড়িয়ে যায় চাপা হিংস্রতায়
বুকের ভেতর ইনজিনের চাপা ক্রোধ
রক্তের উত্তেজনে থেকে তৈরি হচ্ছে বন্যতা
অস্তিত্বহীন আত্মার পায়ে স্বেচ্ছায় প্রণাম রেখেছিল সুবো
তিন মাস জঘন্য নীরবতার পর আঁৎকে উঠে কুঁকড়ে গিয়েছিল প্রদীপ
মানুষের সাহসিকতাকে ভুল করে সন্দেহ করতে শিখেছি
ভুল জেনে ভুল মানুষের সঙ্গে মিশে
আমি চালাক হতে ভুলে যাচ্ছি স্বেচ্ছায়
ভাঁটার সঙ্গে সঙ্গে চতুরতা মূর্খতাও গড়িয়ে যাচ্ছে অন্ধকারে
ত্রিদিবের মুখ ত্রিদিব নিজেই কতদিন চিনতে পারেনি
আদপে সত্য কোনো স্পষ্ট মুখ খঁজে পাচ্ছি না নিজের
“মানুষের নিজস্ব কোনো চরিত্র নেই” বলতে ককিয়ে উঠেছিল
৩৫২ কোটি মানুষ তায় ঐতিহ্য আর পোষা চরিত্রহীনতা
ওঃ অসম্ভব কষ্ট হচ্ছে এখন
কে বা কারা গলা টিপে ধরছে ভুল করে
আমার ।
তাদের অজান্তেই…
(১৯৬৩ সালে শিবপুরের পুরানো বাড়িতে থাকাকালীন রচিত, এবং মলয় রাচৌধুরী সম্পাদিত ‘জেব্রা’ পত্রিকার দ্বিতীয় সংখ্যায় প্রকাশিত । )
অনেকে মনে করেন হাংরি আন্দোলন শেষ হয়ে গেছে
। কিন্তু বর্তমান আধুনিক কবিদের ( সরকারি দালাল গুলোকে বাদ দিলে যারা
থাকে ) লেখা কবিতা বা তাদের চিন্তা চেতনা দেখলে আমার মনে হয় না এ আন্দোলন
শেষ হয়ে গেছে । তবে এটা ঠিক আন্দোলনের রকমেরও পরিবর্তন হয়েছে । কিন্তু
প্রতিবাদের ভাষা হারিয়ে যায় নি তবে পরিবর্তন হয়েছে ভাষার স্বাভাবিক
পরিবর্তনশীলতার মত । আর স্পেংলারের সংস্কৃতি সংগা বা পরিবর্তনের নিয়মকে
যথার্থ ধরলে , আমাদের বর্তমান সংস্কৃতি কি স্বাভাবিক গতিধারায় চলছে ।
আমাদের সংস্কৃতি কি নিজ সমাজ হতে খাদ্য বা বেচে থাকার মত উপাদা পাচ্ছে ?
উত্তর যদি হয় না তবে আমাদের সংস্কৃতি কোন পথে যাবে ?
লেবেলসমূহ:
মুচলেকা,
রাজসাক্ষী,
Hungry Generation.,
Literary Movement,
Protest Literature
বৃহস্পতিবার
হাংরি আন্দোলনে মলয় রায়চৌধুরীর কবিতা -- প্রবীর চ্যাটার্জি
বিশ
শতকের ষাট বা ছয়ের দশক বাংলা কবিতার ইতিহাস যে-কারণে স্মরণীয় হয়ে আছে,
তার মথ্যে হাংরি আন্দোলন অন্যতম, এ-বিষয়ে দ্বিমত নেই । আর এই হাংরি
আন্দোলনের অন্যতম নেতা মলয় রায়চৌধুরী । যিনি আজও সৃজনক্ষম । গদ্যে-পদ্যে
যিনি তাঁর মৌলিক চিন্তাভাবনা ও প্রতিবাদ অক্ষয় করে চলেছেন । কারো আনুকুল্য
বা হাততালির প্রত্যাশা করেন না । ভুল কি ঠিক, সে-বিচার করবে ইতিহাস বা
মহাকাল । পরোয়াহীন এই লেখককে তাঁর নিজস্ব ভাষামুদ্রা ও ভঙ্গির জন্য
অভিবাদন জানাতেই হয় । আমরা জানি প্রথাভাঙার স্পর্ধা তখন সরকার মানতে
পারেনি । কাব্যে অশ্লীলতার জন্য মলয় রায়চৌধুরীকে গ্রেপতার করা হয় ।
বাংলা কবিতায় রবীন্দ্রনাথের পর নতুন সুর শুনিয়েছিলেন তিরিশের কবিরা । চল্লিশের কবিদের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও প্রতিবাদী ভঙ্গি আরেক মাত্রা যোগ করেছিল । আত্মকথন ও আত্মরতিকে সম্বল করে অন্যরকম স্বাদ নিয়ে এলেন পঞ্চাশের কবিরা । আর ষাটের কবিরা, বিশেষভাবে 'হাংরি আন্দোলন' আমূল নাড়া দিলো বাংলা কবিতার সনাতন ঐতিহ্যকে, নিয়মানুবর্তিতাকে । কবিতার ভাষায়, ছন্দে, অলংকারে, স্তবকে তুমুল ভাংচুর পাঠকের অভ্যস্ত চোখ ও কানকে বিব্রত করে তুলল । বিশেষত মলয় রায়চৌধুরীর লেখায় যৌনতার সঙ্গে এলো ব্যঙ্গ, আত্মপরিহাস ও অসহায় মানুষের নিস্ফলতার যন্ত্রণা । কিভাবে মলয় রায়চৌধুরী তাঁর কবিতায় আত্মপ্রক্ষেপ ঘটিয়েও নিরপেক্ষ হয়ে যান, সামাজিক ঘটনার দ্রষ্টা হন, নির্মম সমালোচনায় শাণিত গিস্পাত হয়ে ওঠেন, তা তাঁর কবিতাগুলি পড়লে টের পাওয়া যায় ।
হাংরি আন্দোলন চলাকালীন তার তিনটি কবিতা সাড়া জাগায় | সেই তিনটি হচ্ছে "জখম", "প্রচন্ড বৈদ্যুতিক ছুতার",এবং
"রবীন্দ্রনাথের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা" | আগের লেখাতে আমি "প্রচন্ড বৈদ্যুতিক ছুতার" কবিতাটি প্রকাশ করেছি | আজ প্রকাশ করলাম :-
"রবীন্দ্রনাথের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা"
-----------মলয় রায়চৌধুরী
আজ দেখি এলুমিনিয়াম বাক্সে গোছ করা আমারই মড়া
অর্ধেক পাঁজর পুড়ে গেছে রাবার জ্বালানো আঁচে
আমাকে ক্ষমা করো
মানুষের মগজ নষ্ট হোক আমার
আমার নখ দাঁত নষ্ট হোয়ে যাক
হাতির আঁদুয়া দিয়ে বেঁধে রাখো আমায়
দেখতে চাই রক্তের ভেতর হাঙ্গর আফানি দেয় কিনা
লাথি লেগে ভাতের থালার ওপর জলের গ্লাস উল্টে পড়ুক
আমাকে ক্ষমা করো
সন্তানের আত্মমৈথুন করা হাতে মুখাগ্নি
উলুঘাস - বুনোটের শেকড়ের পাশে পোকাদের নিঃশব্দ সঙ্গম
এতদিন এদের মুখে থুথু ছিটিয়ে দিতে পারিনি
ধানকাটা নিয়ে এ বছর অনেক লাশ পড়ে গেল
বাইসন শিকারের জন্য বেতলার জঙ্গলে আমাদের চিত্কার
হরিনের মাংস কাটা হয়েছিল কোদাল দিয়ে
আমার ছেলে - মেয়েরা খরগোশের চোখ উপরে
খেলা করছিল বেতলার দুর্গে
এলুমিনিয়াম বাক্সে আমার লাশ বাঁচিয়ে তুলতে চাইছি
আমাকে ক্ষমা করুন
banla kabitaya rabindranathera para natuna sura suniyechilena tirisera kabira . callisera kabidera rajanaitika prajna o pratibadi bhangi areka matra yoga karechila . atmakathana o atmaratike sambala kare an'yarakama sbada niye elena pancasera kabira . ara satera kabira, bisesabhabe 'hanri andolana' amula nara dilo banla kabitara sanatana aitihyake, niyamanubartitake . kabitara bhasaya, chande, alankare, stabake tumula bhancura pathakera abhyasta cokha o kanake bibrata kare tulala . bisesata malaya rayacaudhurira lekhaya yaunatara sange elo byanga, atmaparihasa o asahaya manusera nisphalatara yantrana . kibhabe malaya rayacaudhuri tamra kabitaya atmapraksepa ghatiye'o nirapeksa haye yana, samajika ghatanara drasta hana, nirmama samalocanaya sanita gispata haye othena, ta tamra kabitaguli parale tera pa'oya yaya .
hanri andolana calakalina tara tinati kabita sara jagaya | se'i tinati hacche "jakhama", "pracanda baidyutika chutara",ebam
"rabindranathera kache ksama prarthana" | agera lekhate ami "pracanda baidyutika chutara" kabitati prakasa karechi | aja prakasa karalama :-
"rabindranathera kache ksama prarthana"
-----------malaya rayacaudhuri
aja dekhi eluminiyama bakse gocha kara amara'i mara
ardheka pamjara pure geche rabara jbalano amce
amake ksama karo
manusera magaja nasta hoka amara
amara nakha damta nasta hoye yaka
hatira amduya diye bemdhe rakho amaya
dekhate ca'i raktera bhetara hangara aphani deya kina
lathi lege bhatera thalara opara jalera glasa ulte paruka
amake ksama karo
santanera atmamaithuna kara hate mukhagni
ulughasa - bunotera sekarera pase pokadera nihsabda sangama
etadina edera mukhe thuthu chitiye dite parini
dhanakata niye e bachara aneka lasa pare gela
ba'isana sikarera jan'ya betalara jangale amadera citkara
harinera mansa kata hayechila kodala diye
amara chele - meyera kharagosera cokha upare
khela karachila betalara durge
eluminiyama bakse amara lasa bamciye tulate ca'ichi
amake ksama karuna
বাংলা কবিতায় রবীন্দ্রনাথের পর নতুন সুর শুনিয়েছিলেন তিরিশের কবিরা । চল্লিশের কবিদের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও প্রতিবাদী ভঙ্গি আরেক মাত্রা যোগ করেছিল । আত্মকথন ও আত্মরতিকে সম্বল করে অন্যরকম স্বাদ নিয়ে এলেন পঞ্চাশের কবিরা । আর ষাটের কবিরা, বিশেষভাবে 'হাংরি আন্দোলন' আমূল নাড়া দিলো বাংলা কবিতার সনাতন ঐতিহ্যকে, নিয়মানুবর্তিতাকে । কবিতার ভাষায়, ছন্দে, অলংকারে, স্তবকে তুমুল ভাংচুর পাঠকের অভ্যস্ত চোখ ও কানকে বিব্রত করে তুলল । বিশেষত মলয় রায়চৌধুরীর লেখায় যৌনতার সঙ্গে এলো ব্যঙ্গ, আত্মপরিহাস ও অসহায় মানুষের নিস্ফলতার যন্ত্রণা । কিভাবে মলয় রায়চৌধুরী তাঁর কবিতায় আত্মপ্রক্ষেপ ঘটিয়েও নিরপেক্ষ হয়ে যান, সামাজিক ঘটনার দ্রষ্টা হন, নির্মম সমালোচনায় শাণিত গিস্পাত হয়ে ওঠেন, তা তাঁর কবিতাগুলি পড়লে টের পাওয়া যায় ।
হাংরি আন্দোলন চলাকালীন তার তিনটি কবিতা সাড়া জাগায় | সেই তিনটি হচ্ছে "জখম", "প্রচন্ড বৈদ্যুতিক ছুতার",এবং
"রবীন্দ্রনাথের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা" | আগের লেখাতে আমি "প্রচন্ড বৈদ্যুতিক ছুতার" কবিতাটি প্রকাশ করেছি | আজ প্রকাশ করলাম :-
"রবীন্দ্রনাথের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা"
-----------মলয় রায়চৌধুরী
আজ দেখি এলুমিনিয়াম বাক্সে গোছ করা আমারই মড়া
অর্ধেক পাঁজর পুড়ে গেছে রাবার জ্বালানো আঁচে
আমাকে ক্ষমা করো
মানুষের মগজ নষ্ট হোক আমার
আমার নখ দাঁত নষ্ট হোয়ে যাক
হাতির আঁদুয়া দিয়ে বেঁধে রাখো আমায়
দেখতে চাই রক্তের ভেতর হাঙ্গর আফানি দেয় কিনা
লাথি লেগে ভাতের থালার ওপর জলের গ্লাস উল্টে পড়ুক
আমাকে ক্ষমা করো
সন্তানের আত্মমৈথুন করা হাতে মুখাগ্নি
উলুঘাস - বুনোটের শেকড়ের পাশে পোকাদের নিঃশব্দ সঙ্গম
এতদিন এদের মুখে থুথু ছিটিয়ে দিতে পারিনি
ধানকাটা নিয়ে এ বছর অনেক লাশ পড়ে গেল
বাইসন শিকারের জন্য বেতলার জঙ্গলে আমাদের চিত্কার
হরিনের মাংস কাটা হয়েছিল কোদাল দিয়ে
আমার ছেলে - মেয়েরা খরগোশের চোখ উপরে
খেলা করছিল বেতলার দুর্গে
এলুমিনিয়াম বাক্সে আমার লাশ বাঁচিয়ে তুলতে চাইছি
আমাকে ক্ষমা করুন
Transliteration
bisa satakera sata ba chayera dasaka banla kabitara itihasa ye-karane smaraniya haye ache, tara mathye hanri andolana an'yatama, e-bisaye dbimata ne'i . ara e'i hanri andolanera an'yatama neta malaya rayacaudhuri . yini aja'o srjanaksama . gadye-padye yini tamra maulika cintabhabana o pratibada aksaya kare calechena . karo anukulya ba hatatalira pratyasa karena na . bhula ki thika, se-bicara karabe itihasa ba mahakala . paroyahina e'i lekhakake tamra nijasba bhasamudra o bhangira jan'ya abhibadana janate'i haya . amara jani prathabhanara spardha takhana sarakara manate pareni . kabye aslilatara jan'ya malaya rayacaudhurike grepatara kara haya .banla kabitaya rabindranathera para natuna sura suniyechilena tirisera kabira . callisera kabidera rajanaitika prajna o pratibadi bhangi areka matra yoga karechila . atmakathana o atmaratike sambala kare an'yarakama sbada niye elena pancasera kabira . ara satera kabira, bisesabhabe 'hanri andolana' amula nara dilo banla kabitara sanatana aitihyake, niyamanubartitake . kabitara bhasaya, chande, alankare, stabake tumula bhancura pathakera abhyasta cokha o kanake bibrata kare tulala . bisesata malaya rayacaudhurira lekhaya yaunatara sange elo byanga, atmaparihasa o asahaya manusera nisphalatara yantrana . kibhabe malaya rayacaudhuri tamra kabitaya atmapraksepa ghatiye'o nirapeksa haye yana, samajika ghatanara drasta hana, nirmama samalocanaya sanita gispata haye othena, ta tamra kabitaguli parale tera pa'oya yaya .
hanri andolana calakalina tara tinati kabita sara jagaya | se'i tinati hacche "jakhama", "pracanda baidyutika chutara",ebam
"rabindranathera kache ksama prarthana" | agera lekhate ami "pracanda baidyutika chutara" kabitati prakasa karechi | aja prakasa karalama :-
"rabindranathera kache ksama prarthana"
-----------malaya rayacaudhuri
aja dekhi eluminiyama bakse gocha kara amara'i mara
ardheka pamjara pure geche rabara jbalano amce
amake ksama karo
manusera magaja nasta hoka amara
amara nakha damta nasta hoye yaka
hatira amduya diye bemdhe rakho amaya
dekhate ca'i raktera bhetara hangara aphani deya kina
lathi lege bhatera thalara opara jalera glasa ulte paruka
amake ksama karo
santanera atmamaithuna kara hate mukhagni
ulughasa - bunotera sekarera pase pokadera nihsabda sangama
etadina edera mukhe thuthu chitiye dite parini
dhanakata niye e bachara aneka lasa pare gela
ba'isana sikarera jan'ya betalara jangale amadera citkara
harinera mansa kata hayechila kodala diye
amara chele - meyera kharagosera cokha upare
khela karachila betalara durge
eluminiyama bakse amara lasa bamciye tulate ca'ichi
amake ksama karuna
banglakobita.space © 2018.
Authors
লেবেলসমূহ:
Hungry Generation.,
Literary Movement,
New Generation,
Protest Literature
এতে সদস্যতা:
পোস্টগুলি (Atom)




