হাংরি কিংবদন্তি লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
হাংরি কিংবদন্তি লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

রবিবার

হাংরি আন্দোলন-এর অশ্লীলতা বিষয়ক ইশতাহার

 


হাংরি আন্দোলন-এর অশ্লীলতা বিষয়ক ইশতাহার

[ ১৯৬৫ সালে ফালিকাগজের বুলেটিনে প্রকাশিত ]

আমি অশ্লীলতা সমর্থন করি ।

আমি ততদিন ওব্দি অশ্লীলতা সমর্থন করব, যতদিন ওইসব দুর্বৃত্ত অভিজাতরা তাদের পৈতৃক উৎকর্ষের নকল উৎসবের দাবি করতে থাকবে ।

আসলে অশ্লীলতা বলে কিছু নেই । 

অশ্লীলতা একটা নকল ধারণা, বানানো, উদ্ভাবিত,

তৈরি-করা,

নির্মিত

একদল অশিক্ষিত শ্রেণি-সচেতন ষড়যন্ত্রীর দ্বারা ; প্রতিষ্ঠানের অভিজাত শকুন দ্বারা, নিচুতলার থ্যাঁতলানো মানুষদের টাকাপুঁজ খেয়ে যারা গরম থাকে ; সেইসব মালকড়ি-মালিক জানোয়ারদের দ্বারা, যারা ঠাণ্ডা মাথায় এই নিচুতলার গরম হল্কার ওপরে একচোট মুরুব্বিগিরি করে ।

তাদের শ্রেণিগত সংস্কৃতি বাঁচাতে,

টাকাকড়ির সভ্যতাকে চালু রাখতে,

ঘৃণাভুতের পায়ে সৌরসংসারকে আছড়ে ফেলতে ।

সমাজের মালিকরা একটা নকল নুলো ভাষা তৈরি করে, নিচু শ্রেণির শব্দাবলীকে অস্বীকার করতে চায় যাতে বিভেদ রেখাটা পরিষ্কার থাকে ।


শব্দ আসলে শব্দ আসলে শব্দ আসলে শব্দ আর আমি অভিব্যক্তির কোনোরকম শ্রেণিবিভাগ হতে দেবো না । শুধুমাত্র এই অজুহাতে যে কোনো শব্দ, অভিব্যক্তি, গালাগালি, বাক্য বা উক্তি এক বিশেষ শ্রেণি/গোষ্ঠী/জাত/এলাকা/সম্প্রদায় কর্তৃক ব্যবহৃত, আমি কাউকে তা অস্বীকার, পরিত্যাগ, অগ্রাহ্য, প্রত্যাখ্যান করতে দেবো না ।

একটা শব্দ হলো ফাঁকা আধার যা ভরাট হবার জন্যে অপেক্ষমান ।

সেই সমাজ, যেখানে দুটো ভিন্ন আর্থিক শ্রেণির জন্যে দুরকম শব্দাবলী, তা অসুস্হ আর বিষাক্ত।

অশ্লীলতাকে প্রশ্রয় দেবো কেননা ভাষার মধ্যেকার শ্রেণিবিভাগ আমি নষ্ট ও ধ্বংস করে দেবো ।

তুমি যদি একজন অ্যাকাডেমিক মূর্খ হও এবং আমার কথায় তোমার বিশ্বাস হচ্ছে না, তাহলে কলকাতার একজন রক্তপায়ী বাবুকে ধানবাদে নিয়ে গিয়ে সবচেয়ে পরিষ্কার খনিশ্রমিকের মাদুরে শুইয়ে দাও। সে তাকে মনে করবে অশ্লীল, ইতর, অসহ্য, এবং সমাজবিরোধী । সেই লোকটাকেই বম্বে বা প্যারিসে নিয়ে গিয়ে কোনো কেউকেটা রাজকুমার বা আলিখান বা বড়োসায়েবের পাশে শুইয়ে দাও ; সে তার শিরদাঁড়ার পায়ুবৃন্ত পর্যন্ত আহ্লাদে ডগমগ করে উঠবে :

ঘৃণা

অভিজাত মগজবাক্যে তরল ভ্যামপায়ার গড়ে তোলে কেননা ইশ্বরগোবর এই সফেদ কলারদের সর্বদা ভয়, এই বুঝি মানব সভ্যতাকে লোটবার তাদের অধিকার ও সুবিধা শেষ হয়ে গেল ।

অশ্লীলতা অভিজাতদের সংস্কার যারা নিচুতলার উন্নত সংস্কৃতির কৃষ্টি-আক্রমণকে ভয় পায় ।


আসলে অশ্লীলতা হচ্ছে বুর্জোয়াদের বাড়িতে বানানো আত্মাপেষাই মেশিন ।

ঠিক যেমন তারা বানিয়েছে যুদ্ধ

গণহত্যা

বাধ্যতামূলক সৈন্যভর্তি

পুলিশের অত্যাচার কুঠরি

এবং আণবিক বোমা

নিজেদের লোকেদের ক্ষমতায় রাখতে

পৃথিবীর সমস্ত স্বর্ণপায়খানাকে তাদের পেটে ভরে নিতে

তাদের বিরোধীদের নিশ্চিহ্ণ করতে

মধ্যবিত্তের থুতুতে একদল সফেদকলার সৈন্য ডুবিয়ে রাখতে ।

আমি এদের চাই না

এই পোকাদের

আমি চাই পিটুইটারি আত্মাসুদ্দু মানুষ ।

একজন বুর্জোয়া সবসময় একজন ফ্যাসিস্ট বা একজন

কম্যুনিস্ট বা একজন প্রতিক্রিয়াশীল

কিন্তু কখনও মানুষ নয় ।


অভিজাতের কাছে নিচুতলার ভাষা অশ্লীল । অভিজাতের কাছে তার নিজের ভাষা মানে শিল্প।

বুর্জোয়ারা মনে করে নিচুতলার ভাষা ব্যবহার করলে মানুষ এবং সমাজ ‘কলুষিত ও বিকৃত’ হয়, কেন না তারা ভালো করেই জানে যে, এই ধরণের বুজরুকি ছাড়া তাদের সমাজ-সংস্কৃতি বেশিদিন টিকবে না।

এই ষড়যন্ত্র এক্কেবারে কাণ্ডজ্ঞানহীন ।

সমগ্র সমাজের সাধারণ ভাষায় কথা বলা এবং লেখা যদি কলুষিত ও বিকৃত করা হয়,

তাহলে আমি মানুষকে কলুষিত ও বিকৃত করে প্রকৃতিস্হ করব ।

মানুষের তাবৎ শব্দাবলী যতক্ষণ না গ্রহণযোগ্য হয়, আমি অশ্লীলতা সমর্থন করব । আমি চাই কবিতাকে জীবনে ফিরিয়ে দেয়া হোক ।

আমি ইচ্ছে করে তেমন লেখা লিখবো, যাকে বুর্জোয়ারা অশ্লীল মনে করে, কেন না আমি তাদের হিঁচড়ে নিয়ে গিয়ে বাধ্য করব তাদের ওই নকল উৎকর্ষের বিভেদ ভেঙে ফেলতে । আর এর জন্যে কলকাতার কম্যুনিস্ট বুর্জোয়া, প্রতিক্রিয়াশীল বুর্জোয়া এবং ফ্যাসিস্ট বুর্জোয়া আমার বিরুদ্ধে একজোট হয়ে আমায় তাদের জেলখানায় ঢুকিয়ে দিলেও কিছু এসে যায় না ।

মানুষ ও মানুষের মধ্যে পার্থিব দখলিসত্তের ভিত্তিতে কোনো তফাত করতে দেবো না ।

পৈতৃক রুপোর চামচে করে সমাজের একটা অংশ কিছু শব্দকে খায় বলে, আমি তাদের উন্নত মনে করি না ।


যে সমাজে পার্থিব দখলিসত্তের ভিত্তিতে মানুষে-মানুষে তফাত, সেখানে যৌনতা পুঁজি হিসেবে ব্যবহৃত।

সেক্স পুঁজিরুপে ব্যবহৃত ।

বুর্জোয়া-অত্যাচারিত সমাজ একটা বেবুশ্যেঘর,

কিন্তু কেন যৌনতা পুঁজি হিসেবে ব্যবহৃত ?

কেননা পৃথিবীতে যৌনতাই একমাত্র ব্যাপার যাতে ক্ষুদ্রতা নেই

সংস্কৃতির

ঐতিহ্যের

ধর্মের, জাতির

ঐশ্বর্যের

দেশের, প্রথার, সংস্কারের এবং আইনের ।

অবচেতনার টুঁটি চেপে ধরার জন্যেই যৌনতাকে পুঁজি করা হয় ।

যৌনমাংসের তেল-তেল গন্ধ ছাড়া  এই সমাজে কোনো বিজ্ঞাপন সফল নয় এবং কোও কাজই টকটকে যোনির ফাঁদ না পেতে করিয়ে নেয়া সম্ভব নয় । প্রতিটি পদক্ষেপে অবশ্যম্ভাবী যৌনজাল কেননা এই সমাজ-ব্যবস্হা ক্রেতা-বিক্রেতার তৈরি ।

মানুষ এবং/অথবা মানুষী এই সংস্কৃতিতে হয়ে ওঠে প্রতীক বা বস্তু, অর্থাৎ জীবন বদলে যায় ‘জিনিস’-জড়পদার্থে ।

যৌনজীবন যদি হয়ে ওঠে সহজ সরল স্বাভাবিক, তাহলে এই সিঁড়ি-বিভাজিত সংস্কৃতি ধ্বসে পড়বে, আর ওই সুবিধা-লোটার-দল তাদের ফাঁপা অন্তর্জগতের মুখোমুখি হয়ে পড়বে ।

তাই জন্যে যৌনতার র‌্যাশনিং

তাইজন্যে ধীরেসুস্হে যৌনবিষের ফেনা

তাইজন্যে পরিপূর্ণ যৌন-উপলব্ধি বারণ

তাইজন্যে যৌনতাকে স্বাভাবিক করতে দেয়া হবে না,

তাই জন্যে পুঁজি ছাড়া অন্য কোনো রকমভাবে যৌনতাকে প্রয়োগ করতে দেয়া হয় না : কবিতায় তো কখনই নয় : কেননা কবিতার সঙ্গে কিছুই প্রতিযোগিতা করতে পারে না ।

শৈশব থেকেই সমাজের প্রতিটি ও তাবৎ মস্তিষ্ককে ভুল শিক্ষায় ভ্রষ্ট করা হয়, এবং এই নষ্টামিকে বলা হয় নৈতিকতা । শাসনকারী বুর্জোয়া সম্্রদায় জানে যে যতদিন এই অসুখকে নীতিজ্ঞান বলে চালানো যায়, আর যে কোনোভাবে মধ্যবিত্তের ভেতরে এটা ছড়িয়ে দেয়া যায়, তাদের কর্তৃত্ব বহাল থাকবে ।


উচ্চবিত্ত টাকা-খুনিরা সাহিত্যে যৌনতার অন্য প্রয়োগ অশ্লীল ঘোষণা করবে, কেন না আইনগত ও সামাজিক উপায়ে তারা জঘন্য হিংস্রতায় নিজের শত্রুদের নিশ্চিহ্ণ করবে যাতে যৌনতাকে পুঁজি ছাড়া অন্য উপায়ে ব্যবহার করা না হয় ।

বুর্জোয়ারা যাকে অশ্লীল বলে, আমি ইচ্ছে করে তাইই লিখবো, যাতে যৌনতাকে পুঁজি হিসেবে ব্যবহারের ব্যাপারটা ধ্বংস ও ছারখার করে দিতে পারি ।

যৌনতা মানবিক ;

মেধাশক্তিই অনাক্রম্য ; যা অনাক্রম্য তা নীতিজ্ঞান ।

আমি যৌনতাকে ‘জিনিস’ হিসেবে প্রয়োগ করতে দেবো না । সেনসর পদ্ধতি সেই ভয় থেকে জন্মায় যাকে নীৎশে বলেছেন ‘যূথের নীতিজ্ঞান’ ।

বুর্জোয়াদের দাবি যে, কোনো বই বা কবিতা পড়ে মানুষ ও সমাজ ‘কলুষিত এবং বিকৃত’ হয়ে উঠবে কারণ তাতে যৌনতাকে স্বাভাবিকতা দেয়া হয়েছে । 


আমি, মলয় রায়চৌধুরী, জন্ম ১১ কার্তিক

আমি অশ্লীলতা সমর্থন করি,

আমি জানি, কলকাতার বুর্জোয়া দুর্বৃত্তরা 

আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ছকে ফেলেছে,

আমার তাতে কিছু যায় আসে না ।

এই সভ্যতার পতন কেউ থামাতে পারবে না

আমি ভবিষ্যৎবাণী করছি ।

আমার যেমন ইচ্ছে আমি সেরকমভাবে লিখবো, এবং সমগ্র বাঙালি মানবসমাজের শব্দভাঁড়ারে নিজেকে চুবিয়ে দেবো।

আমার সমস্ত শরীর যা ভাবে, আমি সেটাই ভাববো

আর যারা জানতে চায় তাদের জানাবো

কিংবা কাউকে

যে এই কথাগুলো জানার জন্যে জন্মাবে ।

আমি কবিতাকে জীবনে ফিরিয়ে দিতে চাই ।

জীবনে যা-কিছু আছে তার সমস্তই থাকবে কবিতার অস্ত্রাগারে ।

শুক্রবার

শম্ভু রক্ষিত-এর কবিতা : 'আমার জ্বর, আমার অসুখ'

 

শম্ভু রক্ষিত-এর কবিতা : আমার জ্বর, আমার অসুখ

কেবল স্বপ্নের সেই পেরাম্বুলেটার এবং শিশুর মুখটা মনে আছে । আর কোনো স্বপ্নের কথা মনেই পড়ে না অথচ সেদিন শুধু উষ্ণ রোদে উলঙ্গ শরীরটা ছড়িয়ে দিয়ে নীল মাছিটা দেখতে দেখতে বেলা বাড়ছিল, বেলা কাটছিল ।

************************

আমি সর্বক্ষণ ঘোলাডাঙায় গিয়ে ঘর নেবার কথা ভাবি এখন সিনেমা দেখে আমার বাড়ি ফেরার সময় হয়ে গিয়েছে । অথবা বাড়ি ফেরার সময় । এখন আমার বুকটা ধুক-ধুক করছে কেন কে জানে।

************************

মরা কুকুর গরু বাছুরের জন্য মিউনিসিপালিটির ঠেলা গাড়ি আছে । আমি কেন মরা মানুষের কথা ভাবতে পারি না ? আমি কেন মিউনিসিপালিটির ঠেলাগাড়ির কথা ভাবতে পারি না ?

*************************

দুহাতে কপাল চাপড়ানোর সময় শেষ হয়ে গেছে । এখন আমার কেবল ভাবনা।

কেবল ভাবনা ! অথচ আমার স্বপ্ন কিচ্ছু নয় -- শুধু বাউণ্ডুলেনা । এখন আমার আঙুলের ফাঁকে কেন সিগারেট জ্বলছে না ? এখন আমি কেন ঢোল-ডগরে কেন ঘা দিচ্ছি না ? কেন ?

**************************

করবী ফুলেরও কিছু শ্রম হয় । এখন আমার ইস্ত্রি করা পোষাক । আমার ক্রোধ কেবল ভদ্রতার অন্ধকার । এখন আমার উথ্থান নেই । এখন আমি শুয়ে আছি । বারোটা-তেরোটা বেজেই চলেছে । এখন আমি চা-মেশানো ভদ্রতার কথা কেন ভাবতে পারি না ? আমার সময়ের ওল্টানো দূরবীনে গম্বুজ মিনার কেন দেখতে পারি না ? কেন ?

***************************

কেবল রেড রোড, রেসকোর্স, ইডেন গার্ডেন, রাজভবন, মিছিল, কেবল রেড রোড, রেসকোর্স, ইডেন গার্ডেন, রাজভবন, হাড় ; কেবল দূরের, সব দূরের দূরের দূরের ।

[ ষাটের দশকে হাংরি আন্দোলনের পত্রিকা “জেব্রা”-র দ্বিতীয় সংখ্যায় প্রকাশিত]

বৃহস্পতিবার

হাংরি জেনারেশন আন্দোলন নিয়ে '২২শে শ্রাবণ' ফিল্মে সৃজিৎ মুখোপাধ্যায়ের খিল্লি



হাংরি আন্দোলনকে ফিল্মে খিল্লি করেছিলেন সৃজিৎ মুখোপাধ্যায় তাঁর বাইশে শ্রাবণ-এ । কোনও প্রয়োজন ছিল না অথচ তিনি গৌতম ঘোষকে একজন হাংরি কবি হিসেবে তুলে ধরলেন যার লেখা নাকি কোথাও ছাপা হয় না আর যার বুদ্ধিবিভ্রম ঘটে গেছে ।  হাংরি আন্দোলন এই সিনেমায় এসেছে হাংরিয়ালিস্ট কবি নিবারণ চক্রবর্তী’র হাত ধরে। মানসিক বিকারগ্রস্থ এই কবি  হাংরি আন্দোলনকে নিজের মধ্যে ধরে রেখেছেন এবং কিছুটা মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে গভীর রাতে এলোমেলো ভাবে ঘুরে বেড়ান, সেলফোনে তাঁর কবিতার বইয়ের প্রকাশক রবীন্দ্রনাথের সাথে কথা বলেন, কবিতা আবৃত্তি করে শোনান রাতের মাতালদের। এই কবি পুলিশের খাতায় তালিকাভুক্ত,  কলকাতা বইমেলায় আগুন ধরিয়ে দেয়ার অপরাধে।  এই অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত শেষ পর্যন্ত মানসিক হাসপাতালে হয়েছিল। কোলকাতা শহরে ঘটে যাওয়া সিরিয়াল কিলিঙ একসময় এই কবির দিকেই আঙ্গুল তুলে ধরে। 
লোকটা কেমন হাংরি, যার বন্ধুবান্ধব নেই, দল নেই, কফি হাউসে যায় না, খালাসিটোলায় যায় না, বন্ধুদের নিয়ে হ্‌ইচই করে না, মধুসূদনের সমাধিতে খালাসিটোলায় বারদুয়ারিতে হাওড়া স্টেশনে নিমতলা শ্মশানে কফি হাউসে দাঁড়িয়ে জোরে-জোরে কবিতা পড়ে বন্ধুদের শোনায় না, মাদক নেয় না, নিজেদের দলের পত্রিকা নেই, নিজেই লিফলেটে ছাপাবার বদলে একজন খোচরের ওপর নির্ভর করে কবিতা প্রকাশের জন্য ! প্রসঙ্গত আমি প্রকাশ করতুম ‘জেব্রা’, সুবিমল বসাক ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’, অরুণেশ ঘোষ ‘জিরাফ’, দেবী রায় ‘চিহ্ণ’, ত্রিদিব ও আলো মিত্র ‘উন্মার্গ’ আর The Waste Paper,  প্রদীপ চৌধুরী ‘ফুঃ’, শৈলেশ্বর ঘোষ ‘ক্ষুধার্ত’, সুভাষ ঘোষ ‘ক্ষুধার্ত খবর’ এবং পরে অলোক গোস্বামী প্রকাশ করতেন ‘কনসেনট্রেশন ক্যাম্প’।  ফিল্মে কয়েকজন হাংরি আন্দোলনকারীর নামও উল্লেখ করা হয়েছে চরিত্রটাকে আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রমাণ করার জন্য ! এই ফিল্মের কারণে দর্শকদের কাছেও হাংরি আন্দোলন হয়ে উঠেছিল খিল্লি করার ব্যাপার । পরাবাস্তব আন্দোলন, ডাডা আন্দোলন, বিট আন্দোলন, র‌্যাঁবো-ভেরলেন নিয়ে যেসমস্ত ফিল্ম তৈরি হয়েছে তাতে তাঁদের খিল্লি করা হয়নি।

হাংরি জেনারেশন আন্দোলন নিয়ে গৌতম চক্রবর্তীর খিল্লি



আনন্দবাজার পত্রিকায় ১৬ জুন ২০১৩ তারিখে গৌতম চক্রবর্তী হাংরি আন্দোলন সম্পর্কে এই কথাগুলো লিখেছিলেন ; তাতেও রয়েছে খিল্লি, যা তিনি পরাবাস্তববাদীদের সম্পর্কে কখনও করেছেন কিনা জানি না । উনি লিখেছিলেন :
“মানুষ, ঈশ্বর, গণতন্ত্র ও বিজ্ঞান পরাজিত হয়ে গেছে। কবিতা এখন একমাত্র আশ্রয়।... এখন কবিতা রচিত হয় অর্গ্যাজমের মতো স্বতঃস্ফূর্তিতে।
১৯৬২ সালে এই ভাষাতেই কলেজ স্ট্রিট কফি হাউস থেকে খালাসিটোলা, বারদুয়ারি অবধি সর্বত্র গোপন বিপ্লবী আন্দোলনের ব্লু প্রিন্টের মতো ছড়িয়ে পড়ে একটি ম্যানিফেস্টো। ২৬৯ নেতাজি সুভাষ রোড, হাওড়া থেকে প্রকাশিত এই ম্যানিফেস্টোর ওপরে লেখা ‘হাংরি জেনারেশন’। নীচের লাইনে তিনটি নাম। ‘স্রষ্টা: মলয় রায়চৌধুরী। নেতৃত্ব: শক্তি চট্টোপাধ্যায়। সম্পাদনা: দেবী রায়।’
তখনও কলেজ স্ট্রিটের বাতাসে আসেনি বারুদের গন্ধ, দেওয়ালে লেখা হয়নি ‘সত্তরের দশক মুক্তির দশক’। কিন্তু পঞ্চাশ পেরিয়ে-যাওয়া এই ম্যানিফেস্টোর গুরুত্ব অন্যত্র। এর আগে ‘ভারতী’, ‘কবিতা’, ‘কৃত্তিবাস’, ‘শতভিষা’ অনেক কবিতার কাগজ ছিল, সেগুলি ঘিরে কবিরা সংঘবদ্ধও হতেন। কিন্তু এই ভাবে সাইক্লোস্টাইল-করা ম্যানিফেস্টোয় আগে কখনও ছড়ায়নি বাংলা কবিতা।
ওটি হাংরি আন্দোলনের দ্বিতীয় ম্যানিফেস্টো। প্রথম ম্যানিফেস্টোটি বেরিয়েছিল তার কয়েক মাস আগে, ১৯৬১ সালের নভেম্বর মাসে। ইংরেজিতে লেখা সেই ম্যানিফেস্টো জানায়, কবিতা সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে যায় না, বিভ্রমের বাগানে পুনরায় বৃক্ষরোপণ করে না। ‘Poetry is no more a civilizing manoeuvre, a replanting of bamboozled gardens.’ বিশ্বায়নের ঢের আগে ইংরেজি ভাষাতেই প্রথম ম্যানিফেস্টো লিখেছিলেন হাংরি কবিরা। কারণ, পটনার বাসিন্দা মলয় রায়চৌধুরী ম্যানিফেস্টোটি লিখেছিলেন। পটনায় বাংলা ছাপাখানা ছিল না, ফলে ইংরেজি।
দুটি ম্যানিফেস্টোতেই শেষ হল না ইতিহাস। হাংরি আসলে সেই আন্দোলন, যার কোনও কেন্দ্র নেই। ফলে শহরে, মফস্সলে যে কোনও কবিই বের করতে পারেন তাঁর বুলেটিন। ১৯৬৮ সালে শৈলেশ্বর ঘোষ তাঁর ‘মুক্ত কবিতার ইসতাহার’-এ ছাপিয়ে দিলেন ‘সমস্ত ভন্ডামির চেহারা মেলে ধরা’, ‘শিল্প নামক তথাকথিত ভূষিমালে বিশ্বাস না করা’, ‘প্রতিষ্ঠানকে ঘৃণা করা’, ‘সভ্যতার নোনা পলেস্তারা মুখ থেকে তুলে ফেলা’ ইত্যাদি ২৮টি প্রতিজ্ঞা। পরে বন্ধুদের মধ্যে ঝগড়া বাধবে। মলয় ব্যাংকের চাকরি নিয়ে বাইরে চলে যাবেন। শৈলেশ্বর, সুবো আচার্য এবং প্রদীপ চৌধুরীরা বলবেন, ‘মলয় বুর্জোয়া সুখ ও সিকিয়োরিটির লোভে আন্দোলন ছেড়ে চলে গিয়েছে।’কী রকম লিখতেন হাংরিরা? বছর দুয়েক আগে সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের ‘বাইশে শ্রাবণ’ ছবিতে গৌতম ঘোষের চরিত্রটি লেখা হয়েছিল হাংরি কবিদের আদলে।
‘জেগে ওঠে পুরুষাঙ্গ নেশার জন্য হাড় মাস রক্ত ঘিলু শুরু করে কান্নাকাটি
মনের বৃন্দাবনে পাড়াতুতো দিদি বোন বউদিদের সঙ্গে শুরু হয় পরকীয়া প্রেম’,
লিখেছিলেন অকালপ্রয়াত ফালগুনী রায়। র‌্যাঁবো, উইলিয়াম বারোজ এবং হেনরি মিলারের উদাহরণ বারে বারেই টেনেছেন হাংরিরা। ঘটনা, এঁরা যত না ভাল কবিতা লিখেছেন, তার চেয়েও বেশি ঝগড়া করেছেন। এবং তার চেয়েও বেশি বার গাঁজা, এলএসডি, মেস্কালিন আর অ্যাম্ফিটোমাইন ট্রিপে গিয়েছেন।
অতএব, সাররিয়ালিজ্ম বা অন্য শিল্প আন্দোলনের মতো বাঙালি কবিদের ম্যানিফেস্টোটি কোনও দিন গুরুত্বপূর্ণ হয়নি। কিন্তু ‘হাংরি’রা আজও মিথ। এক সময় ‘মুখোশ খুলে ফেলুন’ বলে তৎকালীন মন্ত্রী, আমলা, সম্পাদকদের বাড়িতে ডাকযোগে তাঁরা মুখোশ পাঠিয়ে দিয়েছেন। আবার এক সময় ‘প্রচন্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতাটি লেখার জন্য অশ্লীলতার মামলা হল মলয় রায়চৌধুরীর বিরুদ্ধে। উৎপলকুমার বসু, সুবিমল বসাকের বিরুদ্ধে জারি হল গ্রেফতারি পরোয়ানা।
রাষ্ট্র ও আদালত কী ভাবে কবিতাকে দেখে, সেই প্রতর্কে ঢুকতে হলে ১৯৬৫ সালে মলয় রায়চৌধুরীর বিরুদ্ধে মামলাটি সম্পর্কে জানা জরুরি। শক্তি চট্টোপাধ্যায় কাঠগড়ায় উঠেছেন মলয়ের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে। পাবলিক প্রসিকিউটরের জিজ্ঞাসা, ‘প্রচন্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতাটা পড়ে আপনার কী মনে হয়েছে?
শক্তি: ভাল লাগেনি।
প্রসিকিউটর: অবসিন কি? ভাল লাগেনি বলতে আপনি কী বোঝাতে চাইছেন?
শক্তি: ভাল লাগেনি মানে জাস্ট ভাল লাগেনি। কোনও কবিতা পড়তে ভাল লাগে, আবার কোনওটা ভাল লাগে না।
শক্তি সাক্ষ্য দিয়েছিলেন মলয়ের বিরুদ্ধে। কয়েক মাস পরে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় মলয়ের সমর্থনে...
প্রসিকিউটর: কবিতাটা কি অশ্লীল মনে হচ্ছে?
সুনীল: কই, না তো। আমার তো বেশ ভাল লাগছে। বেশ ভাল লিখেছে।
প্রসিকিউটর: আপনার শরীরে বা মনে খারাপ কিছু ঘটছে?
সুনীল: না, তা কেন হবে? কবিতা পড়লে সে সব কিছু হয় না।
একই মামলায় শক্তি ও সুনীল পরস্পরের বিরুদ্ধে। তার চেয়েও বড় কথা, ’৬৫ সালে এই সাক্ষ্য দেওয়ার আগের বছরই সুনীল আইওয়া থেকে মলয়কে বেশ কড়া একটি চিঠি দিয়েছিলেন, ‘লেখার বদলে আন্দোলন ও হাঙ্গামা করার দিকেই তোমার ঝোঁক বেশি। রাত্রে তোমার ঘুম হয় তো? মনে হয়, খুব একটা শর্টকাট খ্যাতি পাবার লোভ তোমার।’ ব্যক্তিগত চিঠিতে অনুজপ্রতিম মলয়কে ধমকাচ্ছেন, কিন্তু আদালতে তাঁর পাশে গিয়েই দাঁড়াচ্ছেন। সম্ভবত, বন্ধু-শত্রু নির্বিশেষে অনুজ কবিদের কাছে সুনীলের ‘সুনীলদা’ হয়ে ওঠা হাংরি মামলা থেকেই। প্রবাদপ্রতিম কৃত্তিবাসী বন্ধুত্বের নীচে যে কত চোরাবালি ছিল, তা বোঝা যায় উৎপলকুমার বসুকে লেখা সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের একটি চিঠি থেকে, ‘প্রিয় উৎপল, একদিন আসুন।...আপনি তো আর শক্তির মতো ধান্দায় ঘোরেন না।’
তা হলে কি হাংরি আন্দোলন বাংলা সাহিত্যে প্রভাবহীন, শুধুই কেচ্ছাদার জমজমাট এক পাদটীকা? দুটি কথা। হাংরিদের প্রভাবেই কবিতা-সংক্রান্ত লিটল ম্যাগগুলির ‘কৃত্তিবাস’, ‘শতভিষা’ গোছের নাম বদলে যায়। আসে ‘ক্ষুধার্ত’, ‘জেব্রা’, ‘ফুঃ’-এর মতো কাগজ। সেখানে কবিতায় বাঁকাচোরা ইটালিক্স, মোটাদাগের বোল্ড ইত্যাদি হরেক রকমের টাইপোগ্রাফি ব্যবহৃত হত। পরবর্তী কালে সুবিমল মিশ্রের মতো অনেকেই নিজেকে হাংরি বলবেন না, বলবেন ‘শুধুই ছোট কাগজের লেখক’। কিন্তু তাঁদের গল্প, উপন্যাসেও আসবে সেই টাইপোগ্রাফিক বিভিন্নতা। তৈরি হবে শ্রুতি ও শাস্ত্রবিরোধী আন্দোলন। হাংরিরা না এলে কি নব্বইয়ের দশকেও হানা দিতেন পুরন্দর ভাট?
আসলে, ম্যানিফেস্টোর মধ্যেই ছিল মৃত্যুঘণ্টা। ’৬২ সালে হাংরিদের প্রথম বাংলা ম্যানিফেস্টোর শেষ লাইন, ‘কবিতা সতীর মতো চরিত্রহীনা, প্রিয়তমার মতো যোনিহীনা ও ঈশ্বরীর মতো অনুষ্মেষিণী।’ হাংরিরা নিজেদের যত না সাহিত্যবিপ্লবী মনে করেছেন, তার চেয়েও বেশি যৌনবিপ্লবী।”
গৌতম চক্রবর্তী লেখেননি যে ম্যানিফেস্টো আর বুলেটিনগুলো সেন্ট্রাল অ্যাভেনিউ কফি হাউস, আনন্দবাজার, যুগান্তর, কবিতা ভবন, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, প্রেসিডেন্সি, স্কটিশ, আশুতোষ, সিটি কলেজ ইত্যাদিতেও  বিলি করা হয়েছিল এবং পাঠানো হয়েছিল ব্রিটিশ লাইব্রেরি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে।

শনিবার

মলয় রায়চৌধুরীর কিছু উক্তি

মলয় রায়চৌধুরীর কিছু উক্তি ( ২০১০ )
কবিতা লিখলে গালমন্দ খেতেই হবে ।
***
যারা ছবি আঁকে তারা নিজেদের বলে চিত্রশিল্পী । কেউ নিজেকে ভুলেও কবিশিল্পী বলে না ।
 যারা পাঁঠা কাটে তাদের কসাইশিল্পী বলা হবে না কেন ? কসাই তো কেমন তুলি চালাবার
 মতন করে চপার চালায় ।
***
শিল্পের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা কবিতা রচনার প্রথম শর্ত।
***
এককালে বাংলাভাষায় বাণিজ্য হতো ; এখন বাংলাভাষায় কেবল পদ্য লেখা যায় কিংবা সংবাদপত্রের গুলগল্প।
***
মৃত্যুকে আবিষ্কারই প্রেম ; প্রেম আবিষ্কারই কবিতা ; কবিতা আবিষ্কারই মৃত্যু
***
যৌনতা হল মেটাফর । প্রেম হলো ক্যাটাসট্রফি ।
***
শাঁখের আওয়াজকেও গোঙানিতে বদলে ফেলতে পারা যায় । সেই গোঙানিটা মৃত শাঁখের ।
***
ভাষা তো অবলা নয় যা নারীকে অবলা বলব ।
***
কবিতা প্লুরাল, তাই একটা কবিতার অনেক মানে হতে পারে । আবার কোনো মানে নাও হতে পারে ।
***
ভাষা ফ্যাসিবাদের সহায়ক ।
***
কোনো-কোনো কুষ্ঠরোগি ভিক্ষা চাইবার সময়ে ছুঁয়ে দিয়ে ভয় দেখাতে চায় ।
***
আমি ২৯ নভেম্বর বিয়ের প্রস্তাব দিই আর চৌঠা ডিসেম্বর বিয়ে করি, যাতে প্রেমের হলকার মধ্যেই
 পরস্পরকে খুঁজে নিতে পারি ।
***
মানুষ ভাষাকে প্রতিক্রিয়াশীল করে তুলেছে ।
***
সবচেয়ে মিষ্টি বৃষ্টি হলো যা তাড়া করেও ধরতে পারে না ।
***
মালার্মে আর রিলকের যতো উল্লেখ তিরিশের দশকে হতো তা আর লিটল ম্যাগাজিনে দেখা যায় না ।
 ওনাদের কবিতার বিশেষ অনুবাদও হয় না । আসলে বাংলা কবিতার পৃথিবীতে ওনাদের কবিতা খাপ খায় না ।
***
যতোও তর্কাতর্কি হোক, কবিতাপাঠ অনুষ্ঠান হোক, কবিতা আর মেইনস্ট্রিম বৌদ্ধিক ব্যাপার নয় ।
 এটা এখন বিশেষজ্ঞদের জগত ; এই জগতে ভূমিকম্প হলেও তা এর বাইরের লোকেরা জানতে পারে না ।
 তবে এই জগতের পুরুতদেরও সাংস্কৃতিক মর্যাদা আছে । কেউ দুর্গাপুজোর পুরুত, আবার কেউ মনসা,
 শেতলা, শনিঠাকুরের পুরুত ।
***
নেপালে যখন ছিলুম, হাত দিয়ে চটকে মশলা মিশিয়ে তৈরি মোষের কাঁচা মাংস ‘কচিলা’ আর তার সঙ্গে
 ‘রাকসি’ মদ খেতুম । খেড় বেছানো অন্ধকার ঘরে ফিরে গুহাবাসীদের আনন্দে ফিরে যেতুম, 
পঁচিশ হাজার বছর পেছনে । মাওবাদীরা হয়তো সেই জন্য দুটোই বেআইনি করে দিয়েছে ; 
মানুষকে এগিয়ে যেতে হবে । কিন্তু কোথায় ? ইউরোপের ‘এনলাইটেনমেন্টে’ !
***
ইটভাটার বধুয়া মজুরদের যখন ছাড়িয়ে স্বাধীনতা দেয়া হল, তখন তাদের প্রথম প্রশ্ন ছিল, 
“হুজুর, আমাদের খাওয়াবে কে?”
***
যুবতী শোকাতুরাকে জড়িয়ে মৃতকে ভুলে জীবিতার দেহতাপ পাওয়াও বেঁচে থাকার রসদ ।
***
তাকিয়ে পাথরপ্রতিমা করে দেবার সৌন্দর্যবোধ কেবল কবিদের থাকে ।
***
প্রাচীন গ্রিসের দেবতাদের মূর্তির লিঙ্গ ছোটো আর ন্যাতানো হতো । রাক্ষসদের লিঙ্গ বড়ো 
আর দাঁড়ানো গড়া হতো । ওনাদের দেবতাদের মূর্তির প্রশংসা করার বদলে আমরা রাক্ষসদের
 ঈর্ষা করার নান্দনিক যুগে পৌঁছে গেছি ।
***
আয়নাও পারা ঝরিয়ে নতুন বউয়ের স্মৃতি ভুলে যায় ।
***
গন্তব্য আর তীর্থ দুটো আলাদা পথবিন্দু ।
***
বসন্তঋতুর সঙ্গে একাত্ম হবার প্রয়াস সম্পর্ককে অনৈতিক করে তুলতে পারে ।
***
প্রতিটি মৃত্যুদণ্ডের নিজস্ব রূপকথা হয় ।
***
লিখনভঙ্গিমা সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন হয়ে পানাপুকুরে গোসাপের সাঁতার ।
***
স্কুল বালকেরা পরীক্ষার খাতায় কলমের নার্ভাস নাচের প্র্যাকটিস দেখতে পায় ।
***
শত্রুতা শেখা দরকার মাকড়সাদের থেকে ; ওইটুকু মাকড়সা অথচ শত্রুদের মুখে থুতু ছিটিয়ে
 কি বিশাল জালের ফাঁদ পেতে রাখে ।
***
রাতে পেচ্ছাপ করতে উঠলে আলো জ্বালি না, ঘুমের ট্যাবলেটের রেশ যাতে ফুরিয়ে না যায় । 
কিন্ত পেচ্ছাপ পড়ার আওয়াজে কান রাখতে গিয়ে ঘুমটা চটে যায় । তার ওপর বাইরে পড়লে 
সকালে উঠে ধুতে হবে, কেননা আমিই প্রথম উঠি । প্রাকঔপনিবেশিক আর উত্তরঔপনিবেশিকের খিচুড়িজীবন ।
***
মধ্যবিত্ত বাঙালির বিড়ি খাওয়ায় কি এলিটিজম নেই ?
***
খালাসিটোলা থেকে বেরিয়ে গোরুর মাংসের গরম-গরম শিক-কাবাব খাবার প্রস্তাব দিলেই 
সুভাষ ঘোষ আর শৈলেশ্বর ঘোষ পালিয়ে উধাও হয়ে যেতো । তার আগে পর্যন্ত মাতাল ।
***
হিন্দি ভাষার কবি রাজকমল চৌধুরীর সঙ্গে ওর গ্রাম মাহিষীতে গিয়েছিলুম, ছিন্নমস্তার পুজোয় ;
 সেদিন একের পর এক মোষ বলি চলছে, আর আমরা দিশিমদ ঠররা খেয়ে রক্ত মেখে বেহেড, 
মাংস খাওয়া আর নাচানাচি হবে রাতে । সেই রাতেই মনে হয়েছিল ‘অস্তিত্ববাদ’ দর্শনটা এক্কেবারে 
অভারতীয়, কলোনিয়াল ; লোকে কি করে যে কামু-সার্ত্রের নাম জপ করে বেড়ায় !
***
যিনি নিজেকে ঈশ্বরবিশ্বাসী বলে বিজ্ঞাপিত করেন, তিনি যখন ঈশ্বরের সমর্থনে বাগাড়ম্বর ফাঁদেন, 
তখন  আঁচ করতে পারি যে তাঁর ঈশ্বরবিশ্বাস ভুয়ো ।
***
কাউকে ভালোবাসার সময়ে কেউ কি ভাবে যে, “আমি অমুককে ভালোবাসি ?” অথচ ছাড়াছাড়ির পর ভাবে,
 “আমি অমুককে ভালোবাসতুম ।”
***
সংবাদপত্র পড়া আর টিভিতে সংবাদ দেখার পজিটিভ দিক হলো যে, আমরা স্বস্তি পাই, 
আমাদের চারিপাশে হাজার-হাজার মূর্খ এই সমাজের বিভিন্ন স্তরে বাস করে ।
***
টিভির অ্যাঙ্কর ( অ্যাঙ্করিণী ? ) তরুণীরা বুড়ো দর্শকদেরও বলে, “সঙ্গে থাকুন” । কেমন অশ্লীল ডাক ।
***
ফৌজদারি আদালতে, হাজতে, জেলের পাল্লায় না পড়লে দেশকে, দেশের মানুষদের, জানা যায় না ।
***
নর্দমায়, মাঠে, নদীর ধারে না হাগলে শিক্ষিত মানুষের জীবনবোধ হবার সম্ভাবনা কম ।
***
প্রথম সঙ্গমের আগে পর্যন্ত যে রহস্যময়ী অচেনা, সে চেনা রহস্যময়ী হয়ে ওঠে প্রতিবারের রুটিনে ।
***
বেঁচে থাকার উদ্দেশ্য বলে আলাদা কিছু হয় না । বেঁচে থাকাটাই বেঁচে থাকার উদ্দেশ্য ।
***
যতোই চেষ্টা করা হোক, দুঃখকে অতিক্রম করা অসম্ভব ।
***
শৈশব থেকে দেখছি, লাউডস্পিকারের ডেসিবল বেড়েই চলেছে ; অথচ সব আওয়াজই মানেহীন ।
***
ফোন করে স্বপ্নে আসতে চাইছেন এক যুবতী-কবি । তিনি কবি । মাতাল ।
***
স্বপ্ন মাত্রেই পোস্টমডার্ন, তাদের অরৈখিক রাইজোম্যাটিক প্লটের কারণে ।
***
দেবীরা সবাই রোগের ( শীতলা, মনসা, পর্ণশর্বরী, ধূমাবতী ) আর দেবতারা সবাই চিকিৎসক
 ( ধন্বন্তরী, ধাত্রী, অশ্বিনীভাইরা ) । কেন ?
***
যদি না চোখে-চোখে রাখা হয়, তাহলে পুলিশ স্টেট হয়ে ওঠার জন্য গণতন্ত্রের মাটি সবচেয়ে নরম ।
***
এখন কবির নাম দেখে আঁচ করা যায় নামের নিচে কবিতাটা কেমন হবে। বছর শেষেও কোনো 
বিশেষ বাঁকবদল পাওয়া যায় না । যেন কবিতা আর কবির চাকরিতে পার্থক্য নেই ।
***
সঙ্গমের চেয়ে যোনির দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকার আনন্দ বেশি ।
***
জলাতঙ্ক রোগটা কুকুরেরা মানুষের কাছ থেকে পেয়েছে ।
***
বয়স হয়ে গেলেও বাসুদেব দাশগুপ্ত সোনাগাছির বেবি-দীপ্তি-মীরাদের মাংসের আকর্ষণ ছাড়তে পারেনি। 
দাদার কাছে এসে ভায়াগ্রা যোগাড় করে দিতে বলতো ।
***
সুভাষ ঘোষ মধ্যবিত্ত মূল্যবোধ থেকে বেরোতে পারেনি, হাংরি আন্দোলনের সময়েও।
 সোনাগাছিতে গিয়ে কারোর ঘরে ঢুকে তক্ষুনি বেরিয়ে এসে বলতো. লিঙ্গ দাঁড়াচ্ছে না ।
***
“আমি ও বনবিহারী” ( ২০০০ ) বইটার জন্য অকাদেমি পুরস্কার পেয়েছিলেন প্রতিষ্ঠানবিরোধী লেখক
 সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় । উৎসর্গ করেছিলেন, “কবি, নাট্যকার ও মন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে” । 
আসলে উৎসর্গ করেছিলেন কবি নাট্যকার ও বনবিহারীকে, ভবিষ্যতে অবস্হা কী হতে চলেছে তা 
আগাম আঁচ করে ।
***
ক্যাথলিক মূল্যবোধে বেড়ে-ওঠা লেখকের টেক্সটের গভীরে কতোটা যেতে পারেন এমন সমালোচক 
যিনি হিন্দু পরিবারে জন্মেছেন, হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজে বসবাস করেছেন ?
***
সিপিএম-এর দমবন্ধ-করা কালখণ্ডে, কাফকাকে নিয়ে লিখেছেন মূলত বামপন্হীরা, যখন কিনা 
যাঁদের দম বন্ধ হয়ে আসছিল, কাফকা সম্পর্কে লেখা উচিত ছিল তাঁদের ।
***
প্রলেতারিয়েতের সঙ্গে একাত্ম বোধ করার জন্য বের্তোল্ত ব্রেখত দিনের পর দিন স্নান করতেন না,
 দাঁত মাজতেন না, পোশাক পালটাতেন না । পশ্চিমবঙ্গে তো কেউই বোধহয় প্রলেতারিয়েতের সঙ্গে 
কখনও একাত্ম বোধ করেনি ।
***
আমার কখনও ‘লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইট’ হয়নি ; প্রতিবার ‘লাভ অ্যাট ফার্স্ট টাচ’ হয়েছে ।
***
কবিতার জন্য নিয়তিকে বশে আনতে হয় ।
***
প্রতিশোধের ষড়যন্ত্রকে জিইয়ে রাখা জরুরি কেননা তা জখমকে তাজা রাখে ।
***
দেশভাগের পর, পশ্চিমবাংলাকে যাঁরা বদলাতে চেয়েছেন, সাহিত্যিক বুদ্ধিজীবি রাজনীতিক সমাজবেত্তা,
 তাঁরা কেউই নিজেকে বদলাতে চাননি ।
***
দেবী রায়কে সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় লিখেছিলেন, “হাংরি আন্দোলনের একটা সিমবল তৈরি করে নিতে এবং 
পাঁচ পয়সা দাম রাখতে ।” যেই পুলিশের ধরপাকড় আরম্ভ হল উনি সরকারি সাক্ষী হয়ে লিখে দিলেন যে 
হাংরি আন্দোলনের সঙ্গে ওনার কোনো সম্পর্ক নেই ।
***
আমার যে কুষ্ঠি-ঠিকুজি মা তৈরি করিয়েছিলেন, তার সমস্ত ভবিষ্যবাণীকে ভুল প্রমাণ করে দিয়েছি ।
***
যে যুবতী নিজেকে কুৎসিত বলে মনে করেন, তাঁর আত্মচিন্তা সম্পর্কে ধারণা করা অসম্ভব ।
***
প্রচণ্ড বৃষ্টিতে সবুজ ঘাসের ওপরে সঙ্গমের তুলনা হয় না । যেমন শরৎকালের জ্যোৎস্নায় ফাঁকা মাঠে 
জোনাকিদের মাঝে উলঙ্গ প্রেমিক-প্রেমিকার নাচ ।
***
প্রেম তখনই সফল যখন তা প্রেমিক আর প্রেমিকা দুজনকেই একযোগে ধ্বংস করে দ্যায় ।
***
কবির প্রতিষ্ঠা অন্য কবিদের ঈর্ষায় লুকিয়ে । অগ্রজ লেখকেরা ঈর্ষা করার মাধ্যমে অনুজ লেখকদের 
স্বীকৃতি দেন
***
তুমি যাকে ঘৃণা করছ সে যদি তা জানতে না পারে তাহলে ঘৃণা করার কোনো মানে হয় না ।
***
পরস্পরের ভাষা না জানলে, সঙ্গমের রহস্য আরও গভীর হয়ে ওঠে ।
***
প্রকৃত সুন্দরীর দিকে দ্বিতীয়বার তাকালে সৌন্দর্যের পরিভাষা যৌনতায় পালটে যায় ।
***
মানুষ পৃথিবীর প্রতি অপার বিরক্তি নিয়ে জন্মায় ; তাই সে জন্মেই কাঁদতে আরম্ভ করে ।
***
নাগরিকদের দুঃখ-কষ্ট-যন্ত্রণা দেবার জন্যই রাষ্ট্রের অস্তিত্ব ।
***
অপবাদ আকর্ষণ করার ক্ষমতা না থাকলে জীবদ্দশায় একজন কবির খ্যাতি বৃথা ।
***
যেকোনো ব্যাপার তোমাকে নষ্ট করে দিতে পারে, তা অসাধারণ কবিতা হোক বা অপরূপা প্রেমিকা ।
***
বইমেলায় লিটল ম্যাগাজিন বিভাগে মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের স্যাঙাত হয়ে পেছন-পেছন হাঁটছিলেন 
সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় । আমায় দেখে হাত তুললেন, অর্থাৎ দ্যাখো, আমি কোথায় পৌঁছেছি । দেখলুম ।
 জানি না ওনার মৃতদেহ নন্দন চত্ত্বরে রাখা হয়েছিল কিনা, একুশ বন্দুকের সেলামি দেয়া হয়েছিল কিনা । 
ওনার প্রতিদ্বন্দ্বী সুনীলের মৃতদেহ রাখা হয়েছিল, আর শক্তিকে শ্মশানে সেলামি দেয়া হয়েছিল ।
***
কখনও সাহিত্য-আলোচকদের মনের মতন লেখার চেষ্টা করা উচিত নয় । নিজের মনের মতন লিখতে গেলে 
রিস্ক নিতেই হবে ।
***
সৌরমণ্ডলের বাইরের মানুষদের কথা যখনই চিন্তা করা হয়, তখন তাদের কুৎসিত দেখানো হয় কেন ? 
তারা হয়তো ঐশ্বর্য রায় বচ্চন আর ঋতিক রোশনের চেয়ে ভালো দেখতে ।
***
পৃথিবীতে বসবাস করার মতো জায়গা আর রইলো না । এরকম জায়গা মগজে আসতে থাকলে, 
বুঝতে হবে মৃত্যু বেশ কাছাকাছি
***
কতোগুলো অঘটন মগজে পূঞ্জিভূত হলে একটা কবিতা চিন্তায় খেলতে আরম্ভ করে ?
***
কোনো-কোনো কবিতা মধু খেয়ে, ফেলে চলে যাওয়া, মৌমাছির চাকের মতন । মধুর খোঁজে মোম প্রাপ্তি ।
***
তোমার লিঙ্গও সঠিক সময়ে তোমার নির্দেশ মানতে অস্বীকার করতে পারে ।
***
ক্ষমা করার আগে গভীর ভাবে খতিয়ে দেখা উচিত ।
***
এই বয়সে কোনো যুবতী ভালোবাসার প্রস্তাব জানালে অমঙ্গলের আশঙ্কায় আক্রান্ত হই ।
***
জীবন সম্পর্কে কথা বলা প্রায় অসম্ভব কেননা বাংলা ভাষায় তার জন্য সঠিক অভিব্যক্তি 
এখনও পাওয়া যায় না ।
***
আমি ভাগ্যবান যে আয়নাকে ঘৃণা করার দরকার হয় না । আমার টাক পড়েনি ; কখনও পড়বেও না ।
***
মানব সম্প্রদায়ের মুক্তির তাত্বিকরা শেষ পর্যন্ত গণহত্যাকারীতে রূপান্তরিত হয় ।
***
সবচেয়ে বাজে আবিষ্কার হল লাউডস্পিকার, বিশেষ করে যখন তা সাম্প্রদায়িক বিশ্বাসের দানব হয়ে ওঠে ।
***
কবিতা মনের বিশৃঙ্খলাকে কয়েদ করে ।
***
প্রতিটি শব্দেই যদি ক্রিয়া লুকিয়ে থাকে, তাহলে একটিমাত্র সত্য বলে কিছু হয় না ; যা হয় তা হল কর্ম । 
ক্রিয়াপদে নিহিত থাকে কর্মশক্তি ।
***
সুভাষ ঘোষ আর শৈলেশ্বর ঘোষ মারা যাবার আগে অনেক চেলা তৈরি করে গেছে দেখছি ।
 ওরা দুজনে মুচলেকা দিয়ে রাজসাক্ষী হয়েছিল বললেই চেলারা রাস্তার ঘেয়ো কুকুরের হাঁমুখ খুলে 
কামড়াতে আসে ।
***
এখনকার কবিতা অর্থবহ ‘পাবলিক ইডিয়ম’ গড়ে তুলতে পারেনি ।
***
আদালতের জজরাই যখন সন্দেহের ঊর্দ্ধে নন বলে বিধায়করা দাবি করছেন, তখন সাহিত্যের 
বিচারকরা কোন যুক্তিতে সন্দেহের ঊর্দ্ধে ?
***
ব্যর্থ বিপ্লবী বিদেশে গিয়ে মার্ক্সের কবর দেখতে যান । ব্যর্থ কবি বিদেশে গিয়ে বদল্যারের কবর দেখতে যান।
***
“কোথায়” জায়গাটা ঠিক কোথায় ?
***
দাদাকে লেখা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের চিঠির অংশ, “যে কারণে আমি আনন্দবাজারে সমালোচনায় বাজে 
বইকে ভালো লিখি -- সেই কারণেই মলয়ের লেখাকে ভালো বলেছি”।
***
এককালে যারা অবক্ষয়বিরোধী ছিল তারাই বঙ্গসমাজে অবক্ষয় নিয়ে এলো ।
***
বক্সিং ম্যাচ যারা দেখতে যায় তারা হার-জিতের মাধ্যমে জীবনের সমস্যাগুলোর সমাধান খোঁজে ।
***
“পবিত্র বই” আর “অপবিত্র বই”-এর পার্থক্য হল যে “অপবিত্র বই” কেবলমাত্র কবিরাই লিখতে পারেন ।
***
গ্ল্যামারের আকর্ষণ হল ক্যাটওয়াকের শেষে যুবতীদের সমবেত ঘামের গন্ধ, যা অত্যন্ত দামি পারফিউম
 দিয়েও চাপা পড়ে না ।
***
সকলেই ভাবে ‘পৌঁছে গেছি’ । পেছন ফিরে তাকিয়ে টের পায় যেখানে সে দাঁড়িয়েছিল সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে।
***
কেউ আমাকে ঘৃণা করলে তা উপভোগ করি ।
***
পশুরা জানতেই পারল না যে মানুষ সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী ।
***
ধর্ম যে উদ্দেশ্যহীন এবং ভাঁওতা তা সবচেয়ে ভালো করে জানে সেই বুড়োগুলো যারা নারী ও কিশোরদের
 মানববোমা তৈরি করে পাঠায় ।
***
প্রগতির একরৈখিক ধারণা  প্রিমিটিভ ।
***
বাজার-করা আর ভোট-দেওয়া ছাড়া নাগরিকের কোনো সম্পর্ক আছে কি সমাজ আর রাষ্ট্রের সঙ্গে ?
***
দেশভাগের আগে পূর্ববঙ্গের যে সাম্যবাদীরা দেশভাগ সমর্থন করেছিল, তারাই ১৫ই আগস্ট ১৯৪৭-এর অনেক 
আগে ভারতে পালিয়ে এসেছিল । তাদের কি তকমা দেয়া উচিত ? বিশ্বাসঘাতক !
***
“প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার” কবিতাটি হল  Confessions of pain ; যে কবিরা এই কবিতাটিকে হিংসে করেন,
 তাঁরা প্রকৃতপক্ষে আমার যন্ত্রণাবোধকে হিংসে করেন ।
***
লেসবিয়ানরা  পুরুষাঙ্গের মুখমেহন করতে পান না বলে কি ‘পেনিস এনভি’ পুষে রাখেন ? 
***
প্রতিশোধস্পৃহা জন্মায় উন্মদের মস্তিষ্কে, অথচ উন্মাদনা ছাড়া কবিতা লেখা যায় না ।
***
তুমি যদি নার্সিসিস্ট না হও, তাহলে তুমি আধুনিক কবি নও ।
***
বাঙালির ‘মধ্যমেধা’ নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের অনেকে চেঁচামেচি করেন । যদি সকলেই ‘মধ্যমেধা’ হতো তাহলে বিদেশে
 কারা পালিয়ে গিয়ে বসবাস করছে ?
***
ভালো মানুষের পক্ষে ভালো বন্ধু পাওয়া অত্যন্ত কঠিন ।
***
আশাবাদ : লক্ষ বছর আগে মরে গিয়েছে যে নক্ষত্র তার আলো এখন এসে পৌঁছেচে পৃথিবীতে ।
***
মরে গেলে আত্মার সদ্গতির জন্য শোকপ্রকাশ করবেন না ; আমার আত্মা নেই । 
আমার গ্রন্হগুলোর আত্মা আছে ।
***
কবিতার উৎস কোনো-না-কোনো রহস্য যার উন্মোচন অন্য উপায়ে সম্ভব নয় ।
***
গাঙচিল নামে এক প্রকাশনা সংস্হার কর্ণধার বললেন যে, “আপনার বই তো  বুদ্ধদেব গুহর মতন বিকোয় না,
 তাই প্রকাশ করতে পারব না ।”
***
যার নির্বাণ কিংবা মহানির্বাণ ঘটে সে তা জানতে পারে না । তাহলে নির্বাণ বলতে কী বোঝায় ?
***
যোনিকে ফর্সা করে তোলার বিজ্ঞাপন প্রায়ই দেখি টিভিতে । যোনি কালো হোক বা ফর্সা তাতে প্রেমিকের কীই বা 
এসে যায় !
***
জোয়ার, ভাটা, এল নিনো, নিম্নচাপ, ঘূর্ণাবর্ত, বন্যা ! জলের অসুখ হল প্রকৃতির জলাতঙ্ক ।
***
সব ধর্মের পুরোহিতরাই নানা রকমের আচরণ করেন । দেখে মনে হয় বাচ্চাদের খেলা । 
তাই বোধহয় ধর্মগুলোয় নানা খোকোনপ্রিয় গাঁজাখুরি গল্প গড়ে ওঠে ।
***
ভারতে অনেক পরিবার হাজার বছর ধরে গরিব । তবু তারা হাতে অস্ত্র তুলে নেয় না কেন ? 
জাতপাতের বর্ণবিভাজনের কারণে !
***
অন্ধকারে বিছানাকে আরণ্যক বধ্যভূমি করে তোলাই ফুলশয্যা ।
***
রাস্তায় অচেনা মানুষদের ভিড়ে গা-ঘেঁষাঘেষি করে হাঁটার সময়ে একাকীত্বকে যেভাবে উপভোগ করি,
 সেভাবে একা ঘরের কোনে বসে হয় না ।
***
পাশা খেলায়, মানে জুয়ায়, যুধিষ্ঠির কখনও জিততে পারেননি, তবু কেন শকুনি চরিত্রের প্রয়োজন ?
***
যে লোকটা ভয়ে কখনও কোনো মাদক নেয়নি সে গাঁজাটানার বিরোধীতা করবেই ।
***
এক-একজন মানুষকে একবার দেখলেই টের পাওয়া যায় তার মগজে সাভানার কোন জন্তুদের উৎপাত চলছে ।
***
জীবনে একবার অন্তত আকুল কামলালসায় আক্রান্ত হবার অভিজ্ঞতা জরুরি ।
***
পরস্পরবিরোধিতা আর অনিশ্চয়তার সম্ভাবনাকে একযোগে ধরে ফেলতে পারে কবিতা ।
***
কেউ যদি জানতে চায় যে লিফ্টে আমি কার সঙ্গে আটক হতে চাইব ? আমার উত্তর হবে কোনো 
নেয়ানডারথাল তরুণীর সঙ্গে, তার কারণ সে জানে না যে প্রেম কাকে বলে ।
***
প্রেম শেষপর্যন্ত অনীহা, উদাসীনতা, গতানুগতিকতা, অমনোযোগ, একঘেয়েমিতে পৌঁছে ফুরিয়ে যায় ।
***
বিশ্বাসঘাতকরা মরবার আগে আত্মসন্মানহীন শিষ্যদের তৈরি করে যায়, যারা মৃতের গোলামি করে বেঁচে থাকে ।
***
যে লোক তোমার সঙ্গে ছলনা করেছে সে চিরকাল তোমার বিরুদ্ধে কথা বলবে, এবং সে যদি লেখক হয় 
তাহলে তোমার বিরুদ্ধে লিখবে ।
***
জীবনে একবার কেউ-না-কেউ পিঠে ছুরি মারবেই, আর সে-আঘাত কখনও সারবে না ।
***
বিশুদ্ধ ক্ষমতার লোভ থেকে গুণ্ডা এবং রাজনেতাদের জন্ম ।
***
মেয়েদের ভগাঙ্কুর কেটে ফেলার প্রধান উদ্দেশ্য তাদের যৌনসুখ থেকে বঞ্চিত করা । 
সউদি আরবে এই প্রথা তুলে দেয়া হয়েছে কেননা আব্রাহামিক ধর্মগ্রন্হে কেবল পুরুষের খতনা
 সম্পর্কে নির্দেশ আছে ।
***
বিষয়-সম্পত্তির জন্য মানুষ-মানুষীর এতো লোভ হয় কেন ? ভবিষ্যতের জন্য নয় । 
যখন মানুষ গুহাবাসী ছিল তখন গুহার দখলিসত্ত্ব নিয়ে লড়াই করতে হতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে
 আত্মরক্ষা করার জন্য । সেই প্রাগেতিহাসিক মানুষ ঘাপটি মেরে থাকে বেশির ভাগ মানুষের চরিত্রে ।
***
বুড়ো বয়সের একটা ফোটো পোস্ট করেছিলুম ম্যাট্রিমনিয়াল সাইটে, একথা জানিয়ে যে পেনশনে
 টিকে আছি এবং মুম্বাইতে থাকি । বহু তরুণী প্রোপোজাল পাঠিয়েছেন ! কী কারণ হতে পারে ? 
বাবা-প্রেমিক চাই ? মুম্বাইতে ছাদ চাই ? 
***
অনেক পরিচিত মানুষ-মানুষী স্বপ্নে বারবার আসেন, অথচ আমি চাই না তাঁরা আসুন । 
বোঝা যায় যে প্রতিটি ব্যাপারে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হতে পারে না ।
***
আমি লিখি গল্পহীন গল্প ; অনেকে তাকেও ছোটোগল্প বলে মনে করেন ।
***
সৃজনশীল মানুষের অধঃপতনের অভিজ্ঞতা হওয়া জরুরি, কেননা তা জ্যোতিষ্কদের হয়, পশুদের হয় না ।
***
সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়কে লেখা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ১৫ জুন ১৯৬৪-এর চিঠি থেকে : 
“সন্দীপন, আপনি অনেকদিন কিছু লেখেননি, প্রায় বছর তিনেক । তার বদলে আপনি কুচোকাচা গদ্য
 ছাপিয়ে চলেছেন এখানে-সেখানে । সেই স্বভাবই আপনাকে টেনে নিয়ে যায় হাংরির হাঙ্গামায় । 
আমি বারণ করেছিলাম । আপনি কখনও আমাকে বিশ্বাস করেননি । ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছিলেন । 
আমি শক্তিকে কখনও বারণ করিনি, কারণ আর যত গুণই থাক --- শক্তি লোভী । 
শেষ পর্যন্ত উৎপলও ওই কারণে যায়।”
***
স্বমেহন আর কবিতার একটা যোগসূত্র আছে । দুটোই একই বয়সে আরম্ভ হয় ।
***
টাক ঢেকে রাখার জন্য জুলিয়াস সিজার সব সময় অলিভ পাতার মুকুট পরে থাকতেন, 
ঘুমোবার সময় ছাড়া । তাঁকে যখন সেনেটররা ছোরা মারছিলেন, তখনও তিনি মুকুট সামলাচ্ছিলেন ।
***
দে’জ থেকে একটা “হাংরি জেনারেশন সংকলন” প্রকাশিত হয়েছে, তাতে শঙ্খ ঘোষের লেখাও অন্তর্ভুক্ত ! 
এই সংকলনে এমন অনেকের লেখা আছে যারা হাংরি আন্দোলনের সময়ে মায়ের কোলে ছিল ।
***
চে গ্বেভারার কবর খুঁজে পাওয়া গিয়েছে, তাতে ওনার কেটে নেয়া হাত দুটো ছিল না ; 
হাত দুটো সংরক্ষণের জন্য কিউবায় পাঠানো হয়েছিল, কিন্তু সেখান থেকেও হারিয়ে গিয়েছে ।
***
যাদের বাড়ির ভেতরেই পায়খানা থাকে তাদের প্রলেতারিয়েত বলা চলে কি ?
***
বাতাসের ঘ্রাণশক্তি ঝড়কে আমিষাশী করে তোলে ।
***
দীর্ঘশ্বাস হলো রাতের উড়ন্ত একাকী দাঁড়কাক ।
***
চাষিকে খেতছাড়া, মজুরকে কারখানা-ছাড়া, গেরস্হকে ঘরছাড়া করার মাধ্যমে যারা 
বিপ্লব করতে চায় তারা সময়ের ল্যাঙ খেয়ে কুপোকাৎ হবেই ।
***
বাল বা ঝাঁট অনেকের কানেও হয় । তারা বেশ সন্দেহজনক ।
***
যোনির সঙ্গে প্রসববেদনার সম্পর্ক । কিন্তু বহু তরুণী প্রসবযন্ত্রণা ভোগের সুযোগ পান না ।
***
আইভিএফ করে বউ-এর বাচ্চা হয়েছে । কবির শুক্রসংখ্যা কম । উনি আর প্রেমের কবিতা লেখেন না ।
***
জার্মানির মতন ভারতেও বেশ্যাবৃত্তিকে আইনের স্বীকৃতি দেয়া দরকার । তাদের নিয়মিত ডাক্তারি 
পরীক্ষাও দরকার । তাহলে রেপের সংখ্যা কমবে বলে অনুমান করা যেতে পারে ।
***
ভারতে খৃষ্টধর্মীরা শবে ফরম্যালিন মাখিয়ে তিনচার বছর রেখে দিচ্ছেন, গোরস্তান পাবার আশায় ।
 ইউরোপে কিন্তু ইনসিনারেটার প্রয়োগের সংখ্যা বেড়ে গেছে ।
***
মারাঠি কবি অরুণ কোলটকার একজন পার্সি তরুণীকে বিয়ে করেছিলেন । 
পার্সি সমাজ সেই বিয়েকে স্বীকৃতি দেয়নি । দুই ধর্মের বিয়েতে ব্যাগড়া দেয় দুটো সমাজ, আর
 এটা ভারতেই সবচেয়ে বেশি ।
***
রামকৃষ্ণ পরমহংসকে নিয়মিত চুল আর দাড়ি ছাঁটাতে হতো । 
চৈতন্যদেবকে নিয়মিত দাড়ি আর মাথা কামাতে হতো । 
***
রাজকমল চৌধুরীর মাহিষী গ্রামে মোষ বলি দিয়ে তার রক্ত মেখে সবাইকে নাচতে দেখে আমিও 
তাই করেছিলুম । পরে ব্যাপারটা যখনই মনে পড়েছে, ভেবেছি যে কেমন করে আমিও ওই পাল্লায় পড়েছিলুম ।
***
গাঁজা আর চরস ফুঁকে তার নেশায় যারা আটকে পড়ে তারা মূর্খ । ওগুলো ইচ্ছেমতো ছেড়ে দেয়া যায় । 
মদের নেশা ধরে ফেললে ছাড়ানো কঠিন হয়ে দাঁড়ায় ।
***
বাবা প্রতিটি চিঠিতে লিখতেন, “ঈশ্বরে বিশ্বাস রাখবি, তাহলে কেউ তোর কিছু করতে পারবে না।”
 মা কিন্তু কোনো চিঠিতে ঈশ্বরের উল্লেখ করতেন না । 
***
আমার মেয়ে আর নাতনিরা ঈশ্বরে বিশ্বাস করে না, গরু-শুয়োরের মাংস খায়, আফ্রিকার বুশমিট খায় । 
***
আমার ছেলে হিন্দুর যাবতীয় দেবী-দেবতায় বিশ্বাস করে, যদিও সে আর তার বউও গরু-শুয়োরের মাংস খায় ।
***
আমার স্ত্রী ভগবানে বিশ্বাস করে কিন্তু ভগবান বলতে যে কী বোঝায় তার ব্যাখ্যা করতে পারে না ।
 গরুর মাংস খায় । খাবার পর বলতে থাকে, গরুর মাংস কেন যে খেলুম ।
***
অতিরাজসিক রাজ্যে, কী হবে চামউকুনে থিকথিকে অলিভমুকুটে ?
***
বোবার গুষ্টি ছাড়া আর কেই হলপ করে না ।
***
পাঁকে হাঁটতে যে ঘেন্না হয় তা পায়ের নয় ; তা মগজের ।
***
বুড়ো হলে মুখে জমে থাকে পরতের পর পরত বয়স, তাই তা আর রহস্যময় থাকে না ।
***
সধবার শব সাজাবার বিউটিশিয়ানরা বউ সাজাবার চেয়ে বেশি চার্জ করে মূলত দেহতাপের পার্থক্যের দরুন ।