বাংলা সাহিত্যে ষাটের দশকের হাংরি জেনারেশনের ন্যায় আর কোনও আন্দোলন তার পূর্বে হয় নাই । হাজার বছরের বাংলা ভাষায় এই একটিমাত্র আন্দোলন যা কেবল সাহিত্যের নয় সম্পূর্ণ সমাজের ভিত্তিতে আঘাত ঘটাতে পেরেছিল, পরিবর্তন আনতে পেরেছিল। পরবর্তীকালে তরুণ সাহিত্যিক ও সম্পাদকদের সাহস যোগাতে পেরেছে ।
১ ) হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের প্রথম ও প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো তাঁরা সাহিত্যকে পণ্য হিসাবে চিহ্ণিত করতে অস্বীকার করেছিলেন । কেবল তাই নয় ; তাঁরা এক পৃষ্ঠার লিফলেট প্রকাশ করতেন ও বিনামূল্যে আগ্রহীদের মাঝে বিতরণ করতেন । তাঁরাই প্রথম ফোলডার-কবিতা, পোস্ট-কার্ড কবিতা, ও পোস্টারে কবিতা ও কবিতার পংক্তির সূত্রপাত করেন । পোস্টার এঁকে দিতেন অনিল করঞ্জাই ও করুণানিধান মুখোপাধ্যায় । ফোলডারে স্কেচ আঁকতেন সুবিমল বসাক । ত্রিদিব মিত্র তাঁর ‘উন্মার্গ’ পত্রিকার প্রচ্ছদ নিজে আঁকতেন। পরবর্তীকালে দুই বাংলাতে তাঁদের প্রভাব পরিলক্ষিত হয় ।
২ ) হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ অবদান প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা । তাঁদের আগমনের পূর্বে প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা করার কথা সাহিত্যকরা চিন্তা করেন নাই । সুভাষ ঘোষ বলেছেন প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার অর্থ সরকার বিরোধিতা নয়, সংবাদপত্র বিরোধিতা নয় ; হাংরি জেনারেশনের বিরোধ প্রচলিত সাহিত্যের মৌরসি পাট্টাকে উৎখাত করে নবতম মূল্যবোধ সঞ্চারিত করার । নবতম শৈলী, প্রতিদিনের বুলি, পথচারীর ভাষা, ছোটোলোকের কথার ধরণ, ডিকশন, উদ্দেশ্য, শব্দ ব্যবহার, চিন্তা ইত্যাদি । পশ্চিমবঙ্গে বামপন্হী সরকার সত্বেও বামপন্হী কবিরা মধ্যবিত্ত মূল্যবোধ থেকে নিষ্কৃতি পান নাই । শ্রমিকের কথ্য-ভাষা, বুলি, গালাগাল, ঝগড়ার অব্যয় তাঁরা নিজেদের রচনায় প্রয়োগ করেন নাই । তা প্রথম করেন হাংরি জেনারেশনের কবি ও লেখকগন ; উল্লেখ্য হলেন অবনী ধর, শৈলেশ্বর ঘোষ, সুবিমল বসাক, ত্রিদিব মিত্র প্রমুখ । সুবিমল বসাকের পূর্বে ‘বাঙাল ভাষায়’ কেউ কবিতা ও উপন্যাস লেখেন নাই। হাংরি জেনারেশনের পরবর্তী দশকগুলিতে লিটল ম্যাগাজিনের লেখক ও কবিদের রচনায় এই প্রভাব স্পষ্ট ।
৩ ) হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের তৃতীয় অবদান কবিতা ও গল্প-উপন্যাসে ভাষাকে ল্যাবিরিনথাইন করে প্রয়োগ করা । এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ মলয় রায়চৌধুরীর কবিতা ও গল্প-উপন্যাস । মলয় রায়চৌধুরী সর্বপ্রথম পশ্চিমবাংলার সমাজে ডিসটোপিয়ার প্রসঙ্গ উথ্থাপন করেন । বামপন্হীগণ যখন ইউটোপিয়ার স্বপ্ন প্রচার করছিলেন সেই সময়ে মলয় রায়চৌধুরী চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেন ডিসটোপিয়ার দরবারি কাঠামো ।উল্লেখ্য তাঁর নভেলা ‘ঘোগ’, ‘জঙ্গলরোমিও’, গল্প ‘জিন্নতুলবিলদের রূপকথা’, ‘অরূপ তোমার এঁটোকাঁটা’ ইত্যাদি । তিনি বর্ধমানের সাঁইবাড়ির ঘটনা নিয়ে রবীন্দ্রনাথের ‘ক্ষুধিত পাষাণ’ অবলম্বনে লেখেন ‘আরেকবারে ক্ষুধিত পাষাণ’ । বাঙাল ভাষায় লিখিত সুবিমল বসাকের কবিতাগুলিও উল্লেখ্য । পরবর্তী দশকের লিটল ম্যাগাজিনের কবি ও লেখকদের রচনায় এই প্রভাব সুস্পষ্ট ।
৪ ) হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের চতুর্থ অবদান হলো পত্রিকার নামকরণে বৈপ্লবিক পরিবর্তন । হাংরি জেনারেশনের পূর্বে পত্রিকাগুলির নামকরণ হতো ‘কবিতা’, ‘কৃত্তিবাস’, ‘উত্তরসূরী’, ‘শতভিষা’, ‘পূর্বাশা’ ইত্যাদি যা ছিল মধ্যবিত্ত মূল্যবোধের বহিঃপ্রকাশ । হাংরি জেনারেশন আন্দোলনকারীগণ পত্রিকার নামকরণ করলেন ‘জেব্রা’, ‘জিরাফ’, ‘ধৃতরাষ্ট্র’, ‘উন্মার্গ’, ‘প্রতিদ্বন্দী’ ইত্যাদি । পরবর্তীকালে তার বিপুল প্রভাব পড়েছে । পত্রিকার নামকরণে সম্পূর্ণ ভিন্নপথ আবিষ্কৃত হয়েছে ।
৫ ) হাংরি জেনারেশন আন্দোলনে সর্বপ্রথম সাবঅলটার্ন অথবা নিম্নবর্গের লেখকদের গুরুত্ব প্রদান করতে দেখা গিয়েছিল । ‘কবিতা’, ‘ধ্রুপদি’, ‘কৃত্তিবাস’, ‘উত্তরসূরী’ ইত্যাদি পত্রিকায় নিম্নবর্গের কবিদের রচনা পাওয়া যায় না । হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের বুলেটিনগুলির সম্পাদক ছিলেন চাষি পরিবারের সন্তান হারাধন ধাড়া । সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়সহ তৎকালীন কবিরা তাঁর এমন সমালোচনা করেছিলেন যে তিনি এফিডেভিট করে ‘দেবী রায়’ নাম নিতে বাধ্য হন । এছাড়া আন্দোলনে ছিলেন নিম্নবর্গের চাষী পরিবারের শম্ভু রক্ষিত, তাঁতি পরিবারের সুবিমল বসাক, গয়লা পরিবারের সুভাষ ঘোষ, জাহাজের খালাসি অবনী ধর ইত্যাদি । পরবর্তীকালে প্রচুর নিম্নবর্গের কবি-লেখকগণকে বাংলা সাহিত্যের অঙ্গনে দেখা গেল।
৬ ) হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের ষষ্ঠ গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব হলো রচনায় যুক্তিবিপন্নতা, যুক্তির কেন্দ্রিকতা থেকে মুক্তি, যুক্তির বাইরে বেরোনোর প্রবণতা, আবেগের সমউপস্হিতি, কবিতার শুরু হওয়া ও শেষ হওয়াকে গুরুত্ব না দেয়া, ক্রমান্বয়হীনতা, যুক্তির দ্বৈরাজ্য, কেন্দ্রাভিগতা বহুরৈখিকতা ইত্যাদি । তাঁদের আন্দোলনের পূর্বে টেক্সটে দেখা গেছে যুক্তির প্রাধান্য, যুক্তির প্রশ্রয়, সিঁড়িভাঙা অঙ্কের মতন যুক্তি ধাপে-ধাপে এগোতো, কবিতায় থাকতো আদি-মধ্য-অন্ত, রচনা হতো একরৈখিক, কেন্দ্রাভিগ, স্বয়ংসম্পূর্ণতা ।
৭) হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের পূর্বে লেখক-কবিগণ আশাবাদে আচ্ছন্ন ছিলেন মূলত কমিউনিস্ট প্রভাবে । ইউটোপিয়ার স্বপ্ন দেখতেন । বাস্তব জগতের সঙ্গে তাঁরা বিচ্ছিন্ন ছিলেন । হাংরি জেনারেশন আন্দোলনকারীগণ প্রথমবার হেটেরোটোপিয়ার কথা বললেন ।
৮ ) হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের পূর্বে কবি-লেখকগণ মানেকে সুনিশ্চিত করতে চাইতেন, পরিমেয়তা ও মিতকথনের কথা বলতেন, কবির নির্ধারিত মানে থাকত এবং স্কুল কলেজের ছাত্ররা তার বাইরে যেতে পারতেন না । হাংরি জেনারেশনের লেখকগণ অফুরন্ত অর্থময়তা নিয়ে এলেন, মানের ধারণার প্রসার ঘটালেন, পাঠকের ওপর দায়িত্ব দিলেন রচনার অর্থময়তা নির্ধারণ করার, প্রচলিত ধারণা অস্বীকার করলেন । শৈলেশ্বর ঘোষের কবিতার সঙ্গে অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের কবিতার তুলনা করলে বিষয়টি স্পষ্ট হবে ।
৯ ) হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের পূর্বে ‘আমি’ থাকতো রচনার কেন্দ্রে, একক আমি থাকতো, লেখক-কবি ‘আমি’র নির্মাণ করতেন, তার পূর্বনির্ধারিত মানদণ্ড থাকতো, সীমার স্পষ্টিকরণ করতেন রচনাকার, আত্মপ্রসঙ্গ ছিল মূল প্রসঙ্গ, ‘আমি’র পেডিগ্রি পরিমাপ করতেন আলোচক। হাংরি জেনারেশন আন্দোলনকারীগণ নিয়ে এলেন একক আমির অনুপস্হিতি, আমির বন্ধুত্ব, মানদণ্ড ভেঙে ফেললেন তাঁরা, সীমা আবছা করে দিলেন, সংকরায়ন ঘটালেন, লিমিন্যালিটি নিয়ে এলেন ।
১০ ) হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের পূর্বে শিরোনাম দিয়ে বিষয়কেন্দ্র চিহ্ণিত করা হতো । বিষয় থাকতো রচনার কেন্দ্রে, একক মালিকানা ছিল, লেখক বা কবি ছিলেন টাইটেল হোলডার। হাংরি জেনারেশনের লেখক-কবিগণ শিরোনামকে বললেন রুবরিক ; শিরোনাম জরুরি নয়, রচনার বিষয়কেন্দ্র থাকে না, মালিকানা বিসর্জন দিলেন, ঘাসের মতো রাইজোম্যাটিক তাঁদের রচনা, বৃক্ষের মতন এককেন্দ্রী নয় । তাঁরা বললেন যে পাঠকই টাইটেল হোলডার।
১১ ) হাংরি জেনারেশনের পূর্বে কবিতা-গল্প-উপন্যাস রচিত হতো ঔপনিবেশিক মূল্যবোধ অনুযায়ী একরৈখিক রীতিতে । তাঁদের ছিল লিনিয়রিটি, দিশাগ্রস্ত লেখা, একক গলার জোর, কবিরা ধ্বনির মিল দিতেন, সময়কে মনে করতেন প্রগতি । এক রৈখিকতা এসেছিল ইহুদি ও খ্রিস্টান ধর্মগ্রন্হের কাহিনির অনুকরণে ; তাঁরা সময়কে মনে করতেন তা একটিমাত্র দিকে এগিয়ে চলেছে । আমাদের দেশে বহুকাল যাবত সেকারণে ইতিহাস রচিত হয়েছে কেবল দিল্লির সিংহাসন বদলের । সারা ভারত জুড়ে যে বিভিন্ন রাজ্য ছিল তাদের ইতিহাস অবহেলিত ছিল । বহুরৈখিকতারে প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো ‘মহাভারত’ । হাংরি জেনারেশনের কবি-লেখকগণ একরৈখিকতা বর্জন করে বহুরৈখিক রচনার সূত্রপাত ঘটালেন । যেমন সুবিমল বসাকের ‘ছাতামাথা’ উপন্যাস, মলয় রায়চৌধুরীর দীর্ঘ কবিতা ‘জখম’, সুভাষ ঘোষের গদ্যগ্রন্হ ‘আমার চাবি, ইত্যাদি । তাঁরা গ্রহণ করলেন প্লুরালিজম, বহুস্বরের আশ্রয়, দিকবিদিক গতিময়তা, হাংরি জেনারেশনের দেখাদেখি আটের দশক থেকে কবি ও লেখকরা বহুরৈখিক রচনা লিখতে আরম্ভ করলেন ।
১২ ) হাংরি জেনারেশনের পূর্বে মনে করা হতো কবি একজন বিশেষজ্ঞ । হাংরি জেনারেশনের কবিরা বললেন কবিত্ব হোমোসেপিয়েন্সের প্রজাতিগত বৈশিষ্ট্য ।
ষাটের
দশক। দেশভাগের পর পশ্চিম বাংলায় এক বিশৃঙ্খল অবস্থা। একদিকে সাম্প্রদায়িক
দাঙ্গার সাথে উদ্বাস্তু কলোনিতে বাড়ছে মানুষের ভিড়, অন্যদিকে স্বরাজের
স্বপ্নকে গুঁড়িয়ে চলছে স্বার্থ আর নোংরা রাজনীতির নগ্ন খেলা। ঠিক এই সময়
আবির্ভাব ঘটলো একদল তরুণ কবির। এক পাতার বুলেটিনে তারা জীবন, দর্শন,
রাজনীতি আর যৌনতা বিষয়ে কবিতা, গদ্য, অনুগল্প আর স্কেচ ছাপালো। তারপর কফি
হাউজ, পত্রিকা দপ্তর, কলেজের বাংলা বিভাগ আর লাইব্রেরি গিয়ে বিলি করতে
থাকলো হ্যান্ডবিল আকারে। কলকাতার মোড়গুলোতে দাঁড়িয়ে পাঠ করলো তাদের
রচনাগুলো। রচনাপাঠের জায়গাকে ঘিরে হাজারো মানুষের ভিড় জমে যায়। রবীন্দ্রনাথ
আর জীবনানন্দের ভক্ত বাঙালি এমন ধারার কবিতা আগে শোনেনি। কোনো কোনো কবিতার
প্রথম লাইনটাই ধাক্কা দিয়ে গেল- “তিন বিধবা গর্ভ করে শুয়ে আছি পুণ্য বিছানায়”। আবার কোনোটায় উঠে এলো বাস্তব জীবনের প্রহসন- “আমি খালি পেটে ইন্টারভ্যু দিতে গিয়ে বলে এলুম অর্থমন্ত্রীর কাকিমার নাম”।
বাংলা সাহিত্যকে এই প্রথমবারের মতো বুদ্ধিজীবীদের সভা থেকে নামিয়ে আনা হলো
রাস্তায়, সাধারণ মানুষের মাঝে। যে তরুণ কবিরা এই বিপ্লব ঘটালো, তারা
নিজেদের দাবি করল 'হাংরি জেনারেশন' হিসেবে। আর এই ক্ষুধার্ত কবিদের নেতৃত্ব
দিলেন ২১ বছরের এক তরুণ, মলয় রায়চৌধুরী; ভবিষ্যতে যিনি নিজের পরিচয় দিতে
গিয়ে বলবেন ‘একজন কালচারাল বাস্টার্ড’।
Advertisement
আন্দোলনের সময় মলয় রায়চৌধুরী; তবে
শুধু কবিতা লিখেই ক্ষান্ত হননি এই ক্ষুধার্ত কবির দল। ১৯৬৩ সালের কথা।
রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী, এমএলএ, সচিব, লেখক এবং সাংবাদিকরা পেতে থাকলেন
বিভিন্ন ধরনের মুখোশ। কোনোটা জন্তু-জানোয়ারের, কোনোটা দানবের। জোকার, মিকি
মাউস, দেবতা- কোনো ধরনের মুখোশই বাদ গেল না। প্রতিটি মুখোশের সাথে লেখা
থাকে, “দয়া করে মুখোশটা খুলে ফেলুন”। অন্যদিকে কবি সাহিত্যিকদের পাঠানো হলো বিয়ের কার্ড। তাতে লেখা "Fuck the Bastards of Gungshalik School of Poetry"।
মূলধারার বাণিজ্যিক পত্রিকাগুলোতে ছোটগল্পের নামে আসতে লাগল সাদা কাগজ, আর
বুক রিভিউয়ের জন্য পাঠানো হতো জুতোর বাক্স। প্রথাগত সাহিত্য আর সংস্কারের
বিরুদ্ধে ক্রমে আরও জোরদার হলো 'হাংরি মুভমেন্ট'। কখনো তারা একটি বইয়ের দাম
ধরলেন এক লক্ষ টাকা বা কয়েকটি টি বি সিল, আবার কখনো চিত্রপ্রদর্শনীর আয়োজন
করে শেষদিন পুড়িয়ে ফেললেন সমস্ত চিত্রকর্ম। কিন্তু প্রশাসনকে খেপিয়ে
হাংরিয়ালিস্টদের এই আন্দোলন বেশিদিন চলতে পারল না। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে
প্রথমবারের মতো ছয় কবির হাতে হাতকড়া পরানো হলো অশ্লীল রচনা আর
রাষ্ট্রদ্রোহিতার দায়ে। কিন্তু, সাহিত্য কি কখনো অশ্লীল হয়? নাকি এর
পুরোটাই ছিল প্রতিষ্ঠিত সমাজের মুখোশধারী ভীত সুশীল শ্রেণীর ষড়যন্ত্র? হাংরি
মুভমেন্টের কথা উঠে এসেছে চলচ্চিত্রেও। সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের 'বাইশে
শ্রাবণ' চলচ্চিত্রের নিবারণ চক্রবর্তীর কথা মনে আছে নিশ্চয়ই? নিবারণরূপী
গৌতম ঘোষকে সৃজিত হাজির করেছিলেন একজন হাংরিয়ালিস্ট কবির চরিত্রে। উদ্ধত,
অহংকারী আর খ্যাপাটে নিবারণ সিস্টেম নিয়ে বললেন- "একটা পঁচে যাওয়া সিস্টেম, প্রত্যেকটা মানুষ পঁচে যাওয়া। কয়েকটা লাশ ঘুরে বেড়াচ্ছে।”
এই সিস্টেমের সাথে হাংরি প্রজন্মের দ্বন্দ্ব ছিল প্রকাশ্য। হাংরিয়ালিস্ট
কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্ল সেনকে
উদ্দেশ্য করে লিখেছিলেন,
"কবিতা ভাতের মতো কেন লোকে নিতেই পারছে না যুদ্ধ বন্ধ হলে নেবে? ভিখারিও কবিতা বুঝেছে তুমি কেন বুঝবে না হে অধ্যাপক মুখ্যমন্ত্রী সেন?"
হাংরি আন্দোলনের ইশতেহার; Source: revolvy.comহাংরি
আন্দোলনকারীরা তাদের মুভমেন্টকে 'কালচারাল কাউন্টার' বলতেন। পশ্চিমা
বিশ্বে তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী একটি প্রজন্ম, কালচারাল কাউন্টার
ঘটিয়ে নতুনধারার এক সমাজের বীজ বুনে ফেলেছে। আমেরিকার 'বিট জেনারেশন' আর
ব্রিটেনের 'অ্যাংরি ইয়াংম্যান' গোষ্ঠির লেখকেরা মূলধারার
সাহিত্য-সংস্কৃতিতে আঘাত হেনে বিশ্বে জনপ্রিয়। অনেকে এজন্য হাংরি
জেনারেশনকে বিট জেনারেশনের সাথে তুলনা করলেন। বিট জেনারেশনের অনুপ্রেরণাতে
হোক বা যেভাবেই হোক না কেন, ১৯৬১ সালে পাটনা থেকে রীতিমতো ইশতেহার ছাপিয়ে
আন্দোলন শুরু করলেন মলয় রায়চৌধুরী। বিদ্রোহ ঘোষণা করলেন প্রচলিত ধারার
সাহিত্য আর সমাজ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে। কবিতার ইশতেহারে তিনি লিখলেন, “শিল্পের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা কবিতা সৃষ্টির প্রথম শর্ত”। লিখলেন, “এখন কবিতা রচিত হয় অরগ্যাজমের মতো স্বতঃস্ফূর্তিতে”। রাজনৈতিক ইশতেহারে বললেন,“রাজনৈতিক বিশ্বাসের চেহারা পালটে দেওয়া হবে”।
এই হাংরিয়ালিস্টদের ইশতেহারে লিড দিলেন উল্টোডাঙা বস্তির বাসিন্দা কবি
শক্তি চট্টোপাধ্যায়, আর প্রকাশক ও সম্পাদক হাওড়া বস্তিবাসী দেবী রায়। মলয়ের
বড় দাদা সমীর রায়চৌধুরী প্রথম জীবনে কৃত্তিবাসের সাথে যুক্ত থাকলেও এই
আন্দোলনে সম্পৃক্ত হন। হাংরি বুলেটিন ছাপানোর অধিকাংশ খরচ সমীরই দিতেন।
১৯৬২-৬৩ সালে হাংরি আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত হন বিনয় মজুমদার, সন্দীপন
চট্টোপাধ্যায়, উৎপলকুমার বসু, সুবিমল বসাক, ত্রিদিব মিত্র, ফালগুনী রায়,
আলো মিত্র, অনিল করঞ্জাই, রবীন্দ্র গুহ, সুভাষ ঘোষ, করুণাবিধান
মুখোপাধ্যায়, বাসুদেব দাশগুপ্ত, শৈলেশ্বর ঘোষ, হরনাথ ঘোষ, নীহার গুহ,
প্রদীপ চৌধুরী, সুবো আচার্য, অরুপরতন বসু, সতীন্দ্র ভৌমিক, অজিতকুমার
ভৌমিক, অশোক চট্টোপাধ্যায়, অমৃততনয় গুপ্ত, ভানু চট্টোপাধ্যায়, শংকর সেন,
যোগেশ পাণ্ডা, তপন দাশ, মনোহর দাশ, শম্ভু রক্ষিত, মিহির পাল, সুকুমার
মিত্র, দেবাশিষ মুখোপাধ্যায় প্রমুখ।
হাংরি
আন্দোলনের লেখকেরা। ঘড়ির কাঁটার অভিমুখে: শৈলেশ্বর ঘোষ, মলয় রায়চৌধুরী,
সুভাষ ঘোষ, বাসুদেব দাশগুপ্ত, ডেভিড গার্সিয়া এবং সুবিমল বসাক;মলয় এই আন্দোলনের ধারণা নিয়েছিলেন ইংরেজ কবি জিওফ্রে চসারের বাক্য “The Sour Hungry Time” আর জার্মান দার্শনিক অসওয়াল্ড স্পেংলারের ‘The Decline of the West’
গ্রন্থ থেকে। শৈলেশ্বর ঘোষের মতে, ‘হাংরি জেনারেশন’ শব্দটি প্রথম ব্যবহার
করেন শক্তি চট্টোপাধ্যায়। ১৯৬২ সালে বিনয় মজুমদারের কবিতার সমালোচনা করতে
গিয়ে শক্তি বলেছিলেন, বিদেশের সাহিত্যকেন্দ্রে যে ধরনের আন্দোলন চলছে, তেমন
আন্দোলন এখানে হলে তা কেবলমাত্র ক্ষুধা সংক্রান্ত হতে পারে। “ওদিকে ওদেশে সামাজিক অবস্হা অ্যাফ্লুয়েন্ট, ওরা বিট বা অ্যাংরি হতে পারে। আমরা কিন্তু ক্ষুধার্ত।”
শক্তির এই ক্ষুধা অবশ্য শুধু আক্ষরিক অর্থেই ক্ষুধা ছিল না। তা ছিল
সাহিত্যে মনের ভাব প্রকাশের ক্ষুধা, যথার্থ শব্দ প্রয়োগের ক্ষুধা, সৃষ্টির
আকাঙ্ক্ষা আর অবদমিত বাসনা পূরণের ক্ষুধা।
হাংরিয়ালিস্টদের
এই ক্ষুধার্ত কার্যক্রম বুঝতে হলে তাদের সামাজিক অবস্থাটা বুঝতে হবে। এই
হাংরি জেনারেশনের কবিরা শৈশব এবং কৈশোরে দেশভাগ দেখেছে। এদের একটি বড় অংশ
বেড়ে উঠেছিল পূর্ব বাংলা থেকে আগত উদ্বাস্তু পরিবারে। তাদের আর্থ-সামাজিক
নিরাপত্তা ছিল না। যারা পশ্চিমবঙ্গের ছিলেন, তাদেরও অনেকে বেড়ে উঠেছিলেন
মানবেতর পরিবেশে। এই লেখকেরা জীবনকে যেভাবে দেখেছেন, সেভাবেই কবিতায় ফুটিয়ে
তুলতে চেয়েছেন। কবিদের মধ্যে হাংরিরা কেবল মাইকেল মধুসূদন আর জীবনানন্দকে
শ্রদ্ধা করতেন। মলয় অবশ্য ভালোবাসতেন রবীন্দ্রনাথের গান। সেই সময় পশ্চিম
বাংলায় বামপন্থীরা সক্রিয়। কিন্তু এই হাংরি জেনারেশনকে আকৃষ্ট করতে পারলেন
না তারা। এই তরুণেরা মার্কসকেও নাকচ করে দিয়েছিলেন। মার্কসবাদের
সীমাবদ্ধতাগুলো সোভিয়েত ভাঙার ২৫ বছর পূর্বেই অনুধাবন করেছিলেন এই
বিপ্লবীরা। এবার তারা কবিতা, স্কেচ আর পোস্টারে তুলে আনলেন সমাজকে। ‘জখম’
কবিতায় মলয় লিখলেন-
“মানুষের দেয়া আইনানুগ মৃত্যুদণ্ড পেয়ে কেবল মানুষই মরে যাচ্ছে ফ্যাক্ট্রি আর বিবাহ দুটোরই রেজিস্ট্রি হয়ে চোলেছে নিয়মমাফিক কোল্কাতায় মদের ব্যবসা থেকে নৈতিক মাইনে পাচ্ছে ৪৫০০০ ডান হাত ১ একরে ১৩৫ জোড়া পায়ের ঠেসাঠেসি আরাম খাচ্ছে ১৯৬৫ মডেলের কোল্কাতা”
হাংরি ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে অনিল করঞ্জাইয়ের স্কেচ; হাংরি
মুভমেন্ট দ্রুতই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। দেশীয় পত্রিকাগুলো আন্দোলনকারীদের
নিয়ে মুখরোচক সব সংবাদ লিখে চলল। তাদের প্রতিষ্ঠানবিরোধী কর্মকাণ্ড
পত্রিকায় নিয়মিত ছাপতে থাকলো। শিরোনামে লিখলো: “হা-ঘরে সম্প্রদায়”, “কাব্যচর্চার নামে বিকৃত যৌনলালসা”, “সাহিত্যে বিটলেমি কী এবং কেন?”, "Erotic Lives & Loves of Hungry Generation"।
কলকাতা, বেনারস আর নেপাল গিয়ে হিপীনীদের সাথে তাদের অবাধ যৌনচর্চার বর্ণনা
ছাপালো কিছু সংবাদপত্র। হাংরিয়ানদের বিরুদ্ধে নানারকম অপপ্রচারও শুরু হল।
বলা হলো, তারা বিটনিকদের মতো মাদকাসক্ত।
প্রকৃতপক্ষে, হাংরিয়ালিস্টরা সৃজনশীলতা বৃদ্ধির আশায় মাদক নিতেন না।
ব্যক্তিবিশেষে মদ্যপান বা নেশাদ্রব্যের অভ্যাস থাকলেও তা আন্দোলনের সাথে
সামগ্রিকভাবে জড়িত ছিল না। হাংরি কবিদের বিকৃত যৌনতার ধারক বলেও চালানোর
চেষ্টা হলো। শৈলেশ্বর ঘোষ ও সুভাষ ঘোষ মেসে এক ঘরে থাকতেন, তাই ছড়ানো হল
তারা সমকামী। এভাবে সত্য-মিথ্যে মিশিয়ে গণমাধ্যমে নানাভাবে প্রচার চলতে
লাগল।
কল্লোল
আর কৃত্তিবাসী গোষ্ঠী যা পারেনি, হাংরিরা কিন্তু তা-ই করে দেখিয়েছিলেন।
হাংরি কবিতাগুলো বাকিদের চোখের সামনেই আমেরিকার লিটল ম্যাগাজিনগুলোতে
প্রকাশিত হচ্ছিলো। ১৯৬৪ সালের ১০ই জুন আমেরিকা থেকে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
মলয়কে চিঠি লিখলেন-
"কলকাতা শহরটা আমার, ফির গিয়ে
আমি ওখানে রাজত্ব করব। দু'একজন বন্ধুবান্ধব ওই দলে আছে বলে নিতান্ত
স্নেহবশতই তোমাদের হাংরি জেনারেশন গোড়ার দিকে ভেঙে দিইনি। এখনও সে ক্ষমতা
রাখি। লেখার বদলে হাঙ্গামা ও আন্দোলন করার দিকেই তোমার লক্ষ্য বেশি। যতো
খুশি আন্দোলন করো, বাংলা কবিতার এতে কিছু এসে যায় না ।"
হাংরিদের
এই অভ্যুত্থানে মূলধারার বাংলা কবিতায় পরিবর্তন হয়তো তাৎক্ষণিকভাবে দেখা
গেল না, কিন্তু প্রতিষ্ঠিত কবি-সাহিত্যিক আর প্রশাসনের হর্তাকর্তাদের
প্রতিক্রিয়াটা ঠিকই দেখা গেল। ১৯৬৫ সালের সেপ্টেম্বরে এগারো জন হাংরি
আন্দোলনকারীর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হলো। মলয় রায়চৌধুরী,
মলয়ের দাদা সমীর রায়চৌধুরী, দেবী রায়, সুভাষ ঘোষ, শৈলেশ্বর ঘোষ, প্রদীপ
চৌধুরী- এই ছয় কবিকে গ্রেপ্তার করলো পুলিশ। এই লেখকদের বাড়িঘর তল্লাশী করার
সময় পুলিশ বহু লেখা নষ্ট করলো। পাশাপাশি বই, ফাইল, টাইপরাইটার ইত্যাদিসহ
সব ধরনের কাগজপত্র উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া হলো। এগুলো আর কখনও ফেরত দেয়া হয়নি।
হাতে হাতকড়া আর কোমরে দড়ি বেঁধে রাস্তা দিয়ে হাঁটিয়ে আদালতে নেওয়া হয় মলয়
রায়চৌধুরীকে। জিজ্ঞাসাবাদের পর মলয় ছাড়া বাকিদের ছেড়ে দেওয়া হলো। মলয়ের
'প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার' নামের কবিতাটিকে অশ্লীল আখ্যা দিয়ে চার্জশিট গঠন
করল পুলিশ। মলয় লিখেছিলেন-
“আমাকে তোমার গর্ভে আমারই শুক্র থেকে জন্ম নিতে দাও আমার বাবা-মা অন্য হলেও কি আমি এরকম হতুম ? সম্পূর্ণ ভিন্ন এক শুক্র থেকে মলয় ওর্ফে আমি হতে পার্তুম ? আমার বাবার অন্য নারীর গর্ভে ঢুকেও কি মলয় হতুম ? শুভা না থাকলে আমিও কি পেশাদার ভদ্রলোক হতুম মৃত ভায়ের মতন ? ওঃ বলুক কেউ এসবের জবাবদিহি করুক শুভা, ওঃ শুভা তোমার সেলোফেন সতীচ্ছদের মধ্যে দিয়ে পৃথিবীটা দেখতে দাও আমায়”
তৎকালীন
পত্রিকা এই কবিতাকে 'বেহুদা' বললেও এই একটিমাত্র কবিতাই পরবর্তীতে সমগ্র
দক্ষিণ এশিয়া থেকে জায়গা করে নিয়েছিল ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়
প্রকাশিত, ‘Modern And Postmodern Poetry of the Millenium’ সংকলনে। যে
১১ জনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছিল, তাদের কারও কারও
চাকরি চলে গেল, কারও হলো বদলি। সবার স্বাভাবিক জীবন নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। ভয়ে
অনেকে আন্দোলন ছেড়ে দিলেন। এই সময় বদলে যায় চিত্র। মলয়ের সাথে যিনি ছিলেন
হাংরি বুলেটিনের লিডার, সেই শক্তি চট্টোপাধ্যায় আদালতে গিয়ে সাক্ষ্য দিলেন
তার বিপক্ষে। অন্যদিকে মলয়ের পক্ষে সাক্ষী দিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়।
ভরা আদালতে সুনীল বললেন, কবিতাটিতে কোনো অশ্লীলতা নেই। নিম্নআদালত সাজা
দিলেও পরবর্তীতে উচ্চআদালতের দেওয়া রায়ে, ১৯৬৭ সালে বেকসুর খালাস পেলেন মলয়
রায়চৌধুরী।
মলয় রায়চৌধুরী সম্পাদিত জেব্রা পত্রিকার প্রচ্ছদ;হাংরি
জেনারেশন তৎকালীন সমাজের প্রথাগত নীতিবোধ আর চেতনায় দারুণ আঘাত হেনেছিল।
প্রতিঘাতে তাদেরও আক্রান্ত হতে হয়েছিল। কিন্তু এরপর আর হাংরি মুভমেন্ট
জ্বলে উঠতে পারেনি। হ্যান্ডবিল আকারে প্রকাশিত হাংরি বুলেটিনগুলো দ্রুত
ছড়িয়ে পড়লেও সেগুলো সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়নি। বুলেটিনের বাইরে হাংরি
আন্দোলনকারীরা জেব্রা, প্রতিদ্বন্দ্বী, উন্মার্গ, চিহ্ন, এষণা, ফুঃসতীন্দ্র
এবং দি ওয়েস্ট পেপার নামে কয়েকটি পত্রিকাও প্রকাশ করেছিল। কলকাতার লিটল
ম্যাগাজিন লাইব্রেরি ও গবেষণাকেন্দ্র এবং ঢাকার বাংলা একাডেমি মিলে এর
মাত্র কয়েকটি বুলেটিন আর পত্রিকা সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়। ‘হাংরি
জেনারেশন’ যেসব সাহিত্যিকদের জন্ম দিয়েছে, তারা ব্যক্তিগত জীবনে এক অর্থে
অসফল হলেও তাদের এই আন্দোলন পরবর্তীতে বাংলা সাহিত্যের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
নাগরিক জীবন ও রাষ্ট্রযন্ত্রের অসঙ্গতিকে, এত অল্প সময়ে এভাবে কলমের আঘাতে
আর কোনো সাহিত্যকেন্দ্রিক আন্দোলন, জর্জরিত করতে পারেনি।
তথ্যসূত্র
১। ক্ষুধার্ত সংকলন; সম্পাদনা: শৈলেশ্বর ঘোষ; প্রকাশক: সাহিত্য অকাদেমী, নিউ দিল্লি; প্রকাশকাল: ১৯৯৫
ষাটের এলিট বাঙালি সংস্কৃতির বিরুদ্ধে সুবিমল বসাক আবির্ভূত হয়েছিলেন কাউন্টারকালচারাল একজন সাবঅলটার্ন লেখক হিসাবে । নবারুণ ভট্টাচার্যের মতন তিনি অন্য মানুষদের জীবন থেকে অভিজ্ঞতা সংগ্রহ করেননি, করেছেন নিজের নিম্নবর্ণ-নিম্নবর্গ জীবনের লাৎ খাবার অভিজ্ঞতা থেকে । সুবিমলের বর্গে শৈশবে গায়ে চামউকুন হয়, চুলে জট পড়ে, নখে ময়লা জমে, ময়লা নখ নিয়েই ভাত-ডাল মাখতে হয়, রাস্তার কলে স্নান করতে হয়, দেনার দায়ে বাপ আত্মহত্যা করলে কৈশোর থেকে সংসার চালাতে হয় । তাই মধ্যবিত্ত জীবনে পৌঁছেও এলিটদের সংস্কৃতিতে ঢোকার অনুমতি পান না সুবিমল বসাক । আসলে, যে বিদ্যায়তনিক আলোচক এলিট সংস্কৃতির প্রডাক্ট, তিনি তাঁর দোসরদের খোঁজ করেন পাল্প ফিকশানে, কেননা প্রতিষ্ঠানের ছত্রছায়া ছাড়া পাল্প ফিকশান শেকড় পায় না ।
উকুন জানতুম, চুলে হয়, বলতে গেলে দেখা যায় না, মাথার চুলে খুঁজে-খুঁজে বের করে টিপে মারতে হয়, বাঁদরদের মতন । ব্যাংকশাল কোর্টে মামলার সময়ে, রাতের বেলায় সুবিমল বসাকের জ্যাঠামশায়ের বইঠকখানার স্যাকরার প্রায়ান্ধকার দোকানঘরে মাদুরে শুয়েছিলুম, সুবিমল বলল, শালা, তোমার গায়ে চামউকুন হয়ে গেছে । সুবিমল আমার গা থেকে ছোটো ছারপোকার মাপের একটা চামউকুন তুলে বলল, পনেরোদিন স্নান করোনি, আদালতের পাবলিকদের সঙ্গে ওঠাবসা করছ, গায়ে চামউকুন হয়ে গেছে, বিহারিদের মতন । সত্যিই, ফৌজদারি আদালতে এতো রকমের ক্রিমিনাল জড়ো হতো যে সাবধানে না থাকলে খোস-পাঁচড়া, আর নানা ছোঁয়াচে রোগও হয়ে যেতে পারতো । কলকাতায় মাথা গোঁজার ঠাঁই না থাকায় দিনের পর দিন স্নান হতো না ; ততোদিনে চামউকুনরা নিজেদের বংশবৃদ্ধি করে ফেলতো আমার গায়ে ।
চামউকুন যে কেমনতরো উকুন, তা অন্য হাংরি আন্দোলনকারীদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পেরেছিলুম, কখনও দেখেনি । একটা চামউকুন মেরে কাগজে মুড়ে সুভাষ ঘোষ আর বাসুদেব দাশগুপ্তকে দেখিয়েছিলুম । বাসুদেব তখন বেবি-দীপ্তি-মীরার রেগুলার খদ্দের । সেই পাড়াতেও কারোর গায়ে চামউকুন দেখেনি ।
সুবিমল বসাক পাটনাতেই থাকতো, গান্ধি ময়দানের ওই পারে, পশ্চিম দিকে, গোলঘর নামে ব্রিটিশদের তৈরি একশো চুয়াল্লিশ পাকানো সিঁড়ির ঢাউস খামারবাড়ির কাছে ; গিন্সবার্গকে নিয়ে উঠেছিলুম ওই খামারবাড়ির টঙে, নেমে ভেতরে ঢুকে গিন্সবার্গ ওর ‘সানফ্লাওয়ার সূত্র’ কবিতা চেঁচিয়ে আবৃত্তি করার পর আফশোষ করেছিল যে একটা রেকর্ডার আনা উচিত ছিল ।
পাটনায় থাকলেও সুবিমল বসাকের সঙ্গে আমার আলাপ ছিল না ; ও পড়তো পশ্চিমের কোনো স্কুলে আর আমি পূর্বদিকের রামমোহন রায় সেমিনারিতে । তবে ওদের পরিবারের কথা বাবা জানতেন ; বলেছিলেন যে ওর বাবা নাইট্রিক অ্যাসিড খেয়ে দেনার দায়ে আত্মহত্যা করেছিলেন । কারোর বাবা আত্মহত্যা করলে তাঁর ছেলের মনে কেমন প্রতিক্রিয়া হয় ? কে জানে, আমার পক্ষে ভেবে ওঠা কঠিন । আমার খুড়তুতো বোন পুটি কড়িকাঠ থেকে ঝুলে আত্মহত্যা করেছিল বাছুরের গলা থেকে দড়ি খুলে ।
‘দুরুক্ষী গলি’ নামে একটা উপন্যাস লিখেছে সুবিমল, ওর আত্মজীবনী, তাতে সোনার গয়না যে কতো ধরণের হতো আর তাদের বিস্ময়কর নাম ছিল, তা ওর ‘দুরুক্ষী গলি’ পড়ে জানা যায় । আমার মনে হয় এটা ওর সেরা উপন্যস, ধরা পড়ে আর্থসাংস্কৃতিক আর ঐতিহাসিক যুগলক্ষণ, আর সেই সঙ্গে বিলুপ্ত হতে-থাকা আত্মনির্ভর স্যাকরাদের ইতিহাসও বটে । পুঁজিবাদী স্বার্থের নিরিখে যখন সাহিত্যিকদের খ্যাতি বিবেচিত হচ্ছে, তখন বঙ্গসংস্কৃতিতে হঠাৎ ঢুকে পড়া ব্যাণ্টামওয়েট মুষ্ঠিযোদ্ধার আদলে ময়লা এক যুবক নিজের লেখালিখিকে নিয়ে গিয়েছে কলোনিয়াল ইসথেটিক রিয়্যালিটির বাইরে ।
সুবিমল পাটনা থেকে কলকাতায় চাকরি করতে গিয়েছিল বলে জানতো যে এখানে মাথা গোঁজার ঠাঁই না থাকলে রাতে কতো বিপদে পড়তে হয় । অন্য হাংরি আন্দোলনকারীরাও অনেকে কলকাতার বাইরে থেকে পৌঁছেছিল, কিন্তু কেউই রাতের বেলায় থাকতে দিতে রাজি হয়নি, নানা অজুহাত দেখিয়ে কাটিয়ে দিয়েছে ।
কলকাতায় হাংরি আন্দোলনের খবর পেয়ে সুবিমল বসাক জানতে পেরেছিল যে বুলেটিন ছাপাবার ইংরেজি ম্যাটার আর টাকাকড়ি আমিই দিই, তাই ১৯৬৩ সালের কোনো এক সময়ে আমার সঙ্গে পাটনায় দেখা করতে এসেছিল, আন্দোলনে যোগ দেবার উদ্দেশে । একদিক থেকে ভালোই হলো, ভেবেছিলুম, ঠিকই ভেবেছিলুম, কেননা চাষি পরিবারের হারাধন ধাড়া তখন নিজের পিতৃদত্ত নাম নিয়ে হিমশিম, এফিডেভিট করে দেবী রায় হবার নির্ণয় নিয়ে ফেলেছে ।
ঢাকার তাঁতি পরিবারের সুবিমল বসাকের নিম্নবর্গ নিয়ে তেমন মনোভাব ছিল না, যখন কিনা ওর বাবা স্যাকরা ছিলেন । দেবী রায় যেমন থাকতো হাওড়ার বস্তিতে, সুবিমল বসাকের বাড়ি গিয়ে দেখলুম, ওদের বাড়িও নিম্নবর্গ বিহারি এলাকায়, আর বাবা না থাকায়, একটা আধখেঁচড়া বাড়িতে বসবাস করে ওকেই ভাইদের বড়ো করে তুলতে হচ্ছে । কলকাতায় ট্রান্সফার নিয়ে চলে গিয়েছিল সাহিত্যের আকর্ষণে । কিছুকাল আগে নিম্নবর্গের জন্য নির্ধারিত একটা পুরস্কারও পেয়েছে সুবিমল । অনুবাদের জন্য সাহিত্য অ্যাকাডেমির পুরস্কার পেয়েছে ।
সুবিমল কাজ করতো ইনকামট্যাক্স দপতরে, সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউতে । ও স্কেচ আঁকতে পারতো, উড-কাট করতে পারতো । তখন এসট্যাবলিশমেন্টের কর্তাদের ‘দয়া করে মুখোশ খুলে ফেলুন’ ছাপানো রাক্ষস জীবজন্তু ইত্যাদির মুখোশ, হাংরি আন্দোলনের পক্ষ থেকে বিলি করা সারা হয়ে গেছে, বিয়ের কার্ডে ‘Fuck the bastards of Gangshalik school of poetry’ ছাপিয়ে বিদ্যায়তনিক কবিদের পাঠানো হয়ে গেছে, কলকাতার মালিকরা ব্লাস্ট ফারনেসে টগবগ করে ফুটছে, সুবিমল বলল যে, ও এবার নানারকম স্কেচ এঁকে স্টেনসিলে একশো কপি ছাপিয়ে বিলি করবে, হাংরি আন্দোলনের নতুন ধরনের বুলেটিন । আমি একটা চার্ট তৈরি করেছিলুম, উনিশ নম্বর হাংরি বুলেটিন হিসেবে প্রকাশিত হয়েছিল, তার স্টেনসিলও সুবিমল তৈরি করে দিয়েছিল । চার্টে দেখানো হয়েছিল যে বাঙালি কবিদের পূর্বপুরুষরা কবিয়াল ছিলেন ; পূর্বপুরুষরা সকলেই নিম্নবর্ণের ছিলেন বলে আধুনিক কবিরা বেশ চটে ছিলেন ।
মজার ছিল বুলেটিনগুলো, মধ্যবিত্ত কবি-লেখকদের ওয়াটারশেডের ওপর থেকে ঠেলে ফেলার জন্য যুৎসই । কয়েকটা মনে আছে : একজন তরুণীর সারা শরীর জুড়ে স্তন, একজোড়া পায়ের স্কেচ যা দেখলেই টের পাওয়া যায় যে মানুষ-মানুষী মিশনারি আঙ্গিকে ছিল, সামনা-সামনি যুবক-যুবতী যা দেখে মনে হবে ফুলদানি, এরকম বহু বুলেটিন, সপ্তাহে একটা করে। নিজের বইয়ের আর ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ পত্রিকার প্রচ্ছদও নিজেই আঁকতো সুবিমল । কেবল ওর ‘ছাতামাথা’ বইয়ের প্রচ্ছদ আমি পেপার কাটিং দিয়ে তৈরি করে দিয়েছিলুম । ‘ছাতামাথা’ বইয়ের উৎসর্গপত্রের আইডিয়াটাও দিয়েছিলুম ।
সংবাদপত্র দপতরে গিয়ে ব্ল্যাংক কাগজকে ছোটোগল্প হিসাবে জমা দেয়া আর রিভিউ করার জন্য বাচ্চাদের চটির বাক্স ব্রাউন কাগজে মুড়ে জমা দেবার ব্যাপারে সুবিমলও গিয়েছিল আমার সঙ্গে । এর জন্য শক্তি চট্টোপাধ্যায় খচে কাঁইবিচি, সাঙ্গোপাঙ্গোদের নিয়ে আমাকে আর সুবিমলকে প্যাঁদাবার জন্য কফিহাউসের বাইরে অপেক্ষা করছিলেন । কফিহাউসের সিঁড়ির কাছে ইসমাইলের পান-সিগারেটের দোকানে লোহার রড লুকিয়ে রাখা হয়েছিল মার দেবার জন্য । নিচে নামতেই প্যাঁদাবার জন্য ঘিরে ধরা হয় । সুবিমল সেসময়ে ব্যাণ্টাম ওয়েট বক্সার, হুমকি দিয়ে তেড়ে ভোজপুরি গালমন্দ করতেই সব দেদ্দৌড়, যারা ঘিরে ধরেছিল তারা তো বটেই, শৈলেশ্বর ঘোষ, বাসুদেব দাশগুপ্ত, সুভাষ ঘোষরাও । পরে জানা গিয়েছিল যে সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় যেমন আয়ওয়া থেকে হুমকিচিঠি পেয়েছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখা, তেমনই পেয়েছিলেন শক্তি চট্টোপাধ্যায় - উনি তখন সবে সহসম্পাদকের চাকরির অফার পেয়েছেন ।
পশ্চিমবাংলায় সেই সময়ে রিফিউজিরা সোভিয়েত দেশে বাংলায় অনুবাদ করা মার্কস-এঙ্গেলস পড়ে-পড়ে বামপন্হী হবার দৌড়ে শামিল । বাসুদেব দাশগুপ্ত, সুভাষ ঘোষ আর অরুণেশ ঘোষও বই পড়ে ঢুকেছিল জমায়েতে, সবায়ের দেখাদেখি । পরে ওদের বক্তব্য ছিল যে মফসসলে বেঁচে থাকতে হলে এছাড়া উপায় ছিল না । ওদের বক্তব্যে যুক্তি ছিল, কেননা প্রমোদ দাশগুপ্ত ক্যাডার পাঠিয়ে স্কুলগুলো আর ক্লাবগুলো স্ট্যালিনি কায়দায় দখল করছিলেন । পরে তারা ইংরেজির এমন পেছন মেরে দিল যে পশ্চিমবঙ্গ থেকে ইউপিএসসির পরীক্ষাগুলোয় কেউই প্রতিযোগীতা করতে পারে না, দলে-দলে পালিয়েছে-পালাচ্ছে বাইরের রাজ্যে বা বিদেশে ।
বই পড়ে যা হয়, বামপন্হীরা জোটবেঁধে নিজেদের আখের গুছিয়ে আর্থিকভাবে প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগীতায় মাতলো আর বামপন্হাকে ডোবালো । সুবিমল বসাক ওই সব বই পড়াপড়ির দিকে যায়নি, ওর আগ্রহ হয়নি, নিজের জীবনে যতো লাৎ খেয়েছিল, ওর দরকার ছিল না বই পড়ে সেসব জানা-বোঝার । লাৎগুলো ও প্রয়োগ করেছে ওর লেখায়, কবিতা-গল্প-উপন্যাসে । মনে রাখা দরকার যে সুবিমল যখন লেখালিখি আরম্ভ করে, তখন কৃত্তিবাস গোষ্ঠীর সাহিত্যিকরা দল বেঁধে নিজেদের প্রতিষ্ঠানের অনুগামী করে তুলেছিলেন ।
সুবিমল বসাক ‘ছাতামাথা’ নামে একটা ফিকশানে হাত দিলো, হাংরি আন্দোলনের ডামাডোলের মাঝেই, যেখানে সুযোগ পেতো লিখতে বসে যেতো । আমি আইডিয়া দিয়েছিলুম যে আমরা যেহেতু এসট্যাবলিশমেন্টের লিটেরারি ভ্যালুজকে রিভার্স করে দিচ্ছি, ‘ছাতামাথা’ ফিকশানের সংলাপ লেখো কলকাতার বুলিতে আর ন্যারেটিভ লেখো ঢাকার কুট্টিদের বুলিতে । কুট্টিদের বুলি নিয়ে সুবিমল প্রায়ই রগড় করতো । ‘আর্ট ফর আর্ট সেক’ এর ধরতাইকে ছিৎরে লাট করে দিয়েছিল ‘ছাতামাথা’, প্রধানত ট্রান্সকালচারালাইজেশনের বিরুদ্ধে স্হানিকতাকে প্রয়োগ করে ।
এখন বাংলাদেশে একটা বিদ্যায়তনিক ধুয়ো উঠেছে যে কলকাতার ভাষা বর্জন করে বাংলাদেশের কথ্যবুলিকে ভাষার পর্যায়ে উন্নীত করা হোক, তাইতে সাহিত্য রচিত হোক, অথচ যখন আমি ওনাদের বলি যে সুবিমল বসাক অলরেডি এই কাজ পাঁচ দশক আগে করে ফেলেছেন, তখন ব্রাত্য রাইসু আর সলিমুল্লা খানরা কানে তুলো দিয়ে থাকেন । সুবিমল বসাকের গদ্য আর পদ্য কাল্পনিক নিম্নবর্গীয় নয় । প্রতীকি নয়, তা রিয়্যাল ফ্লেশ অ্যান্ড ব্লাড । খোলনলচে পালটে ফেলার জন্য যতো ধরণের টেকনিক সম্ভব, ব্যবহার করেছে সুবিমল । তাকে যদি কোনো আলোচক অ্যানার্কিক বলে তকমা দেন, তাহলে তাই সই ।
নকশাল আন্দোলনের ঠিক আগে বেলঘরিয়ায় জমি কিনে সুবিমল নিজের আস্তানা গড়ে ফেলল, চারিদিকে সুনসান, তখনও বাড়িঘর তেমন হয়নি, সেখানে হাংরি আন্দোলনকারীরা জমায়েত হবার নিরিবিলি খুঁজে পেলো । ফালগুনী রায়, ত্রিদিব মিত্র আর ওর প্রেমিকা আলো মিত্র, করুণানিধান মুখোপাধ্যায়, অনিল করঞ্জাই, কাঞ্চন মুখোপাধ্যায় আর বিদেশ থেকে যারা আসতো, যেমন ট্রেশম গ্রেগ, ডেভিড গারসিয়া, জর্জ ডাউডেন, নেপালি কবি পারিজাত যিনি আমার প্রেমে পড়েছিলেন এবং যাঁকে নিয়ে আমি বেশ কিছু প্রেমের কবিতা লিখেছিলুম ।
নকশাল আন্দোলনের সময়ে সুবিমল বসাকের বাড়ির সামনে প্রায়ই গোষ্ঠী-খুনোখুনি হতো, পুলিশও লাশ হাপিশ করার অন্ধকার খুঁজে পেতো । সুভাষ ঘোষ কিছুদিন ওর আস্তানায় ছিল আর সুবিমলের কাছে হাংরি আন্দোলন সম্পর্কিত যে কাটিঙের ফাইল ছিল তা নিয়ে শৈলেশ্বর ঘোষের শালা সুভাষ কুণ্ডুকে দিয়েছিল । অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ফাইল ছিল সেটা, হাংরি আন্দোলনের সমস্ত কাটিঙ সংগ্রহ করে হাইকোর্টের ব্যারিস্টার করুণাশঙ্কর রায়কে দিয়েছিলুম । বহু সংবাদপত্রে আমার আর অনেক সময়ে আমার আর দেবী রায়ের কার্টুন প্রকাশিত হয়েছিল, হাংরি আন্দোলনের গবেষকদের কাজে লাগতো । সুভাষ ঘোষের আত্মীয় ছিল সুভাষ কুণ্ডু, শৈলেশ্বর ঘোষের শালা হবার সূত্রে।
সুবিমল বসাক ওর রিভার্স ন্যারেটিভ টেকনিক বজায় রেখে কবিতা লিখল পূর্ববঙ্গের বুলিতে, অথচ সেগুলো কেন নজর কাড়লো না বলা কঠিন, কেননা আইরিশ ভাষায় সিমাস হিনির লেখা কবিতা ইংরেজি পত্রিকায় নিয়মিত আলোচিত হয়েছে । সুবিমল ছোটোগল্প লেখা আরম্ভ করল কলকাতাবাসী অবাঙালি পরিবারের সদস্যদের নিয়ে, তাদের কথাবার্তায় যে বদল ঘটে গেছে তা প্রতিফলিত হলো ওর গদ্যে । বহুকাল অবহেলিত ছিল ওর বইগুলো । এখন তন্ময় ভট্টাচার্যের উদ্যোগে সৃষ্টিসুখ থেকে সেগুলো খণ্ডে-খণ্ডে প্রকাশিত হচ্ছে । সুবিমল বসাক ওর মায়ের কাছ থেকে আর বৃদ্ধা আত্মীয়দের বাড়িতে গিয়ে ‘ঢাকাই বিয়ার গীত’ সংগ্রহ করে প্রকাশ করেছিল । একটা ‘কুসংস্কার সংকলন’ও প্রকাশ করেছিল ।
হাংরি আন্দোলন মামলার সময়ে সুবিমল বসাকই শেষ পর্যন্ত আমার সঙ্গে ছিল । ওর অফিস থেকে চলে আসতো ব্যাংকশাল কোর্টে, আমার মামলার ডেট পড়লে । সুবো আচার্য, প্রদীপ চৌধুরী, শৈলেশ্বর ঘোষ, বাসুদেব দাশগুপ্ত সব হাওয়া হয়ে গিয়েছিল । আমি পাটনায় গেলে সুবিমল আমার উকিলদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতো । হাইকোর্টের জুনিয়ার ব্যারিস্টার করুণাশঙ্কর রায়ের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতো । হাইকোর্টে আমি মামলা জিতে গেলে সুবিমলই কোর্ট থেকে রায়ের কপি নিয়ে আমাকে পাঠিয়েছিল পাটনায় ।
তবে সুবিমলের একটা ধারণা ভুল । নব্বুই দশকে আমি আমার কলকাতা অফিসে বিভাগীয় প্রধান হয়ে ফেরার পর শৈলেশ্বর, সুভাষ, প্রদীপের সঙ্গে দেখা করেছিলুম । সুবিমলের সঙ্গেও । তাকে সুবিমল ভেবেছিল আমি হাংরি আন্দোলন রিভাইভ করতে চাইছি । আসলে আমি যে ইতিমধ্যে প্রচুর পড়াশুনা করে ফেলেছি, ভারতের বহু গ্রামে ঘোরাঘুরি করে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছি, তার হদিশ পায়নি সুবিমল । যাই হোক, আমার নতুন লেখালিখি নিয়ে এক সাক্ষাৎকারে সুবিমল নিজেই বলেছে যে আমার লেখার ধরন আর ভাবনাচিন্তা পুরো পালটে গেছে ।
‘ছিটেফোঁটা’ পত্রিকার বইমেলা ২০১০ সুবিমল বসাক সম্বর্ধনা সংখ্যায় কলিম খান এই কথাগুলো সুবিমল বসাক সম্পর্কে লিখেছিলেন, যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ :
“আধুনিকতাবাদী, অ্যাকাডেমিশিয়ান, প্রগতিপন্হি, কমিউনিস্ট-সাম্যবাদী, মৌলবাদী, হাংরি, উগ্রপন্হী... বহু রকম মানুষই আমরা চারিদিকে দেখতে পাই; এবং তাঁদের নেতৃস্হানীয়রা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অত্যন্ত স্বাতন্ত্র্যাভিমানী।স্বাতন্ত্র্যের অভিমানের মধ্যে সকলের থাকে বিশেষ হওয়ার, পৃথক হওয়ার প্রবণতা থাকে। তথাকথিত সাম্যবাদীদের মধ্যে তো স্বাতন্ত্র্যের অভিমান সবচেয়ে বেশি, যদিও স্বাতন্ত্র্য সাধারণভাবে বিশেষবাদী বা অসাম্যবাদী। বিপরীতে দেখা যায়, গ্রামবাংলার মানুষের মধ্যে, তথাকথিত ধর্মভিরু সাধারণ মানুষদের মধ্যে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের অভিমান সবচেয়ে কম। তাঁদের ভিতরে সকলের থেকে পৃথক বা আলাদা হয়ে থাকার কোনো প্রবণতা দেখা যায় না, বিপরীতে মিলে-জুলে থাকার প্রবণতা দেখা যায়। বাংলা ভাষার শব্দার্থতত্বের বিচারে এরকম মানুষদেরই 'সুন্দর' মানুষ বলতে হয়। সেই হিসেবে শ্রী সুবিমল বসাকও সুন্দর মানুষ।
১৯৯৬ সালে তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটে। বিগতকালের হাংরি আন্দোলনের এক বিদগ্ধ আত্মারূপেই আমি তাঁকে চিনেছিলাম। একালের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যাবাদী সমাজে সকল সামাজিক সত্তার ও প্রতিষ্ঠানাদির যেমন কেন্দ্র ও প্রান্ত হয়ে থাকে, হাংরি আন্দোলনেও সেইরূপ কেন্দ্র-প্রান্ত ব্যাপার ছিল। কেন্দ্রে যখন মলয় রায়চৌধুরী সগৌরবে বিরাজিত ছিলেন, তখন প্রান্তে ছিলেন সুবিমল বসাক। কালধর্ম তাঁকে যে-কলঙ্ক বা গৌরব দিয়েছিল, তা সবই তখন মলিন হয়ে এসেছিল। তাঁর স্বভাবের মধ্যে সেসবের রং-রূপ, তেজ-ছটা আমার চোখে খুব একটা পড়েনি। যেটি পড়েছিল, তা হল তাঁর নিষ্কলুষ আত্মার দীপ্তি। প্রথম আলাপেই বুঝেছিলাম, এই মানুষটির সঙ্গে নির্বিবাদে ঘর করা চলে।
কলকাতার বাংলা সাহিত্যের জগতে আমার অনুপ্রবেশ ঘটে ১৯৯৫ সালে। ১৯৯৭-৯৮ সালের মধ্যেই আমি টের পেয়ে যাই, এই জগৎ অত্যন্ত কলুষিত হয়ে গেছে। ভাল সাহিত্যিক তো পরের ব্যাপার, আগে তো ভাল মানুষের সাক্ষাৎ পেতে হবে। এখানে যে ভাল মানুষের দেখা মেলা অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে! কার্যত আজকের কলকাতায় বঙ্গসাহিত্যের সারস্বত ব্রহ্মলোকে ভালমানুষের দেখা পাওয়া ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠেছে। যাঁরা মানিষ হিসেবেই কলুষিত, তাঁরা ভাল সাহিত্যিক হবেন, এমন আশা করা খুবই ত্রুটিপূর্ণ এবং দুরাশা মাত্র। তারই মাঝে যে আমি দু'চারজনকে ভালো মানুষ রূপে পাই, তাঁদেরই একজন শ্রী সুবিমল বসাক। ২০০০ সাল থেকে আমি সেমিনার, সাহিত্যসভা ইত্যাদিতে যাতায়াত বন্ধ করে দিই এবং অনেকের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে দিয়ে একান্তে নিজের কাজ করতে থাকি। সেই একান্ত সময়েও যাঁদের সঙ্গে আমার সম্পর্ক কমবেশি অক্ষুণ্ণ থাকে, শ্রী সুবিমল বসাক তাঁদের একজন। তাঁর সান্নিধ্য আমার খুবই ভাল লাগত। তাঁর ভালমানিষির গন্ধ মনেপ্রাণে মাখামাখি হয়ে যেত। মনে পড়ত সৈয়দ মুজতবা আলীর সেই অমোঘ বাণী --- 'কয়লাওলার সাথে দোস্তি, ময়লা হতে রেহাই নাই/ আতরওলার বাক্স বন্ধ, দিল খুশ তবু পাই খুশবাই।' শ্রী সুবিমল বসাকের সাহিত্যসৃষ্টি নিয়ে আমার কিছু বলার নেই। কেননা, তাঁর সাহিত্য আমার মস্তিষ্কের স্বভাবের সঙ্গে খাপ খায়নি বলে তা আমার উপভোগ্য হয়নি। অতএব, যা আমি ভাল করে উপভোগ করিনি, তা রসাল ও সুস্বাদু কি না, বলদায়ক কি না, উপাদেয় কি না, তা নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে আমি পারব না। কিন্তু মানুষটি যে আমার খুবই আপনজন রূপে গৃহীত হয়েছিলেন, তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। তাঁকে আমি 'সুন্দর মানুষ' বলেই চিনেছিলাম, চিনেছি, ভালবেসেছি।”
সুবিমলের ‘’হাবিজাবি’ কবিতা দিয়ে চামউকুন পর্ব শেষ করছি :-
আমারে মাইরা ফেলনের এউগা ষড়যন্ত্র হইসে
চারো কোনা দিয়া ফুসফুস আওয়াজ কানে আহে
ছাওয়াগুলান সইরা যায় হুমকে থিক্যা
অরা আমারে এক্কেরে শ্যায করতে সায়
আমি নিজের ডাকাইতে্ যা হাতেরে লইয়া সচেত্তন আসি
কেউ আইয়া চ্যারায় দিশায় চ্যাবা কথা কয় না
আমি সুপসাপ থাকি
ভালাসির গুছাইয়া আমি কথা কইতে পারি না
২ কইতে গিয়া সাত হইয়া পড়ে
১৫ সাইলে ৯ আইয়া হাজির হয়
ছ্যাব ফেলনের লাইগ্যা বিচড়াইতাসি অহন
আহ, আমার দাঁত মাজনের বুরুশ পাইতাসি না
বিশ্বাস করেন, কেউ একজনা আমার মুহের সকরা খাবার খাইসে ।
হাংরি আন্দোলনের দ্রোহপুরুষ ত্রিদিব মিত্র এবং তাঁর তদানীন্তন প্রেমিকা
আলো মিত্র ( যাঁকে তিনি পরবর্তীকালে বহু ঝড়-জলের পর বিয়ে করেন ) সম্পর্কে
পত্র-পত্রিকায় বিশেষ লেখালিখি দেখতে পাওয়া যায় না, তার কারণ আন্দোলনকারীদের
কয়েকজন আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন, ষাটের সেই টালমাটাল সময়ে, যাতে এই
প্রেমিক-প্রেমিকা জুটি বিশেষ বিজ্ঞাপিত ও প্রচারিত না হন। হাংরি জেনারেশন
কেবল একটি পত্রিকা হয়ে থেকে যেত ত্রিদিব ও আলোর অবদান ছাড়া। তা যে আন্দোলন
হতে পেরেছে তার কারণ এঁদের দুজনার অভাবনীয় তৎপরতা।কালীদা, যিনি খালাসিটোলা
ভাটিখানার মালিক বা ম্যানেজার ছিলেন, বলেছিলেন যে আলো মিত্রের আগে আর কোনো
মহিলা খালাসিটোলায় ঢোকার সাহস করেননি।
ষাটের দশকে যা নতুন-নতুন
কার্যকলাপ সাহিত্যিকরা আরম্ভ করেছিলেন তা ত্রিদিব মিত্র ও আলো মিত্রর
মস্তিষ্কপ্রসূত। তাঁরাই প্রথম পোস্টকার্ডে কবিতা, পুস্তিকার আকারে কবিতা,
রঙিনকাগজে কবিতা, ভাঁজকরা কাগজে কবিতা আরম্ভ করেছিলেন।তাঁরাই প্রথম মাইকেল
মধুসূদন দত্তের সমাধিতে কবিতা পাঠের আয়োজন করেছিলেন। তাঁরাই প্রথম
খালাসিটোলা নামে কলকাতার বিখ্যাত ভাটিখানায়, জীবনানন্দ দাশের জন্মদিনে,
পত্রিকার প্রথম সংখ্যা প্রকাশের অনুষ্ঠান করেছিলেন।খালাসিটোলায় কবিতা পাঠের
অনুষ্ঠানও তঁদের অবদান। তাঁরা দুজনে দুটি পত্রিকা প্রকাশ করতেন; ইংরেজিতে
'ওয়েস্ট পেপার' ও বাংলায় 'উন্মার্গ' । তাঁদের পূর্বে বাংলা সাহিত্যে
পত্রিকার এরকম নাম রাখার কথা কেউ চিন্তা করতে পারতেন না। বস্তুত, তার পর
থেকে পত্রিকার নামকরণে বিপ্লব ঘটে গিয়েছে পশ্চিমবাংলায়। মলয় রায়চৌধুরী
ও দেবী রায় যে-সমস্ত মুখোশ হাংরি আন্দোলনের পক্ষ থেকে বিলি করার জন্য
ছাপিয়েছিলেন, জোকার দানব পশু পাখি মিকিমাউস দেবী-দেবতা ইত্যাদি, সেগুলি
এনারা দুজনে পৌঁছে দিয়ে আসতেন তখনকার মন্ত্রী ও প্রশাসনের কর্ণধারদের,
সংবাদপত্র-মালিকদের , যার জন্য যথেষ্ট বুকের পাটা দরকার। এনারা দুজনে কাঁধে
মই নিয়ে কলকাতা ও হাও্ড়ার কলেজ ও অন্যত্র হাংরি আন্দোলনের পোস্টার
সাঁটতেন; পোস্টার এঁকে দিতেন অনিল করঞ্জাই ও করুণানিধান মুখোপাধ্যায়
।হাংরি আন্দোলনের পূর্বে কবিতার পোস্টারের ধারণা কলকাতার সাহিত্যিকদের ছিল
না।
ত্রিদিব মিত্রের জন্ম হাওড়ার অভিজাত পরিবারে, ১৯৪০ সালের ৩১
ডিসেম্বর। তিনি স্কুল-ফাইনাল পরীক্ষার পর অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের উদ্দেশ্য বাড়ি
থেকে পালান , এবং চল্লিশ দিনের যে হোলি উৎসব মথুরা ওবৃন্দাবনে হয়, তাতে অংশ
নিয়েছিলেন। যাঁরা ওই উৎসবে কখনও অংশ নিয়েছেন তাঁরাই কেবল জানেন ব্যাপারটা
কত আনন্দদায়ক ও উৎশৃঙ্খল। তিনি ছিলেন ফর্সা ও সুপুরুষ, এবং স্বাভাবিকভাবেই
তাঁর অভিজ্ঞতা ভালো হয়নি। এই অভিজ্ঞতা তাঁকে ক্রুদ্ধ ও সমাজ সম্পর্কে
বিতৃষ্ণ করে তুলেছিল, যা লাঘব হয় হাংরি আন্দোলনে যোগ দেয়ার মাধ্যমে।
ত্রিদিবের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল খালাসিটোলার ভাটিখানায়।তারপর আমার
মাধ্যমে মলয়ের সঙ্গে ও অন্যান্যদের সঙ্গে। মলয়ের সঙ্গে নৈকট্য গড়ে ওঠে
ত্রিদিবের এবং সেকারণেই ত্রিদিবের পত্রিকা দুটি হাংরি আন্দোলনের অভুমুখ হয়ে
ওঠে।ওর পত্রিকা প্রকাশিত হলেই আমরা দল বেঁধে খালাসিটোলায় অনুষ্ঠান করতাম;
তারপর বাইরে বেরিয়ে কলকাতার পথে অনেক রাত পর্যন্ত চরে বেড়ানো; কখনও বা
গাঁজার পুরিয়া ম্যানেজ করে রামকৃষ্ণ ঘাটে সারা রাত। পকেটে টাকা থাকলে
বেপাড়ায়। ত্রিদিবের সুপুরুষ চেহারার জন্য ওর খাতির হত বেশি, গালও টিপে দিত
কেউ-কেউ। পেটে মদ পড়লেই ত্রিদিবের কন্ঠ থেকে কথা ছুটতে শুরু করত; অন্য
সময় ও একেবারে চুপচাপ, কারোর সঙ্গে তখন কোনো কথা বলত না।একেবারে ফালগুনী
রায়ের বিপরীত চরিত্র।আমরা কফিহাউসে একত্রিত হলেও অত্যধিক কথাবার্তায় বিরক্ত
ত্রিদিব সাধারণত কফিহাউসে যেত না। যেত তখনই যখন হাংরির কোনো বুলেটিন বা
মুখোশ বা পোস্টকার্ড বা ফোল্ডার বিলি করার থাকত, কিংবা কফিহাউসের সিঁড়ির
দেয়ালে পোস্টার লাগাবার থাকতো। অনেকে পোস্টার ছিঁড়ে দিতো বলে ত্রিদিবের
সঙ্গে তাদের হাতাহাতি রুখতে হতো আমাদের। ত্রিদিব ও তার প্রেমিকার হাংরি
তৎপরতার কারণে হাংরি আন্দোলনের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়লেও, ত্রিদিব নিজের
লেখালিখিকে অবহেলা করেছে, যখন কিনা অন্যান্য হাংরি আন্দোলনকারীরা সে-সময়
নিজেদের লেখায় মনোনিবেশ করেছেন। কেবলমাত্র দুটি কবিতা-পুস্তিকা রেখে
গেছেন ত্রিদিব -- ঘুলঘুলি ও প্রলাপ-দুঃখ । ঘুলঘুলি ছিল ফোল্ডারের আকারে
এবং প্রলাপ-দুঃখ ছিল ৪৮ পৃষ্ঠার, ল্যাকভার্নিশহিন কালো রঙের মলাট, কাভারে
ত্রিদিবের কোমর পর্যন্ত নেগেটিভ ছবি -- শুয়ে আছে ঘাসের ওপর, হাতে সিগারেট।
গণেশ পাইন এঁকে দিয়েছিলেন ওর প্রলাপ-দুঃখ বইটির প্রচ্ছদ। বইটি প্রকাশের
পরও ত্রিদিব সেইভাবে প্রচার করেনি, যখন কিনা হাংরি বুলেটিন সে পৌঁছে দিত
সকলের টেবিলে বা বাসায় বা দপতরে। ফালগুনী রায়ের মতই একলা থাকতে ভালো
বাসত ত্রিদিব মিত্র।নিস্পৃহ ছিল নিজেরই লেখালিখির প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে।তার
কিংবদন্তি গড়ে ওঠে মূলত আলোর সঙ্গে ওই ষাটের দশকে লিভ-ইন, তা সত্তেও অবাধ
যৌনতা, বেশ্যাদের মধ্যে বিস্ময়কর পপুলারিটি, কাঁচা মাছ ও কাঁচা মাংস খাবার
জন্যে একগুঁয়ে লোভ, ঘনঘন সিগারেট খাওয়া (অধিকাংশ সময়ে গাঁজা বা চরস দিয়ে),
টিপিকাল হাওড়ার কথ্যভাষায় কথা বলার ঝোঁক, জীবনানন্দের কবিতা আওড়াতে থাকা,
খালি গায়ে রাস্তায় হাঁটা।
ব্যাংকশাল কোর্টে যখন মলয় রায়চৌধুরীর
বিরুদ্ধে কেস চলছিল তখন শৈলেশ্বর ঘোষ, সুভাষ ঘোষ, সুবো আচার্য, বাসুদেব
দাশগুপ্ত, প্রদীপ চৌধুরী, রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় কারোর টিকিটি দেখা যেত না
।শৈলেশ্বর আর সুভাষ তো রাজসাক্ষী হয়ে গিয়েছিল, এবং সে-বাবদ টাকাও পেয়েছিল
সরকারের কাছ থেকে। আমি যেতাম আর যেত ত্রিদিব ও আলো; অনেক সময়ে ফালগুনী রায়।
এতদিন ধরে আমরা গাদাগাদা বই পেয়েছি: ফুলের বই, পাখির বই, সেলাইয়ের বই,
রান্নার বই, ছবি লেখার বই, ঘরকন্নার বই, ডেবিটক্রেডিটের বই, পোস্টাপিসের
বই, সমাজতত্বের বই, শাক-সব্জি ফলানোর বই, গানের বই, প্রাপ্তবয়স্কের বই --
এই নানা ধরণের বই; তেমনি এতদিন ধরে পেয়ে এসেছি যন্ত্রণার কবি, হতাশার কবি,
প্রেমের কবি, মুক্তি-যুদ্ধের কবি, নিসগৈর কবি, জনপদ কবি, রোমান্টিক কবি,
মৌমাছির কবি -- এমন ধারা অনেক। জীবনের কবি । সারপ্রাইজিং ব্যাপার।
ত্রিদিবের লেখালিখি জীবনের সঙ্গে অমন ওতপ্রোত ভাবে জড়িত বলেই তার রচনা
অমোঘ, দোষময় ও কলঙ্কিত।মনে পড়ে, বিষ্ণুপুর শহর থেকে তিন মাইল দূরে
ব্রীড়াবতী নদীতে আমি, মলয়, সুবো আর ত্রিদিব বেশ কয়েক ঘন্টা সম্পূর্ণ উলঙ্গ
হয়ে স্নান করেছিলাম; বহু চাষি সেসব দেখে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাননি। তার
পরেও, চাষিদের দৌলতে, বালির চড়ায় মহুয়া টেনে পড়েছিলাম আমরা।
প্রলাপ-দুঃখ কাব্যগ্রন্হে ত্রিদিব দেখিয়েছে মুদ্রার অপরপিঠ।একথা আজ আর
বলার অপেক্ষা রাখে না যে সাহিত্যের কমিটমেন্ট ও রাজনীতির কমিটমেন্ট এক নয় ।
রাজনীতির কমিটমেন্ট বিধানসভার-লোকসভার বাইরে ভেতরে আলাদা হতে পারে, কিন্তু
সাহিত্যে একবার কমিটেড হয়ে গেলে তার আর ফেরার উপায় থাকে না, বিশ্বাসঘাতকতা
ছাড়া। মলয় লেখালিখি দুই দশকের জন্যে ছেড়ে দিয়েছিল, যে কারণেই হোক,
জানি না। ত্রিদিবও মলয়ের সঙ্গে লেখালিখি ছেড়ে দিয়েছিল, কিন্তু আর ফেরেনি,
এমনকি আমাদের কারোর সঙ্গে যোগাযোগ রাখেনি।এমনই তার ঘৃণা ও ক্রোধ। সে কাউকে
ক্ষমা করেনি। ফালগুনী তবু ক্ষমা করে দিয়েছিল শৈলেশ্বর ও সুভাষকে, ত্রিদিব
করেনি। ত্রিদিবের মতে, হাংরি জেনারেশন আন্দোলনকে দূষিত করে দিয়েছিল এই
দুইজনের( শৈলেশ্বর আর সুভাষ ) কার্যকলাপ। ( রচনা: ৯ মে ১৯৭২ )