রবিবার

সুভাষ ঘোষের চিঠি -- মলয় রায়চৌধুরীকে

শনিবার
২২/৫/১৯৬৫
মলয়
এক্ষুনি তোমার চিঠি পেলাম --- আমার লেখা যা মোট ৮ পৃ ছাপা হয়ে গেল আজ -- তোমার দেরি দেখে গত এক সপ্তাহ ধরে তোমাকে অনন্ত পাঁচটি চিঠি দিয়েছি, আমি ব্লক ফটোর অলরেডি তৈরি করেছি --- লেখা ছাপিয়েছি ২০০ --- তুমি তো সব প্ল্যান গণ্ডোগোল করে দিলে still আমি তোমার ২৫০ কভারের জন্য আগামি ,ঙ্গলবার অবধি অপেক্ষা করব । প্রেসে সব ছাপিয়ে পুরো মাল পাঠিয়ে দেবো তোমাকে -- আর যদি না পাই তাহলে ৪০০ আর্ট পেপারে আমার ফটো ও ওই লেখা extra ছাপিয়ে দেবো তোমাকে ---

হ্যাঁ, যা বলছিলাম -- ক্ষু.প্র.তে হারাধনের বইয়ের বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছে বলে ওর লেখা জেব্রাতেও ছাপা হবে -- এরকম কথা আছে নাকি ? কই তোমার সঙ্গে দেখা হল যখন এরকম বললে না তো--- এই তোমার দোষ-- আমি তো তখন হারাধনের লেখা গুণগত যোগ্যতা না থাকায় ছাপতে বারণ করেছিলাম তোমাকে -- গুণও বড় কথা নয় --- আসল কথা দেবী রায়ের ক্লিক + এক্সপ্লয়টেশান+নোংরামি ।

আসলে ওর লেখা যখন ক্ষু.প্র.তে ছাপা হচ্ছে না জানল তখন মরিয়া আরকি -- আর তো --হেঁ..হেঁ । তুমি তখন জিগ্যেস করলেও আমি পরিষ্কার করতাম সব -- ফলে তুমি জেব্রা থেকে ওর লেখা withdraw করে নাও । ওর নাকি সব বিদেশি নাঙরা ১০০০-১০০০ পৃষ্ঠার প্রশংসা পাঠিয়েছে -- ওই নিয়ে থাকুক ও --- OK ---ভালোবাসা নিও
                                                 সুভাষ ঘোষ

( সন্দীপ দত্তের লাইব্রেরিতে ক্ষুধার্ত প্রতিরোধ এবং জেব্রা পত্রিকায় দেখা যায় যে ক্ষুধার্ত প্রতিরোধ পত্রিকা থেকে মলয় রায়চৌধুরী ও দেবী রায় উভয়কেই বাদ দেয়া হয়েছিল । দেবী রায় ও মলয় রায়চৌধুরীকে অপমান করার জন্য শৈলেশ্বর ঘোষ বেনামে দেবী রায়চৌধুরী নাম দিয়ে নিম্নমানের রচনা ক্ষুধার্ত পত্রিকায় প্রকাশ করতেন । জেব্রা পত্রিকায় সুভাষ ও দেবী রায় উভয়েরই রচনা প্রকাশিত হয়েছিল । )

 

শুক্রবার

সুবিমল বসাকের চিঠি -- বাসুদেব দাশগুপ্তকে -- কলেজ স্ট্রিটে ত্রিদিব মিত্রকে সাহিত্যিকদের শাসানি

প্রিয় বাসুদেব
তোমার ১৬ তারিখের পোস্টকার্ড পেয়েছি । মলয়ের খবর জেনেছ নিশ্চয়ই । ওর আসার কথা কোলকাতায় । সুভাষের সঙ্গে গতকাল দেখা হয়েছে, জানালো মলয় অফিসে জয়েন করে আসবে -- তার জন্য সার্টিফায়েড কপির দরকার । কোলকাতা কেমন ঠাণ্ডা মেরে গেছে । আমাদের বিরুদ্ধে আক্রমণ তীব্র হয়ে উঠেছে । ত্রিদিব আজ জানালো, ওকে ৩/৪ দিন আগে কলেজ স্ট্রিটে ধরেছিল এবং শাসিয়েছে, "এদিকে আসা বন্ধ করে দেব" বলে । এইসব চলছে ।

"জেব্রা"র পোস্টার করো তিনটে - বড় সাইজের । লেখকসূচীর নামগুলো দিও । মঙ্গলবার বা শনিবার নাগাদ বেরিয়ে পড়বে মনে হয় । ভালোবাসা নিও । শারীরিক ও মানসিক দু'দিক দিয়েই আমি ভালো নেই ।
                                                    সুবিমল
                                                ৬ আগস্ট ১৯৬৭

গল্প চেয়ে বাসুদেব দাশগুপ্তকে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের চিঠি

অধুনা, ১৭/১ডি, সূর্য সেন স্ট্রিট
কলকাতা -- ১২
প্রিয় বাসুদেব
"আজকের গল্প" নামে একটি গল্প সংকলন প্রকাশিত হবে শিগগিরই । 'অধুনা' এটি প্রকাশ করছেন । এতে সাম্প্রতিক কালের লেখকদের গল্প থাকবে, কোনোক্রমে আমি এর সম্পাদক । আমার ইচ্ছে, এতে আপনার একটি গল্প থাকুক । আপনার গল্প আমার অনেকদিন থেকেই ভালো লাগে । আপনার 'রিপুতাড়িত' গল্পটি আমি এই সংকলনে রাখতে চাই । আশা করি এতে আপনার কোনো আপত্তি হবে না । অবিলম্বে আপনার সন্মতি জানালে খুব ভালো হয় । 
                                         ভালোবাসা নেবেন
                                       সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
                                          ২৮ জুন ১৯৬৮
পুনশ্চ : যদি আপনার সন্মতি থাকে, আশা করি নিশ্চয়ই থাকবে, তবে আপনার জীবন সম্পর্কে কয়েকটি তথ্য যেমন খুশি উপায়ে জানাবে ।

( বাসুদেব দাশগুপ্ত সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেছিলেন । সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সেসব কথা নিজের জীবনী থেকে বাদ দিয়েছেন । )

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে হাংরি লেখক বাসুদেব দাশগুপ্তের চিঠি -- সংকলনে গল্পের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান

সুনীলবাবু
আপনার চিঠি পেলাম । নানান বাজে কাজে ব্যস্ত থাকার দরুন উত্তর দিতে একটু দেরী হল । আমার লেখা আপনার অনেকদিন থেকেই ভালো লাগে জেনে খুশি হলাম । আপনার মতো একজন নামী পাঠক পাওয়া আনন্দেরই কথা । "আজকের গল্প" কোন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সম্পাদনা করছেন ? ইনিই কি তিনি যিনি আমেরিকা থেকে ফিরে এসে রূপচাঁদ পক্ষীর হয়ে হাংরি জেনারেশন সম্পর্কে কুৎসিত মন্তব্য করেছিলেন ? ইনিই কি তিনি যিনি কৃত্তিবাসের একটি সংখ্যায় হাংরিদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছিলেন ?
ইনিই কি ছদ্মবেশী সনাতন পাঠক যিনি দেশের পাতায় লিখেছিলেন "এদের লেখা কিশোর বয়সের ডায়েরি মাত্র" ? যদি তাই হয়, এই সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তার সম্পাদিত সংকলনের যোগ্যতা হারিয়েছেন ।
                                            নমস্কারান্তে
                                             বাসুদেব দাশগুপ্ত
                                             ১২ জুলাই ১৯৬৮

মঙ্গলবার

প্রদীপ চৌধুরীর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন প্রণবকুমার চট্টোপাধ্যায় -- হাংরি জেনারেশন আন্দোলন

প্রশ্ন : প্রদীপবাবু, আপনি ফরাসি সাহিত্যে আগ্রহী এবং ফরাসি ভাষা ভালো জানেন । শোনা যায় এই যোগাযোগের সূত্রে আপনাকে মাঝে-মাঝেই ইউরোপ আমেরিকায় যেতে হয় । শুনেছি কলকাতায় আপনি যে পত্রিকা প্রকাশ করেন, তাতে বিদেশি কবি-লেখকদের প্রাধান্য । কোনো সাহিত্যসভা বা কবিতাপাঠেও আপনাকে দেখা যায় না । আপনার প্রকাশিত পত্রিকা পাতিরাম বা ধ্যানবিন্দুতেও কখনও দেখিনি । শ্রুতি আন্দোলনের কবি পুষ্কর দাশগুপ্ত গ্রিকভাষা জানতেন এবং আগ্রহী ছিলেন । তিনি ওই দেশে চলে যাবার আগে মন্তব্য করেছিলেন -- "বাংলায় লিখে কিছু হবে না, বাংলা সাহিত্যের কোনো ভবিষ্যৎ নেই ।" আপনিও কি তাই মনে করেন?
উত্তর : প্রণব, সাক্ষাৎকারটি সম্পূর্ণ করতে খানিকটা দেরি হলো, কারণ যেসব প্রশ্ন রাখা হয়েছে, তাদের একটিরও কোনো সাহিত্যমূল্য নেই । আমি কি লিখি না লিখি সে সম্পর্কে প্রশ্নকর্তার কোনো কৌতূহল নেই । আমার বয়স এখন ৭১। এ বয়সে এরকম গালগল্প ধরণের প্রশ্নমালার জবাব লেখা আমার কাছে অভূতপূর্ব। আমি যা লিখি, অর্থাৎ কবিতা -- তা একেবারে বিশুদ্ধ, হ্যাঁ, কেমিকালি পিওর । "গ্রেপভাইন" "গুঞ্জন" এমনকী প্রাণহীন ইনফরমেটিক্স-এ যারা মজা পান আমি তাদের মনোরঞ্জনে অসমর্থ । সচরাচর আমি তাদের সঙ্গ এড়িয়ে চলি, যে সমাজ ও সংস্কৃতি এসব গুজবের উপর দাঁড়িয়ে আছে, আমার কাছে, এমনকী বর্জ্য সেই সংস্কৃতি । আমার নীরবতায় তাই "অসহায়" বোধ করার কারণ নেই । পৃথিবীর সব কবিই নীরব -- উদাহরণ হিসেবে জীবনানন্দকেই দ্যাখো না । কবি-লেখকদের সরবতা পূর্ণ প্রস্ফূটিত হয় তাদের রচনায় --- যেমন, নদী, নীরবে বয়ে চলেছে । রোজই সুনামি ঘটিয়ে তার অশেষ পরমায়ু ঘোষণা করতে হয় না । শুধু কবিরাই বা বলি কেন, এখনকার সমাজই ধীরে ধীরে নীরবতার দিকে ঝুঁকছে । রুটিরুজির চাপ, অবসাদ তার প্রাণোচ্ছলতাকে হত্যা করছে । রাস্তায় অতিশয় সরব যাদের দেখা যায় আমরা তো জানি তারা কারা। দলীয় ও নির্দল ফেস্টুনধারী, ধর্ষকামী কিংবা ক্ষমতাবানদের চাকর-বাকর । এখন সবার ঘরেই সেট টপ বক্স । কোনো আন্দোলন নেই । সব কিছুই পূর্ব নির্ধারিত ইশ্যুভিত্তিক । বিশুদ্ধ আন্দোলন নিজেই একটি কবিতা, রিলেটিভ ফোর্স । হাংরি জেনারেশন উথ্থানপর্বে সমাজ এরকম ছিল না । ঘৃণা ও ভালোবাসার কারণগুলিকে চিহ্ণিত করা যেরো । ভাঁড়ামো তখনও ছিল -- কিন্তু তাদের হোতাদের চিহ্ণিত করা যেতো । এই স্বচ্ছতার জন্যই হাংরি আন্দোলন সম্ভব হয়েছিল, এই বাংলার কোনো সাহিত্য আন্দোলনেই যা দেখা যায় না । অল ইজ ফিনিশড নাউ । পৃথিবী থেকে আন্দোলন শেষ হয়ে গেছে । নীরবতা, কঠোর নীরবতাই এখন একমাত্র আন্দোলন । দুঃখজনক, কিন্তু আমার বিচারে ঘটনাটি এরকমই । চিন্তার কারণ নেই প্রণব, আমি এখনও বেঁচেই আছি ।
          সাহিত্য ও চারুকলার পৃথিবী কোনো অক্ষ ও দ্রাঘিমায় সীমাবদ্ধ নয় । ভাষা জানা বা না-জানা এটি ব্যক্তিগত চয়েসের ওপর নির্ভর করে । আমি ফরাসি সাহিত্যের একজন নিয়মিত পাঠক । আগ্রহী বললেওকম বলা হবে । ঐ ভাষা বেশ খানিকটা জানি কিন্তু ফরাসি ভাষায় আমার লেখার দক্ষতা অতি সামান্য । কাজ চালাবার মতো । কিন্তু আমি সব সময় সচেতন যে এটা আমার থার্ড ল্যাঙ্গুয়েজ । কিন্তু আমার কাব্য রচনার ভাষা বরাবরই বাংলা --- যা আমার মাতৃভাষা । ইংরেজি ভার্শানসহ আমার বাংলা কবিতার বই ওদের দেশে যাবার কারণে ঘটেছিল। এসুবাদেই আমার ব্যাপারটি আরো মজার যে আমার ফরাসিদেশে ও সুইজারল্যাণ্ডে যাবার প্রথম আমন্ত্রণ আসে একজন সুইস ব্যালেরিনার কাছ থেকে । সে নিজে কবি, অনেক দিন ধরে আমার কবিতার ভক্ত । আমার "গ্রহণ" কবিতাটি কোরিওগ্রাফ করে এবং ইউএনও-সহ ইউরোপের নানা স্হানে তা প্রদর্শন করে । সে আমাকে জানায় যে তার বিশেষ ইচ্ছে তার নাচ শুরু হবার আগে মঞ্চে আমি কবিতাটি বাংলায় পড়ি । খরচপাতি সবই তার । একদিন জেনিভা থেকে তার স্বামী, আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু কবি হ্যারি রুডলফ উইলকেনস ব্যাপারটি পাকাপাকি করতে কলকাতায় এসে উপস্হিত । না গিয়ে উপায় ছিল না । এভাবেই এসব হয়েছে একেবারে ব্যক্তিগত স্তরে -- কখনও ফ্রান্সের কোনো মেয়ের অনুরোধে কখনও সরকারি আমন্ত্রণে পোয়েট-ইন-রেসিডেন্স হিসাবে, কখনও বা ফরাসি স্কুল-কলেজে "গীতাঞ্জলি" পড়াবার জন্য । আট-দশ বছর আমেরিকা-ইংল্যাণ্ড-কানাডায় চুটিয়ে লিখেছি । এসব নানা সূত্রে সমধর্মী কবিদের সঙ্গে বন্ধুতার সম্পর্ক গড়ে উঠেছে । আমি রেসিস্ট নই বলে ওদের লেখাও আমার প্রকাশিত কাগজপত্রে ছাপা হয়েছে । ১৯৬৫ থেকে ১৯৮০ সাল অব্দি আমার সম্পাদিত কাগজ "স্বকাল" এবং "ফুঃ" "ক্ষুধার্ত-৩" কাগজে বাংলা লেখাই ছাপা হয়েছে -- হাংরি জেনারেশনের বন্ধুবান্ধবদের লেখা । এরপর যখন হাংরি জেনারেশনে জমি দখলের লড়াই শুরু হয়, আমি আস্তে আস্তে ঐ আন্দোলন থেকে সরে আসি । আমার জমিদারিতে কোনও আগ্রহ নেই । কারণ আমি জানি একজন "পরিপূর্ণ" কবির খাসতালুক দীক্ষিত পাঠকের হৃদয় । এই হৃদয়ের তাড়নাতেই আমি আমার কাগজে বহু বিদেশি বন্ধুদের লেখা সমান গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করেছি । তাছাড়া বহুদিন তো হলো, আমি যেধরণের লেখার ভক্ত বাংলায় সেধরণের লেখা হচ্ছে না । পরিশেষে, কেবল ভালো লেখার অভাবে কাগজগুলি বন্ধ হয়ে আসছে । বেটার টাইমের অপেক্ষা করছি । কে এই পুষ্কর ? এ বান্ডল অফ কনফিউজড নার্ভস ! 
প্রশ্ন : হাংরি আন্দোলনের সময়ে আপনার নামে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছিল । আপনাকে আগরতলা থেকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে । সেই সময়ে শান্তিনিকেতনের পাঠভবন থেকে আপনাকে বহিষ্কার করা হয় । এটা কি হাংরিদের সাথে যোগ থাকার কারণে ? কোথাও কোথাও অন্য কথাও শোনা যায় । প্রকৃত ঘটনা যদি পাঠকদের জানান ।
উত্তর : প্রকৃত ঘটনা এরকমই ।
প্রশ্ন: হাংরি মোকদ্দমায় গ্রেপ্তারের পর আপনি মুচলেকা দিতে অস্বীকার করেছিলেন বলে আপনাকে রাজসাক্ষী করতে চায়নি সরকারপক্ষ । যদি বিস্তারিত বলেন ।
উত্তর : মুচলেকা-ফুচলেকা এতোসব জানি না প্রণব । আমার কাছে যা সত্য মনে হয়েছে আমি বলেছি, লিখিত স্টেটমেন্ট দিয়েছি । এই উত্তরের সঙ্গে তুমি যদি অরিজিনাল স্টেটমেন্ট অ্যাজ ইট ইজ জুড়ে দাও তাহলে পাঠক সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবে । এটা করা তোমার দায়িত্ব ।
প্রশ্ন : হাংরিরা কলকাতায় গাঁজা হ্যাশিশের ঠেক, খালাসিটোলা, সোনাগাছির মতন এলাকায় যেতেন এবং দলবেঁধে হৈ-চৈ করতেন । এ সংবাদ কি সত্য ? তাহলে জানতে ইচ্ছে করছে আপনি বিদেশে থাকার সময়ে কখনও শ্রমিকদের মদ্যপানের পাবে, রেডলাইট এরিয়ায় ককনও গেছেন ? কলকাতার খালাসিটোলা, বারদুয়ারিতে কবি-সাহিত্যিকদের অবাধ বিচরণ । বিদেশেও কি তাই ?
উত্তর: না, সত্য নয় -- অর্ধসত্য । এটা ওদের ব্যক্তিগত ব্যাপার । তাদের সাহিত্য রচনার সঙ্গে একেবারে নিঃসম্পর্কিত, তাই এসব গুজবকে গুরুত্ব দেবার মানে হয় না । এসব অভিজ্ঞতা এদেশেই এতো সব হয়েছে যে বিদেশে আর তুলনামূলক অভিজ্ঞতা নেবার প্রয়োজন বোধ করিনি । তাছাড়া, এতো সময় কোথায় ? এসব ব্যাপারকে বিদেশে খুব গুরুত্ব দেয়া হয় না । ইউরোপ আর ১৯৩১ এর মিলারের ইউরোপ নয় --- আমেরিকাতেও গ্রিনিচ ভিলেজের গুরুত্ব এখন অতিশয় নগণ্য । তোমার মাথায় এসব স্ক্যাণ্ডালাস প্রশ্ন আসে কি করে প্রণব ? অভাবনীয় ।
প্রশ্ন : কথা ও কাহিনী ও দে'জ থেকে যে হাংরি সংকলন প্রকাশিত হয়েছে, ওই দুটি গ্রন্হে অন্তর্ভূক্ত লেখকরা কি সবাই হাংরি আন্দোলনে ছিলেন ? নাকি প্রকাশকদের চাহিদা মেটাতে সংকলনটিকে বড়ো করার জন্য অনেক অ-হাংরি লেখকদের লেখাও যুক্ত করা হয়েছে ? তার মধ্যে অনেকে কবিদের আত্মীয়স্বজন এমনকী পাঁচের দশকের কবিদের অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে । এভাবে কি ইতিহাসে ভূলবার্তা দেয়া হচ্ছে না ? একটি সংকলনে আপনাকেও বর্জন করা হয়েছে । কী বলবেন ?
উত্তর: কথা ও কাহিনী ও দে'জ-বাবুদের সংকলন দুটি সম্পূর্ণ আলাদা -- প্রথমটি নির্বাচিত রচনা সংকলন, দ্বিতীয়টি ক্ষুধার্ত পত্রিকার সংকলন । "আত্মীয়স্বজন" ব্যাপারটা আমি জানি না --- যদি তা হয়েও থাকে -- লেখালিখির গুণগত মান থাকলে ছাপা হতে আপত্তি কোথায় ! প্রণব, এবিষয়ে সঠিক উত্তর যাঁরা দিতে পারতেন, বাসুদেব ও শৈলেশ্বর, তারা দুজনেই এখন প্রয়াত । কথা ও কাহিনীর সংকলনের রূপকার প্রধানত তিনজন : বাসুদেব, শৈলেশ্বর এবং সম্পাদক সমীর চৌধুরী । তিনিও মৃত । দে'জ এর সংকলনটি শৈলেশ্বরের একক তত্ত্বাবধানে হয়েছে । এ ব্যাপারে কারোর, আমার অন্তত, লিখিত অনুমতিও নেওয়া হয়নি । বইটির কোনও কপিরাইটও নেই । শৈলেশ্বরও নেই । কেন যে এতো তড়িঘড়ি করে সে এই বইটির প্রড়োজনা করল, এখন তা জানার উপায় নেই । এটা তোমাদেরই বের করা দরকার । আমার সময়, আগ্রহ, কোনোটাই নেই ।
প্রশ্ন : হাংরি কবি সুবো আচার্য একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে যোগ দিয়েছেন । সুভাষ ঘোষ, বাসুদেব দাশগুপ্ত একটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন। উল্লেখিত কবি-লেখকদের এই অবস্হান মেনে নিলেও কি তাঁদের হাংরি বলবেন? হাংরি আন্দোলন ঘোষিতভাবেই ছিল প্রতিষ্ঠানবিরোধী, ধর্মবিরোধী -- প্রতিষ্ঠানের প্রতি এনাদের অবস্হান পরিবর্তন কি তাঁদের লেখালিখিকে প্রভাবিত করেছে বলে মনে হয় আপনার ?
উত্তর: ভারতবর্ষ একটি ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক দেশ । হাংরি জেনারেশন কোনো একনায়কতন্ত্রী প্রতিষ্ঠান নয় । একনায়কতন্ত্র থাকলে প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা থাকতে পারে না । হাংরিরা প্রতিষ্ঠানবিরোধী । কোনো সৃষ্টিশীল লেখকের রচনা কেমন হবে তা বলা কখনই সম্ভব নয় । এখানে আমার মতামতের কোনো মূল্য নেই । আমি মনে করি কোনো লেখকই ধর্ম ও রাজনীতি থেকে পুরোপুরি মুক্ত থাকতে পারে না । চীন রাশিয়া ভারতবর্ষে তো নয়ই । ঐসব ঘোষণা কে কখন এবং কেন করেছিল আমার তা জানা নেই । হয়তো অতিশয়োক্তি, জোক ।
প্রশ্ন: হাংরি সাহিত্য কি পরবর্তীকালে বাংলা সাহিত্যকে প্রভাবিত করতে পেরেছে বলে মনে করেন ? পরবর্তী প্রজন্মের কবি-লেখকদের রচনায় কবিতা ও গদ্যের হাংরি বৈশিষ্ট্য চিহ্ণিত করতে পারেন ? একটু যদি ভালোভাবে ব্যাখ্যা করেন ।
উত্তর: অবশ্যই খানিকটা প্রভাবিত করে থাকবে । বিশেষত শব্দ, তা বাক্য ও বক্তব্য প্রকাশের স্বাধীনতা--- নানা প্রতিকূলতার মধ্যেই হাংরি যা প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিল, এটা একটা বিরাট, অভাবনীয় জাম্প ।
প্রশ্ন : হাংরি আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা হিসাবে গ্রেপ্তারের পর মলয় রায়চৌধুরী অন্যদের মতো মুচলেকা দিয়ে চলে যেতে পারতেন । ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত জেনেও, জেল হতে পারে জেনেও, মুচলেকা দেননি, বা ২০০৪ সালে সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার লিখিতভাবে ফিরিয়ে দেয়া কি মলয়বাবুর হাংরি আন্দোলনের প্রতি সততার প্রমাণ ? হাংরি উত্তর অনেক কবিই যেখানে পুরস্কার নিয়ে সন্মানিত বোধ করছেন ( শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, উৎপলকুমার বসু ) একটু বিস্তারিত যদি বলেন ।
উত্তর : মলয়ের স্টেটমেন্ট সম্পর্কে আমি একেবারে অজ্ঞ । মলয়ের সাহিট্য অকাদেমি পুরস্কার প্রাপ্তি প্রত্যাখ্যানের খবর এই প্রথম শুনলাম । এ বিষয়ে প্রামাণ্য কাগজপত্র যদি এ উত্তরের সঙ্গে ছেপে দাও তাহলে পাঠকদের সুবিধা হবে । মলয় একক ও অনন্য । তাকে অন্যদের সঙ্গে উপমিত করার কোনো প্রয়োজন নেই বলেই মনে হয় । ব্যক্তি নিজেই একমাত্র তার নিজের লেখা বিচার করতে পারে । পাঠক পারে গ্রহণ ও বর্জন করতে ।
প্রশ্ন : অনেকে বলেন মূলত পঞ্চাশ দশকের কবিরাই হাংরি আন্দোলনের বিরোধিতায় ইন্ধন জুগিয়েছিলেন । সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কৃত্তিবাসের সম্পাদকীয়, প্রকাশিত চিঠি, সাক্ষাৎকার ইত্যাদি থেকে অনুমান করা যায় যে, তিনি বাইরে থেকে হাংরি আন্দোলনকে ভেঙে দেবার চেষ্টা করেছিলেন । আপনি শঙ্খ ঘোষের "শব্দ ও সত্য" প্রবন্ধটির কড়া সমালোচনা করে প্রবন্ধ লিখেছিলেন। আপনার কি মনে হয় যে সুনীলবাবু যে কাজ বাইরে থেকে করতে চেয়েছিলেন, একই কাজ শঙ্খবাবু ভেতর থেকে করতে চেয়েছেন ?
উত্তর : বলা শক্ত । সুনীল ও শঙ্খ দুজনেই কবি । কবিরা তো নুতন কবিতা আন্দোলনে খুশি হয় । হবতো ওনারা কোনো চাপের মুখে হাংরি আন্দোলনের বিরোধিতা করে থাকতে পারেন । কিন্তু মনেপ্রাণে ওনারা দুজনেই হাংরি রচনার ভক্ত বলেই জানি ।
প্রশ্ন : রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে হাংরিদের নানা মত । আপনার মতামত জানতে চাইবো ।
উত্তর: রবীন্দ্রনাথ ইজ গ্রেট । তাঁর গ্রেটনেস আমার মতামতের উপর নির্ভর করে না । রবীন্দ্রনাথের গল্প, উপন্যাস ও গান আজও আমার কাছে আকর্ষণীয় । আমি এখনও নিয়মিত রবীন্দ্রচর্চা করি ।
প্রশ্ন : ত্রিপুরায় আপনার দ্বারা উৎসাহিত হয়ে অনেক তরুণ কবি নিজেদের হাংরি আন্দোলনকারী রূপে ঘোষণা করেছিলেন বলে জানা যায় । আপনি গুটিয়ে নেবার কারণেই কি তাদের উৎসাহে ভাঁটা পড়ে ? এনাদের কোনও লেখা কলকাতার লিটল ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয় এখন ? এনাদের বিষয়ে কিছু বলুন।
উত্তর: আমার "গুটিয়ে নেওয়া" ( ধরা যাক ) ত্রিপুরার সাহিত্য চর্চায় কোনও প্রভাব ফেলেনি। সেখানকার কবি-লেখকরা এখনও সমানভাবেই অ্যাগ্রেসিভ লেখা লিখে চলেছে । ওদের সাহিত্যনিষ্ঠা কোলকাতার কবি-লেখকদের আদর্শ হতে পারে । কোলকাতার লিটল ম্যাগাজিনে হত্যে দেবার কোনও কারণ নেই । ওনাদের পত্রপত্রিকা অনেক, এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ । কবিতা উপত্যকা থেকে প্রকাশিত "অনার্য" একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কবিতাপত্র । আমি এর অধিকাংশ সংখ্যাতেই লিখি । কোলকাতার কাগজপত্রগুলি ওরা অনেকটা বর্জ্য বলেই মনে করে । আমি ত্রিপুরা চেড়েছি চল্লিশ বছর আগে কিন্তু এখনও বছরে অন্তত একবার ওখানে যেতে চাই --- ত্রিপুরার কবি বন্ধুদের ভালোবাসার টানে ।

[ প্রণবকুমার চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত "হাংরি সাহি্য আন্দোলন : তত্ত্ব, তথ্য, ইতিহাস" গ্রন্হে প্রকাশিত । প্রকাশক প্রতিভাস, ১৮এ গোবিন্দ মণ্ডল রোড, কলকাতা ৭০০ ০০২, দাম ৫০০ টাকা ] 
                                    


 

শুক্রবার

সুবো আচার্য, হাংরি আন্দোলন, সাক্ষাৎকার

( সুবো আচার্য ছিলেন হাংরি আন্দোলনকারী । তাঁর বিরুদ্ধেও গ্রেপতারি পরোয়ানা ছিল । কিন্তু তিনি সেসময়ে ত্রিপুরার একটি গ্রামে গিয়ে গা ঢাকা দেন। পরে পুলিশ কেবল মলয় রায়চৌধুরীর বিরুদ্ধে মামলা করেছে শুনে সুবো আচার্য ত্রিপুরা থেকে ফেরেন, এবং দেওঘরে গিয়ে অনুকূল ঠাকুরের শিষ্যত্ব নিয়ে সাহিত্যজগত থেকে উধাও হয়ে যান । স্টেট ব্যাংকের চিফ ম্যানেজার হিসাবে অবসর নেবার পর কলকাতায় ফিরলে 'চন্দ্রগ্রহণ' পত্রিকার সম্পাদক প্রণবকুমার চট্টোপাধ্যায় তাঁকে খুঁজে বের করে এই সাক্ষাৎকারটি নেন । আগ্রহীরা পড়ে সুবো আচার্যের পলায়ন ও পুনরাবির্ভাব ও নির্বাণের গল্প পাবেন সাক্ষাৎকারটিতে । 'চন্দ্রগ্রহণ' পত্রিকা, বসন্ত সংখ্যা, ২০১৪, ৭ বরদাকান্ত রোড, দমদম, কলকাতা ৭০০ ০৩০, মুঠোফোন : ৯৮৩১৬৭৯৩৭৭ )
প্রশ্ন : আপনার সম্পর্কে আমরা কিছুই জানি না । হাংরি আন্দোলন মামলায় যাঁরা রাজসাক্ষী হয়েছিলেন, তাঁদের মুচলেকা থেকে তাঁদের পারিবারিক তথ্য পাওয়া যায় । আপনি যদি আপনার জন্ম, বাবা-মা, পরিবার, বাল্যকাল নিয়ে কিছু বলেন তাহলে ভালো হয় ।
উত্তর: আর দশটা বাঙালি মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেরা যেভাবে মানুষ হয়, আমিও সেভাবেই মানুষ হয়েছি -- খুব অল্প বয়সেই, দেশভাগের সামান্য আগে আমরা বাঁকুড়ায় চলে আসি --- সেখানেই আমার বড়ো হওয়া --- স্কুল-কলেজের পরে কলকাতায় এসে পড়াশুনো -- প্রথমে প্রেসিডেন্সি কলেজের মাধ্যমে  কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ( ড. হরপ্রসাদ মিত্রের সৌজন্যে ) কিন্তু অল্প কিছুদিন পরেই যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে তুলনামূলক সাহিত্যের পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ক্লাসে ভর্তি হই -- পরে এমন সব ঘটনা ঘটতে থাকে, যে একসময় আমি বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে চলে আসি আমার তখনকার বন্ধু প্রদীপ চৌধুরীর সঙ্গে -- মূল কারণ ছিল কবিতা লেখা ও জীবনকে দেখা -- এছাড়া আর কিছু নয় --- তখনও হাংরি জেনারেশানের কারুর সঙ্গে আলাপও হয়নি --- আমার এ সিদ্ধান্ধ একজনই মাত্র সমর্থন করেছিলেন -- তিনি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় -- আয়ওয়া থেকে একটি চিঠিতে লিখেছিলেন --"যেভাবে জীবন কাটাতে চাইছ সেটা দিব্য"-- তারও প্রায় বছরখানেক বাদে যোগাযোগ হয় শৈলেশ্বর, সুভাষ, বাসুদেব, দেবী রায় আর ফালগুনী রায়ের সঙ্গে --- বন্ধুত্ব হয়, ভাববিনিময় হয়, একসঙ্গে উন্মত্ত জীবনযাপন শুরু হয় -- কলকাতার নাড়িনক্ষত্র, অন্ধিসন্ধি, গলিঘুঁজি দেখতে দেখতে চোখের ওপর থেকে যেন একটা পর্দা সরে যায় -- মলয়ের সঙ্গে জীবনে দুবারই দেখা হয়েছে --- একবার দুমকায় সমীরদার কোয়ার্টারে তাঁর আম্ন্ত্রণে গিয়ে -- দ্বিতীয়বার মলয় যখন সাহিত্যসংক্রান্ত মামলা মিটে যাওয়ার পর সুবিমল আর ত্রিদিবকে নিয়ে আমার তখনকার চাকরি স্হলে এসেছিলেন -- তখন সদ্য পিতৃহীন হয়েছি -- বিধবা মা আর এক দাদার সঙ্গে থাকতাম--- সঙ্গী ছিল গ্রন্হ, গ্রন্হ, গ্রন্হ --- লেখা আর লেখা আর লেখা আর বিরতিহীন, একাকী মদ্যপান আর মৃত্যুচিন্তা-- মৃত্যুর চিন্তা আমার সর্বক্ষণের সঙ্গী ছিল -- জীবনের এক বিচিত্র উদঘাটন হতে থাকে আমার কাছে --বাড়ির কাছেই ছিল একটা শ্মশান -- মধ্যরাতে ছাদে দাঁড়িয়ে মদ্যপ এক মৃত্যুচিন্তাকাতর যুবা, যে কয়েকবছর আগেও ধর্মতলা এলাকায় সন্ধ্যেয় ট্র্যাফিক অগ্রাহ্য করে উচ্চস্বরে কবিতা আবৃত্তি করতে করতে রাস্তা পেরোতো--- কলকাতা কিন্তু কবিকে অসন্মান করেনি -- নয়তো কবেই মরে যেতুম -- দেঘরে 'সৎসঙ্গ আশ্রমে শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের সমীপে পৌঁছোই মৃত্যুরহস্য জানার জন্য -- তাঁরই নির্দেশে আমার দীক্ষা -- তাঁর দুটি মাত্র ছোট বাক্য বুঝতে আমার বছর আষ্টেক সময় লেগেছিল -- জীবনের দিগন্ত খুলে যেতে থাকে -- তাঁরই অনুপ্রেরণায় আমি যাবতীয় ধর্মগ্রন্হ থেকে হাহরণ করতে থাকি সারকথাগুলি--- জীবনের রাস্তাটাই সম্পূর্ণ বদলে যায় -- কথা যদি আমি বলি যে, তিনি সর্বক্ষণ আমার সঙ্গে থাকেন-- তাহলে লোকে পাগল বলবে আমায় । এই যে আপনার প্রশ্নগুলির উত্তর লিখছি এখনও তিনি আমার সঙ্গে আছেন --- ফলে সত্য থেকে বিচ্যুত হওয়া বা অহং নিয়ে মত্ত হহোয়ার কোনো উপায়ই নেই । তাঁর অনন্ত করুণা ও দয়ায় আমি গোটা জীবনটাকে দেখতে পাই -- শুধু দেখি না, মৃত্যুর ওপরে বসে প্রার্থনা করি, "অন্ধজনে দেহ আলো, মৃত্যুজনে দেহ প্রাণ--"
প্রশ্ন : হাংরি আন্দোলনে আপনি কার মাধ্যমে যোগ দিলেন ? কবে নাগাদ আপনার মনে হল যে এই আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে আপনি আত্মপ্রকাশ করতে পারবেন ? যে কাজকর্মের জন্য ষাটের অন্যান্য গোষ্ঠীর তুলনায় হাংরিদের খ্যাতি, তাতে কি অংশ নিতেন ? খালাসিটোলা যাওয়া, গাঁজা-হ্যাশিশ টানা, দলবেঁধে যত্রতত্র যাওয়া, ইত্যাদিতে অংশ নিয়েছেন কি ? হাংরি আন্দোলন মকদ্দমায় আপনার বিরুদ্ধেও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ছিল । পুলিশ কি আপনার খোঁজে গিয়েছিল ? গ্রেপ্তার হলে মুচলেকা দিতেন ? মকদ্দমার সময়ে বন্ধুদের সমর্থনে নিম্ন/উচ্চ আদালতে যেতেন ? মকদ্দমার সময়ে আপনি কোথায় থাকতেন ?
উত্তর : আমি, যতদূর মনে পড়ে, শৈলেশ্বর, সুভাষ, বাসুদেব এবং প্রদীপের সঙ্গেই মেলামেশা করতাম -- মলয়ের সঙ্গে যোগাযোগ হয় বহু পরে -- কারুর বেঁধে দেয়া ম্যানিফেস্টো বা নিয়মে লেখার কথা ভাবিনি কখনও, ফলে আমার ব্যাপারটা ছিল আমার মতন । লেখার ব্যাপারে আমার সেরকম কোনও বাসনা ছিল না -- শেক্সপিয়ার এর ঐ লাইনটা আমি খুব সমর্থন করি --"অ্যাম্বিশান ইজ এ থিং হুইচ মেকস অ্যান এনজেল এ সিনার" । প্রতিষ্ঠা বা নানারকম বিশেষণে ভূষিত হওয়া নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই । মলয়ের মামলা চলার সময়ে আমি ত্রিপুরায় থাকতাম -- তেলিয়ামুড়া নামে একটা জায়গায় স্কুলশিক্ষক ছিলাম -- কলকাতার সঙ্গে কোনো যোগাযোগ ছিল না -- ফলে এদিকের কিছুই জানতাম না । ওখানে ছমাসের বেশি থাকার পর আমি কলকাতায় ফিরে আসি । না, পুলিশ আমার সম্পর্কে কি কি করেছিল জানি না -- তবে, ওরা একটা ক্ষতি করেছিল -- ওদেই অ্যাডভার্স রিপোর্টের জন্য মিনিস্ট্রি অফ এক্সটারনাল অ্যাফেয়ার্স এ আমার প্রায় হওয়া একটা চাকরি শেষ অব্দি হয়নি -- মনে পড়ে, খুব ব্যথা পেয়েছিলাম -- বাস্তব ক্ষতি হয়েছিল দুটো -- আমার পিতৃদেব খুব হতাশ অবস্হায় চলে গিয়েছিলেন -- এবং যে মেয়েটি আমার জন্য বহু বছর অপেক্ষা করেছিল, সে শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যা করে । কিন্তু এতে ওদের আর কি যায় আসে । আজ আমারও কিছু এসে যায় না । ইট ইজ এ পার্ট অফ দি গেম । ধ্বংস ও সৃষ্টির লীলা ছাড়া একে আর কি বলা যায় !
প্রশ্ন : আপনি কি নিজেকে প্রতিষ্ঠানবিরোধী মনে করেন ? অনেকে অভিযোগ করেন যে হাংরিরা প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার কথা বলে অথচ গোষ্ঠীপতি দাদা ও বইবাজারের বাণিজ্যিক কর্তাদের ধরে সংকলন প্রকাশ করতে এবং তার জন্য টাকা নিতে, তাদের বাধে না । এ বিষয়ে আপনার অবস্হান যদি স্পষ্ট করেন ।
উত্তর : এই চিন্তা থেকে আমি লক্ষ মাইল দূরে । তাছাড়া আমি বোধহয়, সেরকম গুরুত্বপূর্ণ কিছু ছিলাম না । শক্তি বা সন্দীপন সম্পর্কে কিছু বলতে পারবো না । তবে এদেশে প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার কথা বলে প্রাতিষ্ঠানিকতার প্রতি লোভ অনেকেরই আছে । সকলেই তো আর সতীনাথ ভাদুড়ি বা শঙ্খ ঘোষ নন । তাছাড়া লেখাটাই তো কথা, মূল ব্যাপার ।
প্রশ্ন : 'কথা ও কাহিনি' প্রকাশিত সংকলনটি সম্পাদনা করেছিলেন সমীর চৌধুরী । সম্পাদকীয় পড়ে আমাদের মনে হয়েছে যে হাংরি আন্দোলন সম্পর্কে সমীর চৌধুরীর কোনো ধারণা ছিল না । তিনি কয়েকজনের রচনা নিয়ে দপ্তরির কাজ করেছেন । আপনি কী বলেন ?
উত্তর : আপনার কথাই তো ঠিক ।
প্রশ্ন : দে'জ থেকে প্রকাশিত হাংরি সংকলনটিকে অনেকে বলেন 'দারা-পুত্র-পরিবার' সংকলন । যে চারজন হাংরি আন্দোলনের সূত্রপাত করেছিলেন, তাঁদের রচনা এই সংকলনে নেই । যাঁদের কার্যকলাপের জন্য হাংরি আন্দোলনের খ্যাতি, তাঁদের রচনা নেই । যাঁদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বেরিয়েছিল, তাঁদের অধিকাংশের রচনা নেই । তার পরিবর্তে আছে অমুকের স্ত্রী, তমুকের শ্যালক, তমুকের আত্মীয়, পাঁচের দশকের কবি, ইত্যাদি । আপনি সৎপথের ধার্মিক মানুষ হয়ে কোন তর্কে এই সংকলনে নিজেকে অন্তর্ভুক্ত করলেন ?
উত্তর : ঐ সংকলনের কথা আমি জেনেছি 'দেশ' পত্রিকার বিজ্ঞাপন থেকে -- প্রদীপ চৌধুরীর টেলিফোন পেয়ে । আমি করলে অবশ্যই অন্যরকম হতো । মলয়কে বাদ দেয়া মানে তো শিরচ্ছেদ করা ।
প্রশ্ন : আপনি অনুকূল ঠাকুরের শরণাপন্ন কেন হলেন ? আপনি কি হাংরি আন্দোলনের জীবনে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন বা অধঃপতনের পথে চলে যাচ্ছিলেন ? আপনার কি মনে হয়েছিল যে হাংরিদের জীবন প্রকৃতপক্ষে একটি ইঁদুরকল, এবং তা থেকে মুক্তি প্রয়োজন ? হাংরি আন্দোলনের সঙ্গে কি অনুকূল ঠাকুরের মতবিরোধ আছে ? অনেকে তেমনটাই মনে করেন । আপনি কি বলবেন ?
উত্তর : প্রশ্নের প্রথম অংশ সম্পর্কে কিছুই বলবো না । শুধু দেবীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথা সম্পর্কে বলি -- বই পড়ে কখনও ভগবানের অনুভূতি হয় না -- ঈশ্বরের জ্ঞান পেতে হলে কি করতে হয় ? ভগবান শ্রীরামকৃষ্ণদেব বলেছেন, "ঈশ্বর শুদ্ধ মনের গোচর" -- আগে জলে নামতে হবে তবে তো সাঁতার -- ডাঙায় সাঁতার দিলে বুকের ছাল-চামড়া ছিঁড়ে যাবে । কবি সমর সেনের 'বাবু বৃত্তান্ত' পড়লে এমন একটা দৃষ্টান্ত পাবেন যা অফুরন্ত হাসির খোরাক হয়ে আছে । হাংরিরা অসম্পূর্ণ -- ঠাকুর সম্পূর্ণ -- তিনি দ্বন্দ্বাতীতং গান সদৃশং ।
প্রশ্ন : আপনি কোনো কাব্যগ্রন্হ প্রকাশ করেননি কেন ? অথচ আপনি আপনার কবিতা 'কথা ও কাহিনি' এবং 'দে'জ' প্রকাশিত সংকলনে অন্তর্ভুক্তির জন্য দিয়েছেন ? আপনি তো স্টেট ব্যাঙ্কের উঁচু পদে ছিলেন, মাইনেও ভালো পেতেন, তবু কাব্যগপ্রন্হ প্রকাশ করলেন না কেন ? আমরা, সাধারণ পাঠকরা, আপনার একটি কাব্যগপ্রন্হ খুঁজে বেড়াই ।
উত্তর : ভীষণ টাকার অভাব -- নয়তো, প্রকাশক পেলে হয়তো একটি বই বার করা যেতো ।
প্রশ্ন : আপনি কি মেডিটেশন করেন ? মেডিটেশনের সময়ে আপনার মনে কি কোনো কবিতার উন্মেষ ঘটার সম্ভাবনা দেখা দেয় ? এখনকার তরুণ কবিদের মেডিটেশান সম্পর্কে কোনো পথনির্দেশ দিতে পারেন কি ?
উত্তর : পরামর্শ দিলে কেউ কি শুনবেন ? স্বামী বিবেকানন্দের 'ইন সার্চ অফ গড অ্যাণ্ড আদার পোয়েমস' পড়েছেন ? সন্ত কবীরের দোহা পড়লে বিস্ময়ে মূক হয়ে যেতে হয় -- এগুলো সবই মেডিটেশনের পথে পাওয়া -- কবীর পড়তে পড়তে আমি বার বার দেখি রবীন্দ্রনাথের অনেক আগেই তিনি অনেক কথা বলেছেন যা রবীন্দ্রনাথে ঘুরে ফিরে এসেছে । তবে ব্যক্তিটি তো রবীন্দ্রনাথ -- অসম্ভব এবং প্রবল পরিপাক শক্তি ছিল তাঁর । কবীরের ব্যবহৃত শব্দগুচ্ছ রবীন্দ্রনাথ বাংলায় এনেছেন ঈষৎ পরিবর্তিত করে । এবং মনে হবে এসবই রবীন্দ্রনাথের ।
প্রশ্ন : সুভাষ ঘোষ ও বাসুদেব দাশগুপ্ত সিপিএম-এ যোগ দিয়ে ছিলেন, অথচ হাংরি পত্রিকাও প্রকাশ করতেন । সুভাষ ঘোষের বাড়িতে জ্যোতি বসুর ফোটো ঝোলানো থাকত, লাল ঝাণ্ডার ভাঁড়ার ছিল । তাঁরা দুজনেই সিপিএম-এর মিছিলে অংশ নিতেন । তাঁদের এই রাজনৈতিক কার্যকলাপ কি প্রতিষ্ঠানের আশ্রয়ে তাঁদের সুবিধাভোগী প্রমাণ করে না ? আপনার কি মনে হয় ?
উত্তর : কি জানি, ওদের রাজনৈতিক মতামত নিয়ে কখনও আমার সঙ্গে কথা হয়নি । বাসুদেবের শেষ দিকের রাজনৈতিক উপন্যাস আমার একেবারেই ভালো লাগেনি ।
প্রশ্ন : 'চন্দ্রগ্রহণ' পত্রিকার হাংরি আন্দোলন সংখ্যা ( সেপ্টেম্বর-অক্টোবর ২০১৩ ) পড়ে আপনার কি মনে হয়েছে যে 'কথা ও কাহিনি' এবং 'দেজ' থেকে প্রকাশিত সংকলনগুলির তুলনায় এটি একটি সামগ্রিক কাজ, এবং সেকারণে প্রশংসনীয় ?
উত্তর : কিছুই হয় না --- যতক্ষণ না দেখছি ততক্ষণ কোনও মন্তব্য করা ঠিক হবে না ।
প্রশ্ন : আপনি কি জানেন যে হাংরি আন্দোলন নিয়ে পিএইচ ডি এবং এম ফিল হয়েছে ? ওয়েসলিয়ান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মারিনা ডি হেলার হাংরি আন্দোলন নিয়ে গবেষণা করেছেন ? ইউটা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনামিকা বন্দ্যোপাধ্যায় ফিল্ম তুলে নিয়ে গেছেন ? ইউ টিউবে হাংরি কবিতা পাঠ করে রেকর্ড করেছেন বাংলাদেশ, আমেরিকা, কানাডা ইত্যাদি দেশের কবিরা ? ফালগুনী রায়ের কবিতা নিয়ে ফিল্ম করেছেন শর্মী পাণ্ডে ? মলয় রায়চৌধুরীর 'প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার' কবিতাটি নিয়ে ফিল্ম করেছেন মৃগাঙ্কশেখর গঙ্গোপাধ্যায় ? এই সংবাদগুলো শুনে আপনার কেমন প্রতিক্রিয়া হয় ? 'বাইশে শ্রাবণ' নামে একটি ফিল্মে প্রখ্যাত পরিচালক গৌতম ঘোষ জনৈক হাংরি কবির ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন, জানেন ? ফিল্মটি আপনি দেখে থাকলে আপনার প্রতিক্রিয়া জানতে চাইব ।
উত্তর : সিনেমাটা আমার সেভাবে দেখা হয়নি । তবে গৌতম ঘোষ একজন ব্রিলিয়ান্ট অভিনেতা -- সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেনের পরে দুজন আমার খুব প্রিয় পরিচালক -- একজন আমার একদাকালের বন্ধু বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত -- অন্যজন অবশ্যই দি ম্যাসকুলাইন বয় অফ মাই টাইম, গৌতম ঘোষ । তৃতীয়জন সৃজিৎ মুখোপাধ্যায় । তবে যা বর্ণনা শুনেছি, আমরা একটু অন্যরকম ছিলাম । দৃশ্যত আমাদের অবয়বেই খানিকটা পাগলামির ভাব ছিল। কিন্তু আমরা আত্মহত্যা করিনি -- একটা অনুসন্ধান ছিল আমাদের -- সেটা অবিশ্যি এক একজনের এক একরকম । অ্যালেন গিন্সবার্গের তো শেষ পর্যন্ত বৌদ্ধদর্শনে খুব বিশ্বাস হয়েছিল । যদিও ওঁর ঈশ্বরানুভূতির ব্যাপারটা সেভাবে আমাদের প্রভাবিত করেনি  -- যা ওঁদের প্রবল ক্ষতি করেছে তা হল নানা রকমের নেশা । বাহিরের চেষ্টায় কিছু হবে না ভাই -- এটা সম্পূর্ণ অন্তর্গত ব্যাপার । প্রণব, শ্মশানে গেলেই কি সব হয় ? ঈশ্বরলাভের জন্য বহু জন্মজন্মান্তের সুকৃতি লাগে । আর লাগে সংকল্প, লাগে "মুখ্য হরিকথা -নিরূপণ" করে যাওয়া । মানুষের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার ঈশ্বরকে বা মূল উৎসকে খুঁজে পাওয়া -- সেটা হলেই সমস্ত অসম্পূর্ণতা তুচ্ছ হয়ে যায় । কবিতা মানে তো আমার কাছে আজ 'দি জার্নি টোয়ার্ডস দি ইটারনাল ট্রুথ -- আমি কি চাই ? এ টাচ অফ দি ইনফিনিট -- এ টাচ- এ রিয়াল টাচ । কোনো অজ্ঞাত কারণে আমার বেঁচে থাকা নয় । শংকরাচার্য বলতেন --ব্রহ্ম সত্য, জগত মিথ্যা-- বুদ্ধও তাই বলতেন -- সূক্ষ্ম ভাবনা থেকে সূক্ষমতর ভাবনায় যেতে হবে -- বাসনার দাস হলে নির্বাণের পথ বন্ধ হয়ে যায় । সেইজন্যেই সহস্রমুখ চেতনার অধিকারী হতে হয় ।