রবিবার

তাপস মাইতি লিখেছেন মলয় রায়চৌধুরীকে


মলয়দা, আপনি আপনার মতো সেটাই আপনার বৈশিষ্ট্য। এক জায়গায় আপনি বলছেন 'আন্দোলন শুরু করার অনেক পরে আপনি ইয়োরোপীয় সাহিত্য পড়েছেন কারন সে সুযোগ ও সুবিধা ওই সময় আপনার ছিল না'। অনেকে কিন্তু বিশ্বসাহিত্য সম্পর্কে অগাধ পান্ডিত্য নিয়েও কোনো আন্দোলনে পা রাখতে পারেনি, তফাৎটা বড় পরিস্কার। আপনি বিখ্যাত বহু সাহিত্যিকদের আপনাকে লেখা চিঠি সিন্দুকে না জমিয়ে রেখে কমোডে ছিঁড়ে ফেলে দিয়েছেন, কারন তা ভাঙিয়ে বেঁচে থাকার ইচ্ছা আপনার নেই। পড়ে ফেলা বইয়ের প্রতি আপনার মোহ নেই তাই তা সঙ্গে নিয়ে ঘুরে বেড়ান না আগ্রহী পাঠকদের বিলিয়ে দেন। সময় থেকে আপনি অনেক এগিয়ে। প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে অন্যের মাথা ব্যথা হবে, আপনাকে গন্ডিতে দরে রাখা মুশকিল।
তাপস মাইতি

বৃহস্পতিবার

অর্ঘ্য দত্ত'র প্রশ্ন --- অনুপম মুখোপাধ্যায়-এর উত্তর

অর্ঘ্য দত্তের প্রশ্ন :
 "আজ মলয় রায়চৌধুরীর জেল না হলেও কি উনি হাংরির মুখ হয়ে উঠতেন? উনি কি ঐ ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ এখন‌ও আত্মপ্রচারের জন্য অপ্রয়োজনেও ব্যবহার করেন বলে মনে হয় না?"


অনুপম মুখোপাধ্যায়ের উত্তর : 
"আমার যতদূর জানা আছে, মলয় রায়চৌধুরীই তো আহ্বায়ক ছিলেন ওই মুভমেন্টের। বাকিরা অনেকেই পরে ওঁকে ল্যাং মেরেছিল। কিন্তু আজ তারাই হাংরির খ্যাতিতে ভাগ বসাতে চায়। মলয়দা এখনও দারুণ লিখছেন। মলয়দার যদি জেল না হত, তাহলে কী হত? জানি না। যেমন জানি না রবীন্দ্রনাথ নোবেল না পেলেও ২৫শে বৈশাখে ইস্কুল কলেজে ছুটি থাকত কি না। মলয়দা জানেন যদি নিজের অমরত্বের আয়োজন উনি নিজেই না করে যান, ওঁর হয়ে সেই ব্যবস্থা কেউ করবে না। এটা রবীন্দ্রনাথও করে গেছেন। বাঙালি আত্মবিস্মৃত জাত। তার কুলীনতা নেই, অন্তত সেন আমল অবধি। এটা সম্ভবত একটা সমষ্টিগত মানসিক সমস্যা আমাদের সমাজে। বাঙালির অতীতে যেহেতু আর্যাবর্তের গৌরব নেই, সে তার অতীত ভুলতেই চায়। এখানে তাই যাঁরা বড় বাঙালি, তাঁরা নিজেদের স্মৃতিরক্ষার আয়োজন নিজেরাই করে যেতে বাধ্য হন, অন্যথায় তাঁদের মুছে যেতে হয়। মলয়দা সেটাই করছেন। যদি তিনি অনবরত হাংরি নিয়ে কথা না বলে যেতেন, দেখতেন সোশ্যাল নেটওয়ার্কে ও নিয়ে আলোচনাই হত না। যেমন ফেসবুকে দেখবেন পবিত্র মুখোপাধ্যায়কে নিয়ে কোনো কিছু উচ্চারিত হয় না। অথচ পবিত্রদাও ষাটের দশকে ধ্বংসকালীনের মতো মুভমেন্ট করেছিলেন, ‘কবিপত্র’-এর মতো পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন অর্ধশতক ধরে। তাঁকে নিয়ে কথা কই? আমি নিজেও যদি ফেসবুকে নিজের ঢাক তুমুল না বাজাতাম, সম্ভবত আপনি জানতেন না অনুপম বলে কেউ আছে, বা তার ইন্টারভিউ নেওয়া যায় নিজের কাগজের জন্য।"

মোহনা সেতুর কন্ঠে মলয় রায়চৌধুরীর "প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার"

যদি আমায় জিজ্ঞাসা করা হয়, আমি সবথেকে বেশি কোন কবিতা পড়েছি তবে আমি দুইটা কবিতার নাম বলব। এক. বিদ্রোহী ; দুই. প্রচন্ড বৈদ্যুতিক ছুতার।
৯০ লাইনের দীর্ঘ কবিতা মুখস্ত হয়ে গিয়েছে পড়তে পড়তে।
অবশ্য এই কবিতা কোনো পুরুষেরই।
আমি যেহেতু সমপ্রেমী না সেহেতু একজন নারীকে যোনী মেলে ধরার কথা বলতে পারি না। কিন্তু কবিতাটি আমার এত পছন্দ যে এসমস্ত কিছুকে পাত্তা দিলাম না।
"কেউ কথা রাখেনি " কবিতা যখন আমিসহ অনেক নারী পাঠ করতে বলি, এখন তার বুকে শুধুই মাংসের গন্ধ, এখনো সে যেকোনো নারী__ তখন এই কবিতায় বাধ্যবাধকতা থাকার কথা না।
-7:12

বৃহস্পতিবার

হাংরি জেনারেশন আন্দোলন নিয়ে '২২শে শ্রাবণ' ফিল্মে সৃজিৎ মুখোপাধ্যায়ের খিল্লি



হাংরি আন্দোলনকে ফিল্মে খিল্লি করেছিলেন সৃজিৎ মুখোপাধ্যায় তাঁর বাইশে শ্রাবণ-এ । কোনও প্রয়োজন ছিল না অথচ তিনি গৌতম ঘোষকে একজন হাংরি কবি হিসেবে তুলে ধরলেন যার লেখা নাকি কোথাও ছাপা হয় না আর যার বুদ্ধিবিভ্রম ঘটে গেছে ।  হাংরি আন্দোলন এই সিনেমায় এসেছে হাংরিয়ালিস্ট কবি নিবারণ চক্রবর্তী’র হাত ধরে। মানসিক বিকারগ্রস্থ এই কবি  হাংরি আন্দোলনকে নিজের মধ্যে ধরে রেখেছেন এবং কিছুটা মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে গভীর রাতে এলোমেলো ভাবে ঘুরে বেড়ান, সেলফোনে তাঁর কবিতার বইয়ের প্রকাশক রবীন্দ্রনাথের সাথে কথা বলেন, কবিতা আবৃত্তি করে শোনান রাতের মাতালদের। এই কবি পুলিশের খাতায় তালিকাভুক্ত,  কলকাতা বইমেলায় আগুন ধরিয়ে দেয়ার অপরাধে।  এই অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত শেষ পর্যন্ত মানসিক হাসপাতালে হয়েছিল। কোলকাতা শহরে ঘটে যাওয়া সিরিয়াল কিলিঙ একসময় এই কবির দিকেই আঙ্গুল তুলে ধরে। 
লোকটা কেমন হাংরি, যার বন্ধুবান্ধব নেই, দল নেই, কফি হাউসে যায় না, খালাসিটোলায় যায় না, বন্ধুদের নিয়ে হ্‌ইচই করে না, মধুসূদনের সমাধিতে খালাসিটোলায় বারদুয়ারিতে হাওড়া স্টেশনে নিমতলা শ্মশানে কফি হাউসে দাঁড়িয়ে জোরে-জোরে কবিতা পড়ে বন্ধুদের শোনায় না, মাদক নেয় না, নিজেদের দলের পত্রিকা নেই, নিজেই লিফলেটে ছাপাবার বদলে একজন খোচরের ওপর নির্ভর করে কবিতা প্রকাশের জন্য ! প্রসঙ্গত আমি প্রকাশ করতুম ‘জেব্রা’, সুবিমল বসাক ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’, অরুণেশ ঘোষ ‘জিরাফ’, দেবী রায় ‘চিহ্ণ’, ত্রিদিব ও আলো মিত্র ‘উন্মার্গ’ আর The Waste Paper,  প্রদীপ চৌধুরী ‘ফুঃ’, শৈলেশ্বর ঘোষ ‘ক্ষুধার্ত’, সুভাষ ঘোষ ‘ক্ষুধার্ত খবর’ এবং পরে অলোক গোস্বামী প্রকাশ করতেন ‘কনসেনট্রেশন ক্যাম্প’।  ফিল্মে কয়েকজন হাংরি আন্দোলনকারীর নামও উল্লেখ করা হয়েছে চরিত্রটাকে আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রমাণ করার জন্য ! এই ফিল্মের কারণে দর্শকদের কাছেও হাংরি আন্দোলন হয়ে উঠেছিল খিল্লি করার ব্যাপার । পরাবাস্তব আন্দোলন, ডাডা আন্দোলন, বিট আন্দোলন, র‌্যাঁবো-ভেরলেন নিয়ে যেসমস্ত ফিল্ম তৈরি হয়েছে তাতে তাঁদের খিল্লি করা হয়নি।

হাংরি জেনারেশন আন্দোলন নিয়ে গৌতম চক্রবর্তীর খিল্লি



আনন্দবাজার পত্রিকায় ১৬ জুন ২০১৩ তারিখে গৌতম চক্রবর্তী হাংরি আন্দোলন সম্পর্কে এই কথাগুলো লিখেছিলেন ; তাতেও রয়েছে খিল্লি, যা তিনি পরাবাস্তববাদীদের সম্পর্কে কখনও করেছেন কিনা জানি না । উনি লিখেছিলেন :
“মানুষ, ঈশ্বর, গণতন্ত্র ও বিজ্ঞান পরাজিত হয়ে গেছে। কবিতা এখন একমাত্র আশ্রয়।... এখন কবিতা রচিত হয় অর্গ্যাজমের মতো স্বতঃস্ফূর্তিতে।
১৯৬২ সালে এই ভাষাতেই কলেজ স্ট্রিট কফি হাউস থেকে খালাসিটোলা, বারদুয়ারি অবধি সর্বত্র গোপন বিপ্লবী আন্দোলনের ব্লু প্রিন্টের মতো ছড়িয়ে পড়ে একটি ম্যানিফেস্টো। ২৬৯ নেতাজি সুভাষ রোড, হাওড়া থেকে প্রকাশিত এই ম্যানিফেস্টোর ওপরে লেখা ‘হাংরি জেনারেশন’। নীচের লাইনে তিনটি নাম। ‘স্রষ্টা: মলয় রায়চৌধুরী। নেতৃত্ব: শক্তি চট্টোপাধ্যায়। সম্পাদনা: দেবী রায়।’
তখনও কলেজ স্ট্রিটের বাতাসে আসেনি বারুদের গন্ধ, দেওয়ালে লেখা হয়নি ‘সত্তরের দশক মুক্তির দশক’। কিন্তু পঞ্চাশ পেরিয়ে-যাওয়া এই ম্যানিফেস্টোর গুরুত্ব অন্যত্র। এর আগে ‘ভারতী’, ‘কবিতা’, ‘কৃত্তিবাস’, ‘শতভিষা’ অনেক কবিতার কাগজ ছিল, সেগুলি ঘিরে কবিরা সংঘবদ্ধও হতেন। কিন্তু এই ভাবে সাইক্লোস্টাইল-করা ম্যানিফেস্টোয় আগে কখনও ছড়ায়নি বাংলা কবিতা।
ওটি হাংরি আন্দোলনের দ্বিতীয় ম্যানিফেস্টো। প্রথম ম্যানিফেস্টোটি বেরিয়েছিল তার কয়েক মাস আগে, ১৯৬১ সালের নভেম্বর মাসে। ইংরেজিতে লেখা সেই ম্যানিফেস্টো জানায়, কবিতা সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে যায় না, বিভ্রমের বাগানে পুনরায় বৃক্ষরোপণ করে না। ‘Poetry is no more a civilizing manoeuvre, a replanting of bamboozled gardens.’ বিশ্বায়নের ঢের আগে ইংরেজি ভাষাতেই প্রথম ম্যানিফেস্টো লিখেছিলেন হাংরি কবিরা। কারণ, পটনার বাসিন্দা মলয় রায়চৌধুরী ম্যানিফেস্টোটি লিখেছিলেন। পটনায় বাংলা ছাপাখানা ছিল না, ফলে ইংরেজি।
দুটি ম্যানিফেস্টোতেই শেষ হল না ইতিহাস। হাংরি আসলে সেই আন্দোলন, যার কোনও কেন্দ্র নেই। ফলে শহরে, মফস্সলে যে কোনও কবিই বের করতে পারেন তাঁর বুলেটিন। ১৯৬৮ সালে শৈলেশ্বর ঘোষ তাঁর ‘মুক্ত কবিতার ইসতাহার’-এ ছাপিয়ে দিলেন ‘সমস্ত ভন্ডামির চেহারা মেলে ধরা’, ‘শিল্প নামক তথাকথিত ভূষিমালে বিশ্বাস না করা’, ‘প্রতিষ্ঠানকে ঘৃণা করা’, ‘সভ্যতার নোনা পলেস্তারা মুখ থেকে তুলে ফেলা’ ইত্যাদি ২৮টি প্রতিজ্ঞা। পরে বন্ধুদের মধ্যে ঝগড়া বাধবে। মলয় ব্যাংকের চাকরি নিয়ে বাইরে চলে যাবেন। শৈলেশ্বর, সুবো আচার্য এবং প্রদীপ চৌধুরীরা বলবেন, ‘মলয় বুর্জোয়া সুখ ও সিকিয়োরিটির লোভে আন্দোলন ছেড়ে চলে গিয়েছে।’কী রকম লিখতেন হাংরিরা? বছর দুয়েক আগে সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের ‘বাইশে শ্রাবণ’ ছবিতে গৌতম ঘোষের চরিত্রটি লেখা হয়েছিল হাংরি কবিদের আদলে।
‘জেগে ওঠে পুরুষাঙ্গ নেশার জন্য হাড় মাস রক্ত ঘিলু শুরু করে কান্নাকাটি
মনের বৃন্দাবনে পাড়াতুতো দিদি বোন বউদিদের সঙ্গে শুরু হয় পরকীয়া প্রেম’,
লিখেছিলেন অকালপ্রয়াত ফালগুনী রায়। র‌্যাঁবো, উইলিয়াম বারোজ এবং হেনরি মিলারের উদাহরণ বারে বারেই টেনেছেন হাংরিরা। ঘটনা, এঁরা যত না ভাল কবিতা লিখেছেন, তার চেয়েও বেশি ঝগড়া করেছেন। এবং তার চেয়েও বেশি বার গাঁজা, এলএসডি, মেস্কালিন আর অ্যাম্ফিটোমাইন ট্রিপে গিয়েছেন।
অতএব, সাররিয়ালিজ্ম বা অন্য শিল্প আন্দোলনের মতো বাঙালি কবিদের ম্যানিফেস্টোটি কোনও দিন গুরুত্বপূর্ণ হয়নি। কিন্তু ‘হাংরি’রা আজও মিথ। এক সময় ‘মুখোশ খুলে ফেলুন’ বলে তৎকালীন মন্ত্রী, আমলা, সম্পাদকদের বাড়িতে ডাকযোগে তাঁরা মুখোশ পাঠিয়ে দিয়েছেন। আবার এক সময় ‘প্রচন্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতাটি লেখার জন্য অশ্লীলতার মামলা হল মলয় রায়চৌধুরীর বিরুদ্ধে। উৎপলকুমার বসু, সুবিমল বসাকের বিরুদ্ধে জারি হল গ্রেফতারি পরোয়ানা।
রাষ্ট্র ও আদালত কী ভাবে কবিতাকে দেখে, সেই প্রতর্কে ঢুকতে হলে ১৯৬৫ সালে মলয় রায়চৌধুরীর বিরুদ্ধে মামলাটি সম্পর্কে জানা জরুরি। শক্তি চট্টোপাধ্যায় কাঠগড়ায় উঠেছেন মলয়ের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে। পাবলিক প্রসিকিউটরের জিজ্ঞাসা, ‘প্রচন্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতাটা পড়ে আপনার কী মনে হয়েছে?
শক্তি: ভাল লাগেনি।
প্রসিকিউটর: অবসিন কি? ভাল লাগেনি বলতে আপনি কী বোঝাতে চাইছেন?
শক্তি: ভাল লাগেনি মানে জাস্ট ভাল লাগেনি। কোনও কবিতা পড়তে ভাল লাগে, আবার কোনওটা ভাল লাগে না।
শক্তি সাক্ষ্য দিয়েছিলেন মলয়ের বিরুদ্ধে। কয়েক মাস পরে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় মলয়ের সমর্থনে...
প্রসিকিউটর: কবিতাটা কি অশ্লীল মনে হচ্ছে?
সুনীল: কই, না তো। আমার তো বেশ ভাল লাগছে। বেশ ভাল লিখেছে।
প্রসিকিউটর: আপনার শরীরে বা মনে খারাপ কিছু ঘটছে?
সুনীল: না, তা কেন হবে? কবিতা পড়লে সে সব কিছু হয় না।
একই মামলায় শক্তি ও সুনীল পরস্পরের বিরুদ্ধে। তার চেয়েও বড় কথা, ’৬৫ সালে এই সাক্ষ্য দেওয়ার আগের বছরই সুনীল আইওয়া থেকে মলয়কে বেশ কড়া একটি চিঠি দিয়েছিলেন, ‘লেখার বদলে আন্দোলন ও হাঙ্গামা করার দিকেই তোমার ঝোঁক বেশি। রাত্রে তোমার ঘুম হয় তো? মনে হয়, খুব একটা শর্টকাট খ্যাতি পাবার লোভ তোমার।’ ব্যক্তিগত চিঠিতে অনুজপ্রতিম মলয়কে ধমকাচ্ছেন, কিন্তু আদালতে তাঁর পাশে গিয়েই দাঁড়াচ্ছেন। সম্ভবত, বন্ধু-শত্রু নির্বিশেষে অনুজ কবিদের কাছে সুনীলের ‘সুনীলদা’ হয়ে ওঠা হাংরি মামলা থেকেই। প্রবাদপ্রতিম কৃত্তিবাসী বন্ধুত্বের নীচে যে কত চোরাবালি ছিল, তা বোঝা যায় উৎপলকুমার বসুকে লেখা সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের একটি চিঠি থেকে, ‘প্রিয় উৎপল, একদিন আসুন।...আপনি তো আর শক্তির মতো ধান্দায় ঘোরেন না।’
তা হলে কি হাংরি আন্দোলন বাংলা সাহিত্যে প্রভাবহীন, শুধুই কেচ্ছাদার জমজমাট এক পাদটীকা? দুটি কথা। হাংরিদের প্রভাবেই কবিতা-সংক্রান্ত লিটল ম্যাগগুলির ‘কৃত্তিবাস’, ‘শতভিষা’ গোছের নাম বদলে যায়। আসে ‘ক্ষুধার্ত’, ‘জেব্রা’, ‘ফুঃ’-এর মতো কাগজ। সেখানে কবিতায় বাঁকাচোরা ইটালিক্স, মোটাদাগের বোল্ড ইত্যাদি হরেক রকমের টাইপোগ্রাফি ব্যবহৃত হত। পরবর্তী কালে সুবিমল মিশ্রের মতো অনেকেই নিজেকে হাংরি বলবেন না, বলবেন ‘শুধুই ছোট কাগজের লেখক’। কিন্তু তাঁদের গল্প, উপন্যাসেও আসবে সেই টাইপোগ্রাফিক বিভিন্নতা। তৈরি হবে শ্রুতি ও শাস্ত্রবিরোধী আন্দোলন। হাংরিরা না এলে কি নব্বইয়ের দশকেও হানা দিতেন পুরন্দর ভাট?
আসলে, ম্যানিফেস্টোর মধ্যেই ছিল মৃত্যুঘণ্টা। ’৬২ সালে হাংরিদের প্রথম বাংলা ম্যানিফেস্টোর শেষ লাইন, ‘কবিতা সতীর মতো চরিত্রহীনা, প্রিয়তমার মতো যোনিহীনা ও ঈশ্বরীর মতো অনুষ্মেষিণী।’ হাংরিরা নিজেদের যত না সাহিত্যবিপ্লবী মনে করেছেন, তার চেয়েও বেশি যৌনবিপ্লবী।”
গৌতম চক্রবর্তী লেখেননি যে ম্যানিফেস্টো আর বুলেটিনগুলো সেন্ট্রাল অ্যাভেনিউ কফি হাউস, আনন্দবাজার, যুগান্তর, কবিতা ভবন, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, প্রেসিডেন্সি, স্কটিশ, আশুতোষ, সিটি কলেজ ইত্যাদিতেও  বিলি করা হয়েছিল এবং পাঠানো হয়েছিল ব্রিটিশ লাইব্রেরি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে।