শনিবার

অলোক গোস্বামী : উত্তরবঙ্গে হাংরি আন্দোলনে ভেঙে দেবার ষড়যন্ত্র করেছিলেন শৈলেশ্বর ঘোষ

অরুণেশ হাত তুলে নিলেই তো কেসটা চুকেবুকে যায় না। শেষ না দেখে ছাড়ার বান্দা শৈলেশ্বর ঘোষ নন। আরেক জন তো রয়েছে, সে দিক কৈফিয়ত।
কে সে? সুভাষ ঘোষ। সুভাষ ঘোষ কেন? কারণ ততদিনে বেশ কয়েকবার উত্তরবঙ্গে এসেছেন সুভাষ। আমরাও গিয়ে থেকেছি ওর বাড়িতে। সুতরাং উত্তরবঙ্গ নামক ফ্রন্টটিকে দেখভালের অলিখিত দায়িত্ব সুভাষের ওপরই ন্যস্ত করেছিলেন শৈলেশ্বর। যদিও প্রকৃত ঘটনাটা ছিল উল্টো। কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে নিয়মিত লেখা দেয়া এবং আমাদের লেখাপত্রের পাঠ প্রতিক্রিয়া জানানো ছাড়া সুভাষের অন্য কোনো ভূমিকাই ছিল না। এমন কী ফালগুনি রায়ের রচনা প্রকাশ করার যে পরিকল্পনা আমরা গ্রহণ করেছিলাম, সেটাও ছিল আমাদের নিজস্ব। কিন্তু সে কথা শৈলেশ্বর ঘোষ বিশ্বাস করলে তো!
বাল্যবন্ধু তথা একসঙ্গে বালুরঘাট ছেড়ে মহানগরে আসা শৈলেশ্বরের আজ্ঞাকে মান্যতা দিতে বাধ্য হলেন সুভাষ ঘোষ। এলেন শিলিগুড়িতে। জমিদারী মানসিকতাকে ঘৃণা করা এবং নামাবলি খান খান করার কাজে আস্থা রাখা সত্বেও বন্ধুর ক্রোধে বিচলিত সুভাষ সমঝোতার কথা বলতে চাইলেন আমাদের সঙ্গে। স্বজন ধ্বংসী যুদ্ধে মূলতঃ কারা লাভবান হবে, বোঝাতে চাইলেন। সাদা বাংলায় যাকে বলে, কুরুক্ষেত্র থেকে বুঝিয়ে শুনিয়ে ঘরের ছেলে ঘরে ফেরাতে চাইলেন। এবং ব্যর্থ হলেন। সেটাই ছিল স্বাভাবিক। কারণ আমাদের প্রতিবাদ কোনো ব্যক্তিগত অসূয়া কিংবা নেতৃত্বের লোভজাত ছিল না। আমরা কোনো গদির ভাগও চাইনি যে সমঝোতা করবো। বরং চেয়েছি, ফের একবার আন্দোলিত হোক বাংলা সাহিত্য। শুধু মাত্র কয়েকজন ব্যক্তি নন, সেই আন্দোলনের শরিক হোন প্রতিটি সাহিত্য পিয়াসী মানুষ। অন্ততঃ যারা,‘সৎ সাহিত্য’-- এমত শব্দবন্ধে আস্থা রাখেন। আর তার জন্য যেহেতু স্ববিরোধিতা মুক্ত হওয়াটা জরুরী তাই আঙুল তুলেছিলাম স্ব-ত্রুটিগুলোর বিরুদ্ধে। এক্ষেত্রে জানিয়ে রাখা ভালো, আমাদের আঙুল কিন্তু কারো কোনো ব্যক্তিগত ত্রুটি-বিচ্যুতির বিরুদ্ধে ওঠেনি। উঠেছিল সাহিত্য কেন্দ্রিক চিন্তাভাবনার স্ববিরোধিতা নিয়ে। এবং সেসবের লক্ষ্য শুধুই শৈলেশ্বর ঘোষ ছিলেন না, প্রায় সবাই ছিলেন। এমন কী নিজেদের ছাল চামড়া খুলে নিতেও দ্বিধা ছিল না আমাদের।
সুতরাং সম্মিলিত ভাবে দূত সুভাষকে চেপে ধরা হলো । না, কমরেডশিপে আস্থা রাখা মানুষটিকে এক তিলও সরানো গেল না । বন্ধু শৈলেশ সম্পর্কে কোনো বিরূপ মন্তব্য করা তো দূরস্থান, শুনতেও নারাজ। বাকি বন্ধুদের ক্ষেত্রেও সেই একই নীতি। কিন্তু আমরা যে পাল্টা যুক্তিগুলো তুলে ছিলাম সুভাষের পক্ষে সম্ভব হয়নি সেসব খন্ডন করাও। খন্ডন করতেও চাননি হয়তো। কেননা সমঝোতার পরিণতি কী--সেটা সুভাষ হাড়ে হাড়ে জানতেন। তাছাড়া কবি শৈলেশ্বরকে তো আমরা কখনই অস্বীকার করিনি! যেভাবে করতে চাইনি বাংলা সাহিত্যে ক্ষুধার্ত আন্দোলনের ভূমিকা।
স্থির করা হলো পত্রিকার তরফ থেকে এমন একজন ক্ষুধার্তের সাক্ষাতকার নেয়া হবে যিনি সোজা সাপ্টা প্রশ্নের উত্তর সোজা সাপ্টা ভাবেই দেবেন। কোনো ছেঁদো দার্শনিকতার ধূম্রজাল সৃষ্টি করে বিষয়টা ঘুলিয়ে দেবার চেষ্টা করবেন না।
কিন্তু কে সেই ব্যক্তি?

বলাবাহুল্য দুই সনত্, অরুণেশ এবং শৈলেশ্বরের নাম ধর্তব্যের মধ্যেই আসেনি। প্রদীপ চৌধুরী বহুবছর আগেই তাঁর পত্রিকা, ‘স্বকাল’ এ ক্ষুধার্ত আন্দোলনের মৃত্যু ঘোষণা করেছিলেন সুতরাং সাক্ষাৎকারের জন্য তিনিও উপযুক্ত। চেষ্টাও করেছিলাম কিন্তু ওঁর বাং-ফরাসী আদব কায়দার খোলস ভেঙে শাঁসে প্রবেশ করাটা আমাদের পক্ষে দুঃসাধ্য হওয়ায় পরিকল্পনা ক্যানসেলড।

তো সাক্ষাৎকার নেয়ার জন্য যে নামটা অবশিষ্ট থাকে সেটা হলো সুভাষ ঘোষ। সেদিন একমাত্র সুভাষকেই উপযুক্ত মনে হয়েছিল কারণ লক্ষ্য করেছিলাম, শুধু বিষয় নয়,আঙ্গিক মারফতও প্রথম থেকে একমাত্র সুভাষই নিজেকে এতটাই অস্পৃশ্য করে তুলতে পেরেছেন যে প্রতিষ্ঠানের কোনদিন সাধ্য হবে না ওকে ছোঁয়ার।একমাত্র ওর রচনাতেই রয়েছে গা-গতরের গন্ধ। বুর্জোয়া নিউক্লিয়াসের বিরুদ্ধে ওকেই দেখছি ক্রমাগত কামান দাগিয়ে চলতে।
মিথ,মেটাফর,অ্যালিগরি,সিম্বলিজমকে সপাটে লাথি মেরে উড়িয়ে সুভাষই লিখতে পেরেছেন--
--“পটলের সন্তান পটল হয়--আলুর সন্তান নিখাদ আলু--কুকুরের সন্তান আদ্যন্ত কুকুর এক--মানুষের সন্তান মানুষ কি না আমি আজও বুঝে উঠতে পারিনি--”

--“এখানে স্পেডকে স্পেড বলা হয় না। এটা বুর্জোয়াদের মুক্তমেলার দেশ--মুক্ত বাজারের দেশ--এটা বুর্জোয়াদের রূপক জগৎ--রূপক দেশ--রূপক মানুষ রূপক জীবন ভালোবাসে--রূপক তথা খোলসটা ছিঁড়ে দিলাম। দগদগে চেহারা বেরিয়ে পড়ল। গেল গেল রব উঠল। হ্যাঁ,ওরা ওই বিত্তবান,মধ্যবিত্ত,এলিট শ্রমিক, পোষা টিয়া ময়না--টিয়া ময়না ওই এদেশের এলিট,অ্যাকাডেমি বাজারজাত লেখক,কবি।”
সেই সাক্ষাৎকারটিতে রাখা হয়েছিল চোখা চোখা প্রশ্ন কিন্তু হায় হতভাগ্য, প্রায় সব ক’টা প্রশ্নই কৌশলে এড়িয়ে গেলেন সুভাষ ঘোষ। যেটুকু বললেন সেটা প্রায় না বলার মতই, তবুও ওই বলাটুকুই ছিল আমাদের কাছে যথেষ্ট।
শুধু আমাদের কাছে নয়,শৈলেশ্বর ঘোষের কাছেও। ওই সাক্ষাৎকারটি থেকে দুটো সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলেন তিনি, দূত হিসেবে সুভাষ চূড়ান্ত ব্যর্থ এবং এই ব্যর্থতা মূলতঃ বিশ্বাসঘাতকতারই নামান্তর। শৈলেশ্বর নিশ্চিত হয়ে গেলেন, উত্তরবঙ্গের এই পাল্টা অভ্যুথ্থান মূলতঃ মলয়ের উস্কানি এবং সুভাষ ঘোষের প্রশ্রয়জাত। শৈলেশ্বরকে হঠিয়ে ক্ষুধার্ত রথের প্রধান সারথি হতে চাইছেন সুভাষ। যদিও রথটি তখন মূলতঃ তিন চাক্কায় ভর করে চলছিল, দুটি চাক্কা শৈলেশ্বর এবং সুভাষ। অন্য চাক্কার অর্ধেক প্রদীপ চৌধুরী, বাকি অর্ধেক অরুণেশ ঘোষ।
সুভাষ লিখেছিলেন--“ কামরোগ ভয় আমার--
নামরোগ ভয় আমার--
‘আমি’রোগ ভয় আমার--ক্ষমতারোগ-”
লিখেছিলেন,“ দান,ভিক্ষাবৃত্তি,হ্যাংলামিপনা যদিও আমাদের জাতীয় মজ্জায় প্রায় অন্তর্ভুক্ত কিন্তু আমি তার কেউ নই--দাদা ধরা,বাবা ধরা আজকাল জলচল হয়েছে--দেখে ঘেন্না ধরে--”

আমরা যারা অনেক পরে সুভাষ ঘোষের সঙ্গে পরিচিত হয়েছি তারা জানতাম ওইসব লেখা সুভাষ নিছকই বানিয়ে বানিয়ে লেখেননি, একদম প্রাণের কথা ওঁর। ক্যাডার-লিডার নয়, সুভাষ বিশ্বাস করেন কমরেডশিপে। এবং সেই বিশ্বাস ছিল এতটাই দৃঢ় এবং সুপ্রোথিত যে সেটাকে,‘সৌভ্রাতৃত্ব বোধ’ নামক ছেঁদো অভিধায় অপমানিত করা চলে না।
সুভাষের সঙ্গে বাল্যবন্ধুত্বের সুবাদে ওই সব তথ্য শৈলেশ্বরেরও জানা ছিল কিন্তু সন্দেহ বহোত খতরনাক চিজ। অভ্যেস মোতাবেক অতীত ভুলে যেতে অসুবিধে হলো না শৈলেশ্বরের। মনগড়া অভিমানে আহত হলেন শৈলেশ্বর।মফঃস্বলের ছেলেদের বাড়াবাড়ি দেখে অহঙে আঘাত পেলেন। কে না জানে, কবিকে যদি বা আঘাত করা যায়, নেতাকবিকে আঘাত করা অত সোজা নয়! অহং চোট গ্রস্ত হলে সে কাউকে ছেড়ে কথা কয় না। কইতে জানে না। সুতরাং এবার শুরু হলো প্রত্যাঘাতের পালা।
অথচ কবি শৈলেশ্বরকে কিন্তু কখনই অস্বীকার করিনি আমরা। করা যায় না। কিভাবে ভুলব সেই সব অমোঘ লাইন--
বৃক্ষাকাশে কবিতা টাঙাবো না আমরা, শোবার ঘরেই গাছ সঞ্চার হয়েছে,
গাছেতে ভূমধ্যাকর্ষণ হয় চোরাচালান বোঝে— শোবার ঘরেই চলে
অহরহ বিক্ষোভ-আক্রমণ; গাছের সঙ্গেই সুদীর্ঘকাল ফলে ওঠে
ভালবাসাবাসি— কলকাতায় দশবছর খারিজ নীলাম
দরসরবরাহ নিদ্রাপ্রেমের মূল্যবৃদ্ধি— ফাটকায় হাতবদল
দিনমান হৃদয় চিৎ— দিনমানভর তেত্রিশ হিজরের গর্ভ হয়
দিনমান ধরে হে ঘোড়া ভৌতিক ক্ষুধা কবিতার ।

কিন্তু সেইডা পাগোল মনডারে বুঝাই ক্যামনে! এই প্রসঙ্গে একটা ঘটনা মনে পড়ে যাচ্ছে। ফের সেই কথায় আসি।
সদ্য প্রকাশিত কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প বগলে নিয়ে এক ঠা ঠা দুপুরে আমি হাজির হয়েছিলাম শৈলেশ্বরের বাড়ির গেটে। একা। ইচ্ছে ছিল শৈলেশ্বরের সঙ্গে মুখোমুখি বসে যাবতীয় ভুল বোঝাবুঝি নিয়ে খোলাখুলি কথা বলবো। যেহেতু স্মরণে ছিল শৈলেশ্বরের সঙ্গে প্রথম পরিচয়ের স্মৃতি তাই আস্থা ছিল শৈলেশ্বরের প্রজ্ঞা,ব্যক্তিত্ব,যুক্তিবোধ তথা ভদ্রতাবোধের ওপর। দৃঢ় বিশ্বাস ছিল শৈলেশ্বর আমাদের ভুলগুলো ধরিয়ে দেবেন এবং যৌথ আলোচনাই পারবে সব ভুল বোঝাবুঝি মিটিয়ে নতুন উদ্যমে একসাথে পথ চলা শুরু করতে। কিন্তু দুভার্গ্য বশতঃ তেমন কিছু ঘটলো না। বেল বাজাতেই গেটের ওপারে শৈলেশ্বর। আমাকে দেখেই ভ্রূ কুঁচকে ফেললেন।
--কী চাই!
মিনমিন করে বললাম, আপনার সঙ্গে কথা বলবো।
--কে আপনি?
এক এবং দুই নম্বর প্রশ্নের ভুল অবস্থান দেখে হাসি পাওয়া সত্বেও চেপে গিয়ে নাম বললাম।
--কি কথা?
--গেটটা না খুললে কথা বলি কিভাবে!
--কোনো কথার প্রয়োজন নেই। চলে যান।
--এভাবে কথা বলছেন কেন?
--যা বলছি ঠিক বলছি। যান। নাহলে কিন্তু প্রতিবেশীদের ডাকতে বাধ্য হবো।

এরপর স্বাভাবিক কারণেই খানিকটা ভয় পেয়েছিলাম কারণ আমার চেহারাটা যেরকম তাতে শৈলেশ্বর যদি একবার ডাকাত, ডাকাত বলে চেঁচিয়ে ওঠেন তাহলে হয়ত জান নিয়ে ফেরার সুযোগ পাবো না। তবে 'ছেলেধরা' বলে চেল্লালে ভয় পেতাম না। সমকামিতার দোষ না থাকায় নির্ঘাত রুখে দাঁড়াতাম।
ভয় পাচ্ছি অথচ চলেও যেতে পারছি না। সিদ্ধান্তে পৌঁছতে গেলে আরও খানিকটা জানা বোঝা জরুরি।
--ঠিক আছে, চলে যাচ্ছি। তবে পত্রিকার নতুন সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছে সেটা রাখুন।
এগিয়ে আসতে গিয়েও থমকে দাঁড়ালেন শৈলেশ্বর।
--কোন পত্রিকা?
--কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প।
--নেব না। যান।

এরপর আর দাঁড়াইনি। দাঁড়ানোর প্রয়োজনও ছিল না। ততক্ষণে বুঝে ফেলেছি ব্যক্তি শৈলেশ্বর ঘোষকে চিনতে ভুল হয়নি আমাদের। আর এই সমঝদারি এতটাই তৃপ্তি দিয়েছিল যে অপমানবোধ স্পর্শ করারই সুযোগ পায়নি।

মঙ্গলবার

অলোক গোস্বামী : উত্তরবঙ্গে হাংরি আন্দোলন ( ১৩ )

বহুবছর পর বাইকের চাকা ফেঁসে যাওয়ায় সারাতে গিয়ে আচমকা দেখা পেয়েছিলাম আমার ফেলে আসা পাড়ার হারিয়ে যাওয়া এক বন্ধুর, কালু। বলাবাহুল্য ভালো নাম মনে নেই কারণ আমাদের পাড়ায় ভালো নাম খারাপ নাম ইত্যাদি প্রভৃতি ভেদাভেদ ছিল না। সবার একটাই নাম। অবশ্য কালুর একটা গোপন নাম ছিল। সত্যিকারের গোপন, বাড়ির লোকেরা জানলেও বন্ধুরা জানত না। শুধু আমি জেনেছিলাম।
কালুর বাবা গোপাল ঘোষের ছিল দইয়ের ব্যবসা। সেই দইয়ের কোয়ালিটি কেমন ছিল সেটা পাড়ার কেউ জানত না কারণ শহরের দোকানে পাওয়া যেত না সেই দই। গোপাল ঘোষ রিক্সো্য় হাঁড়িগুলো চাপিয়ে হাটে হাটে বিক্রি করতেন। কেমন হোত বিক্রিবাট্টা, সেটাও জানতাম না। তবে কালু এবং তার দিদির বেশভূষা দেখে অনুমান করতে অসুবিধে হোত না।
গোপাল ঘোষ খুব কম কথার মানুষ ছিলেন। পাড়ার কারোর সঙ্গে দহরম মহরম তো দূরের কথা, সৌজন্য বিনিময় করতেও দেখিনি। যেটুকু দেখেছি তাহলো মস্ত কড়াইয়ে দুধ জ্বাল চলছে আর বহুক্ষণ আগে নিভে যাওয়া একটা বিড়িকে মুঠোয় ধরে মুহুর্মুহু টান দিতে দিতে গোপাল ঘোষ দেখে চলেছেন দুধের উথাল পাথাল।
অবশ্য এটুকুই দেখেছিলাম বললে সত্যের অপলাপ হয়। দেখতাম কোনো কোনো দিন রিক্সোর চাপপাশে অজস্র হাঁড়ি চাপিয়ে গোপাল ঘোষের হাট অভিযান এবং অনেক রাতে একই ভাবে প্রত্যাগমন। যদিও ফিরে আসা পর্ব খানিকটা বৈচিত্র্য ছিল। দেখতাম চারপাশে বাঁধা হাঁড়ির আড়ালে এলিয়ে পড়ে আছেন গোপাল ঘোষ, হাতের মুঠোয় যথারীতি নিভে যাওয়া একটা বিড়ি তবে ফারাক এটুকুই যে সেই নিভন্ত বিড়িতে টান পড়ছে না। সময় কোথায় টান দেয়ার? আকাশের দিকে মুখ করে কালুর বাবা গলা ছেড়ে গাইছেন, শো যা, রাজকুমারী, শো যা আ আ।
মাত্র একটাই লাইন। এবং সেটা রাজকুমারীর প্রতি অনুরোধ নাকি আদেশ ছিল, সেটা সুর শুনে বোঝার উপায় ছিল না।
একরাতে কিভাবে যেন রিক্সো থেকে ছিটকে পাশের কাঁচা নর্দমায় পড়ে গিয়েছিলেন গোপাল ঘোষ। হুড়মুড় শব্দে প্রতিবেশীরা নিমিষে ঘর ছেড়ে পথে। আমিও। কেউ হাত বাড়াতে সাহস পাচ্ছে না পাছে অপমানিত হোতে হয়। কারো সাহায্য ছাড়াই গোপাল ঘোষ একা একাই নর্দমা থেকে উঠে হাঁড়ির ফাঁকফোকর দিয়ে ফের চেপে বসেছিলেন রিক্সোয়। না, কাউকে কৃতজ্ঞতাটুকুও জানান নি শুধু আমাকে হাতের ইশারায় কাছে ডেকে বলেছিলেন, ছারপোকার কামড়েও বিষ আছে, তেলাপোকার কামড়েও বিষ আছে।
উপদেশের মর্মার্থ না বুঝে পরদিন কালুকে বলেছিলাম ঘটনাটা। কালু বলেছিল, ওই নামগুলা আমার মায়ের আর দিদির।
--যাঃ, মানুষের আবার ওরকম নাম হয় নাকি!
--বাবা ন্যাশা খাইলে ওইসব নামে আমাদের ডাকে।
--তোর নাম কি?
আমার এই প্রশ্নের উত্তর চট করে দিতে চায়নি কালু পাছে ফাঁস করে ফেলি। অনেক কিরা, কসমের পর বলেছিল, টিকটিকি।
সেই টিকটিকি এতদিন পর আমার সামনে! যথারীতি আবেগে থরথরিয়ে কেঁপে উঠেছিলাম। কিন্তু কালু ছিল নির্লিপ্ত। আমার বিভিন্ন কৌতুহলের উত্তরে কখনও ‘হুঁ’ কখনও ‘হ্যাঁ’ টুকু বলেছে। বেশীর ভাগ সময়েই ছিল নিশ্চুপ। এমন কী অনেকক্ষণ অবধি ‘ আপনি’ সম্বোধনটা চালিয়েছিল। অনেক অনুরোধের পর ‘তুমি’ তে নামলেও তারচে নামাতে পারিনি। চলে আসার সময় ইচ্ছে হয়েছিল ডেকে ওঠার, এ্যাই টিকটিকি। সাহস পাইনি।


অলোক গোস্বামী : উত্তরবঙ্গে হাংরি আন্দোলন ( ১২ )

তখন জাতীয় পার্টির পরামর্শ তথা আদেশে জলপাই আর খাকি পোশাকের যৌথ উদ্যোগে মফঃস্বলের অলিতে গলিতে লাশের ছড়াছড়ি। পাড়া নিবাসীদের রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধির সুবিধার্থে লাশগুলো এশিয়ান মুক্তিসূর্যের আলো শরীরে মেখে পড়ে থাকত অনেকক্ষণ।
সচরাচর মৃত্যু সংবাদ পেলে মাছির মতো দর্শকদের ঝাঁপিয়ে পড়াটা চিরকালের রেওয়াজ কিন্তু তখন এই ধরণের মৃত্যুগুলো এতটাই ত্রাসের সঞ্চার করত যে সবাই সেঁদিয়ে থাকত ঘরের ভেতর। বলা তো যায় না যদি বুকফাটা শোক আচমকা প্রকাশিত হয়ে পড়ে, আহা রে, ---বাবুর ছেলেটা.....!
তাবলে মৃতের পরিচয় গোপন থাকত না, কিভাবে যেন ছড়িয়ে পড়ত শহরময়! এ ব্যাপারে কাদের মুখ্য এবং কাদের গৌণ ভূমিকা থাকত সেটা জানার মতো সাহস কারোরই ছিল না।
তখন সব গলিরই এক বা একাধিক এহেন শিক্ষামূলক লাশের গৌরব থাকত।
সবারই যদি সেই গৌরব থেকে তাহলে আমরাই বা পিছিয়ে থাকব কেন? সম মর্যাদা দান করতে এক সকালে আমাদের গলিতেও আবিষ্কৃত হলো একটি লাশ। এক্ষেত্রেও কয়েক ঘন্টার মধ্যেই চলে এলো নিহত যুবকের নাম ধাম। জানা গেল মৃত যুবক আমাদের পাড়ার নয়। তাহলে এখানে লাশটা এলো কিভাবে? ডেকে এনে খুন করা হয়েছে? নাকি কারো সঙ্গে দেখা করতে এখানে এসেছিল, ফেরা হয়নি?
কে দেবে এসব উত্তর! শুধু এটুকু জানা গেল যে আজ রাতে পাড়ায় মিলিটারি নামবে। গোটা এলাকায় রেইড করা হবে। কোনো যুবক ছাড় পাবে না। সবাইকে অ্যারেস্ট করা হবে না, এনকাউন্টারও করে দেয়া হবে কাউকে কাউকে।
বলাবাহুল্য বিরোধী মনোভাবাপন্নদের পাড়া ছাড়ার ধুম শুরু হয়ে গেল।কিন্তু আমাদের ওপরতলার বিপুদা বেঁকে বসলো, আমাদের দলের ছেলে খুন হয়েছে। আমি কেন পালাবো? পালাবে তো ওরা!
--ওরা মানে! তুই জানিস কারা মেরেছে?
--আলবত জানি। সবার নাম বলে দিতে পারি। শুধু আমি কেন, পুলিশও জানে। পুলিশ ওদের চাকর তাই ধরার সাহস নেই।
এরপর মিলিটারি সংক্রান্ত সংবাদ কতটা সঠিক কিংবা সংবাদদাতা আদৌ নির্ভরযোগ্য কিনা, সেসব সন্দেহের অবকাশই থাকেনা। বাড়ির চারঘর ভাড়াটে পরিবারই নিশ্চিত হয়ে যায় পাড়ার অন্য বাড়িগুলো যদি বা রেহাই পায়, আমাদের কাঠের দোতলার রেহাই নেই। তারচেও বড় কথা হলো সবাইকে প্রত্যক্ষ করতে হবে বিপুদার নৃশংস মৃত্যু।
ব্যাপারটা যেহেতু মেনে নেয়াটা কঠিন তাই বিপুদার মা, বাবার সঙ্গে অন্য তিনটি পরিবারও দায়িত্ব নিলো বিপুদাকে বোঝানোর। যৌথ চাপাচাপিতে বিপুদা ঘর ছাড়ল বটে কিন্তু তাতেও কি স্বস্তি আছে? চারদিকে তো বিপ্লবী অস্তিত্বের ছড়াছড়ি! সুতরাং বাড়ি লোকদের প্রচেষ্টা শুরু হলো সেই অস্তিত্বের প্রমাণ লোপাটের। খাটের তলার বাক্স থেকে খুঁজে বের করা হলো রাশি রাশি বই,লিফলেট, পুস্তিকা। সবকিছু আগুনে পুড়িয়ে ছাইগুলোও জলে ধুয়ে দেয়া হলো। মার্কস,লেনিন,স্ট্যালিন,হোচিমিনের ছবিগুলো দেয়াল থেকে খুলে প্লাস্টিকের প্যাকেটে পুড়ে রেখে দেয়া হলো যৌথ ঘুঁটের গাদার একদম নীচে। রইলো শুধু পেন্সিল স্কেচের রবীন্দ্রনাথ। 'বুর্জোয়া কবি' আখ্যা পেয়ে যাওয়ায় ওঁর ছবিতে বিপদ হবে না, হয়ত এরকম ধারণা থেকেই ওই ছাড়।
সে যাক,এখন এ বাড়িতে যে বিপ্লব থাকে সে নিতান্তই সুবোধ বালক। মাসীর মেয়ের বিয়েতে গতমাসে আসামে গিয়েছে। শিগ্রি ফিরবে।
প্রমাণ লোপাটের অপরাশেন শেষে সবার চোখে মুখে যখন তৃপ্তির ছোঁয়া ঠিক তখনই আমার চোখে পড়েছিল টেবিলের নীচে পড়ে থাকা সবুজ রেক্সিনে বাঁধানো একটা বই। কাউকে টের পেতে না দিয়ে বইটা তুলে নিয়ে এসে রেখে দিয়েছিলাম পড়ার বইখাতার স্তূপে।
সংবাদদাতার সততা প্রমাণ করে শেষ রাতে পাড়া ঘিরে ফেলল সি.আর.পি। সংগে পুলিশ। ভোর হোতেই শুরু হয়ে গেল বাড়ি বাড়ি তল্লাশি। বাড়ি চেনানোর দায়িত্বে থাকলো চেনা কিছু যুবক। পাড়ার কিছু ছেলেকে জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজনে ভ্যানে তোলা হলো। কী আশ্চর্য, এসবই ঘটছিল চারপাশে, আমাদের বাড়িটাকে বাদ দিয়ে! তবে কি রেহাই পেলাম আমরা? নাঃ, সেই আশাটুকুকে সমূলে বিনাশ করে পুলিশ এলো। হাতের খাতা দেখে রোল কলের ভঙ্গীতে জিজ্ঞেস করলো, বিপ্লব কোন ঘরে থাকে? এবং উত্তরের তোয়াক্কা না রেখেই কাঠের সিঁড়ি মচমচিয়ে উঠে গেল দোতলায়।
ততক্ষণে সব কটা পুলিশ ভ্যানই ভর্তি হয়ে যাওয়ায় বিপুদার দুই দাদাকে গোটা কয়েক চড় চাপড় দিয়ে বিপুদার বাবাকে, ওসব আসাম ফাসাম দেখাবেন না। ছেলেকে বলুন সারেন্ডার করতে। নাহলে কিন্তু আপনারা কেউ রেহাই পাবেন না, হুকুম দিয়ে চলে গিয়েছিল রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস বাহিনী। রেহাই পেয়ে গিয়েছিলাম অন্য তিনটি পরিবার। না, প্রমাণের জন্য কোনো তল্লাশির প্রয়োজন বোধ করেনি ওরা। সুতরাং সবকিছুর পাশাপাশি রেহাই পেয়েছিল ওই সবুজ রেক্সিনের বইটাও।
আজও আমার সঙ্গে আছে বইটা। ম্যাক্সিম গোর্কির ছোট গল্প। সুযোগ পেলেই উল্টেপাল্টে দেখি কারণ ওটা তো নিছকই বই নয়, আমার প্রথম চুরি করা বই। রাশিয়ান সাহিত্য প্রাঙ্গনে আমার প্রথম পদক্ষেপ। ওই বই থেকেই জেনেছিলাম ‘ভিভা’ শব্দটার অর্থ জিন্দাবাদ।

কমেন্ট
একটি কমেন্ট লিখুন...




অলোক গোস্বামী : উত্তরবঙ্গে হাংরি আন্দোলন ( ১১ )

সত্তর দশকে পশ্চিমবঙ্গের প্রধান তিনটি রাজনৈতিক দলেরই অন্যতম কার্যসূচি ছিল ভিন্ন মতাদর্শীদের হত্যা করা। তাবলে তিনটি দলকে একাকার করে দেয়া চলবে না। হত্যার কারণগুলো ছিল ভিন্ন ভিন্ন। পৃথিবী জুড়ে কম্যিউনিস্টদের বাড় বাড়ন্ত দেখে আতঙ্কিত কংগ্রেসের উদ্দেশ্য ছিল শাসনের পথকে নিষ্কন্টক রাখা। সি.পি.আই. এমের কাছে আত্মরক্ষাই ছিল পাল্টা হত্যার একমাত্র উদ্দেশ্য। এ ব্যাপারে একমাত্র নকশালদের দৃষ্টিভঙ্গীটা ছিল খানিকটা আলদা। দারুন একটা বিশেষণের পেটেন্ট নিয়েছিল ওরা--শ্রেণীশত্রু। কারা তারা? তখন না হয় বোঝার মতো বয়স আমার ছিল না কিন্তু যাদের ছিল তারাও কি বুঝতে পারতেন? সম্ভবতঃ নয়। শুধু এটুকু বুঝতেন, পথে ঘাটে পড়ে থাকা লাশগুলোর পরিবার প্রদত্ত নাম যেটাই হোক, ওদের সামাজিক নাম-- শ্রেণীশত্রু।
শ্রেণীশত্রু হওয়ার জন্য বয়স,পেশা, অর্থনৈতিক ক্ষমতা, রাজনৈতিক মতাদর্শ কোনটাই বাধা হয়ে দাঁড়াত না। শুধু প্রয়োজন হোত চিহ্নিত করণ। সেই কষ্টটুকুও নকশালদের করতে হোত না, তাদের ভালোবেসে ওই নৃশংস কাজটুকু করে দিতেন চেয়ারম্যান। তিনিই বিভিন্ন রচনা মারফত পরিষ্কার বুঝিয়ে দিতেন শ্রেণীশত্রু কাহাদের বলা যাইবেক। যদিও তিনি চীনদেশের মানুষ তবুও আমাদের জন্য এই শ্রমটুকু হাসিমুখে করতে রাজী ছিলেন কারণ দুনিয়ার মেহনতি মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করাটাই ছিল তাঁর অন্যতম স্বপ্ন। তাই তিনি শুধু চীনেরই চেয়ারম্যান ছিলেন না, আমাদেরও ছিলেন। তাঁর দেয়া শ্লোগান, 'বন্দুকের নলই ক্ষমতার উৎস' হয়ে উঠেছিল আমাদের বেদমন্ত্র।
তথ্যগুলো জেনে ছিলাম দেয়াল লিখন মারফৎ। বন্দুক সংক্রান্ত তথ্যটা নিয়ে মাথা না ঘামালেও চেয়ারম্যান সংক্রান্ত তথ্যটা আমাকে চিন্তায় ফেলেছিল। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রীকে চিনি অথচ নিজেদের চেয়ারম্যানকে চিনি না!
চেনার আগ্রহে দেয়ালচিত্রগুলো খুঁটিয়ে দেখার চেষ্টা করতাম কিন্তু টেনসিলের ওপর আলকাতরার সহযোগিতায় যে ছবিগুলো আঁকা থাকত সেসব থেকে ওঁর চেহারাটা স্পষ্ট বোঝা যেত না।টুপি পরা অবয়বটুকু শুধু বুঝতে পারতাম। চোখ, মুখ সব অন্ধকার।
অবশ্য তখন চেয়ারম্যান অনুগামীদেরই বা কতটুকু চিনতাম! কংগ্রেস, সি.পি.এমদের রাস্তায় দেখা গেলেও নকশালদের দেখতে পেতাম শুধু মৃত্যুর পর। লাশ দেখে অবাক হয়ে ভাবতাম,ওমা, মিলুদাও নকশাল ছিল!
জীবিত নকশালদের দেখা না পাবার কারণ ততদিনে প্রায় সবাই আন্ডারগ্রাউন্ডে। রাতের অন্ধকারে ওরা যখন মাটির তলা থেকে বেরিয়ে এসে অ্যাকশন করতো তখন উদ্দিষ্ট ব্যক্তি ছাড়া সবাই ঘুমঘোরে। মজার ব্যাপার হলো, এক্ষেত্রেও লাশ দেখেই আমাদের চিনতে হোত যে মানুষটি শ্রেণীশত্রু ছিল।
তাবলে জীবিত শ্রেণীশত্রু যে বিলকুল দেখিনি তা নয়, যদিও সেই দুজনকে নিহত হোতে হয়নি। বরাতজোরে বেঁচে গিয়েছিলেন। সেই দুজনের একজন ছিলেন আমার বাবা। অন্যজনের প্রসঙ্গে পরে আসছি আপাততঃ বাবার শ্রেণীশত্রুতার প্রসঙ্গে আসা যাক।
নির্বাচন ঘোষিত হওয়ার পর থেকেই পরিবারের সবাই আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলাম কারণ কেন্দ্রীয় সরকারের কর্মচারি হওয়ায় খুব স্বাভাবিক কারণেই বাবার ইলেকশন ডিউটি পড়ার কথা। ততদিনে দেয়াল লিখন মারফত সবাই জেনে গিয়েছিলাম, পার্লামেন্ট মূলতঃ শুয়োরের খোঁয়াড়। কিন্তু জানাটা অর্ধেক ছিল অর্থাৎ ওই দেয়াল লিখন থেকে লোকসভা সম্পর্কে জানা গেলেও বিধানসভা মূলতঃ কী, সেটা বোঝা যাচ্ছিল না। সুতরাং ত্রুটি সংশোধনার্থে কে বা কাহারা রাতের অন্ধকারে বাড়ি বাড়ি যে হ্যান্ডবিলগুলো বিলি করে গিয়েছিল তাতে স্পষ্ট ভাষায় লেখা ছিল নির্বাচনের কাজে যেকোনো ভাবে অংশ নেয়া মানুষই শ্রেণীশত্রু এবং তাদের জন্য একটাই শাস্তি বরাদ্দ--মৃত্যু।
এরপর শুরু হয়ে গেল মায়ের তরফ থেকে প্রতিরোধের আয়োজন অর্থাৎ তেত্রিশ কোটি দেব-দেবীর পায়ে মাথা কোটা, মানত, উপবাস ইত্যাদি ইত্যাদি।এছাড়া এক সামান্য মেয়েমানুষের কী বা করার থাকতে পারে! বাপের বাড়ি, শ্বশুরবাড়ি থেকে অনেক দূরের এই শহরে রক্ষা করতে ঈশ্বরের চে বড় খুঁটি আর কে হোতে পারে!
বাবা ইষ্টনাম জপের পাশাপাশি ছুটলেন ঈশ্বরসম শক্তিমান মানুষদের দোরে দোরে, একটু দেখুন। ছেলেমেয়ে দুটো একেবারেই নাবালক। আমার কিছু হলে ওরা পথে ভেসে যাবে।
না, কেউ কটুকাটব্য করেননি। সবাই আশ্বস্ত করেছিলেন, আরে, ডিউটি তো পড়েইনি এখনও, আগেই ভেঙে পড়ছেন! দেখব, যাতে আপনার নামটা কাটিয়ে দেয়া যায়।
কিন্তু এক সন্ধ্যায় বাবা অফিস থেকে ফিরে দুখি স্বরে জানালেন, ভোটে ডিউটি পড়েছে।
কথাটা শোনা মাত্র হাউমাউ করে কেঁদে উঠেছিল মা। সেটাই স্বাভাবিক কারণ এই সংবাদই তো প্রমাণ করে দেয় যে আমাদের পরিবারের প্রতি বরাবর সদয় থাকা দেবদেবীবৃন্দ এক্ষণে হাত গুটিয়ে নিয়েছেন। অর্থাৎ নাবালক পুত্র কন্যার হাত ধরে এক সদ্য বিধবার পথে গিয়ে দাঁড়ানোটাই ভবিতব্য হিসেবেই বেছে দিয়েছেন বিধাতা।
বাবা ফের ছুটে ছিলেন ঈশ্বরপ্রতীমদের দোরে দোরে। এবারও কেউ কটু কথা বলেননি। বাবাকে সাহস জুগিয়ে ছিলেন,এত মিলিটারি সি.আর.পি থাকবে,তবু এত ভয় কিসের অ্যাঁ! সবাই যদি গুন্ডা বদমাশদের ভয়ে এভাবে পেছয় তবে গণতন্ত্র কিভাবে এগোবে?
এরপর সমবেত কান্না মারফত গণতন্ত্রের যাত্রপথ পিচ্ছিল করা ছাড়া আমাদের কী বা করার থাকতে পারে!
বাবা সতর্ক করে দিয়েছিলেন ডিউটির খবরটা যাতে পাঁচকান না হয়। যদিও সেটা সতর্কীকরণ নাকি বিনীত প্রার্থনা ছিল সেটা বাবার কন্ঠস্বর শুনে সেদিন বুঝতে পারিনি।
অবশেষে এলো সে দিন। কাকভোরে চটের ব্যাগে জামাপ্যান্ট ভরে হাফশার্ট আর লুঙি পরে বাবা রওনা দিলেন পোলিং বুথের পানে। যথারীতি অত ভোরে আমাদের দু ভাইবোনের ঘুম ভাঙেনি। মা ঠেলে তুলে দিয়েছিলেন, ওঠ। বাবা যাচ্ছে। প্রণাম কর।
লাফিয়ে উঠেছিলাম। প্রণাম করতেই বাবা জড়িয়ে ধরেছিলেন। কাঁপাস্বরে বলেছিলেন, বাইরে যাস না। যত তাড়াতাড়ি পারি ফিরে আসব।
মাথা নেড়ে বাবার দিকে ভালো করে তাকিয়ে ছিলাম, কে বলতে পারে এ দেখাই শেষ দেখা নয়তো!
বাইরে বেরিয়ে আনুষ্ঠানিক ভাবে বিদায় জানাতে পারিনি কারণ তাতে দশজনের কৌতূহল সৃষ্টি হোত। খবরটা পৌঁছে যেত চেয়ারম্যান অনুগামীদের কানে। তাই ঘরের ভেতর থেকেই শ্রেণীশত্রুকে বিদায় জানিয়ে ছিলাম।হাত জোর করে নিয়তির কাছে প্রার্থনা করেছিলাম যাতে গণতন্ত্রকে এগিয়ে দিয়ে এক বাপ ঠিকঠাক ফিরে আসে তার পরিবারের কাছে। পাশাপাশি চেয়ারম্যানের কাছেও মনে মনে কোনো আবেদন জানিয়ে ছিলাম কি? এতদিন পর ঠিকঠাক মনে নেই। হয়ত জানিয়ে ছিলাম কেননা চীন কতটা দূরে সেটা সঠিক ভাবে না জানলেও চীনের পথই যে আমাদের পথ, সেটা দেয়াল লিখন থেকে জেনেছিলাম।
রক্ষাকত্রা যে-ই হোক, জীবিত অবস্থাতেই ফিরে আসতে পেরেছিল বাবা। তখন গভীর রাত। আমার তখন ঘুমের অতলেই ডুবে থাকার কথা কিন্তু জেগে বসেছিলাম। জীবিত শ্রেণীশত্রু দেখার কৌতূহল আমাকে ঘুমোতে দেয়নি।

কমেন্ট
একটি কমেন্ট লিখুন...




অলোক গোস্বামী : উত্তরবঙ্গে হাংরি আন্দোলন ( ১০ )

এবার আসা যাক দ্বিতীয় শ্রেণীশত্রুর প্রসঙ্গে।
দেয়াল লিখন পড়ার অভ্যেস আমার বহুদিনের। ডহরবাবুর আঙিনা ভরানোর নিমন্ত্রণ কিংবা নেতাজীর শিগ্রি ফিরে আসার সংবাদ, যেটাই হোক, আজও আমার নজর এড়ায় না। বাল্যকালের অভ্যেস বলে কথা!
সি.পি.আই.এম.এল-এর যত দেয়াল লিখন পড়তাম তার মধ্যে সেরা লাগত, এই বুর্জোয়া ব্যবস্থায় যে যত পড়ে সে তত মূর্খ হয়। বলাবাহুল্য সে বয়সে অত কঠিন কঠিন শব্দের অর্থ বোধগম্য হোত না। কে জানে হয়ত গোটা বাক্যটার অর্থই বুঝতে পারতাম না যদি না লিখনটার হাতে-কলমে প্রয়োগ থাকতো।
শহর জুড়ে তখন স্কুল পোড়ানোর উৎসব চলছে। শুধু পোড়ানো নয়, দু-চারজন শিক্ষক সেজে থাকা শ্রেণীশত্রু বধও চলছে। বেশীর ভাগ স্কুলই বন্ধ থাকছে মাসের পর মাস। কিন্তু আমার ভাগ্য এতটাই মন্দ যে ঠিক সেসময়েই ফ্রি প্রাইমারি থেকে ছাড়িয়ে এনে আমাকে ভর্তি করা হয়েছিল শহরের নামী স্কুলে। সত্যিই গর্ব করার মতো স্কুল। 1898 তে প্রতিষ্ঠিত হয়ে 1918তেই হায়ার সেকেন্ডারি বোর্ডের স্বীকৃতি পাওয়া এই স্কুলের প্রাক্তন ছাত্রদের তালিকায় চিরকালই স্বনামধন্যদের ছড়াছড়ি। পাশ রেকর্ডে বলা চলে প্রায় HMV।
কিন্তু নাম ধুয়ে কি জল খাবো? ওই দেয়াল লিখনের আঁচটুকুও লাগত না আমাদের বিদ্যালয়ে! কে জানে কোন জাদুবলে হেডমাস্টার মশায় কঠোর ভাবেই স্কুলের রাশ ধরে রেখেছিলেন! শুধু এটুকুই নয়, মুকুটে পালকের সংখ্যা বাড়িয়ে নিতেই কি না কে জানে, একবার কিছু ছাত্রের খোঁজে আসা পুলিশ বাহিনীকে স্কুল চত্বর থেকে উনি বের করেও দিয়েছিলেন। অর্থাৎ কুমির এবং বাঘ, দুপক্ষকেই চটিয়েছিলেন। তবুও ওঁর কিংবা আমাদের স্কুলের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়নি।
যেহেতু শৈশব থেকেই আমি লেখাপড়া বিমুখ তাই এতটা নিরাপত্তা অবধারিত ভাবেই আমার ভালো লাগত না। অহরহ খবর পাচ্ছি, আজ অমুক স্কুলে আগুন জ্বললো, কাল তমুক স্কুল বন্ধ হয়ে গেল অথচ আমার সেই একঘেয়ে রুটিন। খেলার মাঠ পেরিয়ে স্কুলে যাবার পথে দেখতাম পুরোন স্কুলের সহপাঠীরা মজাসে ফুটবল পিটছে। দেখে বুকে যন্ত্রণা হোত। রাগ হোত বাবার ওপরে, প্রাইমারি পর্বটা পুরোন স্কুল থেকে পড়লে কী ক্ষতি হোত! না থাকুক অটুট দরজা,জানলা, বেঞ্চ, স্বাধীনতাটা তো অটুট ছিল!
রাতে শুয়ে শুয়ে ভাবতাম, আচ্ছা,স্কুলটা যদি আজ রাতে পুড়ে ছাই হয়ে যায় তাহলে কতদিন ছুটি থাকতে পারে? প্রতিদিনই আমার ভাবনায় ছাই ঢেলে দিব্যি পঠন পিটন চলত।
অবশেষে এরকম একটা নিশ্চিন্ত দুর্গের মাথাতেও এক সকালে পতপত করে উড়তে দেখা গেল লাল পতাকা। যদিও তাতে কোন প্রতীক চিহ্ন ছিল না, তা না থাকুক, সে সময় একখন্ড লাল কাপড়ই শহর বন্ধ করে দেয়ার পক্ষে ছিল যথেষ্ট।
সেদিন স্কুলে আসা প্রত্যেক ছাত্রের বুক আনন্দে দুরুদুরু, কতদিন বন্ধ থাকবে স্কুল! অনেকে বলছে বটে অনির্দিষ্টকাল কিন্তু তার মানে কতদিন? সঠিক না জেনে বাড়ি ফেরা যায়?
এরপর থানা পুলিশ সি.আর.পি হওয়াটাই স্বাভাবিক ছিল কিন্তু তার পরিবর্তে দারোয়ানকে সঙ্গী করে হেডস্যার সোজা উঠে গেলেন ছাদে এবং পতাকাটা নামিয়ে এনে রেখে দিলেন অফিসে। উপস্থিত ছাত্র শিক্ষকদের তখন অজ্ঞান হওয়ার উপক্রম। এহেন হঠকারিতার কারণে জীবন সংশয় তো শুধু হেডস্যারের নয়, এগারো শত ছাত্র সহ চল্লিশ জন শিক্ষকেরও। কে বাঁচাবে তাদের?
এখানেই শেষ নয়, কারো সঙ্গে কোনো আলোচনা ব্যতিরেকেই হেডস্যার নির্দেশ দিলেন স্কুল চালু করার। এরপর যথারীতি ঘন্টা বাজল এবং দুরুদুরু বুকে আমাদের গিয়ে বসতে হলো ক্লাসে। অন্যদিন যারা শিক্ষকদের প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিয়ে বাহবা কুড়োত, তাদের ভাগ্যে সেদিন তারিফের হাসিটুকুও জুটল না আর যারা ব্যর্থ হয়ে অন্যদিনের মতোই পিঠ পেতে দিল, তাদের জুটল কঠিনতম বজ্রমুষ্টি।
এভাবেই একদিন-প্রতিদিন-এক হপ্তা-এক মাস। যথা পূর্বং তথা পরং। নির্বিঘ্নে চললো আমাদের অধ্যয়ন তপস্যা। কিছুদিন ভয়ে কাঁটা হয়ে থাকার পর যখন আমরাও ভবিতব্যকে মেনে নিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি ঠিক তখনই একদিন আমাদের সকল কাঁটা ধন্য করে ফুল ফোটার উপক্রম ঘটল।
তখন প্রায় দুপুর একটা, টিফিনের আগের ক্লাসটা চলছে, খানিক পরেই টিফিন তথা খেলাধুলো পর্ব শুরু হবে, সে সময়ই হঠাৎ ‘আগুন আগুন’ চিৎকারে আমরা সবাই নিমেষে ক্লাসের বাইরে। না, কোথাও কোন আগুনের শিখাটুকুও নেই তবু হেডস্যার মাঠের মাঝখানে দাঁড়িয়ে তারস্বরে চিৎকার করছেন।
ছুটে এলেন শিক্ষকবৃন্দ। শোনা গেল, হেডস্যার যখন ঘরে বসে কাজ করছিলেন তখন কয়েকটি যুবক আচমকা ঘরে ঢুকে পড়েছিল, ওদের হাতে ছিল কেরোসিনের টিন। উদ্দেশ্য যে আগুন ধরানো, সেটাও নাকি তারা জানিয়েছিল। কোন রকমে ওদের নাগাল মুক্ত হয়ে হেডস্যার বেরিয়ে আসতে পেরেছেন।
যদিও সরেজমিন তদন্তে যুবকবৃন্দ, কেরোসিন টিন কিছুই পাওয়া গেল না এমন কী কেরোসিনের গন্ধটুকুও নয়, তবু এরপর স্কুল ছুটি হয়ে যাওয়া রুখবে কে? কিন্তু মূল প্রশ্ন তো সেটা নয়, এই ছুটি কতদিনের, প্রশ্নটা সেখানে। উত্তর মেলেনি।
হায়, অভাগা যেদিকে চায় সাগর শুকায়ে যায়।পরদিনই চালু হয়েছিল স্কুল। এমন কী তার কিছুদিন পর পরীক্ষা পর্ব শুরু হোতেও কোনো অসুবিধে হয়নি। কোন দৈব সেদিন কৃপা করেছিলেন হেডস্যারকে সেটা জানা যায়নি। যেহেতু জানার সাহস ছিল না কিংবা জানানোর মতো সোর্সও ছিলনা তাই জানার তৃষ্ণাটুকুও বোধ করিনি তবে স্বীয় জ্ঞান বলে এটুকু বুঝতে অসুবিধে হয়নি যে হেডস্যার শ্রেণীশত্রুই তবে সেটা যেহেতু আমার চোখেই তাই মৃত্যু বরাদ্দ হয়নি।
গল্পটা এখানেই শেষ হোত যদি না অনেকদিন পর এক প্রাক্তন সহপাঠীর আচমকা দেখা পেয়ে স্মৃতির ঝাঁপি খুলে বসতাম। কিন্তু বেরসিক কি আর কল্পনার ধার ধারে? আমার ঝাঁপির মুখ চাপা দিয়ে বলেছিল, আরে, লাল পতাকাটা তো উঁচু ক্লাসের কয়েকটা ছেলে টাঙিয়েছিল যাতে পরীক্ষা ভন্ডুল হয়ে যায়! আমাদের স্কুলে ওসব ঘটবে কিভাবে! ভুলে গেলি মহান নেতার একমাত্র ছেলে তখন আমাদের স্কুলেরই ছাত্র ছিল?
তথ্যটা মিথ্যে নয় ঠিকই কিন্তু তাতে কী এসে যায়!
আমার অবিশ্বাসে চটে উঠেছিল তথ্যদাতা, তুই একবারে গাধা, কখনও ভেবে দেখেছিস গার্লস স্কুলেও কেন তখন আগুনের আঁচ লাগেনি?
ততদিনে গার্লস স্কুলের আঁচ আমার শরীরে ভালো মতোই প্রভাব ফেলতে শুরু করেছিল। এমন কী ওই স্কুলের কেউ কেউ প্রতিরাতের স্বপ্নেও হাজিরা দিচ্ছিল কিন্তু সেসব তো ভিন্ন ব্যাপার! তার সঙ্গে সহপাঠীর প্রশ্নের মিল কোথায়?
বিস্মিত গাধার পিঠে সস্নেহে চাপড় মেরে সেই সবজান্তা বলেছিল, কারণ সর্বাধিনায়কের একমাত্র মেয়েও তখন গার্লস স্কুলের ছাত্রী ছিল!
খানিকক্ষণ নিশ্চুপ বসে থেকে প্যান্টে সেঁটে যাওয়া চোরকাঁটা বেছেছিলাম। কার্য শেষে উঠে পিঠ ঝাড়া দিয়েছিলাম, চলি রে।
এমন নাটকীয় বিদায়ে হয়ত সহপাঠী মনঃক্ষুণ্ণ হয়েছিল। হোক গে। কুলোকের কুকথা অলোক কোন দায়ে বিশ্বাস করবে! সেটাও আবার এতদিন পর! কে হায় হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালোবাসে?


কমেন্ট
একটি কমেন্ট লিখুন...




অলোক গোস্বামী : উত্তরবঙ্গে হাংরি আন্দোলন ( ৯ )

হাংরি জেনারেশন বুলেটিন কিংবা ক্ষুধার্ত পত্রিকায় অনেকেই লিখেছিলেন। এরা কারা, কিভাবে যুক্ত হয়েছিলেন, কেনই বা সরে গিয়েছিলেন, বলতে পারবো না। যেহেতু হাংরি সাহিত্য বিষয়ক গবেষণা পত্র লিখতে বসিনি তাই সেসব প্রসঙ্গ এখানে অর্থহীন। আমি এবং আমরা সেসময় যে যে ক্ষুধার্ত লেখক/কবিদের সংস্পর্শে এসেছিলাম এই আখ্যানে শুধুই তাদের প্রসঙ্গ। সম্পূর্ণ ইতিহাসে আগ্রহীরা আশা করি স্বীয় তাগিদে বিশদ জেনে নেবেন।
অবনী ধরের সঙ্গে কোনদিন আলাপ হয়নি। আলাপ হবেই বা কীভাবে, উনি বেঁচে আছেন কিনা সেটুকু তথ্যও কারো কাছ থেকে জানতে পারিনি সেদিন। মাত্র বছর কয়েক আগে জানতে পেরেছি ওঁর মৃত্যুসন-২০০৭। আহা, একবারটি দেখা হলো না অবনীদা!
কেন সেদিন অবনী ধর সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারিনি সে প্রসঙ্গে আমি কিছু না বলে বরং অবনী পুত্র অলোক ধরের লেখা থেকে অংশবিশেষ তুলে ধরি--
” ২০১১ সালে শৈলেশ্বর ঘোষ সম্পাদিত ক্ষুধার্ত সংকলন প্রকাশিত হয়েছিল ‘দে’জ’ প্রকাশনা থেকে। সংকলনটি উৎসর্গ করা হয়েছে প্রয়াত তিন হাংরি লেখক কবিদের উদ্দেশ্যে। এরা হলেন-- বাসুদেব দাশগুপ্ত, সুভাষ ঘোষ, ফালগুনী রায়। অথচ আমার বাবা অবনী ধর প্রয়াত হন ২০০৭ সালে। আর এভাবেই সেই সংকলনটির সম্পাদক প্রমাণ করবার চেষ্টা করেছিলেন যে, দু-একটা লেখা ক্ষুধার্ত সংকলনগুলোতে ছাপা হলেও আসলে অবনী ধর হাংরি জেনারেশনের তেমন কেউ ছিলেন না। তাই তিনি অবনী ধরকে তাদের সহযোদ্ধাও মনে করেননি।”( শারদীয় অনুষ্টুপ-২০১৯)।
পুরোন ক্ষুধার্ত পত্রিকা এবং স্বকাল পত্রিকায় অবনীর, “ ভাতের জন্য শ্বশুরবাড়ি”, “ ওয়ান ব্রেড ওয়ান শট”, “ কলিকাতা ভ্রমণ”, “ আমার দুঃখী মা” পড়েছিলাম। পড়ে মুগ্ধ হয়েছিলাম। অবনী ধরকে একজন অন্যতম ক্ষুধার্ত গদ্যকার হিসেবে মেনে নিতে অসুবিধে হয়নি। কারণ সহজ সরল ভাষায় কোনো উপমা, প্রতীকের পরোয়া না করে শুধুমাত্র নিজেকেই ব্যবহার করে যা লিখেছেন সেসব লিখতে অনেক লেখকের ব্যাগ পাইপ ফেটে যাবে। যদিও লেখার প্রশ্নও ওঠে না কারণ তাদের কাছে সাহিত্য এক অনন্ত মায়াপুর।
অবনী ধরের কয়েকটা গল্প পুনর্মুদ্রণ করেছিলাম আমরা। সম্ভবত আমাদের পূর্বে কেউ করেনি। করার কথাও নয়। যা হোক আমাদের সেই কাজটাকে ক্ষুধার্ত বন্ধুরা সমর্থনও করেনি। কেন করেনি, কী বলেছিল? থাক সেসব কথা। এতদিন পর সে সব প্রসঙ্গ তুলে বাতাস গন্ধা করে কোনো লাভ নেই। বাংলা সাহিত্য থাকলে অবনী ধরও থাকবেন।
ফালগুনী রায় সম্পর্কে বিশেষ কিছু বলার নেই। আমরা ওঁকে জীবিত অবস্থায় পাইনি। পেয়েছিলাম ওঁর কিছু কবিতা, একটা উপন্যাস এবং “ নষ্ট আত্মার টেলিভিশন” নামক চটি কবিতা সংকলনটা। কবিকে বোঝার জন্য এ্টুকুই তো যথেষ্ট। আমরাই প্রথম ফালগুনীর কবিতা এবং ফালগুনী বিষয়ক কিছু লেখা নিয়ে একটা সংকলন প্রকাশ করেছিলাম। সংকলনটির এককপিও আমার কাছে নেই। হয়ত সন্দীপ দত্তের সংগ্রহে থাকতে পারে।
পরিচয় হয়েছিল ত্রিপুরার কবি/লেখকদের সঙ্গে। যেমন অরুণ বণিক, সেলিম মুস্তাফা, বিনয় দেবনাথ, প্রণব দেবনাথ, অরূপ দত্ত। পরিচয়ের সূত্র প্রদীপ চৌধুরী। ওদের সঙ্গে কখনও দেখা না হলেও চিঠিতে নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। লেখালিখিতে যোগাযোগ ছিল। মনে আছে পোস্টকার্ডে উপন্যাস পাঠাতেন অরুণ বণিক। উত্তর না পেলে চটে উঠতেন। আহা, মানুষটাকে নৃশংস হত্যা করেছিল কে অথবা কাহারা। খবরটা জেনে আমরা শিলিগুড়িতে শোকপালনও করেছিলাম।
সুবিমল বসাকের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল বহু বহু বছর পেরিয়ে। সুবিমল অসাধারণ কিছু গদ্য এবং কবিতা লেখা সত্বেও ওঁর বন্ধুদেরই কখনও দেখিনি ওঁকে গুরুত্ব দিতে। কেন ওই উপেক্ষা, বলতে পারব না। হয়ত মলয় রায়চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলার অপরাধে। মলয় ছুঁলে আঠেরো ঘা।
দেবী রায়ের সঙ্গে কোনদিন যোগাযোগ না হওয়া সত্বেও ওঁর প্রসঙ্গে কিছু কথা বলার প্রয়োজন বোধ করছি। দেবী রায়ের আদত নাম হারাধন ধাড়া। কে জানে কেন ভদ্রলোক ছদ্মনামে লিখতেন! তা লিখতেই পারেন, বাংলা সাহিত্যে এ আর নতুন ঘটনা কি! কিন্তু অবাক হয়ে দেখতাম ক্ষুধার্তরা দেবী রায়ের পিতৃদত্ত নাম নিয়ে ব্যঙ্গ বিদ্রুপ করতেন। ব্যাপারটা খুবই বিসদৃশ ঠেকতো। প্রতিবাদ হয়ত করিনি কখনও তাবলে ঘটনাটাও ভুলতে পারিনি। না ভোলার প্রমাণ বছর খানেক আগে একটা গল্প লিখেছিলাম,‘ নামগোত্র’। ভয় নেই, এখানে সেই গল্পটা ফাঁদতে বসবো না, শুধু জানিয়ে রাখছি মূল বিষয় ছিল এই নাম-ছদ্মনাম।

অন্যায়ের প্রতিবাদ জানাতে আমার প্রায় ছত্রিশ বছর লাগলেও মলয় রায়চৌধুরী কিন্তু বহু পূর্বেই প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। মলয়দার কথাগুলো হুবহু মনে নেই, তবে মর্মার্থটা এরকম ছিল, দেবী রায়ের প্রকৃত নাম উচ্চারণ করতে যাদের উল্লসিত হোতে দেখি শঙ্খ ঘোষের প্রকৃত নাম উচ্চারণ করতে গিয়ে সেসব ছাগকন্ঠ শুকিয়ে আসে।
মলয়ের এই প্রতিবাদ খুব ভালো লেগেছিল। শুধু দেবী রায়কে সমর্থন করার জন্যই নয়, শঙ্খ ঘোষের প্রসঙ্গটা তুলে ধরার কারণেও। সত্যিই, শঙ্খ ঘোষের মতো জ্যান্ত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ক্ষুধার্তদের অত মাখামাখি আমাদের সেসময় বিমূঢ় করে দিতো। বুঝতে পারিনি শ্রী ঘোষের, ‘শব্দ আর সত্য’ এর মতো একটা লেখা ক্ষুধার্ত পত্রিকায় কেন প্রকাশিত হয়েছিল! যদিও লেখাটির পাশেই প্রদীপ চৌধুরীর একটি প্রতিবাদী লেখা প্রকাশিত হয়েছিল। ওই যে খানিক আগে প্রদীপ চৌধুরী প্রসঙ্গে লিখতে গিয়ে খানিকটা গদ্যাংশ তুলে ধরে বলেছিলাম, লেখাটি তাৎপর্যপূর্ণ, ওটাই ছিল পাল্টা লেখাটার অংশবিশেষ।
প্রদীপদার লেখাটা শেষ হয়েছিল এভাবে-- “ আপনি শব্দ ও সত্যের কথা লিখতে চেয়েছেন কিন্তু শব্দের গোপন সত্যের কথা ভেবেছেন কখনো?”

কিন্তু এই কাউন্টার-এনকাউন্টার পর্ব ভালো লাগেনি আমার। বরং মনে হয়েছে বিরক্তিকর ঘটনাটাকে তো এড়িয়ে যাওয়াই যেত। প্রথম লেখাটা ছাপানোর কী এমন দায়বদ্ধতা ছিল! ভদ্রলোকদের সঙ্গে গা ঘষাঘষি করার এত লোভ?
ভদ্রলোকি প্রসঙ্গ যখন এলোই তখন একটা গল্প বলার লোভ সামলাতে পারছি না। যদিও ঘটনাটা অবান্তর মনে হোতে পারে, হয় হোক, আগাম মার্জনা চেয়ে রাখছি।
একটি কমেন্ট লিখুন...




অলোক গোস্বামী : উত্তরবঙ্গে হাংরি আন্দোলন ( ৮ )


কোনো একটা অনুষ্ঠানে অশোক মিত্রর সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল। বামফ্রন্টের প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী, ‘কবিতা থেকে মিছিলে’র লেখক। আরও অজস্র বই আছে ওঁর কিন্তু ‘কবিতা থেকে মিছিলে’ একটি অবশ্যপাঠ্য বই। অন্ততঃ আমাদের সময়ে তেমনটাই ছিল।
সবাই জানেন উনি খুব চাঁচাছোলা গোত্রের মানুষ ছিলেন। আমি জেনেছিলাম ওর আপাত রুক্ষতার আড়ালে কোমল মনটার কথা।

সেই অনুষ্ঠানে আমিই কিছু চাঁচাছোলা মার্কা কথা বলেছিলাম, প্রধান অতিথির চেয়ারে বসে উনি শুনেছিলেন। অনুষ্ঠান শেষে আমাকে ডেকে কথা বলেছিলেন।
তারপর থেকে ডঃ মিত্র আমাকে পোস্টকার্ড লিখতেন, আমিও উত্তর দিতাম। কোলকাতায় এলে দেখা করতাম। দীর্ঘক্ষণ চলতো আড্ডাপর্ব। বিষয় হোত অবশ্যই রাজনীতি এবং সাহিত্য। কখনও ওঁর স্ত্রীও এসে বসতেন। আড্ডার যা নিয়ম, তর্কবিতর্কও হোত। আমাকে যারা জানেন তারা জানেন বিতর্কের সময় প্রতিপক্ষকে রেয়াত করার অভ্যেস আমার কোনো কালেই নেই। এ কারণে অনেকেই আমাকে এড়িয়ে চলেন। বলাবাহুল্য তারা কেউ অশোক মিত্র নন।
তো একবার মানিক বন্দ্যোপাধায়কে নিয়ে কথাবার্তা চলছিল। ডঃ মিত্র পদ্মা নদীর মাঝি বিষয়ে বলছিলেন, আমি মুগ্ধ হয়ে শুনছিলাম। ইচ্ছে ছিল পুতুল নাচের ইতিকথা বিষয়ে কিছু কথা শোনার কিন্তু উনি উপন্যাসটিকে গুরুত্ব দিলেন না। এরপর আমার সবচে প্রিয় উপন্যাস ‘দিবারাত্রির কাব্য’ প্রসঙ্গ উঠতেই উনি বলে বসলেন, কাঁচা লেখা। ব্যস, আমারও মাথা গরম হয়ে উঠলো। ঠাস করে বলে দিলাম, আপনি সাহিত্যই বোঝেন না। সব সময় মার্কসবাদের ভূত আপনার মাথায় ঘোরে।
এক পলকের জন্য থমকালেন না অশোক মিত্র। বরং মাথা হেলিয়ে বললেন, হোতে পারে।

হুঁশ ফিরতেই আমার মাথায় বাজ, কাকে কী বললাম! কিন্তু উনি নির্বিকার, আপনার যেটা মনে হয়েছে সেটা বলতেই পারেন। অসুবিধে কীসের! হোতেই তো পারে আমার ভাবনায় কোথাও ভুল রয়েছে। কথাবার্তা নাহলে বুঝব কিভাবে!
তো একবার অশোক মিত্রকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, আপনি তো বলেছিলেন যে আপনি কমিউনিস্ট, ভদ্রলোক নন, তাহলে চৌরঙ্গী কেন্দ্রে সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের বিরুদ্ধে নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছিলেন কেন? কি ভেবেছিলেন, ওখানকার ভদ্রলোকেরা আপনাকে ভদ্রলোক ভেবে জিতিয়ে দেবেন?
উত্তর দিতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা দেখাননি অশোক মিত্র। অকপটে বলেছিলেন, আমার তো সেবার ভোটে দাঁড়ানোরই কথা ছিল না। হারের ভয়ে সিদ্ধার্থ রায়ের বিরুদ্ধে কেউ প্রার্থী হোতে রাজী হচ্ছিলেন না। জ্যোতি বসু আমাকে অনুরোধ করলেন, আমিও শহীদ হোতে রাজী হয়ে গেলাম।আমি তো ভদ্রলোক নই, লজ্জা কিসের!

ভদ্রলোকি প্রসঙ্গে যখন এত কথাই শুনলেন তখন নাহয় আরও খানিকটা শুনলেন। যদিও এই ভদ্রলোক প্রসঙ্গে ইতিপূর্ব কিছু কথা বলেছি কিন্তু সেটুকু ওঁর জন্য যথেষ্ট নয়। সেই ভদ্রলোক হলেন মলয় রায়চৌধুরী। হ্যাঁ, ঠিকই পড়েছেন। আমি জেনেশুনেই মলয় রায়চৌধুরীকে ভদ্রলোক অভিধাটি দিচ্ছি। কারণ--
ক) উনি সাবর্ণ চৌধুরী বংশজাত।
খ) উনি ইকনোমিক্সের তুখোড় ছাত্র, লন্ডন স্কুল অফ ইকনোমিক্সে ভর্তি হওয়ার কথা ছিল, ক্ষুধার্ত আন্দোলনে জড়িয়ে পড়ার কারণে সম্ভব হয়নি।
গ) উনি প্রাক যৌবনেই বিদেশী সাহিত্য গুলে খেয়েছিলেন।
ঘ) উনি শৈশবে পটনার ইমলিতলায় ছোটলোকদের সঙ্গে বেড়ে উঠতে বাধ্য হলেও ‘হাংরি’ শব্দটা ধার করেছিলেন চসারের লেখা থেকে। পত্রিকার নামও তাই রেখেছিলেন, ‘হাংরি জেনারেশন।’ প্রথম কয়েকটি সংখ্যা প্রকাশ করেছিলেন খাস ইংরেজিতে।
ঙ) উনি রিজার্ভ ব্যাঙ্কের অতি উচ্চপদে চাকরি করতেন। তিরাশি সালেই বেতন ছিল দৈনিক একশ সত্তর টাকারও বেশী অর্থাৎ ৫১০০/ এরও বেশী।
চ) উনি আন্তর্জাতিক যোগাযোগে রীতিমত চ্যাম্প। ক্ষুধার্ত মামলায় ফেঁসে যাবার কালে খোদ গিন্সবার্গ দিয়ে চিঠি লিখিয়েছিলেন ইন্দিরা গান্ধীর সহকারীকে।
ছ) অ্যান্টি-এস্টাব্লিশমেন্টের বিগ বস।
জ) রূপোলী পর্দার আগ্রহ।
ঝ) ষাটের দশকে, যখন যোগাযোগ ব্যবস্থা এত উন্নত ছিল না তখনই বিশ্বের তাবড় তাবড় মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। এখন তো পৃথিবীর কোণে কোণে মে হাংরি আন্দোলন তথা নিজেকে ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছেন। তাঁর বদৌলতেই আজ হাংরি জেনারেশান মুভমেন্টের নিজস্ব ওয়েব সাইট রয়েছে।

প্রসঙ্গত জানিয়ে রাখি, ওপরের একটি তথ্যও কিন্তু আমার স্বকপোল কল্পিত নয়, সবগুলোই সাপ্লায়েড বাই খোদ মলয় রায়চৌধুরী। এরপরও কারো কোনো তথ্য জানতে হলে সরাসরি মলয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন। ভদ্রলোক উদার। ওঁর একটি কবিতা সংকলনের নাম--যা লাগবে বলবেন।
তো ভদ্রলোক চিরকাল ‘ আমি’র শব্দরূপ লিখে গেলেন। ব্যাকরণ কৌমুদী তো “ ময়ি-আবয়োঃ-অস্মাসু” অবধি লিখেই যথেষ্ট মনে করেছিল কিন্তু মলয়দা ওটুকুতে সন্তুষ্ট না হয়ে দিনের পর দিন স্টক বাড়িয়েই নিয়েছেন। আজও সমান গতিতে চলছে ওঁর বর্ধমান এক্সপ্রেস। সঙ্গে রয়েছে ব্যঙ্গ বিদ্রুপের অক্ষয় তূণীর। যাকেই মনে হবে বিপরীত অক্ষের মানুষ তাকেই লক্ষ্য করবেন।
মলয়দার সঙ্গে আমার সম্পর্ক অনধিক ছত্রিশ বছরের। ভদ্র এবং অস্পষ্টবাদী হিসেবে আমারও তো কোনদিনই সুনাম নেই তাহলে এতগুলো বছর ধরে মলয় রায়চৌধুরীর ঝাঁঝ সামলালাম কিভাবে? প্রথম পত্রাঘাতই আমার পক্ষে যতটা অস্বস্তিকর হয়েছিল তাতে এরপর দুজনের ভেতর দুস্তর ব্যবধান জেগে ওঠাটাই ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু হয়নি।হয়নি কারণ ওঁর মনের জোর আমাকে মুগ্ধ করেছিল।
মাত্র আঠাশ বছরে স্ট্রোকে আক্রান্ত মলয়দাকে আমি যে বয়সে দেখেছি তখন তাঁর শারীরিক অবস্থা এমনই ছিল যে অন্য কেউ হলে পঙ্গু বলা যেত। ওই যে বলেছিলাম, কাঁপা কাঁপা হস্তাক্ষর, কারণটা ছিল ঠিকঠাক কলম ধরতে না পারা। মুঠো করে কলম ধরতেন। আমি দেখেছি মলয়দার ঘাড় কাঁপতে। এহেন দশায় এত অজস্র লেখা, আক্রমণ শানানো, ওফ, সেরেফ মলয় রায়চৌধুরী বলেই সম্ভব। যাকে বলে দানব প্রতিভা। সাধে কী সুভাষ ঘোষ বলেছিলেন, "মলয় যদি ‘আমি’ রোগটা সারাতে পারাতো তাহলে বাংলা সাহিত্যকে খেল দেখিয়ে দিতে পারতো।”
জানি, সুভাষের এই কথা মলয়দা বিশ্বাস করবেন না কারণ সুভাষের সঙ্গে শত্রুতার ব্যাপারটা তিনি প্রায় কলতলার ঝগড়ার পর্যায়ে নামিয়ে এনেছেন। যেমন, বেশ্যার ঘরে গিয়ে সুভাষের বীরপুরুষগিরি না দেখাতে পারা কিংবা সুভাষের শ্বশুরবাড়িতে ঘরজামাই থাকা, ইত্যাদি প্রভৃতি নানান টক-ঝাল-মিষ্টি প্রায়শই পরিবেশন করে থাকেন।
প্রথমটার কথা বলতে পারবো না কারণ আমাদের সঙ্গে সুভাষদার তেমন সম্পর্ক ছিল না। তবে দ্বিতীয়টার কথা বলতে পারবো কারণ স্টেশন চত্বরে চাটাই বিছিয়ে আনাজ বিক্রি করা জমিদার(!) শ্রীললিতমোহন সাহার রাজগৃহে আমরা থেকেছি। দেখেছি চৌধরি ললিতবাবুর একমাত্র রাজকন্যা শ্রীমতি কনক সাহা ওরফে কনক ঘোষের স্কুলে চাকরির সুবাদে টিনের চাল আর বেড়ার সেই ঘরকে এক কামরার পাকা ঘরে পরিণত করার লড়াই। দেখেছি রাজা ললিতমোহনের দীর্ঘজীবি রানীকে জীবনের শেষ কিছু বছর উন্মাদ দশায় কাটাতে। অনুভব করেছি, কনকদির মা, সন্তান এবং সুভাষদাকে দেখভাল করার প্রাণান্তকর লড়াই। দেখেছি, আচমকা আমাদের উপস্থিতিতে বিরক্ত না হোতে। মাটিতে শুতে হলেও আমরা কিন্তু প্রাসাদের তৃপ্তিই পেয়েছি।
আমরা যখন জানি এসব তখন মলয় কি জানেন না? আলবত জানেন। ওঁর স্যাটফোন ডিসকানেক্ট করার ক্ষমতা কোনো টর্নেডোরই নেই। তবু বলেন ওসব। হয়ত নিজেকে ডি-ক্লাসড প্রমাণ করতে এসব বলেন। বলুনগে। ওসব কথায় কিছু মনে করারও কারণ নেই, খোট্টা রসিকতার ধরণ এমনই হয়। মরদানি ওদের কাছে বহোত বঢ়া চিজ।
সে যাগ্গে, এরপর থেকে যেখানে যত লেখাপত্র প্রকাশিত হোত মলয়দা নিয়মিত সেসবের জেরক্স কপি আমাকে পাঠাতেন। একবার এক পোস্টকার্ডে মলয় জানিয়েছিলেন, কোলকাতায় আমার দাদা থাকে। হাওয়া ৪৯ পত্রিকা সম্পাদনা করেন। দেখা কোরো।
ঠিকানাও দেয়া ছিল ওই পোস্টকার্ডে কিন্তু আগ্রহ ছিল না আমার। মলয়ের অহঙের রেলিঙই ডিঙোতে পারি না তার পরে আবার ওঁর দাদা! কাজ নেই। অত লোড নেয়া যাবে না। তাছাড়া যেটুকু শুনেছিলাম তাতে মানুষটাকে আদৌ গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়নি।
কিন্তু সময়ের দাবীকে অস্বীকার করবে কে? পরিচয় হলো সমীর রায়চৌধুরীর সঙ্গে। কী আশ্চর্য, দু ভাইয়ে এত ফারাক! পান্ডিত্য, সহিষ্ণুতা, বিনয়, আন্তরিকতা, অন্যের লেখার প্রতি আগ্রহ, সবকিছু মিলিয়ে মানুষটি যেন প্রবাদ প্রতীম। আমার এই বিশেষণগুলো যে বানিয়ে বানিয়ে বলা নয় সেটা যারা সমীর রায়চৌধুরীর সঙ্গে মিশেছেন তারা জানেন। সুতরাং সম্পর্ক গড়ে উঠতে দেরী হলো না। সেই নিবিড় সম্পর্ক সমীরদার মৃত্যু অবধি জারী ছিল।
আমার সম্পাদিত গল্পবিশ্ব পত্রিকায় একটি ক্রোড়পত্রও প্রকাশিত হয়েছিল সমীরদাকে নিয়ে। সেখানে মলয় রায়চৌধুরীকে ইচ্ছে করেই লেখক হিসেবে নির্বাচন করিনি। কারণ আমি চেয়েছিলাম, সমীর রায়চৌধুরী মানে শুধুই মলয় রায়চৌধুরীর দাদা, এই গড়ে দেয়া ধারণাটাকে ভেঙে দিতে। চেয়েছিলাম পাঠক যাতে সমীর রায়চৌধুরীকে নিজ বৈশিষ্ট্যে খুঁজে নিতে পারেন।
সমীর রায়চৌধুরী প্রসঙ্গে অনেক কিছু বলার আছে কিন্তু সেসবের জন্য এই পরিসর উপযুক্ত নয়। এখানে শুধুই মলয় রায়চৌধুরী।
সমীরদা পড়তে দিয়েছিলেন মলয় রায়চৌধুরীর প্রথম উপন্যাস--ডুবজলে যেটুকু প্রশ্বাস।বেশ কিছুদিন না পড়ে ফেলে রেখেছিলাম। কারণ মলয়ের কবিতা কোনদিনই পছন্দ হয়নি আমার। এমন কী ‘প্রচন্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ পড়েও তেমন আহামরি কিছু লাগেনি। মনে হয়েছে বিদেশী কবিতার অনুসরণ। কিন্তু উপন্যাসটা পড়ে চমকে উঠেছিলাম, এ কোন মলয় রায়চৌধুরী! অনর্গল আঁচড়ানি কামড়ানির ফাঁকে ফাঁকে কিভাবে রপ্ত করলেন এই ভাষা! কর্কশ মানুষটার ভেতরে এই পেলব কথনভঙ্গী ছিল নাকি কখনও? মানুষের অন্তরকে খুঁটিয়ে দেখার মতো রঞ্জন রশ্মি ছিল নাকি ওঁর চোখে! ছিল নাকি এতটা সোহাগ, প্রশ্রয় ওঁর অন্তরে? কই, টের পাইনি তো!