শনিবার

উত্তম দাশ : হাংরি আন্দোলনের স্রষ্টা মলয় রায়চৌধুরী

    


প্রচণ্ড অবিশ্বাস, ঘৃণা ও প্রত্যাখ্যান এই ত্রিবিধ নৈরাজ্যে ষাট দশকের শুরুতে আত্মার একটা ছটফটানি মলয় রায়চৌধুরী যখন সবে টের পাচ্ছেন তখন তিনি পাটনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির ছাত্র । জীবনের মুখোমুখি দাঁড়াবার বয়েস । নিজেকে চিনে নেবার, অস্তিত্বের স্বরূপ আবিষ্কারের সময় । ততদিনে চিনে নেবার অবকাশ হয়েছে স্বদেশকে, সমাজ তার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কাঠামো খুলে ধরেছে সামনে । স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে চোদ্দ বছর আগে । দেশবিভাগ, শেকড়হীন মানুষের বিলিব্যবস্হা, দেশপপেম ততদিনে মুনাফা তুলছে । পরিবারের গঠন পালটাচ্ছে ; শহর গ্রাম ব্যবধান বাড়ছে, নীতিবোধ ভাঙছে, বিশ্বাসের তলানি এ পপজন্ম চেখে দেখার ফুরসৎ পায়নি । বাংলা কবিতায় রবীন্দ্রবিরোধ রাজনৈতিক মুনাফার জন্য মাত্র প্রয়োজন, ত্রিশ-চল্লিশের কবিতা গতানুগতিক হচ্ছে নির্জীব কবিদের হাতে । পঞ্চাশ সবে জাগছে । নিজস্ব ভূমি আবিষ্কার হয়নি ।
         বিদেশি সাহিত্যের সঙ্গে মলয়ের পরিচয় তখনও নিবিড় নয় । এই সময়ে হঠাৎ ইংরেজ কবি চসারের In the sowre hungry tyme পঙক্তিটি গিরে ধরল তাঁকে । একান থেকে তুলে নিলেন হাংরি শব্দটি । অসওয়াল্ড স্পেংলারের সাংস্কৃতিক অবক্ষয় বিষয়ক কনসেপ্টে খুঁজে পেলেন হাংরি শব্দের দার্শনিক ভিত্তি । এই সময়ের প্রতিক্রিয়া দাদার বন্ধু শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে জানালেন তিনি । শক্তিও তখন পাটনায় । উৎসাহ দিলেন । [ মলয় ইংরেজিতে কবিতার একটি ইশতাহার প্রকাশ করলেন ১৯৬১ সালের নভেম্বরে Hungry Generation নামে ; সেই ইশতাহার ১৯৬২ সালে আরও দুবার পরিমার্জিত আকারে প্রকাশিত হয়েছিল । বাংলা ইশতাহার প্রকাশিত হয়েছিল ইংরেজি ইশতাহারের পরে । ] ১৯৬২ সালের এপ্রিলে বাংলা ইশতাহারটি প্রকাশ করলেন মলয় ‘হাংগরি জেনারেশন’ । স্রষ্টা : মলয় রায়চৌধুরী, ; নেতৃত্ব : শক্তি চট্টোপাধ্যায় ; সম্পাদনা : দেবী রায় । ততদিনে অবশ্য দলবল বেড়েছে । কিন্তু হাংরি জেনারেশনের প্রথম বাংলা বুলেটিনটি গুরুত্বপূর্ণ । পরবর্তী সময়ে যাঁরা হাংরি আন্দোলনের সরিক হয়েছিলেন, ধরে নিতে হবে এই বুলেটিনের বয়ানে তাঁদের সায় ছিল । অন্তত তাঁরা মেনে নিয়েছিলেন এই আন্দোলনকে । মলয়ের লেখা বুলেটিনের সঙ্গে মৌল কোনো বিরোধ তাঁদের আদর্শগত কারণে ছিল না ; থাকলে একদল তরুণ নিশ্চয় এভাবে সংগঠিত হতে পারতেন না । আমি ভুলি না যে একটা আন্দোলন যৌথ চিন্তার ফসল । পরবর্তীকালে হাংরি আন্দোলনে এই যৌথ চিন্তার রূপ দেখবো । কিন্তু প্রাথমিক স্তরে একজন তাত্বিকের আনুগত্ব মেনে নেওয়াই সঙ্গত । তাত্বিক মলয় প্রথম বুলেটিনে লিখেছেন :-

          “কবিতা এখন জীবনের বৈপরীত্যে আত্মস্হ । সে আর জীবনের সামঞ্জস্যকারক নয়, অতিপ্রজ অন্ধ বল্মীক নয়, নিরলস যুক্তিগ্রন্হন নয় । এখন, এই সময়ে, অনিবার্য গভীরতার সন্তৃস্তদৃক ক্ষুধায় মানবিক প্রয়োজন এমনভাবে আবির্ভূত যে, জীবনের কোনো অর্থ বের করার প্রয়োজন শেষ । এখন প্রয়োজন অনর্থ বের করা, প্রয়োজন মেরু বিপর্যয়, প্রয়োজন নৈরাত্মসিদ্ধি । প্রাগুক্ত ক্ষুধা কেবল পৃথিবীবিরোধিতার নয়, তা মানবিক, দৈহিক এবং শারীরিক । এ ক্ষুধার একমাত্র লালনকর্তা কবিতা, কারণ কবিতা ব্যতীত আর কী আছে জীবনে ! মানুষ, ঈশ্বর, গণতন্ত্র এবং বিজ্ঞান পরাজিত হয়ে গেছে । কবিতা এখন একমাত্র আশ্রয় ।
          কবিতা থাকা সত্বেও, অসহ্য মানবজীবনের সমস্ত প্রকার অসম্বদ্ধতা । অন্তরজগতের নিষ্কুন্ঠ বিদ্রোহে, অন্তরাত্মার নিদারুণ বিরক্তিতে, রক্তের প্রতিটি বিন্দুতে রচিত হয় কবিতা --- উঃ, তবু মানবজীবন কেন এমন নিষ্প্রভ ! হয়তো, কবিতা এবং জীবনকে ভিন্নভাবে দেখতে যারা অভ্যস্ত, তাদের অপ্রয়োজনীয় অস্তিত্ব এই সংকটের নিয়ন্ত্রক ।
          কবিতা বলে যাকে আমরা মনে করি, জীবনের থেকে মোহমুক্তির প্রতি ভয়ংকর আকর্ষণের ফলাফল তা কেবল নয় । ফর্মের খাঁচায় বিশ্বপ্রকৃতির ফাঁদ পেতে রাখাকে আর কবিতা বলা হয় না । এমন কি, প্রত্যাখ্যাত পৃথিবী থেকে পরিত্রাণের পথরূপেও কবিতার ব্যবহার এখন হাস্যকর । ইচ্ছে করে, সচেতনতায়, সম্পূর্ণরূপে আরণ্যকতার বর্বরতার মধ্যে মুক্ত কাব্যিক প্রজ্ঞার নিষ্ঠুরতার দাবির কাছে আত্মসমর্পণই কবিতা । সমস্ত প্রকার নিষিদ্ধতার মধ্যে তাই পাওয়া যাবে অন্তর্জগতের গুপ্তধন । কেবল, কেবল কবিতা থাকবে আত্মায় । 
          ছন্দে গদ্য লেখার খেলাকে কবিতা নাম দিয়ে চালাবার খেলা এবার শেষ হওয়া প্রয়োজন । টেবলল্যাম্প ও সিগারেট জ্বালিয়ে, সেরিব্রাল কর্টেক্সে কলম ডুবিয়ে কবিতা বানাবার কাল শেষ হয়ে গেছে । এখন কবিতা রচিত হয় অর্গাজমের মতো স্বতঃস্ফূর্তিতে । যেহেতু ত্রশ্নু বলাৎকারের পরমুহূর্তে কিংবা বিষ খেয়ে অথবা জলে ডুবে ‘সচতনভাবে বিহ্বল’ হলেই এখন কবিতা লেখা সম্ভব । শিল্পের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা কবিতা সৃষ্টির প্রথম শর্ত । শখ করে, ভেবে ভেবে, ছন্দে গদ্য লেখা হয়তো সম্ভব, কিন্তু কবিতা রচনা তেমন করে কোনো দিনই সম্ভব নয়। অর্থবঞ্জনাঘন হোক অথবা ধ্বনিপারম্পর্যে শ্রুতিমধুর, বিক্ষুব্ধ প্রবল চঞ্চল অন্তরাত্মার ও বহিরাত্মার ক্ষুধা নিবৃত্তির শক্তি না থাকলে, কবিতা সতীত মতো চরিত্রহীনা, প্রিয়তমার মতো যোনিহীনা, ঈশ্বরীর মতো অনুন্মেষিনী হয়ে যেতে পারে ।”

          হাংরি জেনারেশনের বিরুদ্ধে প্রচলিত যে অভিযোগ যৌনতা এবং জান্তব ক্ষুধা ও জৈবতার, তার ইঙ্গিতমাত্র নেই মলয়ের ইশতাহারে । যদিও জীবনের সামগ্রিক ক্ষুধাকে তিনি বলেছেন -- ‘মানসিক, দৈহিক এবং শারীরিক।’ তবু তাঁর বিশ্লেষণ যেখানে এসে থেমেছে সেখানে এ ক্ষুধা আত্মিক । অন্তরাত্মা ও বহিরাত্মার ক্ষুধা নিবৃত্তির সামর্থ্যে কবিতা আসলে বস্তুগত জীবন ও আত্মিক জীবনের মেলবন্ধন । কবিতা যেখানে জীবনের একমাত্র আশ্রয় সেখানে কবিতা ও জীবন একার্থক অথচ জীবনের সংকট কবিতা ও জীবনকে ভিন্নভাবে দেখা। কবিতা-বানিয়েদের মলয় দেখেছেন ক্ষমাহীন, কবিতা তাঁর কাছে অরগ্যাজমের মতো স্বতঃস্ফূর্ত, সুতরাং ‘সচেতনভাবে বিহ্বল’ হলেই কবিতা সৃষ্টি সম্ভব । অরগ্যাজম বলতে যে জৈববৃত্তি বোঝায় তা কখনই উদ্দীপনাহীন ও স্বতঃস্ফূর্ত নয় । বৈজ্ঞানিক সত্যে উপমাটি ব্যর্থ । এখানে আমাদের মেনে নিতে হবে কবিতার স্বতঃস্ফূর্তি মলয়ের ধারণামতো । অনেকটা রোমান্টিক কবিদের স্পন্টেনিয়াস ওভারফ্লো অফ পাওয়ারফুল ফিলিংস, অবশ্যই রোমান্টিকদের মতো আবেগে আত্মসমর্পণ নয়, কল্পজগৎ তৈরি নয়, সচেতন বিহ্বল অবস্হাই মলয়ের ধারণায় কবিতা সৃষ্টির শর্ত, ‘অন্তরাত্মার ও বহিরাত্মার ক্ষুধা নিবৃত্তির শক্তি’ না থাকলে তাকে মলয় কবিতা বলতে রাজি হননি । নিঃসন্দেহে অভিনব । বশেষত বহিরাত্মার ক্ষুধা নিবৃত্তি । কিন্তু এই অভিনব মতবাদ থেকেই হাংরি আন্দোলন শুরু ।
          এতদিনে হাংরি-সংগঠন শক্তি সঞ্চয় করেছে, একে-একে জড়ো হয়েছেন সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, উৎপলকুমার বসু, সমীর রায়চৌধুরী, সুবো আচার্য, শৈলেশ্বর ঘোষ, সুভাষ ঘোষ, দেবী রায়, প্রদীপ চৌধুরী, সুবিমল বসাক,বাসুদেব দাশগুপ্ত, রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়, ফালগুনী রায়, অরণি বসু, শম্ভু রক্ষিত, ত্রিদিব মিত্র, তপন দাস, মিহির পাল প্রমুখ । তালিকায় প্রথম তিনজন পঞ্চাশের, বাকিরা সময়ের দিক থেকে ষাট দশকের অর্থাৎ শক্তিকে নিয়ে হাংরি গোষ্ঠীভূক্ত হয়েছেন পঞ্চাশের চারজন কবি । কিন্তু প্রশ্ন, পঞ্চাশের এই চার কবির ষাটের অনুজ কবিদের সঙ্গে নতুন আন্দোলনে শরিক হবার প্রয়োজন হল কেন ? এই সময়ে শরৎকুমার মুখোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় ‘কৃত্তিবাস’ বেরিয়েছে । সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তখন আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়র্কশপ প্রোগ্রামে আমেরিকায় । ‘কৃত্তিবাস’-এর পপকাশনা নিয়ে চিন্তিত অথচ শরৎ-এর ওপরে আস্হা রেকেই তাঁকে চলতে হচ্ছে । ‘স্বপ্ন সংকলন’-এর পরিকল্পনা তাঁর মাথায় । অথচ গুছিয়ে উঠছে না কিছুই । লেখক নির্বাচনে দ্বিধাদ্বন্দ্ব চলছে বন্ধুদের সঙ্গে । শরৎ-এর সম্পাদিত ‘কৃত্তিবাস’ পেয়ে সুনীল আমেরিকা থেকে যে চিঠি সমীরকে লিখেছিলেন তাতে ‘কৃত্তিবাস’ গোষ্ঠীতে যে ভাঙন ধরেছে তারই ইঙ্গিত । এই সময়ে আরো একটি ঘটনা -- তন্ময় দত্তের কবিতার খাতা চুরি । সুনীল বলেছেন, জীবনানন্দের পর সবচেয়ে সক্তিমান কবি তন্ময় । অভিমানে তিনি কবিতা লেখা ছেড়ে দেন । 
          বন্ধুদের মধ্যে এমনি নানা অসন্তোষ এবং ‘কৃত্তিবাস’-এর সম্ভাবনায় সন্দিহান হয়ে নতুন কিছু করার প্রবণতায় মলয়ের দাদা সমীরকে কেন্দ্র করে সন্দীপন উৎপল যোগ দিলেন হাংরি আন্দোলনে । শক্তি আগেই যুক্ত । তুলনায় প্রতিষ্ঠিত এই চার লেখকের সমর্থন পেয়ে হাংরি আন্দোলনে জোর এলো । আগেই বলেছি ইতিমধ্যে অনেক তরুণ সংঘবদ্ধ এই আন্দোলন ঘিরে । নানা চিন্তার ছাপ আসছে । আন্দোলন সম্পর্কে নানাজন নিজের মতো ফতোয়া দিচ্ছেন । মলয়ের চিন্তায় যে নির্দিষ্টতা ছিল,নানা চিন্তার চাপে ছড়িয়ে পড়ায় আন্দোলনকে স্পষ্ট রূপরেখায় বেঁধে দিতে হাংরি আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য নির্ণায়ক নিয়মবিধির একটি ইশতাহার রচিত হলো । লিখলেন মলয় :-
  1. The merciless exposure of the self in its entirety .
  2. To present in all nakedness all aspects of the self and thing before it.
  3. To  catch a glimpse of the exploded self at a particular moment.
  4. To challenge every value with a view to accepting or rejecting the same.
  5. To consider everything at the start to be nothing but a ‘thing’ with a view to testing whether it is living or lifeless.
  6. Not to take reality as it is but to examine it in all its aspects.
  7. To seek to find out a mode of communication, by abolishing the accepted modes of Prose and Poetry which would instantly establish a communication between the poet and his reader.
  8. To use the same words in poetry as are used in ordinary conversation.
  9. To reveal the sound of the word, used in ordinary conversation, more sharply in the poem.
  10. To break loose the traditional association of words and to coin unconventional and here-to-fore unaccepted combination of words.
  11. To reject traditional forms of poetry and allow poetry to take its original forms.
  12. To admit without qualification that poetry is the ultimate religion of man.
  13. To transmit dynamically the message of the restless existence and the sense of disgust in a razor sharp language.
  14. Personal ultimatum.

          এই চৌদ্দটি সূত্রের মূল লুকিয়ে আছে কি লিখব আর কি ভাবে লিখব এই তত্বের ওপর । সম্পূর্ণ অহং-এর ক্ষমাহীন প্রকাশ, বিশেষ মুহূর্তে বিস্ফারিত আত্মার আভাস সম্পূর্ণ নিজস্ব শব্দবন্ধে ও প্রকাশ রীতিতে । ঐতিহ্য অস্বীকার, পপচলিত রীতি প্রত্যাহার, এবং তার প্রকাশ প্রাত্যহিক ভাষায়, কিন্তু কামড় বসাবে তীক্ষ্ণ । অস্হির অস্তিত্বের যন্ত্রণা ও চরম বিতৃষ্ণা লোক-প্রচলিত মূল্যবোধকে ধ্বংস করে প্রতিষ্ঠিত করবে কবিতাকে । ধর্মে কিছু পাওয়ার নেই । সমাজে প্রত্যাখ্যাত, রাজনীতি বন্ধ্যা --- একমাত্র আশ্রয় কবিতা । সমস্ত ভাঙচুরের মধ্যে দাঁড়িয়ে জীবনের অর্থকে ফলবানের চিন্তা নিঃসন্দেহে শিল্পীর । 
          ঐতিহ্যগত মূল্যবোধকে অস্বীকার, প্রচলিত ধারার বিপক্ষে দাঁড়িয়ে কবিতার নতুন চেহারা আবিষ্কার প্রকৃতই সাহসী ও মৌলিক । নতুন কবিতার জন্য নতুন সূত্র অনুস্ধানও স্বাভাবিক । কিন্তু তত্ব নির্ভর করে কিংবা ইশতাহার মেনে কবিতা লেখা, দলবদ্ধভাবে সম্ভব কিনা সে প্রশ্ন জাগতে পারে । ইশতেহারের সূত্রগুলো দলবদ্ধ সকলের ভেতর থেকে উঠে আসা কিনা সে প্রশ্নও উঠতে পারে । যদি ধরে নেওয়া যায় ইশতাহারের সূত্র ধরেই হাংরি আন্দোলনের সংঘবদ্ধতা তা হলে মেনে নিতে হয় এ আন্দোলনের জোর ছিল । জোর যে ছিল তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ প্রতিরোধ শুরু হয়ে গেল দ্রুত । তবে সে সংবাদ সমর্থনের নয়, বিরুদ্ধতার । লেখালিখির জন্য যতটা, তার চেয়ে অনেক বেশি এঁদের জীবনযাত্রা এবং শিল্প-অসম্পর্কিত ক্রিয়াকলাপ একটা টেনশনের আবহাওয়া তৈরি করল । 
          এ সবই হয়তো জীবনের প্রতি, সমাজের প্রতি ঘৃণা ও বিতৃষ্ণা থেকে উপজাত । চূড়ান্ত প্রত্যাখ্যান উভয়তই, ফলে এই বিকার । নাকি শুধু স্টান্ট ! শুধু স্টান্ট হলে মূল আন্দোলনই অর্থহীন । মনে হয় না শুধু স্টান্টের পেছনে এতগুলি তাজা ছেলে জুটেছিল । নিজেদের ধ্বংসের পথই কি নির্মাণ করেছিল হাংরি ছেলেরা ? এবং একই সঙ্গে এঁদের ধ্বংসের চক্রান্ত গড়ে উঠেছিল এদেশে, বিভিন্ন সংবাদপত্রের বিরুদ্ধবাদী সংবাদে এবং বুদ্ধিজীবীদের প্রতিক্রিয়ায় । এই সময়ে মলয়কে লেখা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের একটি চিঠি খুবই জরুরি। চিঠিতে কোনো তারিখ নেই । পোস্টের স্হান আমেরিকার আইওয়া সিটি, তারিখ ১০ জুন ১৯৬৪ । উত্তরপাড়ায় ১৯৬৪ সালের জুনের ১৬ তারিখে । মলয়, সুনীলের বন্ধু সমীরের ভাই, তাঁর স্নেহভাজন ও প্রিয়জন । কিন্তু হাংরির অসামাজিক ও শিল্পসম্পর্কহীন ক্রিয়াকলাপে ক্ষুব্ধ সুনীল তাঁর মনোভাব স্পষ্ট বলেছেন । নিশ্চিতই সুনীলের কলকাতার বন্ধুরা তাঁর ক্ষোভের ইন্ধন যুগিয়েছিলেন । কিন্তু সুনীল এ-চিঠিতে মলয়ের কবিতাকেই সরাসরি অগ্রাহ্য করেছেন । যদিও কিছুদিন আগে সমীরকে লেখা চিঠিতে ‘কৃত্তিবাস’ থেকেই মলয়ের বই প্রকাশের অভীপ্সার কথা আমরা জানি । সুনীল লিখেছিলেন : ‘মলয়ের বই তো ওকে কৃত্তিবাস থেকেই বার করতে বলেছি, সাহিত্য প্রকাশক কোনো দরকার নেই । 
          ‘কৃত্তিবাস’ থেকে মলয়ের বই প্রকাশের ইচ্ছা কি শুধু বন্ধুকৃত্যের জন্য, বন্ধুর ভাইয়ের প্রতি স্নেহের টানই তার কারণ ? নাকি কবি হাসাবেই মলয়ের যোগ্যতা তখনও অবধি স্বীকৃত ছিল তাঁর । কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যে এই ধরণের বদল তবে কি বন্ধুদের উসকানির ফল ? সুনীলের কাছে কবিতার আন্দোলনের চেয়ে ভালো কবিতা লেখা জরুরি । এতে আপত্তির কারণ নেই । এ তাঁর নিজস্ব ধারণা । কিন্তু হাংরি আন্দোলন ভেঙে দেবার কথা বললেন কেন ? ঈর্ষা নয় । কারণ এঁদের লেখার জৌলস তিনি স্বীকার করেননি, লেখার জগতে এঁদের তিনি প্রতিদ্বন্দ্বীও মনে করেননি । তবে কি হাংরির লেখকরা তাঁকে নানাভাবে উত্যক্ত করেছিল বলেই এই উত্তেজনা ? কিন্তু এতখানি উত্তেজনা কি সম্ভব, একেবারে হাংরি আন্দোলন ভেঙে দেবার মতো । নাকি শক্তি, সন্দীপন ও উৎপলের কৃত্তিবাসগোষ্ঠী ত্যাগ ও হাংরি আন্দোলনে যোগ কৃত্তিবাসী বন্ধুদের প্রতিশোধস্পৃহ করে তুলেছিল ? এঁদেরই কেউ কি সুনীলের উত্তেজনার কারণ সরবরাহকারী ? 
          হাংরি আন্দোলন প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে । সুনীলের চিঠিতে যা ছিল আভাস, এদেশে তা তখন নাড়া দেওয়া সংবাদ ।  ১৯৬৪-এর ১৭ জুলাই ‘যুগান্তর’ দৈনিকে সংবাদ বেরুচ্ছে ‘সাহিত্যে বিটলেমী’ এই শিরোনামে । এ সংবাদ হাংরি আন্দোলনের দিক থেকে নঙর্থক । কিন্তু অনেক সত্য এখানে লুকিয়ে আছে । প্রচলিত ধারণা, পুলিশী গ্রেফতার এবং মামলা হাংরি আন্দোলনকে রাতারাতি খ্যাতি দিয়েছে । কিন্তু এ সংবাদ হাংরি আন্দোলনের বিরুদ্ধে পুলিশী ব্যবস্হা গ্রহণের দুমাস আগের । অথচ দেখছি সংবাদেই প্রকাশিত হয়েছে হাংরি আন্দোলন ও এর লেখকরা ইতিমধ্যে বিদেশে আলোচিত । সাংবাদিক জানাননি, এদেশে ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলে এঁদের শেকড় ততদিনে অনেকদূর নেমে গেছে । হিন্দী তরুণ লেখকদের একটা অংশ প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়েছেন এই আন্দোলনে । পুলিশ এঁদের ওপর ন্জর রাখছে, রাখছিল, তার প্রমাণ পাওয়া গেল দুমাসের মধ্যেই । পুলিশ নজর রেখেছিল কেন ? কিছু তরুণ লেখকের প্রথাবিরোধী লেখার জন্য ? শাসকগোষ্ঠী এবং সবরকম কতৃত্বকে অস্বীকার ও আক্রমণ করার জন্য ? বন্ধ্যা রাজনীতি , প্রচলিত বিশ্বাস ও ঐতিহ্যের প্রতি প্রবল বিতৃষ্ণায় তীব্র ছটফটানি পুলিশি আইনে অপরাধমূলক ছিল কি ? নাকি কেউ পুলিশকে এঁদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছিলেন ? এসব কূট প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে আমাদের । ধীরে ধীরে তথ্য যাচাই করে ।
          এখন পর্যন্ত ‘দৈনিক যুগান্তর’-এর সংবাদ জানাচ্ছে এঁদের জীনযাত্রা ও লেখা বদ্ধ-বাঙালি জীবনে নাড়া দিতে শুরু করেছে । সংবাদের যোগ্য করে তুলেছেন এঁরা নিজেদের ।কী অন্তর্দৃষ্টিতে এঁরা দেখতে পেয়েছিলেন রাজনৈতিক পাণ্ডাদের । যাঁদের স্হান হবে ‘গণিকার মৃতদেহ ও গর্দভের লেজের মাঝামাঝি কোথাও’ । শুধু রাজনীতি নয়, সমস্ত ভারতবর্ষের অন্ধকার অনেক আগে থেকে আঁচ করার অপরাধ করে ফেলেছিলেন এঁরা। এবং সে শুধু সর্বস্ব পণ করে শিল্প করতে গিয়ে । দৈনিক যুগান্তরের সংবাদে  হাংরি আন্দোলনের ক্রিয়াকাণ্ডের উপরিতলের চেহারাটাই ফুটে উঠেছে, ভেতরের চেহারা কিছু পরিমাণে ধরার চেষ্টা দেখা যায় দুদিন পরের ‘আর মিছিলের শহর নয়’ শিরোনামের সম্পাদকীয়তে । প্রয়োজনীয় অংশ এরকম : ‘’বাংলাদেশে দলাদলিতে দীর্ণ বিশ্বাসহীন রাজনীতি আজ নিজের মস্তক চর্বণ করিতে ব্যস্ত । এই আবহাওয়ার জন্যই কি সমাজে এক ধরণের নিরাশাবাদ জন্ম লাভ করিতেছে, যার চেহারা ড্রেন-পাইপ মস্তানি, যার আওয়াজ রাস্তার রোমিওদের শিস, এবং সাহিত্যের ‘ক্ষুৎকাতরতার’ মধ্যে ভয়াবহভাবে প্রকাশ পাইতেছে ? কাজেই ইহা আশ্চর্য নয়, এই সব বিকৃতির উপাসকরা, যারা ‘হাংরি জেনারেশন’ নাম ধারণ করিয়াছে, তারা পরম শ্রদ্ধাহীন অবজ্ঞায় ‘গণিকার মৃতদেহ ও গর্দভের লেজের কোথাও’ রাজনীতিকদের স্‌আন নির্দেশ করিতে চাহিতেছে । কলিকাতার ক্ষুধার্ত ছেলেরা এই ধিক্কার দিতেছে এবং আত্মধিক্কারের মধ্যে বন্দী হইতেছে ; ইহা কি বন্ধ্যা রাজনীতিকদের প্রায়শ্চিত্ত অথবা অসুস্হ সমাজের অভিশাপ?”
          সম্পাদকীয় স্তম্ভের লেখক প্রশ্ন তুলেছেন, উত্তর দেননি । দিলে বলতে হতো ‘বন্ধ্যা-রাজনীতিকদের প্রায়শ্চিত্ত ও অসুস্হ সমাজের অভিশাপ’ এই ক্ষুধার্ত ছেলেদের টেনে নিয়ে এসেছে শেষ আশ্রয়স্হল কবিতায় । তবে ভিন্নরূপের কবিতা নিশ্চয়ই, আমাদের সংস্কারের বাইরের কবিতা, ইরিটেটিভ কিন্তু নিজেকে চেনার জন্য অব্যর্থ । অন্তত হাংরি লেখকদের দৃষ্টিকোণ থেকে । হাংরি আন্দোলন সংবাদে ও সম্পাদকীয়তে এনেছে যে নঙর্থক প্রতিক্রিয়া, সে প্রতিক্রিয়ার টেনশন থেকে কলকাতার পুলিশ ১৯৬৪ সালের সেপ্টেম্বরের গোড়ায় হাংরি লেখকদের বিরুদ্ধে অ্যাকশানে নামলো । এ এস আই কালীকিঙ্কর দাসের অভিযোগের ভিত্তিতে কলকাতার জোড়াবাগান থানার এস আই এস এন পাল এই দিনেই এফ আই আর করলেন ।
          একই দিনের অভিযোগ ও এফ আই আর ( সেকশান ১২০ বি এবং ২৯২ আইপিসি ) --- কলকাতা পুলিশের সুনাম খুব অর্থবহ । হাংরি জেনারেশনের অভিযুক্ত বুলেটিনে যাঁদের লেখা ছিল সবাইকে অভিযুক্ত করা হলো । অর্থাৎ ঢাকি ঢুলি সব । কালীকিঙ্কর দাস জানিয়েছিলেন ‘ক্রেডিবল ইনফরমেশান’ থেকে হাংরি জেনারেশনের প্রচারের কথা জানতে পারেন । পুলিশ শাখার ইনফরমাররা যেভাবে সমাজের বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে থাকে তাতে কলকাতা পুলিশের ইনটেলিজেন্স ব্রাঞ্চের পক্ষে হাংরি ক্রিয়াকাণ্ডের খোঁজ পাওয়া খুবই সবাভাবিক ঘটনা । কিন্তু পুলিশ হঠাৎ হাংরি জেনারেশন সম্পর্কে এত তৎপর হলো কেন ? কিন্তু কত ছিল হাংরি বুলেটিনের প্রচার সংখ্যা ? কজন পাঠক পয়সা খরচ করে ও পত্রিকা কিনত ? অর্থাৎ যে সময়ে কলকাতার বই-স্টল আলো করে পর্ণগ্রাফি বিক্রি হতো, সেসময়ে কতজন পাঠক রেস্ত খরচ করে  অশ্লীল লেখা জেনে হাংরি জেনারেশন বুলেটিন সংগ্রহ করত ? সুকুমারমতি বালক-বালিকাদের বিপথগামী হবার কতখানি সম্ভাবনা ছিল ও পত্রিকা পড়ে ? মূলত কবিতার মগজ এবং যে পপকাশভঙ্গীতে লেখা সে যুগে কবিতা পাঠকদের ক্ষেত্রেও তা ছিল প্রায় অসহনীয় । তা হলে “টু করাপ্ট দি মাইন্ড অফ দি কমন রিডার’ একথা আসছে কি করে ? সাধারণ পাঠকের সংজ্ঞা কি ? 
          তবু তর্কের খাতিরে ধরে নেওয়া যাক পুলিশ তার দৃষ্টিকোন থেকে হাংরির লেখাকে নৈতিকভাবে অশ্লীল মনে করেছে । আমার সংশয়ী মন এখানে অন্য ইন্ধন খুঁজে ফিরছে হয়তো । অভোযোগ দায়ের ও মামলা চালানোর সময়ে পুলিশের মনোভাব পরিবর্তন হয়নি ধরা যেতে পারে । কারণ যে অভিযোগ পুলিশ তুলবে তাকে তথ্য প্রমাণে আদালতে পপতিষ্ঠা করবে, এটাই স্বাভাবিক । আমি এখানে একটা চিঠির উল্লেখ রাখতে চাই।  কিছু পরবর্তীকালের । কিন্তু বর্তমান প্রসঙ্গে প্রাসঙ্গিক । ১৯৬৫ সালের ২৭ জানুয়ারি ‘ইনডিয়ান কংগ্রেস ফর কালচারাল ফ্রিডাম’-এর এগজিকিউটিভ সেক্রেটারি মিস্টার এ. বি. শাহ মলয়কে এই চিঠিতে লিখেছেন :
“I met the Deputy Commissioner of Police the other day after we met at the Office of the Radical Humanist in Calcutta. I was told that they would not have liked to bother themselves with the ‘hungry Generation’ but for the fact that a number of citizens to whom the writings of your group were made available, insisted on some action being taken.”
         তাহলে দেখা যাচ্ছে, পুলিশের দক্ষতা বা সক্রিয়তা নয়, কিছু নাগরিকের চাপাচাপিতেই পুলিশ হাংরিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্হা নিতে অগ্রসর হয় । প্রশ্ন, এই নীতিবাদী নাগরিকরা কারা ? কেন তারা হাংরিদের বিরুদ্ধে পুলিশকে সক্রিয় করলেন ? পুলিশ হাংরি জেনারেশনের এগারোজনকে অভিযুক্ত করে গ্রেপ্তার করেছিল ছয়জনকে । অথচ মামলা দায়ের করল একজনের বিরুদ্ধে । স্টেট বনাম মলয় রায়চৌধুরী । কিন্তু মলয় যে অভোযোগে অভিযুক্ত, অন্যদের তা থাকে নিষ্কৃতি পাবার কথা নয় । আসলে পেছনে আরও কিছু ঘটনা ঘটে গিয়েছে, এর মধ্যে হাংরি লেখকরা অনেকেই জবানবন্দি দিয়ে বসে আছেন পুলিশের কাছে । মধ্যবিত্ত বাঙালির নিরাপত্তাবোধ উসকে দিয়েছিল তাঁদের অস্তিত্ব । শিল্পের জন্য কারাবরণের চেয়ে হাংরি আন্দোলন থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করা অনেক জরুরি ছিল সেসময়ে । আসলে সে সময়ে হাংরির নেতৃত্ব ও সংগঠন মলয়ের হাতে । সম্পাদক প্রকাশক হিসাবে যাঁর নামই থাক, মলয়ই সবকিছুর নিয়ন্ত্রক । অবশ্যই বন্ধুরা জানতেন, কিন্তু থানা-পুলিশের ভয়ে ওঞ্চাশের লেখকদের মতই সুভাষ বা শৈলেশ্বর কেউ হাংরি জেনারেশনের কোনো দায়িত্ব নিতে চাননি । সবাই সম্পর্ক ত্যাগের কথাই বলেছেন । ব্যতিক্রম প্রদীপ চৌধুরী ।
          অ্যালেন গিন্সবার্গ আবু সয়ীদ আইয়ুবকে হাংরি লেখকদের সাহায্য করার আবেদন জানিয়ে চিঠি লিখেছিলেন, সেই আবু সয়ীদ মলয় এবং তাঁর সঙ্গীদের লেখক বলে মেনে নিতে পারেননি । এবং লেখার জন্য কেউ এদেশে পুলিশীপীড়ন ভোগ করেছে বলেও তাঁর জানা নেই বলেছেন । অ্যালেন গিন্সবার্গকে ৩১ অক্টোবর ১৯৬৪ যখন আবু সয়ীদ চিঠিতে এসব লিখেছেন, তখন কিন্তু কলকাতা পুলিশ হাংরি লেককদের বিরুদ্ধে মামলা সাজাচ্ছে । আবু সয়ীদের চিঠিটি এইরকম :-

পার্ল রোড, কলকাতা, 
৩১ অক্টোবর ১৯৬৪
প্রিয় শ্রীগিন্সবার্গ
          আপনার ১৩ তারিখের উদ্দেশ্যহীন অবমাননাকর চিঠি পেয়ে আমি বিস্মিত । আপনি যে কংগ্রেস ফর কালচারাল ফ্রিডমকে কমিউনিস্টদের দ্বারা চিহ্ণিত একটি জোচ্চোর বুলশিট উদারনৈতিক আঁতেলদে কমিউনিস্টবিরোধী সিনডিকেট বলে মনে করেন, তাতে আমি অবাক হইনি ; কেননা আমি কখনও কংগ্রেস ফর কালচারাল ফ্রিডামকে আপনার লেবেল 'বুর্জোয়া' কিংবা 'শ্রদ্ধেয়' থেকে মুক্ত করার কথা ভাবিনি ।
          যদি কোনো পরিচিত ভারতীয় সাহিত্যিক বা বুদ্ধিজীবি তাদের সাহিত্যিক বা বৌদ্ধিক কাজের জন্য পুলিশের অবদমনের শিকার হতো , আমি নিশ্চিত যে ভারতীয় কংগ্রেস ফর কালচারাল ফ্রিডাম আপনার অপমানজনক ওসকানি ছাড়াই হস্তক্ষেপ করতো ।  আমি আপনাকে জানিয়ে আনন্দিত যে তেমন কোনো কিছুই সাম্প্রতিককালে এদেশে ঘটেনি । মলয় রায়চৌধুরী ও তাঁর হাংরি জেনারেশনের তরুণ বন্ধুরা, আমার জ্ঞানমতে তেমন কোনো রচনা লিখে উঠতে পারেনি, যদিও তারা আত্মপ্রচার করে লিফলেট ছাপিয়ে বিলি করেছে  এবং গণ্যমান্য লোকেদের চিঠি নোংরা ও অশ্লীল ভাষায় প্রকাশ করেছে ( আমি আশা করি আপনি স্বীকার করবেন যে 'ফাক' শব্দটি অশ্লীল এবং 'বাস্টার্ড' শব্দটি নোংরা, অন্তত এই বাক্যটিতে, "গাঙশালিক স্কুলের জারজদের ধর্ষণ করো", তারা এর চেয়েও খারাপ   ভাষায় কবিদের নাম উল্লেখ করে লিখতে ইতস্তত করেনি )। সম্প্রতি তারা একজন মহিলাকে ভাড়া করে তার উন্মুক্ত বুক দেখাবার প্রদর্শনীর আয়োজন করেছিল এবং সেই আশ্চর্যজনক আভাঁগার্দ প্রদর্শনী দেখার জন্য অনেকের সঙ্গে আমাকেও আহ্বান করেছিল । আপনি পৃথিবীর ওই পারে বসে কলকাতায় এই ধরণের বয়ঃসন্ধিকালীন ইয়ার্কিকে প্রচার করায় আপনার সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা বলে চালাতে পারেন । আশা করি আমার যা দায়িত্ব তা পালন করার জন্য আপনি আমাকে আপনার মতের সঙ্গে পার্থক্য সমর্থন করবেন ।
          পুলিশের পক্ষে নিশ্চয়ই বোকামি হয়েছে এই যুবকদের গড়া ফাঁদে পড়ে তাদের কয়েকজনকে কয়েক দিনের জন্য হেফাজতে নেয়া ( তাদের সবাইকে এখন ছেড়ে দেয়া হয়েছে ) আর তার দ্বারা তাদের প্রচারে সুবিধা করে দেয়া এবং জনসাধারণের সহানুভূতি সংগ্রহ করা -- তারা তাদের ইয়ার্কির মাধ্যমে নিজেদের প্রচারই চাইছিল । 
          আপনার মতের সঙ্গে আমার এ-ব্যাপারে মিল নেই যে ইনডিয়ান কমিটি ফর কালচারাল ফ্রিডামের প্রধান কাজ হলো মার্কিন বিটনিক কবিদের কাঁচা অনুকরণকারীদের সাহায্য করা । ইউরোপীয় সাহিত্য সম্পর্কে আপনার জ্ঞানকে আমি শ্রদ্ধা করি কিন্তু আমার ভাষার সাহিত্যকদের মূল্যায়ন করার ক্ষমতাকে আপনার নির্দেশে খর্ব করতে পারি না -- যে ভাষা সম্পর্কে আপনি নিজের অজ্ঞতা বেছে নিয়েছেন ।
          আপনার সঙ্গে গূঢ় পার্থক্য সত্ত্বেও এবং আপনার কয়েকটি অসাধারণ কবিতাকে ভালোলাগা সত্ত্বেও আপনাকে শুভেচ্ছা জানাই ।
                                                                    ভবদীয়
                                                               আবু সয়ীদ আইয়ুব       

          শৈলেশ্বর ও সুভাষের জবানবন্দিতে সাহসের অভাব ছিল । যে আত্মিক অসহায়বোধ তাঁদের হাংরি আন্দোলনে প্রাণিত করেছে, গ্রেফতার ও মামলার মুখোমুখি তাই তাঁদের বৈষয়িক অসহায়বোধে দাঁড় করিয়েছে । সুযোগ খুঁজেছেন নিস্তারের । এমনকি হাংরির সঙ্গে সম্পর্ক ছেদের মুচলেকার বিনিময়েও কাঙ্খিত ছিল মুক্তি । এসব কার্যকলাপ ও মনোভাব দলের অন্য সদস্যদের মধ্যে ভুল ধারণার জন্ম দিতে পারে, বিশেষ করে মলয়ের । সামাজিক সব মূল্যবোধকে যাঁরা অবিশ্বাস করে এগিয়েছিলেন, যা কিছু প্রচলিত তাকেই সন্দেহ করা, শেষ পর্যন্ত বন্ধুত্বের ক্ষেত্রেও  এ অবিশ্বাস মাথা চাড়া দিয়েছিল । শৈলেশ্বরের জবানবন্দি পরবর্তী সময়ে মলয়ের ক্ষোভ ও ঘৃণার কারণ ।
          ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতায় অশ্লীলতার দোষারোপে আলিপুর ব্যাঙ্কশাল কোর্টের নয় নম্বর কোর্টে প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট শ্রী এ কে মিত্র মলয়ের দোশো টাকা জরিমানা অনাদায়ে এক মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দিলেন সঙ্গে অভিযুক্ত রচনাগুলোর বিনষ্টির আদেশ । কলকাতা হাইকোর্টে অবশ্য এ-মামলা টেকেনি । বেকসুর খালাস পেয়েছিলেন মলয় । কিন্তু অনেক টেনশন ও অর্থ খরচের পর । শুধু কি তাই ? বন্ধু বিচ্ছেদ ঘটে গেল হাংরি লেখকদের সঙ্গে ।
-----------------------
ঋণস্বীকার : মহাদিগন্ত

শুক্রবার

হাংরি জেনারেশন - বাংলা সাহিত্যে প্রথম আভাঁ গার্দ আন্দোলন : অভিজিৎ পাল

হাংরি জেনারেশন : বাংলা সাহিত্যে প্রথম  
 আভাঁ গার্দ  আন্দোলন  
অভিজিৎ পাল      
          ১৯৩১ সালে লেখা পল ভালেরির এই বক্তব্য দিয়ে আরম্ভ করি, 
কেননা পশ্চিমবাংলার হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের আভাঁ গার্দ 
কাজগুলোর ক্ষেত্রে বক্তব্যটা খাটে : “আমাদের কারুশিল্পগুলো উন্নত 
হয়েছিল, তাদের প্রকার ও প্রয়োগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল যে সময়ে, 
তা বর্তমান সময় থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ছিল, এবং বস্তুসমূহের ওপরে 
তখনকার লোকেদের প্রভাবক্ষমতা আমাদের সময়কার লোকেদের তুলনায় 
তুচ্ছ ছিল । আমাদের টেকনিকের বিস্ময়কর ক্রমবিকাশ, তারা যে 
অভিযোজ্যতা এবং যথাযথতা  অর্জন করেছে, তারা যে ধারণাগুলো 
আর অভ্যাসগুলো তৈরি করেছে তা নিশ্চিত করে যে সৌন্দয্যের 
প্রাচীন সংজ্ঞায় গভীর পরিবর্তন আসন্ন। সমস্ত কারুকলাতে একটি 
বস্তুগত উপাদান রয়েছে যা আর আগের মতো বিবেচনা বা অনুশীলন 
করা যায় না, যা আমাদের আধুনিক জ্ঞান এবং শক্তি দ্বারা প্রভাবিত নয় । 
গত বিশ বছরে পাত্র বা স্থান বা কাল প্রাচীনকালে যা ছিল তা থেকে 
একেবারে আলাদা । কারুকৃতির পুরো কৌশলে রূপান্তর ঘটাতে আমাদের 
অবশ্যই অন্যরকম উদ্ভাবন আশা করতে হবে, যার ফলে  শৈল্পিক আবিষ্কার 
নিজেই প্রভাবিত হবে, এমনকি আমাদের কারুকৃতির ধারণায় বিপুল 
ও আশ্চর্যজনক পরিবর্তন আনবে। "
          পশ্চিমবঙ্গে ষাটের দশকে লিটল ম্যাগাজিন বিস্ফোণের সময় থেকে আভাঁ গার্দ কাজগুলো নিজেদের মুক্ত মঞ্চ পেয়ে গিয়েছিল । লক্ষনীয় যে এই বিস্ফোরণ সম্ভব হয়েছিল হাংরি জেনারেশনের সাহসী কার্যক্রমের কারণে । তাঁরাই পথপ্রদর্শক । হাংরি জেনারেশন দেখিয়ে দিতে পেরেছিল যে কেবল একফালি কাগজ বা একফর্মার পত্রিকা সাহিত্য ও সংস্কৃতি জগতে উথালপাথাল ঘটিয়ে দিতে পারে ; কোনো প্রাতিষ্ঠানিক পত্রিকার বা সংবাদপত্রের দয়াদাক্ষিণ্যের প্রয়োজন নেই । এটি তাঁদের এক গুরুত্বপূর্ণ অবদান যা ডাডা এবং সুররিয়ালিস্টদের তোলপাড়ের সঙ্গে তুলনীয় । মনে রাখা প্রয়োজন যে হাংরি জেনারেশনের এই ফালিকাগজ ও এক ফর্মার পত্রিকা তাঁদের রচনাবলীকে আমেরিকা ও ইউরোপে বিভিন্ন ভাষায় পৌঁছে দিয়েছিল । 
        এই প্রসঙ্গে অলোক গোস্বামী লিখেছেন: “এই সম্মীলিত পদক্ষেপের ফলেই লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলনের গতিবেগ বৃদ্ধি পেয়েছে। ভুল পদক্ষেপগুলোও পারেনি গতিরোধ করতে। আর তাই লিটল ম্যাগাজিনকে কে বা কাহারা সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করেছে, সেই তথ্য আজ আর প্রাধান্য পায় না। তার পরিবর্তে উঠে আসে সোমেন চন্দ, দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, কমলকুমার মজুমদার, অমিয়ভূষণ মজুমদার,শৈলেশ্বর ঘোষ,সুভাষ ঘোষ,বাসুদেব দাশগুপ্ত, মলয় রায়চৌধুরী,উদয়ন ঘোষ,অরূপরতন বসু,কৃষ্ণগোপাল মল্লিক,সুবিমল মিশ্র,সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়,দেবেশ রায় এবং এরকম আরও অসংখ্য নাম। এদের ব্যতিক্রমী চিন্তাভাবনাকে পাঠকের সামনে প্রথম তুলে ধরেছে লিটল ম্যাগাজিনই। গড়পড়তা সাহিত্যের পরিবর্তে পাঠককে আগ্রহী করেছে নতুন রচনারীতির স্বাদ গ্রহণ করতে। সেই প্রচেষ্টা যে বিফল হয়নি তার প্রমাণ,পরবর্তিতে বাণিজ্যিক পত্রিকাগুলো বাধ্য হয়েছে নিজেদের ছাঁচ থেকে বেরিয়ে ওদের কারো কারো লেখা ছাপতে। সবার ক্ষেত্রে অবশ্য অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া কার্যকরী হয়নি। সেসব লেখকেরা জনপ্রিয়তার তোয়াক্কা না রেখে শুধু মাত্র লিটল ম্যাগাজিনকেই তাদের রচনা প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছেন। লিটল ম্যাগাজিন শুধু তাদের লেখাই প্রকাশ করেনি, সীমিত সামর্থ সত্বেও সেসব লেখকেদের বইপত্রও প্রকাশ করেছে। করে চলেছে। সুতরাং থোড় বড়ি খাড়া সাহিত্যের চর্চা করার পরিবর্তে ব্যতিক্রমী এবং নিরীক্ষা মূলক সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতা করে বাংলা সাহিত্যের সৃজনীধারাটাকে সজীব রেখেছে যে একমাত্র লিটল ম্যাগাজিনই সেটা আজ আর বলার অপেক্ষা রাখে না। লিটল ম্যাগাজিন যদি এই দায়িত্ব পালন না করতো তাহলে বাংলা সাহিত্যের দশা কী হোত তার প্রমাণও হাতের কাছে মজুত আছে। বাণিজ্যিক সাহিত্য পত্রিকাগুলো পাঠক মনোরঞ্জনের ফাঁদে আটকা পড়ে রীতিমত ধুঁকতে শুরু করেছে। একদা হুড়মুড়িয়ে বিক্রি হওয়া দুর্গাপুজো সংখ্যাগুলো এখন পরিণত হয়েছে বিশ্বকর্মা পুজো সংখ্যায়। তাতেও যেহেতু সামাল দেয়া যাচ্ছে না তাই এখন সাহিত্য সম্ভারগুলোর সঙ্গে বিনামূল্যে চামচ, শুকনো লঙ্কার গুঁড়ো, শ্যাম্পুর স্যাসে বিতরণ করেও লোক টানতে হচ্ছে। এরপর আগামীতে যদি পুজো সংখ্যাগুলো জন্মাষ্টমী সংখ্যায় পরিণত হয় এবং বাই ওয়ান গেট ওয়ান ব্যবস্থা চালু হয় তাতেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। যেহেতু প্রসাদ কবির সুরে স্বখাত সলিল সংক্রান্ত গানটা গাইতে পারছে না তাই নিজেদের ব্যর্থতাকে ঢাকতে অজুহাত দিচ্ছে বাঙালি পাঠকের উদাসীনতাকে। সেই অজুহাত যে কতটা মিথ্যে তার জলজ্যান্ত প্রমাণ, লিটল ম্যাগাজিনের বিশেষ সংখ্যার প্রতি পাঠকের আগ্রহ উত্তরোত্তর বৃদ্ধি। আমার বক্তব্যকে কারো যদি অতিশয়োক্তি মনে হয় তাহলে তাকে অনুরোধ করব বইমেলায় কিংবা লিটল ম্যাগাজিন মেলায় গিয়ে বিক্রির পরিসংখ্যানটা জেনে নিতে। এই জনপ্রিয়তাও শুধু নতুন রীতির গল্প কবিতা প্রকাশের কারণে বৃদ্ধি পায়নি, সাহিত্য সংস্কৃতি সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে যে ধরণের চর্চা লিটল ম্যাগাজিন করে চলেছে সেসব বাণিজ্যিক পত্রিকার কাছে কল্পনাতীত।”   এখন “আভাঁ গার্দ” বিষয়টির তাত্বিক দিকটি দেখা যাক । পিটার বার্জার তো বলেইছেন যে “আভাঁ গার্দ কী ? প্রশ্নটা শুনলেই মনে তা উস্কানিমূলক ।” তিনি সত্য কথা বলেছেন । পশ্চিম বাংলা ও বাংলাদেশে হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের উল্লেখ করলে তা উস্কানিমূলক প্রস্তাব হয়ে দাঁড়ায় ।
          সাহিত্য, ছবি আঁকা, সঙ্গীত ইত্যাদির ক্ষেত্রে “আভাঁ গার্দ” শব্দটা এসেছে ফরাসি ভাষা থেকে ; সৈন্যবাহিনীর একেবারে সামনের সারিতে যে দলটা শত্রুপক্ষের ক্ষমতা আঁচ করার জন্য এগিয়ে যায়, ইংরেজিতে  ভ্যাঙ্গার্ড বা ফ্রণ্টলাইন, বাংলায় বলা যেতে পারে ‘অগ্রদূত’ বা ‘অগ্রগামী-দল’, তাদের । ফরাসি সৈন্যবাহিনীতে ১৭৯৪ সালে সামনের ঝটিকাবাহিনীর নাম দেয়া হয়েছিল আভাঁ গার্দ যাদের বার্তার ওপর নির্ভর করে সেনাবিহিনী এগোতো ; বলা বাহুল্য যে পরের দলটাকে বলা হতো ‘রিয়ার গার্ড’ । ১৮২৫ সালে অভিধাটি প্রথম প্রয়োগ করেন সাঁ সিমনিয়াঁ  ওলিন্দে রডরিগেস তাঁর “শিল্পী, বিজ্ঞানী এবং শিল্পপতি” ( “L’artiste, le savant et l’industriel” ) প্রবন্ধে। রডরিগস লিখেছিলেন যে শিল্পীদের উচিত “জনগণের অগ্রণী হিসাবে কাজ করা" কেননা , সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংস্কারের জন্য "শিল্পকলার শক্তি প্রকৃতপক্ষে সবচেয়ে তাৎক্ষণিক এবং দ্রুততম”; তিনি বলেছিলেন যে তাঁরা ভিশনারি এবং সমাজকে সঠিক পথে এগিয়ে নিয়ে যাবেন । উনিশ শতকের ফ্রান্সে যে বামপন্হী বিপ্লবীরা রাজনৈতিক সংশোধনের জন্য আন্দোলন করেছিলেন, তাঁদের চিহ্ণিত করার জন্যও ব্যবহৃত হয়েছিল অভিধাটি । বামপন্হী ভাবধারা থেকে বিযুক্ত হয়ে ইউরোপে অভিধাটা প্রয়োগ করা আরম্ভ হয় নিরীক্ষামূলক, অরক্ষণশীল, প্রথাবিরোধী, ক্যাননমুক্ত, বৈপ্লবিক, অনৈতিহ্যগত নান্দনিক বা কান্তিবিদ্যা-সম্বন্ধিয় উদ্ভাবন বা নবপ্রবর্তনকে বোঝাতে, যা প্রাথমিকভাবে গ্রহণযোগ্য ছিল না এবং যা সৃজনকারী ও ভোক্তার মাঝে সমালোচনা হিসাবে উদ্ভূত হয়েছিল । সংস্কৃতির ক্ষেত্রে আভাঁ গার্দ মূলত স্হিতাবস্হাকে আক্রমণ করে এবং     প্রথাসিদ্ধ প্রচলনের পাঁচিল ভেঙে ফেলে পরিধিকে অবিরাম বাড়াতে থাকে ; হাংরি জেনারেশন তাইই করেছিল এবং সেকারণে সদস্যরা জেলহাজতে গিয়েছিল । ডাডাবাদী বা আধুনিকতাবাদী সাহিত্য  থেকে অবিরাম ঘটে চলেছে এই প্রক্রিয়া এবং সেই কারণেই সৃজন-সেনাদের আচমকা বাঁকবদলকে বলা হয়েছে আন্দোলন । 
         বর্তমান কালখণ্ডে আভাঁ গার্দ বলতে বোঝায় কোনও বুদ্ধিজীবি, লেখক এবং শিল্পী গোষ্ঠীর কাজকে,  যাঁরা সেই কাজগুলোকে তাঁদের বিশেষ বার্তার মাধ্যমে প্রচলিত সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের বিরুদ্ধে উপস্হাপন করেন । অবিরাম হবার দরুন এককালের বৈপ্লবিক ধারাকে সমাজের মূলদলটি বা ‘রিয়ার গার্ড’ নিজের দলে মিশিয়ে নেয়, যার ফলে আবার নতুন আভাঁ গার্দ গোষ্ঠীর উদ্ভব হয়। গ্যাব্রিয়েল ডিজায়ারে লাভেরদান্ত তাঁর “ফ্রম দি মিশন অফ আর্ট অ্যাণ্ড রোল অফ অর্টিস্টস” বইতে লিখেছেন, “শিল্প, যা সমাজের অভিব্যক্তি, নিজেকে স্পষ্ট করে তোলে তার সর্বোচ্চ উড়ালে, সবচেয়ে উন্নত সামাজিক প্রবণতায় : তা হল প্রকাশকর্তার পূর্বগামী । সুতরাং জানবার জন্য যে শিল্প প্রবর্তকের উদ্দেশ্য পূরণ করছে কিনা,  সত্যিই আভাঁ গার্দ দলের মানুষ কিনা, একজনকে জানতে হবে যে মানবিকতা কোন দিকে যাচ্ছে, মানবজাতির নিয়তি কী, খুলে স্পষ্ট দেখিয়ে দিতে হবে যাবতীয় কলুষ, কল্মশ, হিংস্রতা, নোংরামি ইত্যাদি যা হয়ে দাঁড়িয়েছে সমাজের বুনিয়াদ । 
          ফ্রান্সেই আভাঁ গার্দের বা ভ্যাঙ্গার্ডের সূত্রপাতের কারণ ছিল, যেমন পশ্চিমবাংলায় হাংরি জেনারেশনের উদ্ভব । প্রথমত সেই সময়ের ফ্রান্সে প্রতীকি স্তরে ফরাসি সংস্কৃতিতে লাঠি ঘোরাতেন সমাজের গণ্যমান্য অভিজাতরা এবং তাঁদের নান্দনিক মূল্যবোধকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়া সাধারণ মানুষের কাছে জরুরি ছিল । অর্থাৎ সমান্তরাল সমাজটিতে এগিয়েছিল অভিজাত মূল্যবোধ আর পেছিয়েছিল সংস্কৃতি সৃষ্টিকারীদের মূল্যবোধ । আভাঁ গার্দের আগমন জরুরি হয়ে উঠেছিল সেই মূল্যায়ণ ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে সেখানে নিজেদের মূল্যায়ণ পদ্ধতি স্হাপন করা । ইংরেজিভাষী অঞ্চলে তা ছিল উল্লম্ব, অর্থাৎ কেউ ওপরে এবং বাদবাকি ক্রমশ তলার দিকে ধাপেধাপে । উপনিবেশগুলোতেও ইংরেজরা এই মূল্যায়ন পদ্ধতি নিয়ে গিয়ে চারিয়ে দিতে পেরেছিল : গ্রেটেস্ট, গ্রেট, মেজর, মাইনর ইত্যাদি । বোদলেয়ারকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করলেও, র‌্যাঁবো-ভেরলেনের চরিত্র নিয়ে গুজব ছড়ালেও, কেউই তাঁদের, তাঁরা যখন লিখছিলেন, মাইনর হিসাবে তকমা দেগে দ্যায়নি । ফ্রান্সে লাতিন কোয়ার্টারের মতন তখনকার অ-ভদ্রলোক অথচ বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রকাশক অধ্যুষিত এলাকায় মাতামাতি হলেই তারা ছিল এগিয়ে । ওপরে নয় ।
          ফরাসি সাহিত্যে ষোড়শ শতক থেকেই মিলিটারি মেটাফর প্রয়োগ করা হয়েছে । একদল লেখককে বলা হতো “La Brigade” অর্থাৎ ‘বৃহৎ সৈন্যদল’ ; ব্রিগেড বলা হতো, তাতে সেনাবাহিনীর বহু ব্যাটালিয়ান ও কোম্পানি অন্তর্ভুক্ত । শিল্পী-সাহিত্যিকদের সমাজের ভ্যাঙ্গার্ড হতে হবে, এই আওয়াজ প্রথমে ফ্রান্সে তুলেছিলেন ক্লদ অঁরি দ্য সাঁ-সিমঁ, ১৮২৫ সালে প্রকাশিত তাঁর  Opinions Litteraires, philosophiques et industrielles bhite : "আমরা, শিল্পীরা, বুদ্ধিবৃত্তিক বিপ্লবের ভ্যানগার্ড হয়ে উঠব। শিল্পের শক্তি আসলে সবচেয়ে কার্যকর এবং দ্রুততম। আমাদের কাছে সব ধরণের অস্ত্র রয়েছে: যখন আমরা নতুন ধারণা প্রস্তাব করতে চাই, তখন আমরা সেগুলো শ্বেতপাথরে খোদাই করি বা আমরা সেগুলো একটি ক্যানভাসে আঁকি । " বৌদ্ধিক বিপ্লবের একেবারে সামনে দিকে শিল্পসাহিত্য থাকে, এই  ধারণা উনিশ শতকের মধ্যভাগে আবার দেখা দিয়েছিল, আবারও একটা বিপ্লবের ধারণার সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছিল আর সমস্ত ফরাসী বিপ্লব প্যারিসেই শুরু হয়। ফ্রান্সে উনিশ শতকের শেষে এই অভিধাটির মান পরিবর্তিত হয়েছিল । তারপর থেকে নির্দিষ্ট শিল্প-সাহিত্যিক গোষ্ঠীকে চিহ্ণিত করার জন্য প্রয়োগ করা আরম্ভ হয়েছিল এবং নতুন গোষ্ঠীটিকে নান্দনিক অন্বেষণের অগ্রভাগ হিসাবে গণ্য করা হতে লাগলো কেননা নতুন গোষ্ঠী আগের  শৈল্পিক মানদণ্ডকে ভেঙে ফেলতে সফল হল । বিপ্লবী আলোকপ্রাপ্তির সম্মিলিত প্রত্যয়টি বিলিন হয়ে গিয়ে "আভাঁ গার্দ" অভিধাটি সাধারণত শিল্পী-সাহিত্যিক গোষ্ঠীকে চিহ্নিত করতে ব্যবহৃত হওয়া আরম্ভ হয় । অনেক গোষ্ঠী থাকলেও, যে গোষ্ঠী একটি নতুন পদ্ধতির প্রস্তাব করে, আর তখনকার থিম্যাটিক মোটিফগুলির সাথে জড়িত নয় এবং নতুন অন্বেষণ চালাচ্ছে, আর অন্বেষণের প্রক্রিয়াতে পরীক্ষামূলক, তারা “আভাঁ গার্দ” হিসাবে চিহ্ণিত হতে লাগলো।
        পরিবর্তনের মূল অভিগমন হল যে এটি একটি সংক্ষিপ্ত সময়ের বিপ্লবের পরিণতি, ঘটনার বৈপরীত্য,  যা সমস্ত কিছু উল্টে পাল্টে দিতে চায়, যা হাংরি জেনারেশন করতে পেরেছে । এই দৃষ্টিভঙ্গি একটি বিশেষ ধারণার প্রতিপাদন করে এবং তাহল এই যে মানবজাতির অগ্রগতি বা শিল্পসাহিত্যের বাঁকবদল একটি "বিদার" ( Rupture ) এর পরিণতি, যা হঠাৎ করে অভিনবতাকে আবিষ্কার করে এবং যা আগে থেকে চলছে এমন  সমস্ত কিছুকে পাল্টে দ্যায় এবং প্রাক্তন চিন্তাধারার পদ্ধতিতে রূপান্তরণ ঘটায়। ততোদিনে যা প্রাক্তন তা পুঁজিবাদের চাপে বাজারের খোরাক হয়ে ওঠে । ১৯৫০ সালে ইসিদোরে ইজু, যিনি ত্রিস্তঁ জারার মতন রোমানিয় ছিলেন, প্যারিসে আরম্ভ করেন ‘লেট্রিজম’ আন্দোলন, যাকে পরাবাস্তবের পরের আভাঁ গার্দ আন্দোলনের স্বীকৃতি দেয়া হয়েছিল ; ‘লেট্রিস্ট’ আন্দোলনকারীরা অক্ষর, বাক্য ও ছবির মিশ্রণ ঘটিয়ে কাজ করতেন । ইজু বলেছিলেন যে বিশ্ব সাহিত্য ক্রমশ “Le ciselant” বা স্তব্ধতা থেকে ক্রমশ “l’amplique” দিকে এগিয়ে যায়, অর্থাৎ একটা সময় আসে যখন সমসাময়িক সমাজ নতুন মাত্রাটিকে গ্রহণ করে নেয় এবং তা হয়ে ওঠে doxa বা গৃহীত কল্পমূর্তি, যার পুনরাবৃত্তি ততোদিন চলতে থাকে যতোদিন না আবার নতুন ‘ভ্যাঙ্গার্ড’ এসে তাকে সরিয়ে দিচ্ছে । ইজু এই নবীনতাকে বলেছিলেন Novatique, যাকে ১৯৬০ ও ১৯৭০ দশকের Tel quel বা “যেমন আছে” পত্রিকাগোষ্ঠীর ভাবুকরা, বিশেষ করে রলাঁ বার্থ ও মিশেল ফুকো,  বলা আরম্ভ করলেন Rupture বা “বিদার” । 
          Tel quel গোষ্ঠীর সদস্যরা আধুনিক চিন্তাধারার সূত্রপাতকে ইতিহাসে ১৮৮৬ নাগাদ একটি “জ্ঞানতাত্বিক ভাঙন” বা “epistemological break” হিসাবে চিহ্ণিত করলেন কেননা সেই বছর মালার্মে তাঁর টেক্সটগুলো প্রকাশ করেছিলেন যা Album de Vers et de Prose নামে গ্রন্হাকারে ১৮৮৮ সালে প্রকাশিত হয়, কিন্তু এই বছরেই ফরাসি কবি মোরেয়ার “আধুনিক” সাহিত্যিক ইশতাহার Manifesto of Symbolism প্রকাশিত হয় Le Figaro সংবাদপত্রে যা প্রকৃতপক্ষে ছিল ১৮৫৬ সালে Le Salon de-তে বোদলেয়ারের লেখা “আধুনিকতা” সম্পর্কিত বক্তব্য । বোদলেয়ারের বক্তব্যটি পৃথিবী জুড়ে আধুনিকতার সংজ্ঞার স্বীকৃতি পায় । বোদলেয়ার বলেছিলেন যে “বিশুদ্ধ শিল্প”  [Ktema es aei অর্থাৎ অনন্তকালের সম্পদ] নামে পাশ্চাত্য চিন্তায় প্রাচীনকাল থেকে চলে আসছে তার জায়গায় আনতে হবে আধুনিক শিল্পবোধ কে, যা “আপেক্ষিক” ; শিল্প হল আংশিক শাশ্বত ও আংশিক সমসাময়িক বললেন বোদলেয়ার, এবং সমসাময়িকতা থাকার দরুণ তা আধুনিক । তিনি শিল্প-সাহিত্য সম্পর্কে নিজস্ব সমকালীনতার এই ব্যাখ্যার জয়কে কোনো দুর্বোধ্য শাশ্বতের বিপক্ষে তুলে ধরলেন । 
      মোরেয়া তাঁর ইশতাহারে বলেছিলেন, "সমস্ত চারুকলার মতো, সাহিত্যেরও অবিরাম বিকাশ হয়: একটি আবর্তের সঙ্গে তার প্রত্যাবর্তন কঠোরভাবে নির্ধারিত  [...]। শৈল্পিক বিবর্তনের প্রতিটি নতুন পর্ব তার আগের বৌদ্ধিক গোষ্ঠীর অবসানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে হয়, তার ঠিক আগের গোষ্ঠী অনিবার্যভাবে ফুরিয়ে যায় ।” তিনি বলেছেন  সাহিত্য এবং শিল্প ক্রমাগত নৃশংস এবং বিরোধী ভাবনাচিন্তার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যায়। এটাই মৌলিক জ্ঞানতাত্ত্বিক ইতিহাস যা আভাঁ গার্দের সৃষ্টিবাদী ধারণাটিকে, নানা আন্দোলন সত্ত্বেও, টিকে থাকতে দিয়েছে। উপরোক্ত তিনটি মৌলিক ফরাসি সাংস্কৃতিক এবং বৌদ্ধিক বৈচিত্র্য ব্যাখ্যা করে যে কেন আভাঁ গার্দ ধারণাটি ফরাসি সমালোচনামূলক শব্দভাণ্ডারে আবিষ্কার হয়েছিল এবং এত ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। ফরাসি সমালোচনামূলক ইতিহাসে সিম্বলিজম, ডাডা, ফিউচারিজম, পরাবাস্তববাদ এবং লেট্রিজমের মতো  ভ্যানগার্ডগুলির বর্ণনা করার সময়ে আভাঁ গার্দ অভিধাটি প্রয়োগ করে হয় । বস্তুত ১৮৮৬ থেকে ১৯৬০র দশক পর্যন্ত ঘটে যাওয়া বাঁকবদলগুলোকে চিহ্ণিত করার জন্যই আভাঁ গার্দ অভিধাটি প্রয়োগ করা হয় ।                                                 
          ইতালিয় ভাবুক রেনাতো পোজিওলি ১৯৬২ সালে তাঁর  ‘আভাঁগার্দের তত্ব’ রচনায় ( Teoria dell’arte d’avanguardia ) অভিধাটির অন্তর্গত সাংস্কৃতিক প্রপঞ্চের ধ্রুবকগুলো ঐতিহাসিক, সামাজিক, মনস্তাত্বিক এবং দার্শনিক পরিপ্রেক্ষিতে পরিমাপের প্রয়াস করেছিলেন । তিনি চিত্রকলা, কবিতা, সঙ্গীত ইত্যাদির  ব্যক্তিগত দৃষ্টান্তগুলো ছাপিয়ে বলতে চেয়েছেন যে অগ্রদূত বাহিনীর সদস্যরা বিশেষ আদর্শ বা মানদণ্ডের শরিক হবার দরুণ তা প্রতিফলিত হয় তাঁদের প্রচলবিরোধী বা সমাজরীতিঅনীহ জীবনশৈলীতে । জার্মান সমালোচক পিটার বার্গার ১৯৭৪ সালে তাঁর ‘থিয়রি অফ দি আভাঁ গার্দ’ বইতে বলেছেন যে সমাজের রাজনৈতিক সমালোচনা করে আবির্ভূত হলেও, পুঁজিবাদের সহযোগীতায় প্রতিষ্ঠান ব্যক্তির কাজে যে রাজনৈতিক বিষয়বস্তু থাকে তাদের অসাড় করে দেয় বা যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে নিয়ে চলে যায় । আভাঁ গার্দের ধারণা মূলত শিল্পী, লেখক, সুরকার এবং চিন্তাবিদদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হলেও এবং তাঁদের কাজগুলো মূলধারার সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের পরিপন্থী এবং  সামাজিক বা রাজনৈতিক প্রান্তসীমায় তাঁদের অবস্হান থাকলেও পাশ্চাত্যদেশগুলোর বেলায় যে বক্তব্য খাটে তা বঙ্গসমাজের মতন গরিবদেশগুলোর বেলায় খাটে বলে মনে হয় না ।
        পশ্চিমবঙ্গে আভাঁ গার্দ কবে থেকে আরম্ভ হল তা চিহ্ণিত করা সহজ । আভাঁ গার্দ অভিধাটি যুদ্ধসংক্রান্ত হবার দরুন এসট্যাবলিশমেন্টের সঙ্গে কবিলেখকদের যুদ্ধের সময়কাল দিয়ে তা দেগে দেয়া যায়, অর্থাৎ ষাটের দশকে যখন সাহিত্যশিল্পের প্রাতিষ্ঠানিক মানদণ্ড আক্রান্ত হল হাংরি জেনারেশন আন্দোলনকারী সাহিত্যগোষ্ঠির দ্বারা ।  পশ্চিমবঙ্গে যেমন, প্রতিষ্ঠানের বিরোধিতা করার পাশাপাশি শিল্পায়নের দ্বারা উৎপাদিত কৃত্রিমভাবে সংশ্লেষিত গণ সংস্কৃতিকেও বাঙালি আভাঁ গার্দ প্রত্যাখ্যান করেছে। প্রিন্ট ও বৈদ্যুতিন মিডিয়াগুলির প্রতিটি হল পুঁজিবাদের প্রত্যক্ষ পণ্য — এগুলি এখন মোটামুটি কারুশিল্পের প্ল্যাটফর্মের কাজ করে — অথচ এগুলো সত্যিকারের কারুশিল্পের আদর্শ নয়, উৎপাদন সম্পর্কিত  লাভ-ক্ষতির উদ্দেশ্য দ্বারা চালিত। বাজার তাই নকল বা যান্ত্রিক এবং প্রায়শই আভাঁ গার্দ সংস্কৃতি থেকে চুরি করে আনুষ্ঠানিক নকশা বা আবিষ্কার ব্যবহার করে তারা আভাঁ গার্দ কারুশিল্পের চেয়ে উন্নত হওয়ার ভান করে। যেমন বিজ্ঞাপন যাঁরা তৈরি করেন সেই দোকানদাররা পরাবাস্তবতা থেকে চাক্ষুষ পদ্ধতি চুরি করে চলেছে, যদিও বিজ্ঞাপনের কাজগুলো সত্যই পরাবাস্তব প্রতিক্রিয়া গড়ে তুলতে পারে না । বিজ্ঞাপন যেটা তৈরি করে তা হল ( kitsch ) ‘কিৎশ’-- আভাঁ গার্দের বিপরীত এবং তা রিয়ার গার্ডও নয় ।
          রেনাতো পোজিওলি যে তর্কবিন্দুগুলো দিয়ে আভাঁ গার্দকে চিহ্ণিত করেছিলেন সেগুলো পশ্চিমবাংলায় ষাটের দশকের হাংরি জেনারেশন সাহিত্য আন্দোলন এবং পরবর্তী বাঁকবদলকারী পত্রিকাগোষ্ঠির  ক্ষেত্রে প্রযোজ্য । ১ ) আভাঁ গার্দ বলতে বোঝায় পুরোনো পথ ছেড়ে নতুন পথে যাত্রা ; ২ ) মার্কসবাদীরা আভাঁ গার্দ বিরোধী ; ৩ ) মার্কসবাদীরা আভাঁ গার্দকে ‘বুর্জোয়া শিল্প, নামে অভিহিত করতে ভালোবাসেন, কেননা তাঁরা আঙ্গিকের চেয়ে বিষয়বস্তুকে গুরুত্ব দেন ; ৪ ) আমেরিকা -ইংল্যাণ্ডে আভাঁ গার্দ শব্দটা ব্যবহার করা হয় না, কেননা তা ফ্রান্সে উদ্ভুত, তাঁরা পোস্টমডার্ন বলা পছন্দ করেন । ; ৫ ) রাজনৈতিক এবং নান্দনিক আভাঁ গার্দ পরস্পরের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে বামপন্হীদের কারণে ; ৬ ) উৎসাহের ঝরণা থেকে আভাঁ গার্দ শিল্প-সাহিত্যের জন্ম ; ৭ ) আভাঁ গার্দ শিল্পী-সাহিত্যিকরা কাজের তুলনায় প্রকাশভঙ্গীতে বেশী আগ্রহী ; ৮ ) পুরাতনপন্হীরা নিজেরাই নতুনের আবির্ভাব চান কিন্তু দেরিতে স্বীকার করেন ; ৯ ) আঁভা গার্দ জনপ্রিয় নয় তার কারণ জনগণের কাছে পৌঁছোতে দেয়া হয় না ; ১০ ) রোমান্টিসিজম আভাঁ গার্দের চেয়ে জনপ্রিয় ছিল কারণ তখন অভিজাত সমাজ অবলুপ্ত হয়ে নতুন কর্মীশ্রেনি ও মধ্যবিত্তের উদ্ভব হচ্ছিল ; ১১ ) বহু আভাঁ গার্দ শিল্পী-সাহিত্যিক জনপ্রিয়তা পছন্দ করেন না ; ১১ ) একটি আভাঁ গার্দ আন্দোলন দেখে পরের প্রজন্ম দ্রুত নিজেদের আভাঁ গার্দ আন্দোলনের সূত্রপাত করতে চায় ; ১২ ) আভাঁ গার্দ আন্দোলনের লেজ দীর্ঘ হয় কেননা অংশগ্রহণকারীরা পরস্পরের অচেনা এবং পরস্পরের পৃষ্ঠভূমি ভিন্ন হওয়া সত্বেও দল গড়ে তোলেন ; ১৩ ) সব দেশের আভাঁ গার্দকে বিশ্বায়ন নিজের অন্তর্গত করে ফেলতে চায় ;  ১৪ ) পুঁজিবাদের চাপে অনেকে আভাঁ গার্দ ত্যাগ করে বৈষয়িক সাফল্য চান, যেমন আগেকার কবি-শিল্পীরা রাজ দরবারের সাহায্য পেতেন ।
          পিটার বার্জার ১৯৮৪ সালে লেখা তাঁর  ‘থিয়োরি অফ দি আভাঁ গার্দ’ বইতে রেনাতো পোজিওলির চেয়ে বেশ ভিন্ন তর্কবিন্দু দিয়েছিলেন, যেমন ১) জনারগুলোর পার্থক্য  [ genres ] ছলনাময়, যদিও কবিতা, চিত্রকলা ইত্যাদি নাম দিয়ে তাদের আলোচনা হয় ; ২) শ্রোতা-পাঠক-দর্শকরা কখনও কৌতুহলশূন্য নয় বরং একদেশদর্শী ; ৩ ) ব্যাখ্যাকারী নিজের পক্ষপাত আরোপ করে ; ৪ ) এটা অবশম্ভাবী যে ব্যাখ্যাকারী নিজের কালখণ্ডের প্রেক্ষিতে অতীতকে যাচাই করবে ; ৫ ) ধর্ম অনেকসময়ে বাগড়া দ্যায় কেননা ধর্ম দুর্দশা কাটাবার প্রয়াস করলেও আনন্দ লাঘব করে ; ৬ ) মানুষ যখন বুঝতে পারল যে ধর্ম ব্যাপারটা ছলনাময় তখন সে এর নাম দিল দর্শন [ বিশ্বাস নয় ] ; ৭ ) আদোর্নো যদিও বলেছেন যে আভাঁ গার্দের কোনো অভীষ্ট নেই, পিটার বার্জার বলেছেন যে আভাঁ গার্দের অভিষ্ট হল আলোচনার সূত্রপাত ঘটানো ; ৮ ) আভাঁ গার্দ যার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে, পুঁজিবাদের কারণে তাকেই প্রতিষ্ঠা করতে সাহায্য করে ; ৯ ) আভাঁ গার্দ শিল্প-সাহিত্য ব্যক্তির প্রয়োজনকে অন্তত কাল্পনিক তৃপ্তি দ্যায় যেগুলো প্রতিদিনকার জীবনযাপনে অবদমিত থাকে ; ১০ ) একটি আন্দোলনের সঙ্গে আরেকটি আন্দোলনকে মিশিয়ে আলোচনা করা উচিত নয়, তা করলে তাদের উদ্দেশ্যকে গুলিয়ে ফেলা হবে ; ১১ ) ডাডা আন্দোলনের কোনো শৈলী ছিল না, তার ছিল উদ্দীপনা ও তত্ত্ব, এবং আঁভা গার্দ অভিধার তারাই জন্মদাতা, তারা প্রতিটি সংস্হার বাইরে নিজেদের রাখতে চেয়েছিল ; ১২ ) ওয়াল্টার বেনিয়ামিন বলেছেন যে যান্ত্রিক যুগে শিল্প-সাহিত্যকে গ্রাহ্য করায় প্রভূত পার্থক্য ঘটে গেছে, কেননা তা এখন যতো ইচ্ছে উৎপাদন হয় ; ১৩ ) শিল্প-সাহিত্য এখন মুনাফার ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে, সেখানে কবিতা খাপ খায় না ; ১৪ ) রাজনৈতিক না হলে আভাঁ গার্দ হয় না ; ১৫ ) শিল্প-সাহিত্য প্রতিদিনের জীবন থেকে আলাদা, তা ম্যাজিকাল, তার প্রতিটি কারুকাজকে একসঙ্গে গ্রথিত করা হয়, জঘন্য ধারণার মতো কবিদের একসঙ্গে থাকা উচিত ; ১৬ ) শিল্পসাহিত্য তার কার্যকরী মূল্য খুইয়ে ফ্যালে তখন তা শিক্ষণীয় ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায় ; ১৭ ) নাগরিক তার প্রতিদিনের জীবনে ‘কর্মচারী’ হিসাবে ক্ষুদ্র হয়ে গেছে ; শিল্প-সাহিত্যে তাকে ‘মানুষ’ হিসাবে খুঁজে পাওয়া যায় ; ১৮ ) সংস্হাগুলো তাদের অন্তর্ভুক্ত কাজকেই কেবল শিল্প-সাহিত্য বলে মনে করে -- এটা নান্দনিক কারণে ঘটে না, সামাজিক কারণে ঘটে ; ১৯ ) সত্যকার আঁভা গার্দ শিল্পী-সাহিত্যিক সিস্টেমকে ভেঙে ফেলতে চান, অবশ্য আজকের দিনে আধুনিক শিল্পী দুশঁর পক্ষে তা কঠিন হতো কেননা তিনি সিস্টেমকে ভাঙলেন অথচ তার অন্তর্গত হয়ে গেলেন [ হাংরি জেনারেশনের শৈলেশ্বর ঘোষ শেষ বয়সে সিস্টেমকে স্বীকার করে নিয়েছিলেন ] ; ২০ ) সংস্কৃতি এখন ইনডাস্ট্রি যার দরুন শিল্প-সাহিত্যকে খেয়ে ফেলতে চেষ্টা করে যাচ্ছে বাজার ; ২১ ) রেডিমেড জিনিসকে শিল্প-সাহিত্যে বদলে ফেললে তা শিল্প-সাহিত্য থেকে মুক্ত হয়ে যায় ভাবা ভুল, কেননা রেডিমেড ব্যাপারে শিল্পের অভিব্যক্তি খুঁজে পায় ব্যক্তি ।
          আভাঁ গার্দ সম্পর্কিত আলোচনা পুনরুজ্জীবিত হল থিয়োদোর আদোরনোর সমর্থনের দরুণ । সমসাময়িক শিল্প-সাহিত্যের একটা বড়ো অংশ তখনও এবং এখনও যেহেতু বুর্জোয়াজিকে কুন্ঠিত ও হতবুদ্ধি করে, আদোরনো যুক্তি দিয়ে প্রথাগত নান্দনিক মূল্যবোধ ও আঙ্গিকের পক্ষে বৌদ্ধিক বিশ্বাসযোগ্যতা দিয়েছিলেন । কিন্তু যাঁরা শিল্প-সাহিত্যের ঐতিহ্যে কেবল নতুনত্বের জন্যই নতুনত্ব আনতে চান, এবং যাঁদের কাজের প্রধান উদ্দেশ্য হল শক দেয়া আর স্ক্যাণ্ডালাস হওয়া, তাঁদের উচিত নয় আদোরনোকে আশ্রয় করে নিজেদের সমর্থন আদায় করা । যেমন, স্ত্রাভিনস্কির ‘রাইট অব স্প্রিঙ’ এর প্রথম অনুষ্ঠানকে আদোরনো আভাঁ গার্দের স্বীকৃতি দেননি, কেননা তা ছিল ‘লোকতাত্বিক’ এবং আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মতৃপ্ত । স্ত্রাভিনস্কির সেই অনুষ্ঠানে ঐতিহ্যবিরোধিতা ছিল না এবং তা আঙ্গিকের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়নি ।   
          বিশ শতকের যে কাজগুলোকে আদোরনো আভাঁ গার্দের স্বীকৃতি দিয়েছেন তাতে ছিল আমাদের নিজেদের মধ্যেকার এবং জগতসংসারে অবস্হিত যা কিছু  প্রিমিটিভ বা আদিম । এই আদিমতার কারণেই আফ্রিকার ভাস্কর্যের প্রতি পিকাসোর আকর্ষণ কিংবা মনদ্রিয়ানের ছবি আঁকায় কেবল রেখার প্রয়োগ । সেই সময়ে পাশ্চাত্য জগত জড়িয়ে পড়েছিল দুই বিশ্বযুদ্ধের হত্যালীলায়, ঔপনিবেশিক  একীকরণ আর দ্রুত পণ্যায়নে, ফলে ডুবে যাচ্ছিল সেই একই বুনো সভ্যতায় যা কাটিয়ে ওঠা নিয়ে তারা এককালে গর্ব করত । আদোরনোর মতে, সমাজের আত্মসংরক্ষণ সমাজ-অনুমোদিত আত্মত্যাগ থেকে    পার্থক্যহীন হয়ে গিয়েছিল : যা আদিম মানবের মধ্যে, অহং-এর আদিম দিকগুলোয় পাওয়া যায় । আদোরনোর আভাঁ গার্দ তত্ত্ব বাস্তবের এই আদিম বৈশিষ্ট্য থেকে উৎসারিত হয় ; প্রিমিটিভ বৈশিষ্ট্যকে যা দাবিয়ে রাখে তার বিরোধিতা করে আভাঁ গার্দ ।  এই দৃষ্টিকোণ থেকে রাজনীতি, দর্শন, সঙ্গীত ও সাহিত্য নিয়ে আদোরনো জীবনভর বলেগেছেন যে “আত্মসংরক্ষণের লড়াইয়ের চেয়েও জীবনের কাজ অনেক বেশি।” আদোরনো তাঁর ‘নেগেটিভ ডায়ালেকটিকস’ ( ১৯৬৬ ) বইতে লিখেছেন যে এই তর্কে আত্মসংরক্ষণ “ইতিহাসের এতাবৎ মান্যতার বাইরে সর্বনাশের নিয়ম ছাড়া আর কিছুই নয়।”    
          আভাঁ গার্দকে সমর্থনে আদোরনো ‘আগে থেকে পাওয়া’ ব্যাপারকে গুরুত্ব দেননি । আভাঁ গার্দকে ‘নতুন’ হতে হবে । উনি বলেছেন যে সিরিয়াস সঙ্গীতকে, সিরিয়াস শিল্পের মতনই, একই সঙ্গে নতুন আর  স্বীকৃত উভয়ই হতে হবে ।    প্রকৃত আভাঁ গার্দের গুণগ্রাহীতা আসে ঐতিহ্যকে বুঝতে পারার মাধ্যমে কেননা তা একই সঙ্গে তার থেকে দূরে সরে যায় আবার তার  ধারাবাহিকতাও । ফালতু অথচ অভিনব কিছু সৃষ্টি করা যেমন সহজ তেমনই সহজ অসার ও গতানুগতিক কিছু সৃষ্টি করা । অভিনবতার খাতিরেই অভিনবতা সৃষ্টি করা আর জনগণের বাজারকে খাওয়ার জন্য সৃষ্টি করায় সে ক্ষেত্রে তেমন পার্থক্য থাকে না । নতুন কাজ যতোই শকিঙ হোক, সেই শক কিসের বিরুদ্ধে করা হচ্ছে তার বোধ না থাকে তাহলে তা হবে বেশ্যাসুলভ । আদোরনোর বক্তব্য থেকে আমরা যা পাই তা হল যে নতুনের জন্য আমাদের তৈরি থাকতে হবে এবং অমনভাবে তৈরি থাকা তখনই সম্ভব যখন একজন গ্রাহী তার শিক্ষিত প্রবৃত্তির দ্বারা স্বীকার করতে পারবে যে প্রকৃতপক্ষে সৃষ্টিকাজটি ঠিক কী । আদোরনোর মতে প্রকৃত সৃষ্টির মানসপ্রতিমার অভিজ্ঞতার অভাব, যার জায়গা নিয়েছে চিত্তবিনোদন বাজারের লালিকা আর রেডিমেড বাঁধাধরা জিনিসপত্র, সেগুলোই প্রাথমিক স্তরে জার্মানদের মধ্যে গড়ে দিয়েছিল সিনিসিজম যা শেষ পর্যন্ত বিটোফেনের মানুষদের বদলে ফেললো হিটলারের মানুষে ।
       বোদলেয়ারের “আধুনিকতাবাদ”-এর প্রেক্ষিতে তাঁর বৌদ্ধিক উত্তরসূরীর কথা বলার জন্য আজকে "অতিরিক্ত-আধুনিকতাবাদ"-এর বক্তব্য রাখতে গেলে একজনকে নিজেকে "উত্তরসমসাময়িক-পরবর্তী" কাঠামোর মধ্যে উপস্হাপিত করতে হবে। জাঁ পল সার্ত্রে যেমন তাঁর জার্নাল Les Temps Modernes-এ বলেছেন,  কবিতাকে সমসাময়িকতার সহজ অত্যাচার ("চরম" বা তার “অভাব”) থেকে নিজেকে বিযুক্ত করতে হবে এবং ভবিষ্যতের বিষয়ে প্রত্যাশা দেওয়ার কথা ভাবতে হবে; কবিতাকে অবিরাম  ভবিষ্যত আবিষ্কার করতে হবে। কবিকে কেবল তাঁর নিজস্ব সমসাময়িকের চেয়ে বেশি হতে হবে, এবং সংক্ষিপ্ত শর্তাবলী, বলা যেতে পারে যে কবিকে ভবিষ্যতের উদ্ভাবন করতে হবে। তাঁর কবিতাকে ভাবতে হবে যে কবিতা কী হতে পারে, তাত্ত্বিকভাবে এবং উপায়ের দিক থেকে তো বটেই,  ভাবের নতুন রূপের দিক থেকেও। সম্ভবত এতে কোনও সমসাময়িকতা নেই, তবে কমপক্ষে এটি কল্পনাশক্তিকে আরও সক্রিয় করবে, আরও বেশি ভালভাবে বেঁচে থাকার নতুন পদ্ধতির উদ্ভাবন করার ক্ষমতা এবং আগত বিশ্বের তাৎপর্যের ভিত্তিগুলির কল্পনা করবে। আমরা যদি কবিতার "আধুনিক সমসাময়িক" যুগে প্রবেশ করতে চাই, তবে আমাদের বোদলেয়ারের "আপেক্ষিকবাদী" দৃষ্টিভঙ্গিতে আরও কিছু যুক্ত করতে হবে । র‌্যাঁবো তাঁর সবচেয়ে অসাধারণ মুহুর্তগুলিতে  "Le voyant" ["ভাবাবেশ"] বলেছিলেন। কবি কেবল তাঁর নিজস্ব "সময়"-এ সীমাবদ্ধ হতে পারেন না । তাঁর দূরদর্শিতার ক্ষমতা থাকতে হবে। কবিতায় স্থায়ী, বাস্তব এবং ভবিষ্যত অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
          প্রশ্ন উঠতে পারে যে "আভাঁ গার্দ" সাহিত্য-অভিধার জন্ম কেন বোদলেয়ারের  "আধুনিকতা" সম্পর্কিত বক্তব্যের পৃষ্ঠভূমিতে "সমসাময়িক"কে যুক্ত করেছে । আভাঁ গার্দ-এর  সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ কাজ হল জনগণের কর্মক্ষমতা পরীক্ষা করা এবং তার উন্নতি করা। এটি কেবল পরীক্ষা-নিরীক্ষা নয়, ইউরোপে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পথও ছিল,  যা সংস্কৃতিবিশেষকে সুরক্ষিত রাখার বিষয়টি নিশ্চিত করে। সাংস্কৃতিক বিভ্রান্তি এবং কিছু সামাজিক উথালপাথালের মাঝেও আভাঁ গার্দ ধারণাটি সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়েছিল যা জনগণকে এগিয়ে যেতে প্ররোচনা দিয়েছিল। ফ্রান্সে বিপ্লবের পরে আভাঁ গার্দ একটি সফল পরিবর্তন এনেছিল ।  সেই সময় যে লোকেরা রাস্তায় নেমে লড়াই করছিল তারা শিল্প এবং কবিতা সম্পর্কে খুব বেশি জানত না (ক্লিমেন্ট গ্রিনবার্গ, ২০০৫ ) আভাঁ গার্দ কবি বা শিল্পীর কাছে প্রধান বা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি ছিল তাদের মতামত এবং চিন্তাভাবনা নির্দ্বিধায় প্রকাশ করার দক্ষতা। ধারণাটি এতটাই শক্তিশালী ছিল যে এটি শিল্পের সমস্ত দ্বন্দ্ব এবং সমস্যাগুলি সমাধান করতে এগিয়ে গিয়েছিল কারণ কারুকৃতিগুলো শিল্পীকে তার  দক্ষতা প্রদর্শনের অনুমতি দেয়। আভাঁ গার্দ ছিল “আধুনিক” ব্যাপার ।  
        ফ্রান্সে উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে, বিপ্লব ঘটার পরে ১৮৪০ সালে সর্বহারা শ্রেণীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকায়  গণতান্ত্রিক চেতনা লগ্নী ও শ্রমের প্রতি বিদ্বেষের ফলে নিরঙ্কুশ রাষ্ট্রের প্রতি মোহিত হয়ে ওঠে। শিল্প সমালোচক ক্লিমেন্ট গ্রিনবার্গ তাঁর  "আভাঁ গার্দ ও কিৎশ" প্রবন্ধে যেমন উল্লেখ করেছিলেন: একই সমাজে একই সাথে টি.এস. এলিয়টের ‘ওয়েস্ট ল্যাণ্ড’ কবিতার মতো কাজ হয় আবার টিন প্যান অ্যালির গান হয় কিংবা ব্রাকের একটি চিত্রকর্ম এবং একটি স্যাটারডে ইভনিঙ পোস্টের কভার হয়; চারটিই একই সংস্কৃতির অংশ এবং একই সমাজের পণ্য। কলকাতায় যেমন দেখি ‘কোয়ার্টজ পাবলিশারের আভাঁ গার্দ বইয়ের পাশাপাশি স্টার জলসা আর জি টিভির কিৎশিয় সিরিয়ালগুলো । যেমন সাহিত্যের ক্ষেত্রে হাংরি, শ্রুতি, শাস্ত্রবিরোধী, নিমসাহিত্য আন্দোলনের মাধ্যমে তেমনই ষাটের দশকে পশ্চিমবঙ্গে চিত্রকলার ক্ষেত্রে একট আভাঁ গার্দ চেতনার উন্মেষ ঘটেছিল, এরকম বললে অত্যুক্তি হয় না।এবং পরবর্তী সময়ে ষাটের দশকে প্রতিষ্ঠাপ্রাপ্ত শিল্পীদের হাতে তা ক্রমশই আরাে বিকশিত হয়েছে, আরাে সংহতি অর্জন করেছে। এই বিকাশ ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের চিত্রচর্চার সঙ্গে সমান্তরাল হলেও, তা থেকে স্বতন্ত্র। অথাৎ পশ্চিমবঙ্গের শিল্পীদের কাজে এমন কিছু বৈশিষ্ট্য আছে, যা, শিল্পী ভেদে প্রত্যেকের নিজস্বতা সত্ত্বেও, এক সামগ্রিক ঐক্যের ইঙ্গিতবাহী; আর সেই ঐক্যের যে বিশেষ ধরণ, সেটা অন্যান্য অঞ্চলের শিল্পীদের প্রকাশভঙ্গি থেকে একটু আলাদা।  গণেশ পাইন, রবিন মণ্ডল, যোগেন চৌধুরী, বিকাশ ভট্টাচার্য, প্রকাশ কর্মকারের আঁকা ছবিগুলোর পাশাপাশি বাংলা আর হিন্দি সিনেমার পোস্টার । অবনী ধর, সুবিমল বসাক, বাসুদেব দাশগুপ্ত, সুবিমল মিশ্র, সুভাষ ঘোষ-এর ন্যারেটিভের পাশাপাশি পণ্যসাহিত্যের ন্যারেটিভ । প্রথম দিকে আভাঁ গার্দ একটি বিমূর্ত বা অযৌক্তিক শিল্পের মতো বিকাশ করা হয়েছিল যা মানুষের চিন্তাভাবনা বা অনুভূতি প্রকাশ করবে। আভাঁ গার্দ ধারণাটি শক্তিশালী হবার কারণ এটি মানুষকে তাদের অনুভূতি প্রকাশ করতে বা এমনকি “সৃষ্টিকর্তাকে” ছাপিয়ে যাবার সদিচ্ছা প্রদান করে ।
         সাহিত্য-শিল্পকে পণ্যায়নের প্রেক্ষিতে স্লাহভয় ঝিঝেক সম্প্রতি এই সম্ভাবনার বিষয়ে চিন্তা করে বেলেছেন যে বর্তমান পুঁজিবাদকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করা সম্ভবত দূরদর্শীতার অভাব; তাঁর মতে আমাদের একথা এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয় যে পশ্চিমা পুঁজিবাদও আমাদের গণতন্ত্র এবং সুখের ধারণা এনে দিয়েছে এবং সম্ভবত এগুলি  অন্তর্নিহিত মূল্যবোধগুলোর সাথে সংযুক্ত ; সুতরাং আমরা যদি গণতন্ত্রকে গুরুত্ব দিই তবে যা জরুরি তা সাম্যবাদ বা একটি ধর্মতাত্ত্বিক ব্যবস্থা দ্বারা পুঁজিবাদের প্রতিস্থাপনের আহ্বান জানানো নয় কেননা ওদুটো প্রমাণিত হয়নি যে তারা উন্নত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে। এখনও পর্যন্ত প্রমাণ হয়নি যে আধুনিকতাবাদী কবিরা বোদলেয়ারের প্রস্তাবিত মডেলের তুলনায় "আরও ভাল" হতে পারে এমন সৃষ্টিধারা প্রতিস্থাপন করতে পেরেছেন। আমাদের মনে রাখতে হবে, বোদলেয়ারের পাঠবস্তুগুলো প্রতিষ্ঠানের ভাষার সমসাময়িক, এবং সমস্ত আধুনিক গণতন্ত্রের বিশ্বজুড়ে সেটাই ঘটে গেছে । আমাদের কেবল মনে রাখতে হবে যে হিটলরিয়ান ফ্যাসিবাদ "অবক্ষয়ের শিল্প" নামের কাজকে সেন্সরযোগ্য মনে  করেছিল এবং কমিউনিস্ট সরকারগুলো "পাতি বুর্জোয়া নন্দনতত্ত্বের" ধারণাটি আবিষ্কার করেছিল। আর ধর্মের ধ্বজাধারীদের কথা বাদ দিন কেননা আমরা জানি ধর্মীয় উৎসাহ সাহিত্য-শিল্পকে নিষিদ্ধ করার চেষ্টায় আগেও মেতেছিল আর এখনও তাই করে চলেছে, কারণ তাদের ধর্মভিত্তিক নৈতিক শৃঙ্খলার সাথে মানায় না বলে মনে করেন ধ্বজাধারীরা। পশ্চিমবঙ্গে অনিল বিশ্বাস এককালে এইরকম ছড়ি ঘুরিয়েছিলেন । হিন্দুত্ববাদীরা বহু শিল্পীর কাজের বিরুদ্ধে ফতোয়া দিয়েছে, হুসেনকে তো দেশছাড়া করেছিল ।
      আরেকটি জিজ্ঞাসা হল  যে "আভাঁ গার্দ" সাহিত্যে-অভিধার জন্ম কেন বোদলেয়ারের এই উপলব্ধি থেকে উৎসারিত হয়েছিল যে "আধুনিকতা"র নতুন নান্দনিক বক্তব্যের সাথে "সমসাময়িক"-এর  সম্পর্ক ছিল। নতুন নান্দনিক বোধকে সংজ্ঞায়িত করার জন্য "আধুনিক" শব্দটি আকস্মিকভাবে বোদলেয়ারের কাছে হাজির হয়নি । ফ্রান্সের সাহিত্যে এর দীর্ঘকালীন সাংস্কৃতিক ইতিহাস রয়েছে । ১৬৮৮ সালে ফরাসি লেখক শার্ল পেরা ( Charles Perrault ) তাঁর চার খন্ডের বইয়ের প্রথম খণ্ড “প্রাচীনতা ও আধুনিকতার সমান্তর” প্রকাশ করেছিলেন ( Parallele des anciens et des modernes )। এই বইটি ফরাসি সাহিত্যের ইতিহাসে "La querrelle des Anciens et des Moderns" বা “প্রাচীন ও আধুনিকতার বিতর্ক” নামে পরিচিত।  শার্ল পেরা "আধুনিক" দৃষ্টিভঙ্গির সমর্থক ছিলেন এবং বলেছিলেন সমসাময়িক সাহিত্য ক্লাসিকাল সাহিত্যের মতোই ভালো হতে পারে । বিতর্কটি শুরু হয়েছিল যখন শার্ল পেরা তাঁর “লুই দ্য গ্রেটের শতক” ( "Le siecle de Louis le Grand") কবিতাটি তৎকালীন ফরাসি রাজা লুই চতুর্দশকে একজন প্রবুদ্ধ শাসক হিসাবে প্রশংসা করে লিখেছিলেন এবং তাতে বলেছিলেন যে রাজা চারুকলার উন্নতির জন্য এত কিছু করেছেন যে সমসাময়িক কাজগুলো ধ্রুপদী কারুকৃতির তুলনায় উন্নত হয়ে গিয়েছে । প্রতিবাদে বোলেউ-ডেসপ্রা ( Boileau-Despreaux )ও রাসিনে তাঁকে আক্রমণ করেছিলেন এবং  "প্রাচীন যুগের" সমর্থকদের নেতা হিসেবে, ক্লাসিকাল কারুকৃতির তুলনায় সমসাময়িক শিল্পের আধিপত্যকে অস্বীকার করেছিলেন, আর জাগতিক বিষয়-আশয়ের প্রতি লোভের নিন্দা করেছিলেন, যা  ঘটেছিল শার্ল পেরার ক্ষেত্রে , যিনি রাজনৈতিক ক্ষমতার স্পষ্ট বশ্যতা স্বীকার করে নিয়েছিলেন। দুই দলের মধ্যে ঐতিহাসিক কলহের অবশেষে সমাধান হয়েছিল যখন দুই দলের প্রতিনিধি ফরাসি অ্যাকাদেমির সামনে পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে মিটমাট করে নেন । তা সত্ত্বেও, অষ্টাদশ এবং উনিশ শতক পর্যন্ত ফ্রান্সে তার প্রভাব থেকে গিয়েছিল
        বোদলেয়ার সেই সময়ে অনুধাবন করেছিলেন যে আধুনিকতা সম্পর্কিত তাঁর ১৮৫৬ সালের পাঠবস্তুটিতে "আধুনিক কবিতা" ও আধুনিকতাবাদের ধারণাকে পুনরুদ্ধার করার অর্থ কী। অনেকে মনে করেন যে বোদলেয়ারের সমকালীনতার এই বক্তব্যটি আর্তুর র‌্যাঁবোর কাব্যদর্শনের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে,  যেমনটি তাঁর কবিতা “নরকে এক ঋতু”র উপসংহারে তিনি লিখেছিলেন: Il faut etre absolument moderne - “আপনাকে একেবারে আধুনিক হতে হবে।” প্রকৃতপক্ষে যদি কেউ র‌্যাঁবোর উদ্ধৃতিটি গভীরভাবে পাঠ করে, তবে তা ( anti-phrase ) "বিরোধী বাক্যাংশ" হিসাবে দেখা যেতে পারে: র‌্যাঁবো তাঁর সমসাময়িকতাকে অপছন্দ করতেন, এটা তাঁর কাছে পাতিবুর্জোয়া, মামুলি, মানুষদের বস্তুবাদী সমাজের প্রতি কাপুরুষোচিত আত্মসমর্পণ বলে মনে হয়েছিল।
          যদি প্রকাশ্যে পুরস্কৃত কবিতা ( যেমনটি র‌্যাঁবো তাঁর নিজের সমসাময়িক কবিদের ক্ষেত্রে লক্ষ্য করেছিলেন : সালি প্রুধোম, ফ্রাঁসোয়া কোপি,, বাঁভিল, প্রমুখ  কবিরা "সমাজের কাছে "ঋণী" হন, তাহলে তাঁরা তো ফালতু বুর্জোয়া মহাবিশ্বের অংশ ছিলেন, যাকে র‌্যাঁবো তুচ্ছ-তাচ্ছ্যল্য করেছেন , তারপরে র‌্যাঁবো "কবিতা" নিয়ে আরকিছু করতে চাননি। "নিজেই নিজের সমসাময়িক" হওয়ার জন্য তিনি  তাঁর সময়ের অংশ হতে পারেন, তাঁর নিজস্ব বিশ্বে থাকবেন, এর প্রসঙ্গগুলো এবং সমস্যাবলীতে মগ্ন হয়ে উঠবেন। যদি, সমস্ত কাব্যিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে, বস্তুবাদী কদর্যতার সমসাময়িকতাকে উপেক্ষা করা না যায় , তবে তিনি কবিতাকে ত্যাগ করে  চলে যাবেন ভাগ্যান্বেষণে, তারপরে বাণিজ্যিক ব্যবসায়ী এবং শেষ অবধি রাজা মেনেলিককে তাঁর স্বাধীনতায় সহায়তা করার জন্য বন্দুক চোরাচালানের কাজ করবেন যাতে রাজা ইংরেজ উপনিবেশবাদীদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারেন । এটিই ছিল র‌্যাঁবোর প্রতি সমসাময়িকতার আহ্বান। র‌্যাঁবোর কাছে “আপনাকে একেবারে আধুনিক হতে হবে” ছিল  নেতিবাচক, তাঁর কাব্যিক "দৃষ্টিপ্রতিভা," অর্থাৎ ভিশন পরিত্যাগ, তাঁর স্বপ্ন এবং কাব্যিক সৃষ্টির জীবনকে ত্যাগ করার বার্তা। 
    "সমসাময়িকতা" ( contemporaneity ) এবং "আধুনিকতা" ( modernity )-র মধ্যেকার  অভ্যন্তরীণ যোগসূত্র একটি নির্দিষ্ট সময়কালে শিল্প বলতে কী বোঝায় তা নির্ধারণের জন্য বিশেষ সময়ে ঐতিহাসিকভাবে একটি মূল গুণক প্রবর্তন করেছিল। ইতিহাসকরণ ( historization ) একটি পর্যায়কালীনতার ( periodization ) জন্য পথ ছেড়ে দিয়েছিল এবং অবশ্যই "আভাঁ গার্দ" ধারণাটি যুগচেতনার অংশরূপে সাহিত্য-শিল্পের ফলাফল হিসাবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। এর অতিমাত্রার বৈকল্পিকতার কথা যা সার্ত্রে বলেছেন তা ওপরে আলোচনা করেছি ;  লেখকেরা তাঁর সময়ের রাজনৈতিক, সমাজতাত্ত্বিক, আদর্শগত বিতর্কে অংশ নেন এবং গড়ে তোলেন "বাস্তববাদী", "হস্তক্ষেপবাদী" শিল্প-সাহিত্য যেমন আজকের সমসাময়িক কাব্য রচনায় ল্যাঙ্গোয়েজ পোয়েট্রি আন্দোলনের লুই জুকোস্কি, বব পেরেলম্যান ও চার্লস বার্নস্টেইন এবং ফ্রান্সের জাঁ মারি গ্লাইজ-এর বিশৃঙ্খলার রচনাগুলো বর্তমান কালখণ্ডের আভাঁ গার্দ। সুতরাং অবাক হওয়ার কিছু নেই যে আজ যে কবিতাকে সর্বাধিক উদ্ভাবনী বলে বিবেচনা করা হয় তা হল "আপনার সমসাময়িকতা প্রকাশ করুন" ।  "চরম সমসাময়িক" লেখার একটি প্রশংসনীয় অংশ হ'ল দৈনন্দিন জীবনের বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশ এবং উপস্থাপন। এই সময়ের ফরাসি কবি ও তাত্বিক অঁরি মেশোনিক স্লোগান দিয়েছেন - “কবিতায় আপনাকে নিজের সমসাময়িক হতে হবে"।
          ইউরোপীয় ঐতিহ্য এবং মার্কিন সংস্কৃতির বর্তমানবাদের স্বাভাবিক দার্শনিকতায় "রাজনৈতিক" দায়বদ্ধতা সমসাময়িকতার কবিতা হিসাবে সমালোচকদের  স্বীকৃতি পেয়েছে। সেই দিক থেকে দেখতে গেলে "আধুনিকতাবাদ"কে ছাড়িয়ে বা অতিক্রম করে, একটি অনৈতিহাসিক "উত্তর-আধুনিকতাবাদ" ( post-modernism ) ওই প্রবণতার সাথে খাপ খায় এবং এটি প্রত্নতত্ত্ব,  সময়ের ধারাবাহিকতা এবং ঐতিহাসিক সংশ্লেষ ইত্যাদিকে বাতিল করার মাধ্যমে নাটকীয় উপায়ে কার্যকর করে: প্রতিটি উপাদান (কবিতার মাত্রা ও ছন্দ , থিম, চিত্র, শব্দ, গদ্যযুক্তি ইত্যাদি) যে উত্তর-আধুনিক কবিতা বা গদ্যে উপস্হাপন করা হয় তা তাৎক্ষণিকভাবে "সমসাময়িক" হিসাবে স্বীকৃতি পায় । রক্ষণশীল আলোচকরা সেহেতু উত্তর-আধুনিকতা কে মান্যতা দিতে চান না, যেমন তাঁরা আভাঁ গার্দকেও স্বীকৃতি দিতে চান না । হাংরি জেনারেশন আজ বাংলা সাহিত্যপাঠের বিষয় । ছাত্রদের সেকারণে ‘আভাঁ গার্দ’ ধারণাটির সঙ্গে পরিচিত হওয়া জরুরি ।

বাংলা সাহিত্যে হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের প্রভাব : অভিজিৎ পাল

বাংলা সাহিত্যে হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের প্রভাব
অভিজিৎ পাল
বাংলা সাহিত্যে ষাটের দশকের হাংরি জেনারেশনের ন্যায় আর কোনও আন্দোলন তার পূর্বে হয় নাই । হাজার বছরের বাংলা ভাষায় এই একটিমাত্র আন্দোলন যা কেবল সাহিত্যের নয় সম্পূর্ণ সমাজের ভিত্তিতে আঘাত ঘটাতে পেরেছিল, পরিবর্তন আনতে পেরেছিল। পরবর্তীকালে তরুণ সাহিত্যিক ও সম্পাদকদের সাহস যোগাতে পেরেছে । 

১ ) হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের প্রথম ও প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো তাঁরা সাহিত্যকে পণ্য হিসাবে চিহ্ণিত করতে অস্বীকার করেছিলেন । কেবল তাই নয় ; তাঁরা এক পৃষ্ঠার লিফলেট প্রকাশ করতেন ও বিনামূল্যে আগ্রহীদের মাঝে বিতরণ করতেন । তাঁরাই প্রথম ফোলডার-কবিতা, পোস্ট-কার্ড কবিতা, ও পোস্টারে কবিতা ও কবিতার পংক্তির সূত্রপাত করেন । পোস্টার এঁকে দিতেন অনিল করঞ্জাই ও করুণানিধান মুখোপাধ্যায় । ফোলডারে স্কেচ আঁকতেন সুবিমল বসাক  । ত্রিদিব মিত্র তাঁর ‘উন্মার্গ’ পত্রিকার প্রচ্ছদ নিজে আঁকতেন। পরবর্তীকালে দুই বাংলাতে তাঁদের প্রভাব পরিলক্ষিত হয় ।

২ ) হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ অবদান প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা । তাঁদের আগমনের পূর্বে প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা করার কথা সাহিত্যকরা চিন্তা করেন নাই । সুভাষ ঘোষ বলেছেন প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার অর্থ সরকার বিরোধিতা নয়, সংবাদপত্র বিরোধিতা নয় ; হাংরি জেনারেশনের বিরোধ প্রচলিত সাহিত্যের মৌরসি পাট্টাকে উৎখাত করে নবতম মূল্যবোধ সঞ্চারিত করার । নবতম শৈলী, প্রতিদিনের বুলি, পথচারীর ভাষা, ছোটোলোকের কথার ধরণ, ডিকশন, উদ্দেশ্য, শব্দ ব্যবহার, চিন্তা ইত্যাদি । পশ্চিমবঙ্গে বামপন্হী সরকার সত্বেও বামপন্হী কবিরা মধ্যবিত্ত মূল্যবোধ থেকে নিষ্কৃতি পান নাই । শ্রমিকের কথ্য-ভাষা, বুলি, গালাগাল, ঝগড়ার অব্যয় তাঁরা নিজেদের রচনায় প্রয়োগ করেন নাই । তা প্রথম করেন হাংরি জেনারেশনের কবি ও লেখকগন ; উল্লেখ্য হলেন অবনী ধর, শৈলেশ্বর ঘোষ, সুবিমল বসাক, ত্রিদিব মিত্র প্রমুখ । সুবিমল বসাকের পূর্বে ‘বাঙাল ভাষায়’ কেউ কবিতা ও উপন্যাস লেখেন নাই। হাংরি জেনারেশনের পরবর্তী দশকগুলিতে লিটল ম্যাগাজিনের লেখক ও কবিদের রচনায় এই প্রভাব স্পষ্ট ।

৩ ) হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের তৃতীয় অবদান কবিতা ও গল্প-উপন্যাসে ভাষাকে ল্যাবিরিনথাইন করে প্রয়োগ করা । এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ মলয় রায়চৌধুরীর কবিতা ও গল্প-উপন্যাস । মলয় রায়চৌধুরী সর্বপ্রথম পশ্চিমবাংলার সমাজে ডিসটোপিয়ার প্রসঙ্গ উথ্থাপন করেন । বামপন্হীগণ যখন ইউটোপিয়ার স্বপ্ন প্রচার করছিলেন সেই সময়ে মলয় রায়চৌধুরী চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেন ডিসটোপিয়ার দরবারি কাঠামো ।উল্লেখ্য তাঁর নভেলা ‘ঘোগ’, ‘জঙ্গলরোমিও’, গল্প ‘জিন্নতুলবিলদের রূপকথা’, ‘অরূপ তোমার এঁটোকাঁটা’ ইত্যাদি । তিনি বর্ধমানের সাঁইবাড়ির ঘটনা নিয়ে রবীন্দ্রনাথের ‘ক্ষুধিত পাষাণ’ অবলম্বনে লেখেন ‘আরেকবারে ক্ষুধিত পাষাণ’ । বাঙাল ভাষায় লিখিত সুবিমল বসাকের কবিতাগুলিও উল্লেখ্য । পরবর্তী দশকের লিটল ম্যাগাজিনের কবি ও লেখকদের রচনায় এই প্রভাব সুস্পষ্ট ।

৪ ) হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের চতুর্থ অবদান হলো পত্রিকার নামকরণে বৈপ্লবিক পরিবর্তন । হাংরি জেনারেশনের পূর্বে পত্রিকাগুলির নামকরণ হতো ‘কবিতা’, ‘কৃত্তিবাস’, ‘উত্তরসূরী’, ‘শতভিষা’, ‘পূর্বাশা’ ইত্যাদি যা ছিল মধ্যবিত্ত মূল্যবোধের বহিঃপ্রকাশ । হাংরি জেনারেশন আন্দোলনকারীগণ পত্রিকার নামকরণ করলেন ‘জেব্রা’, ‘জিরাফ’, ‘ধৃতরাষ্ট্র’, ‘উন্মার্গ’, ‘প্রতিদ্বন্দী’ ইত্যাদি । পরবর্তীকালে তার বিপুল প্রভাব পড়েছে । পত্রিকার নামকরণে সম্পূর্ণ ভিন্নপথ আবিষ্কৃত হয়েছে ।

৫ ) হাংরি জেনারেশন আন্দোলনে সর্বপ্রথম সাবঅলটার্ন অথবা নিম্নবর্গের লেখকদের গুরুত্ব প্রদান করতে দেখা গিয়েছিল । ‘কবিতা’, ‘ধ্রুপদি’, ‘কৃত্তিবাস’, ‘উত্তরসূরী’ ইত্যাদি পত্রিকায় নিম্নবর্গের কবিদের রচনা পাওয়া যায় না । হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের বুলেটিনগুলির সম্পাদক ছিলেন চাষি পরিবারের সন্তান হারাধন ধাড়া । সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়সহ তৎকালীন কবিরা তাঁর এমন সমালোচনা করেছিলেন যে তিনি এফিডেভিট করে ‘দেবী রায়’ নাম নিতে বাধ্য হন । এছাড়া আন্দোলনে ছিলেন নিম্নবর্গের চাষী পরিবারের শম্ভু রক্ষিত, তাঁতি পরিবারের সুবিমল বসাক,  জাহাজের খালাসি অবনী ধর, মালাকার পরিবারের নিত্য মালাকার ইত্যাদি । পরবর্তীকালে প্রচুর সাবঅলটার্ন কবি-লেখকগণকে বাংলা সাহিত্যের অঙ্গনে দেখা গেল। 

৬ ) হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের ষষ্ঠ গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব হলো রচনায় যুক্তিবিপন্নতা, যুক্তির কেন্দ্রিকতা থেকে মুক্তি, যুক্তির বাইরে বেরোনোর প্রবণতা, আবেগের সমউপস্হিতি, কবিতার শুরু হওয়া ও শেষ হওয়াকে গুরুত্ব না দেয়া, ক্রমান্বয়হীনতা, যুক্তির দ্বৈরাজ্য, কেন্দ্রাভিগতা বহুরৈখিকতা ইত্যাদি । তাঁদের আন্দোলনের পূর্বে টেক্সটে দেখা গেছে যুক্তির প্রাধান্য, যুক্তির প্রশ্রয়, সিঁড়িভাঙা অঙ্কের মতন যুক্তি ধাপে-ধাপে এগোতো, কবিতায় থাকতো আদি-মধ্য-অন্ত, রচনা হতো একরৈখিক, কেন্দ্রাভিগ, স্বয়ংসম্পূর্ণতা । 

৭) হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের পূর্বে লেখক-কবিগণ আশাবাদে আচ্ছন্ন ছিলেন মূলত কমিউনিস্ট প্রভাবে । ইউটোপিয়ার স্বপ্ন দেখতেন । বাস্তব জগতের সঙ্গে তাঁরা বিচ্ছিন্ন ছিলেন । হাংরি জেনারেশন আন্দোলনকারীগণ প্রথমবার হেটেরোটোপিয়ার কথা বললেন । হাংরি জেনারেশনের কবি অরুণেশ ঘোষ তাঁর কবিতাগুলোতে বামপন্হীদের মুখোশ খুলে দিয়েছেন। হাংরি জেনরেশনের পরের দশকের কবি ও লেখকগণের নিকট বামপন্হীদের দুইমুখো কর্মকাণ্ড ধরা পড়ে গিয়েছে, বিশেষ করে মরিচঝাঁপি কাণ্ডের পর ।

৮ ) হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের পূর্বে কবি-লেখকগণ মানেকে সুনিশ্চিত করতে চাইতেন, পরিমেয়তা ও মিতকথনের কথা বলতেন, কবির নির্ধারিত মানে থাকত এবং স্কুল কলেজের ছাত্ররা তার বাইরে যেতে পারতেন না । হাংরি জেনারেশনের লেখকগণ অফুরন্ত অর্থময়তা নিয়ে এলেন, মানের ধারণার প্রসার ঘটালেন, পাঠকের ওপর দায়িত্ব দিলেন রচনার অর্থময়তা নির্ধারণ করার, প্রচলিত ধারণা অস্বীকার করলেন । শৈলেশ্বর ঘোষের কবিতার সঙ্গে অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের কবিতার তুলনা করলে বিষয়টি স্পষ্ট হবে ।

৯ ) হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের পূর্বে ‘আমি’ থাকতো রচনার কেন্দ্রে, একক আমি থাকতো, লেখক-কবি ‘আমি’র নির্মাণ করতেন, তার পূর্বনির্ধারিত মানদণ্ড থাকতো, সীমার স্পষ্টিকরণ করতেন রচনাকার, আত্মপ্রসঙ্গ ছিল মূল প্রসঙ্গ, ‘আমি’র পেডিগ্রি পরিমাপ করতেন আলোচক। হাংরি জেনারেশন আন্দোলনকারীগণ নিয়ে এলেন একক আমির অনুপস্হিতি, আমির বন্ধুত্ব, মানদণ্ড ভেঙে ফেললেন তাঁরা, সীমা আবছা করে দিলেন, সংকরায়ন ঘটালেন, লিমিন্যালিটি নিয়ে এলেন ।

১০ ) হাংরি  জেনারেশন আন্দোলনের পূর্বে শিরোনাম দিয়ে বিষয়কেন্দ্র চিহ্ণিত করা হতো । বিষয় থাকতো রচনার কেন্দ্রে, একক মালিকানা ছিল, লেখক বা কবি ছিলেন টাইটেল হোলডার। হাংরি জেনারেশনের লেখক-কবিগণ শিরোনামকে বললেন রুবরিক ; শিরোনাম জরুরি নয়, রচনার বিষয়কেন্দ্র থাকে না, মালিকানা বিসর্জন দিলেন, ঘাসের মতো রাইজোম্যাটিক তাঁদের রচনা, বৃক্ষের মতন এককেন্দ্রী নয় । তাঁরা বললেন যে পাঠকই টাইটেল হোলডার।

১১ ) হাংরি জেনারেশনের পূর্বে কবিতা-গল্প-উপন্যাস রচিত হতো ঔপনিবেশিক মূল্যবোধ অনুযায়ী একরৈখিক রীতিতে । তাঁদের ছিল লিনিয়রিটি, দিশাগ্রস্ত লেখা, একক গলার জোর, কবিরা ধ্বনির মিল দিতেন, সময়কে মনে করতেন প্রগতি । এক রৈখিকতা এসেছিল ইহুদি ও খ্রিস্টান ধর্মগ্রন্হের কাহিনির অনুকরণে ; তাঁরা সময়কে মনে করতেন তা একটিমাত্র দিকে এগিয়ে চলেছে । আমাদের দেশে বহুকাল যাবত সেকারণে ইতিহাস রচিত হয়েছে কেবল দিল্লির সিংহাসন বদলের । সারা ভারত জুড়ে যে বিভিন্ন রাজ্য ছিল তাদের ইতিহাস অবহেলিত ছিল । বহুরৈখিকতারে প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো ‘মহাভারত’ । হাংরি জেনারেশনের কবি-লেখকগণ একরৈখিকতা বর্জন করে বহুরৈখিক রচনার সূত্রপাত ঘটালেন । যেমন সুবিমল বসাকের ‘ছাতামাথা’ উপন্যাস, মলয় রায়চৌধুরীর দীর্ঘ কবিতা ‘জখম’, সুভাষ ঘোষের গদ্যগ্রন্হ ‘আমার চাবি, ইত্যাদি । তাঁরা গ্রহণ করলেন প্লুরালিজম, বহুস্বরের আশ্রয়, দিকবিদিক গতিময়তা, হাংরি জেনারেশনের দেখাদেখি আটের দশক থেকে কবি ও লেখকরা বহুরৈখিক রচনা লিখতে আরম্ভ করলেন ।

১২ ) হাংরি জেনারেশনের পূর্বে মনে করা হতো কবি একজন বিশেষজ্ঞ । হাংরি জেনারেশনের কবিরা বললেন কবিত্ব হোমোসেপিয়েন্সের প্রজাতিগত বৈশিষ্ট্য । পরবর্তী প্রজন্মে বিশেষজ্ঞ কবিদের সময় সমাপ্ত করে দিয়েছেন নতুন কবির দল এবং নবনব লিটল ম্যাগাজিন ।

১৩ ) ঔপনিবেশিক প্রভাবে বহু কবি নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব দাবি করতেন । ইউরোপীয় লেখকরা যেমন নিজেদের ‘নেটিভদের’ তুলনায় শ্রেষ্ঠ মনে করতেন । হাংরি জেনারেশনের পূর্বে শ্রেষ্ঠ কবি, শ্রেষ্ঠ কবিতা, শ্রেষ্ঠত্ব, বিশেষ একজনকে তুলে ধরা, নায়ক-কবি, সরকারি কবির শ্রেষ্ঠত্ব, হিরো-কবি, এক সময়ে একজন বড়ো কবি, ব্র্যাণ্ড বিশিষ্ট কবি  আইকন কবি ইত্যাদির প্রচলন ছিল । হাংরি জেনারেশন সেই ধারণাকে ভেঙে ফেলতে পেরেছে তাদের উত্তরঔপনিবেশিক মূল্যবোধ প্রয়োগ করে । তারা বিবেচন প্রক্রিয়া থেকে কেন্দ্রিকতা সরিয়ে দিতে পেরেছে, কবির পরিবর্তে একাধিক লেখককের সংকলনকে গুরুত্ব দিতে পেরেছে, ব্যক্তি কবির পরিবর্তে পাঠকৃতিকে বিচার্য করে তুলতে পেরেছে। সবাইকে সঙ্গে নিয়ে চলার কথা বলেছে । সার্বিক চিন্তা-চেতনা ও কৌমের কথা বলেছে । তাঁদের পরবর্তী কবি-লেখকরা হাংরি জেনারেশনের এই মূল্যবোধ গ্রহণ করে নিয়েছেন ।

১৪ ) হাংরি জেনারেশনের পূর্বে শব্দার্থকে সীমাবদ্ধ রাখার প্রচলন ছিল । রচনা ছিল কবির ‘আমি’র প্রতিবেদন । হাংরি জেনারেশনের কবি-লেখকরা বলেছেন কথা চালিয়ে যাবার কথা। বলেছেন যে কথার শেষ নেই । নিয়েছেন শব্দার্থের ঝুঁকি । রচনাকে মুক্তি দিয়েছেন আত্মমনস্কতা থেকে । হাংরি জেনারেশনের এই কৌম মূল্যবোধ গ্রহণ করে নিয়েছেন পরবর্তীকালের কবি-লেখকরা । এই প্রভাব সামাজিক স্তরে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ।

১৫ ) হাংরি জেনারেশনের পূর্ব পর্যন্ত ছিল ‘বাদ’ দেবার প্রবণতা ; সম্পাদক বা বিশেষ গোষ্ঠী নির্ণয় নিতেন কাকে কাকে বাদ দেয়া হবে । হাংরি জেনারেশনের পূর্বে সাংস্কৃতিক হাতিয়ার ছিল “এলিমিনেশন”। বাদ দেবার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সংস্কৃতিকে তাঁরা নিজেদের আয়ত্বে রাখতেন । হাংরি জেনারেশনের সম্পাদকরা ও সংকলকরা জোট বাঁধার কথা বললেন । যোগসূত্র খোঁজাল কথা বললেন । শব্দজোট, বাক্যজোট, অর্থজোটের কথা বললেন । এমনকি উগ্র মতামতকেও পরিসর দিলেন । তাঁদের এই চারিত্র্যবৈশিষ্ট্য পরবর্তীকালের সম্পাদক ও সংকলকদের অবদানে স্পষ্ট । যেমন অলোক বিশ্বাস আটের দশকের সংকলনে ও আলোচনায় সবাইকে একত্রিত করেছেন । বাণিজ্যিক পত্রিকা ছাড়া সমস্ত লিটল ম্যাগাজিনের চরিত্রে এই গুণ উজ্বল ।

১৬ ) হাংরি জেনারেশনের পূর্ব পর্যন্ত একটিমাত্র মতাদর্শকে, ইজমকে, তন্ত্রকে, গুরুত্ব দেয়া হতো । কবি-লেখক গোষ্ঠীর ছিল ‘হাইকমাণ্ড’, ‘হেডকোয়ার্টার’, ‘পলিটব্যুরো’ ধরণের মৌরসি পাট্টা । হাংরি জেনারেশন একটি আন্দোলন হওয়া সত্বেও খুলে দিল বহু মতাদর্শের পরিসর, টুকরো করে ফেলতে পারলো যাবতীয় ‘ইজম’, বলল প্রতিনিয়ত রদবদলের কথা, ক্রমাগত পরিবর্তনের কথা । ভঙ্গুরতার কথা । তলা থেকে ওপরে উঠে আসার কথা । হাংরি জেনারেশনের পরে সম্পূর্ণ লিটল ম্যাগাজিন জগতে দেখা গেছে এই বৈশিষ্ট্য এবং এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক প্রভাব ।

১৭ ) হাংরি জেনারেশনের পূর্ব পর্যন্ত দেখা গেছে ‘নিটোল কবিতা’ বা স্বয়ংসম্পূর্ণ এলিটিস্ট কবিতা রচনার ধারা । তাঁরা বলতেন রচনাকারের শক্তিমত্তার পরিচয়ের কথা । গুরুগম্ভীর কবিতার কথা । নির্দিষ্ট ঔপনিবেশিক মডেলের কথা । যেমন সনেট, ওড, ব্যালাড ইত্যাদি । হাংরি জেনারেশনের কবি লেখকগণ নিয়ে এলেন এলো-মেলো কবিতা, বহুরঙা, বহুস্বর, অপরিমেয় নাগালের বাইরের কবিতা । তাঁদের পরের প্রজন্মের সাহিত্যিকদের মাঝে এর প্রভাব দেখা গেল । এখন কেউই আর ঔপনিবেশিক বাঁধনকে মান্যতা দেন না । উদাহরণ দিতে হলে বলতে হয় অলোক বিশ্বাস, দেবযানী বসু, ধীমান চক্রবর্তী, অনুপম মুখোপাধ্যায়, প্রণব পাল, কমল চক্রবর্তী প্রমুখের রচনা ।

১৮ ) হাংরি জেনারেশনের পূর্বে ছিল স্হিতাবস্হার কদর এবং পরিবর্তন ছিল শ্লথ । হাংরি জেনারেশনের কবি ও লেখকগণ পরিবর্তনের তল্লাশি আরম্ভ করলেন, প্রযুক্তির হস্তক্ষেপকে স্বীকৃতি দিলেন । পরবর্তী দশকগুলিতে এই ভাঙচুরের বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয়, যেমন কমল চক্রবর্তী, সুবিমল মিশ্র, শাশ্বত সিকদার ও নবারুণ ভট্টাচার্যের ক্ষেত্রে ; তাঁরা ভাষা, চরিত্র, ডিকশন, সমাজকাঠামোকে হাংরি জেনারেশনের প্রভাবে গুরুত্ব দিতে পারলেন ।

১৯ ) হাংরি জেনারেশনের পূর্বে নাক-উঁচু সংস্কৃতির রমরমা ছিল, প্রান্তিককে অশোভন মনে করা হতো, শ্লীল ও অশ্লীলের ভেদাভেদ করা হতো, ব্যবধান গড়ে ভেদের শনাক্তকরণ করা হতো । হাংরি জেনারেশনের কবি ও লেখকরা সংস্কৃতিকে সবার জন্য অবারিত করে দিলেন । বিলোপ ঘটালেন সাংস্কৃতিক বিভাজনের । অভেদের সন্ধান করলেন । একলেকটিকতার গুরুত্বের কথা বললেন । বাস্তব-অতিবাস্তব-অধিবাস্তবের বিলোপ ঘটালেন । উল্লেখ্য যে বুদ্ধদেব বসু মলয় রায়চৌধুরীকে তাঁর দ্বারে দেখামাত্র দরোজা বন্ধ করে দিয়েছিলেন । পরবর্তীকালের লিটল ম্যাগাজিনে আমরা তাঁদের এই অবদানের প্রগাঢ় প্রভাব লক্ষ্য করি ।

২০ ) হাংরি জেনারেশনের পূর্বে ছিল ইউরোপ থেকে আনা বাইনারি বৈপরীত্য যা ব্রিটিশ খ্রিস্টানরা হা্রণ করেছিল তাদের ধর্মের ঈশ্বর-শয়তান বাইনারি বৈপরীত্য থেকে । ফলত, দেখা গেছে ‘বড় সমালোচক’ ফরমান জারি করছেন কাকে কবিতা বলা হবে এবং কাকে কবিতা বলা হবে না ; কাকে ‘ভালো’ রচনা বলে হবে এবং কাকে ভালো রচনা বলা হবে না ; কোন কবিতা বা গল্প-উপন্যাস  উতরে গেছে এবং কোনগুলো যায়নি ইত্যাদি । হাংরি জেনারেশনের কবি ও লেখকরা এই বাইনারি বৈপরীত্য ভেঙে ফেললেন । তাঁরা যেমন ইচ্ছা হয়ে ওঠা রচনার কথা বললেন ও লিখলেন, যেমন সুভাষ ঘোষের গদ্যগ্রন্হগুলি । হাংরি জেনারেশনের কবি ও লেখকগণ গুরুত্ব দিলেন বহুপ্রকার প্রবণতার ওপর, রচনাকারের বেপরোয়া হবার কথা বললেন, যেমন মলয় রায়চৌধুরী, পদীপ চৌধুরী ও শৈলেশ্বর ঘোষের কবিতা । যেমন মলয় রায়চৌধুরীর ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতা ও ‘অরূপ তোমার এঁটোকাঁটা’ উপন্যাস । যেমন সুবিমল বসাকের বাঙাল ভাষার কবিতা যা এখন বাংলাদেশের ব্রাত্য রাইসুও অনুকরণ করছেন । হাংরি জেনারেশনের পরের দশকগুলিতে  তাঁদের এই অবদানের প্রভাব পরিলক্ষিত হয়, এবং তা সমগ্র পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের লিটল ম্যাগাজিনগুলিতে ।

২১ ) হাংরি জেনারেশনের পূর্বে ছিল আধিপত্যের প্রতিষ্ঠার সাহিত্যকর্ম । উপন্যাসগুলিতে একটিমাত্র নায়ক থাকত । হাংরি জেনারেশনের কবি ও লেখকগণ আধিপত্যের বিরোধিতা আরম্ভ করলেন তাঁদের রচনাগুলিতে । বামপন্হী সরকার থাকলেও তাঁরা ভীত হলেন না । হাংরি জেনারেশনের পূর্বে সেকারণে ছিল খণ্ডবাদ বা রিডাকশানিজমের গুরুত্ব । হাংরি জেনারেশনের কবি ও লেখকগণ গুরুত্ব দিলেন কমপ্লেকসিটিকে, জটিলতাকে, অনবচ্ছিন্নতার দিকে যাওয়াকে । যা আমরা পাই বাসুদেব দাশগুপ্ত, সুবিমল বসাক, মলয় রায়চৌধুরী, সুভাষ ঘোষ প্রমুখের গল্প-উপন্যাসে । পরবর্তী দশকগুলিতে দুই বাংলাতে এর প্রভাব পরিলক্ষিত হয় ।

২২ ) হাংরি জেনারেশনের পূর্বে গুরুত্ব দেয়া হয়েছিল গ্র্যাণ্ড ন্যারেটিভকে । হাংরি জেনারেশনের কবি লেখকগণ গুরুত্ব দিলেন মাইক্রো ন্যারেটিভকে, যেমন সুবিমল বসাকের ‘দুরুক্ষী গলি’ নামক উপন্যাসের স্বর্ণকার পরিবার, অথবা অবনী ধরের খালাসি জীবন অথবা তৎপরবতী কঠিন জীবনযাপনের ঘটনানির্ভর কাহিনি । পরবর্তী দশকগুলিতে দেখা যায় মাইক্রোন্যারেটিভের গুরুত্ব, যেমন গ্রুপ থিয়েটারগুলির নাটকগুলিতে ।

২৩ ) হাংরি জেনারেশনের কবি ও লেখকগণ নিয়ে এলেন যুক্তির ভাঙন বা লজিকাল ক্র্যাক, বিশেষত দেবী রায়ের প্রতিটি কবিতায় তার উপস্হিতি পরিলক্ষিত হয় । পরের দশকের লেখক ও কবিদের রচনায় লজিকাল ক্র্যাক অর্থাৎ যুক্তির ভাঙন অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠেছে । যেমন সাম্প্রতিক কালে অগ্নি রায়,  রত্নদীপা দে ঘোষ, বিদিশা সরকার, অপূর্ব সাহা, সীমা ঘোষ দে, সোনালী চক্রবর্তী, আসমা অধরা, সেলিম মণ্ডল, জ্যোতির্ময় মুখোপাধ্যায়, পাপিয়া জেরিন, প্রমুখ ।

২৪ ) হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের পূর্বে রচনায়, বিশেষত কবিতায়, শিরোনামের গুরুত্ব ছিল ; শিরোনামের দ্বারা কবিতার বিষয়কেন্দ্রকে চিহ্ণিত করার প্রথা ছিল । সাধারণত বিষয়টি পূর্বনির্ধারিত এবং সেই বিষয়ানুযায়ী কবি কবিতা লিখতেন । শিরোনামের সঙ্গে রচনাটির ভাবগত বা দার্শনিক সম্পর্ক থাকতো । ফলত তাঁরা মৌলিকতার হামবড়াই করতেন, প্রতিভার কথা বলতেন, মাস্টারপিসের কথা বলতেন ।হাংরি জেনারেশন আন্দোলনকারীগণ শিরোনামকে সেই গুরুত্ব থেকে সরিয়ে দিলেন । শিরোনাম আর টাইটেল হোলডার রইলো না । শিরোনাম হয়ে গেল ‘রুবরিক’ । তাঁরা বহু কবিতা শিরোনাম র্বজন করে সিরিজ লিখেছেন । পরবর্তী দশকের কবিরা হাংরি জেনারেশনের এই কাব্যদৃষ্টির সঙ্গে একমত হয়ে কবিতার শিরোনামকে গুরুত্বহীন করে দিলেন ; সম্পূর্ণ কাব্যগণ্হ প্রকাশ করলেন যার একটিতেও শিরোনাম নেই ।
 

বুধবার

বাংলা সাহিত্যে হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের প্রভাব : অভিজিৎ পাল

বাংলা সাহিত্যে হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের প্রভাব
অভিজিৎ পাল
বাংলা সাহিত্যে ষাটের দশকের হাংরি জেনারেশনের ন্যায় আর কোনও আন্দোলন তার পূর্বে হয় নাই । হাজার বছরের বাংলা ভাষায় এই একটিমাত্র আন্দোলন যা কেবল সাহিত্যের নয় সম্পূর্ণ সমাজের ভিত্তিতে আঘাত ঘটাতে পেরেছিল, পরিবর্তন আনতে পেরেছিল। পরবর্তীকালে তরুণ সাহিত্যিক ও সম্পাদকদের সাহস যোগাতে পেরেছে । 

১ ) হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের প্রথম ও প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো তাঁরা সাহিত্যকে পণ্য হিসাবে চিহ্ণিত করতে অস্বীকার করেছিলেন । কেবল তাই নয় ; তাঁরা এক পৃষ্ঠার লিফলেট প্রকাশ করতেন ও বিনামূল্যে আগ্রহীদের মাঝে বিতরণ করতেন । তাঁরাই প্রথম ফোলডার-কবিতা, পোস্ট-কার্ড কবিতা, ও পোস্টারে কবিতা ও কবিতার পংক্তির সূত্রপাত করেন । পোস্টার এঁকে দিতেন অনিল করঞ্জাই ও করুণানিধান মুখোপাধ্যায় । ফোলডারে স্কেচ আঁকতেন সুবিমল বসাক  । ত্রিদিব মিত্র তাঁর ‘উন্মার্গ’ পত্রিকার প্রচ্ছদ নিজে আঁকতেন। পরবর্তীকালে দুই বাংলাতে তাঁদের প্রভাব পরিলক্ষিত হয় ।

২ ) হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ অবদান প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা । তাঁদের আগমনের পূর্বে প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা করার কথা সাহিত্যকরা চিন্তা করেন নাই । সুভাষ ঘোষ বলেছেন প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার অর্থ সরকার বিরোধিতা নয়, সংবাদপত্র বিরোধিতা নয় ; হাংরি জেনারেশনের বিরোধ প্রচলিত সাহিত্যের মৌরসি পাট্টাকে উৎখাত করে নবতম মূল্যবোধ সঞ্চারিত করার । নবতম শৈলী, প্রতিদিনের বুলি, পথচারীর ভাষা, ছোটোলোকের কথার ধরণ, ডিকশন, উদ্দেশ্য, শব্দ ব্যবহার, চিন্তা ইত্যাদি । পশ্চিমবঙ্গে বামপন্হী সরকার সত্বেও বামপন্হী কবিরা মধ্যবিত্ত মূল্যবোধ থেকে নিষ্কৃতি পান নাই । শ্রমিকের কথ্য-ভাষা, বুলি, গালাগাল, ঝগড়ার অব্যয় তাঁরা নিজেদের রচনায় প্রয়োগ করেন নাই । তা প্রথম করেন হাংরি জেনারেশনের কবি ও লেখকগন ; উল্লেখ্য হলেন অবনী ধর, শৈলেশ্বর ঘোষ, সুবিমল বসাক, ত্রিদিব মিত্র প্রমুখ । সুবিমল বসাকের পূর্বে ‘বাঙাল ভাষায়’ কেউ কবিতা ও উপন্যাস লেখেন নাই। হাংরি জেনারেশনের পরবর্তী দশকগুলিতে লিটল ম্যাগাজিনের লেখক ও কবিদের রচনায় এই প্রভাব স্পষ্ট ।

৩ ) হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের তৃতীয় অবদান কবিতা ও গল্প-উপন্যাসে ভাষাকে ল্যাবিরিনথাইন করে প্রয়োগ করা । এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ মলয় রায়চৌধুরীর কবিতা ও গল্প-উপন্যাস । মলয় রায়চৌধুরী সর্বপ্রথম পশ্চিমবাংলার সমাজে ডিসটোপিয়ার প্রসঙ্গ উথ্থাপন করেন । বামপন্হীগণ যখন ইউটোপিয়ার স্বপ্ন প্রচার করছিলেন সেই সময়ে মলয় রায়চৌধুরী চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেন ডিসটোপিয়ার দরবারি কাঠামো ।উল্লেখ্য তাঁর নভেলা ‘ঘোগ’, ‘জঙ্গলরোমিও’, গল্প ‘জিন্নতুলবিলদের রূপকথা’, ‘অরূপ তোমার এঁটোকাঁটা’ ইত্যাদি । তিনি বর্ধমানের সাঁইবাড়ির ঘটনা নিয়ে রবীন্দ্রনাথের ‘ক্ষুধিত পাষাণ’ অবলম্বনে লেখেন ‘আরেকবারে ক্ষুধিত পাষাণ’ । বাঙাল ভাষায় লিখিত সুবিমল বসাকের কবিতাগুলিও উল্লেখ্য । পরবর্তী দশকের লিটল ম্যাগাজিনের কবি ও লেখকদের রচনায় এই প্রভাব সুস্পষ্ট ।

৪ ) হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের চতুর্থ অবদান হলো পত্রিকার নামকরণে বৈপ্লবিক পরিবর্তন । হাংরি জেনারেশনের পূর্বে পত্রিকাগুলির নামকরণ হতো ‘কবিতা’, ‘কৃত্তিবাস’, ‘উত্তরসূরী’, ‘শতভিষা’, ‘পূর্বাশা’ ইত্যাদি যা ছিল মধ্যবিত্ত মূল্যবোধের বহিঃপ্রকাশ । হাংরি জেনারেশন আন্দোলনকারীগণ পত্রিকার নামকরণ করলেন ‘জেব্রা’, ‘জিরাফ’, ‘ধৃতরাষ্ট্র’, ‘উন্মার্গ’, ‘প্রতিদ্বন্দী’ ইত্যাদি । পরবর্তীকালে তার বিপুল প্রভাব পড়েছে । পত্রিকার নামকরণে সম্পূর্ণ ভিন্নপথ আবিষ্কৃত হয়েছে ।

৫ ) হাংরি জেনারেশন আন্দোলনে সর্বপ্রথম সাবঅলটার্ন অথবা নিম্নবর্গের লেখকদের গুরুত্ব প্রদান করতে দেখা গিয়েছিল । ‘কবিতা’, ‘ধ্রুপদি’, ‘কৃত্তিবাস’, ‘উত্তরসূরী’ ইত্যাদি পত্রিকায় নিম্নবর্গের কবিদের রচনা পাওয়া যায় না । হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের বুলেটিনগুলির সম্পাদক ছিলেন চাষি পরিবারের সন্তান হারাধন ধাড়া । সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়সহ তৎকালীন কবিরা তাঁর এমন সমালোচনা করেছিলেন যে তিনি এফিডেভিট করে ‘দেবী রায়’ নাম নিতে বাধ্য হন । এছাড়া আন্দোলনে ছিলেন নিম্নবর্গের চাষী পরিবারের শম্ভু রক্ষিত, তাঁতি পরিবারের সুবিমল বসাক, গয়লা পরিবারের সুভাষ ঘোষ, জাহাজের খালাসি অবনী ধর ইত্যাদি । পরবর্তীকালে প্রচুর নিম্নবর্গের কবি-লেখকগণকে বাংলা সাহিত্যের অঙ্গনে দেখা গেল। 

৬ ) হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের ষষ্ঠ গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব হলো রচনায় যুক্তিবিপন্নতা, যুক্তির কেন্দ্রিকতা থেকে মুক্তি, যুক্তির বাইরে বেরোনোর প্রবণতা, আবেগের সমউপস্হিতি, কবিতার শুরু হওয়া ও শেষ হওয়াকে গুরুত্ব না দেয়া, ক্রমান্বয়হীনতা, যুক্তির দ্বৈরাজ্য, কেন্দ্রাভিগতা বহুরৈখিকতা ইত্যাদি । তাঁদের আন্দোলনের পূর্বে টেক্সটে দেখা গেছে যুক্তির প্রাধান্য, যুক্তির প্রশ্রয়, সিঁড়িভাঙা অঙ্কের মতন যুক্তি ধাপে-ধাপে এগোতো, কবিতায় থাকতো আদি-মধ্য-অন্ত, রচনা হতো একরৈখিক, কেন্দ্রাভিগ, স্বয়ংসম্পূর্ণতা । 

৭) হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের পূর্বে লেখক-কবিগণ আশাবাদে আচ্ছন্ন ছিলেন মূলত কমিউনিস্ট প্রভাবে । ইউটোপিয়ার স্বপ্ন দেখতেন । বাস্তব জগতের সঙ্গে তাঁরা বিচ্ছিন্ন ছিলেন । হাংরি জেনারেশন আন্দোলনকারীগণ প্রথমবার হেটেরোটোপিয়ার কথা বললেন । 

৮ ) হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের পূর্বে কবি-লেখকগণ মানেকে সুনিশ্চিত করতে চাইতেন, পরিমেয়তা ও মিতকথনের কথা বলতেন, কবির নির্ধারিত মানে থাকত এবং স্কুল কলেজের ছাত্ররা তার বাইরে যেতে পারতেন না । হাংরি জেনারেশনের লেখকগণ অফুরন্ত অর্থময়তা নিয়ে এলেন, মানের ধারণার প্রসার ঘটালেন, পাঠকের ওপর দায়িত্ব দিলেন রচনার অর্থময়তা নির্ধারণ করার, প্রচলিত ধারণা অস্বীকার করলেন । শৈলেশ্বর ঘোষের কবিতার সঙ্গে অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের কবিতার তুলনা করলে বিষয়টি স্পষ্ট হবে ।

৯ ) হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের পূর্বে ‘আমি’ থাকতো রচনার কেন্দ্রে, একক আমি থাকতো, লেখক-কবি ‘আমি’র নির্মাণ করতেন, তার পূর্বনির্ধারিত মানদণ্ড থাকতো, সীমার স্পষ্টিকরণ করতেন রচনাকার, আত্মপ্রসঙ্গ ছিল মূল প্রসঙ্গ, ‘আমি’র পেডিগ্রি পরিমাপ করতেন আলোচক। হাংরি জেনারেশন আন্দোলনকারীগণ নিয়ে এলেন একক আমির অনুপস্হিতি, আমির বন্ধুত্ব, মানদণ্ড ভেঙে ফেললেন তাঁরা, সীমা আবছা করে দিলেন, সংকরায়ন ঘটালেন, লিমিন্যালিটি নিয়ে এলেন ।

১০ ) হাংরি  জেনারেশন আন্দোলনের পূর্বে শিরোনাম দিয়ে বিষয়কেন্দ্র চিহ্ণিত করা হতো । বিষয় থাকতো রচনার কেন্দ্রে, একক মালিকানা ছিল, লেখক বা কবি ছিলেন টাইটেল হোলডার। হাংরি জেনারেশনের লেখক-কবিগণ শিরোনামকে বললেন রুবরিক ; শিরোনাম জরুরি নয়, রচনার বিষয়কেন্দ্র থাকে না, মালিকানা বিসর্জন দিলেন, ঘাসের মতো রাইজোম্যাটিক তাঁদের রচনা, বৃক্ষের মতন এককেন্দ্রী নয় । তাঁরা বললেন যে পাঠকই টাইটেল হোলডার।

১১ ) হাংরি জেনারেশনের পূর্বে কবিতা-গল্প-উপন্যাস রচিত হতো ঔপনিবেশিক মূল্যবোধ অনুযায়ী একরৈখিক রীতিতে । তাঁদের ছিল লিনিয়রিটি, দিশাগ্রস্ত লেখা, একক গলার জোর, কবিরা ধ্বনির মিল দিতেন, সময়কে মনে করতেন প্রগতি । এক রৈখিকতা এসেছিল ইহুদি ও খ্রিস্টান ধর্মগ্রন্হের কাহিনির অনুকরণে ; তাঁরা সময়কে মনে করতেন তা একটিমাত্র দিকে এগিয়ে চলেছে । আমাদের দেশে বহুকাল যাবত সেকারণে ইতিহাস রচিত হয়েছে কেবল দিল্লির সিংহাসন বদলের । সারা ভারত জুড়ে যে বিভিন্ন রাজ্য ছিল তাদের ইতিহাস অবহেলিত ছিল । বহুরৈখিকতারে প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো ‘মহাভারত’ । হাংরি জেনারেশনের কবি-লেখকগণ একরৈখিকতা বর্জন করে বহুরৈখিক রচনার সূত্রপাত ঘটালেন । যেমন সুবিমল বসাকের ‘ছাতামাথা’ উপন্যাস, মলয় রায়চৌধুরীর দীর্ঘ কবিতা ‘জখম’, সুভাষ ঘোষের গদ্যগ্রন্হ ‘আমার চাবি, ইত্যাদি । তাঁরা গ্রহণ করলেন প্লুরালিজম, বহুস্বরের আশ্রয়, দিকবিদিক গতিময়তা, হাংরি জেনারেশনের দেখাদেখি আটের দশক থেকে কবি ও লেখকরা বহুরৈখিক রচনা লিখতে আরম্ভ করলেন ।

১২ ) হাংরি জেনারেশনের পূর্বে মনে করা হতো কবি একজন বিশেষজ্ঞ । হাংরি জেনারেশনের কবিরা বললেন কবিত্ব হোমোসেপিয়েন্সের প্রজাতিগত বৈশিষ্ট্য ।