সমীর রায়চৌধুরী লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
সমীর রায়চৌধুরী লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শুক্রবার

উত্তরাধুনিক কবিতা কাকে বলে : সমীর রায়চৌধুরী

 ভাষাতাত্বিক প্রবাল দাশগুপ্ত তাই উত্তরাধুনিকতাকে বলেছেন ‘সাজানো বাগানের পরের স্টপ’ বা ‘অধুনান্তিক’ ।

প্রবাল দাশগুপ্ত অধুনান্তিককে বলেছেন “সাজানো বাগানের পরের স্টপ” । আরও স্পষ্ট করে দিয়েছেন এই কথাগুলোতে, “কিছু কাল আগে ‘সাজানো বাগানের পরের স্টপ’ বলে একটা প্রসঙ্গ ফেঁদেছিলাম। সেই সূত্রে ভেবে বলো তো, তুমি যখন আধুনিক বিজ্ঞানের দূরবীক্ষণ আর অণুবীক্ষণ দিয়ে দূরের মহতো মহীয়ান্ আর কাছের অণোর্ অণীয়ান্ জিনিসপত্রকে যথাক্রমে কাছে টেনে আনো এবং বাড়িয়ে মাঝারি আয়তনে নিয়ে আসো যাতে তোমার নজরে তাকে ধরতে পারো, তখন তুমি আদতে কী করছ? আমি বলে দিই? জিনিসটাকে তুমি তোমার বাগে আনছ, যাতে তোমার পছন্দমতো ম্যাগনিফিকেশনে দেখতে পাও। বাগ, ইয়ানী বগীচা, ওই বাগান আর কী। তোমার সাজানো বাগানে নিয়ে আসতে পারলে তবে তুমি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলো, এইবার ধরতে পেরেছি। নীটশে যখন পাগল হয়ে যাচ্ছেন ঠিক সেই সময় দিয়ে, যতদূর মনে পড়ছে ১৮৮৯ সালে, একজন প্রখ্যাত নীটশেবিদ পণ্ডিতকে চিঠি লিখে বলেন, “আমাকে তুমি ধরতে পেরেছ ভালো করেই জানি। খুব ভালো ধরেছ। এবার আমায় ছাড়তে পারবে কি? ছেড়ে দেখাও তো?” অধুনান্তিক শেখাটা ওই ছাড়তে শেখার দস্তুর। বাগে আনা কথাটার ব্যুৎপত্তি যাঁরা জানেন তাঁরা ভুল ধরিয়ে দেবেন, সেই অপেক্ষায় আছি, পাঠক তুমি তখন ধরতে পারবে আসল উত্তরটা কী হবার কথা, আমি আগাম বলে রাখছি, তার পর ভুলে যেও না উত্তরটা ধরতে পারার পর ছাড়তে পারাও চাই, নইলে তোমার সঙ্গে আকাশের সংযুক্তি ছিঁড়ে যাবে, পড়ে থাকবে খালি আধুনিকবাদের যুক্তি, দেখবে যে মাটির সঙ্গে একেবারেই আকাশের কোনো যোগ নেই তাকে আর মাটি বলে চিনতেই পারছ না, মনে হচ্ছে ছাই। চারিদিকে অসত্য কথন, মিথ্যাচার, ক্ষমতার রহস্যাবৃত কথাস্রোত সচেতন মানুষকে দগ্ধ করে। এক আস্তিক বিপন্নতা দেখা দেয়। লেখার মাধ্যমে সে তার কথন বিশ্বকে ব্যাপ্তি দেয়। পুনর্নির্মাণ করে তার সত্যদ্রষ্টা সত্ত্বার বহিঃপ্রকাশ। ধারণাময় এই ধরিত্রীর মাইক্রোস্তরে যতই প্রবেশ করা যায়, দেখা যায়, বহু সংকেত এমনই যে, বাস্তব জগতে বা প্রাত্যহিক কাজেকর্মে তা তেমন কাজে লাগে না। তবু তা প্রয়োজনীয় নয়, একথাও বলা যাবে না। অস্বীকার করা যাবে না, ব্যক্তি মনের সৃজন জগতের মুক্তির একটি পরিসর নির্মাণে তার ভূমিকার কথা।”

জাঁ ফ্রাঁসোয়া  লিওতার্ ‘দ্যা পােস্ট মর্ডান কন্ডিশন এ রিপাের্ট অন নলেজ’ নামক একটি বই লেখেন। লিওতার্, ইয়ুর্গেন  হাবারমাসের বক্তব্যের প্রেক্ষিতে বলেন যে, আলােকময়তা বা এনলাইটেনমেন্ট  কিছু মহাবয়ান বা মহাসন্দর্ভ বা গ্র্যান্ড ন্যারেটিভ তৈরি করেছে। এই বয়ানগুলাে প্রচণ্ড শক্তিশালী। এই আন্দোলনে যুক্তিবাদী ধারণাগুলাে যেমন, প্রগতিশীল, যুক্তিবাদী ইত্যাদি ধারণাগুলাে শক্তিমত্তা অর্জন করে। তিনি বলেন যে, এই গ্র্যান্ড ন্যারেটিভগুলাে দাবি করে যে সমগ্র বিশ্বে যা কিছু ঘটছে অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ সবকিছুর ব্যাখ্যা প্রদান করতে পারে, মূলত পারে না। লিওতারের বক্তব্য হল, বাস্তব আরাে জটিল আরাে বহুবিধ এবং সত্যও বহুবিধ। তিনি বলেন কোনাে বিশেষ সংঘাতের ক্ষেত্রে নানাবিধ যে দৃষ্টিভঙ্গি আছে তা সামনে নিয়ে আসা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। লিওতারের কথা হল, বিভিন্ন অবস্থান হতে সত্যাকে বুঝতে হবে, একটি বিষয়ে সত্য পরবর্তীতে সেটি সত্য নাও হতে পারে। লিওতারের দৃষ্টিতে পুঁজিবাদ বিবিধতা মুছে ফেলে, এটি সমরূপতা ও অখণ্ডতা তৈরির চেষ্টা চালায়। লিওতার বারবার মেটা-ন্যারেটিভ বা গ্র্যান্ড ন্যারেটিভ বা মহাবয়ানের ওপর গুরুত্বারােপ করেন। তিনি এটির প্রতি সন্দিহান। তিনি বলেছেন, এই মহাবয়ানসমূহ তাদের বিশ্বাসযােগ্যতা হারিয়ে ফেলেছে। উত্তর আধুনিকতাবাদীর দৃষ্টিভঙ্গির একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল এই বিশ্বাসহীনতা এবং বিবিধতার ওপর গুরুত্বারােপ। সত্য বহুবিধ এবং সত্য উপলব্ধিতে অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সত্য বহুবিধ হলে কবিতার সত্যও বহুবিধ হবে ।

জাঁ ফ্রাঁসোয়া বদরিয়ার বলেছেন যে,  আধুনিকতাবাদে বাস্তব এবং অবাস্তবের বিভাজন রেখা স্পষ্ট ছিল। এই দুটির মধ্যে পার্থক্য দাঁড় করানাের ক্ষেত্রে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি অত্যন্ত ক্রিয়াশীল। যেমন, ভূত দেখা, এটি বিজ্ঞান সম্মত নয় বিধায় এটা বাস্তব নয়। বদরিয়ার বক্তব্য হচ্ছে যে, বর্তমানের সমাজ জীবনে সিনেমা, টিভি, বিজ্ঞাপনের ইমেজসমূহের সর্বব্যাপী প্রভাবের কারণে বাস্তব এবং অবাস্তব, সত্যি আর কল্পিত, আসল আর নকল, উপরিতল আর গভীরতা,  এসবের স্বাতন্ত্র্য হারিয়ে গেছে। এর ফলে আমরা একটি হাইপার রিয়েল সংস্কৃতি পাই। যেখানে দুইয়ের ভিন্নতা ক্ষয়ে গেছে। যেমন, আমরা প্লাস্টিক সার্জারির কথা বলতে পারি। প্লাস্টিক সার্জারির মাধ্যমে আমরা আমাদের জন্মসূত্রে পাওয়া রূপের পরিবর্তন করে সৌম্যকান্তি বা সুন্দরী হয়ে আরেকজন হয়ে যেতে পারি। যেমন নাকটা পছন্দ হচ্ছে না, তা প্লাস্টিক সার্জারির মাধ্যমে ঠিক করে নিতে পারি। এই প্রেক্ষিতে বদরিয়া বলেন যে বাস্তব এবং পরিবেশন এই দুয়ের মধ্যে যে সুস্পষ্ট বিভাজন ছিল সেটি উত্তর-আধুনিকতার ফলে সংস্কৃতিতে, বিজ্ঞাপন, সিনেমা এসবের প্রভাবে হাওয়া হয়ে গিয়েছে। অধ্যাপক ইহাব হাসান একটি বিকল্প জ্ঞানভাষ্য এবং সমালােচনার মাধ্যম হিসেবে উত্তরাধুনিকতাকে  মানতে চান। তিনি যে উত্তরাধুনিকতাবাদের কথা বলতে চান তাতে উইলিয়াম ব্লেক, ডি সাদ; একটা সময়ের পাউন্ড, জয়েস, দাদা, স্যুরিয়ালিজম বা পরাবাস্তববাদ, নব্য ফরাসি উপন্যাসের ধারা, জেনে, বিট আন্দোলন, জনপ্রিয় সাহিত্যকে অন্তর্ভুক্ত করতে চান।

অধুনান্তিক পত্রিকা “হাওয়া৪৯”-এর সম্পাদক সমীর রায়চৌধুরী আধুনিক কবিতা আর অধুনান্তিক কবিতার বৈশিষ্ট্য এইভাবে চিহ্ণিত করেছেন : -

আধুনিক কবিতা : যুক্তির প্রাধান্য, যুক্তির প্রশ্রয়, সিঁড়ি ভাঙা অঙ্কের মতো যুক্তি ধাপেধাপে এগোয়, কবিতায় আদি-মধ্য-অন্ত এই ভাবগুলো বজায় থাকে, একরৈখিক, ক্রমঅগ্রসর, কেন্দ্রাভিগ, যুক্তির দিকে কবিতার অভিমুখ, আঁটোসাঁটো, স্বয়ংসম্পূর্ণ, বদ্ধসূচনা, বদ্ধ আঙ্গিক, বদ্ধ সমাপ্তি, ডিসটোপিয়া, সুনিশ্চিত মানে, পরিমেয়তা ও মিতকথনের প্রতি গুরুত্ব, কবির ঠিক করে দেয়া মানে, স্হাবর, তলে-তলে মানে, বাইরে মুখোশ, ‘আমি’ পাঠবস্তুর কেন্দ্রে, ‘আমি’র নির্মাণ, একক ‘আমি’, পূর্ব নির্ধারিত মানদন্ড, ক্যানন দাঁড় করানো, সীমা স্পষ্ট, আত্মপ্রসঙ্গই মূল পপসঙ্গ, শুদ্ধতা, ‘আমি’র পেডিগ্রি বা কুলজি, একক মালিকানা, স্পষ্ট মালিকানা, গোপন গভীরে শিকড়, কবিই টাইটেল হোলডার, লিনিয়ার, লিনিয়রিটি, দিশাগ্রস্ত, একক গলার জোর, একমুখী প্রগতি, ধ্বনি মেলান কবি, কবি একজন বিশেষজ্ঞ, শ্রেষ্ঠত্ব, শ্রেষ্ঠ কবিতা, চার্ট টপার কবি, একজনকে তুলে ধরা, হিরো কবি, গুরু কবি, এক সময়ে একজনই বড়ো, ব্র্যাণ্ড নেম কবি, আইকন, কথার খেলাপ, প্রতিশ্রুতিভঙ্গ, শব্দার্থকে সীমাবদ্ধ রাখা, কবির ‘আমি’র প্রতিবেদন, বাদ দেবার প্রবণতা, এলিমিনেশন, একটিমাত্র মতাদর্শ, ইজম, হাইকমাণ্ড, পলিটব্যুরো, নিটোলো কবিতা, শক্তিমত্তার পরিচয়, কবিতার নির্দিষ্ট মডেল যেমন সনেট ওড ব্যালাড ইত্যাদি, কবিকে প্রকৃতির বাইরে সংসাস্কৃতিক জীব মনে করা, প্রতীকের প্রাধান্য, প্রতীকের চমৎকারিত্ব, ঘুরিয়ে বলা, স্হিতাবস্হার কদর, নাক উঁচু সংস্কৃতি, প্রান্তিককে অশোভন মনে করা, শ্লীল ও অশ্লীল ভেদাভেদ, ব্যবধান তৈরি করা, ভালো কবিতা-খারাপ কবিতার বাইনারি বৈপরীত্য, উতরে যাওয়া কবিতা, খণ্ডবাদী, রিডাকশানিজম, অবচ্ছিন্নবোধ, কেন্দ্রিকতায় উদ্ভূত, কবিতার শিরোনামের গুরুত্ব, প্রতিভা, মাস্টারপিস, ক্ষমতার মসনদ গঠন, মৌলিকতার হামবড়াই, একটিমাত্র বার্তার বাহক, কবিতার লক্ষ্য অব্যর্থ, কবির ব্যক্তিসত্তার বিবেচন, আধিপত্যের প্রতিষ্ধঠা, বৃক্ষশাখার মতন ইনটারলিংকড।

উত্তরাধুনিক কবিতা : যুক্তিবিপন্ন, যুক্তির কেন্দ্রিকতা থেকে মুক্তি, যুক্তির বাইরে বেরোবার প্রবণতা, আবেগের সমউপস্হিতি, কবিতার শুরু হওয়া আর শেষ হওয়াকে গুরুত্ব না দেওয়া, ছেতরানো, ক্রমান্বয়হীন, আবেগ-যুক্তির দ্বৈরাজ্য, কেন্দ্রাভিগ, এলোমেলো দেখায়, দ্বৈরাজ্যের দিকে কবিতার অভিমুখ, মুক্ত সূচনা, মুক্ত আঙ্গিক, মুক্ত সমাপ্তি, হেটেরোটোপিয়া, মানের নিশ্চয়তা এড়িয়ে যাওয়া, অফুরন্ত মানে, যা ইচ্ছা তা মনে করে নিতে পারেন পাঠক, মানের ধারণার প্রসার, প্রচলিত মত অস্বীকার, যা আছে তা লোনোর দরকার নেই, স্বচ্ছতা, ভিতর-বাহির আলাদা নয়, একক ‘আমি’র অনুপস্হিতি, ‘আমি’র বন্ধুত্ব, ক্যানন থেকে বেরিয়ে যাওয়া, সীমা আবছা, সীমায় ভাঙন, মিশ্রতা, লিমিনালিটি, সংকরায়ন, সংকরত্ব, মালিকানার রুবরিক, মালিকানার বহুত্ব, মালিকানা বিপন্ন, মালিকানা বিসর্জন, পাঠকই টাইটেল হোলডার, শেকড় ছড়িয়ে পড়া, রাইজোম্যাটিক, প্লুরালিজম, বিদিশাগ্রস্ত বহুস্বরের আশ্রয়, দিগ্বিদিকে গতিময়, অ্যাক্টিভিস্ট, জগৎ আয়োজনের মেলবন্ধন উসকে দেন, কবিত্ব হোমোসেপিয়েন্সের প্রজাতিগত বৈশিষ্ট্য, বিবেচন-প্রক্রিয়া থেকে কেন্দ্রিকতা সরিয়ে দেয়া, পাঠকৃতি বিচার্য - কবি নয়, সার্বিক চিন্তা-চেতনা, কথা চালিয়ে যাওয়া, কথার শেষ নেই, শব্দার্থের ঝুঁকি, আত্মমনস্কতা থেকে কবিতার মুক্তি, জোটবাঁধা, যোগসূত্র খোঁজা, শব্দজোট, মর্মার্থজোট, বহুমতাদর্শের পরিসর, বাক্যজোট, প্রতিনিয়ত রদবদল, ক্রমাগত পরিবর্তণ, ভঙ্গুরতার স্বীকৃতি, জীবন থেকে উঠে আসা ধারণা, বহুরঙা, অপরিমেয় নাগাল, নির্দিষ্টতার বাইরে, প্রতীকবর্জন, সরাসরি বলা,পরিবর্তনের তল্লাশি, প্রযুক্তির স্বীকৃতি, সাংস্কৃতিক বিভাজন বিলোপ, অভেদের সন্ধান, একলেকটিক, বাস্তব-অতিবাস্তব-অধিবাস্তবের ব্যবধান বিলোপ, যেমন ইচ্ছা হয়ে ওঠা কবিতা, বহুপ্রকার প্রবণতা গ্রাহ্য, কবি পরোয়াহীন, কমপ্লেকসিটি, জটিলতা, অনবিচ্ছিন্নতার দিকে, প্রান্তিকতায় উদ্ভূত, মাইক্রোন্যারেটিভ, সাময়িক প্রত্যয়, তত্বের বৈভিন্ন্য অনুশীলন, কবিতা ফ্লাক্স থেকে উপজাত, কাইনেটিক, কেন্দ্রিয় বিষয়ের অনুপস্হিতি, কবিতার শিরোনাম গুরুত্বহীন, প্রান্তিক শব্দ, আঞ্চলিক শব্দ, পথচলতি অভিব্যক্তি, একসঙ্গে বহু কন্ঠস্বর, বার্তার বহুলতা ও বার্তা বর্জন, আধিপত্যের বিরোধিতা, ছবি ও লাইন ঘাসের মতন ইনটারলকড, সংজ্ঞার সীমা ছাপিয়ে যাওয়া ।


আমরা পেয়েছি শিবনারায়ণ রায়কে, যিনি বলেছিলেন,   “ভাবতে হবে, চিন্তা করতে হবে, সেইসঙ্গে পড়াশোনাও করতে হবে প্রচুর। তাহলেই সবটা মিলিয়ে নতুন নতুন পথ হাজির হবে আমাদের সামনে”। তবুও শিক্ষা ও সুযোগের অভাবে বাংলা সাহিত্যে সুররিয়ালিজমের প্রভাব যথাকালে আসেনি। অথচ এ তো ভারতবর্ষেরই। সুররিয়ালিজমের মূল খুঁজতে অনেক চলে গেছেন প্রাচীন গ্রিসে যেখানে ডেফির দেবতা সক্রেটিসকে বলেছিলেন, নিজেকে জানো। কিন্তু তারও বহু আগে আমরা শুনেছিলাম আত্মানং বিদ্ধি। ধ্যানের সাহায্যে অপরলোকে উত্থান, শরীর ছাড়িয়ে গিয়ে দৈববাণী শ্রবণ, বেদ যে কারণে অপৌরুষেয়, অ্যালকেমির সমান্তরাল তান্ত্রিক উপাসনা ইত্যাদি। কিন্তু সাহিত্যে আমরা এগুলো ভুলে গেছি অনেকদিন, সম্ভবত ইংরেজদের প্রভাবে। সারা পৃথিবীর সচেতন লেখকদের মধ্যে এমন বোধহয় একজনও নেই— যিনি সুররিয়ালিজমকে পুরোপুরি অস্বীকার করতে পেরেছেন।   জীবনানন্দ দাশের কবিতায় পরাবাস্তবতার অসাধারণ প্রয়োগ দেখতে পাই। যাঁরা জীবনানন্দের কবিতা বুঝতে পারতেন না তাঁদের পরাবাস্তব আন্দোলনের কথা জানা ছিল না।

আধুনিক কবিতার পরের কালকন্ডে যে ধরণের কবিতা আর গল্প লেখা আরম্ভ হলো সেগুলোকেই উত্তরাধুনিক বলা যায়। একটি কবিতা উত্তরাধুনিক ফর্মে হতে হলে যেসব মানদন্ডে উত্তীর্ণ হতে হয়—তা নিয়ে হয়তো তর্ক আছে। এক পক্ষ বলেন অঙ্কের হিসাব কষে বা বৈজ্ঞানিক উপাত্ত ধরে নির্ধারিত ছকে একজন কবি কবিতা আর গল্প-উপন্যাস লেখেন না। ঠিক বিপরীত কথা বলছেন কেউ কেউ।  তথাকথিত ছক থেকে কবিতাকে মুক্ত করে সাবলিলভাবে বেড়ে উঠতে দেয়াই উত্তরাধুনিকতা। এতে অন্যের প্রভাব চাপিয়ে দেয়ার প্রবণতা থাকে না। এতে শেকড়ের টান ও নিজস্বতার প্রভাবকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।

উত্তরাধুনিকতা হলো একটি আভাঁগার্দ বহুরৈখিক পথ । আভাঁগার্দ মানে ‘অ্যাডভান্স গার্ড’ বা ‘ভ্যানগার্ড’, আক্ষরিক অর্থে ‘ফোর-গার্ড’, ভাবকল্পটি এমন একজন ব্যক্তি বা কাজ যা শিল্প, সংস্কৃতি বা সমাজের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয় যা পরীক্ষামূলক, নতুন বা অপ্রথাগত। কাজগুলো প্রথমদিকে নান্দনিক উদ্ভাবন এবং প্রাথমিক অগ্রহণযোগ্যতা দ্বারা চিহ্নিত করা হতো । আভাঁগার্দ শব্দটা, মূলত ফরাসি সামরিক বাহিনীতে ব্যবহৃত একটি শব্দ ছিল । এই  সামরিক রূপকটি সাহিত্য-শিল্পের ক্ষেত্রে প্রয়োগ আরম্ভ হলো, বাণিজ্যিক, প্রাতিষ্ঠানিক, প্রথানুগত লেখালিখি থেকে পার্থক্য চিহ্ণিত করার জন্য । শব্দটি সেনাবাহিনীর সামনের জওয়ানদের নির্দেশ করে, যারা যুদ্ধক্ষেত্রে সবচেয়ে প্রথমে শত্রুদের মুখোমুখি হয় এবং যারা পরে আসে তাদের জন্য পথ প্রশস্ত করে । অর্থাৎ আভাঁগার্দ বলতে বোঝায়, সাহিত্য-শিল্পের ক্ষেত্রে, যাঁরা সমসাময়িক কালখণ্ড থেকে এগিয়ে । বলা বাহুল্য যে তাঁরা আক্রান্ত হবেন এবং তার জন্য তাঁরা নিজেদের সেইমতো প্রস্তুত করেন, এরকম মনে করা হয় । তবে বিবর্তনমূলক অর্থে নয়।  কারণ এটি বুর্জোয়া সমাজে সাহিত্য-শিল্পের মূল নীতি সম্পর্কে আমূল প্রশ্ন তোলে, যে বক্তব্যটি হলো এই যে, ব্যক্তি-একক  বিশেষ সাহিত্য-শিল্পের কাজের স্রষ্টা বা ব্র্যাণ্ড, পুঁজিবাদী কাঠামোয় বিক্রয়যোগ্য । আভাঁগার্দ ভাবকল্পটি সর্বদা প্রয়োগ করা হয়েছে তাঁদের ক্ষেত্রে যাঁরা বুর্জোয়া এস্টাব্লিশমেন্টের স্থিতাবস্থাকে চুরমার করে যারা এগিয়ে যাবার কথা বলেন । কবি বা শিল্পী কী বলিতেছেন নয়, কবিতা বা শিল্পটি কী করিতেছে, এটাই হলো আভাঁগার্দের নবায়ন ।

আভাঁগার্দ কবিতা তার আগেকার অন্যান্য কবিদের কাব্যাদর্শ  প্রত্যাখ্যান করে এগোয় এবং পরিবর্তে নতুন এবং উত্তেজনাপূর্ণ বাকপথের সন্ধান করে । অর্থাৎ আভাঁগার্দ সাহিত্য-শিল্পের মনোবিজ্ঞান এবং আদর্শে, ঐতিহাসিকভাবে বিবেচনা করা হয় যে ( হেগেলীয় এবং মার্কসবাদীদের দৃষ্টিভঙ্গি যাকে ঐতিহাসিক দ্বান্দ্বিকতা বলবেন), ভবিষ্যতবাদী প্রকাশের প্রতিনিধিত্ব করেL তাই বলতে গেলে, একটি ভবিষ্যদ্বাণীমূলক এবং ইউটোপিয়ান পর্যায়, আভাঁগার্দের বিচরণক্ষেত্র। ব্যাপারটাকে অনেকে মনে করেন, আভাঁগার্দ নিজেই বিপ্লব না হলেও তা ঘোষণা এবং বিপ্লবের জন্য একটি প্রস্তুতি। একইভাবে ছবি আঁকা আর ভাস্কর্যের নবায়ন করে আভাঁগার্দ । উদ্ভাবন ব্যাপারটা আভাঁগার্দ কাজের কেন্দ্র । ফলত, অনেকসময়ে, আভাঁগার্দ লেখা সম্পূর্ণ নতুন, দুর্বোধ্য, দুরূহ, মজার এবং প্রায়শই সমসাময়িক পাঠকদের দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হয়। কবি বা শিল্পী তার ফলে হতাশ হন না, ঠিক যেমন যুদ্ধক্ষেত্রে ঘটে, পেছিয়ে আসার প্রশ্ন ওঠে না । মরে যাবে জেনেই  আভাঁগার্দ জওয়ানরা শত্রুনিধনে বেরোয় । কখনও কখনও কবি বা শিল্পীরা, যাঁরা আভাঁগার্দ  থিমের সাথে জড়িত, তাঁদের অবদানের জন্য স্বীকৃতি পেতে কয়েক দশক লেগে যায় কিংবা শেষ পর্যন্ত স্বীকৃতি নাও পেতে পারেন । ক্রমশ আভাঁগার্দ সাহিত্য-শিল্প মূলধারার অংশ হয়ে যায় এবং অবিশ্বাস্যভাবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তাই দেখা যায়, একদা যে ডাডাবাদী কাজগুলো আভাঁগার্দ হইচই হিসাবে নিন্দিত হয়েছিল তা প্রয়োগ করছে বিজ্ঞাপনের এজেন্সিগুলো । প্রাথমিকভাবে সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে যা আদর্শ বা স্থিতাবস্থা হিসেবে বহুকাল যাবত গ্রাহ্য, তার সীমানা অতিক্রম করে আভাঁগার্দ সাহিত্য-শিল্প । আভাঁগার্দকে  কেউ কেউ আধুনিকতার শেষ বৈশিষ্ট্য বলে মনে করেন যার হাত ধরে উত্তরাধুনিকতা প্রবেশ করেছে । অনেক শিল্পী  আভাঁগার্দ আন্দোলনের সাথে যুক্ত করে নিজেদের কাজকে উত্তরাধুনিক হিসাবে চিহ্ণিত করেছেন । ‘শ্রুতি’ আন্দোলনের কবি সজল বন্দ্যোপাধ্যায় আমেরিকার ল্যাঙ্গুয়েজ পোয়েটদের বহু আগে উত্তরাধুনিক কবিতা লিখেছিলেন ।


প্রাগুক্ত বইতে তপোধীর ভট্টাচার্য বলেছেন, “সাহিত্যিকতার সংগঠনে উপস্থাপনার কত বহুমুখী তাৎপর্য হতে পারে এবং পাঠকৃতির নির্মিতিতে অন্তর্বয়ন ও পরাপাঠের গুরুত্ব কত বেশি,এ সম্পর্কে তারা আমাদের সচেতন করে দিয়েছেন । কোনও যথাপ্রাপ্ত বাস্তবতার পুনরুখাপন করাই শিল্প নয়। ভাষার বহুস্বরিক বিন্যাস ও প্রতিন্যাসের মধ্য দিয়ে বাস্তব অহরহ পুননির্মিত হয়। যে-অনুপাতে ভাষা নতুন হয়ে ওঠে, ঠিক সেই অনুপাতে শিল্পকেও মৌলিক বলতে পারি । এইজনো সৃষ্টি ও নির্মাণের দ্বন্ধ। আর, এই ধারণাও এখন অচল যে নব নব উন্মেষশালিনী প্রতিভার অধিকারী শুধু লেখক এবং পাঠক কেবল নিস্ত্রিয় ভোক্তা। রোর্লা বার্ত তার বিখ্যাত 5/7, বইতে বাচনিক নন্দনের নতুন পর্যায়ের সুচনা করেছেন। বালজাকের “সারাসিন' এর আলোচনা প্রসঙ্গে তিনি পাঠককেন্দ্রিকতা ও লেখককেন্দ্রিকতার নতুন সংজ্ঞা ও বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছেন। ভাষা থেকে অর্থের উদ্তাসনে যেখানে উৎপাদন প্রক্রিয়ার ওপর বেশি গুরুত্ব আরোপ করা হয়, সেখানে পাঠক সব্তিয় না হয়ে পারে না। স্বভাবত ভাষার অভিব্যক্তিতেও তার ছাপ পড়তে বাধ্য । কিন্তু যেখানে পাঠকৃতিকে আমরা নিষ্ক্রিয় পাঠক হিসেবে গ্রহণ করি, সেখানে ভাষাতেও অর্থাৎ অর্থবোধে সক্রিয়তার বিদ্যুৎস্পর্শ দেখা দিতে পারে না। যেখানে পাঠকের সক্রিয় সহযোগিতা আবশ্যিক সেখানে লিখন-প্রক্রিয়া কার্যত লেখক থেকে পাঠকের কাছে সরে যায়।”...”সংস্কৃতি ও বর্বরতার দ্বান্বিকতা কিংবা অমঙ্গলবোধ সম্পর্কিত চুড়ান্ত চেতনা কীভাবে সাংস্কৃতিক সমালোচনা-ধারাকে প্রভাবিত করে, এসম্পর্কে আডোর্নোর মন্তব্য নিঃসন্দেহে আমাদের ভাবায়। আউস্হিৎস সভ্যতার ইতিহাসে নিঃসন্দেহে বিপুল গুরুত্বসম্পন্ন জলবিভাজন রেখা । এই রেখার ওপারে যারা রয়েছে, কবিতা লেখা তাদের কাছে বর্বরতার অভিজ্ঞান কেন-_ তা তলিয়ে ভাবতে হয়। সৃষ্টির জ্ঞানও ধবস্ত হয়ে যাচ্ছে সার্বিক বিনষ্টির গাঢ়তম ছায়ার অভিঘাতেঃ তাই কবিতার মতো সূক্ষ্ম সংবেদনশীল শিল্পমাধ্যম এখন নিরাশ্রয়। তবে এই কথাগুলিকে আক্ষরিকভাবে গ্রহণ করা সমীচীন কি না, এই প্রশ্ন উঠে তাইযন্ত্রণাময় আত্মসমালোচনার সুত্রে বাচনিক আতিশয্য অনিবার্ধ হয়ে পড়েছিল। হয়তো শিক্পকর্মকে কেউ কখনো ইতিহাস-নিরপেক্ষ বলে ভাবতে না পারে ।”...”প্রতিটি পাঠকৃতি মানে সিসিফাসের পুনর্নবীকৃত উদ্যম; বয়ানের ভেতরে প্রচ্ছন্ন থাকে তাৎপর্যের গভীরে পৌছানোর সোপানমালা। অধ্যবসায়ী শিল্পরসিক পাঠক/দর্শক ছাড়া অন্য কেউ তাদের আবিষ্কার করতে পারেনা ।”

আধুনিকতাবাদীদের পরের কবিরা, যাঁদের ষাট-সত্তর-আশি-নব্বই দশকের কবি বলা হয় তাঁদের কবিতায় বক্তব্য আছে, কিন্তু বক্তব্য নিয়ে নিশ্চিত হওয়া চলে না। কবিতাজুড়েই চলে দ্বিরুক্তিবদাভাস, শ্লেষ ও কূটাভাসের খেলা। পরিচিত পরিমণ্ডলের বাইরে থেকেও তাঁরা নিজস্ব অভিজ্ঞতা থেকে আহরণ করেন উপমা উৎপ্রেক্ষা ও রূপক, মিথ ও মেটাফর। অনেক কঠিন সমাজ বাস্তবতার কথা বললেও তাঁদের কবিতার ভাষা অধিক সম্ভাবনা তৈরি করে । বস্তুত আধুনিকতাবাদীদের পরবর্তী কবিদের অনেকে নিজের সময়কে দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করেছেন।

মঙ্গলবার

সমীর রায়চৌধুরী সম্পর্কে অলোক গোস্বামী

 


  • লং লিভ আলিবাবা
    অলোক গোস্বামী
    ২০০৩ তে শিলিগুড়ি থেকে শুরু করেছিলাম ‘গল্পবিশ্ব ’পত্রিকা সম্পাদনা করা। নামকরণেই মালুম হওয়াটা স্বাভাবিক যে ওটা ছিল গল্প পত্রিকা। তবে নিছকই গল্প ছাপাছাপিতে সীমাবদ্ধ ছিলনা সেই প্রচেষ্টা, গল্প সংক্রান্ত আলোচনাও প্রাধান্য পেত সেখানে। ‘ডার্করুম’ বিভাগে থাকতো লেখকদের গল্প বিষয়ক চিন্তাভাবনা। কয়েকটি সংখ্যায় প্রকাশ করেছিলাম বর্হিবঙ্গের বাংলা গল্প চর্চার আলোচনাও। অর্থাৎ বাংলা ছোট গল্পের সাম্প্রতিকতম চিত্রটা তুলে ধরার কাজে আমাদের প্রচেষ্টা ছিল আন্তরিক।
    তো, পরপর পাঁচটি সংখ্যা প্রকাশিত হওয়ার পর ২০০৮ তে ষষ্ঠ সংখ্যার বিষয় বেছে ছিলাম-ব্যতিক্রমী সাহিত্য। কারণ হিসেবে সম্পাদকের কলামে লিখেছিলাম--“ব্যতিক্রমী সাহিত্য-এই অভিধাটির সঙ্গে বাংলা সাহিত্যের পাঠকদের দীর্ঘ দিনের পরিচয়। এই তকমা কবে চালু হয়েছিল কে জানে! তবে এটি আবিষ্কারের মূল কৃতিত্ব যে গবেষক তথা আলোচকদের সে কথা বলা বাহুল্য মাত্র। কিছু লেখকের ক্ষেত্রে উক্ত অভিধাটি প্রয়োগ করে আমাদের চিনিয়ে দিয়েছেন উনি/ওঁরা ব্যতিক্রমী সাহিত্যিক। সাহিত্যের মূলস্রোতের বিপরীতে তাদের অবস্থান।
    এই বিভক্তিকরণ আমরা অর্থাৎ পাঠকেরা নির্বিচারে মেনেও নিয়েছি। এই বিভক্তিকরণের পদ্ধতি তথা প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কখনই প্রশ্ন তুলিনি। পাঠকদের কথা বাদ দিয়েও বলা যায়, উক্ত লেখকদেরও যে এহেন বিভক্তিকরণে যে আপত্তি রয়েছে তেমন কোন প্রমাণ চোখে পড়েনি। অথচ প্রশ্ন ওঠাটা স্বাভাবিক ছিল, কোনটা ব্যতিক্রমী সাহিত্য? কোন নিরিখে ব্যতিক্রমী--বিষয়,নাকি ভাষা,নাকি বাণিজ্যিক মাপকাঠিতে? নাকি ওই বিশেষণ চালু করার পেছনে থোড়-বড়ি-খাড়া সমৃদ্ধ বাজার চালু ফর্মুলাটিকে বাঁচিয়ে রাখার কোনো গূঢ় অভিসন্ধি রয়েছে!
    এমন প্রশ্ন ওঠাটাও অস্বাভাবিক ছিলনা যে কোনটা তবে মূলস্রোতের সাহিত্য? যে নদীটির তীরে সাহিত্য সংস্কৃতি বিকশিত হয়েছিল সেই সরস্বতীই যখন লুপ্ত হয়ে গিয়েছে,যখন আদি গঙ্গার অপর নাম টালি নালা তখন ‘মূলস্রোত’ বিশেষণটিও কি নিছক শব্দ জঞ্জাল নয়?”
    আমার মতো আরও অনেক পাঠকের সংশয় দূর করার জন্য ওই সংখ্যায় প্রকাশ করেছিলাম বেশ কিছু প্রবন্ধ এবং গল্প। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে চালু থাকা ওরকম একটা আখাম্বা বিশেষণের জন্য শুধু এটুকুই যে যথেষ্ট নয় সেটা বিবেচনা করে প্রয়োজন অনুভব করেছিলাম এমন এক ব্যক্তিত্বকে নিয়ে ক্রোড়পত্র প্রকাশ করার যার চিন্তা ভাবনা বাজার নির্দিষ্ট নয়। যিনি সাহিত্যের বিভিন্ন প্রবণতা বিষয়ে সম্যক ধারণা রাখেন। যিনি যতটা ভাবতে পারেন,ভাবিয়ে তুলতে পারেন তারচে’ও বেশী। আলোচনা প্রসঙ্গে যিনি কোনো ব্যক্তিগত অসূয়ার ধার ধারেন না। যার কাছে কোনো রচনাই অপ্রাসঙ্গিক নয়।
    বন্ধুরা যথারীতি আমার ওই আকাঙ্খাকে মহতি আহ্লাদ হিসেবে ধরে নিয়েছিলেন। সেটাই স্বাভাবিক, কেননা তাদের খোঁজে তেমন কোনো উপযুক্ত ব্যক্তিত্ব ছিল না যা কিনা আমার ছিল। সমীর রায়চৌধুরী। আমি জানতাম গল্পবিশ্বের ওই সংখ্যায় সমীর রায়চৌধুরীকে নিয়ে ক্রোড়পত্র প্রকাশ করা কতটা অনিবার্য।
    আমার এহেন প্রস্তাবনায় সেদিন অনেকেই ভ্রু কুঁচকে ছিলেন, হঠাৎ সমীর রায়চৌধুরীকে নিয়ে কেন! কী লিখেছেন ভদ্রলোক? কী দাম আছে ওঁর কথাবার্তার? থান ইঁট মার্কা উপন্যাস আছে? ঝুলিতে মেডেল,আকাদেমী চেয়ার, পার্টি মেম্বরশিপ, এনি থিং?
    যাদের হাংরি সংক্রান্ত কেচ্ছাতিহাস জানা ছিল তারা মুচকি হেসে বলেছিলেন,“উনি তো জাস্ট মলয় রায়চৌধুরীর দাদা! আর কী আছে ওঁর? কখনো সুনীল শিবিরে কখনও শৈলেশ্বর শিবিরে ব্যালেন্স করে চলেছেন.।”
    না, তাদের বিস্ময় কিংবা ধ্যানধারণা আমাকে অবাক করেনি। এমন কী মন্তব্যগুলোও আহত করেনি। বরং স্বাভাবিকই মনে হয়েছিল। কেননা বছর বারো আগে আমি নিজেও তো ছিলাম ওই বিস্মিতের তালিকায়। ‘সমীর রায়চৌধুরী’--নামটার সঙ্গে আমার পরিচয়ও তো শুধু মাত্র হাংরি সাহিত্যের ইতিহাস মারফতই হয়েছিল এবং যে পদ্ধতিতে হয়েছিল সেটাকে আদৌ পরিচয় বলা যায় কিনা সন্দেহ।
    পরিচয়ের সুযোগটা ঘটলো নয়ের দশকের মাঝামাঝি। একটা পোস্টকার্ডে আচমকাই মলয় রায়চৌধুরী জানিয়ে ছিলেন,“ আমার দাদা কোলকাতার বাঁশদ্রোণীতে থাকেন। হাওয়া ৪৯ নামে একটি পত্রিকা সম্পাদনা করেন। যোগাযোগ কোরো।”
    বিশদ ঠিকানা থাকা সত্বেও তক্ষুনি যোগাযোগ করিনি। কিংবা বলা ভালো প্রয়োজন বোধ করিনি। কারণ তিনি মলয় রায়চৌধুরীর দাদা। প্রথম আলাপেই মলয়ের অহঙের সুউচ্চ রেলিং পেরুতে পারিনি। নেহাৎ ওঁর কলম দক্ষতা এবং ঐতিহাসিক গুরুত্বকে খর্ব করতে পারিনি তাই সম্পর্কটুকু বজায় রেখেছিলাম। তাবলে মলয়ের দাদার সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে কেন! যিনি কিনা আবার উচ্চ পদস্থ সরকারি কর্মি ছিলেন তাঁর অহঙ্কারও কি কম কিছু হবে? তাছাড়া কি এমন লিখেছেন ভদ্রলোক যে গাল বাড়িয়ে চড় খেয়ে আসতে হবে!
    কিন্তু সময়ের দাবীকে কে-ই পেরেছে অগ্রাহ্য করতে? মাস কয়েক পর কোলকাতা যাবার সুবাদে ঢুঁ মেরেই বসলাম সমীর রায়চৌধুরীর বাড়িতে। তাবলে আচমকা নয়। টেলিফোনে আগাম কথা বলে ওপারের কন্ঠস্বরকে রীতিমত স্ক্যান করে বুঝে নিতে চেয়েছিলাম, যাওয়াটা কতদূর সম্মানজনক হবে।
    সপরিবারে এসেছি শুনে আমন্ত্রণটাও পেয়েছিলাম সপরিবারেই কিন্তু ঝুঁকি নিতে পারিনি কেননা বিভিন্ন লেখক দাদাদের সৌজন্যে জোটা পূর্ব অভিজ্ঞতা খুবেকটা সম্মানজনক ছিল না। সুতরাং নিশ্চিন্ত হতে পারিনি টেলিফোন এবং আমার কানের বিশ্বস্ততা বিষয়ে। একা একা গিয়ে ঢুঁ মেওে আসাটাই শ্রেয় বোধ করেছিলাম।
    তখনও শহীদ ক্ষুদিরাম স্টেশান চালু হয়নি, মেট্রোর দৌড় টালিগঞ্জ অবধি। কোলকাতার অন্ধিসন্ধিও তেমন চেনা না থাকায় লাট খেতে খেতে হাজির হয়েছিলাম শ্রী রায়চৌধুরীর ব্রহ্মপুরের বাড়িতে। অনেক জমি এবং কিছু গাছপালাসহ দোতলা বাড়িটা দেখে মনে হয়েছিল ভদ্রলোক যথার্থই সাবর্ণ রায়চৌধুরীদের উত্তর পুরুষ। গেট পেরিয়ে বেশ কিছুটা ভেতরে ঢুকে কলিং বেলে বাজানোর পর যিনি বেরিয়ে এসে ছিলেন তাঁকে দেখে আমার পূর্ব ধারণাটাই পাকাপোক্ত হয়েছিল। প্রায় ছ’ফুট,নির্মেদ,টকটকে চেহারা। গোঁফদাড়ি নিখুঁত কামানো। মাথা ভর্তি কালো চুলে এক চিলতে সাদার নিখুঁত আভিজাত্য।
    স্বপরিচয় পেশ করতেই যে প্রশ্নটার সম্মুখীন হলাম সেটার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না।
    --ওরা কোথায়?
    --কে! কারা?
    --তোমার স্ত্রী,কন্যা? ওঁদেরও তো আসার কথা ছিল!
    --না, মানে ইসে, মানে হঠাৎ আমার পিসী......।
    প্রস্তুতি বিহীন মিথ্যে যে কতটা অপ্রস্তুত করার ক্ষমতা রাখে সেটা সেদিন প্রতি পদে টের পেয়েছিলাম কেননা এরপরই মে হাজির হয়েছিলেন শ্রীমতি বেলা রায়চৌধুরী এবং একই প্রশ্ন সহ।
    এবারও একই রকম ভঙ্গীতে মিথ্যে সংবাদ পেশ করেছিলাম, তবে ততক্ষণে যেটুকু সপ্রতিভতা জোগার করতে পেরেছিলাম তার ওপর নির্ভর করে বলে ফেলেছিলাম,“আছি তো কয়েক দিন, আসা যাবে না হয় ফের একদিন।”
    খোঁড়া অজুহাতটাকে ল্যংড়াতে দিলেন না রায়চৌধুরী দম্পতি, নিমিষে লুফে নিলেন,“ ঠিক আছে, কবে আসবে বলো?
    এরপর আর কথার খেলাপ করিনি। দিন দুয়েক পরই কপাল ঠুকে হাজির হয়েছিলাম স্ত্রী এবং চার বছরের কন্যা সহ। এবার ওঁদের দুজনের ঠোঁটেই চওড়া হাসি। শুরু হলো জম্পেশ গল্প গুজব। বিদায় নিয়েছিলাম নৈশাহারান্তে।
    সেই শুরু। আমার সেই চার বছরের কন্যা চব্বিশ বছুরে হওয়ার পরও সেই ধারা বহমান ছিল। এই সেদিনও শোবার ঘরের বিছানার পাশে আমরা চারজন,মশারীর ভেতর বালিশ নির্ভর সমীরদা। আলোচনা যথারীতি গড়াচ্ছে বিষয় থেকে বিষয়ান্তরে। সাহিত্য-সিনেমা-প্রেম-রাজনীতি, কী নয়! এবং যথারীতি সেদিনের আড্ডারও সমাপ্তি অধিবেশন বসেছিল ডাইনিং টেবিলে। শুধু দুটো বিষয়ে খানিকটা ভিন্নতা ছিল।
    (১) সেদিন সমীরদা এসে বসতে পারেননি ডাইনিং টেবলে, দেখাতে পারেননি গৃহিনীপণার নমুনা।
    (২) বিদায় কালে এসে দাঁড়াতে পারেননি বারান্দায়। ঘাড় উঁচু করে দেখতে পারেননি আমাদের বিদায় পর্ব।
    কারণ সমীরদা তখন শয্যাশায়ী।
    থাক সেসব ব্যক্তিগত কথা। আপাতত ফিরে যাওয়া যাক সেদিনের কথায়। তো, সেদিন সমীরদা জানতে চেয়েছিলেন আমার লেখালিখি সংক্রান্ত চিন্তা ভাবনা বিষয়ে। নিজস্ব চিন্তার খানিকটা অংশ শেয়ারও করেছিলেন। বলাবাহুল্য সেসবের অনেকটাই আমার মাথার ওপর দিয়ে বয়ে গিয়েছিল। তবে এটুকু বুঝেছিলাম, মানুষটি ভিন্ন গোত্রের। মাথায় পোকা পোষেন এবং সেগুলো যাতে ঝিমিয়ে না পড়ে তাই নিয়মিত খাদ্য জোগানও দিয়ে থাকেন। নিজস্ব ভাঁড়াড়ে টান পড়লে অন্য মাথা থেকে খাদ্য সংগ্রহ করেন। সেই সুযোগে কয়েকটি পোকা চালানও করে দিয়ে থাকেন সেই মাথায়। সেই মাথাওয়ালা মানুষটি যদি চালাক হয়ে থাকেন তবে রায়চৌধুরী বাড়ির চৌহদ্দি পেরুনো মাত্র সেই পোকাগুলোকে ঝেড়ে ফেলে দিতে কসুর করেন না।
    তবে সবাই পারে না। আমিও পারিনি। হয়তো পারতাম যদি না প্রথম আলাপেই তখনও অবধি সমীরদার একমাত্র প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ, “সিগারেটের তিরোভাব” সংগ্রহ করে না আনতাম।
    যে কোনো গল্প কিংবা কবিতা সংকলনের পাতা উল্টে প্রথমেই নাম গল্প/কবিতাটি পড়ে নেয়ার অভ্যেস আমার চিরকালের। সেই রীতি অনুসারে প্রথম পড়েছিলাম ‘সিগারেটের তিরোভাব’ গল্পটি। গল্প নাকি ধাঁধা! এর নাম গল্প! কিসের গল্প এটি, সিগারেট ছাড়ার? নাকি শিশু মনস্তত্বের? নাকি মৃত্যুর!!!
    গল্পটি যেহেতু সদ্য লেখা তাই এরপর পড়তে চেয়েছিলাম পুরোন গল্পগুলো। বুঝতে চেয়েছিলাম সমীর রায়চৌধুরীর গল্পের বাঁক বদলের ধরণ।
    সবচে পুরোন গল্প ছিল,‘স্মৃতির হুলিয়া প্রতুলের মা অমলেট অবধি।’ আমার ধারণা ছিল লম্বা টাইটেলের স্রষ্টা শুধুই সুবিমল মিশ্র কিন্তু এই গল্পটি প্রমাণ করে দিলো সেই ১৯৫৭ তেই নিয়ম ভেঙেছিলেন সমীরদা। সেই নিয়মভঙ্গ শুধু নামকরণে নয়, বিষয়েও। এখানেও সেই একই ধাঁধা, কিসের গল্প এটা? আসন্ন মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে মায়ের ছবি খোঁজা দিয়ে গল্পটি শুরু হলেও অন্তিমে সেই প্রসঙ্গ বেমালুম উধাও। মাঝখানের পর্বে পাঠককে সঙ্গী করে দৌড়ে বেরিয়েছেন এ গলি-সে গলি,এই সময়-সেই সময়। অথচ পাঠান্তে আদৌ গল্পটিকে অবান্তর ভাবা অসম্ভব। বরং নামকরণের সার্থকতা বিষয়ে নিঃসন্দেহ হতে হয়। মেনে নিতে হয়,সত্যিই তো, যে কোনো স্মৃতির যাত্রা এক সময় অমলেট পর্বে এসেই থেমে যায়। বাকি পর্বটির দখল নেয় বর্তমান তথা জীবন। যদিও এই ভাবনার জন্ম দিতে আমাকে আরও দীর্ঘ দিন সমীর সঙ্গ করতে হয়েছিল। সেদিন বরং ধাঁধিয়েই গিয়েছিলাম।
    সপ্রতিভ মানুষ যেহেতু ধাঁধাঁ পছন্দ করে না তাই নিজেকে মুক্ত করতে পরপর পড়েছিলাম,‘টিনিদির হাত,’‘দ্বিতীয় সংখ্যা,’‘অতিক্রম’,‘সমরেশ কিভাবে অপেক্ষা করে,’‘মাথার ওপরে দাদা আছেন’। সব ক’টা গল্পেরই রচনাকাল পঞ্চাশ এবং ষাটের দশক এবং সব ক’টা গল্পই আমাকে বাধ্য করেছিল ভাবতে, জন্মসূত্রে এবং জীবিকা সূত্রে বরাবর পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্য জগত থেকে দূরে থাকা মানুষটি কিভাবে খুঁজে পেল সাহিত্যের এই নতুন ভাষা যা কিনা নির্দিষ্ট ভূগোলে আবদ্ধ থাকার বদলে আন্তর্জাতিকায় পৌঁছে গিয়েছে!
    ‘আন্তর্জাতিকতা’,এই অভিধাটি মাথায় এসেছিল,‘জলছবি’ গল্পটি পড়ে। কেননা সেই ১৯৬৩ তে যে ম্যাজিক রিয়ালিটির ব্যবহার করেছিলেন সমীরদা তার সঙ্গে ভারতবর্ষের পরিচয় ঘটেছে আশির দশকে, প্রায় কুড়ি বছর পর, মার্কেজের হাত ধরে। অত দিন আগে সমীরদা কিভাবে পেয়েছিলেন ওই কৃৎকৌশলের সুলুক সন্ধান!!
    গল্পটি জন্ম দিয়েছিল অনেক ক’টি বিস্ময়ের।
    প্রথম বিস্ময় জেগেছিল এই তথ্য জেনে যে,আপাদ মস্তক কবিতা পত্রিকা,‘কৃত্তিবাস’ নিয়ম ভেঙে সেই প্রথমবার গল্প প্রকাশ করেছিল এবং সেই নিয়মভঙ্গ ঘটেছিল,‘জলছবি’-র হাত ধরেই?
    দ্বিতীয় বিস্ময়ের কারণ ছিল গল্পটির নির্বাচন। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় পড়েছিলেন গল্পটি! সত্যিই ভালো লেগেছিল! মনে হয়েছিল,ওই গল্পটি নিয়মভঙ্গের দাবী রাখে!
    তৃতীয় বিস্ময় জেগেছিল এই ভেবে যে, সুনীলবাবু যদি সত্যিই গল্পটিতে আগাম বাঁক পরিবর্তনের ইঙ্গিত লক্ষ্য করে থেকে থাকেন তাহলে নিজে,অন্ততঃ একটি গল্প, ওই ধারায় লিখলেন না কেন? সমস্ত প্লেটে ছোঁ মারা তো ওঁর প্রাচীন অভ্যেস! তবে কি বুঝতে পেরেছিলেন যে ওটা তাঁর চায়ের কাপ নয়!
    কিন্তু কে ঘোচাবে আমার ওইসব বিস্ময়! সমীর রায়চৌধুরীর মতো লেখকদের জন্য যেহেতু এ.টি.দেব কিংবা অসিত বাঁড়ুজ্জেরা থাকেন না তাই সব বিস্ময় ঘোচাতে খোদ ওঁরই শরণাপন্ন হয়েছিলাম।
    না, প্রথমে নিজের লেখার স্বপক্ষে একটি কথাও বলেননি সমীরদা। বরং অন্য প্রসঙ্গে চলে গিয়েছিলেন। শুনতে চেয়েছিলেন আমার কথা। সাহিত্য নয়, জীবনের নানান প্রসঙ্গে। খোস গল্প প্রিয় আমি সুযোগ পেয়ে ঝাঁপি খুলে বসেছিলাম। বাপের বয়সী মানুষটির মুখে প্রশ্রয়ের হাসি দেখতে পেয়ে কোনো রকম সেন্সরশীপের ধার ধারিনি। অনেক গল্পের শেষে সমীরদা বলেছিলেন,“ছোট গল্প এরকমই হবে।”
    এহেন আলটপকা মন্তব্যে অবাক হয়েছিলাম।
    --কি রকম!
    --যেভাবে এতক্ষণ গল্প করলে। যেভাবে এতক্ষণ প্রসঙ্গ থেকে প্রসঙ্গান্তরে গিয়ে তুমি নিজেকে আমার কাছে পেশ করলে, ঠিক সেই ভাবে।
    --তা কি করে হয়! উপন্যাস হ’লে তবু নাহয় কথা ছিল, ছোট গল্পে আবার তেমনটা হয় নাকি! গল্পের আদি-মধ্য-অন্ত থাকবে না?
    --না থাকবে না। জীবন তো ওভাবে পর্বে পর্বে ভাগ হয়ে আসে না, তাহলে সাহিত্য কেন হবে? সাহিত্য আর জীবন আলাদা নাকি! তাই সাহিত্যেও থাকবে মুক্ত সূচনা আর মুক্ত সমাপ্তি। তোমার গল্প দিয়ে তোমাকে কিছু বোঝানোর প্রয়োজন নেই বরং পাঠকৃতি দিয়েই পাঠক বুঝে নিক তার মতো করে। তুমি শুধু ভাবনার সংঘাতগুলো মেলে ধরো।
    আরো অনেক অনেক কথা বলেছিলেন সমীরদা। অনেক কিছ্রুই অর্থ বুঝতে পারিনি। শুধু কানে বেজেছে, ‘পোস্ট মর্ডান,’পোস্ট কলোনিয়ালিজম,‘অরৈখিক’, ‘রাইজোমাটিক,’‘কোয়ান্টাম বিজ্ঞান ভাবনা,’‘ক্যায়স,’ ইত্যাদি প্রভৃতি শব্দগুলো। শব্দগুলো আমার কাঁধে এতটাই বোঝা হয়ে চেপে বসেছিল যে ভার মুক্ত হ’তে ফোনে কথা বলেছি, ছুটে এসেছি কোলকাতায়। প্রকৃত শিক্ষকের মতো তিলে তিলে বুঝিয়েছেন সমীরদা। বোঝার সুবিধের জন্য বিভিন্ন লেখা থেকে উদাহরণ পেশ করেছেন। না, একবারের জন্যও নিজের লেখা তুলে ধরার চেষ্টা করেননি। বরং এমন লেখকদের কোট করেছেন যারা কি না সমীরদার ভিন্ন শিবিরের লোক। যদিও সমীরদার কোনো নিজস্ব শিবির ছিল না কিন্তু ওই লেখকরা তেমনই মনে করতেন। অথচ জীবনের শেষদিন পর্যন্ত সমীরদার মুখে কোনো লেখক সম্পর্কে তাচ্ছিল্য সূচক কোনো মন্তব্য শুনিনি, তা তিনি বা তাঁরা যতই হাটুরে কিংবা বাজারে লেখক হোন কিংবা সরাসরি সমীর রায়চৌধুরী বিরোধী।
    সমীরদার কথা শুনতে শুনতে ভেবেছিলাম, ধুর,আমি একা কেন ভেবে মরবো? আমার মতো তো আরও অনেকে আছেন যারা সাহিত্য নিয়ে ভাবনা চিন্তা করেন। ঐকিক নিয়মের সূত্র মেনে আমার কাঁধের বোঝাটাকে আরও দশজনের কাঁধে চালান করে দিলে কেমন হয়?
    বলা ভালো, গল্পবিশ্ব পত্রিকা আমাকে সুযোগ দিলো সেই পরিকল্পনাটাকে বাস্তবায়িত করার। কিন্তু শুধু পরিকল্পনাটাকে বাস্তবায়িত করলেই তো হবে না, সেটাকে সার্থকও করতে হবে। কিভাবে সম্ভব হবে সেটা? সর্বার্থে দীর্ঘ মানুষটিকে ক্রোড়পত্রের সামান্য কয়েকটি পৃষ্ঠায় আঁটানো কি চাট্টিখানি কথা!
    প্রথম সিদ্ধান্তটা নিয়েছিলাম--ক্রোড়পত্রে সমীর রায়চৌধুরীর কোনো গল্প মুদ্রিত হবেনা। কারণ ওঁর রচনা বিষয়ে যারা ওয়াকিবহাল নন তারা একটি কিংবা দুটি লেখা মারফৎ ওঁকে শনাক্ত করুক, তেমনটা আমার অভিপ্রেত ছিলনা। বরং পড়াতে চেয়েছিলাম সমীর রায়চৌধুরীর কথাবার্তা, সাক্ষাতকার এবং সমীর সাহিত্য বিষয়ে অন্যান্যদের চিন্তা ভাবনা। যদি কোনো পাঠক আকর্ষণ বোধ করেন তাহলে তিনি নিজ গরজেই খুঁজে নিয়ে পড়বেন সমীর রায়চৌধুরীর গল্প--চেয়েছিলাম এমনটাই। অর্থাৎ ভাবনা চালান।
    বলাবাহুল্য আমার পরিকল্পনাটাকে সর্বান্তকরণে সমর্থন করেছিলেন সমীর রায়চৌধুরী। কারণ সমীর ঘনিষ্ঠরা প্রত্যেকেই জানেন, রাশি রাশি লিখে সম্পাদকের হাতে গুঁজে দেয়ার চে তাদের সঙ্গে ঘন্টার পর ঘন্টা সাহিত্য সংক্রান্ত কথাবার্তায় কতটা আন্তরিক ছিলেন সমীরদা। কতটা আগ্রহ ছিল মত বিনিময়ে এবং বিতর্কে।
    দ্বিতীয় সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, সমীর সাহিত্য বিষয়ক লেখক তালিকায় মলয় রায়চৌধুরী থাকবেন না। কেননা আমি চেয়েছিলাম সেই সমীর রায়চৌধুরীকে যিনি স্ববলে বলীয়ান। উনি মলয় রায়চৌধুরীর দাদা, এটা নিছকই ব্যক্তিগত তথ্য হিসেবে পরিগণিত হোক।
    আমার দ্বিতীয় সিদ্ধান্তটাকে মেনে নিতে অসুবিধে হয়েছিল সমীরদার। কেননা ‘আমি’ বিরোধী ‘আমরা’ প্রিয় সমীরদার নিজের ‘হয়ে ওঠা’ নিয়ে কোনো মাথাব্যথাই ছিল না। তাছাড়াও যে সমস্যাটা প্রধান হয়ে উঠেছিল সেটা হলো ততদিনে উনি মলয় রায়চৌধুরীকে লেখার আমন্ত্রণ জানিয়ে ফেলেছিলেন। মলয়ের মতো এক প্রধাণ লেখককে আমন্ত্রণ জানানোর পর সেই আমন্ত্রণ ফিরিয়ে নেয়া যে কতটা অসম্মানজনক সেটা আমিও জানতাম। তবু নিজের সিদ্ধান্তে এতটাই অটল ছিলাম যে সমীরদা বাধ্য হয়েছিলেন আমার জেদটা মেনে নিতে। এই প্রসঙ্গে মলয় রায়চৌধুরীর ভুমিকাও যথেষ্ট ধন্যবাদ যোগ্য কেননা ব্যাপারটাকে তিনিও প্রেস্টিজ ইস্যু করেননি। আমার সিদ্ধান্তটাকে মেনে নিয়ে অন্য একটা গদ্য দিয়েছিলেন।
    সমীরদার সাহিত্যের সঙ্গে পরিচিত মুষ্টিমেয় অথচ বিশিষ্ট লেখকদের আমন্ত্রণ জানানোর পাশাপাশি অনুরোধ জানিয়ে ছিলাম বেলা রায়চৌধুরীকেও। কেননা বৌদিকে না দেখলে হয়তো ‘সহধর্মিণী’ শব্দটার ওপর ততটা আস্থাবান হোতে পারতাম না। এ প্রসঙ্গে একটা ছোট্ট নমুনা পেশ করাটা সঙ্গত বোধ করছি। এই সেদিনও, যখন ঘোর অসুস্থ সমীরদা, তখনও আমাদের গল্পগুজবে কোনো আপত্তি তোলেননি বৌদি। বরং বলেছেন,“তোমাদের সাথে কথাবার্তা বলতে পারলেই তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে উঠবে সমীর। আমি জানি এটাই ওর আসল ওষুধ।”
    সেই ক্রোড়পত্রে অন্য লেখাগুলোর পাশাপাশি প্রকাশ করেছিলাম সমীর রায়চৌধুরীর সাক্ষাতকার। অবশ্য সেটাকে সাক্ষাতকার বলাটা কতদূর সঙ্গত, সে বিষয়ে আমি আজও নিশ্চিত নই। বরং বলা ভালো সেসব ছিল একগাদা উৎপটাং প্রশ্ন, যা কিনা আম পাঠকের মনে আকছার জেগে ওঠে।
    যথারীতি বিরক্ত হননি সমীরদা। সমস্ত প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। সেসব উত্তরের সাপেক্ষে কোনো মাতব্বরকে কোট করেননি, নিজস্ব জারণ-বিজারণ মারফত পাওয়া অভিজ্ঞতা সমূহকেই পেশ করেছিলেন।
    দীর্ঘ সাক্ষাতকারটি উদ্ধৃত করা অসম্ভব এবং অহেতুক। তবু খানিকটা নমুনা পেশ করার লোভ সামলাতে পারছি না।
    --“আধুনিক গল্পবিশ্বে লেখকেরা কল্পনা করতেন স্বপ্নদেশের। সমস্ত কিছুই সেখানে ইউটোপিয়াকে কেন্দ্র কেের আবর্তিত হত। রচনার গঠনতন্ত্র, বক্তব্য,ভাষা সব ছিল ললিত,নান্দনিকতত্ত¡ দ্বারা পীড়িত। পোস্টমডার্ন কালখন্ডে প্রথমেই যা ঘটল, তাহল এই ইউটোপিয়ান কনসেপ্টের দেয়াল ভেঙে পড়া। নান্দনিকতার অপর প্রান্ত, সৌন্দর্যের অপর প্রান্ত, শান্তিপ্রিয়তার অপর প্রান্ত --সব জায়গায় অধুনান্তিক লেখকেরা পৌঁছে যেতে লাগলেন। মডার্ন পরিসরে মানুষ কেবল বুঝত হ্যাঁ অথবা না। পোস্টমডার্ন পরিসরে পাঠক এর মধ্যিখানে থাকা অনির্ণীত বিশ্বটিকে আবিস্কার করলেন....দ্যাখো, সাহিত্যে আর শিল্পে আমি মনে করি কেউ কাউকে অতিক্রম করেনা বা বিপ্রতীপ অবস্থান হয়না...বরং উত্তোরত্তর...কন্টিনিউটির ভিন্ন জায়গা খুঁজে বের করে বা আবিস্কার করে...একটা উত্তরাধিকার নিয়ে সে জন্মায় এবং তারপর সে নিজের অর্জনকে যোগ করে,তারপর প্রকাশ করে...ইমলিতলা আমার একটা উত্তরাধিকার..তেমনই মহাভারত...উপনিষদ উত্তরাধিকার...সাহিত্যে কাউকে কাউকে বাদ দিয়ে কাউকে কাউকে বেছে নেব কেন? কে আমার পূর্বপুরুষ নয়? আমি তো অভেদের কথা বলি....এরকম কেউ কেউ ভাবে-হাংরিতে থাকলে কৃত্তিবাসকে আক্রমণ করতে হয়,বা হাংরিকে আক্রমণ করতে হয় বা পোস্টমডার্নকে আক্রমণ করতে হয়,ব্যাপারটা ঠিক নয়,ব্যাপারটা হচ্ছে অতিক্রম করার তত্ত¡...একটাকে বড় করে অন্যটাকে হেয় করে দেখার চেষ্টা করাটা ঔপনিবেশিক ধরতাই। প্রগতিবাদীর যে তত্ত¡,রৈখিকতার যে তত্ত¡--সেটাতে বিশ্বাস করলে এই আক্রমণ বা অসন্তুষ্টির কথা ওঠে....এখন আমি মোটেই লেখা নিয়ে আন্দোলনের কথা ভাববোনা ... সেই কন্ডিশনগুলো এখনও আছে কিন্তু অন্যভাবে হ্যান্ডেল করতে আমরা সবাই শিখে গেছি...শিখেয়েছে আন্দোলনগুলো...অতএব আন্দোলনগুলোকে নিয়ে ঠাট্টা তামাশা করা যায়না...আজ একজন রাজনৈতিক নেতা যখন লগ্নীকারীকে স্বাগতম জানান আমার সেটা বুঝতে কোনও অসুবিধে হয়না...আমি এইজন্য বুঝি যে ঐ জায়গাটাতে যেখানে তিনি আগে ছিলেন সেই জায়গাটাতে আজ পারফর্ম করা যেতে পারেনা...আধুনিকতা ফুরিয়ে যায়নি....আমরা আছি ভেরী মাচ আধুনিকতার মধ্যে...কিন্তু আধুনিকতার মধ্য থেকে বেরিয়ে যে জায়গায় আমরা যেতে চাইছি....যে পরিসরে পৌঁছতে চাইব...সেই অবস্থাপন্নতাকে আবিস্কার করছি।”
    গল্পবিশ্বও সেই সংখ্যাটা কতটা সার্থক হয়েছিল সে সম্পর্কে মতামত দেয়া আমার ক্ষেত্রে শোভন নয়। তবে সম্পাদক হিসেবে এটুকু দাবী করতেই পারি, সমীর রায়চৌধুরীর সাহিত্য নিয়ে সেটাই ছিল প্রথম কাজ। তারপর আরও কেউ কেউ। ভবিষ্যতে অবধারিত ভাবেই আরও অনেকেই করবেন। করতে বাধ্য থাকবেন।
    আমার এই দাবীকে কারুর যদি বাহুল্য মনে হয় সেক্ষেত্রে আমি তাকে অনুরোধ করবো সমীর রায়চৌধুরীর প্রকাশিত শেষ গল্প সংকলনটা পড়ে দেখতে। জীবনভর যে সত্যের অনুসন্ধান করেছেন সমীরদা, খুঁজেছেন যেসব জটিল প্রশ্নের উত্তর, সেসব কিছুই এই বইয়ের দু মলাটের ভেতর বন্দী করে গিয়েছেন। জ্ঞানের ব্যক্তিগত মালিকানাকে প্রকৃত মৌলবাদ হিসেবে বিবেচনা করা বইটার নামকরণও যথার্থ --খুল যা সিমসিম। অর্থাৎ সেই রত্নগুহায় প্রবেশ মন্ত্রটা জনসমক্ষে ফাঁস করে দিয়ে সমীরদা বলতে চেয়েছেন--হে জ্ঞানতাপস, স্বাগতম।
    অনেক দিন আগে নিজের একটা গল্প সংকলনের ব্যাক কভারে শ্রী সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় আকাঙ্খা প্রকাশ করেছিলেন, বাংলা সাহিত্য কোনদিন সৎ হলে তাঁর ওই সংকলনটি পাঠক খুঁজবেন। কিন্তু সৎ-অসৎ,ভালো-মন্দ,সাদা-কালো ইত্যাদি প্রভৃতি বাইনারিতে অবিশ্বাসী সমীরদার প্রয়োজন পড়েনি,‘রেখো মা দাসেরে মনে,’ মার্কা আবেদন পেশ করার। বরং তিনি নিশ্চিত ছিলেন বাংলা সাহিত্যের অনুসন্ধিৎসু পাঠক তাঁর বইটি পড়বেনই। সেই বিশ্বাস থেকেই কোনো ধারাগোল মার্কা হেঁয়ালির পরোয়া না করে প্রচ্ছদে ঝুলিয়ে রেখেছেন একজোড়া চাবি। সেই চাবি সংগ্রাহকদের ভিড় যে দিনকে দিন বাড়বেই সে ব্যাপারে আমিও নিশ্চিত।

     


শনিবার

সমীর রায়চৌধুরীর গালগল্পের দ্রব্যগুণ : জপমালা ঘোষরায়

 

সমীর রায়চৌধুরীর গালগল্পের দ্রব্যগুণ
------------------------------------------------------

জপমালা ঘোষরায়

# কলকাতার আদিপুরুষ সাবর্ণ চৌধুরীর বংশধর সমীর রায়চৌধুরী নামক বিস্ময়পুরুষের সাহিত্যকর্মের প্রতি আগ্রহ লালন করেছিলাম একেবারেই কলজছাত্রীবেলা থেকে। আমার বাবা, ৫০ এর দশকের রবীন্দ্র অনুসারী কবি। তাঁর কাছে শুনেছিলাম সমীর রায়চৌধুরী হাংরী সাহিত্য আন্দোলনের পুরোধা এবং অনেক পরে, ৯০ এর দশকে এসে জানলাম তিনি বাংলা পোস্টমডার্ন সাহিত্য আন্দোলনেরও পথিকৃৎ। তখন পড়ার সুযোগ বলতে কালে ভদ্রে কলেজস্ট্রিট গিয়ে কিছু বই সংগ্রহ করা। তাও মেইন স্ট্রিমের লেখকদের বই পাওয়া গেলেও ওঁর মতো প্রতিষ্ঠান বিরোধী কোনো লেখকের বই তেমন পাওয়া যেত না। কাজেই বুভুক্ষা থেকেই গেছিল। পরে যে আর পাঁচজন সাহিত্যসেবকের মতো আমিও তাঁর সরাসরি স্নেহ সান্নিধ্য লাভ করবো এই চমৎকারের কথা কখনো চিন্তাও করিনি। বন্ধু কবি ও প্রাবন্ধিক মৌলিনাথ বিশ্বাসের সাহায্যে এটা সম্ভব হয়েছিল তাঁর জীবনের শেষ পাঁচ /ছ বছরে এসে। বলা যায় আমিই বোধ হয় শেষতম সেবক যাঁরা তাঁর নিবিড় সান্নিধ্যে এসেছেন। তাঁর অজস্র গল্প প্রবন্ধ এবং কবিতা পড়ার সুযোগ যত পেয়েছি, যত তাঁর বহুমুখী প্রতিভা ও ব্যক্তিত্বের ঝর্ণাধারায় অবগাহন করেছি, ততই খুলে গেছে সিমসিম। পরে সম্পাদক মৌলিনাথ আমার মত দীন কলমজীবীকে দিয়ে সমীরের জীবিতাবস্থায় তাঁর গল্পের আলোচনা লিখিয়ে নিয়েছিলেন "কালকথা" পত্রিকায়। কোনো জীবিত কিংবদন্তীকে নিয়ে লিখতে গেলে ভয়টা থাকেই সুতরাং পড়াশুনোয় কোনো ফাঁকি চলে না। সমীরের অনেক লেখালিখির মধ্যে "খুল যা সিমসিম" গল্পগ্রন্থ এবং "অপূর্বময়ী স্মৃতি বিদ্যালয়" কাব্যগ্রন্থ দুটি মাত্র মনোযোগ দিয়ে পড়লেই আন্দাজ করা যাবে সমীর রায়চৌধুরী নামক সমুদ্রের ব্যাপ্তি ও গভীরতা। সবচেয়ে বড় ছিল তাঁর কথা বলার অসামান্য ভঙ্গী, কখনো ব্যাপ্তি থেকে শিকড়ের দিকে আসছেন পরক্ষণেই শিকড়কে রেখে দিয়ে ঘাসবিন্যসে চলে যাচ্ছেন ব্যাপ্তির দিকে। এই বিপ্রতীপ ধরতাই থেকেই সমীর রায়চৌধুরীর লেখনবিশ্বকে জানতে হবে। সমীরের জন্ম ১লা নভেম্বর ১৯৩৩ পানিহাটিতে, পরবর্তী সময় কাটিয়েছেন বিহারের পাটনা শহরে, অর্থাৎ দুটি ভিন্ন সংস্কৃতি ও ভৌগোলিক অবস্থান তাঁর মননকে বায়নারি থটপ্রসেসের মধ্যে লালন করেছে, যুক্তির ফাটল বা লজিকাল ক্র‍্যাক থেকে চিন্তার বিস্তারে সাহায্য করেছে। ফলত তাঁর গল্প একটা মাল্টি অ্যাঙ্গুলার ভঙ্গিমা পেয়ে গেছে এবং ভঙ্গিমা বাঙালীর আড্ডাখানার শুরু শেষ হীন চিরকেলে গালগল্পের মতো। এ প্রসঙ্গে বলি সমীরের গল্প সম্পর্কে "গালগল্প" শব্দটি ব্যবহার করেছেন তাঁর ভাই, বিখ্যাত সাহিত্যিক "হাংরিপুরুষ" মলয় রায়চৌধুরী।

# একসময় মনে করা হত ছোটগল্পের চূড়ান্ত লক্ষ্য হল তাৎপর্যে পৌঁছানো এবং তারজন্য চাই শক্তপোক্ত ঘটনা, স্থান কাল অনুযায়ী চরিত্র। কিন্তু এখন যেহেতু জীবন রিমোট কন্ট্রোলে বদলে বদলে যাওয়া চ্যানেল, হাজারো অ্যাপ এ ডাউনলোড করে ফেলা চমৎকার, তাই এখনকার গল্প অন্যরকম। এখন গল্পে নানারকম টুকরোটুকরো উদঘাটন বীজের মতো ছড়িয়ে যায়। জীবনের পাজলগুলো কুড়াতে কুড়াতে "আমি মানব একাকী ভ্রমি বিস্ময়ে"। সমীরের গল্পে সমীর এভাবেই খোঁজেন সেল্ফ আইডেন্টিটি। খোলাখুলি বলতে কি, সমীরের লেখালিখিতে, তাঁর বোধের পুঁজিতে, গঠনকাঠামোয় কোথাও প্রাতিষ্ঠানিকতার ছোঁয়া মাত্র নেই। আছে কালখন্ডের ক্ষয়, নিরন্তর শূন্যতা, গ্লানি ও হতাশার বিরুদ্ধে দ্রোহ। কিন্তু এই দ্রোহের উচ্চারণ উচ্চকিত, মানে ফাটিয়ে দেওয়া বলতে যা বোঝায় তা নয়, এই দ্রোহ প্রত্যয়ী উচ্চারণে মজা শ্লেষ কৌতুকের রীতিতে ভাষাশব্দ ও লেখনবিশ্ব নির্মাণের। সরাসরি বলাই ভালো, সৎসাহিত্যের গুহামুখ খুলে দিয়েছে সমীর রায়চৌধুরীর গল্পবিশ্ব।

# সমীরের গল্পে অন্ধকার ততটা অন্ধকার নয়, শূন্যতা ততটা শূন্যতা নয়। শূন্যদশকে লেখা তাঁর একটি সাড়া জাগানো গল্প "মেথিশাকের গন্ধ" শুরুর আগে তিনি কোনো প্লট ভাবেন নি। তিনি ভাবেনও না। একটা বিষয়হীনতা দিয়েই শুরু করেছেন। কলকাতার নর্দার্ন পার্ক, ব্রহ্মপুরের বাড়িতে হঠাৎ লোডশেডিং এবং নিশ্চিদ্র অন্ধকার বাড়ি। তিথিগত আঁধারে আকাশের আলোটুকুও নেই। বসার ঘর থেকে রান্নাঘর পর্যন্ত আপাত অদৃশ্য অথচ ঘ্রাণ আছে এমন এক "সামথিং"কে ইডিকেট করে তাঁর থটপ্রসেস বহুস্তরীয় অন্ধকারকে বহু কৌণিকতায় বিশ্লেষণ করতে করতে জীবনধর্মের মুক্তমুখে এগিয়ে যাচ্ছে।"একজায়গায় গিয়ে নিশ্চয়ই মেথিশাকের গন্ধের সঙ্গে শেফালির উপস্থিতির জৈব গন্ধ মিশবেই" এটাই জীবনমুুুুখীতা। একথা চিন্তা করতে করতে অন্ধকারের মধ্যে দিয়েই গল্পকার এগোচ্ছেন, যেখানে মেথিশাক রান্না করতে করতে হঠাৎ ঘটে যাওয়া অন্ধকারে শেফালির হাত থেকে একটি কাঁচের শিশি পড়ে ভেঙে চুড়মার হয়ে যাচ্ছে এবং শেফালি অন্ধকার ভেদ করে চেঁচিয়ে সাবধান করে দিচ্ছে "এদিকে এসো না"। অর্থাৎ অন্ধকারে একজনের অভ্যস্ত যাপনেও ভাঙচুর আসছে। আবার নিমেষেই ম্যাজিকের মতো ভ্যানিশ হয়ে গেল দৃশ্যমান যা কিছু। সমস্ত "সামথিং" তখন "নাথিং" হয়ে গেল। এখান থেকেই উঠে আসছে একটা জাদু বাস্তবতা বা ম্যাজিক রিয়্যালিজম, অন্ধকারের বহুস্তর। একস্তরে শৈশবে মায়ের শেখানো সাবধানবাণীতে জুজুবুড়ি আর খোক্কস ভয়, আবার রাঙাদিদুর গপ্পে সেই খোক্কসজয়ের নির্দেশনা, এটা একটা স্তর। তার পরই রাঙা দিদুর মৃত্যুর পর মা যখন বললেন দিদু অন্ধকারের দেশে চলে গেছে, এবং সমীরের মনে হল কত প্রিয়জন সেই অন্ধকারের দেশে চলে গেল "সেই প্রথম অন্ধকারের মধ্যে প্রিয়জনের বাসা তৈরি হল" এটাও একটা স্তর। এভাবেই অন্ধকার হাতড়াতে হাতড়াতে মনে হল মা এবং ছোড়দির কথা যাঁরা মেথিশাক ভালোবাসতেন। "অন্ধকারের কত অলিগলি, অন্ধকারের মধ্যে একধরণের ফাটল"। এই প্রসঙ্গে এই অদৃশ্যের মধ্যেও দৃশ্যমান হয়ে উঠছে শিল্পী অমিতাভ ধরের ছবি। ম্যাজিকাল রিয়্যালিটি। দুদিন আগে অন্ধকারে চলে যাওয়া শিল্পী বাঁধন দাসের থিওরি মনে আসছে "বাঁধনের কথা আজ খুব বেশী করে মনে পড়ছে। মাত্র দুদিন হল সে মারা গেছে।.......বাঁধন বলত অন্ধকারের স্থানিকতা। স্পেস যেভাবে সম্পর্ক গড়ে"। মেথিশাকটা আসলে এই গল্পে কোন বিষয়ই নয়। মেথিশাকের গন্ধকে কেন্দ্রকরে ভেদের শনাক্তকরণ থেকে অভেদের দিকে যাত্রা। এভাবেই বহুস্তর ভেদ করতে করতে শেষে এসে বললেন ডাইনিং টেবিলের কাছে একফালি শীতরোদ্দুর যেমন খুব চেনা এবং এবাড়ির নিজস্ব সম্পদ, তেমনি অন্ধকারটুকুও চেনা জানা, এবাড়ির নিজস্ব, যার সঙ্গ নিতে কোনো অসুবিধে নেই। সে হল "কালো রঙের কাজ"। প্রি-মডার্নের মতো আলোর বিপরীত অন্ধকার তো নয়ই, পাস্ট-মর্ডান বা আধুনিকোত্তরের মতো আলোর পরিপূরকও না। এখানে দুটোই সহজ এবং সমান (আলো= অন্ধকার)। এভাবেই যেখানে ছেড়ে দিলেন সেখানে অন্ধকার আনবাউন্ড, এন্ডলেস এবং আলোর চেয়েও আলোকিত হয়ে উঠল। এটাই সমীরের গল্পহীন গল্পের অভিনবত্ব এটাই পোস্টমডার্ন।

# সমীর রায়চৌধুরীর গল্পের নামকরণগুলিও অন্যরকম, যেমন, বহুজাতিক ভূতের গল্পের খসড়া, শ্রীশ্রী লক্ষ্মীর মাঙ্গলিক বচন, স্মৃতির হুলিয়া প্রতুলের মা ওমলেট অবধি, ছাতা হারানোর বর্ষাকালীন দুকখু, কবিরাজ চাঁদচুড়ামণি শ্রীব্রজেশচন্দ্র কথিত দ্রব্যগুণ, একমিনিট বিয়াল্লিশ সেকেন্ড ওসামা বিন লাদেনের ক্যাম্পে ইত্যাদি। বোঝা যাচ্ছে নামকরণের ক্ষেত্রেও তিনি অপ্রাতিষ্ঠানিক। সমীরের গল্পকে গালগল্প বলার কারণ হল তিনি কোনো প্লট ভেবে নিয়ে গল্প লিখতে বসেন না। কোনো কাল্পনিক চরিত্রও থাকে না। তিনি নিজে একজন ব্যক্তি এবং ব্যক্তি সমীরের জীবনের অভিজ্ঞতার সূতোগুলোকে টেনে টেনে এনে জুড়ে দেন গল্পের মধ্যে। প্রসঙ্গক্রমে অনেক বাস্তব চরিত্র এসে যায়। কিন্তু তারা এমন ভাবে আসে যে তাদের কোনো কৈফিয়ত ও থাকে না। বা কৈফিয়তি দায়টাও সমীরের থাকে না। যেমন শুভাপ্রসন্ন, বাঁধন দাস, অমিতাভ ধর, কালীকৃষ্ণ, শ্যামল মজুমদার প্রমুখ ব্যক্তিত্বের উপস্থিতি যথাযথ ভাবেই তাঁর গল্পে আছে। আবার খুল যা সিমসিম গল্পের চাবিওয়ালা আসগর আসলে চাবিওয়ালা আসগরই। অন্য কেউ না। কিন্তু তার উপস্থিতি, ক্রিয়াকর্ম ইত্যাদি নিয়ে চরিত্রটিকে এমন অদ্ভুত ম্যাজিক্যালি রিয়্যাল করে তুললেন যে সে একটা গল্প হয়ে উঠল। প্লট বিহীন গল্প।

# "বহুজাতিক ভূতের গল্পের খসড়া" একটি খসড়া মাত্র নয়, বিশ্বায়নের হাজারো বাস্তব মজার মধ্যে একটি ম্যাজিক রিয়ালিস্টিক মজা। সমীরের লেখায় এই ঐতিহাসিক ধরতাইটাই অ্যাবসলিউট সত্য। জীবনের কত দ্বন্দ্ব সংঘাত দুর্যোগ, কত জ্যোৎস্না মেঘ কুয়াশা, অন্ধকারের ফাটল দিয়ে তিনি সব ম্যাজিকের মত দেখতে পান এবং সেভাবেই দেখান পাঠক বা শ্রোতাকে। কোনো পাব্লিশার প্লিজ আহত হবেন না! আঘাত দেওয়া আমার উদ্দেশ্য নয়। বইপাড়ার ব্যবসা নিয়ে সমীরের যা মনে হয়েছে আমি তার বিশ্লেষক মাত্র। এখানে কার্তিক নামের লোকটি বইপাড়ার পেশাদার ভৌতিক গল্প লিখিয়ে। বোধোদয় নামক দোকান অথবা সংস্থা থেকে তার জন্য রেডিমিক্স প্যাকেটে ভূতের গল্প লেখার অর্ডার এসেছে। ছবিছাবা সহ থিম দেওয়া আছে সেই অনুযায়ী গল্পের প্লট ভাবতে হবে। বাজারে কী ধরণের ভূতের গল্পের কাটতি আছে সেই অনুযায়ী অর্ডার। ছোটোদের ভূতের গল্প কার্তিক অনেক লিখেছে কিন্তু এবার তাকে লিখতে হবে বড়দের ভূতের গল্প, তাও আবার কর্পোরেট ওয়ার্ল্ডকে সামনে রেখে বিষয় নির্বাচন করা হয়েছে মাল্টিন্যাশনাল বা বহুজাতিক ভূতের গল্প। সমীর কোনো চরিত্রকে কখনো আঘাত করেন না বরং একটা সহজ আনন্দময়তায় ছড়িয়ে দেন। কিন্তু মুশকিলটা হল কার্তিকের ভূতের গল্পের খসড়া আর জমে না কিছুতেই। হাজার চেষ্টা করেও সে বহুজাতিক ভূতকে নামাতে পারেনা। " বোধোদয় বলে এমন তো হওয়ার কথা নয়। নামকরা ব্র‍্যান্ডনেম। সবচেয়ে বেশী কাটছে। প্রশ্ন করে আবছায়া ছিল? -- হ্যাঁ, আর পোড়োবাড়ি? -- সেও ছিল। নিশাচর চলাফেরা? -- ছিল বৈকি, ছাতা হারানোর বর্ষাকালীন দুঃখু? --- তাও তো ছিল..... তাহলে অসুবিধা টা কোথায়?.... কার্তিক বুঝতে পারে না শেষ পর্যন্ত সেল্ফমেডের প্যাকেট নিয়ে বাড়ি ফেরে.... কেবলই অনুমেয়র দিকে তাকিয়ে আরও আরও... ভূতভাবনের বহুব্রীহি।.... একদিন পেয়ে যাবে। ধরা ছোঁয়ায় আসবে মনের মতো ভূত..." এভাবেই একটা ফ্যান্টাসি, এক আনন্দময় জগতের চলা ফেরার কথা। একটা সমস্যার কথা বলা হল কিন্তু কোনোরকম ক্যাওস ছাড়া, তছনছ ছাড়াই একটা ম্যাজিক রিয়ালিজমের মোড়কে।

# কালখণ্ডের চমৎকার কৌতুক হল বুদ্ধিজীবীদের বাজারায়ন তথা বিশ্বপুঁজিবাদ। একথা বোধহয় আধিপত্যবাদীরা বুঝে ওঠার আগেই বুঝে ফেলেছিলেন কতিপয় গোত্রচিহ্নহারা দ্রোহপুরুষ, তার মধ্যে সমীর রায়চৌধুরী অন্যতম। "শ্রীশ্রী লক্ষ্মীর মাঙ্গলিক বচন" গল্পে এই বাজারায়ন আর ভোগবাদের সম্পন্নতা ও বিপন্নতা দুই ই চিহ্নিত করেছেন ডবল ডুয়ালিটিতে। তাবড় তাবড় দেশীয় বণিকদের মদতে চমকদার সাবান, তেল, কেশকালা, মাজন এসব তৈরী করছে।এই সব সামগ্রীর দ্রব্যগুণ বিচারের জন্য কোথাও কোনো বাণিজ্যসংস্থা দশ বিলিয়ন খরচা করছে বিজ্ঞাপন বাবদ। এদের সমবেত আক্রমনের ফলে আমজনতা বিভ্রান্ত হচ্ছে। বিগবাজারে তারা বলিপ্রদত্ত হয়েও বুঝতে পারছে না যে ভোগবাদ আসলে একটি রোগ। ধর্মের টোপ গেলানো হিন্দু মাঙ্গলিক বচন "ওঁ হ্রীং শ্রী ওঁ লক্ষ্মীবাসুদেবায় নমঃ"। পিনাকী বলে ক্রেতাকে বিব্রত না করে বাজার দখল করতে হবে। মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে অনেক কবি লেখক ডকু ফিল্মমেকার সবাইকে টপকে অ্যাসাইনমেন্টটা পায় নায়ক সুব্রত। অফিস থেকে ৩০ হাজার টাকা ধার নিয়ে নিয়ে পুরীতে হোটেলে এসে ওঠে।সে খায় দায় আর লক্ষ্য করে কে কেমনভাবে টুথপেস্ট ব্যবহার করে। মুখশ্রীতে কেমন মহিমা খেলা করে। ব্রাশের ডিজাইন দেখে, টিউবের প্যাকিং। ফেনা গল্প স্বাদ মেজাজ ব্রাশের আকার ছন্দ।গাদা টুথপেস্ট নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে সে পেয়ে যায় বাজারায়ণের সূত্র। "স্রেফ টুথপেস্টের টিউবের মুখটা এক মিলিমিটার বাড়িয়ে দিতে হবে। গোপন থাকবে এই কৌশল। দাম মাত্র দুটাকা কমিয়ে একটা ঝুটো মিতব্যয়িতার গিমিক ধরে রাখতে হবে বাজারে। অথবা শুরুতে কোনো ফ্রি গিফট বা এক্সট্রা কুড়ি পার্সেন্টের ভড়ং। মনোযোগের কেন্দ্র সরিয়ে দিতে হবে। তাহলেই ফোর্টি পারসেন্ট অতিরিক্ত টুথপেস্ট ড্রেনআউট হয়ে যাবে। কেননা টিউবের মুখের ডায়ামিটার আগের চেয়ে এক মিলিমিটার বেড়ে গেছে।" অদ্ভুত রসময়তায় পণ্যের পৃথিবীর অসাড়তাকে তুলে ধরা হল এই গল্পে।

# " স্মৃতির হুলিয়া প্রতুলের মা ওমলেট অবধি" নামক গল্পেও যথারীতি কোনো আদ্যপ্রান্ত গল্প নেই। বর্তমান পণ্যতাড়িত সুপার ফাস্ট জীবনে প্রতুল তার মৃত মায়ের জন্য কষ্ট পেয়েও তাঁকে স্মরণ করার সময় নেই। ছবিটাও সে দেয়ালে টাঙায় নি তার পিছনের যুক্তিটা হল। ঘুরতে বেরোতে মায়ের ছবিটা তাকে আক্রান্ত করবে। মনখারাপ করলে তার কাজের গতি রুদ্ধ হবে। অথচ সে চায় মায়ের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী খুব জাঁকজমকপূর্ণ করে পালন করতে। তার ধারণা এভাবেই মাকে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করা হয়। আর মাত্র এক সপ্তাহ বাকি তার মধ্যে আর সময় পাবে না বলে আজ সে তন্নতন্ন করে মায়ের ছবি খুঁজছে। সারাবাড়ি আলমারি আনাচ কানাচ কোথাও খুঁজে পাচ্ছে না। খুঁজতে খুঁজতে সে অনেক দৈনন্দিন কাজ ভুলে যাচ্ছে কিন্তু মিমি, তার কয়েকমাসের সন্তান, তার শিশুখাদ্য আনতে ভুলছে না। এটাকে সমীর বলছেন "স্মৃতির হুলিয়া" হুলিয়া শব্দটি একটি মিশ্র সংস্কৃতির অপশব্দ, যা মেকিতাকে ইন্ডিকেট করে। প্রতুল অশোকের বাড়ি যেতে ভুলে যাচ্ছে, অশোক তার বাড়ি এলে সে মায়ের ছবি খুঁজতে খুঁজতেই অশোকের সঙ্গে মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির অ্যাডভান্টেজ ডিস অ্যাডভান্টেজ নিয়ে আলাপ আলোচনা করছে সেখানে স্মৃতির মূল্য কতটুকু? এর মধ্যেই অনিমা জানাচ্ছে তার একসপ্তাহ আগে পেঁয়াজের বাক্সে ডিম রেখে ভুলে যাওয়া। প্রতুল বলে ওটাকে ওমলেট করে দিতে। অনিমা বলে মায়ের ছবি দুপুরে খুঁজবে আপাতত ওমলেট দিয়ে চা খাওয়া হোক। এভাবেই গল্পটির শেষহীন শেষ। এখানে ডিম শুধুমাত্র খাদ্যবস্তু থাকলো না, দ্বিতীয় ডায়মেন্সনে ডিম সৃষ্টি ও পরম্পরার দ্যোতক হয়ে উঠলো, কেননা ডিম থেকে দ্বিতীয় প্রজন্ম, যেমন প্রতুলের মায়ের থেকে প্রতুল, তার এবং অনিমার মিলন থেকে তাদের কন্যা সন্তান মিমির জন্ম। লেখক ককর্কশতাহীন সাংকেতিকতার মধ্যে দিয়ে দেখালেন আমাদের পণ্যায়িত জীবনের অসাড়তা।

# "কবিরাজ চাঁদ চুড়ামণি শ্রীব্রজেশচন্দ্র কথিত দ্রব্যগুণ " "আলজাজিরা" "একমিনিট বিয়াল্লিশ সেকেন্ড ওসামাবিন লাদেনের ক্যাম্পে" প্রভৃতি গল্পে দেখতে পাই কীভাবে বাংলা গল্পের ভাষাপ্রয়োগ শব্দের স্থানিকতা ও অর্থবোধকতা পাল্টে পাল্টে যেতে পারে। আলোচক কৌশিক চক্রবর্তীর ভাষায় তা হয়ে উঠতে পারে "রুবিক পৃথিবীর মাল্টিক্রোম হাতছানি"। "এই গল্পগুলিতে তিনি আতঙ্ক ও ভয়কে রিলেট করতে পারেন চমস্কি কথিত সাবভার্ট টেরারিজমের সঙ্গে। যেভাবে আমেরিকার জনগণের মধ্যে ওসামা নামক জুজুর ভয় দেখিয়ে আফগান যুদ্ধকে নৈতিক করে তোলাহয়, তার পিছনে রয়েছে আসলে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস। মানুষের আই ওয়াশ করা হয়, মানুষ আসলটা ধরতে পারে না। এই সূত্রটিকে তুলে ধরতে গিয়ে সমীর লিখলেন বিদেশী লাইব্রেরী তে প্রবেশ করতে গিয়ে সিকিউরিটি চেক উপলক্ষে একর ধরণের কাল্পনিক ভয়ের বাতাবরণ। এ প্রসঙ্গে এসেছে এয়ারপোর্ট এ অত্যধিক কড়াকড়ি আর হেনস্থার শিকার হয়েছে ভারত আফগানিস্থানের সাধারণ মানুষ, এমন কি ভারতে জেট ক্যাটাগরির সিকিউরিটি পাওয়া নেতা রাহুল গান্ধীর কথাও। যে ভয় কারণ বিহীন অথচ যে ভয় মিথ্যাকে সত্য করে দিতে পারে। এই ঘটনার নিরিখে বলিউডে শাহরুখ খান অভিনীত একটি চলচ্চিত্র মনে পড়ে " মাই নেম ইজ খান" এতেও দেখেছি সহজ সরল একটি মানুষ এই হেনস্থার শিকার হয়ে অত্যাচারিত হয়েও কিছুতেই প্রমাণ করতে পারে না যে " মাই নেম ইজ খান, বাট আই অ্যাম নট এ টেররিস্ট" শুধু মাত্র তার পদবী খান বলে তাকে এই হেনস্থা। সমীরের গল্পে এই ঘটনা তীব্র দংশনের রূপ না নিয়ে শুধু মাত্র অবলোকনের ধরতাইটুকু রেখে গেছে। ১১সেপ্টেম্বর ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার ধ্বংসের সময় আগুন হানার থেকে বাঁচার জন্য এক দম্পতি জানলা দিয়ে নীচে ঝাঁপ দিচ্ছে। এটা একটা বিভ্রম ঠিক কথাই। কিন্তু পাজল্ড মানুষ মুহূর্তের বাঁচার আকাঙ্ক্ষায় এই ভুল করে এবং আমরা জানি মানুষ এরকম করেওছিল। ইতিহাস তার সাক্ষী। সমীরের অবলোকন থেকে আমরা যা পাই, মনস্তত্ত্ববিদ হিসেব করে দেখেছিলেন সেই দম্পতি পতনকালীন অতিরিক্ত আয়ু পেয়েছিল ১মিনিট ৪২ সেকেন্ড যখন পতন আর উড়ান খুব কাছাকাছি। তাছাড়া অপরের আয়োজিত মৃত্যুর চেয়ে স্বেচ্ছা মৃত্যু অনেক বেশী সম্মানের। এখানে কোনো পরাজয় নেই। এটাও যেমন লেখক দেখাতে চেয়েছেন তেমনি উড়ান শব্দটাকে যোগ করে মৃত্যুর সঙ্গে মুক্তিকে যুক্ত করেছেন। জীবনের শেষ মুহূর্তেও যেখানে কোনো আত্মগ্লানি নেই। হত্যা আআর আত্মহত্যায় যে যার ঈশ্বর খুঁজে নেয়। এভাবেই মুক্তমুখে ছেড়ে দিয়েছেন গল্পটা।

# সমীর রায়চোধুরীর গল্প ও কবিতার লক্ষণ নিয়ে অনেকেই আলোচনা করেছেন। আমি নিজেও আগে অন্যত্র তাঁর আরও অন্যান্য গল্প নিয়ে আলোচনা করেছি। তার থেকে মূল যে বিষয়টি উঠে আসে সেটি হল, সমীর রায়চৌধুরী আদ্যপ্রান্ত একজন পোস্টমডার্ন লেখক, যেখানে লেখকের স্বাধীনতা অবাধ। তথাকথিত অদ্যাপক অনুশাসিত গদ্য নয়। ফলত তাঁর রচনা ডিক্যাননাইসড, পাঠ্যবস্তু বাঁধনমুক্ত, রাইজোমেটিক এবং ডিন্যারোটিভাইজড। অধুনান্তিকের স্বরূপ নিয়ে এখনো অনেকের জিজ্ঞাসা এটা কি কোনো দর্শন? না কি চিন্তাচেতনার স্তর বিশেষ? না কি কোনো আইন? সমীর রায়চৌধুরী বলতে চান পোস্টমডার্ন আসলে কিছু কাললক্ষণ, সময়ের প্রবহমানতার সূত্রেই এর চলন গমন। তাই একে অস্বীকার করা মানে জীবনের স্রোতকে অস্বীকার করা।

রবিবার

সমীর রায়চৌধুরী : মলয়ের অবন্তিকারা


ইলোপকন্যা
তোর বেডরুমে তোকে পেলুম না, কি ঝঞ্ঝাট, মানে হয়
অবন্তিকা, কোন নদী নিয়ে গেছে, বরফের ডিঙি ভাসালুম
দ্যাখ, কেলেঘাই চূর্ণী গুমনি জলঢাকা ময়ূরাক্ষী কংসাবতীর
স্রোতে, তোর ঘাম নেইকো কোথাও, ভাল্লাগে না, জেলেরাও
পায়নি তোর ফেলে দেয়া অন্ধছোঁয়া, পূর্ণিমাও অন্ধকারে,
কি করে চলবে বল, পেঁয়াজের কান্না নেই, ধ্যাৎতেরি
চুড়ির বাজনাহীন, চুমুগুলো কোন সপ্নে রেখে গিয়েছিস
খুঁজে পাচ্ছিনাকো, কাউকে তো বলে যাবি, মুখের প্রতিবিম্ব
আয়নাসুদ্দু ফেলে দিয়েছিলি, ওঃ কি মুশকিল, পাশে-শোয়া শ্বাস
অন্তত রেখে যেতে পারতিস, আলমারি ফাঁকা কেন, বালিশে
খোঁপার তেল নাভির তিল কাকেই বা দিলি, চেনাই গেল না
তোর মনের কথাও, টুথব্রাশে কন্ঠস্বর নেই, চটিতে নাচও
দেখতে পেলুম না, এমন কষ্ট দিস কেন অবন্তিকা, চুলের
নুটিতে থাকত ডাকনাম, ফুলঝাড়ু চালিয়েও সাড়া পাচ্ছি না,
অফিস যাবার রাস্তা এসে তোর জন্যে মাকড়সার জালে
হাতের রেখা সাজিয়ে চলে গেল তোরই মুখের ইলিশস্বাদ
নিয়ে। আরে, ওই তো, যে-ছোকরার সঙ্গে পালিয়েছিলি তুই
তারই জুতোর ছাপের স্বরলিপি মার্বেল মেঝেয় আঁকা…

         মলয়ের বিখ্যাত কবিতা ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ যে কবিতাটির জন্য মামলা-মোকদ্দমা হয়েছিল, পরবর্তীকালে আনন্দ বাগচীর ‘প্রথম সাড়া জাগানো কবিতা’ গ্রন্হে সংকলিত হয়েছে । আনন্দ বাগচী আমার কলেজ জীবনের বন্ধু । তিনি ‘কৃত্তিবাস’ পত্রিকার প্রথম দিকে যুগ্ম-সম্পাদক ছিলেন, পরে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মতের সঙ্গে মিল না হওয়ায় তিনি ‘কৃত্তিবাস’ পত্রিকা থেকে সরে যান । ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ তাঁর গ্রন্হে সংকলিত করার জন্য প্রথমে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং অনুমতির প্রসঙ্গে তুলেছিলেন । মলয়ের কবিতার কোনো কপিরাইট নেই, অতএব অনুমতির প্রসঙ্গে ওঠে না । অধ্যাপক বাগচীর গ্রন্হটিও পাঠক মহলে অনায়ারে আলোড়ন তুলেছিল । কিন্তু ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কেন আলোড়ন তুলেছিল, কী তার বৈশিষ্ট্য, অনেকে হাংরি আন্দোলনের সময় থেকেই আমাকে প্রশ্ন করেছেন । ঢাকার একটি ওয়েবসাইটে এই কবিতাটি নিয়ে ছয় বৎসর যাবৎ তর্ক বিতর্ক চলছে ।
         আমার মনে হয়েছে এই কবিতাটি বাংলা কবিতার বাঁক বদলের অন্যতম দিশাচিহ্ণ । রবীন্দ্রনাথ বাংলা কবিতার পাঠগতি বা স্পিডকে মন্থর করে দিয়েছিলেন । মলয়ের কবিতার পাঠগতি বা দ্রুতি ঢের বেশি । প্রাক-আধুনিক কবিতার গতি কবিয়ালদের বা প্রান্তিক মানুষের পদ্য, নাচ, গান ইত্যাদির মতো দ্রুতিসম্পন্ন। মলয়ের এই কবিতার শব্দ-নির্বাচন এমনই যে, সে গতি বা স্পিডকে কার্যকরী করে তুলেছে । বনলতা সেন, সুপর্ণা, নীরা এরা কবির যেন বা নিজস্ব নারী । জীবনানন্স স্পষ্টতই বলেছেন, তাঁর নায়িকা সবার নয় । ‘কী কথা তাহার সাথে, তার সাথে’, ‘ওইখানে যেওনাকো তুমি’ । কবি ও পাঠক এবং বনলতা যেন একতন্ত্রী এবং সম্পর্কের সুরে একরেখিক । ‘ছুতার’ ( ছুতোর ) দ্যোতকটি শিল্পবিরোধিতার জন্য ব্যবহার করেছেন মলয় । আর গতি স্বভাবতই চিৎকার-নির্ভর । চিৎকার এখানে ছন্দের অনুষঙ্গ । শ্বাসপ্রশ্বাসকে পাঠগতির সঙ্গে পাঠক এমনভাবে স্বয়ং ধাতস্হ হয়ে যায় যে, প্রচলিত অর্থে আমরা বলতে পারি, পাঠ-ছন্দসম্পন্ন । বরং বলা যায় কবিতাটি পপচলিত ছন্দ, থিম, প্রতীক, উপমা এসবকে গুরুত্ব না দিয়ে সেই সময়ের মেইনস্ট্রিম কবিতার প্রতি চ্যালেঞ্জরূপে আবির্ভূত হয়েছিল । 
         মনে রাখা প্রয়োজন এই কবিতাটির জন্যি কবিকে রাস্তায় কোমরে দড়ি দিয়ে, হাতে হাতকড়া পরিয়ে হাঁটিয়ে-হাঁটিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল থানা পর্যন্ত এবং পরের দিন থানা থেকে আদালত অব্দি । কবিতাটির ধরনধারণ ইতিপূর্বের প্রেমের কবিতার নির্ধারিত ক্যাননের সঙ্গে মেলে না ।
         এই কবিতাটি সম্পর্কে লালবাজারে অভিযোগ জানিয়েছিলেন কিছু বুদ্ধিজীবী, সাহিত্যিক ও সাংবাদিক । মলয় তাঁর ‘আমার জেনারেশনের কাব্যদর্শন’ এবং কবিতার বিনির্মাণ সম্পর্কে বেশ কিছু প্রবন্ধে স্পষ্টত ঘোষণা করেছিলেন, তিন থেকে পাঁচ দশক অব্দি তৈরি কবিতার পাতিবুর্জোয়া চেতনার মডেল তিনি ক্রমশ বদলে ফেলতে চান ।
         প্রেম ওই কবিতার স্ট্র্যাটেজি, কেন্দ্র নয় । এজন্যই পপচলিত পাঠবোধ থেকে কবিতাটি পড়ে তাঁরা বিস্মিত হয়েছিলেন । সেই সময়ে আলোচক দীপ্তি ত্রিপাঠী আমার কবিতা পড়েও বলেছিলেন, ‘কবিতাটির মধ্যে অসংলগ্নতা রয়েছে, যুক্তিক্রম মেনে লেখা হয়নি ।’ পাটনায় থাকার সুবাদে মলয় ভোজপুরি মাগধি ইধসকে অনায়াসে কাজে লাগিয়েছিলেন এই কবিতার প্রান্তিক অবস্হান নির্ণয়ে । প্রথম পঙক্তি থেকেই কবিতাটি আক্রমণাত্মক । আধিপত্যকেন্দ্র ও প্রণালীকে বিস্হাপনের প্রয়াস । পাঠবোধকে ডিস্টেবিলাইজ করার ঝাঁকুনি । কবিতাটিকে ইচ্ছাকৃতভাবে নারী-শরীর সংশ্লিষ্ট এমন অনেক শব্দ প্রয়োগ করা হয়েছে যা ছয়ের দশকের আগের পাঠবোধকে বিচলিত করে ; যে পাঠবোধের মধ্যে ছিল ভালো-খারাপ, শ্লীল-অশ্লীল ইত্যাদি বাইনারিবোধ । হাংরি আন্দোলন এই বৈপরীত্যবোধকে আক্রমণ করে । ‘আমি’ হচ্ছে কবিতার মধ্যে একটি সবজান্তা দ্যোতক । এই দ্যোতকটিকেই আক্রমণ করেছেন মলয় ।
         বনলতা সেন, নীরা ইত্যাদির সঙ্গে শুভাকে গুলিয়ে ফেলা উচিত হবে না । কেননা শুভা সম্পর্কে সাধারণ পাঠক যা জানতে চাইবেন তা হল কতকটা পূর্বপাঠের কবিতার নারীদের মতো । অথচ শুভা বাংলা কবিতার ঠক বিপরীত মেরুতে । যেমন খ্রিস্টধর্মে মেরি ম্যাগডালেন, তেমনই ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতার শুভা ।
         শুভা প্রধান চরিত্র নয় -- শুভার জায়গায় যেকোনো নারীবাচক নাম প্রয়োগ করা যেতে পারে । সাধারণ পাঠক শুভাকে কবিতার কেন্দ্র হিসাবে অনুমান করেন, বনলতা বা নীরার আইডেনটিটির মতো ভাবেন । মলয় তো শুভাকে কবিতার কেন্দ্র করে তোলেননি । বনলতা বা নীরা সেই কবিতার প্রাসঙ্গিক কবিতার কেন্দ্র । শুভাকে মলয়ের আর কোনো কবিতায় পাবে না । এখন তো মলয়ের কবিতায় পাঠক ‘অবন্তিকা’কে পাবেন ।
         অবন্তিকাকে নিয়ে মলয় যে কবিতাগুলো লিখেছেন এবং সেই কবিতাগুলো সংকলিত করে রোহন কুদ্দুস পপকাশিত মলয়ের কাব্যগ্রন্হের নাম ‘ছোটোলোকের কবিতা’, যেখানে প্রথম কবিতার শিরোনাম ‘ডেথমেটাল’ এবং প্রথম পঙক্তি ‘মুখপুড়ি অবন্তিকা চুমু খেয়ে টিশ্যু দিয়ে ঠোঁট পুঁছে নিলি?’    
               
মুখপুড়ি অবন্তিকা চুমু খেয়ে টিশ্যু দিয়ে ঠোঁট পুঁছে নিলি ?
শ্বাসে ভ্যাপসা চোখের তলায় যুদ্ধচিহ্ণ এঁকে ডেথ মেটাল মাথা দোলাচ্ছিস
চামড়া-জ্যাকেট উপচে লালনীল থঙ গলায় পেতল-বোতাম চোকার
ঝাপটাচ্ছিস সেক্যুইন গ্ল্যাম রকার খোলা চুল কোমরে বুলেট বেল্ট
বেশ বুঝতে পারছি তোকে গান ভর করেছে যেন লুঠের খেলা
স্ক্রিমিং আর চেঁচানি-গান তোর কার জন্যে কিলিউ কিলিউ কিল
ইউ, লাভিউ লাভিউ লাভ ইউ কাঁসার ব্যাজ-পিন কব্জি-বেল্ট
কুঁচকিতে হাত চাপড়ে আগুনের মধুর কথা বলছিস বারবার
আমি তো বোলতি বন্ধ থ, তুই কি কালচে ত্বকের সেই বাঙালি মেয়েটা ?
কোথায় লুকোলি হ্যাঁরে কৈশোরের ভিজে-চুল রবীন্দ্রনাথের স্বরলিপি
কবে থেকে নব্বুই নাকি শুন্য দশকে ঘটল তোর এই পালটিরূপ !
পাইরেট বুট-পা দুদিকে রেখে ঝাবড়া চুলে হেড ব্যাং হেড ব্যাং হেড ব্যাং
ঝাঁকাচ্ছিস রঙিন পাথরমালা বুকের খাঁজেতে কাঁকড়া এঁকে–
পাগলের অদৃশ্য মুকুট পরে দানব-ব্লেড বেজ গিটারে গাইছিস
বোলাও যেখানে চাই হাত দাও প্রেম-জন্তুকে মারো অ্যানথ্র্যাক্স বিষে
মেরে ফ্যালো মেরে ফ্যালো মেরে ফ্যালো কিল হিম কিল হিম কিল
কিন্তু কাকে বলছিস তুই বাহুতে করোটি উল্কি : আমাকে ?
নাকি আমাদের সবাইকে যারা তোকে লাই দিয়ে ঝড়েতে তুলেছে ?
যে-আলো দুঃস্বপ্নের আনন্দ ভেঙে জলের ফোঁটাকে চেরে
জাপটে ধরছিস তার ধাতব বুকের তাপ মাইক নিংড়ে তুলে
ড্রামবিটে লুকোনো আগুনে শীতে পুড়ছিস পোড়াচ্ছিস
দেয়াল-পাঁজিতে লিখে গিয়েছিলি ‘ফেরারি জারজ লোক’
ভাঙা-চোরা ফাটা বাক্যে লালা-শ্বাস ভাষার ভেতরে দীপ্ত
নিজেরই লেখা গানে মার্টিনা অ্যাসটর নাকি ‘চরমশত্রু দলে’
অ্যানজেলা গস কিংবা ‘নাইট ইউশ’-এর টারজা ট্যুরম্যান
লিটা ফোর্ড, মরগ্যান ল্যানডার, অ্যামি লি’র বাঙালি বিচ্ছু তুই
লাল-নীল-বেগুনি লেজার আলো ঘুরে ঘুরে বলেই চলেছে
তোরই প্রেমিককে কিল হিম লাভ হিম কিল হিম লাভ হিম লাভ
হিম আর ঝাঁকাচ্ছিস ঝাবড়া বাদামি চুল দোলাচ্ছিস উন্মাদ দু’হাত

         পাঠক লক্ষ করবেন ‘মুখপুড়ি’ শব্দের প্রয়োগ । সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় নীরাকে এভাবে সম্বোধন করতে পারতেন না । পাঠক লক্ষ করবেন ‘মুছে’ শব্দের জায়গায় ‘পুঁছে’ শব্দের প্রয়োগ । আমার ‘টিনিদির হাত’ গল্পে আমর প্রফেসার্স লেনের বন্ধুরা ইমলিতলাকে বলতেন ‘ছোটোলোকদের পাড়া’ । এখন তো শুনছি ‘ছোটোলোকের কবিতা’ নিঃশেষিত । সাধারণ পাঠক তো অবন্তিকার পৃথক আইডেনটিটি নিয়ে ভাবতে চাইবেন না । আমার মনে হয় শুভাকে এই পরিসরের মধ্যে স্হাপন করলে আইডেনটিটি কোড পালটে যাবে । ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতার সপ্তম পঙক্তি স্হিতাবস্হা থেকে সরে যাওয়ার ইঙ্গিতবহ --- ‘সমস্ত নোঙর তুলে নেবার পর শেষ নোঙর আমাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে’। শুভার বহুরৈখিক সত্বাকে স্পষ্ট করার জন্য নন্দিতা এবং আলেয়া নাম্নী আরও দুটি নারীর উপস্হিতি রেখেছেন মলয় ।
         জীবনানন্দ তাঁর কবিতায় সূর্য ও তপতীর সম্পর্কের গণিত প্রয়োগ করেছেন । সেখানে ‘সূর্যকরোজ্জ্বল’, ‘জয়জয়ন্তীর সূর্য’ ইত্যাদি শব্দবন্ধ প্রয়োগ করেছেন । ‘প্রচণ্ড বৈদভুতিক ছুতার’ কবিতায় দেখা যাচ্ছে অনভ ধরণের পঙক্তি, ‘শুভার স্তনের ত্বকের মতো বিছানায় শেষবার ঘুমোতে দাও আমায়/জন্মমূর্তের তীব্রচ্ছটা সূর্যজখম মনে পড়ছে’। বাংলা কবিতার আগে সেই সময়ের মেইনস্ট্রিমে যে  নায়িকাদের অবস্হান ছিল    তা মলয় বদলে দিলেন । মরিয়া মারমুখি আঞ্চলিক এথনিসিটির ভিন্নতাকে তুলে ধরলেন ।
         অনুষঙ্গগুলি এযাবৎ অচেনা ছিল এই মেজাজের কবিতায় । ‘যোনিকেশরে কাচের টুকরো’, ধাবমান ছবি, আধোবোজা নারী -- কবিতাটি সময়চেতনাকে আমল দিয়েছে । এখান থেকে মলয় পরে সরে গেছেন পরিসর চেতনার দিকে । ফলে কবিতাটি সেই সময়ে, এমনকি আজও, বঙ্গীয় পাঠকসমাজের কাছে সাংস্কৃতিক সমস্যাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে । সমস্যা আজও সেই একই জায়গায় । কোথাও না কোথাও আধিপত্যকেন্দ্র স্বয়ং উপলব্ধি করেছে এই ব্লান্ট যথাস্হিতি ।
         ‘প্রচণ্ড বৈদভুতিক ছুতার’ কবিতাটি প্রসঙ্গে আর একটি দৃষ্টিকোণ মনে রাখতে হবে । মলয় ইংরেজি অনুবাদে নাম রেখেছিলেন ‘Stark Electric Jesus’, কারণ যিশু ছিলেন ছুতোর । কনভেন্টে পড়ার সময়ে চার্চে গিয়ে বাইবেল ক্লাস করতে হত । মলয় কবিতাটিতে খ্রিস্টধর্মের ক্যানন প্রয়োগ করেছেন । যিশুকে কাঁধে করে ক্রস বইতে হয়েছিল । মলয়কে হাতে হাতকড়া, কোমরে দড়ি বেঁধে হাঁটানো হয়েছিল । যিশুর জীবনে যেমন মেরি ম্যাগডালেন, তেমন মলয়ের কবিতায় শুভা বা অবন্তিকা । মেরি ম্যাকডালেন যিশুর প্রেমিকা ছিলেন না, জীবনের কেন্দ্রে ছিলেন না । মেরি ম্যাকডালেন ছিলেন সবার কাছে অবারিত । তিনি বনলতা সেন বা নীরার মতি সাধ্বী ইমেজে বিলং করেন না । সেদিক থেকে দেখতে গেলে কবিতার নারীকে মলয় মুক্তি দিয়েছেন, স্বাধীনতা দিয়েছেন, স্বনির্ভরতা দিয়েছেন ।