অলোক গোস্বামী লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
অলোক গোস্বামী লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

মঙ্গলবার

সমীর রায়চৌধুরী সম্পর্কে অলোক গোস্বামী

 


  • লং লিভ আলিবাবা
    অলোক গোস্বামী
    ২০০৩ তে শিলিগুড়ি থেকে শুরু করেছিলাম ‘গল্পবিশ্ব ’পত্রিকা সম্পাদনা করা। নামকরণেই মালুম হওয়াটা স্বাভাবিক যে ওটা ছিল গল্প পত্রিকা। তবে নিছকই গল্প ছাপাছাপিতে সীমাবদ্ধ ছিলনা সেই প্রচেষ্টা, গল্প সংক্রান্ত আলোচনাও প্রাধান্য পেত সেখানে। ‘ডার্করুম’ বিভাগে থাকতো লেখকদের গল্প বিষয়ক চিন্তাভাবনা। কয়েকটি সংখ্যায় প্রকাশ করেছিলাম বর্হিবঙ্গের বাংলা গল্প চর্চার আলোচনাও। অর্থাৎ বাংলা ছোট গল্পের সাম্প্রতিকতম চিত্রটা তুলে ধরার কাজে আমাদের প্রচেষ্টা ছিল আন্তরিক।
    তো, পরপর পাঁচটি সংখ্যা প্রকাশিত হওয়ার পর ২০০৮ তে ষষ্ঠ সংখ্যার বিষয় বেছে ছিলাম-ব্যতিক্রমী সাহিত্য। কারণ হিসেবে সম্পাদকের কলামে লিখেছিলাম--“ব্যতিক্রমী সাহিত্য-এই অভিধাটির সঙ্গে বাংলা সাহিত্যের পাঠকদের দীর্ঘ দিনের পরিচয়। এই তকমা কবে চালু হয়েছিল কে জানে! তবে এটি আবিষ্কারের মূল কৃতিত্ব যে গবেষক তথা আলোচকদের সে কথা বলা বাহুল্য মাত্র। কিছু লেখকের ক্ষেত্রে উক্ত অভিধাটি প্রয়োগ করে আমাদের চিনিয়ে দিয়েছেন উনি/ওঁরা ব্যতিক্রমী সাহিত্যিক। সাহিত্যের মূলস্রোতের বিপরীতে তাদের অবস্থান।
    এই বিভক্তিকরণ আমরা অর্থাৎ পাঠকেরা নির্বিচারে মেনেও নিয়েছি। এই বিভক্তিকরণের পদ্ধতি তথা প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কখনই প্রশ্ন তুলিনি। পাঠকদের কথা বাদ দিয়েও বলা যায়, উক্ত লেখকদেরও যে এহেন বিভক্তিকরণে যে আপত্তি রয়েছে তেমন কোন প্রমাণ চোখে পড়েনি। অথচ প্রশ্ন ওঠাটা স্বাভাবিক ছিল, কোনটা ব্যতিক্রমী সাহিত্য? কোন নিরিখে ব্যতিক্রমী--বিষয়,নাকি ভাষা,নাকি বাণিজ্যিক মাপকাঠিতে? নাকি ওই বিশেষণ চালু করার পেছনে থোড়-বড়ি-খাড়া সমৃদ্ধ বাজার চালু ফর্মুলাটিকে বাঁচিয়ে রাখার কোনো গূঢ় অভিসন্ধি রয়েছে!
    এমন প্রশ্ন ওঠাটাও অস্বাভাবিক ছিলনা যে কোনটা তবে মূলস্রোতের সাহিত্য? যে নদীটির তীরে সাহিত্য সংস্কৃতি বিকশিত হয়েছিল সেই সরস্বতীই যখন লুপ্ত হয়ে গিয়েছে,যখন আদি গঙ্গার অপর নাম টালি নালা তখন ‘মূলস্রোত’ বিশেষণটিও কি নিছক শব্দ জঞ্জাল নয়?”
    আমার মতো আরও অনেক পাঠকের সংশয় দূর করার জন্য ওই সংখ্যায় প্রকাশ করেছিলাম বেশ কিছু প্রবন্ধ এবং গল্প। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে চালু থাকা ওরকম একটা আখাম্বা বিশেষণের জন্য শুধু এটুকুই যে যথেষ্ট নয় সেটা বিবেচনা করে প্রয়োজন অনুভব করেছিলাম এমন এক ব্যক্তিত্বকে নিয়ে ক্রোড়পত্র প্রকাশ করার যার চিন্তা ভাবনা বাজার নির্দিষ্ট নয়। যিনি সাহিত্যের বিভিন্ন প্রবণতা বিষয়ে সম্যক ধারণা রাখেন। যিনি যতটা ভাবতে পারেন,ভাবিয়ে তুলতে পারেন তারচে’ও বেশী। আলোচনা প্রসঙ্গে যিনি কোনো ব্যক্তিগত অসূয়ার ধার ধারেন না। যার কাছে কোনো রচনাই অপ্রাসঙ্গিক নয়।
    বন্ধুরা যথারীতি আমার ওই আকাঙ্খাকে মহতি আহ্লাদ হিসেবে ধরে নিয়েছিলেন। সেটাই স্বাভাবিক, কেননা তাদের খোঁজে তেমন কোনো উপযুক্ত ব্যক্তিত্ব ছিল না যা কিনা আমার ছিল। সমীর রায়চৌধুরী। আমি জানতাম গল্পবিশ্বের ওই সংখ্যায় সমীর রায়চৌধুরীকে নিয়ে ক্রোড়পত্র প্রকাশ করা কতটা অনিবার্য।
    আমার এহেন প্রস্তাবনায় সেদিন অনেকেই ভ্রু কুঁচকে ছিলেন, হঠাৎ সমীর রায়চৌধুরীকে নিয়ে কেন! কী লিখেছেন ভদ্রলোক? কী দাম আছে ওঁর কথাবার্তার? থান ইঁট মার্কা উপন্যাস আছে? ঝুলিতে মেডেল,আকাদেমী চেয়ার, পার্টি মেম্বরশিপ, এনি থিং?
    যাদের হাংরি সংক্রান্ত কেচ্ছাতিহাস জানা ছিল তারা মুচকি হেসে বলেছিলেন,“উনি তো জাস্ট মলয় রায়চৌধুরীর দাদা! আর কী আছে ওঁর? কখনো সুনীল শিবিরে কখনও শৈলেশ্বর শিবিরে ব্যালেন্স করে চলেছেন.।”
    না, তাদের বিস্ময় কিংবা ধ্যানধারণা আমাকে অবাক করেনি। এমন কী মন্তব্যগুলোও আহত করেনি। বরং স্বাভাবিকই মনে হয়েছিল। কেননা বছর বারো আগে আমি নিজেও তো ছিলাম ওই বিস্মিতের তালিকায়। ‘সমীর রায়চৌধুরী’--নামটার সঙ্গে আমার পরিচয়ও তো শুধু মাত্র হাংরি সাহিত্যের ইতিহাস মারফতই হয়েছিল এবং যে পদ্ধতিতে হয়েছিল সেটাকে আদৌ পরিচয় বলা যায় কিনা সন্দেহ।
    পরিচয়ের সুযোগটা ঘটলো নয়ের দশকের মাঝামাঝি। একটা পোস্টকার্ডে আচমকাই মলয় রায়চৌধুরী জানিয়ে ছিলেন,“ আমার দাদা কোলকাতার বাঁশদ্রোণীতে থাকেন। হাওয়া ৪৯ নামে একটি পত্রিকা সম্পাদনা করেন। যোগাযোগ কোরো।”
    বিশদ ঠিকানা থাকা সত্বেও তক্ষুনি যোগাযোগ করিনি। কিংবা বলা ভালো প্রয়োজন বোধ করিনি। কারণ তিনি মলয় রায়চৌধুরীর দাদা। প্রথম আলাপেই মলয়ের অহঙের সুউচ্চ রেলিং পেরুতে পারিনি। নেহাৎ ওঁর কলম দক্ষতা এবং ঐতিহাসিক গুরুত্বকে খর্ব করতে পারিনি তাই সম্পর্কটুকু বজায় রেখেছিলাম। তাবলে মলয়ের দাদার সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে কেন! যিনি কিনা আবার উচ্চ পদস্থ সরকারি কর্মি ছিলেন তাঁর অহঙ্কারও কি কম কিছু হবে? তাছাড়া কি এমন লিখেছেন ভদ্রলোক যে গাল বাড়িয়ে চড় খেয়ে আসতে হবে!
    কিন্তু সময়ের দাবীকে কে-ই পেরেছে অগ্রাহ্য করতে? মাস কয়েক পর কোলকাতা যাবার সুবাদে ঢুঁ মেরেই বসলাম সমীর রায়চৌধুরীর বাড়িতে। তাবলে আচমকা নয়। টেলিফোনে আগাম কথা বলে ওপারের কন্ঠস্বরকে রীতিমত স্ক্যান করে বুঝে নিতে চেয়েছিলাম, যাওয়াটা কতদূর সম্মানজনক হবে।
    সপরিবারে এসেছি শুনে আমন্ত্রণটাও পেয়েছিলাম সপরিবারেই কিন্তু ঝুঁকি নিতে পারিনি কেননা বিভিন্ন লেখক দাদাদের সৌজন্যে জোটা পূর্ব অভিজ্ঞতা খুবেকটা সম্মানজনক ছিল না। সুতরাং নিশ্চিন্ত হতে পারিনি টেলিফোন এবং আমার কানের বিশ্বস্ততা বিষয়ে। একা একা গিয়ে ঢুঁ মেওে আসাটাই শ্রেয় বোধ করেছিলাম।
    তখনও শহীদ ক্ষুদিরাম স্টেশান চালু হয়নি, মেট্রোর দৌড় টালিগঞ্জ অবধি। কোলকাতার অন্ধিসন্ধিও তেমন চেনা না থাকায় লাট খেতে খেতে হাজির হয়েছিলাম শ্রী রায়চৌধুরীর ব্রহ্মপুরের বাড়িতে। অনেক জমি এবং কিছু গাছপালাসহ দোতলা বাড়িটা দেখে মনে হয়েছিল ভদ্রলোক যথার্থই সাবর্ণ রায়চৌধুরীদের উত্তর পুরুষ। গেট পেরিয়ে বেশ কিছুটা ভেতরে ঢুকে কলিং বেলে বাজানোর পর যিনি বেরিয়ে এসে ছিলেন তাঁকে দেখে আমার পূর্ব ধারণাটাই পাকাপোক্ত হয়েছিল। প্রায় ছ’ফুট,নির্মেদ,টকটকে চেহারা। গোঁফদাড়ি নিখুঁত কামানো। মাথা ভর্তি কালো চুলে এক চিলতে সাদার নিখুঁত আভিজাত্য।
    স্বপরিচয় পেশ করতেই যে প্রশ্নটার সম্মুখীন হলাম সেটার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না।
    --ওরা কোথায়?
    --কে! কারা?
    --তোমার স্ত্রী,কন্যা? ওঁদেরও তো আসার কথা ছিল!
    --না, মানে ইসে, মানে হঠাৎ আমার পিসী......।
    প্রস্তুতি বিহীন মিথ্যে যে কতটা অপ্রস্তুত করার ক্ষমতা রাখে সেটা সেদিন প্রতি পদে টের পেয়েছিলাম কেননা এরপরই মে হাজির হয়েছিলেন শ্রীমতি বেলা রায়চৌধুরী এবং একই প্রশ্ন সহ।
    এবারও একই রকম ভঙ্গীতে মিথ্যে সংবাদ পেশ করেছিলাম, তবে ততক্ষণে যেটুকু সপ্রতিভতা জোগার করতে পেরেছিলাম তার ওপর নির্ভর করে বলে ফেলেছিলাম,“আছি তো কয়েক দিন, আসা যাবে না হয় ফের একদিন।”
    খোঁড়া অজুহাতটাকে ল্যংড়াতে দিলেন না রায়চৌধুরী দম্পতি, নিমিষে লুফে নিলেন,“ ঠিক আছে, কবে আসবে বলো?
    এরপর আর কথার খেলাপ করিনি। দিন দুয়েক পরই কপাল ঠুকে হাজির হয়েছিলাম স্ত্রী এবং চার বছরের কন্যা সহ। এবার ওঁদের দুজনের ঠোঁটেই চওড়া হাসি। শুরু হলো জম্পেশ গল্প গুজব। বিদায় নিয়েছিলাম নৈশাহারান্তে।
    সেই শুরু। আমার সেই চার বছরের কন্যা চব্বিশ বছুরে হওয়ার পরও সেই ধারা বহমান ছিল। এই সেদিনও শোবার ঘরের বিছানার পাশে আমরা চারজন,মশারীর ভেতর বালিশ নির্ভর সমীরদা। আলোচনা যথারীতি গড়াচ্ছে বিষয় থেকে বিষয়ান্তরে। সাহিত্য-সিনেমা-প্রেম-রাজনীতি, কী নয়! এবং যথারীতি সেদিনের আড্ডারও সমাপ্তি অধিবেশন বসেছিল ডাইনিং টেবিলে। শুধু দুটো বিষয়ে খানিকটা ভিন্নতা ছিল।
    (১) সেদিন সমীরদা এসে বসতে পারেননি ডাইনিং টেবলে, দেখাতে পারেননি গৃহিনীপণার নমুনা।
    (২) বিদায় কালে এসে দাঁড়াতে পারেননি বারান্দায়। ঘাড় উঁচু করে দেখতে পারেননি আমাদের বিদায় পর্ব।
    কারণ সমীরদা তখন শয্যাশায়ী।
    থাক সেসব ব্যক্তিগত কথা। আপাতত ফিরে যাওয়া যাক সেদিনের কথায়। তো, সেদিন সমীরদা জানতে চেয়েছিলেন আমার লেখালিখি সংক্রান্ত চিন্তা ভাবনা বিষয়ে। নিজস্ব চিন্তার খানিকটা অংশ শেয়ারও করেছিলেন। বলাবাহুল্য সেসবের অনেকটাই আমার মাথার ওপর দিয়ে বয়ে গিয়েছিল। তবে এটুকু বুঝেছিলাম, মানুষটি ভিন্ন গোত্রের। মাথায় পোকা পোষেন এবং সেগুলো যাতে ঝিমিয়ে না পড়ে তাই নিয়মিত খাদ্য জোগানও দিয়ে থাকেন। নিজস্ব ভাঁড়াড়ে টান পড়লে অন্য মাথা থেকে খাদ্য সংগ্রহ করেন। সেই সুযোগে কয়েকটি পোকা চালানও করে দিয়ে থাকেন সেই মাথায়। সেই মাথাওয়ালা মানুষটি যদি চালাক হয়ে থাকেন তবে রায়চৌধুরী বাড়ির চৌহদ্দি পেরুনো মাত্র সেই পোকাগুলোকে ঝেড়ে ফেলে দিতে কসুর করেন না।
    তবে সবাই পারে না। আমিও পারিনি। হয়তো পারতাম যদি না প্রথম আলাপেই তখনও অবধি সমীরদার একমাত্র প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ, “সিগারেটের তিরোভাব” সংগ্রহ করে না আনতাম।
    যে কোনো গল্প কিংবা কবিতা সংকলনের পাতা উল্টে প্রথমেই নাম গল্প/কবিতাটি পড়ে নেয়ার অভ্যেস আমার চিরকালের। সেই রীতি অনুসারে প্রথম পড়েছিলাম ‘সিগারেটের তিরোভাব’ গল্পটি। গল্প নাকি ধাঁধা! এর নাম গল্প! কিসের গল্প এটি, সিগারেট ছাড়ার? নাকি শিশু মনস্তত্বের? নাকি মৃত্যুর!!!
    গল্পটি যেহেতু সদ্য লেখা তাই এরপর পড়তে চেয়েছিলাম পুরোন গল্পগুলো। বুঝতে চেয়েছিলাম সমীর রায়চৌধুরীর গল্পের বাঁক বদলের ধরণ।
    সবচে পুরোন গল্প ছিল,‘স্মৃতির হুলিয়া প্রতুলের মা অমলেট অবধি।’ আমার ধারণা ছিল লম্বা টাইটেলের স্রষ্টা শুধুই সুবিমল মিশ্র কিন্তু এই গল্পটি প্রমাণ করে দিলো সেই ১৯৫৭ তেই নিয়ম ভেঙেছিলেন সমীরদা। সেই নিয়মভঙ্গ শুধু নামকরণে নয়, বিষয়েও। এখানেও সেই একই ধাঁধা, কিসের গল্প এটা? আসন্ন মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে মায়ের ছবি খোঁজা দিয়ে গল্পটি শুরু হলেও অন্তিমে সেই প্রসঙ্গ বেমালুম উধাও। মাঝখানের পর্বে পাঠককে সঙ্গী করে দৌড়ে বেরিয়েছেন এ গলি-সে গলি,এই সময়-সেই সময়। অথচ পাঠান্তে আদৌ গল্পটিকে অবান্তর ভাবা অসম্ভব। বরং নামকরণের সার্থকতা বিষয়ে নিঃসন্দেহ হতে হয়। মেনে নিতে হয়,সত্যিই তো, যে কোনো স্মৃতির যাত্রা এক সময় অমলেট পর্বে এসেই থেমে যায়। বাকি পর্বটির দখল নেয় বর্তমান তথা জীবন। যদিও এই ভাবনার জন্ম দিতে আমাকে আরও দীর্ঘ দিন সমীর সঙ্গ করতে হয়েছিল। সেদিন বরং ধাঁধিয়েই গিয়েছিলাম।
    সপ্রতিভ মানুষ যেহেতু ধাঁধাঁ পছন্দ করে না তাই নিজেকে মুক্ত করতে পরপর পড়েছিলাম,‘টিনিদির হাত,’‘দ্বিতীয় সংখ্যা,’‘অতিক্রম’,‘সমরেশ কিভাবে অপেক্ষা করে,’‘মাথার ওপরে দাদা আছেন’। সব ক’টা গল্পেরই রচনাকাল পঞ্চাশ এবং ষাটের দশক এবং সব ক’টা গল্পই আমাকে বাধ্য করেছিল ভাবতে, জন্মসূত্রে এবং জীবিকা সূত্রে বরাবর পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্য জগত থেকে দূরে থাকা মানুষটি কিভাবে খুঁজে পেল সাহিত্যের এই নতুন ভাষা যা কিনা নির্দিষ্ট ভূগোলে আবদ্ধ থাকার বদলে আন্তর্জাতিকায় পৌঁছে গিয়েছে!
    ‘আন্তর্জাতিকতা’,এই অভিধাটি মাথায় এসেছিল,‘জলছবি’ গল্পটি পড়ে। কেননা সেই ১৯৬৩ তে যে ম্যাজিক রিয়ালিটির ব্যবহার করেছিলেন সমীরদা তার সঙ্গে ভারতবর্ষের পরিচয় ঘটেছে আশির দশকে, প্রায় কুড়ি বছর পর, মার্কেজের হাত ধরে। অত দিন আগে সমীরদা কিভাবে পেয়েছিলেন ওই কৃৎকৌশলের সুলুক সন্ধান!!
    গল্পটি জন্ম দিয়েছিল অনেক ক’টি বিস্ময়ের।
    প্রথম বিস্ময় জেগেছিল এই তথ্য জেনে যে,আপাদ মস্তক কবিতা পত্রিকা,‘কৃত্তিবাস’ নিয়ম ভেঙে সেই প্রথমবার গল্প প্রকাশ করেছিল এবং সেই নিয়মভঙ্গ ঘটেছিল,‘জলছবি’-র হাত ধরেই?
    দ্বিতীয় বিস্ময়ের কারণ ছিল গল্পটির নির্বাচন। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় পড়েছিলেন গল্পটি! সত্যিই ভালো লেগেছিল! মনে হয়েছিল,ওই গল্পটি নিয়মভঙ্গের দাবী রাখে!
    তৃতীয় বিস্ময় জেগেছিল এই ভেবে যে, সুনীলবাবু যদি সত্যিই গল্পটিতে আগাম বাঁক পরিবর্তনের ইঙ্গিত লক্ষ্য করে থেকে থাকেন তাহলে নিজে,অন্ততঃ একটি গল্প, ওই ধারায় লিখলেন না কেন? সমস্ত প্লেটে ছোঁ মারা তো ওঁর প্রাচীন অভ্যেস! তবে কি বুঝতে পেরেছিলেন যে ওটা তাঁর চায়ের কাপ নয়!
    কিন্তু কে ঘোচাবে আমার ওইসব বিস্ময়! সমীর রায়চৌধুরীর মতো লেখকদের জন্য যেহেতু এ.টি.দেব কিংবা অসিত বাঁড়ুজ্জেরা থাকেন না তাই সব বিস্ময় ঘোচাতে খোদ ওঁরই শরণাপন্ন হয়েছিলাম।
    না, প্রথমে নিজের লেখার স্বপক্ষে একটি কথাও বলেননি সমীরদা। বরং অন্য প্রসঙ্গে চলে গিয়েছিলেন। শুনতে চেয়েছিলেন আমার কথা। সাহিত্য নয়, জীবনের নানান প্রসঙ্গে। খোস গল্প প্রিয় আমি সুযোগ পেয়ে ঝাঁপি খুলে বসেছিলাম। বাপের বয়সী মানুষটির মুখে প্রশ্রয়ের হাসি দেখতে পেয়ে কোনো রকম সেন্সরশীপের ধার ধারিনি। অনেক গল্পের শেষে সমীরদা বলেছিলেন,“ছোট গল্প এরকমই হবে।”
    এহেন আলটপকা মন্তব্যে অবাক হয়েছিলাম।
    --কি রকম!
    --যেভাবে এতক্ষণ গল্প করলে। যেভাবে এতক্ষণ প্রসঙ্গ থেকে প্রসঙ্গান্তরে গিয়ে তুমি নিজেকে আমার কাছে পেশ করলে, ঠিক সেই ভাবে।
    --তা কি করে হয়! উপন্যাস হ’লে তবু নাহয় কথা ছিল, ছোট গল্পে আবার তেমনটা হয় নাকি! গল্পের আদি-মধ্য-অন্ত থাকবে না?
    --না থাকবে না। জীবন তো ওভাবে পর্বে পর্বে ভাগ হয়ে আসে না, তাহলে সাহিত্য কেন হবে? সাহিত্য আর জীবন আলাদা নাকি! তাই সাহিত্যেও থাকবে মুক্ত সূচনা আর মুক্ত সমাপ্তি। তোমার গল্প দিয়ে তোমাকে কিছু বোঝানোর প্রয়োজন নেই বরং পাঠকৃতি দিয়েই পাঠক বুঝে নিক তার মতো করে। তুমি শুধু ভাবনার সংঘাতগুলো মেলে ধরো।
    আরো অনেক অনেক কথা বলেছিলেন সমীরদা। অনেক কিছ্রুই অর্থ বুঝতে পারিনি। শুধু কানে বেজেছে, ‘পোস্ট মর্ডান,’পোস্ট কলোনিয়ালিজম,‘অরৈখিক’, ‘রাইজোমাটিক,’‘কোয়ান্টাম বিজ্ঞান ভাবনা,’‘ক্যায়স,’ ইত্যাদি প্রভৃতি শব্দগুলো। শব্দগুলো আমার কাঁধে এতটাই বোঝা হয়ে চেপে বসেছিল যে ভার মুক্ত হ’তে ফোনে কথা বলেছি, ছুটে এসেছি কোলকাতায়। প্রকৃত শিক্ষকের মতো তিলে তিলে বুঝিয়েছেন সমীরদা। বোঝার সুবিধের জন্য বিভিন্ন লেখা থেকে উদাহরণ পেশ করেছেন। না, একবারের জন্যও নিজের লেখা তুলে ধরার চেষ্টা করেননি। বরং এমন লেখকদের কোট করেছেন যারা কি না সমীরদার ভিন্ন শিবিরের লোক। যদিও সমীরদার কোনো নিজস্ব শিবির ছিল না কিন্তু ওই লেখকরা তেমনই মনে করতেন। অথচ জীবনের শেষদিন পর্যন্ত সমীরদার মুখে কোনো লেখক সম্পর্কে তাচ্ছিল্য সূচক কোনো মন্তব্য শুনিনি, তা তিনি বা তাঁরা যতই হাটুরে কিংবা বাজারে লেখক হোন কিংবা সরাসরি সমীর রায়চৌধুরী বিরোধী।
    সমীরদার কথা শুনতে শুনতে ভেবেছিলাম, ধুর,আমি একা কেন ভেবে মরবো? আমার মতো তো আরও অনেকে আছেন যারা সাহিত্য নিয়ে ভাবনা চিন্তা করেন। ঐকিক নিয়মের সূত্র মেনে আমার কাঁধের বোঝাটাকে আরও দশজনের কাঁধে চালান করে দিলে কেমন হয়?
    বলা ভালো, গল্পবিশ্ব পত্রিকা আমাকে সুযোগ দিলো সেই পরিকল্পনাটাকে বাস্তবায়িত করার। কিন্তু শুধু পরিকল্পনাটাকে বাস্তবায়িত করলেই তো হবে না, সেটাকে সার্থকও করতে হবে। কিভাবে সম্ভব হবে সেটা? সর্বার্থে দীর্ঘ মানুষটিকে ক্রোড়পত্রের সামান্য কয়েকটি পৃষ্ঠায় আঁটানো কি চাট্টিখানি কথা!
    প্রথম সিদ্ধান্তটা নিয়েছিলাম--ক্রোড়পত্রে সমীর রায়চৌধুরীর কোনো গল্প মুদ্রিত হবেনা। কারণ ওঁর রচনা বিষয়ে যারা ওয়াকিবহাল নন তারা একটি কিংবা দুটি লেখা মারফৎ ওঁকে শনাক্ত করুক, তেমনটা আমার অভিপ্রেত ছিলনা। বরং পড়াতে চেয়েছিলাম সমীর রায়চৌধুরীর কথাবার্তা, সাক্ষাতকার এবং সমীর সাহিত্য বিষয়ে অন্যান্যদের চিন্তা ভাবনা। যদি কোনো পাঠক আকর্ষণ বোধ করেন তাহলে তিনি নিজ গরজেই খুঁজে নিয়ে পড়বেন সমীর রায়চৌধুরীর গল্প--চেয়েছিলাম এমনটাই। অর্থাৎ ভাবনা চালান।
    বলাবাহুল্য আমার পরিকল্পনাটাকে সর্বান্তকরণে সমর্থন করেছিলেন সমীর রায়চৌধুরী। কারণ সমীর ঘনিষ্ঠরা প্রত্যেকেই জানেন, রাশি রাশি লিখে সম্পাদকের হাতে গুঁজে দেয়ার চে তাদের সঙ্গে ঘন্টার পর ঘন্টা সাহিত্য সংক্রান্ত কথাবার্তায় কতটা আন্তরিক ছিলেন সমীরদা। কতটা আগ্রহ ছিল মত বিনিময়ে এবং বিতর্কে।
    দ্বিতীয় সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, সমীর সাহিত্য বিষয়ক লেখক তালিকায় মলয় রায়চৌধুরী থাকবেন না। কেননা আমি চেয়েছিলাম সেই সমীর রায়চৌধুরীকে যিনি স্ববলে বলীয়ান। উনি মলয় রায়চৌধুরীর দাদা, এটা নিছকই ব্যক্তিগত তথ্য হিসেবে পরিগণিত হোক।
    আমার দ্বিতীয় সিদ্ধান্তটাকে মেনে নিতে অসুবিধে হয়েছিল সমীরদার। কেননা ‘আমি’ বিরোধী ‘আমরা’ প্রিয় সমীরদার নিজের ‘হয়ে ওঠা’ নিয়ে কোনো মাথাব্যথাই ছিল না। তাছাড়াও যে সমস্যাটা প্রধান হয়ে উঠেছিল সেটা হলো ততদিনে উনি মলয় রায়চৌধুরীকে লেখার আমন্ত্রণ জানিয়ে ফেলেছিলেন। মলয়ের মতো এক প্রধাণ লেখককে আমন্ত্রণ জানানোর পর সেই আমন্ত্রণ ফিরিয়ে নেয়া যে কতটা অসম্মানজনক সেটা আমিও জানতাম। তবু নিজের সিদ্ধান্তে এতটাই অটল ছিলাম যে সমীরদা বাধ্য হয়েছিলেন আমার জেদটা মেনে নিতে। এই প্রসঙ্গে মলয় রায়চৌধুরীর ভুমিকাও যথেষ্ট ধন্যবাদ যোগ্য কেননা ব্যাপারটাকে তিনিও প্রেস্টিজ ইস্যু করেননি। আমার সিদ্ধান্তটাকে মেনে নিয়ে অন্য একটা গদ্য দিয়েছিলেন।
    সমীরদার সাহিত্যের সঙ্গে পরিচিত মুষ্টিমেয় অথচ বিশিষ্ট লেখকদের আমন্ত্রণ জানানোর পাশাপাশি অনুরোধ জানিয়ে ছিলাম বেলা রায়চৌধুরীকেও। কেননা বৌদিকে না দেখলে হয়তো ‘সহধর্মিণী’ শব্দটার ওপর ততটা আস্থাবান হোতে পারতাম না। এ প্রসঙ্গে একটা ছোট্ট নমুনা পেশ করাটা সঙ্গত বোধ করছি। এই সেদিনও, যখন ঘোর অসুস্থ সমীরদা, তখনও আমাদের গল্পগুজবে কোনো আপত্তি তোলেননি বৌদি। বরং বলেছেন,“তোমাদের সাথে কথাবার্তা বলতে পারলেই তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে উঠবে সমীর। আমি জানি এটাই ওর আসল ওষুধ।”
    সেই ক্রোড়পত্রে অন্য লেখাগুলোর পাশাপাশি প্রকাশ করেছিলাম সমীর রায়চৌধুরীর সাক্ষাতকার। অবশ্য সেটাকে সাক্ষাতকার বলাটা কতদূর সঙ্গত, সে বিষয়ে আমি আজও নিশ্চিত নই। বরং বলা ভালো সেসব ছিল একগাদা উৎপটাং প্রশ্ন, যা কিনা আম পাঠকের মনে আকছার জেগে ওঠে।
    যথারীতি বিরক্ত হননি সমীরদা। সমস্ত প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। সেসব উত্তরের সাপেক্ষে কোনো মাতব্বরকে কোট করেননি, নিজস্ব জারণ-বিজারণ মারফত পাওয়া অভিজ্ঞতা সমূহকেই পেশ করেছিলেন।
    দীর্ঘ সাক্ষাতকারটি উদ্ধৃত করা অসম্ভব এবং অহেতুক। তবু খানিকটা নমুনা পেশ করার লোভ সামলাতে পারছি না।
    --“আধুনিক গল্পবিশ্বে লেখকেরা কল্পনা করতেন স্বপ্নদেশের। সমস্ত কিছুই সেখানে ইউটোপিয়াকে কেন্দ্র কেের আবর্তিত হত। রচনার গঠনতন্ত্র, বক্তব্য,ভাষা সব ছিল ললিত,নান্দনিকতত্ত¡ দ্বারা পীড়িত। পোস্টমডার্ন কালখন্ডে প্রথমেই যা ঘটল, তাহল এই ইউটোপিয়ান কনসেপ্টের দেয়াল ভেঙে পড়া। নান্দনিকতার অপর প্রান্ত, সৌন্দর্যের অপর প্রান্ত, শান্তিপ্রিয়তার অপর প্রান্ত --সব জায়গায় অধুনান্তিক লেখকেরা পৌঁছে যেতে লাগলেন। মডার্ন পরিসরে মানুষ কেবল বুঝত হ্যাঁ অথবা না। পোস্টমডার্ন পরিসরে পাঠক এর মধ্যিখানে থাকা অনির্ণীত বিশ্বটিকে আবিস্কার করলেন....দ্যাখো, সাহিত্যে আর শিল্পে আমি মনে করি কেউ কাউকে অতিক্রম করেনা বা বিপ্রতীপ অবস্থান হয়না...বরং উত্তোরত্তর...কন্টিনিউটির ভিন্ন জায়গা খুঁজে বের করে বা আবিস্কার করে...একটা উত্তরাধিকার নিয়ে সে জন্মায় এবং তারপর সে নিজের অর্জনকে যোগ করে,তারপর প্রকাশ করে...ইমলিতলা আমার একটা উত্তরাধিকার..তেমনই মহাভারত...উপনিষদ উত্তরাধিকার...সাহিত্যে কাউকে কাউকে বাদ দিয়ে কাউকে কাউকে বেছে নেব কেন? কে আমার পূর্বপুরুষ নয়? আমি তো অভেদের কথা বলি....এরকম কেউ কেউ ভাবে-হাংরিতে থাকলে কৃত্তিবাসকে আক্রমণ করতে হয়,বা হাংরিকে আক্রমণ করতে হয় বা পোস্টমডার্নকে আক্রমণ করতে হয়,ব্যাপারটা ঠিক নয়,ব্যাপারটা হচ্ছে অতিক্রম করার তত্ত¡...একটাকে বড় করে অন্যটাকে হেয় করে দেখার চেষ্টা করাটা ঔপনিবেশিক ধরতাই। প্রগতিবাদীর যে তত্ত¡,রৈখিকতার যে তত্ত¡--সেটাতে বিশ্বাস করলে এই আক্রমণ বা অসন্তুষ্টির কথা ওঠে....এখন আমি মোটেই লেখা নিয়ে আন্দোলনের কথা ভাববোনা ... সেই কন্ডিশনগুলো এখনও আছে কিন্তু অন্যভাবে হ্যান্ডেল করতে আমরা সবাই শিখে গেছি...শিখেয়েছে আন্দোলনগুলো...অতএব আন্দোলনগুলোকে নিয়ে ঠাট্টা তামাশা করা যায়না...আজ একজন রাজনৈতিক নেতা যখন লগ্নীকারীকে স্বাগতম জানান আমার সেটা বুঝতে কোনও অসুবিধে হয়না...আমি এইজন্য বুঝি যে ঐ জায়গাটাতে যেখানে তিনি আগে ছিলেন সেই জায়গাটাতে আজ পারফর্ম করা যেতে পারেনা...আধুনিকতা ফুরিয়ে যায়নি....আমরা আছি ভেরী মাচ আধুনিকতার মধ্যে...কিন্তু আধুনিকতার মধ্য থেকে বেরিয়ে যে জায়গায় আমরা যেতে চাইছি....যে পরিসরে পৌঁছতে চাইব...সেই অবস্থাপন্নতাকে আবিস্কার করছি।”
    গল্পবিশ্বও সেই সংখ্যাটা কতটা সার্থক হয়েছিল সে সম্পর্কে মতামত দেয়া আমার ক্ষেত্রে শোভন নয়। তবে সম্পাদক হিসেবে এটুকু দাবী করতেই পারি, সমীর রায়চৌধুরীর সাহিত্য নিয়ে সেটাই ছিল প্রথম কাজ। তারপর আরও কেউ কেউ। ভবিষ্যতে অবধারিত ভাবেই আরও অনেকেই করবেন। করতে বাধ্য থাকবেন।
    আমার এই দাবীকে কারুর যদি বাহুল্য মনে হয় সেক্ষেত্রে আমি তাকে অনুরোধ করবো সমীর রায়চৌধুরীর প্রকাশিত শেষ গল্প সংকলনটা পড়ে দেখতে। জীবনভর যে সত্যের অনুসন্ধান করেছেন সমীরদা, খুঁজেছেন যেসব জটিল প্রশ্নের উত্তর, সেসব কিছুই এই বইয়ের দু মলাটের ভেতর বন্দী করে গিয়েছেন। জ্ঞানের ব্যক্তিগত মালিকানাকে প্রকৃত মৌলবাদ হিসেবে বিবেচনা করা বইটার নামকরণও যথার্থ --খুল যা সিমসিম। অর্থাৎ সেই রত্নগুহায় প্রবেশ মন্ত্রটা জনসমক্ষে ফাঁস করে দিয়ে সমীরদা বলতে চেয়েছেন--হে জ্ঞানতাপস, স্বাগতম।
    অনেক দিন আগে নিজের একটা গল্প সংকলনের ব্যাক কভারে শ্রী সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় আকাঙ্খা প্রকাশ করেছিলেন, বাংলা সাহিত্য কোনদিন সৎ হলে তাঁর ওই সংকলনটি পাঠক খুঁজবেন। কিন্তু সৎ-অসৎ,ভালো-মন্দ,সাদা-কালো ইত্যাদি প্রভৃতি বাইনারিতে অবিশ্বাসী সমীরদার প্রয়োজন পড়েনি,‘রেখো মা দাসেরে মনে,’ মার্কা আবেদন পেশ করার। বরং তিনি নিশ্চিত ছিলেন বাংলা সাহিত্যের অনুসন্ধিৎসু পাঠক তাঁর বইটি পড়বেনই। সেই বিশ্বাস থেকেই কোনো ধারাগোল মার্কা হেঁয়ালির পরোয়া না করে প্রচ্ছদে ঝুলিয়ে রেখেছেন একজোড়া চাবি। সেই চাবি সংগ্রাহকদের ভিড় যে দিনকে দিন বাড়বেই সে ব্যাপারে আমিও নিশ্চিত।

     


শুক্রবার

অলোক গোস্বামী : উত্তরবঙ্গে হাংরি আন্দোলন ( ৭ )

Aftershock শুরু হলো তারপর । শৈলেশ্বরের হাত ঝাপটানিতে কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প থেকে সরে গেলেন অনেকে। অরুণেশ তো সরে গিয়েছিলেনই সঙ্গে নিয়ে গেলেন তাঁর কিছু কাছের মানুষজনকেও যাদের কাউকে কাউকে আমরাও কাছের মানুষ ভাবতাম। তাতে অবশ্য আমাদের কিছু এসে গেল না। বরং কনসেন্ট্রেশান ক্যাম্পের কভারে লিখে দিলাম, “সত্যের ঘাত অসহ্য হলে বুর্জোয়া ভাইরাসেরা গড়িয়ে যায় নিজস্ব ভাগাড়ের দিকে।” লিখে দিলাম, “ জানি পাঠক, তুমি পাজামা কিংবা পেন্ডুলাম নও।”
কিন্তু আমাদের কিছু না এসে গেলেও একজনের গিয়েছিল, সুভাষ ঘোষের। চটে গিয়েছিল সুভাষ-শৈলেশ্বর রসায়ন। যদিও নিজস্ব অবস্থান এবং অসহায়তার কথা বন্ধু ‘শৈলেশ’কে আপ্রাণ বোঝাতে চেয়েছিলেন সুভাষ কিন্তু ব্যর্থ হয়েছিলেন। সেই ব্যর্থতা এতটাই চরমে উঠেছিল যে খোদ কোলকাতাতেই শৈলেশ্বরের ইশারায় সুভাষকে শারীরিক ভাবে লাঞ্ছিতও হোতে হয়েছিল। বাল্যবন্ধুর সেই লাঞ্ছনা সংবাদ উত্তরবঙ্গের অনুচরদের কাছে পৌঁছে দিতে দ্বিধা দেখাননি শৈলেশ্বর ঘোষ।
হ্যাঁ, ততদিনে এক অলিখিত নিয়মে ক্ষুধার্ত শিবির ত্রিধা বিভক্ত হয়ে পড়েছে যেটা আমাদের আদৌ অভিপ্রেত ছিল না। এক শিবিরের অধিনায়ক শৈলেশ্বর ঘোষ। অন্য শিবিরের অধিনায়ক মলয় রায়চৌধুরী এবং তৃতীয় শিবির কনসেনট্রেশান ক্যাম্প, যার নেতৃত্বের দায় জোর-জবরদস্তি চাপিয়ে দেয়া হলো সুভাষের কাঁধে। অথচ আমরা কোনদিনই কারো নেতৃত্বকে স্বীকার করার মতো অবস্থানে ছিলাম না। সুভাষও অপচেষ্টা করেনি চেপে বসার তবু ইতিহাসের রসিকতা বোধের ফের একবার প্রমাণ পাওয়া গেল। ইতিহাসের রসিকতা বলার কারণ সেই ষাটের দশকে প্রকাশিত সুভাষের একটি গদ্যগ্রন্থের নাম ছিল,‘যুদ্ধে আমার তৃতীয় ফ্রন্ট।’ নামকরণের সেই ক্ষণে সুভাষ কি আদৌ ধারণা করতে পেরেছিলেন ভাবী সময় কোনদিন তাকে সত্যি সত্যি এমন জায়গাতেই এনে দাঁড় করাবে?
রসিকতা দূরে থাক, মূল সত্য এটাই যে, এরপরও সুভাষ ঘোষের কোনো নিজস্ব শিবির ছিল না। ছিল না নিজস্ব অনুচর বাহিনী। ছিল না সঙ্গী নির্বাচনের উপযুক্ত কোনো মেটাল ডিটেক্টর। এমন কী মনমতো হাংরি ইতিহাস লেখারও কোনো অ্যাজেন্ডা ছিল না। যা ছিল তা শুধু ঘাড় নীচু করে লিখে যাওয়া, নিজের লেখা পাঠ করে শোনানোর পাশাপাশি তরুণ লেখকদের লেখা শোনা এবং মতামত দেয়া। এছাড়া বেঁচে থাকার অন্য কোনো উদ্দেশ্যও ছিল না সুভাষের। যে কোনো যৌথতায় বিনা আমন্ত্রণে হাজির হোতে আপত্তি ছিল না কোনো।
আমাদের অবাধ্য হওয়ার নমুনা পাওয়া মাত্র শৈলেশ্বর ঘোষ ভিন্ন শিবিরের খোঁজার পালা শুরু করে দিয়েছিলেন। সৃষ্টিশীলতা, ইতিহাস প্রসিদ্ধি এবং ক্ষুরধার বুদ্ধির ত্র্যহস্পর্শে পেয়েওছিলেন তৃতীয় প্রবাহের সন্ধান। তবে এক্ষেত্রে খানিকটা সমঝোতা করতে উনি রাজী হয়েছিলেন। যেমন ওই শিবির কবি শৈলেশ্বরকে স্বীকৃতি দিলেও ক্ষুধার্ত আন্দোলনের প্রতি বিন্দুমাত্র সহানুভূতিশীল ছিল না। অবশ্য তখন শৈলেশ্বরের তাতে আর কিছু এসে যায় না। মলয়ের লাগাতার আক্রমণে ক্ষুধার্ত আন্দোলন তখন শৈলেশ্বরের কাছে বোঝা স্বরূপ।
যথারীতি সে পর্বও দীর্ঘদিন লাস্টিং করলো না। করার কথাও নয়, জানতাম আমরা। কিভাবে জানতাম বলতে চাইছি না। অহেতুক তৃতীয়পক্ষকে টেনে কী লাভ! বরং সেসময়ের একটা শ্লোগানের কথা বলি-- “অস্তিত্ব পুড়ছে, আসুন সেই আলোয় আমরা পরস্পকে শনাক্ত করি।”

আগুন নিয়ে যতই কাব্য রচিত হোক, আগুন বেচারি বড্ড অবোধ। পুড়িয়ে ফেলেই তার তৃপ্তি, শনাক্তকরণের ধার ধারে না। আমিও তো তুষার রায় নই যে এতদিন পর ছাই ঘেঁটে বলে দেবো পাপ ছিল কিনা!
শৈলেশ্বর, সুভাষ, অরুণেশকে নিয়ে অনেক কথাই হলো, এবার অন্য হাংরিদের প্রসঙ্গে যাওয়া যাক।



  • মঙ্গলবার

    অলোক গোস্বামী : উত্তরবঙ্গে হাংরি আন্দোলন ( ১ )

    একটা সাহিত্য অনুষ্ঠানে গিয়ে আচমকাই পরিচয় ঘটেছিল রাজা সরকার, সমীরণ ঘোষ এবং মনোজ রাউতের সঙ্গে। যদিও ওদের সচরাচর কোনো সাহিত্য অনুষ্ঠানে দেখা যেত না তবু তিনটে মুখই আমার পরিচিত ছিল। সেটাই স্বাভাবিক, শহরে কজনই বা লেখালিখি করতো! জানা ছিল ওদের পত্রিকার নাম কুরুক্ষেত্র, ঋত্বিক এবং ধৃতরাষ্ট্র। ওরা আমাকে গুরুত্ব দিতো না জন্য আমিও ওদের এড়িয়ে চলতাম। সেদিন কিভাবে যেন দূরত্বটা ঘুচে গিয়েছিল! অনুষ্ঠান শেষে আমরা চারজন দীর্ঘক্ষণ আড্ডা দিয়েছিলাম। শুধু সেদিন নয়, তার পরের দিনও। এমন কী তার পরের পরের পরের দিনও। অবশ্য দিন না বলে সন্ধ্যে বলাটাই সঠিক হবে।
    আড্ডা দিচ্ছি বটে কিন্তু টের পাচ্ছি তেমন জমছে না। আমার লেখালিখি নিয়ে ওদের তিনজনেরই কোনো মাথাব্যথা নেই। ওদের লেখাপত্র নিয়ে আমি মাথা খাটাতে চাইছি বটে কিন্তু হালে পানি পাচ্ছি না কারণ ওদের লেখালিখির ধরণ ছিল আমার ঘরানার চে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরণের। এমন কিছু শব্দ সেসব লেখায় থাকত যেগুলোকে এতদিন অশ্লীল বলেই মেনে এসেছি।তাছাড়াও পুরোটাই এমন খিটকেলে ধরণের যে চাইলেও এগোনো যাচ্ছে না। এরকম পরিস্থিতিতে বন্ধুত্বও এগোনর কথা নয়। আচ্ছা, দেখা হবে, এরকম কিছু একটা বলে উঠে পড়া এবং ভবিষ্যতে ওপথ না মাড়ানোটাই ছিল স্বাভাবিক পন্থা। কিন্তু তেমনটা হলো না। কেন? জানি না। কে জানে, পুরোন দিনের গল্পে যেমন থাকত, বিধাতা অলক্ষে দাঁড়াইয়া হাসিলেন, প্রথমদিনের আলাপের ক্ষণে হয়ত তেমন কিছু ঘটেছিল! হয়ত কেন, আলবত ঘটেছিল। নাহলে আমি কেনই বা একতরফা ভাবে প্রতি সন্ধ্যেয় হাঁ করে ওদের কথা গিলে যাব? কেনই বা ওদের পরামর্শ মোতাবেক নিজের পাঠক্রম বদলে নেব!
    রাজা, মনোজ এবং সমীরণের সঙ্গে যে ততদিনে হাংরিদের যোগাযোগ ঘটে গিয়েছে, সেটা কিন্তু তখন জানতাম না। অবশ্য জেনেই বা কী হোত, আমি তো হাংরি আন্দোলন কী বস্তুু সেটাই জানতামই না!
    ওদের সুবাদে পরিচিত হলাম হাংরি সাহিত্যের সঙ্গে। পড়লাম সুভাষ, শৈলেশ্বর, ফালগুনি, প্রদীপ, বাসুদেব, অরুণেশদের লেখাপত্র। পড়ে কাঁচামাথা ঘুরে যাবার উপক্রম। এর নাম সাহিত্য! সেই কবে থেকে সাহিত্য পড়ে আসছি, সেসবে যৌন বিবরণও যথেষ্টই ছিল কিন্তু খানিকটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে। এরকম সরাসরি নয়। পড়ে শরীর কিছুটা গরম হোত। কিন্তু এরা যেন চামড়া তুলে নিয়ে লালাভ শরীরটা দেখাচ্ছে। পড়তে গিয়ে গা ঘুলিয়ে ওঠে ! ভাবি, এসবও যদি সাহিত্য পদবাচ্য হয়ে থাকে তবে তা কখনই সরস্বতীর আশীর্বাদ পুষ্ট হোতে পারে না বরং অভিশাপগ্রস্ত বলা যেতে পারে। হয়ত সে কারণেই এদের জেল জরিমানা ঘটেছিল।
    তবে এদের ভেতরে বাসুদেব দাশগুপ্তর লেখাপত্র খানিকটা টেনেছিল। ওর টেকনিকে খানিকটা মুগ্ধতা জেগেছিল। মনে হয়েছিল সর্বাংশে অভিনব। তাবলে বাসুদেবের সব লেখাই যে ভালো লেগেছিল, তা নয় কেননা কিছু গল্পকে পূর্বদোষেই দুষ্ট মনে হয়েছিল।
    দুঃখ পেয়েছিলাম। আচ্ছা, যাদের এত পড়াশোনা, কলম যাদের এতটা শক্তিশালী তারা কেন শব্দ সচেতন নন! অশ্লীল শব্দ ব্যবহার করে কি সুখ পান? কেন লেখেন এমন? বিশেষ করে অশ্লীলতার দায়ে রাষ্ট্র কর্তৃক অভিযুক্ত হওয়ার পরও!
    এসব প্রশ্নের উত্তর জেনে নিতে পড়লাম ওদের সাক্ষাতকার এবং প্রবন্ধগুলো। চোখের সামনে থেকে বন্ধ জানালা খুলে গেল। জানলাম, সাহিত্য নিছকই বিনোদনের মাধ্যম নয়। বরং বিনোদনের সাহিত্য এক আফিম। পাঠক রুচি নামক ইওটোপিয়াকে সামনে রেখে শিল্প সংস্কৃতির যে বেসাতি চালু আছে তার মূল উদ্দেশ্য শুধুই মুনাফা নয়,জনচেতনাকে দাবিয়ে রাখাও। সাহিত্য এবং জীবনকে একই মুঠোয় ধরতে হয়।
    জানলাম, সত্য যদি শিব হয়েও থাকে কিন্তু সেটা আদৌ সুন্দর নয়। তাছাড়া সত্য কখনও একমাত্রিক হয় না। বরং জীবনের মূল সত্যকে গোপন করতেই কলাকৈবল্যবাদ কিংবা প্রগতিশীলতার তত্ত্বের জন্ম।
    এতদিন জানতাম, লিটল ম্যাগাজিন প্রতিষ্ঠানের আঁতুড় ঘর। এখানে হাঁটতে শিখে কবি/লেখকবৃন্দ দৌড়ে গিয়ে ঢুকে পড়ে প্রতিষ্ঠানের বারান্দায়। ব্যস, খোলা বারান্দায় এরপর যতখুশী নাচানাচি, জাগলারি, হাতসাফাই দেখানোর অনন্ত স্বাধীনতা। বারান্দার নীচে দাঁড়িয়ে পাঠককূল সেসব দেখে জীবন সার্থক করে তুলবে। ওই ভিড়ের মধ্যে থাকা কয়েকজন লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদক কলার তুলে বলবেন, বন্ধুগণ, ওই যে প্রোদুনোভা ভল্ট স্পেশালিস্টকে দেখছেন, উনি আমার সাপ্লাই।
    এবার জানলাম,লিটল ম্যাগাজিন কোনো সমান্তরাল সাহিত্য সৃষ্টির আখড়া নয়, বরং প্রচলিত সাহিত্যের বিপরীতে এর অবস্থান। লিটল ম্যাগাজিনের সঙ্গে আরেকটি শব্দ ওতপ্রোত জড়িত- আন্দোলন। যে আন্দোলনের উদ্দেশ্য,পাঠককে সচেতন করে তার প্রত্যাশা বাড়ানো। লিটল ম্যাগাজিন বাজারি রুচির তোয়াক্কা তো রাখেই না বরং তেজস্ক্রিয় ভাষা মারফৎ প্রতিষ্ঠিত ধ্যান-ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে। কারণ প্রতিষ্ঠিত ধ্যান-ধারণা সব সময়ই ওপর থেকে চাপিয়ে দেয়া হয়ে থাকে। জীবনের তলা থেকে উঠে আসে না। গা গতরের ভাষা ব্যবহার করে ভাষাকে এলিটিজম থেকে মুক্ত করাটাই লিটল ম্যাগাজিনের প্রধান কাজ। পাঠককে ঘা মেরে জাগাতে ভাষা সন্ত্রাস ঘটাতে হবে। একমাত্র সেভাবেই প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করা যাবে। পরিচিত হলাম নতুন শ্লোগানের সঙ্গে, প্রতিবাদের সাহিত্য।
    কিন্তু কেমন হবে সেই সব লেখাপত্র? পড়লাম,মানিক-জীবনানন্দ-জগদীশ-সতীনাথ-শান্তিরঞ্জন-অদ্বৈত-দস্তেয়ভস্কি- মিলার- জেঁনে- র‍্যাঁবো- বারোজ - কামু- কাফকা। পড়লাম মার্কসবাদ সংক্রান্ত কিছু লেখাপত্রও। কারণ একমাত্র মার্কসবাদই তাত্ত্বিক ভাবে প্রমাণ করেছে প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা নিছকই আবেগ সঞ্জাত কোনও রোমান্টিক আগ্রহ নয়। এর সুস্পষ্ট আর্থ- সামাজিক-রাজনৈতিক-ঐতিহাসিক ভিত্তি রয়েছে। একমাত্র মার্কসবাদীরাই জানে, বিপ্লবী কর্মকান্ডের সঙ্গে সাংস্কৃতিক আন্দোলনকে যুক্ত করতে না পারলে প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করা অসম্ভব।
    জানলাম, বুঝলাম কিন্তু মেনে নিলাম কি? যদি মেনে নিয়ে থাকি কেন নিলাম? এসব কূট প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে ফের নিজের প্রসঙ্গে ফিরতে হবে। ত্রুটি মার্জনীয়।
    এমন এক পরিবারে জন্মেছি যাদের ঝুঁকি বহির্ভূত জীবন যাপন করে চলাটাই একমাত্র লক্ষ্য। কোনো ঝুট ঝামেলার আভাসটুকু পেলে সঙ্ঘারামে খিল এঁটে বসে থাকাটাই ছিল পারিবারিক রেয়াজ। মনুষ্য জীবন কি খইমুড়ি নাকি যে অহরহ ফুটবে? তার চাই নিস্তরঙ্গ জীবন।সুতরাং স্নেহ-প্রীতি-সম্মান-ভক্তি-শ্রদ্ধা -শৃঙ্খলা, এজাতীয় কিছু শব্দের প্রতি পরিবারের প্রত্যেকের ছিল অন্ধ আনুগত্য। প্রতিবাদ নামক শব্দটার ধার কাউকেই খুব একটা ধারতে দেখিনি। 

    বৃহস্পতিবার

    অলোক গোস্বামী আলোচনা করেছেন মলয় রায়চৌধুরীর উপন্যাস 'ডুবজলে যেটুকু প্রশ্বাস'



    শ্বসন অথবা শাসন প্রণালী
    প্রস্তাব এসেছিল মলয় রায়চৌধুরীর যে কোনো একটি গদ্য কিংবা কবিতা সংকলন নিয়ে আলোচনা করার, কিন্তু আমি তো ফোরেনসিক আলোচক নই। কোনো রচনাকে পোস্টমর্টেম টেবিলে ফেলে, ফালাফালা করে, মাংস-কৃমি খুঁটে বের করে, ভালো কিংবা মন্দ লাগাকে তত্ত্বের কড়াপাকে নাড়াচাড়া করে বিশ্লেষণ করতে শিখিনি। কোনো রচনা যদি পারে হ্যাঁচকা টানে গভীর সমুদ্রে ফেলে দিয়ে হাঙরের ঢেউয়ে লুটোপুটি খাওয়াতে তাহলে তারপর যা পারি তাহলো গ্রন্থটির খোলা পাতার সামনে স্তব্ধ হয়ে বসে থাকতে। অনেক ক্ষণ। দীর্ঘক্ষণ। তারপর বড় জোর সমমনস্ক কারো সঙ্গে পাঠ প্রতিক্রিয়াটুকু বিনিময় করতে পারি। তাই কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে দিয়েছিলাম আমার অপারগতার কথা কিন্তু ওরা ওই পাঠ প্রতিক্রিয়াটুকুতেই রাজী হওয়ায় বেছে নিলাম,“ডুবজলে যেটুকু প্রশ্বাস” উপন্যাসটি।

    কেন এই নির্বাচন, সেটা এক কথা্য় বলা যাবে না। পেছনে অনেকগুলো  কারণ আছে। প্রধান কারণ অবশ্যই, এটা কবি মলয় রায়চৌধুরীর প্রথম উপন্যাস যা লিখিত হয়েছিল ১৯৯১-৯৩তে এবং হাওয়া ঊনপঞ্চাশ প্রকাশনী থেকে ১৯৯৪ তে প্রকাশিত হয়েছিল। সে সময়ই আজীবন ভ্রাতৃবৎসল সমীর রায়চৌধুরী আমাকে উপন্যাসটি উপহার দিয়ে পড়ে দেখতে অনুরোধ করেছিলেন।বইটা নিয়েছিলাম বটে কিন্তু পড়িনি। অবহেলা বশতঃ ফেলে রেখেছিলাম, অন্ততঃ মাস খানেক তো বটেই। তারপর কী জানি কেন, একদিন পড়তে শুরু করেছিলাম! তারপর আর ফেলে রাখতে পারিনি। প্রায় এক সিটিঙেই শেষ করেছিলাম ছিয়ানব্বই পাতার এই উপন্যাসটি। স্বীকার করতে অসুবিধে নেই, পাঠ শেষে এতটাই  মুগ্ধ হয়েছিলাম যে এরপর এই চব্বিশ টাকা মূল্যের বইটির অনধিক চব্বিশ বছর আমার সঙ্গী হয়ে থাকতে অসুবিধে হয়নি। এই প্রসঙ্গে বলে রাখা ভালো, এর মধ্যে আমার বাসভূমির বদল ঘটেছে। নিজস্ব শহর এবং পৈত্রিক দ্বিতল বাড়ি(যার একতলায় নিজস্ব লাইব্রেরি ছিল)ছেড়ে এসে মাথা গুঁজতে হয়েছে ভিন শহরের  ছশো স্কোঃ ফুঃ- র এক শয়নকক্ষ সমৃদ্ধ ফ্ল্যাটে। মাপজোখের তথ্যটা জানানোর কারণ, স্থান সমস্যার কারণে ইচ্ছে অনিচ্ছায় আমাকে অনেক বইপত্রর মায়া ত্যাগ করে আসতে হয়েছে। এমন কী নিজের গল্প সংকলনের দু/তিন কপি বাদ দিয়ে বাকিগুলো অকাতর  বিলিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছিলাম অথচ কী আশ্চর্য, এই বইটির ক্ষেত্রে ততটা নিস্পৃহ হোতে পারিনি!কিছু বাছাই বইপত্রের মাঝখানে ছোট্ট উপন্যাসটি আজও মুখ গুঁজে রয়েছে। এখন পাঠ প্রতিক্রিয়া লেখার স্বার্থে ফের যখন উপন্যাসটি পড়ছি তখনও অবাক হয়ে লক্ষ করছি এই রচনার বিষয়বস্তু এবং গদ্যশৈলী প্রথমদিন আমাকে যতটা আকৃষ্ট করেছিল, আজও ততটাই করছে। বাধ্য হয়ে নিজেকেই প্রশ্ন করছি, তবে কি চব্বিশ বছর ধরে এই উপন্যাসটি আমার সঙ্গ ছাড়েনি এই কারণে যে একদিন আমাকে দিয়ে পাঠ প্রতিক্রিয়া লিখিয়ে ছাড়বে,তাই?

     হোতেই পারে এটা নিছকই আমার মনগড়া কল্পনা! হয়ত এই ভাবনা আমাকে তৃপ্তি দিচ্ছে! সে যা হোক মোদ্দা কথা হলো আপাততঃ এটাই প্রধান কারণ।   

     যারা উপন্যাসটি পড়েননি তারা কেউ জানতে চাইতেই পারেন, কী এমন মনিমাণিক্যের সন্ধান জুগিয়েছে মাত্র ছিয়ানব্বই পাতার এই উপনাস!কৌতুহলটা অবাঞ্ছিতও নয়, কিন্তু এ প্রসঙ্গে পরে কথা হবে। আপাতত জানাতে হবে, কেন আমি সেদিন মলয়ের উপন্যাসটির ব্যাপারে প্রথমে আগ্রহ দেখাইনি? কেন  অবহেলায় ফেলে রেখেছিলাম? আমি যে ততদিনে  মলয় রায়চৌধুরীর নাম শুনিনি কিংবা ওঁর লেখাপত্র পড়িনি, তা তো নয়! তাহলে?

    এই বিবমিষা প্রসঙ্গে কথা বলতে হলে আমাকে ব্যক্তি মলয় রায়চৌধুরী প্রসঙ্গে ঢুকতেই হবে এবং সেটা যে খুব অপ্রাসঙ্গিক হবে, তাতো নয়। হাংরি ম্যানিফেস্টো অনুযায়ী বাসুদেব দাশগুপ্ত বাদে সব হাংরি গদ্যকারই লেখার মালমশলা তুলে এনেছেন নিজের জীবন থেকে এবং কোনো মীথ-মেটাফর-অ্যালিগরির ধার না ধেরে সরাসরি সেসব তুলে ধরেছেন পাঠকের সামনে। ওদের কাছে, যা কিছু ব্যক্তিগত সেটাই অশ্লীল। ওরা সন্ধান করেছেন গা-গতরের ভাষার। মেধার কর্টেক্সে পেনসিল ডুবিয়ে শিল্পচর্চা করার ঘোর বিরোধী ওঁরা প্রত্যেকেই। বন্ধুদের সঙ্গে যতই বিরোধিতা থাকুক মলয়ও বরাবর একই কাজ করেছেন, করে আসছেন। তিনি এবং তাঁর সাহিত্য, একে অন্যের পরিপূরক। তিনিও কোনদিন কল্পনাশ্রিত সাহিত্যচর্চা করেননি। সরাসরি বলেছেন-- দেখি খুল্লামখুল্লা লেখার চেষ্টা করে কতোটা কি তুলে আনতে পারি! উপন্যাস লিখতে বসে ঘটনা খুঁড়ে তোলার ব্যাগড়া হয় না। জীবনকেচ্ছা লিখতে বসে কেচ্ছা-সদিচ্ছা-অনিচ্ছা মিশ খেয়ে যেতে পারে, তার কারণ আমি তো আর বুদ্ধিজীবি নই। জানি যে মানুষ ঈশ্বর গণতন্ত্র আর বিজ্ঞান হেরে ভুত…..বাঙালি সাহিত্যিকদের চাঁদমারি ভাগ্য যে তাঁদের ইউরোপীয় সাহিত্যের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হয় না। বাংলা পাল্প ফিকশন হলো ঘোলা জলের আয়নায় মুখদর্শন…...সাহিত্যজগত থেকে ছিঁড়ে নিজেকে আলাদা না করলে লেখালিখি করা যায় না….আমি সাহিত্যিক লাউডগাগিরিতে ভুগি না, বুঝলেন তো! আমার লেখালিখি নিছক সাহিত্য নয়। গণপাঠককে আনন্দ দেবার জন্য নয় তা। পাঠককে চৌচির করে তার ভেতরে সমাজরাষ্ট্রের গুগোবর ভরে দেবার জন্য। আর আমি শিল্প ব্যাপারটার বিরুদ্ধে , কেননা আমাকে সারিয়ে প্রাচীন গ্রিক হেলেনিক সমাজের যোগ্য করে তোলা যাবে না। আমি চাই না যে আমার শবযাত্রায় কবি লেখকরা ভিড় করুক। একজনকেও চাই নাআমি লেখালিখি বেছে নিইনি, লেখালিখি আমাকে বেছে নিয়েছে ….প্রথম আদিম মানুষ যেমন পাথরের ছোরা আবিষ্কার করেছিল তেমনই আমি নিজের লেখালিখির অস্ত্রশস্ত্র আবিষ্কার করে ফেলেছি।

      যারা এই উপন্যাসটি পড়েছেন তারা হযত ধুঁয়ো তুলবেন,কই, এই উপন্যাসে তো ম্যালা চরিত্র! তাদের একেক জনের জীবন একেক রকম। এবং তারা কেউ মলয় রায়চৌধুরী নন।  মলয় রায়চৌধুরী নামে একটি চরিত্র আছে বটে কিন্তু সারা উপন্যাসে তার উপস্থিতি মোটে দুবার, দু লাইনে। এবং সেই চরিত্রের ভূমিকাও নিছকই একজন আমোদগেঁড়ের।

     উদ্ধৃত করতেই পারেন বইটির ভেতরের পাতায় লিখে দেয়া লাইনগুলো ,” ডুবজলে যেটুকু প্রশ্বাস একটি কাল্পনিক উপন্যাস। চরিত্র, ঘটনা বা সংস্থার সঙ্গে মিল ঘটে গিয়ে থাকলে তা আকস্মিক।

     আমার কাছে একটি আপত্তিও গ্রহণযোগ্য হবে না কারণ উপন্যাসটি পাঠের পর কারুরই বুঝতে অসুবিধে হওয়ার কথা নয় যে এই উপন্যাসেও মলয় নিজেকেই ব্যবহার করেছেন। প্রতিটা চরিত্রই তার খুব কাছের মানুষজন। এই লুকাছুপির কারণ, উপন্যাসটির ব্যাকপ্রাউন্ড ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাঙ্ক এবং উপন্যাস রচনা কালীন সময়ে যেহেতু মলয় রিজার্ভ ব্যাঙ্কের অধিকর্তা পদে কর্মরত তাই জীবিকা স্বার্থেই এই বিধিসম্মত সতর্কীকরণ এবং ওইসব ফর্মগত ছলচাতুরী। ঘরপোড়া গরুর তো সিঁদুরে মেঘ দেখে ডরানোর কারণ থাকেই। এসব তুচ্ছ বিষয় বাদ দিলে যা থাকে তার সবকিছু মলয়সুলভই।

    অতএব এরপর আমি নিশ্চিন্তে এই উপন্যাসের পাঠ প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে নির্দ্বিধার ব্যক্তি মলয় রায়চৌধুরী সম্পর্কে কিছু কথা বলতেই পারি এবং সেই বলাটা আদৌ শিবগীতি হবে না। তারচেও বড় কথা হলো, ইতিহাসের স্বার্থেই ওসব কথা আমি বলতে বাধ্য। বর্তমান সময় থেকে পঁয়ত্রিশ বছর আমাকে পিছিয়ে যেতেই হবে। জানাতেই হবে যে, কিভাবে কিভাবে একদা মলয় রায়চৌধুরীর সংস্পর্শে এসেছিলাম।

     আজ যেমন বাংলা সাহিত্যের পাঠক মাত্রই ওঁর রচনার সঙ্গে পরিচিত, সেদিন, আটের দশকের শুরুতে আমার কিন্তু তেমন অভিজ্ঞতা ছিল না। ক্ষুধার্ত আন্দোলন বিষয়ে জানকারি বাড়াতে গিয়ে মলয়ের নাম শুনেছিলাম বটে কিন্তু সেটা ছিল জাস্ট উল্লেখ মাত্র। তৎকালীন ক্ষুধার্ত লেখকবৃন্দ অনেক নামের সঙ্গে মলয়ের নামটুকু জানিয়ে ছিলেন বটে, ওঁর ক্যারিশ্মা সম্পর্কে কোনো তথ্যই ফাঁস করেননি। সেদিন তাই সবার লেখা পড়লেও মলয়ের লেখার সঙ্গে পরিচয় ছিল না। ওঁর,” প্রচন্ড বৈদ্যুতিক ছুতারশুধু যে পড়িনি, তা নয়, জানতামও না যে ওই কবিতার কারণেই রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্র সংক্রান্ত কেস কাছারি ঘটেছিল। বরং জানতাম শৈলেশ্বরের একটি কবিতাই ছিল ওই মোকদ্দমার কারণ।

    অন্যভাবে‌ও মলয় সম্পর্কে জানার কিংবা ওঁর লেখাপত্র পড়ার সুযোগ ছিল না। কোথাও পাওয়া যেত না  মলয়ের লেখাপত্র।  মলয়ের সঙ্গে যোগাযোগেরও সুযোগ ছিল না কারণ অভিমান এবং ক্যারিয়ার গোছানোর কারণে মলয় তখন ছিলেন স্বেচ্ছা অজ্ঞাতবাসে।

    তো মলয় রায়চৌধুরীর কিরিয়া করমের সঙ্গে প্রথম পরিচয় ঘটে  তিরাশি/চুরাশি নাগাদ, ‘পথের পাঁচালীপত্রিকার পাতায়। পুনরাবির্ভাবেই ফের শোরগোল মাচিয়ে দিলেন মলয়। হাংরি আন্দোলেন ওঁর ভূমিকার কথা সেই প্রথম জানলাম বটে কিন্তু সেই জানকারির পুরোটাই ছিল ভাসাভাসা। কারণ তথ্যের পরিবর্তে ওই সাক্ষাতকারের পুরোটাই ছিল প্রাক্তন সহলেখকদের বিরুদ্ধে  ব্যক্তিগত বিষোদ্গার এবং অহং সর্বস্ব রণহুঙ্কার। (যে অভ্যেস মলয় আজও বজায় রেখেছেন। ভালোমন্দ কিম্বা ভদ্রতা-অভদ্রতার তোয়াক্কা না রেখে কারণে-অকারণে ছোড়া মলয়ের ইগোয়িস্ট হুঙ্কার চোখে পড়েনি এমন পাঠক আজ বিরল। অবশ্য দৃষ্টি আকর্ষণের এই কৌশলটা যে পুরো বিফলে যায়নি তার প্রমাণ, এপার ওপার বাংলা মিলিয়ে আজ মলয় রায়চৌধুরীর পাঠক সংখ্যা নেহাত কম নয়।)

    সেদিন কিন্তু বিরক্তই হয়েছিলাম। শুধু আমি নই, বাংলা সাহিত্যের পাঠক মাত্রেরই একই রকম প্রতিক্রিয়া হয়েছিল। সেটাই ছিল স্বাভাবিক কারণ মলয়ের ঘোষিত প্রতিদ্বন্দ্বী,শৈলেশ্বর ঘোষ ততদিনে প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান বিরোধী কবি। উল্টোদিকে মলয় নতুন প্রজন্মের কাছে বিলকুল অচেনা। প্রাক্তণেদরও মলয়ও একদা এতটাই উত্যক্ত করেছিলনে যে তারাও মলয়কে পাত্তা দিতে চাননি।

     মলয় রায়চৌধুরীর দ্বিতীয় উপস্থিতি সম্ভবত চোখে পড়েছিলকবিতা দর্পনপত্রিকায়। সেই একই রকম খোট্টা পালোয়ান সুলভ আস্ফালন। যথারীতি সবার কাছে বিরক্তিকর।

    মলয়ের তৃতীয় উপস্থিতি  ‘মহাদিগন্তপত্রিকায়। একমাত্র এই উপস্থিতির মাত্রা ছিল ভিন্ন রকম। মহাদিগন্ত পত্রিকা সেদিন হাংরি মামলার খুঁটিনাটি( দলিল দস্তাবেজ সহ) প্রকাশ করেছিল। বাংলা সাহিত্যের পাঠকেরা প্রকৃত সত্য জানতে পেরেছিল। সেই প্রথম আমরা পড়েছিলাম মলয় রায়চৌধুরীর  ‘প্রচন্ড বৈদ্যুতিক ছুতারসহ আরও কিছু লেখাপত্র। বুঝেছিলাম, সেদিনের হাংরি আন্দোলনের প্রতিষ্ঠানের ভিত কাঁপিয়ে দেয়া, আন্তর্জাতিক নজর আকর্ষন করা, সবকিছুর পেছনেই ছিল মলয় রায়চৌধুরীরই প্রধান ভূমিকা এবং মোকদ্দমা-জেল-জরিমানা এবং নিশর্ত মুক্তিপর্বের পর সত্যি সত্যিই সেই হাংরি অান্দোলনের মৃত্যু ঘটে গিয়েছিল। যা ছিল সেটা শুধুই ক্ষুধিত প্রজন্মের সাহিত্য, যার চালিকা শক্তি ছিলেন শৈলেশ্বর ঘোষ, সুভাষ ঘোষ, প্রদীপ চৌধুরী, অরুনেশ ঘোষেরা। সেটা আদৌ আন্দোলন ছিল না। মলয়ের মতো আন্দোলনের নেতৃত্ব দেয়ার ক্ষমতা ওদের কারো ভেতরই ছিল না।  

    এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, বাংলা সাহিত্যে মলয় রায়চৌধুরীর পুনঃপ্রতিষ্ঠার মঞ্চটা সাজিয়ে দেয়ার পেছনে ডঃ উত্তম দাশের নিখুঁত সম্পাদনার ভূমিকা অনস্বীকার্য।  কে জানে. হয়ত স্বভাবগত কারণে মলয় এই গুরুত্বকে অস্বীকার করবেন, হয়ত একই রকম অহঙের উদগার তুলবেন  কিন্তু তাতে ইতিহাসের কিছু এসে যায় না। ফ্যাক্ট ইজ ফ্যাক্ট।
     
     হ্যাঁ, মহাদিগন্ত পর্বের পরই  মলয়ের প্রতি আমার আগ্রহ জন্মেছিল। ঠিকানা জোগার করে একটা চিঠিও পাঠিয়ে ছিলাম। কিন্তু মলয় সেই চিঠিকে সাক্ষাতকারের রূপ দিয়ে এবং আমাকে শৈলেশ্বরের অনুচর ঠাউরে নিয়ে  যে উত্তর দিয়েছিলেন তাতে সেদিন আমার সদ্য যুবক শরীর রাগে ঘৃণায় রী রী করে জ্বলে উঠেছিল। লেখাটির  ছত্রে ছত্রে শুধু গরিলা সুলভ বুক চাপড়ানি এবং অপরকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করা। ছিল পেশার অহঙ্কার। একটা লাইন তো এমনও ছিল যে, ওই সাক্ষাতকার প্রকাশ করলে আমি নাকি রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে যাব! বলাবাহুল্য মলয় রায়চৌধুরী মারফত নিজেকে বিখ্যাত বানানোর প্রবৃত্তি সেদিন অবহেলায় ত্যাগ করতে পেরেছিলাম।

    মলয়ের তৃতীয় সাক্ষাতকার পড়ি অরুনেশ ঘোষ সম্পাদিতজিরাফপত্রিকায়। সেখানেও  সেই একই রকম বিষোদ্গার এবং বুক চাপড়ানির সিক্যুয়েল। আজও মনে আছে একটা প্রশ্নের উত্তরে অরুনেশকে বলেছিলেন,“ লন্ডন স্কুল অফ ইকনোমিক্সে পড়ার সুযোগ পেয়েছিলাম, সাহিত্যের কারণে ভর্তি হইনি। সুতরাং বুঝতেই পারছ, যা যোগ্যতা ছিল তাতে তোমার মতো গাঁয়ের স্কুলে মাস্টারির চাকরি জোগাড় করতে আমার কোন অসুবিধেই হোত না।

    ভদ্র এবং অস্পষ্টবাদী হিসেবে আমারও যে খুব সুনাম আছে তেমন কিন্তু নয় তবু সেদিন মলয় রায়চৌধুরীর ওই ঝাঁঝ সামলানো আমার পক্ষে অস্বস্তিকরই হয়েছিল। সুতরাং এরপর  দুজন ঘেঁটিত্যাড়ার ভেতর দুস্তার ব্যবধান জেগে ওঠাটাই ছিল স্বাভাবিক। বড়জোর ওঁকে হয়ত শহীদের স্বীকৃতি দিতাম কিন্তু কী এক দুর্জ্ঞেয় কারণে শেষ অবধি তেমনটা হোল না! এরপর থেকে যেখানে যত লেখাপত্র প্রকাশিত হোত মলয় নিয়মিত সেসবের জেরক্স কপি আমাকে পাঠাতেন।  বেশীর ভাগই ছিল কবিতা কিংবা যুযুৎসীয় প্যাঁজ পয়জার।  পড়তাম সেসব। কবিতাগুলো ভালো লাগত না। অন্যগুলো থেকে শেখার চেষ্টা করতাম লেজে পা দেয়া মানুষকে অপমান করার কৌশল।
    শুধু লেখাপত্র নয়, কাঁপা কাঁপা অথচ সুন্দর হস্তাক্ষরে মলয় কখনও কখনও পোস্টকার্ডও পাঠাতেন। সৌজন্য বশতঃ সেসবের উত্তরও দিতাম। ব্যস, এই অবধিই। আমার পত্রিকার জন্যও কখনও মলয়ের লেখা চাইনি, মলয়ও কখনও আগ বাড়িয়ে পাঠাননি।

    মলয়ের সুবাদেই এরপর সমীর রায়চৌধুরীর সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটে। সহোদর হওয়া সত্ত্বেও  যেহেতু তিনি ছিলেন ভিন্ন চরিত্রের মানুষ তাই আমাদের সখ্য গড়ে উঠতে বেশী দেরী হয়নি। দিনকে দিন সেই সখ্য নিবিড়তর হয়ে উঠেছিল। যে কোনো বিষয়ে খোলাখুলি মত বিনিময় করতে আমরা কখনও দ্বিধা দেখাইনি। পরবর্তিতে সমীরকে নিয়ে আমার পত্রিকাগল্পবিশ্বএ ক্রোড়পত্রও প্রকাশ করেছিলাম। সমীর রায়চৌধুরীকে নিয়ে বাংলা সাহিত্যে সম্ভবত সেটাই প্রথম কাজ।

    সমীর রায়চৌধুরী প্রসঙ্গে অনেক কিছু বলার আছে কিন্তু সেসবের জন্য এই পরিসর উপযুক্ত নয়। এখানে শুধুই মলয় রায়চৌধুরী এবং ডুবজলে যেটুকু প্রশ্বাস। আপাততঃ সে প্রসঙ্গে ফেরা যাক।

    তো পড়লাম উপন্যাসটা। এবং চমকে উঠলাম। এ কোন মলয় রায়চৌধুরী! অনর্গল আঁচড়ানি কামড়ানির ফাঁকে ফাঁকে কিভাবে রপ্ত করলেন এই ভাষা! কর্কশ মানুষটার ভেতরে এই পেলব কথনভঙ্গী ছিল নাকি কখনও? মানুষের অন্তরকে খুঁটিয়ে দেখার মতো রঞ্জন রশ্মী ছিল নাকি ওঁর চোখে! ছিল নাকি এতটা সোহাগ, প্রশ্রয় ওঁর অন্তরে? কই, টের পাইনি তো!

    সত্যি বলতে কী সেদিন আমার পাঠ অভিজ্ঞতাকে দুমড়ে মুচড়ে দিয়েছিল এই উপন্যাস। ভঙ্গী এবং প্লট মারফত।

    ভঙ্গীর কথায় পরে আসব। প্রথমে বিষয়বস্তু প্রসঙ্গে আসা যাক।

    কীভাবে ব্যাখ্যা করব এই উপন্যাসের প্লট। শিল্পনীতি মোতাবেক কোনো বাঁধা রুটম্যাপই তো নেই!  বাঁধাই সড়কে চলতে চলতে মলয় অনায়াসে পথ বদলে উঠে পড়েছেন ফুটপাথে,সেখান থেকে দ্দে ছুট কানা গলিতে, নাহ্, গলিটা আদৌ অন্ধা নয়, দেয়ালের ফোঁকড় দিয়ে পথ বের করে নেমে পড়েছেন  মাঠে ঘাটে। ফলো করতে গিয়ে আমার নাজেহাল দশা। কখনও চলা থামিয়ে চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ছেন  বটে খোলা মাঠে, দেখছেন বটে আকাশ বাতাস চরাচর কিন্তু আমার পরিশ্রম থামছে কই!

    কথাগুলোতে কারুর হেঁয়ালি ঠেকলে আমি লাচাড়।  কারণ, রচনাটা আদৌ একমাত্রিক নয়,বরং বহুস্তরীয়। ফলে ঠিক করা মুশকিল হয় কাকে শনাক্ত করব এই উপন্যাসের মুখ্য চরিত্র হিসেবে? পাঁচ ফিটের ফর্সা, গালফোলা কোঁকড়া চুল, চনমনে অবাঙালি চেহারা বেপরোয়া সুশান্ত ঘোষকে? যে কিনা উপন্যাসের প্রথম পাতাতে হাজির হওয়া মাত্র ইন্দিরা গান্ধীকে সম্বর্ধনা জানাতে জোগার করা হাতির শুঁড়ের মৃদু আদরে ঘাড় ভেঙে ফেলে, চাকরীর পাশাপাশি ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তে ছুটে যায় ব্যবসা ধান্দায়, জমি পুনর্দখলের অভিপ্রায়ে গুন্ডা ভাড়া করতে গিয়ে নিজেই দখল হয়ে গিয়ে বাধ্য হয় চোদ্দ বছরের এক নাবালিকাকে বিয়ে করে জমি মাফিয়াদের ঘরজামাই হয়ে যেতে!

    নাকি বাবার আত্মহত্যার সুবাদে চাকরি পাওয়া অতনু চক্রবর্তিকে? কিন্তু সে তো ভীষন অন্তর্মুখি! কথা বলতে হবে, এহেন আতঙ্কে সে কারুর মুখোমুখি হোতে চায় না। ধুতি পঞ্জাবী পরে। সর্বোপরি নারীসঙ্গ বিহীন। দলে ভিরে মদ মেয়েমানুষবাজী করতে গিয়েও সবকিছু কেমন দরকচা করে ফেলে! সঙ্গমের অভিজ্ঞতা হয় বটে এক সময়, কিন্তু সেই ঘটনায় পুরুষালির বিন্দুমাত্র ছিঁটেফোটা থাকে না, বরং তা যেন গণধর্ষনের ফাঁদে পড়ে ভার্জিনিটি খোয়ানোর এক মেয়েলি কিস্যা।

    তাহলে মানসী বর্মন? যে কিনা ডিভোর্সী কিম্বা ডির্ভোসী নয়। ননীদা আর সুলতানার বাচ্চার সারোগেট মাদার হওয়ার মতো সাহস দেখিয়ে ফেলে বটে কিন্তু শেষ রক্ষা করতে পারেনা। শেষ অবধি গ্রামে গিয়ে নকশাল আন্দোলনে যোগ দেয়। এই সাহসিকতা এবং সততার পরও কিনা মানসী বর্মনের গচ্ছিত রেখে যাওয়া ব্যাগের ভেতর পাওয়া যায় রাশি রাশি নোট!
    কিন্তু ননীদা কিংবা সুলতানাকেই বা বাদ দেই কিভাবে! অবসরের পর যাকে বিয়ে করলেন ননীদা তাকে সুশান্ত এবং অতনু দেখেছিল হোটেলের কামরায় ঢুকতে এবং বেরতে।

    প্রধান চরিত্র হওয়ার যোগ্যতা অরিন্দমেরই বা কম কিসে! স্বামীর অনুপস্থিতিতে পাশের ফ্ল্যাটের মহিলাকে যৌন খোরাক জোগাতে জোগাতে প্রথমে পাগল এবং পরে নিরুদ্দেশ হয়ে যায় অরিন্দ। বহুদিন পর তার সন্ধান পাওয়া যায় এক গ্রাম্য রেলস্টেশন। চিকিৎসার পর সুস্থ হয়ে চাকরিতে ফের যোগ দেয় অরিন্দম এবং দৃঢ়তার সঙ্গে জানায় যে পাগল সে আদৌ হয়নি কখনো,যৌন কাতরতা থেকে মুক্তি পেতেই সে মানসিক চিকিৎসালয়ে ভর্তি হয়েছিল। অর্থাত চলতি কথায় যাকে আমরা বলি রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার। এবং এরপর সত্যি সত্যি একদিন ফ্ল্যাট ছেড়ে অফিস কোয়ার্টারে এসে ওঠে অরিন্দম। তারপর বদলি হয়ে কোলকাতায় চলে যায়, চিরতরে।

    এরকম আরও অজস্র চরিত্র আছে এই উপন্যাসে, কাহিনী বিন্যাসের ক্ষেত্রে যাদের ভূমিকা এক তিলও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।

    শুধু মানব চরিত্রের কথাই বা বলছি কেন? চরিত্র হিসেবে প্রাধান্য পাবার ক্ষেত্রে   বিহার রাজ্যটাই খুব এলেবেলে নাকি! দীর্ঘকাল ধরে চলে আসা  বিহারের জাতপাতের রাজনীতি, মাফিয়া সন্ত্রাস, অপহরণ ব্যবসা এবং   পোকামাকড়ের চেও অসহায় ভাবে সাধারণ মানুষকে গণহত্যার শিকার বানানো, কয়েক পুরুষ ধরে বিহারবাসী হওয়ার সুবাদে মলয় সেসব পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে তুলে ধরেছেন। যদিও এসব ঘটনা যে বহুদিন ধরেই  বিহারি সংস্কৃতির অঙ্গ সে বিষয়ে টুকচাক বিবরণ মিডিয়া আমাদের জানিয়েছে। সেসব ছিল ওদের নিজস্ব ব্যাপার, কিন্তু মলয়ের আঁখো দেখা হাল তুলে ধরেছে  চাঁদমারিতে কিভাবে ক্রমশঃ ঢুকে পড়েছে কয়েক পুরুষ ধরে ওই রাজ্যে বাস করা বাঙালী পরিবারগুলোও। ফলতঃ স্ত্রী কন্যা পুত্র সহ বেঁচেবত্তে থাকার সোশ্যাল সিক্যুরিটি জোগাড় করতে গিয়ে তাদের সামনে রয়ে গিয়েছে মাত্র দুটো পথ। হয় নিজের বাঙালি পরিচয়কে মুছে ফেলে পুরোপুরি বিহারি হয়ে যাওয়া, নতুবা পূর্ব পুরুষের ভিটে ছেড়ে পশ্চিমবঙ্গে আশ্রয় নেয়া।  
      
    এসবের পাশাপাশি এই উপন্যাসে আরও একটা চরিত্র আমাকে তীব্র ভাবে আকর্ষণ করেছে, সেটা হলো বাতিল পচা নোট। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের সামনের ফুটপাতে বরাবরই  কিছু মানুষকে টেবিল পেতে বসে থাকতে দেখেছি, যাদের পেশা বাট্টার বিনিময়ে ছেঁড়া ফাটা নোট বদলে ঝাঁ চকচকে নোট দেয়া। এটুকু জানতাম যে দালালগুলো এরপর ওই ছেঁড়া ফাটা নোটগুলোকে ব্যাঙ্কের কাউন্টার থেকে বদলে নেয় কিন্তু ব্যাঙ্ক ওই অচল নোটগুলোর কি গতি করে সেটা জানা ছিল না। জানার কথাও নয়, কারণ এই সংক্রান্ত তথ্য কোথাও কোনদিন নজরে পড়েনি। সাহিত্যও পারেনি তেমন জ্ঞান জোগাতে। মলয় রায়চৌধুরীর আগে কেউ এহেন পটভূমিকায় কোনদিন  গল্প/ উপন্যাস কিছুই লেখেন নি। পেশায় ব্যাঙ্ককর্মী এরকম অনেক লেখকের সাহিত্যকর্মের সঙ্গে আমার পরিচয় আছে, সুতরাং দায়িত্ব নিয়েই বলছি কথাটা। হয়ত না লেখার অজুহাত, বিষয়টাকে তেমন গুরুত্বপূর্ণ প্লট মনে না করা। আর এখানেই মলয় রায়চৌধুরীর বৈশিষ্ট। একটা না প্লটকে এমন জবরদস্ত প্লট হিসেবে তুলে ধরেছেন যে পড়তে পড়তে শিউরে উঠেছি। নোট বদলের ভেতর এত দুর্নীতি আছে! নোটের বান্ডিলগুলোকে বাতিল করার জন্য পাঞ্চিং মেশিনে ফেলে যে ছ্যাঁদা করা হয় তাতে স্বেচ্ছায় আঙুল বাড়িয়ে দেয় কিছু মানুষ? সরকারের থেকে কিছু টাকা ক্ষতিপূরণ আদায় করার জন্য এতবড় আত্মত্যা! হ্যাঁ, আত্মত্যাগই বলবো, কারণ ওই ক্ষতিপূরণের পণ দিয়ে মেয়ের বিয়ে দেয়া যাবে, চাষের জমি কেনা যাবে কিম্বা জমি রক্ষার জন্য কেনা যাবে বন্দুক।    
          
    এখানেই শেষ নয়। এরপর আছে রাশি নোট বাতিল হওয়ার পর সেসবের  সদগতি পর্ব। কি করে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক সেসব বাতিল বস্তা পচা নোট নিয়ে? ডুবজলে যেটুকু প্রশ্বাস মারফত জানলাম, জাস্ট কেরোসিন ঢেলে চুল্লীতে  জ্বালিয়ে দেয়া হয়। প্রক্রিয়াটা শবদাহরই মতো। চুল্লীর চিমনি দিয়ে একই রকম গলগলিয়ে ধোঁয়া ওঠে, বিশ্রী কটু গন্ধে চারপাশ ম ম করে ওঠে, আগুন দেয়ার সময় একই ভঙ্গিতেহরিধ্বনিকিম্বারাম নাম সৎ হ্যায়উচ্চারণ করা হয়।

    হ্যাঁ, এরপরই আমার কাছে উপন্যাসটা সার্থকনামা হয়ে ওঠে। একদিকে বিহারের টুঁটি চেপা সামাজিক রাজনৈতিক পরিবেশ অন্যদিকে দিনের পর দিন রাশিরাশি বাতিল বস্তাপচা নোট গোনা, বাতিল করা এবং পোড়ানো, সর্বোপরি দুর্নীতির করাল থাবা ঘাড়ের ওপর সদা উদ্যত, সামন্য ভুলে জীবন কিংবা জীবিকা তছনছ  হয়ে যাবার বিপুল সম্ভাবন। এই জীবনকে ডুবজল ছাড়া আর কী বা বলা যেতে পারে! আর যে কোনো প্রাণী যেহেতু সামান্য শ্বাসটুকু নেয়ার তাগিদে মরীয়া হয়ে ওঠে, অক্সিজেনের খোঁজে বেপরোয়া ঢুঁ মেরে বেরায়, এই উপন্যাসের চরিত্রগুলোও সেটাই করেছে। তাদের সমস্ত আচরণগুলোই ডুবজলে থেকে বাঁচার সন্ধান করার প্রবণতা।

    প্লট বিষয়ে আমি আর কিছু বলব না। বলাটা অপ্রয়োজনীয়ও, কারণ আমি এখানে উপন্যাসটির পাঠ অভিজ্ঞতার কথাই জানাতে চেয়েছি। এবং সেটা সাধ্যমত জানানোর চেষ্টা করেছি। যারা এই উপন্যাসটি আদৌ পড়েননি তারা কিভাবে এই রচনা মারফত প্রকৃত সাহিত্যের স্বাদ পাবেন?  সাহিত্যের ঝাঁজ কান নয়, মন দিয়ে গ্রহণ করতে হয়।
    না বলার আরও একটি কারণ হলো, অধিকাংশ পাঠকই প্রতিষ্ঠান নির্দিষ্ট সিলেবাসের বাইরে কিছু পড়তে আগ্রহী নন। খবরের কাগজের পাতায় ডঃ বাবুরা যা প্রেসক্রাইব করেন, ওরা সেটাই পড়েন। এর বাইরে গিয়ে অহেতুক ঝুঁকি নিয়ে সময়-অর্থের অপচয় ঘটাতে চাননা। যদি বা ওসব প্রেসক্রাইবড বই ভালো না লাগে তবু ঠোঁট ফাঁক করেন না। পাছে লোকে নন এলিট রিডার ভাবে! তাদের কেউ যদি ভুল করেও আমার লেখাটি পড়েন তাহলেও হয়ত মলয়ের লেখাপত্রের প্রতি আগ্রহী হবেন বলে মনে হয় না। তাহলে আর বেগার খাটনি খাটা কেন!

    তবুও যারা মলয়ের লেখাপত্রের সঙ্গে সামান্য হলেও পরিচিত অথচ এই উপন্যাসটি পড়ে উঠতে পারেননি তাদের জন্য ওরঁ বাক্যরচনা তথা চিত্রকল্প নির্মাণের কিছু কিছু নমুনা পেশ করার লোভ সামলাতে পারছিনা। কারণ তাছাড়া বোঝা সম্ভব হবে না, প্রথম উপন্যাসেই মলয় রায়চৌধুরী বাংলা সাহিত্যের চলতি ধারা থেকে হঠকে কিভাবে নিজস্ব ভোকাবলারি আলাদা করে নিয়েছিলেন। সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের গদ্যকে অনেকেই আধুনিকতার  চরম উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন কিন্তু আমার মনে হয়েছে মলয়ের গদ্যশৈলী তারচে ১০০ গুণ আধুনিক। এবং সংখ্যায় স্বল্প হলেও পরবর্তী প্রজন্মের কিছু কিছু গদ্যকারের রচনায়  আমি এই শৈলীর ছায়া দেখেছি। সেসব প্রয়াসকে অক্ষমও বলা যাবে না। এভাবেই তো সাহিত্যের উঠোন ক্রম বিস্তারিত হয়।
    তো আসুন নমুনা পেশের ময়দানে। উপন্যাসটি শুরু হচ্ছে এভাবে--লাশগুলোকে নামানো হচ্ছিল হোসপাইপ কেটে থামানো পাটনা-মুখো দরোজা জানলা বাথরুমের পাল্লাহীন গয়া প্যাসেঞ্জারের অন্ধকার লাগেজ ভ্যান থেকে, একের পর এক আদুল গা তামাটে পুরুষের পেশীদার শরীর ঠান্ডা কাঠ, পুণ্যলাভের জন্য পুড়তে যাবে গঙ্গায় আর এই লেভেল ক্রসিং থেকে, যেখানে রাস্তার ধারে ফোলডিং চেয়ার-টেবিল সাজিয়ে ল্যাম্পপোস্টের তলায় বসে স্বাভাবিক মৃত্যুর প্রমাণপত্র দিয়ে চলেছে পাটনা কর্পোরেশনের গণসেবক ডাক্তার সুনীলরঞ্জন নাহাবিশ্বাস ওরফে বিসওয়াজজি, শ্মশানঘাট কাছেই বলে, প্রতিদিন সন্ধ্যায় ফুলকো মেলার জমজমাট ভিড় আগেভাগে তৈরি, তাদের বাঁশের মাচান, ফুল, শাদা আর গোলাপি থান কাপড়, ঠ্যালা, রিকশা, ট্যাকসি, ধুপ, সিঁদুর, খুচরো টাকা পয়সা, খই বাতাসা, কাতাদড়ি, মাটির কলসি; বিহারী সংস্কৃতির মড়াপোড়ার যা কিছু।

      প্রথম প্যারাগ্রাফে এহেন নিষ্ঠুর বর্ণনার পরই মলয় লেখেন,“ ঘনসবুজ কচি আমের থুতনিতে হাত দিয়ে আদর করছিল একটা প্রৌঢ় আমপাতা। গাছের প্রায়ান্ধকার গোড়ায়, আধভিজে উইপোকার মেটেরঙা দেউড়ি। মিহিন আবেগপ্রবণ বাতাস বেড়াতে বেরিয়েছে হাত ধরাধরি করে। আকাশে দীঘল ফোলাফোলা মেঘ। অনেক দূরে, ওইদিকে, একাধটা ঠুনকো বিদ্যুতের অদৃশ্য আওয়াজ। এখন রূপসী মর্জির বিকেল। অল্প বয়সী কয়েকটি খেটে খাওয়া কাক চলে গেল দক্ষিণ থেকে উত্তরে। একটু আগে সামনের ছাতিম গাছে যে চড়াই পাখিগুলো স্থূল রঙ্গরসিকতায় মশগুল রেখেছিল নিজেদের, তারাও এখন চুপচাপ। রাস্তার ওপারে ধনী আর উদার কাঁঠালগাছ। রোদ্দুর বোধহয় গাছের ছায়া মাড়ায় না এ অঞ্চলে। চারদিকের এমন অতীন্দ্রিয় জগতের আভাস পেয়ে ছোটছোট গোলগোল নুড়ির দল উদাসীন শুয়ে আছে কালভার্টের তলাকার ছিপছিপে নালার কিনার বরাবর।
          
    বাতিল নোটের অজানা জগত বিষয়ে মলয় জানকারি দেন এভাবে, “ কতো রকমের নোট যোগাড় করে আনে দালাল নোটবদলকারীরা! এতো সূক্ষ্ম জোড়াতালি, সাদা চোখে টের পাওয়া যায় না কিচ্ছু। অফিসাররা পরখ করার জন্যে, টেবিলের এনামেল গামলার জলে ছাড়লে, কিছুক্ষণে আলাদা হয়ে ছিতরে যায় তাপ্পি দেয়া জোড়াতালি নোট। হয়তো দুকোণের সংখ্যাগুলো আলাদা, আদ্দেক আসলের সঙ্গে জোড়া আদ্দেক নকল, কিংবা কুড়ি টাকায় দু টাকার তাপ্পি, পাঁচশো টাকায় পাঁচ টাকা, সাতটা একশো টাকার নানান টুকরো জুড়ে একটা আস্ত। নোট যত পচা, যতো বেশী নষ্ট, আবদার ততো বেশি, অনুমোদনের নিয়ম ততো খুঁতখুঁতে, পাশ করার অফিসারের পাদানি ততো উঁচু। জুড়ে জুড়ে কাঠ হয়ে গেছে যেসব নোটের প্যাকেট বান্ডিল, গায়ে গা মিলিয়ে আলাদা হতে চায় না, উইচাটা থিকথিকে, গ্রামীন আটচলায় ছিল সোঁদা দেয়ালবন্দী, খামারবাড়ির মাটির অযাচিত গভীরে কলসিবন্ধ, গাছতলায় পোঁতা গুমোট কাঠের বাক্সে, আত্মহত্যাকারিণীর সঙ্গে জ্বলে খাক বা আধসেঁকা ঝুরঝুরে, চেহারা পাল্টে কাগজ না নোট বোঝার উপায় নেই।

    এতো গেল নোটের বিবরণ, নোট গুনিয়েদের দশাটা কিরকম?

    পুরানো হিলহিলে নোটের স্যাঁতসেঁতে গুঁড়ো গুঁড়ো ধুলোয় অতনুর অ্যালার্জি হয়েছিল চাকরিতে ঢুকেই। জ্বর, নাকের জলে রুমাল ভিজে ধুতির খুট ভিজে সহ্যশক্তি না গজানো অব্দি অ্যানালজেসিক আর অ্যালার্জির বড়ি খেয়ে অর্ধ নিমীলিত, ক্যানটিনের বেঞ্চে বা ডিসপেনসারির স্ট্রেচারগাড়িতে। বড়ো খাজাঞ্চি বলেছিলেন এ চাকরির অনেক হ্যাপা কিন্তু সয়ে যাবে, এরপর যদি আস্তাকুঁড়ে শোও তাহলেও অসুখে পড়বে না।

    ওদের সংস্থায় প্রত্যেক বছর একজন পাগল হয়। গেলবার দুবেজি হয়েছিল, তার আগের বছর এম কে ঝা পাগল হয়ে আর ফেরেনি। আসছে বারে কার পালা কে জানে।

    ব্যস, এনাফ। আর একটি উদ্ধৃতিও আমি দেব না। নাহলে পাঠককে প্রভাবিত করার দোষে অপরাধী হওয়ার পুরো সম্ভাবনা থাকবে। না,তেমন কোনো উদ্দেশ্য আমার নেই। গোটা রচনাটি মারফত আমি শুধু বোঝাতে চেয়েছি, এই উপন্যাসটি আজও আমাকে কতটা প্রভাবিত করে রেখেছে। জানাতে চেয়েছি চুটকির ইশারায় ডেকে এনে মলয় রায়চৌধুরী কিভাবে আমাকে আচমকা ডুবজলে ঠেলে দিয়েছিলেন। স্বস্তি এটুকুই যে এই জলের অপর নাম জীবনও। এর গভীর অতলে আমি পেয়েছি জীবনের সার সত্য।

    একদা মলয় আমাকে লিখেছিলেন,“ আমি মলয়, মলয় রায়চৌধুরী।আমি প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা করিনা, প্রতিষ্ঠানই আমার বিরোধিতা করে। কারণ আমিই প্রতিষ্ঠান।”

    কথাগুলোকে সেদিন মলয়ের হামবাগপণার নমুনা মনে হলেও আজ আমি স্বীকার করতে বাধ্য যে মলয় রায়চৌধুরী সত্যিই এক প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠান ওঁর বিরোধিতা করে কারণ মলয় স্থির কোনো অচলায়াতন নন। ভাষাকে পিতা এবং সন্তান গন্য করে প্রতি মুহুর্ত্বে তাকে শ্রদ্ধা এবং লালন পালন করে চলেছেন। আজকের লেখকের সামনে এক নয়া চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছেন, সম্ভব হলে আমাকে অতিক্রম করে দেখাও, হে মুন্সীরা!
    বাংলাভাষা তথা সাহিত্য নিয়ে যে যতই হতাশ হোক না কেন আমি নিশ্চিত পরবর্তি প্রজন্ম এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করবেই। কিন্তু কবে, তা জানিনা। কেননা ওই যে মলয়, মলয় রায়চৌধুরী, আজও ছুটে চলেছেন। মাঝে মাঝে হাত বাড়িয়ে বলছেন, ছুঁয়ে দেখাও। পরক্ষণেই স্যাঁৎ।