উপরের আলোচিত ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতাটি ১৯৬৩ সালে কবি মলয় রায় চৌধুরী রচিত ৯০ লাইনের একটি কবিতা। এককথায় বললে বহুল আলোচিত একটি জলবিভাজক কবিতা। কবিতাটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৬৪ সালে হাংরি বুলেটিনে। আর প্রকাশের পরপর সাহিত্যে অশ্লীলতার অভিযোগে কবিতাটি নিষিদ্ধ করা হয়। এমনকি রচয়িতাকে কাঠগড়ায়ও তোলা হয়।
রচয়িতা মলয় রায় চৌধুরী পৃথিবীতে আলোড়ন তুলেছিলেন কবিতার জন্য এক ক্ষুধার্ত প্রজন্মের আন্দোলন দিয়ে। যাদের লেখায় প্রকাশ্যে উঠে এসেছিল যৌনতা থেকে জীবনমুখী সংগ্রামের কথা। ইতিহাস তাকে আখ্যায়িত করেছে ‘হাংরিয়ালিস্ট মুভমেন্ট’ শিরোনামে!
আন্দোলনের সময়ে বা থেকে শৈলেশ্বর ঘোষ, মলয় রায় চৌধুরী, সুভাষ ঘোষ,সুবিমল বসাক, প্রমুখগণ। Image Source: thelogicalindian.com
এই আন্দোলন নিয়ে আলোকপাত করতে হলে যেতে হবে সেই ষাটের শতকের গোড়ার দিকে। সাল ১৯৬১। উক্ত বছরের নভেম্বরে সমীর রায় চোধুরী যিনি সম্পর্কে মলয় রায় চৌধুরীর দাদা, তার বন্ধু শক্তি চট্টোপাধ্যায়, দেবী রায় এবং মলয় রায় চৌধুরী নিজেদের পাটনায় বাড়িতে বেশ কয়েকদিন ধরে আলোচনায় বসেন। আলোচনার বিষয়বস্তু উত্তর ঔপনিবেশিক পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক ও সাহিত্যের প্রেক্ষিতে একটি আন্দোলনের সূচনা করা।
নাম দেওয়া হয় ‘হাংরি আন্দোলন’। ধারণাটির পুরো রূপরেখাই ছিল মলয় রায় চৌধুরীর। তখন মলয় রায় চৌধুরীর বয়স বাইশ। সেদিন তাদের চারজনের সহমতে শুরু হলো হাংরি আন্দোলনের বুনন। এই প্রসঙ্গে মলয় রায় চৌধুরী বলেন,
১৯৫৯-৬০ সালে আমি দুটি লেখা নিয়ে কাজ করছিলুম। একটি হল ইতিহাসের দর্শন যা পরে বিংশ শতাব্দী পত্রিকায় ধারাবাহিক প্রকাশিত হয়েছিল। অন্যটি মার্কসবাদের উত্তরাধিকার যা গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়েছিল। এই দুটো লেখা নিয়ে কাজ করার সময়ে হাংরি আন্দোলনের প্রয়োজনটা আমার মাথায় আসে।
ছবিতে মলয় রায়চৌধুরী। হাংরি আন্দোলনের সময়ে পালামৌ জেলার ডালটনগঞ্জে দাদা সমীর রায়চৌধুরীর বাড়িতে তোলা। Image Source: Malay raychoudhury
এবার আসা যাক হাংরি শব্দটি কেন নেওয়া হলো আন্দোলনের নামস্বরূপ। মূলত: ‘হাংরি’ শব্দটি মলয় রায় চৌধুরী নিয়েছিল জিওফ্রে চসারের কবিতার একটি চয়ন ইন সাউরে হাংরি টাইম (In Sowre Hungry Tyme) থেকে এবং তাত্ত্বিকভাবে ভিত্তি হলো প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ও দার্শনিক অসওয়াল্ড স্পেংলারের দ্য ডিকলাইন অব দ্য ওয়েস্ট (The Decline Of The West) বই থেকে।
মলয় রায় দেশভাগের পরবর্তী বাঙালির কালখণ্ডকে আসলে এখানে হাংরিরূপে রূপক অর্থে প্রকাশ করেছিলেন। তো সেদিন পাটনার বাসায় উপস্থিত তিনজনই সেই নাম অনুমোদন করেন। কার্যক্রম হিসেবে ঠিক করা হলো আপাতত প্রতি সপ্তাহে এক পাতার বুলেটিন প্রকাশ করা হবে। কলকাতার কফিহাউস থেকে শুরু করে কলেজ, সংবাদপত্রের অফিস সর্বত্র ফ্রিতে বিলি করা হবে এই বুলেটিন।
এদিকে, হাংরি নামকরণ নিয়ে শৈলেশ্বর ঘোষের মতে ‘হাংরি জেনারেশন’ শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন শক্তি চট্টোপাধ্যায়। ১৯৬২ সালে বিনয় মজুমদারের কবিতার সমালোচনা করতে গিয়ে শক্তি বলেছিলেন,
ওদিকে (পশ্চিমে) সামাজিক অবস্থা অ্যাফ্লুয়েন্ট, ওরা বিট বা অ্যাংরি হতে পারে। আমরা কিন্তু ক্ষুধার্ত।
যাই হোক, আন্দোলনের শুরুতে কলকাতায় নেতৃত্ব দেওয়া হয় শক্তি চট্টোপাধ্যায়কে। যেহেতু চারজনের মধ্যে তার পরিচিতি ছিল বেশি। সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় আন্দোলনের সূচনা হবে বুলেটিন বিতরণের মাধ্যমে। ১৯৬১ সালে হাংরি আন্দোলনের প্রথম বুলেটিন প্রকাশিত হয় ইংরেজীতে।
কারণ তখন পাটনায় বাংলা প্রেস ছিল না। আস্তে আস্তে আন্দোলনের চাকা সুচারুভাবে চলতে শুরু করে। ১৯৬২ সালে বেশ কয়েক মাস পর্যন্ত এই চারজনই ছিলেন আন্দোলনের নিউক্লিয়াস।
এক্ষেত্রে, একটি প্রসঙ্গ এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই; ইউরোপের আন্দোলনগুলো গড়ে উঠেছিল বিভিন্ন দশককে কেন্দ্র করে মানে টাইমফ্রেম ভিত্তিক। বাঙালিও এই চৌহদ্দি ডিঙিয়ে যাওয়ার আর সাহস পায়নি। ফলে, তৎকালীন কল্লোল গোষ্ঠী এবং কৃত্তিবাস গোষ্ঠী তাদের ডিসকোর্সে যে সমস্ত নতুনত্ব এনেছিলেন তা ছিল মূলত কলোনিয়াল এসথেটিক রিয়্যালিটি বা ঔপনিবেশিক নান্দনিক বাস্তবতাকে নিয়ে। কিন্তু এই টাইমফ্রেমকে প্রচণ্ডভাবে প্রথম চড়াঘাত করে যে আন্দোলন, সেটা হাংরি আন্দোলন!
১৯৬৪ সালে হাংরি বুলেটিনের প্রচ্ছদ। মলয় রায় সম্মাদিত হাংরি জেনারেশন বই থেকে সংগৃহিত ছবি।
আর ১৯৬১ সালের প্রথম বুলেটিন থেকেই হাংরি আন্দোলন চেষ্টা করে টাইমফ্রেমভিত্তিক এই চিন্তা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিন্তাতন্ত্র গড়ে তোলার। ইউরোপীয় শিল্পসাহিত্য আন্দোলনগুলোর দিকে খেয়াল করলে দেখা যাবে যে ব্যক্তির দাপটে বাকি সামগ্রিকতা তুচ্ছ সেখানে। যেখানে জনগণের দাপটের কোনো ভাষাই ছিল না। এমনকি দেশীয় কৃত্তিবাস গোষ্ঠীও ব্যক্তিবাদের লালনে সমসাময়িক গোষ্ঠীকে তুলে ধরতে সক্ষম হয়নি।
যে সাহিত্যের মূল ছিল সাধারণ মানুষের ভাবনা আর মুখের ভাষা, রচয়িতা নয়! সেটা কিনা প্রাক-ঔপনিবেশিক বলয়ে চলে গিয়েছিল ব্যক্তিচর্চার কেন্দ্রে। সাম্রাজ্যবাদীরা প্রতিটি উপনিবেশে গিয়ে এই ফসলটির চাষ করেছে সুচারুভাবে!
হাংরি আন্দোলনের মতাদর্শিরা ছিল মার্কসবাদী। আগা-গোড়া ধর্মাবলী নিয়ে চিন্তিত ছিল না। ফলাফলস্বরূপ বুলেটিন প্রকাশের প্রথম থেকেই তাদের সাথে সংঘাত শুরু আমলাতান্ত্রিক চেতনা ধারণ করা মানুষ আর রাষ্ট্রের সাথে!
হাংরি আন্দোলনকারীরা সাহিত্য ছাড়াও রাজনীতি, ধর্ম, উদ্দেশ্য, স্বাধীনতা, দর্শনভাবনা, ছবি আঁকা, সংস্কৃতি ইত্যাদি বিষয়ে ইস্তাহার প্রকাশ করেন। উপমহাদেশে ইস্তাহারের মাধ্যমে প্রথম আন্দোলন।
উল্লেখ্য, হাংরি আন্দোলনের পূর্বে লেখকগণ ছিলেন মূলত কমিউনিস্ট প্রভাবের বলয়ে আচ্ছাদিত। এতটাই যে বাস্তব জগতের সঙ্গে তারা বিচ্ছিন্ন ছিলেন। ইউথোপিয়ান স্বপ্নে বিভোর! অথচ হাংরিরা প্রথমবার হেটেরোটোপিয়ার কথা বললেন। এমনকি হাংরি জেনারেশনের কবি অরুণেশ ঘোষ তাঁর কবিতাগুলোতে বামপন্থীদের মুখোশ খুলে দিতে শুরু করেছিলেন।
হাংরির কথা নিয়ে প্রদীপ চৌধুরীর কালো গর্ত। Image Source: bongodorson
আন্দোলনের সময়কাল ছিল খুবই সংক্ষিপ্ত, ১৯৬১ থেকে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত। অথচ এই ছোট্ট সময়কালে ছাপানো হয় শতাধিক সাইক্লোস্টাইল করা বুলেটিন; অধিকাংশই হ্যান্ডবিলের মতন ফালিকাগজ, দেয়াল-পোস্টারে, একফর্মা এবং দীর্ঘ কাগজে। একটি দীর্ঘ কাগজে প্রকাশিত হয়েছিল উৎপলকুমার বসুর ‘পোপের সমাধি’ শিরোনামের বিখ্যাত কবিতাটি।
হাংরির প্রথম ইশতাহারে আগের প্রজন্মের চারজন কবির নাম থাকায় শক্তি চট্টোপাধ্যায় বেঁকে বসেন। ফলে, ডিসেম্বরে শেষ প্যারা পরিবর্তন করে পুনঃপ্রকাশিত হয়। এদিকে, ১৯৬৩ সালের শেষ দিকে সদস্য সংখ্যাও বৃদ্ধি পেতে থাকে। ফলে আবার অংশগ্রহণকারীদের নামসহ এই ইশতাহারটি তৃতীয় বারের মতো প্রকাশ হয়।
এরিমধ্যে হাংরিতে একে একে যোগ দেন উৎপলকুমার বসু, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, সুবিমল বসাক, অনিল করঞ্জাই, করুণানিধান মুখোপাধ্যায়, প্রদীপ চৌধুরী, সুবো আচার্য, অরূপরতন বসু, বাসুদেব দাশগুপ্ত, সুভাষ ঘোষ, সতীন্দ্র ভৌমিক, হরনাথ ঘোষ, নীহার গুহ, শৈলেশ্বর ঘোষ, অশোক চট্টোপাধ্যায়, অমৃততনয় গুপ্ত, ভানু চট্টোপাধ্যায়, শংকর সেনসহ আরো অনেকেই।
কর্মীদের বৈঠক হাংরি আন্দোলনের সময়ে। Image Source: Avijit Paul
তখনকার দিনে বামপন্থী ভাবধারার বুদ্ধিজীবীদের ওপর পুলিশ নজর রাখতো। দেবী রায় লক্ষ্য করলেন পুলিশের দুজন ইনফর্মার হাংরি আন্দোলনকারীদের যাবতীয় বইপত্র, বুলেটিন ইত্যাদি সংগ্রহ করে লালবাজারের প্রেস সেকশনে জমা দিচ্ছে এবং সেখানে ঢাউস সব ফাইল খুলে ফেলা হয়েছে।
আর বাংলা সাহিত্যে এমন ইশতেহার প্রকাশ করে আগাম ঘোষণা দিয়ে আন্দোলনও আগে আসেনি। ফলে, চারপাশের সবাই নড়েচড়ে বসতে শুরু করে।
হাংরি আন্দোলনের রাজনৈতিক ইশতাহার নিয়ে প্রধান সম্পাদকীয় বের হলো যুগান্তরে। মলয় রায় আর দেবী রায়ের কার্টুন প্রকাশিত হলো দ্য স্টেটসম্যান পত্রিকায়। হেডলাইন হলো ব্রিৎস পত্রিকায়। সুবিমল বসারের প্রভাবে হিন্দি ভাষায় রাজকমল চৌধুরী আর নেপালি ভাষায় পারিজাত হাংরি আন্দোলনের প্রসার ঘটালেন।
হাংরি আন্দোলনের সময়ের পোস্টার-বুলেটিন, করুণানিধান মুখোপাধ্যায়ের আঁকা । বুলেটিনের লেখা মলয় রায়ের। Image Source: songroshala.com
আসামে ছড়িয়ে পড়ল আন্দোলন পত্রিকাগোষ্ঠীর সদস্যদের মাঝে। ছড়িয়ে পড়ল আন্দোলনের ছটা বগুড়ার বিপ্রতীক এবং ঢাকার স্বাক্ষর ও কণ্ঠস্বর পত্রিকাগুলোর সদস্যদের মাঝে।
কিন্তু এরিমধ্যে বিভিন্ন মহলের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিল আন্দোলনকারীদের প্রতি। বিশৃঙ্খলা, অশ্লীলতা আর নৈরাজ্যের আরোপ আনা হলো হাংরিগোষ্ঠীর প্রতি। অসন্তোষকারীরা অনেকে এই আন্দোলনকে ব্রিটেনের অ্যাংরি ইয়াং ম্যান ও আমেরিকার বিট জেনারেশনের সঙ্গে তুলনা করল। যদিও মৌলিক চেতনায় হাংরির সাথে বাকি দুটোর কোনো মিলই ছিল না।
হাংরি আন্দোলনের পত্রিকা ‘জেব্রা’-র দ্বিতীয় সংখ্যা। Image Source: songroshala.com
আর সচরাচর পত্রিকা যেমন-কবিতা, ধ্রুপদী, কৃত্তিবাস, শতভিষা ইত্যাদি থেকে বিপরীতে গিয়ে হাংরি আন্দালনকারীরা তাদের পত্রিকার নাম রাখলেন জেব্রা, উন্মার্গ, ওয়েস্টপেপার, ফুঃ কনসেনট্রেশন ক্যাম্প প্রভৃতি। নামগুলো মনে করিয়ে দেয় যেকোনো আন্দোলনই হয় আধিপত্যের বিরুদ্ধে। হাংরিও তার ব্যতিক্রম ছিল না।
হাংরিদের নিজস্ব কোনো নিজস্ব অফিস ছিল না। ১৯৬৩ সালের দিকে হাংরির কর্মী সুবিমল বসাকের আঁকা ড্রয়িং অশ্লীলতার অভিযোগ উঠলে কফি হাউজের সামনে তাকে বেদম মারধর করা হয়।
হাংরি আন্দোলনের ১৫ নম্বর বুলেটিন এবং ৬৫ নম্বর বুলেটিন যথাক্রমে রাজনৈতিক ও ধর্ম সম্পর্কিত ইশতাহার; যেটি ক্ষুদ্ধ করেছিল শাসকগোষ্ঠীকে। ফলাফলস্বরূপ ১৯৬৪ সালের সেপ্টেম্বরে রাষ্টের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগে গ্রেপ্তার হয় মলয় রায় চৌধুরী, প্রদীপ চৌধুরী, সুভাষ ঘোষ, দেবী রায়, শৈলেশ্বর ঘোষ এবং দাদা সমীর রায় চৌধুরী।
আনুমানিক সাত মাস পরে মানে ১৯৬৫ সালের মে মাসে মলয় রায় চৌধুরীকে রেখে বাকিদের ছেড়ে দেওয়া হয়। মলয় রায়কে অভিযুক্ত করা হয় প্রচন্ড বৈদ্যুতিক ছুতার কবিতাটি অশ্লীল আখ্যায়িত করে। মলয় রায়ের বিরুদ্ধে মামলাটা দায়ের করা সম্ভব হয় তার নিজের দল হাংরির দুই সতীর্থ শৈলেশ্বর ঘোষ এবং সুভাষ ঘোষ রাজসাক্ষী হওয়াতে! অর্থাৎ প্রত্যক্ষভাবে হাংরি আন্দোলন যবনিকাপাত।
কলকাতা ব্যাংকশাল কোর্ট কর্তৃক মলয় রায়চৌধুরীর দণ্ডাদেশ। Image Source: songroshala.com
আরো দুজন সাক্ষীকে আনা হয় মলয় রায়ের বিরুদ্ধে। কিন্তু কৌশুলির জেরায় তারা ভুয়া প্রমাণিত হয়। প্রসিকিউশন এবার মলয়ের বিরুদ্ধে সাক্ষী তোলে শক্তি চট্টোপাধ্যায়, উৎপলকুমার বসু আর সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়কে। গ্রেপ্তারের ভয়ে কেউ আর এগিয়ে আসেনি।
অবশেষে মলয় রায়ের পক্ষ থেকে সাক্ষ্য দেয় জ্যোতির্ময় দত্ত, তরুণ সান্যাল আর সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। শক্তি আর সুনীল ছিলেন পরম বন্ধু। অথচ সুনীল হাংরি আন্দোলনের সমর্থনে ছিলেন না। হাঙ্গামা বলে তিনি পূর্বে হাংরি আন্দোলনের সমালোচনাও করেছিলেন! অথচ হিসাবের পরিক্রমায় শক্তি চলে যায় হাংরির বিরুদ্ধে আর পাশে এসে দাঁড়ায় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়!
মলয় রায় চৌধুরী জেলে থাকা অবস্থায় আমেরিকার ‘টাইম’ ম্যাগাজিনে সংবাদ হয়ে যায়। যুগান্তরে ‘আর মিছিলের শহর নয়’ এবং ‘যে ক্ষুধা জঠরের নয়’ শিরোনামে প্রধান সম্পাদকীয় লিখেন কৃষ্ণ ধর। যুগান্তর দৈনিকে সুফী এবং আনন্দবাজার পত্রিকায় চন্ডী লাহিড়ী কার্টুন আঁকেন। মার্ক্সবাদ ধারণ করা পশ্চিমের অনেক রাষ্ট্র মলয়ের জন্য কলম ধরে।
১৯৬৪ সালে মলয় রায় চৌধুরীর ট্রায়ালের সময়। Image Source: songroshala.com
কিন্তু বিভক্তি শেষ টীকা একে দেয় হাংরিদের কপোলে। আর এই আন্দোলনের ব্যর্থতার সূচিকাগার এই বিভেদ। বুর্জোয়াতন্ত্র এভাবেই বিভক্ত সৃষ্টির মাধ্যমে আন্দোলনকে দমন করে দেয় রক্তাক্ত ময়দান ছাড়া। যেমনটা, প্যালেস্টাইনে ফাতাহ আর হামাসের মধ্যেও দেখা দিয়েছিল।
আজো ইন্দিফাদার স্বপ্নে হাজারো তরুণ শহীদ হয়ে যায়! বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটিও স্বাধীনতার সময় এমন অজস্র বুর্জোয়া ভূ-পলিটিক্সের মুখোমুখি হয়। পরপর পাঁচবার জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ভেটোর সম্মুখীন হতে হয় স্বাধীনতা বানচালের অপচেষ্টাই।
সাহিত্যকে পণ্য হিসাবে চিহ্ণিত করতে অস্বীকার করেছিল হাংরি আন্দোলনের কর্মীরা। তাদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবদান প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা। কবিতাকে মধ্যবিত্ত গন্ডির বলয় থেকে মুক্ত করে শ্রমিকের ভাষায় উপস্থাপন করা। সেটা প্রথম করেন হাংরির কবি ও লেখক অবনী ধর, শৈলেশ্বর ঘোষ, সুবিমল বসাক, ত্রিদিব মিত্র প্রমুখ।
যেটা তখনও অব্দি বিবেচিত হতো অশ্লীল ভাষা আর ঝগড়া হিসেবে। যে বলয় থেকে খোদ বামপন্থীরাও মুক্তি দিতে পারেননি। এখানেই হাংরির স্বার্থকতা। সাহিত্য মূল্যায়ন হয়েছে সকলের তরে।
বামপন্থীদের মতো ইউথোপিয়ান স্বপ্নে বিলিণ না হয়ে হাংরির মলয় রায় চৌধুরী চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিল ডিসটোপিয়ার দরবারি কাঠামো। তার নভেলা ‘ঘোগ’, ‘জঙ্গলরোমিও’, ‘জিন্নতুলবিলদের রূপকথা’তে এর স্বরূপ পাওয়া যায়।
সবচেয়ে বৈপ্লবিক উত্থান ছিল সাবঅলটার্ন অথবা নিম্নবর্গের লেখকদের গুরুত্ব প্রদান করা। এমনকি হাংরি আন্দোলনে বুলেটিনের সম্পাদক ছিলেন চাষি পরিবারের সন্তান হারাধন ধাড়া। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়সহ তৎকালীন কবিরা তার এমন সমালোচনা করেছিলেন যে তিনি শেষ অব্দি এফিডেভিট করে ‘দেবী রায়’ নাম নিতে বাধ্য হোন।
মহাকালের বৈতরণীতে আজো সাক্ষ্য হয়ে আছে একদল ক্ষুদার্তের বয়ানে ‘হাংরি আন্দোলন’ শিরোনামে। উঠে এসেছিল প্রান্তিক কৃষক থেকে অন্ত্যজ শ্রেণির কথা। মলয় রায় চৌধুরী বলেন,
আমার ছোটোবেলা কেটেছে ইমলিতলা নামে পাটনা শহরের এক বস্তিতে, যে-পাড়ায় থাকতো বিহারি অন্ত্যজ আর অত্যন্ত গরিব মুসলমানরা, যারা একটা উৎসবে পরা পোশাক পরের উৎসবে পালটাতো তাদের কাজ ছিল চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, পকেটমারি, পিম্পগিরি, মেয়েদের বেশ্যাগিরি ইত্যাদি । পাড়াটায় নিষিদ্ধ বলে কিছু ছিল না যার দরুন আমি মধ্যবিত্ত বাঙালি মূল্যবোধের বাইরে গড়ে উঠেছি আর তাই ওই জীবন আর বাকজগত আপনা থেকে এসেছে আমার লেখালিখিতে।
হাংরির কথা উঠে এসেছে সমসাময়িক চলচ্চিত্রেও। সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের ‘বাইশে শ্রাবণ’ চলচ্চিত্রে নিবারণরূপী গৌতম ঘোষ! যাকে সৃজিত হাজির করেছিলেন একজন হাংরিয়ালিস্ট কবির চরিত্রে। সেই তুখোড় ক্ষ্যাপাটে নিবারণ সিস্টেম নিয়ে বলেছিল,
একটা পঁচে যাওয়া সিস্টেম, প্রত্যেকটা মানুষ পঁচে যাওয়া। কয়েকটা লাশ ঘুরে বেড়াচ্ছে।
‘ভাত দে হারামজাদা, নইলে মানচিত্র খাবো’ কবি রফিক আজাদ রচিত কবিতা। যেখানে কবি ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ নিয়ে পরোক্ষভাবে চেঁচিয়ে উঠেছিলেন। এভাবেই প্রতিটি প্রতিবাদের স্বর প্রজন্মকে মনে করিয়ে দেয় সেই ষাটের দশকের একদল ক্ষুধার্তের কথা। তৎকালীন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী থেকে শুরু করে সুশীল সমাজকে মুখোশ পাঠিয়ে এক উদ্যাম রাজপথের স্বপ্নে বিভোর ছিল যারা।
হাংরি আন্দোলনের সময়ে নেপালে। Image Source: Hungry Generation.
যারা প্রদীপ্ত স্বরে উচ্চারিত করেছিল ‘দয়া করে মুখোশটা খুলে ফেলুন’। আর কবি সাহিত্যিকদের জন্য বলা হয়েছিল ‘Fuck the Bastards of Gungshalik School of Poetry.’
নিজের ঢোল নিজে না পিটে বাংলা সাহিত্যের মহাফেজখানার কুবের সন্দীপ দত্তের একটা উদ্ধৃতি দিয়ে শুরু করি । সম্প্রতি বীজেশ সাহা সম্পাদিত ‘কৃত্তিবাস’ পত্রিকার ১ জুন ২০২২ সংখ্যায় ‘পাঁচ ছয় দশকের কিছু পত্রিকা-কথা’ প্রবন্ধে লিটল ম্যাগাজিন লাইব্রেরির কর্নধার সন্দীপ দত্ত, যাঁর লাইব্রেরিতে ভারতের ও বিদেশের নানা ভাষার লেখক-গবেষকরা পুরোনো বই-পত্রিকার খোঁজে যান, তাঁর রচনাটা পড়ে মনে পড়ে গেল । সন্দীপ দত্ত জানিয়েছেন, ড্যানিয়েলার মতোই, বাঙালি প্রবীণ সাহিত্যিকরা হাংরি আন্দোলনের প্রতি বিরূপ মনোভাব প্রকাশ করলেও সর্বভারতীয় ভাষাগুলোয় ও বিদেশে বরেণ্য হয়েছিল এই আন্দোলন । বলা বাহুল্য যে ভারতের বিভিন্ন ভাষার পত্রিকা ও লেখকদের কাছে পৌঁছে গিয়েছিল কারণ প্রথমদিকের বহু লিফলেট-বুলেটিন পাটনায় ইংরেজিতে ছাপিয়েছিলুম । পত্রিকার তুলনায় লিফলেট বিলি করার মাধ্যমে হাংরি জেনারেশান আন্দোলনের কথা দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছিল ।
সন্দীপ দত্তের প্রবন্ধটা থেকে প্রাসঙ্গিক অংশ তুলে দিচ্ছি :
“বাংলা লিটল ম্যাগাজিনের ইতিহাসে হাংরি প্রথম প্রতিষ্ঠানবিরোধী আন্দোলন । ১৯৬১ সালের নভেম্বর মাসে হাংরি জেনারেশন বুলেটিনের মাধ্যমে যার সূচনা । স্রষ্টা, নেতৃত্ব ও সম্পাদক যথাক্রমে মলয় রায়চৌধুরী, শক্তি চট্টোপাধ্যায় ও দেবী রায় । পত্রিকার চিন্তনভূমি পাটনা হলেও তার প্রকাশ স্হান ছিল ২৬৯ নেতাজি সুভাষ রোড, হাওড়া ; হারাধন ধাড়া বা দেবী রায়ের ঠিকানা । যদিও ছাপা হয়েছিল পাটনা থেকে ।
“মলয় রায়চৌধুরী তখন ২২ বছরের তরুণ, পাটনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির ছাত্র ।কবি জিওফ্রে চসারের ( ১৯৩৯ - ১৪০০ ) In The Sowre Hungry Tyme পড়ে মলয় Hungry শব্দের অভিঘাতে উত্তেজিত হয়ে ওঠেন । হাংরির পরিকল্পনা তখন থেকেই । সময়ের প্রেক্ষাপটটিও গুরুত্বপূর্ণ । সদ্য স্বাধীন দেশ । দেশভাগ, অর্থনৈতিক বিপর্যয় । দারিদ্র, ক্ষুধা, নিরন্ন মানুষ । বাংলা কবিতার হালও খুব খারাপ । ৩০ - ৪০-এর গতানুগতিক কবিতা নির্জীব হচ্ছে । ৫০-এর কবিরা সবে নিজেদের প্রকাশ করছে । নিজস্বভূমি আবিষ্কার হয়নি । শক্তি চট্টোপাধ্যায় একসময় এলেন পাটনায় । মলয় শক্তিকে হাংরি আন্দোলনের প্রয়োজনের কথা বলেন । প্রথম বুলেটিনে কবিতা বিষয়ক একটি ইশতাহার ইংরেজিতে ছাপা হলো ।
“১৯৬২ ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলায় প্রথম ইশতাহারটি প্রকাশ পায় । ১৯৬১ থেকে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত প্রায় ১০৭টি হাংরি বুলেটিন প্রকাশ পায় । এইসব বুলেটিনে প্রকাশের কোনো তারিখ থাকতো না । নানা রঙের কাগজে, এমনকি মলাটের বাদামি কাগজেও বেরোতো এক সপ্তাহে ২৪টি আবার কখনও বছরে একটি হয়তো ।
“হাংরি সূচনাকালে আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন মাত্র চারজন । শক্তি চট্টোপাধ্যায়, দেবী রায়, সমীর রায়চৌধুরী ও মলয় রায়চৌধুরী । এরপর একে একে যুক্ত হন সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, উৎপলকুমার বসু, শৈলেশ্বর ঘোষ, সুবিমল বসাক, সুভাষ ঘোষ, প্রদীপ চৌধুরী, বাসুদেব দাশগুপ্ত, ফালগুনী রায়, রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়, ত্রিদিব মিত্র, অরুণেশ ঘোষ, সুবো আচার্য প্রমুখ ।
“ঐতিহ্যগত মূল্যবোধকে অস্বীকার ও প্রচলিত গতানুগতিক ধারার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে লেখালিখিতে নতুন আবিষ্কারই প্রকৃত সাহসী ও মৌলিক পথ মানতো হাংরিরা । কৃত্তিবাস বা শতভিষা গোষ্ঠী হাংরি আন্দোলনকে মেনে নিতে পারেনি । প্রবীণ সাহিত্যকাররাও বিরূপ মনোভাব প্রকাশ করেছেন হাংরিদের সম্পর্কে । সংবাদপত্রে সমালোচিত হয়েছে হাংরি গোষ্ঠী ।
“অথচ সর্বভারতীয় ভাষায় বরেণ্য হয়েছিল এই আন্দোলন । হিন্দি, উর্দু, মারাঠি, গুজরাটি তরুণ লেখকরা এই আন্দোলনকে সমর্থন করেছিল । অন্য ভারতীয় ভাষার পত্রপত্রিকায় প্রভাব পড়েছিল হাংরি আন্দোলনের । মারাঠি ভাষার লেখক অশোক সাহানে, দিলীপ চিত্রে, অরুণ কোলটকর প্রমুখ, তেলেগু ভাষায় নিখিলেশ্বর, নগ্নমুনি, জ্বলামুখী প্রমুখ । হিন্দি লেখক ফণীশ্বরনাথ ‘রেণু’ হাংরি লেখকদের মূল্যায়ন করেন ।
“বহির্বিশ্বেও হাংরি আন্দোলনের বার্তা ছড়িয়ে পড়ে ।
“১৯৬৪ সালের জুলাই মাসের শেষ দিকে হাংরি জেনারেশনের একটি বুলেটিনকে কেন্দ্র করে অশ্লীলতার অভিযোগে মলয় রায়চৌধুরীসহ হাংরিদের অনেককেই গ্রেপ্তার করা হয় । ৪৮ শঙ্কর হালদার লেন, আহিরিটোলা, কলকাতা- ৫ থেকে ওই সংখ্যায় দশজন লেখক ও প্রকাশক সমীর রায়চৌধুরীর নাম পাওয়া যায় । লেখক তালিকায় ছিলেন মলয় রায়চৌধুরী, প্রদীপ চৌধুরী, বাসুদেব দাশগুপ্ত, সুবিমল বসাক, উৎপলকুমার বসু, দেবী রায়, রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়, শৈলেশ্বর ঘোষ, সুভাষ ঘোষ ও সুবো আচার্য । এই বুলেটিনেই প্রকাশ পায় মলয় রায়চৌধুরীর ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতাটি ।
“এই কবিতাকে কেন্দ্র করে অশ্লীল রচনার দায়ে হাংরি জেনারেশন পত্রিকার বিরুদ্ধে লালবাজার প্রেস সেকশনের সাব ইন্সপেক্টর কালীকিঙ্কর দাস অভিযোগ আনলেন । শুরু হলো ধড়পাকড় । ১১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেও ধরা হলো ৬ জনকে । মামলা অবশ্য শেষ পর্যন্ত দায়ের করা হয়েছিল মলয় রায়চৌধুরীর বিরুদ্ধে । দীর্ঘ দিন মামলা চলল । ১৯৬৫ সালের মে মাসে মলয় রায়চৌধুরীর বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করা হয় । এই ১৯৬৫ সালেই হাংরি আন্দোলনের ইতি ঘটে । এই বছরেই ২৮ ডিসেম্বর নিম্ন আদালতে মলয় রায়চৌধুরীর সাজা হয় । পরে, ১৯৬৭ সালের ২৬ জুলাই মলয় রায়চৌধুরী হাইকোর্টে পিটিশন দ্বারা মামলা করার ভিত্তিতে, তাঁকে সম্পূর্ণরূপে মুক্তি দেয়া হয় ।
“আন্দোলনের কথা পৌঁছে যায় নিউইয়র্কের TIME পত্রিকায় । এই প্রথম বাংলা ভাষায় প্রকাশিত একটি পত্রিকা বিদেশে প্রচারিত হলো । প্রতিষ্ঠানবিরোধী হাংরি জেনারেশনের এই আন্দোলন বাংলা সাহিত্যে একটি দীঘস্হায়ী ছাপ রেখে গেল ।”
সন্দীপ দত্তের বক্তব্য থেকে স্পষ্ট যে আমাদের আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল বুলেটিন প্রকাশের মাধ্যমে । তখন ছাপানোর খরচও কম ছিল । পাঁচ টাকায় এক হাজার বুলেটিন ছাপিয়ে দেবী রায়কে পাঠিয়ে দিতুম আর দেবী রায় কলকাতার কফিহাউস, বিশ্ববিদ্যালয়, পত্রিকা দপতর ইত্যাদিতে বিলি করতো । ১৯৬২ থেকে বাংলায় বুলেটিন ছাপাবার জন্য আমি দেবী রায়কে ম্যাটার আর টাকা পাঠিয়ে দিতুম । যেহেতু আধুনিকতার একরৈখিকতার বিরোধিতা করা জরুরি ছিল, আমি বুলেটিনগুলোতে ধারাবাহিক নম্বর দিতুম ; কখনও বা নম্বরহীন বুলেটিন প্রকাশ করা হতো, যেমন উৎপলকুমার বসুর ‘পোপের সমাধি’ কবিতা ।
১৯৬৩ সালের শুরুতে সুবিমল বসাক যোগ দেবার ফলে ওর লাইন ড্রইঙ আর তার সঙ্গে গদ্য প্রকাশ করা হতো সাইক্লোস্টাইল করে, অনেকটা এখনকার জেরক্সের মতন । সাইক্লোস্টাইল করা বুলেটিনে কেবল একটারই নম্বর দেয়া হয়েছিল, উনিশ নম্বর, যাতে কবিদের বংশতালিকা তৈরি করা হয়েছিল চার্টের মাধ্যমে; দেখানো হয়েছিল উচ্চবর্ণের আধুনিক কবিদের পুর্বপুরুষরা সবাই নিম্নবর্ণের কবিয়াল । অনিল করঞ্জাই আর করুণানিধান মুখোপাধ্যায়, দুজন চিত্রশিল্পী যোগ দেবার পর পোস্টকার্ডে আর পোস্টারে কবিতা বা স্লোগান লেখা হতো, সেগুলো ছাপানো হতো উর্দু সংবাদপত্রের লিথোপ্রেস থেকে । ত্রিদিব মিত্র আর ওর প্রেমিকা আলো মিত্র পোস্টারগুলো নানা জায়গায় দেয়ালে লাগাতো।
প্রথম কয়েকটা বুলেটিনের সম্পাদকীয় দপতর দেবী রায়ের হাওড়ার বস্তিবাড়ি দেখানো হয়েছিল । এরকম একটা কেন্দ্রের ধারণা যেহেতু আধুনিকতার তৈরি তাই আমি ঠিক করলুম যে যার যেখান থেকে ইচ্ছে বুলেটিন প্রকাশ করতে পারে। হাংরি আন্দোলনের কোনো হেডকোয়ার্টার বা পলিটব্যোরো বা হাইকমান্ড থাকবে না ।কিন্তু নিজের টাকা খরচ করে বুলেটিন ছাপার ব্যাপারে কেউ বিশেষ চাড় দেখায়নি । বুলেটিনে নেতার নাম শক্তি চট্টোপাধ্যায় আমিই ছাপিয়েছিলুম আর এই ব্যাপারটা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে চটিয়েছিল । পরে বিনয় মজুমদার এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন যে নেতা হবার কথা ছিল তাঁর । বিনয় আমাকে তাঁর মনের কথা বলেননি । নয়তো শক্তির বদলে আমি বিনয়ের নাম নেতা হিসাবে ছাপিয়ে দিতুম । ‘সুনীলকে লেখা চিঠি’ নামে একটা বই বেরিয়েছে তালপাতা প্রকাশনী থেকে ; তাতে হাংরি আন্দোলনের সময়ে সুনীলকে লেখা অনেক চিঠি আছে । আমার চিঠিও আছে, যাতে আমি ওনাকে নেতৃত্বের প্রস্তাব দিয়েছিলুম ।
সন্দীপ দত্ত যেমন বলেছেন, মামলাটা আমার বিরুদ্ধে হয়েছিল । আমার বিরুদ্ধে লালবাজারে স্টেটমেন্ট আর আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছিল শক্তি, সন্দীপন, উৎপল, শৈলেশ্বর আর সুভাষ । মামলা জেতার পর আমার ঘেন্না ধরে গিয়েছিল এই তথাকথিত বন্ধুদের সম্পর্কে। মামলা জিতে আমি পচা-ছাতাপড়া-তেলচিটে নোট পোড়াবার চাকরিতে যোগ দিই । এই চাকরি থেকে তাড়াতাড়ি অন্য চাকরি পাবার চেষ্টায় সফল হই । অ্যাগ্রিকালচারাল রিফাইনান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশনের লখনউ অফিসে যোগ দিয়ে টের পাই যে আমি ভারতের গ্রামীণ জীবন আর চাষবাস সম্পর্কে কিচ্ছু জানি না । সাহিত্যের বই পড়ার বদলে আমাকে চাষবাস, পশুপালন, তাঁত, হাতের কাজ, চাল-ডাল জোয়ার-বাজরার ভেদাভেদ নিয়ে বই পড়া আরম্ভ করতে হয় ।
আমার কলকাতায় অনুপস্হিতির সুযোগ নিয়ে শৈলেশ্বর ঘোষ, সুভাষ ঘোষ, বাসুদেব দাশগুপ্ত নানা গল্প রটিয়ে দিতে থাকে । পাঠকরা জানতোই না যে আন্দোলনটা আমি আরম্ভ করেছিলুম, মামলাটা আমার বিরুদ্ধে হয়েছিল। ওরা ক্ষুধার্ত, ক্ষুধার্ত খবর ইত্যাদি পত্রিকা প্রকাশ করলেও, সাঙ্গঠনিক দক্ষতার অভাবে কাছে টানার বদলে সহযোগীদের দূরে সরিয়ে দিয়েছে আর হাংরি আন্দোলনকে সাধারণ পাঠকের কাছে পৌঁছোতে দেয়নি । অলোক গোস্বামী, রাজা সরকার, সমীরণ ঘোষ প্রমুখ উত্তরবঙ্গে হাংরি আন্দোলন আরম্ভ করলে তাকে ভেঙে দেন শৈলেশ্বর ঘোষ, সে-ঘটনা অলোক গোস্বামী বিস্তারিত লিখেছেন তাঁর স্মৃতিকথা ‘মেমারি লোকাল’-এ ।
আমি আবার কলকাতায় ফিরতেই হাংরি আন্দোলন সম্পর্কিত কথাবার্তা সাহিত্যিকদের মাঝে ফিরে আসে। উত্তম দাশ তাঁর মহাদিগন্ত পত্রিকায় যাবতীয় নথিপত্র প্রকাশ করার ফলে হইচই আরম্ভ হয় । যারা কখনও হাংরি আন্দোলনে ছিল না তাদের লেখাপত্র নিয়ে দে’জ থেকে সংকলন প্রকাশিত হয় ।
সমীরণ মোদক আমার সম্পাদিত ‘জেব্রা’ পত্রিকা সংকলিত করেছেন । হাংরি আন্দোলনকারীদের চিঠিপত্র সংগ্রহ করছেন সংকলন প্রকাশের জন্য । এই সংকলনে তিনি হাংরি বুলেটিনগুলো একত্রিত করেছেন, সবগুলো নয়, যতোগুলো পেয়েছেন । তাঁর এই শ্রমসাধ্য কাজের জন্য আমরা সবাই তাঁর কাছে ঋণী ।